Home সম্পূর্ণ কিশোর উপন্যাস রস কষ শিঙ্গাড়া বুলবুলি মস্তক- সোলায়মান আহসান

রস কষ শিঙ্গাড়া বুলবুলি মস্তক- সোলায়মান আহসান

বেড়ানো নিয়ে প্রতিবার গোল বাধায় আবহাওয়া। ইচ্ছেমত ছুট দেওয়া যায় না আবার। ঢাকা শহর এক অদ্ভুত শহর। মন বসে না এখানে দীর্ঘদিন। ছুট দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু পারা যায় না। হাত-পা বাঁধা যেনো। আব্বু বলেন ঢাকা শহরে অদৃশ্য দুটো দৈত্য আছে তারা বড়ো বড়ো শিকল দিয়ে বেঁধে রাখে। সেই দুটো দৈত্যের নাম চাকরি-ব্যবসায় এবং লেখাপড়া। হ্যাঁ, কেউ আটকে থাকে চাকরিতে ছুটির জন্য। ব্যবসায়ের ঝামেলায় কেউ পড়ে থাকে। আর যাদের জন্য বেড়ানো, ছোটমণিদের থাকে স্কুলের পরীক্ষা। তাই ইচ্ছের পায়ে বেড়ি লেগেই থাকে।
সবকিছু ঠিকঠাক। জিসান, বুলবুলিরা রাজশাহী যাবে। ওখানে এক চাচ্চু আছেন, ভার্সিটির অধ্যাপক। তার দেওয়া প্রোগ্রাম মেনে গোছগাছ চলছিল। চাচ্চু ইতিহাসের অধ্যাপক। জিসান বুলবুলির ইচ্ছে এবার বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাসটা জানবে। সভ্যতার ইতিহাস জানা জিসানের খুউব আগ্রহ। রাজশাহীতে আছে বিখ্যাত বরেন্দ্র জাদুঘর। তাছাড়া নাটোরের রাজবাড়ী দেখারও তাদের ইচ্ছে। বিখ্যাত রানী ভবানীর সেই রাজ প্রাসাদটি টানছে জিসানকে। বুলবুলিরও ইতিহাস-ঐতিহ্যে প্রীতি আছে খানিকটা। মামা খবির সবজান্তার কথা হচ্ছে- বেড়ানো শুধুই ফুর্তির জন্য যাতে না হয়, ফুর্তিটা বাড়তি পাওয়া-উদ্দেশ্য থাকবে জ্ঞানার্জন।
শেষ পর্যন্ত রাজশাহী যাওয়ার প্রোগ্রাম বাতিল। ট্রেন জার্নি করবে বলে পাঁচটে টিকিটও কাটা হয়েছিল। ছোট চাচ্চু হঠাৎ জানালেন কয়েকদিন পরে যেতে। কারণ সে সময় চলবে রাজশাহী ভার্সিটিতে ইতিহাস সম্মেলন। সেই সম্মেলন নিয়ে তিনি ব্যস্ত। তা ছাড়া সম্মেলন উপলক্ষে আসা বড়ো বড়ো বিজ্ঞজনদের জন্য ভার্সিটির গেস্ট হাউজ পরিপূর্ণ ঠাসা। যদিও চাচ্চু বলেছিলেন সেটা কোন সমস্যা নয়, থাকার জন্য তার বাসাও খাসা। সমস্যা তার নিজের। পর্যাপ্ত সময় দিতে পারবেন না তিনি।
ওদিকে সিলেট থেকে আব্বুর ফুপাতো ভাই আনসার চাচ্চু ফোনের পর ফোন দিচ্ছেন। তাদের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার কথা ছিল তার কী খবর। বেশ কিছুদিন আগে আম্মুর কথা মত আনসার চাচ্চুকে জানানো হয়েছিল বেড়াতে যাবার ইচ্ছেরÑ সেই সূত্র ধরেই এর আগেও আরেকবার তিনি ফোন দিয়েছিলেন।
কোথায় যাওয়া হবে তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিল জিসানরা। কারণ আম্মুর স্কুল পূজার ছুটির ওই সাত সাতটা দিনই নির্ধারিত বেড়ানোর জন্য। আব্বুরও সেভাবে ফাঁক বের করা। রাজশাহীতে যাওয়া হচ্ছে না দেখে আম্মু পরে ফোন দিলেন আনসার চাচীকে। সেই ফোনের সুবাদে চাচী, চাচাত বোন শাহরিন-আইরিনরা সকাল দুপুর রাতে ফোন দিতে থাকে। কবে আসছে তারা। অবশেষে সিদ্ধান্ত হল মৌলভীবাজারই যাওয়া হবে। মৌলভীবাজারও নয় এর অন্তর্গত রাজনগরের মুন্সিবাজার।
জিসান-বুলবুলির আব্বু রায়হান চৌধুরীর ছোট ফুপুর বাড়ি। বিশাল বাড়ি। প্রায় পনেরো বিঘে জমির ওপর।
‘খান বাড়ি’ হিসেবে মশহুর। কী নেই ওই বাড়িতে- দুটো পুকুর, ফলফলারি, হাঁস-মুরগির খামার। গরুর পাল, ধান পাট থেকে চাষ হয় না এমন কোন কিছু বাকি নেই।
জিসান-বুলবুলিরা এর আগে আরেকবার গিয়েছিল। তখন ওরা ছিল খুউব ছোট। জিসানের বয়স চার, বুলবুলির দুই। এখন ওরা বেশ বড়ো। জিসান ফাইভ, বুলবুলি থ্রিতে পড়ে। এবার ওরা খুব মজা করবে। চাচাত বোনরা অবশ্য ওদের চেয়ে বড়ো। শাহরিন টেন এবং আইরিন সেভেনে পড়ে। ওরাই বারবার ফোন দিয়ে ব্যস্ত করে তোলে। চাচীও ফোনের পর ফোন দিয়েছেন।
অবশেষে আম্মু রেহানা ম্যাডাম-স্কুলে ওই নামেই পরিচিত এবং ডাকসাইটে ম্যাডামদের একজন বললেন, এতো আগ্রহ নিয়ে আমাদের বেড়াতে ডাকছেন ভাই-ভাবী, তাহলে সেখানেই যাবো। কিন্তু যাবো বললেই হলো না, প্রয়োজন সগিরকে। জিসান-বুলবুলিদের ছোট মামা। সে থাকে চা-বাগানে। গার্ডেন ম্যানেজার। তাকে খবর দিলেই এসে হাজির হবে। সগির না হলে জিসান-বুলবুলির বেড়ানো সার্থক হয় না। আর সগির না হলে রায়হান চৌধুরীর হয় না আয়েস করে বেড়ানো। আর রেহানার মাত্র দেড় বছরের ছোট সগির না হলে কি বেড়ানোতে মজা হয়? অতএব সগিরকে খবর দেওয়া হল।
গার্ডেন ম্যানেজারদের একটা সুবিধা হলো বন-জঙ্গলে থাকে। কে দেখে ওদের ডিউটি পালন। তাছাড়া সেরকম বাঁধাধরা নয়টা-পাঁচটা অফিস করা ওদের নিয়ম নয়। বরং চব্বিশ ঘণ্টাই ওদের ডিউটি। তাই ম্যানেজার সাহেবদের গার্ডেনে আলিশান বাড়ি দিয়ে রাখা হয়।
রাজশাহী যাওয়া বাতিল হলে রাজনগর যোগাযোগ চলল দু’-একদিন। সগিরকে সব জানান হলো। তার ঢাকায় প্রয়োজনে আসতে হচ্ছে। ফোনে আনসার চাচা-চাচী, শাহরিন আইরিনের সঙ্গে দিনে কয়েকবার আলোচনা। হ্যাঁ, আলোচনাই বলতে হবে, ওদিক থেকে ফোন আসেতো মিনিটের পর মিনিট কথা। এসব কথার বিষয়বস্তু থাকে নিজ নিজ এলাকার নানা গল্প থেকে ভূত- প্রেতের কেচ্ছা-কাহিনীও।
জিসান ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করে না। বলে-বিশ^াস হচ্ছে না, এবার আসো, দেখাইমু। আইরিনের কথা। শাহরিনও আইরিনের কথায় সমর্থন দেয়।
যাহোক, কথা মতো সগির এসে হাজির। রেহানা ইতোমধ্যে গোছগাছ কমপ্লিট করে রেখেছে। রাজনগর ট্রেনে যাওয়া যায় কিন্তু তারা যাবে মাইক্রোতে। দিনের বেলা যাবে। গাড়ির স্বচ্ছ কাচের জানালা ভেদ করে প্রকৃতি উপভোগ করবে। তাছাড়া রাজনগর থেকে বেশ ভেতরে আনসার চাচ্চুদের বাড়ি। ট্রেনে গেলে আবার চাপতে হবে মাইক্রোতে। কি দরকার বারবার ওঠানামার ঝামেলা পোহানো! তাই সাদা রঙের একটা ‘হায়াসি’ মাইক্রো ভাড়া করা হলো। সগির তার পরিচিত লোকের কাছ থেকে ভাড়া করেছে গাড়ি।

দুই.

