Home গল্প পিঁপড়ার হজযাত্রা -তমসুর হোসেন

পিঁপড়ার হজযাত্রা -তমসুর হোসেন

একটি পিঁপড়া সঙ্কল্প করল সে হজ করতে যাবে। সে সবাইকে এ কথা বলে বেড়াতে লাগল। সে হৃষ্টচিত্তে বলতে লাগল ‘খোদা রহম করলে আমি এবার হজের জন্য যাত্রা করব।’ তার কথা শুনে বিভিন্ন রকম মন্তব্য করতে লাগল লোকজন।
‘কী বললে হজে যাবে। তা কী করে যাবে তুমি হজে?’
‘যাব। একটা উপায় নিশ্চয় হয়ে যাবে।’
‘তুমি কি জান হজে যেতে কত টাকা লাগে? তা কত টাকা জোগাড় করেছ বলত শুনি?’
‘ওসব আমার কিছুই নেই। আমি যাওয়ার ইচ্ছে করেছি এটাই বড় কথা।’
‘এসব পাগলামি না করলেই ভালো হয়।’
মালদ্বীপ থেকে সাগর পাহাড় মরুভূমি পার হয়ে মক্কা যাওয়া সহজ কথা নয়। যেখানে বিশাল সমুদ্র পাড়ি দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে সিন্ধু ঈগলের সবল ডানা। মরুঝড়ে পথ হারিয়ে ফেলে কত দুরন্ত কাফেলা। পার হয়ে যেতে হবে কত অরণ্য, কত পর্বতসঙ্কুল মরু বিয়াবান। এত সব বাধা পার হয়ে কেমন করে সে যাবে পবিত্র মক্কা মুয়াজ্জমায়। এটা কি মুখের ফুঁক না আকাশকুসুম অভিলাষ। তার এক বন্ধু মুখে মুখে বলল, এখান থেকে আরব কত দূর পথ তা কি তুমি জান? কত দিনে তুমি পার হবে এত দূরের রাস্তা? তোমার বয়স কি কুলাবে?’
ছোট্ট পিঁপড়া তার উদ্দেশ্যে অনড় থাকে। যেভাবেই হোক তাকে যেতে হবে খানেকাবায়। খোদার ঘর সে তাওয়াফ করবে একনিষ্ঠ মনে। নবীজীর রওজার পাশে বসে হৃদয়ের দরদ দিয়ে দরুদ পড়বে। যে পথ দিয়ে দয়ার নবী চলাচল করতেন, সেই কঙ্কর বিছানো পথে দুপুরের খরতাপে সেও হেঁটে বেড়াবে। রওজার ধুলো গায়ে মেখে ধন্য তার তাপিত প্রাণ। বুলবুলে বাগে মদিনা সাল্লি আলা সাইয়্যেদেনা মুহাম্মাদ দরুদ পড়ে রাসূলের রওজার চারপাশে সে ঘুরে বেড়াবে। তখন তার হৃদয় বিগলিত না হয়ে পারবে না। অশ্রæসিক্ত চোখে কতই না শান্তির পুলক নেমে আসবে।
ব্যাকুল পিঁপড়া কেঁদে কেঁদে বলে, ইয়া মাবুদ তাওফিক দান কর। সে সবসময় খোদাকে স্মরণ করে। কাজকর্ম স্বপ্নজাগরণে তার একই আরাধনা, হে খোদা অধমকে তুমি পথ দেখাও। তোমার অশেষ দয়া এবং সীমাহীন করুণায় আমাকে তোমার পবিত্র ঘরে পৌঁছে দাও। আমার অন্তর যে ব্যাকুল বিহŸল। তোমার রহম ছাড়া আমার বাসনা কখনই পূরণ হবে না। তুমি ছাড়া এই অধমের কোন আশ্রয় নেই।’ সারাদিন সারারাত পিঁপড়া খোদার দরবারে এই প্রার্থনাই করে।
তখনকার দিনে সবাই পায়ে হেঁটে হজ করত। এখনকার মত উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা তখন ছিল না। ছিল না পানিজাহাজ, দ্রæতগামী ট্রেন এবং আকাশচারী বিমান। পিঁপড়া কী করে হজে যাবে? সবাই তাকে মিথ্যুক এবং ভণ্ড বলে টিটকারি করতে লাগল। একসময় তার চারপাশের পরিবেশ এমন বিরূপ হয়ে উঠল যে তার পক্ষে সেখানে বাস করা কষ্টকর হয়ে পড়ল।
হজের সময় সমাগত অথচ তার যাওয়ার কোন বাহন নেই। এক সকালে আল্লাহর নামে পিঁপড়া শহরের দিকে রওয়ানা করল। এখানে সেখানে ঘুরে সে এক প্রাচীন মসজিদে পৌঁছল। সেখানে ধীরে সুস্থে নামাজ পড়ল সে। মসজিদের ছাদে একটি গম্বুজের ভেতর থাকার ব্যবস্থা করলো সে। মসজিদের চত্বরে পৃথিবীর বহু অঞ্চলের পাখিরা আসা যাওয়া করে। তারা সেখানে পর্যটকদের দেওয়া খাবার খেয়ে গল্পগুজবে মেতে থাকে। পিঁপড়া গম্বুজের ভেতর বসে তাদের কথাবার্তা শোনে। খোদার প্রতি তাদের গভীর ভক্তি এবং নিবিড় আনুগত্য দেখে তার মন জান্নাতি প্রশান্তিতে ভরে যায়। সে খোদার দরবারে নতজানু হয়ে রাত জেগে কান্নাকাটি করতে থাকে।
হঠাৎ একদিন পূর্ব তিমুর থেকে একঝাঁক শুভ্র কবুতর উড়ে এসে আশ্রয় নিলো মসজিদের ছাদে। তাদের দলনেতা তাদেরকে খোদার ইবাদতে মনোনিবেশ করার উপদেশ দিয়ে নিজেও জিকিরে মশগুল হয়ে গেল। পবিত্র হজের শৃঙ্খলা ও আহকাম সম্পর্কে খুঁটে খুঁটে আলোচনা করল প্রবীণ দলনেতা। পরের দিন প্রত্যুষে তারা কাবার উদ্দেশে রওয়ানা করবে। পিঁপড়া এ সুযোগ হাতছাড়া করল না। সে একটি কবুতরের পালকের ভেতর লুকিয়ে থাকল। কয়েকদিন একটানা উড়াল দেওয়ার পর তারা পৌঁছে গেল সুদূর মক্কা নগরে। পিঁপড়া তাদের সাথে হজব্রত পালন করল। মদিনায় যাওয়ার পর তারা নবীজীর কবর জিয়ারত করল। নবী প্রেমে উদ্বেলিত হয়ে পিঁপড়া উচ্চকণ্ঠে গেয়ে উঠল, সাল্লিআলা মুহাম্মাদ বুলবুলে বাগে মদিনা। কবুতরের দলনেতা এমন এক খোদাভীরু আশেকে রাসূলের সন্ধান পেয়ে খুবই খুশি হলো। তারাও তার সাথে সমস্বরে গেয়ে উঠল, বুলবুলে বাগে মদিনা সাল্লিআলা মুহাম্মাদ।

SHARE

Leave a Reply