খুব সকালে এক পশলা বৃষ্টি ঝরে গেল। শহরে বসে কালটা আঁচ করা কঠিন। তবে আশি^নের মাঝামাঝি জিসান জানে। কাল হিসাবে শরৎ। বৃষ্টির কথা। তবে বৃষ্টিটা জানান দিল শীতের। শীত শীত ভাবটা লাগছে। পাহাড়ি অঞ্চলে যাচ্ছে ওরা। ওখানে নাকি পাহাড়ি জঙ্গলে চিতাবাঘের মত শীতটাও লুকিয়ে-চুরিয়ে থাকে। মাঝ রাতে নেমে পড়ে সদলবলে। হি হি হি করা কনকনে শীতও পড়ে। তাই, জিসান-বুলবুলির জন্য চার নম্বর সিগন্যাল-গরম সোয়েটার পরতেই হবে। বুলবুলি লাল আর জিসান নীল রঙের সোয়েটার পরে ফিটফাট। এসব নিয়ে ওরা আজকাল ঝামেলা করে না।
সগির ড্রাইভারকে বলে রেখেছিল ভোর ছ’টায় ঢাকা থেকে রওনা দেবে তারা। ঢাকা থেকে মৌলভীবাজার যাত্রায় ফেরির পথ নয়, তবু যতোটা দিনের আগে ঢাকা ছাড়া যায় ততোই মঙ্গল। এমন চিন্তা থেকেই সগির ড্রাইভারকে বলেছিল।
বৃষ্টির জন্য মিনিট বিশেক লেইট হলো। ড্রাইভার মোহসিনের ভাষ্য-বৃষ্টির ঠাণ্ডায় ঘুমটা জাইকা বইছিল স্যার। খুব স্বাভাবিক, শেষরাতে বৃষ্টি নামলে ঘুমের মাসিরা এসে চোখের পাতায় আসন পেতে বসে আরামসে। উঠতেই চায় না। মোহসিনের কথা একদম ঠিক।
মিরপুর থেকে মাইক্রো ছেড়ে এগিয়ে চলেছে সাঁই সাঁই গতিতে। রাস্তা একদম ফাঁকা। ভোরের এই ঢাকা কত না মায়াবী-কত না মনোহর। একটা নিপাট ভদ্র ভদ্র চেহারা শহরের। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কেউ কেউ বড়দণ্ড লাগানো ঝাড়– দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করতে ব্যস্ত। একটু পর ওদের দেখা যাবে না। থাকবে ঝকঝকে পরিষ্কার রাস্তাটা।
মাইক্রো ছুটে চলেছে। মিরপুর ছেড়ে পূর্বাচল আবাসিক প্রকল্প দিয়ে মাধবদী, নরসিংদী, ভৈরব, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এসে থেমে যায় মাইক্রো। সামনেই হবিগঞ্জ। কিন্তু কোন গাড়ি নড়ছে না। লম্বা গাড়ির সারি। যেতে পারছে না। থেমে আছে। কী ঘটল, নিশ্চয়ই দুর্ঘটনা। যা আমাদের নিত্যদিনের খবর। একটু পর জানা গেল ঠিক তাই। ওদিক থেকে হেঁটে আসা মানুষের মুখে মুখে যে বর্ণনা জানা গেল তা হলো-বড় রাস্তায় সিএনজি স্কুটার চলাচল নিষেধ, সেই নিষেধ না মেনে একটা স্কুটার বড় রাস্তায় এসে পড়ে।
Ñ ট্রাফিক পুলিশের ধাওয়া খেয়ে ফাঁড়ি রাস্তা দিয়ে পালাতে গিয়ে রেলক্রসিংএ এসে চলন্ত ট্রেনের সঙ্গে ধাক্কা।
Ñ ট্রেনের সঙ্গে স্কুটারের সংঘর্ষ আর কিছু বলার থাকে। একজন শিশুসহ চার আরোহী আহত। কেউ বলছে শিশুটা স্পট ডেথ। গ্রামবাসী ছুটে এসেছে। তারা দু’চারটা গাড়ির ওপর চড়াও হয়েছেও। কিন্তু ঘটনাস্থলে দ্রæত পুলিশ-আনসার বাহিনীর সদস্য এসে পরিস্থিতি শান্ত করে।
একঘণ্টা ধরে গাড়ি চলাচল বন্ধ। গাড়ি থেকে নেমে হাঁটাহাঁটি করা ছাড়া উপায় কী। সঙ্গে ছিল বাসা থেকে আনা পানি, সিদ্ধ ডিম আর হালুয়া। রেহানার বরাবরের অভ্যাস কোথাও বেড়ানোর উদ্দেশে দূরপথে বেরুলে কিছু খাবার সঙ্গে নেওয়া। সগির সেটা জানে বলে গলা বাড়িয়ে বলে- আপু, তোর ফুড ব্যাংক বের কর- কখন এই ঝামেলা মিটে। পেটে হারমনিয়াম-তবলা বাজছে।
রেহানা যথারীতি ডিম একটা করে আর বাটিতে বাটিতে হালুয়া বিতরণ করে। পানি দু’বোতলও বেশ কাজে লাগে। আশপাশে কোন দোকান-টোকান নেই। রাস্তার দু’ধারে ধান খেতের সবুজ সমারোহ। শুধু সবুজ আর সবুজ। আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। মনকাড়া দৃশ্য।
হাঁটাহাঁটি খাওয়া-দাওয়া সেরে মাইক্রোতে এসে যে যার সিটে এসে বসে। পেছনের দিকে সগির, জিসান ও বুলবুলি বসেছে। গল্পের সুবিধার জন্য। মাঝামাঝি রায়হান আর রেহানা।
– ছোট মামা, একটা গল্প শোনাও, সময় কাটুক।
জিসান বলল বেশ আবদারের ভঙ্গিতে।
– হ্যাঁ মামা, একটা মজার গল্প শোনাও। বুলবুলিও নড়ে চড়ে বসে।
-গল্প, শুধুই গল্প – একটা কিছু জানতে চাও- সগির বলল।
জিসানরা ছোট মামাকে সবজান্তা হিসাবেই ভাবে। অনেক জ্ঞান রাখেন ছোট মামা। স্টুডেন্ট লাইভে ছিলেন ব্রিলিয়ান্ট। বিদেশ যাবার সুযোগও পেয়েছেন। কিন্তু যাননি। ফিজিকসে মাস্টার্স করে কেউ কি জঙ্গলে পড়ে থাকে? তাও বাগানের ম্যানেজারি করতে? মামা গাছপ্রেমিক। দেশকে ভালোবাসেন। তাই, তিনি গার্ডেনে পড়ে আছেন। চা সম্পর্কে মামার আগ্রহ বেশি। তিনি চান চা-চাষে বিপ্লব আনতে দেশে। বিদেশে রফতানি বাড়াতে।
– আচ্ছা মামা, আর্যজাতি কোত্থকে এসেছিল? জিসান মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে জিজ্ঞেস করে।
– হুম! একটা ভালো প্রশ্ন। বুলবুলি তুমিও কি জানতে চাও?
– হ্যাঁ মামা, জানতে চাই তবে সহজ করে বলতে হবে কিন্তু – হাসতে হাসতে বলল বুলবুলি।
– সহজ করেই বলব। আর্যজাতির আদি বাসভূমি কোথায় ছিল তা স্থির করে বলা যায় না। দক্ষিণ রাশিয়া থেকে মধ্য এশিয়া মানে তুর্কিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত ভূভাগে আর্যদের আদি বাসভূমি ছিল। খ্রিস্টপূর্ব দুই হাজার অব্দের কাছাকাছি সময়ে এই আর্যেরা তাদের বিভিন্ন শাখা নানা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
– কোন্ কোন্ দেশে মামা? জিসান জানতে চায়।
– যেমন ধর, ভারতবর্ষ, ইরান, গ্রিস এবং ইউরোপের নানা দেশে। আর্যরা মানসিক শক্তিতে ছিল খুব অগ্রসর। যোদ্ধা হিসাবেও ছিল ভালো। নানা সভ্যজাতির কাছাকাছি এসে নতুন নতুন সভ্যতা তারা গড়ে তোলে।
– মামা, আর্যরা ভারতবর্ষে এলো কবে? বুলবুলি প্রশ্ন করে।
এতক্ষণ গালে হাত দিয়ে নীরবে শুনছিল। এবার মুখ খুলল। মানে সেও মজা পাচ্ছে।
– মনে হয় খ্রিস্টপূর্ব পনের শ’ অব্দের আগেই। আর্যদের একটা শাখা উত্তর পশ্চিম দিক দিয়ে ভারতবর্ষে প্রবেশ করে। সে সময়ে সিন্ধু ও পাঞ্জাব জুড়ে একটি বৃহৎ সাম্রাজ্য ছিল। এর রাজধানী ছিল হরপ্পা ও মোহেনজোদাড়োতে। হরপ্পা সভ্যতা ব্রোঞ্জ যুগের অন্তর্ভুক্ত। ইতিহাসবিদরা মনে করেন আর্যদের আক্রমণেই এই সাম্রাজ্যটি নষ্ট হয়ে যায়। প্রথম দিকে আর্যরা দমন পীড়নের মাধ্যমে শাসন করতে চাইলেও ধীরে ধীরে তারা সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করে। কারণ এখানে ছিল একটা সভ্যতা- সিন্ধু সভ্যতা যাকে বলা হয়। এই সিন্ধু সভ্যতার দু’টি অঞ্চল হলো সিন্ধু নদ এবং তার শাখা-প্রশাখা বাহিত সমতলে অবস্থিত হরপ্পা ও মোহেনজোদাড়ো। এখন বলা হচ্ছে ইউফ্রেটিস এবং নীল নদের তীরে বেড়ে ওঠা সভ্যতার সমান বয়সী সিন্ধু সভ্যতা। হরপ্পা সভ্যতাকে পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতাগুলির মধ্যে সবচেয়ে বিস্তৃত বলা হচ্ছে। ভারত, আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানের অন্তর্গত সিন্দ, মাক্রান, বালুচিস্তান, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তর রাজস্থান, কাথিয়াবাড়, কচ্ছ এবং বাদাখশানে হরপ্পা সভ্যতার অসংখ্য এলাকা আবিষ্কৃত হয়েছে।
– আচ্ছা মামা, এটা কিভাবে চিহ্নিত করে যে হরপ্পা সভ্যতা এটা কিংবা অন্যটা? জিসানের জানার আগ্রহ বেশি।
– এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বটে, বলছি শোন প্রতœতত্ত¡বিদরা বসে নেই। তারা সারাক্ষণ মাটি খুঁড়ে বের করে আনছেন সভ্যতার নিদর্শন। খোঁড়াখুঁড়িতে বের হয়ে এসেছে মাটির নিচে তলিয়ে যাওয়া পুরো শহর পর্যন্ত। একেকটা সভ্যতার কিছু প্রমাণ ও নিদর্শন চিহ্নিত হওয়ার পর ওই নিদর্শন যেখানেই পাওয়া গেছে, তাকে ওই সভ্যতার অঞ্চল হিসাবে চিহ্নিত হয়। বুঝতে পেরেছ?
বুলবুলি মাথা নাড়ে। মানে সেও বুঝতে পেরেছে।
– সগির, তুমিতো ভাগ্নে-ভাগ্নিদের নিয়ে গল্পে জমে গেছ- একটু গাড়ি থেকে নেমে দেখো না ভায়া, আমরা কোন্ সভ্যতার মধ্যে কতক্ষণ আটকে থাকব? রায়হান হাসতে হাসতে বলল।
– জি, দুলাভাই। নেমে দেখছি আমাদের সুসভ্য হতে কত বাকি।
সগির মাইক্রো থেকে নামে। গাড়ির ড্রাইভার দৌড়াতে দৌড়াতে গাড়ির কাছে এসে বলল- গুড নিউজ স্যার, এখনই গাড়ি ছাড়ি দেবে। ছাত্র এবং গ্রামবাসীর সঙ্গে বনিবনা হইছে।
মোহসিন ঠাস্ করে গাড়ির দরোজা খুলে নিজ সিটে এসে বসে। গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়।
সগিরকে তাই আর বেশি দূর যেতে হয় না। গাড়িতে উঠে আসে। ধীরে ধীরে গাড়ি সামনে এগোতে থাকে। লম্বা গাড়ির সারি। তাই পূর্ণ গতিতে চলতে পারছে না।
– যাক বাঁচা গেল। রেহানা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।

তিন.

বৃষ্টিটা পিছ ছাড়ল না। বাড়ি পৌঁছার পর দুপুর গড়িয়ে গেলে প্রথমে হিমেল হাওয়া। কড় কড় শব্দে বজ্রপাত। তারপর ঝড়ো বাতাস। সবশেষে মুষল ধারায় বৃষ্টি নামল। ফলে আটকে গেল বাইরে যাওয়া। ঘরবন্দী হয়ে পড়ল। কিন্তু আড্ডা, সেটা বাদ সাধে কে! ভাগ হয়ে গেল আড্ডার দল। ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে আড্ডায় জমে গেল রায়হান- রেহানা- আনসারভাই- ভাবীরা। আর বড় বড় কয়েকটি ঘরের সর্বদক্ষিণের ঘরটা হয়ে উঠলো সগির- জিসান- বুলবুলি-শাহরিন-আইরিনদের চাঁদের হাট।
একটুপর এসে জুড়ল শাহরিন-আইরিনদের চাচাত ভাই রাকিন। ক্লাস থ্রিতে পড়ে। গোলগাল চেহারা। মোটাসোটা। দেখলে মনে হবে গোবেচারা, ভাজা মাছটা উল্টিয়ে খেতে পারবে না।
– আমিও গফ্ করতাম শাহরিন আপা-বলেই বড়সড় বিছানায় উঠে বসে রাকিন।
– ঠিক আছে, আমাদের সঙ্গে গফ্ করতে হলে তোমাকে একটা পরীক্ষা দিতে হবে- একটা কবিতা আবৃত্তি করে শোনাতে পারবে? আইরিন বলল।
– পারব। বলেই শুরু করল- কাজলা দিদি, কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী-
বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই,
মাগো আমার শোলক-বলা কাজলা দিদি কই?
পুকুর ধারে লেবুর তলে থোকায় থোকায় জোনাই জ¦লে
ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না একলা জেগে রই-
মাগো আমার কোলের কাছে কাজলা দিদি কই?
সেদিন হতে কেন মা আর দিদিরে না ডাকো;
দিদির কথায় আঁচল দিয়ে মুখটি কেন ঢাকো?
খাবার খেতে আমি যখন, দিদি বলে ডাকি তখন,
ও ঘর থেকে কেন মা আর দিদি আসেনাকো?
আমি ডাকি তুমি কেন চুপটি ক’রে থাকো?
গড় গড় করে কবিতাটি আবৃত্তি করে চলল রাকিন। এমন একটা অপ্রচলিত কবিতা আবৃত্তি করে রাকিন সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলো।
– তুমি এ কবিতা কার কাছ থেকে শিখেছ বাবা? সগির জানতে চায়। আদর করে কাছে টেনে নেয়।
– আমার আম্মুর কাছ থেকে- আম্মুর অনেক কবিতা মুখস্থ। আমারে কয়েকটা কবিতা শিখাইছুইন।
– মামা, রাকিনের আম্মু মানে আমারার ডেইজি চাচী, অসুস্থ, প্যারালাইসিস- কিন্তু তাইন বই পড়তে খুউব ভালো বাসেন- কবিতা আবৃত্তি করেন-
চাচী এক সময় গানও গাইতেন- শাহরিন বলল।
– বাহ চমৎকার! ভীষণ ভালো ভীষণ ভালো, আমার খুব ভালো লেগেছে। রাকিন যে কবিতাটা শোনাল, আমরা এ কবিতা পড়তে পড়তে চোখের পানি ধরে রাখতে পারি নাই- রাকিন আমাকে সেই শৈশবের স্মৃতি মনে করিয়ে দিলো।
রাকিনও হয়ে গেল জিসান-বুলবুলি-শাহরিন-আইরিনদের চাঁদের হাটের সদস্য।
– কিন্তু আমরা এখন কী করব? চোখ পিট পিট করে সগির সবার দিকে তাকিয়ে বলল।

কড় কড় কড়াৎ… কড় কড় কড়াৎ …কড়াৎ …
ভীষণ জোরে বাজ পড়ল। সবাই আঁতকে ওঠে।
-উ মাই গো! শাহরিন চিৎকার দেয়।
– মামা, আমাদের এখানে বাজ পড়লেও কোন ক্ষতি হবে না-ওইযে দেখছেন না পাওয়ার স্টেশন- ওই স্টেশনের যাতে ক্ষতি না হয় সে রকম ব্যবস্থা করা আছে। তাছাড়া বিদ্যুতের সরবরাহ কখনও বন্ধ হবে না। ওই স্টেশন আমাদের এক সময় নিজস্ব জায়গা ছিল। বিক্রি করা হয়েছে। এ জন্য পাওয়ার স্টেশন এতো লাগোয়া।
এমন সময় আনসার চাচ্চু একটা বেতের ট্রেতে বড় বাটিতে গরম গরম তেলেভাজা পিঠা এনে হাজির।
সিলেটে এ পিঠাকে হান্দেশ বলে।
– অমা! হান্দেশ- শাহরিনের আনন্দ প্রকাশ সবার আগে। পটাপট হাত চালিয়ে তুলে নিয়ে মুখে চালান দিতে লাগল সবাই। পিঠার সোয়াদে জমে উঠল চাঁদের হাট আরো।
কড় কড় কড়াৎ… কড় কড়াৎ …
বাজ পড়তে থাকল। বৃষ্টিও নামল জোরে। মানে দুর্যোগ।
– ভালোই হলো, আজ এমনিতে আমরা বেড়াতে গিয়ে মুসিবতেই পড়তাম। হিন্দুদের দুর্গাপূজা- মানে চা-বাগানে লোকে লোকারণ্য। চা-বাগানের কুলিরা দারু খেয়ে নাচ গান করবে। এসব দেখার জন্য আসবে আরো শত শত মানুষ। হিন্দুরাতো আসবে পূজার জন্য, মুসলমানরা আসবে মজা করতে। আমরা ওই ভিড় ঠেলে যেতে পারতাম না মামা। শাহ্রিন বলল।
– কিন্তু আমরা এখন কী করব, গল্প জমবে না-কারণ বাজ ও বৃষ্টির শব্দ, তাহলে-সগির কথাটা বলে আবার পিট পিট চোখে তাকায় সবার দিকে।
– তাহলে আর কি রস কষ শিঙ্গাড়া বুলবুলি মস্তক খেলি-আইরিন বলল।
– কি রকম খেলা এটা? জিসান আমতা আমতা করে।
– ভাইয়া, আমরা যেটা এন্টি বেন্টি সেন্টিটা বলে খেলি-আঙুলের খেলা তাই না? বুলবুলি বলল।
– ইয়েস! আঙুলের খেলা- সবাই রাজি?
– রাজি। সগির সবার আগে বলল।
– তাহলে গোল হয়ে বসি আমরা- আইরিন বলল।
গোল হয়ে বসল সবাই। রাকিনের মুখে হাসি লেগেই আছে।
হাসিমাখা মুখ দেখতে সুন্দর। তাই রাকিনকে সগির নিজের পাশে টেনে বসায়।

রস কষ শিঙ্গাড়া বুলবুলি মস্তক…
রস কষ শিঙ্গাড়া বুলবুলি মস্তক…
রস কষ শিঙ্গাড়া বুলবুলি মস্তক…

চলতে থাকল ওদের খেলা।

– এ্যাই হুরুতা – মুরুতা নাড়– খাইবানি-নারকলের নাড়–?
আনসার চাচ্চুর আবার প্রবেশ। হাতে একটা বেতের ধামায় নারিকেলের নাড়– একদম গরম গরম।
খেলা স্টপ! খেলা স্টপ! আগে নাড়– খাওয়া- আগে নাড়– খাওয়া। একদম গরম গরম। শাহরিন বলল।
রস কষ শিঙ্গাড়া বুলবুলি মস্তক খেলা হতে হাত উঠিয়ে গরম নাড়–র বাটিতে হাত ঢোকায় সবাই।
– আহ্ যা মজা না গরম নাড়– খেতে – সগির আবার দুষ্টমির দৃষ্টিতে পিট পিট করে চায় সবার দিকে।
– ছোট মামা! বুলবুলির হাসি মুখে মামাকে মৃদু শাসন।

চার.

আজ সকালটা সবদিক থেকেই সুন্দর। ঝকঝকে রোদ গাছের ফাঁকফোকর দিয়ে এসে পড়েছে বিশাল উঠোনে। গত দিনের ঝড়-বৃষ্টিতে ঝরে পড়া পাতার ওপর রোদ পড়ায় একটা বুনো গন্ধ ছড়াচ্ছে। এ বাড়ির উঠোন বিশাল। চার ভাইয়ের ঘর পাশাপাশি। বাড়ির এ মোড় থেকে ও মোড় পর্যন্ত উঠোন পাকা করা। ধানের সময় এ উঠোনে ধান শুকানো হয়। ধান ভাঙার জন্য নিজস্ব কল আছে। তা ছাড়া ছোটখাটো অনুষ্ঠানও হয় নাকি এখানে।
সকালে উঠে জিসান ফুরফুরে মেজাজে আছে। গতকাল দিনজুড়ে একটানা ঘ্যানঘেনে বৃষ্টি বেড়ানো প্রোগ্রামকে ভেস্তে দেয়। কিন্তু আজ ঝলমলে রোদ খুশি ছড়াচ্ছে। আজ নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও বেড়ানো হবে। কিন্তু কোথায় তা সে জানে না। মামা হয়তো জানেন। গিয়ে দেখি মামার কাছে। জিসান ভাবে।
গুটিসুটি পায়ে জিসান চলে আসে আরেক বিল্ডিংয়ে। এটা আনাম চাচ্চুর বাড়ি। দোতলা বাড়ি। শান শওকত বেশি। এখানে কেউ থাকেন না এখন। সবাই লন্ডনে। চাচা আসেন বছরে দু’বার। থাকেন মাস ছয়েক। চাচী ও চাচাত ভাইয়েরা কদাচিৎ আসেন। লন্ডনে চাচার হোটেল ব্যবসা আছে। চাচী চাচাত ভাইয়েরা ওই ব্যবসায় দেখাশুনা করেন।
দোতলায় একটা গেস্ট হাউজ। পাঁচটা বেডরুম, বড় ড্রয়িং, কিচেন নিয়ে আলিশান ব্যবস্থা। আনাম চাচা যখন থাকেন তখন অনেক গেস্ট তার বাসায় আসেন। তাই এমন ব্যবস্থা, আনাম চাচ্চু ওই গেস্টরুমেই তাদের থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন।

মামাত ভাই রায়হানদের বেড়াতে যাবার খবর পেয়ে আনাম ফোনে তার গেস্ট হাউজের কেয়ারটেকার সুজনকে সেভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু আনসার চাচ্চু এটা মানতে চাননি। তার কথা- আনাম থাকলে হয়তো সেটা ঠিক ছিল, সে যখন নাই তার মেহমান অন্য জায়গায় থাকবে কেন। হতে পারে তার বাড়িতে তত শান-শওকত নেই। দুই ভাইয়ের এই দ্ব›েদ্বর মীমাংসা হিসাবে স্থির হলো সগির থাকবে আনামের গেস্ট হাউজে আর রায়হানরা আনসার চাচ্চুর বাড়িতে। জিসান আনাম চাচ্চুর বাড়িতে এসে দেখা পেল সুজনের। সুজন চাচা, মামা কোথায়? জিসান জিজ্ঞেস করে।
– দোতলায় উঠিয়া সোজা রুমটায়। সুজন আঙুল দিয়ে সিঁড়ি দেখিয়ে দেয়।
জিসানের চেনা মোটামুটি। হন হন করে সিঁড়ি ভাঙে। একটা টার্নিং আছে। দোতলায় উঠে বড় একটা লন। লনটা পেরিয়ে চলে আসে সগির মামার রুমের সামনে।
– মামা -মামা-জোরে জোরে ডাকে জিসান।
– চলে আয়, দরজা খোলা – ভেতর থেকে মামার কণ্ঠ।
জিসান ঢুকে পড়ে সটান। মামা একটা লাল কম্বলের নিচে তখনো শোয়া।
-মামা, তুমি এমন কুড়ে হলে কবে? এখনও ঘুমাচ্ছ?
-নারে ঘুমাচ্ছি না- সেই সকালে উঠেছি, একটু আলসেমি করছি – গার্ডেনে থাকলে এতক্ষণে এক চক্কর দেওয়া হয়ে যেতো পুরো বাগানটা-
– মামা, আজ কোথায় বেড়াতে যাবো আমরা? জিসান বলল।
– সে কথাই ভাবছিলাম- এদিকে শাহরিনদের ভাই আকাবা নাকি আসছে আজ দুপুরেই। সে সিলেটে মেডিক্যালে পড়ে। পূজার ছুটিতে আসছে। আকাবা বেড়ানোর ব্যাপারে ভালো জানে। সে এলে একটা প্ল্যান করা যাবে। তাছাড়া একজন মেডিক্যাল স্টুডেন্ট সঙ্গে থাকলে ভরসা পাওয়া যায়।
– তার মানে আজকেও আমাদের কোথাও যাওয়া হচ্ছে না?
– না, তা কেন, দুলাভাইত বললেন উনার বাড়িতে নাকি যাবেন আজ –
– বুঝতে পেরেছি মামা, তোমার কাছে বেড়ানোর কোন প্রোগ্রাম নাই।
– মামা- মামা- ডাকতে ডাকতে বুলবুলিও এসে হাজির।
– মামা, চল নাশতা খাবে। আনসার চাচ্চু ডেকেছেন। নেচে নেচে চোখ মুখ নাচিয়ে বলল বুলবুলি।
সগির জিসান বুলবুলিসহ নাস্তার টেবিলে এসে দেখে এলাহি কাণ্ড। টেবিল ভরা খাবার আর খাবার। কয়েক রকম পিঠার সঙ্গে হাঁসের গোস্ত ও চোঙ্গা পিঠে দেখে সগির কুপোকাত। সগিরের প্রিয় খাবার ওই হাঁস ও চোঙ্গা পিঠে। এ জগতে আর কিছু না হলেও চলে। জিসানেরও এক কথা।
– কি সগির, চলবে তো? আমাদের ফুপুর বাড়িতে এসেছো, বদনাম টদনাম করো না ভায়া, আমরা গরিব মানুষ যা পেরেছি- রায়হান হেসে হেসে বলছিল।
– কি যে বলেন দুলাভাই, গরিবরা এতোসব খেতে পায় নাকি, আর আমার জন্য হাঁস আর চোঙ্গা পিঠাই যথেষ্ট-
– তাহলে দেরি কেন, লেগে যাও – রায়হান নড়েচড়ে বসে।
– দুলাভাই, আজ বেড়ানোর প্রোগ্রামটা জানা হলো না –
– কেন বাড়ি যাবো। আনসার ভাই একটা মাইক্রো কল দিয়েছেন- সাড়ে দশটায় আসবে ওটা- আমরা এর আগে রেডি থাকবো- মাইক্রো এলেই রওনা। বাপ-দাদাদের কবর জিয়ারত করব আরকি! আকমল ভাবীর সঙ্গেও দেখা করা হবে। আকমল ভাই মারা যাবার পর আর বাড়ি যাওয়া হয়নি।
– কিন্তু আমাদের আরো কোথায় যাওয়ার প্রোগ্রাম ছিল না-
–  আনসার ভাইয়ের ছেলে আকাবা সিলেট থেকে আসছে দুপুরে- সে এলেই প্রোগ্রামটা ঠিক করা হবে। তার জানাশোনা ভালো ।
– তাহলে আজ আমরা আপনার বাড়িতেই যাচ্ছি- সগির হাঁসের গোস্ত এক টুকরা মুখে তুলে নিতে নিতে বলল।

গাড়িতে ওঠার সময় কোত্থকে রাকিন ছেলেটা এসে হাজির। আমিও তোমরার লগে যাইতাম- শাহ্রিনের কাছে গিয়ে আবদার জানায়।
আনসার চাচ্চু বকা দেন- না না তোমার আম্মায় বকা দিবা-
– আব্বু, চাচীরে কইয়া আইতামনি? আইরিন বলল।
– যাও, তোমার চাচীরে কইয়া আও- না অইলে তাইন গোসা করবা- কইবা, আমার পোয়ারে নিলা না জানাইয়া-
আইরিন দৌড় দিলো রাকিনকে নিয়ে যাবে কিনা তার অনুমতি নিতে। যথারীতি দু’-তিন মিনিটের ভেতর ফিরে এসে জানাল চাচী অনুমতি দিয়েছেন। রাকিনের মুখ হাসিতে ভরে গেল। যে পোশাক পরা ছিল সেইভাবে রাকিন গাড়িতে গিয়ে উঠলো। ছোট মানুষ কি আর মনে করার আছে। আনসার চাচ্চুদের মামু বাড়ি। ফেঞ্চুগঞ্জ। মাত্র ত্রিশ মিনিটের পথ। যাওয়া- আসা লেগে আছেই। নেই রায়হানদের বরং। ঢাকা থেকে আসা হয় না সহসা তাদের। নানা কাজ-দায়িত্বের ঝামেলায়। তাই, রাকিনের পোশাক বদলের ব্যাপারে কেউ পীড়াপীড়ি করল না।

গাড়ি ছুটতে থাকল আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে। দুই ধারে সবুজ টিলা, চা-বাগানের ভেতর দিয়ে চলে গেছে রাস্তা। এঁকে বেঁকে গেছে পথ। আর উঁচু নিচুতো আছেই। এ রাস্তায় গাড়ি চালাতে অভ্যস্ত না হলে অ্যাক্সিডেন্ট হওয়ার ভয় থাকে। গাড়ির ড্রাইভার রানা বেশ দক্ষ মনে হল। সাঁই সাঁই গতিতে গাড়ি ড্রাইভ করে চলেছে।

রানা শুধু ড্রাইভ করছিল না পুটুর পুটুর কথাও বলছিল আনসার চাচ্চুর সঙ্গে। রায়হান ড্রাইভিং সিটে বসে কথা বলা একদম পছন্দ করে না। রেহানাও তাই। কিন্তু আনসার ভাই তাদের ‘বড়ভাইসাব’ তার সঙ্গে বেয়াদবি করবে না।
তাই, কিছু বলতে গিয়েও মুখ বন্ধ রাখে। ওদিকে পেছনের সিটে বসা জিসান বুলবুলি শাহরিন আইরিনদের মুখও চালু হয়ে গেছে। আর সগিরতো আছে।
– মামা, এবার তুমি একটা গল্প শোনাওÑ জিসান বলল।
– তোদের গল্পগুলোতো ভালোই, আমি কেন আবার-
– আচ্ছা মামা, চেঙ্গিস খান সম্পর্কে কিছু বল না! জিসান বলল।
– কি শাহরিন আইরিন শুনতে চাওনি?
– জি বলেন মামা, আমরাও শুনতে চাই। শাহরিন বলল।
– চেঙ্গিস খান সম্পর্কে সঠিক ইতিহাস কমই পাওয়া যায়। বেটা চেঙ্গিস ছিলেন মঙ্গোলীয় যাযাবর গোষ্ঠীর লোক। মধ্যযুগের প্রথম দিকে মোঙ্গলরা মধ্য এশিয়ায় বাস করত যাযাবর হিসাবে। যাযাবর বুঝতো, যারা নির্দিষ্ট স্থানে বাস করে না। এরা সুদক্ষ অশ্বারোহী ও দুর্ধর্ষ যোদ্ধা ছিল। ১১ শ’ শতাব্দীর শেষের দিকে তাদের একটি গোষ্ঠীর নেতা ছিলেন তেমুজিন। এই তেমুজিনই বেটা চেঙ্গিস নামে বিখ্যাত হন। তিনি অন্যান্য গোষ্ঠীগুলোকে একতাবদ্ধ করে উত্তর চীন, সাইবেরিয়া ও পারস্যে মোঙ্গল শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।
– আচ্ছা মামা, কুবলাই খান কি তার বংশের? শাহরিন প্রশ্ন করল।
– অবশ্যই, কুবলাই ছিলেন চেঙ্গিসের নাতি। দাদার যোগ্য উত্তরসূরি। তিনি চীন বিজয় সমাপ্ত করেন। সেখানে ইউয়ান বংশের পত্তন করেন। মোঙ্গলরা পূর্ব ইউরোপে পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করেন। এরাই ১৩ শ’ শতাব্দীর দিকে তৈমুর লং পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ায় মোঙ্গল সাম্রাজ্য বিস্তার করে। এদের বংশেরই একজন বাবর ১৫২৩ সালে ভারতে এসে মোগল রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। মোঙ্গল থেকেই মোগল শব্দটি এসেছে। ১৭০০ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল এদের শাসন ভারতে।
– আচ্ছা মামা, চেঙ্গিস খানকে একজন নিষ্ঠুর শাসক হিসাবে বলা হয় কেন?
– ইতিহাসে আমরা দেখি যারা সাম্রাজ্য বিস্তার করেছেন, তারা সবাই ছিলেন নিষ্ঠুর। চেঙ্গিস ব্যতিক্রম নয়। মোঙ্গলদের মধ্যে দু’জন শাসক চেঙ্গিস এবং তার নাতি কুবলাই মিলে ইতিহাসের সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। উত্তরে কোরিয়া থেকে পশ্চিমে রাশিয়া পর্যন্ত আর দক্ষিণে বার্মা থেকে ইরাক পর্যন্ত ছিল এই সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি। তাদের সৈন্যবাহিনী পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরি পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। আর সেটাতো এমনি এমনি হয়নি। অসংখ্য মানুষের লাশের ওপর দিয়ে এদের অভিযান চলেছে। হ্যাঁ, চেঙ্গিস খান ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম একজন শাসক ছিলেন।
– সগির, এসে গেছি আমাদের বাড়ির রাস্তায়। বড় রাস্তা থেকে মাইক্রো একটা ছোট্ট বাজার রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলল। এটাকে বিয়ালি বাজার বলে। এক সময় এটা ছিল খোলা ময়দান। টিলার ওপর বাড়ি রায়হানদের। আশপাশে ছোট বড় আরো টিলা আছে। সবুজ গাছে ছেয়ে আছে টিলাগুলো। সুপারি গাছগুলো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। রায়হানদের টিলার আগে একটা বড় টিলা। মোকামটিলা। এজমালি গোরস্থান। এখানে শুয়ে আছেন রায়হানের বাপ-দাদারা আরো আত্মীয়-স্বজন। মাইক্রোটা ওই টিলার গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। আর যাবে না। ভাঙ্গা রাস্তা। স্যার, গাড়ি আর যাইত নায়- ড্রাইভার রানার সাফ কথা। দু’জন লোক যাচ্ছিল ওই পথে। রায়হানকে গাড়িতে বসা দেখে সালাম জানায়। তারা ড্রাইভারকে উদ্দেশ করে বলে- যাইব বা কষ্ট করি আউ ও কিন্তু রানা রাজি হলো না। বলল গাড়ির চাক্কা দাবি গেলে কে উঠাইয়া দিবÑ
রায়হান বলল- ঠিক আছে আমরা নামি যাইরাম। ব্রিক সয়লিং রাস্তাÑ এখানে সেখানে ইট সরে গেছে টিলার পাশ থেকে পাহাড়ি পানি এসে নরম করে দিয়েছে রাস্তা। তাছাড়া বালু মাটি জোর কম এমনিতেই। এ এলাকার সমস্যা হলো বালু মাটি, মোটা বালু বলে রাস্তা টেকসই হয় না। তাই, এ নিয়ে ড্রাইভার রানার সঙ্গে জোরাজুরি চলে না।
তাছাড়া এখান থেকে বাড়ির পথ সামান্যই। পথটা খুব ছোট। একটা গাড়ি কোনমতে যেতে পারে। পাশাপাশি দুটো গাড়ি যেতে হলে আগপাছ করতে হয় প্রশস্ত জায়গা দেখে। রানা এ কারণেও গাড়িটা এমন জায়গায় রেখেছে যেখানে আরেকটা রাস্তার সংযোগস্থল। গাড়ির মোড় ঘোরাতে এ সংযোগস্থলে আসতে বাধ্য সে।
একে একে সবাই গাড়ি থেকে নামল। দু’ভাগে বিভক্ত হলো তারা। একভাগ রায়হানের নেতৃত্বে জিয়ারত করার জন্য মোকাম টিলার দিকে। অন্যরা বাড়ির পথে।

আনসার ভাই, রায়হান, সগির, জিসান, রাকিনরা গোরস্থানের টিলার ওপর উঠে এলো। মোকাম টিলা চৌধুরীদের। ২২ মৌজার জমিদার রায়হানের পরদাদা মদরিছ চৌধুরী এজমালি গোরস্থান হিসাবে ওয়াক্ফ করে যান। এর আগে এটা ছিল চৌধুরীদের পারিবারিক গোরস্থান। এ টিলায় শুয়ে আছেন চৌধুরী বংশের পত্তনকারী সিপাহ্সালার শাহ আলম (র)। তিনি হিন্দুরাজা গৌড় গোবিন্দের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। কিন্তু গৌড়ের সঙ্গে পরাস্ত হন। তিনি মুর্শিদাবাদ হতে এসেছিলেন। আর ফিরে যাননি।
হাঁটতে হাঁটতে সেই মাজারের কাছাকাছি রায়হানরা এসে গেল। মাজারের ওপর যথারীতি লাল রঙের সালু কাপড়ের চাঁদোয়া ঝুলছে। চাঁদোয়ার ওপর শুক্নো পাতার স্তূপ। মাজারের ওপর শুক্নো পাতার পুরো আস্তর। বিবর্ণ হয়ে গেছে বাউন্ডারি ওয়াল। বোঝা গেল অনেক দিন কারও যত্নের হাত পড়েনি।

– মাজারে খাদেম আছে নাকি রায়হান? আনসার ভাই মুখ খোলেন।
–  আছে আনসার ভাই, মাসে মাসে বেতনও দেওয়া যার ইতা দেখবার দায়
এমন সময় হাঁপাতে হাঁপাতে কোত্থকে এসে হাজির মনহর সেই মাজারের খাদেম। খালি গায়ে ধুলাবালি। মুখে কাঁচা-পাকা এলোমেলো দাড়ি। লম্বা সালাম জানায়- সেলামালিকুম হুজুর
কিতাবা মনহর, আছনি ভালা? আনসার ভাই জানতে চায়।
মামু বাড়ি হিসাবে আনসার ভাইয়ের শুধু অধিকারই নাই- মসজিদ-মক্তব-গোরস্থানের জন্য প্রতি বছর মোটা অঙ্কের সাহায্য করেন তিন ভাই। চৌধুরী বাড়ির শান-শওকত এখন পাক্কা মসজিদ, গোরস্থান আর বিশাল পুকুরই ধরে রেখেছে। মাঝে মধ্যে আনসার আনাম মামু বাড়িতে এসে খোঁজ-খবর রাখে।
মনহরের কাছে আনসার ভাই তাই অতি পরিচিত এবং আপনজন। মনহর এসেই মাজারের যত্নের নেমে পড়ে। ঝাড়ু দিয়ে পাতা সরাতে লাগে মাজারের। চাঁদোয়ার ওপর পড়া শুকনো পাতাও একটা লাঠির খোঁচায় নিচে ফেলে। এসব কাজে মনহরকে রেখে চলে আসে রায়হানরা বাপ-দাদার কবরের পাশে। জিসানকে চিনিয়ে দেয় কোনটা দাদার আর কোনটা দাদী, পরদাদার।
পাঁচ.

বাড়িতে আসার পর দেখা গেল সবাই ফিরেছে কিন্তু রাকিন আসেনি।
– কী ব্যাপার, রাকিন আসে নাই, কিতা কও
আনসার চাচ্চু সোফা থেকে লাফ দিয়ে উঠে।
– রাকিন কোথায় জিসান?
রায়হান বসেছিল খেতে। ডাইনিং টেবিলের চেয়ার ছেড়ে উঠে এগিয়ে আসে পাশের রুমে। ড্রয়িং রুমে বসা অন্যান্যদের মাঝে। জিসান বুলবুলি বিছানায় বসা। সবার জিজ্ঞাসু দৃষ্টি জিসানের দিকে এখন। কারণ রাকিন ছিল জিসানের সঙ্গে। কারও কোন কথার জবাব না দিয়ে জিসান বিছানা থেকে নেমে পায়ে জুতা গলিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে এক দৌড় দেয়। বাড়ি থেকে বের হয়।
– জিসান, জিসান কোথায় যাচ্ছিস? রায়হানের চিৎকার।
– মোকাম ঢিলায় আব্বু রাকিনকে খুঁজে আনতে
চিৎকার দিয়ে জিসান বলতে বলতে মসজিদের পাশ দিয়ে ঢালু রাস্তায় নেমে গেল। অগত্যা পেছন পেছন ছুট দিলো আনসার চাচ্চু, রায়হান, ছোট মামা। আকমল চাচ্চুর ছোট ছেলে সুমন ভাইয়া মুহূর্তের মধ্যে ছুটল জিসানের পেছন পেছন। এরা সবাই দ্রুত জিসানের পেছন পেছন হেঁটে দৌড়ায়ে মোকাম টিলায় উঠে আসে। সিঁড়ি ভেঙে জিসান আগে উঠে। জিসানের পায়ে এতো শক্তি কিভাবে এলো। পেছন নেওয়া কেউই পারল না জিসানকে ধরতে। জিসান সবার আগেই থাকল। জিসান হাঁটছে না দৌড়াচ্ছে যেন। চিৎকার করে ডাকছে রাকিন- রাকিন – রাকিন – রাকিন – রাকিন – রাকিন – জিসানের চিৎকারে গাছ-গাছালি ভরা টিলার প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।
রাকিন রাকিন ও বাবা রাকিন
আনসার চাচ্চুর গলায় যতো শক্তি ছিল তা দিয়ে ডাকতে থাকেন তিনি। বয়স তার ষাট পেরিয়ে গেছে। অসুস্থও। জিসান দৌড়ায় আর ডাকে রাকিন রাকিন রাকিন

আনসার চাচ্চু এক সময় দাঁড়িয়ে পড়েন। তার হার্ট অপারেশন করা হয়েছিল গেল বছর। তাই বুকটা ভীষণ ধড়ফড়, ধড়্ফড় করে ওঠে। আর হাঁটতে পারছেন না তিনি। মুখ হাঁ করে শ্বাস নিচ্ছেন।
-আনসার ভাই। আপনার শরীর খারাপ করছেনি? রায়হান খানিকটা এগিয়ে গিয়েছিল, পেছনে ফিরে দেখে আনসার ভাই দাঁড়িয়ে গেছেন। বুকে তার ডান হাত চেপে রাখা। কাছে এসে জিজ্ঞেস করেন।
রায়হান পেছন ফিরে আসায় অন্যান্যরাও আর না এগিয়ে ফিরে এলো আনসার ভাইর কাছে।
তোমারা আউ, আমি একটু জিরাই জিসানের লগ ছাড়িও না। হারি যাইব শেষে পাইতায় না বাবারে।

রায়হান সগির সুমনরা তাই-ই করলো। জিসান এখনো ধরাছোঁয়ার মধ্যেই আছে। এখানে দাঁড়ালে জিসান এই বনে কোথায় হারিয়ে যাবে, পরে দু’জনকেই হারিয়ে ফেলবে তারা।

জিসান এখন ধীরে ধীরেই এগোচ্ছে। বনের ভেতর হাঁটা কঠিন। জিসানের চেয়ে রায়হানরা একটু জোরে হাঁটতে পারছে।
-রাকিন – রাকিন – রাকিন ভাইয়া জিসান চিৎকার করে অনবরত ডাকতেই থাকে।

রায়হানরা অবশেষে জিসানের কাছাকাছি এসে যায়। জিসান থেমে পেছন ফিরে তাকায়। চোখ তার ছলছল। মুখে ক্লান্তি।
– জিসান, রাকিন কোথায় তুমি জান এভাবে ছুটে এলে?
-আব্বু, রাকিন বলছিল ওর খুব খারাপ লাগছিল- বার বার চোখে তারাবাতি দেখছিল। আমরা ফেরার সময় রাকিন বারবার পেছনে পড়ে যাচ্ছিল – তারপর আর বলতে পারি না –
– তাহলে তুমি এখানে ছুটে এলে কেন? সগির জিজ্ঞেস করল।
– মামা, রাকিন এ বনেই আছেÑ এসো, আমরা খুঁজে বের করি। রাকিন ছাড়া আমরা ফিরব কিভাবে মৌলভীবাজার?

জিসান আবার চলতে শুরু করে। সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে গাছের পাতা- ডালের ফাঁক দিয়ে তার আলো এসে বনের ঘন অন্ধকার দূর করছে এখনো। সেইসঙ্গে পাখির ডাকাডাকি ও তক্ষকের থেকে থেকে গাছের এ ডাল থেকে ওডালে লাফিয়ে পড়ার দৃশ্য জিসানকে ভীত করে তুলছিল। ভয় পেলে তার চলবে না। রাকিনকে খুঁজে বের করতেই হবে। কী জবাব দেবে রাকিনের মা ডেইজী চাচীকে। সবাই ফিরবে, রাকিন ছাড়া? না না এ হতে পারে না।
– জিসান, একটু দাঁড়াও বাবা, একটু দাঁড়াও – রায়হান ডাকে।
– জিসান, মামা একটু দাঁড়াও সগির ডাকে এবার।
জিসান দাঁড়িয়ে যায়। একটু সামনে এগোলে সিপাহসালার শাহ আলমের মাজার। দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট।
– চল, আমরা মাজারের পাশে গিয়ে দাঁড়াইÑ একটু শলাপরামর্শ করি। রায়হান সগির ও সুমনকে বলল। একে একে সবাই মাজারের কাছাকাছি এসে ত্রিকোণ আকারে দাঁড়ায়। এলোমেলো বাতাস বইছিল। পাতা ঝরার শব্দ। আকাশে চিল ওড়াউড়িও টের পাওয়া গেল। একটা উদ্বেগ উৎকণ্ঠা সবার চোখে মুখে।
– সবাই রাকিনরে খোঁজায় না থাকিয়া সুমন যাউক আনসার ভাইর কাছে।
– জি, দুলাভাই, অসুস্থ মানুষ কি ঘটনা ঘটল তা জানা দরকার- সুমন মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানাল। দেরি না করে যেদিক দিয়ে এসেছিল এই দলটি সেদিক দিয়ে দ্রুত হাঁটতে শুরু করে সুমন।

সুমনের মোকামের সবটাই নখদর্পণে। তাই সে জোর কদম হাঁটতে থাকে। তবে মনে মনে একটা ভয় এসে হানা দেয়- রাকিনকে তাহলে ভূত-প্রেতে নিয়া গেল! জিনের কাজও হতে পারে। বড় আব্বা মওলানা মদরিছ চৌধুরী নাকি বড় কামেল ছিলেন। এলাকায় বড় ‘মওলবিসাব’ হিসাবে ছিলেন মশহুর। তিনি দু’জন জিন নাকি অধীন করে রাখতেন। ওই জিনের উৎপাত তাদের বাড়িতে এখনো বিদ্যমান। রাকিনকে জিনরাও নিতে পারে। এসব ভাবতে থাকে আর জোর কদম হাঁটতে থাকে সুমন।

সূর্য পশ্চিমে আরো হেলে পড়ে। বোঝা যায় আসর ওয়াক্ত হয়ে গেছে। এখন কী করবে দলটি। এমন এক ভাব সবার চোখে মুখে ফুটে উঠেছে। এরওর মুখের দিকে তাকায়।
– চল, আমরা আরো সামনে এগোই- দাদাদের কবর পর্যন্ত- রাকিনকে খুঁজে বের করতেই হবে। জিসান বলল।
– চলুন দুলাভাই, আমরা আরো সামনে যাই। শুনুন দুলাভাই, আমার গার্ডেনে একটা ঘটনা ঘটেছিল।
– সংক্ষেপে বল। বেশি বড় কেচ্ছা শোনার মত মনের অবস্থা নেই- রায়হান বলল হাঁটতে হাঁটতে।
– হ্যাঁ, খুব সংক্ষেপে- আমার বাগানে এক নারীশ্রমিক লক্ষী তার নাম, হঠাৎ একদিন রাতে সে হাওয়া বাড়ির লোকজন এঘর ওঘর আশপাশের চা-বাগান খোঁজাখুঁজি করে হয়রান। রাত গেলো খোঁজাখুঁজি করে। পরের দিন সকাল থেকে আবার খোঁজ। খবর নেওয়া হলো ল²ীর বাপের বাড়ি- না সেখানে যায়নি। বিকালবেলা খবর এলো ল²ীকে বেশ দূরের একটা টিলার উঁচু কড়ই গাছে বসে থাকতে দেখা গেছে। তারপর তাকে নামিয়ে আনা হলো। একজন মাওলানা সাহেবকে ডাকা হলো। ল²ীকে নাকি ভূত-প্রেত নিয়ে গিয়েছিল।
– হয়েছে সগির, বাদ বাকিটা বুঝতে পারছি, রাকিনের ঘটনা সে রকম কি না – তাই ভাবছি। রায়হান বলল।
আরেকটু পর দিনের আলো নিভে আসবে। সঙ্গে কোন চার্জার-টর্চ নেই। মোবাইলের আলো দিয়ে পথ চলা কঠিন।
– আমরা জোর কদম হাঁটি- দিনের আলো কমে আসছে- সগির বলল। বলার ভঙ্গিতে কমান্ডিং ভয়েস ছিল। সগির এক সময় রোভার-স্কাউট ছিল আর গার্ডেনে তাকে গার্ডদের মাঝে মধ্যে লেফ্ট রাইট করাতে হয়।
– হ্যাঁ, আমরা জোরে জোরে হাঁটব- জিসান বলল। কিন্তু বনের ভেতর ছোট ছোট গাছ, লজ্জাবতী লতা, কাঁটাযুক্ত পিয়াল পাতা, কড়ই গাছের ডাল হাঁটার পথ আগলে ধরছিল। তবু দলটি দেখেশুনে হেঁটে যাচ্ছিল। শুধু সামনে হাঁটার পথে দলটির নজর নেই, গাছের ওপরেও রেখেছে নজর। বলাতো যায় না, রাকিনকে কোন ভূত প্রেত জিন উঠিয়ে গাছে রেখে দিলো!
রায়হানের মনে এমনটাও উঁকি দিচ্ছে বারবার। আর মামার মুখে গল্প শুনে জিসানের মনেও একই ভয় জেগে উঠছে। কিন্তু মুখে বলছে না। হাঁটতে হাঁটতে তারা রায়হানের বাবা-চাচার কবরের কাছে এসে গেল। এসেই যখন পড়েছি আরেকবার দোয়া করি। যে কারণে হোক, বাবা- চাচার কবরের পাশে এসে দোয়া না করে চলে যাবো!
– এসো, আমরা সংক্ষেপে দোয়া করি- রাকিনের জন্যও- রায়হান বলল। সেভাবে কবরের দিকে মুখ রেখে পশ্চিমমুখো হলো সবাই। ‘আল্লাহুম্মা আমিন’ বলে হাত-তুলল সবাই।
দোয়া শেষ করে দু’হাত দিয়ে মুখ মুছে জিসান মাথা উঁচু করতেই ভূত দেখার মত চমকে উঠে-ওইতো- ওইতো রাকিন- রাকিনের চিৎকারে দৃষ্টি ঘুরে গেল। কবরের ওপর হতে দৃষ্টি সরে গিয়ে রাকিনের অঙ্গুলি নির্দেশের দিকে গেল। একটা কড়ই গাছের মগডালে রাকিন শুয়ে আছে। সাধারণভাবে এমন চিকন ডালে একটা মানুষ শুয়ে থাকতে পারবে না। গাছটা মাত্র দশ-বারো হাত দূরে।
জিসান এগিয়ে যায়। তার সঙ্গে অন্যান্যরাও।
– রাকিন – রাকিন – রাকিন – আই রাকিন – রাকিন – জিসান প্রাণপণ ডাকে।
– রাকিন – বাবা রাকিন – রাকিন বাবা – রাকিন – রায়হানও জোরে ডাকে ।
– রাকিন – রাকিন – রাকিন – রাকিন – রাকিন – সগিরও সমস্ত শক্তি দিয়ে।
রাকিনের কোন সাড়া নেই। মনে হচ্ছে সে সংজ্ঞা হারিয়েছে।
– এখন কী করা যায় বলতো সগির? রায়হান হতাশভাবে বলল।
– গাছ থেকে নামিয়ে আনতে হবে। সেটা শক্তিশালী মানুষ ছাড়া সম্ভব নয়। যারা তাকে নিয়ে গেছে তারা কম শক্তিশালী নয়। লড়াইটা হবে মানুষ ও প্রেতের সঙ্গে। জিন হলে নামানো কঠিন হবে হুজুর লাগবে। গাছে থাকা অবস্থায় জিনকে তার ওপর থেকে সরাতে হবে।
– আমরা কিভাবে বুঝব জিন না ভূত-প্রেত?
এমন সময় আনসার চাচ্চু সুমনসহ হাঁপাতে হাঁপাতে হাজির।
– আনসার ভাই, ওই দেখেন রাকিন – গাছের মগডালে শুইয়া-
– সর্বনাশ! কে তুলল তারে জিন না প্রেতে?
আনসার চাচ্চু মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েন।
সুমন, বাবা সুমন এখন কিতা করতাম? রায়হান বলল।
– গিলাছড়া থাকি বড় হুজুর আনতে অইব চাচা। ছোটখাটো মাওলানা পারতো নায়। সুমন বলল।
– তুমি আগে বাড়িত খবর দাও। আমরার মসজিদের ইমামসাবরে ডাকো। আর শক্তিশালী দুই চারজন জোয়ান পুরুষ মানুষ জোগাড় করো। দুইটা হ্যারিকেন দুইটা টর্চও আনিয়ো। একটু পর আন্ধার নামবা কালা মিশমিশা- কিচ্ছু দেখা যাইত না। আনসার চাচ্চু বললেন।
সুমন কথামত ছুট দিলো। যতো তাড়াতাড়ি সে এসব জোগাড় করতে পারে ততই মঙ্গল। দিনের আলো নিভে যাবার সময় আর বাকি নেই। সুমন জোর পায়ে হাঁটে। জোরে জোরে মুখে পড়তে থাকে কালেমা শরীফ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।

ছয়.

রসকষ শিঙ্গাড়া বুলবুলি মস্তক…..
রসকষ শিঙ্গাড়া বুলবুলি মস্তক…..
রসকষ শিঙ্গাড়া বুলবুলি মস্তক…..
রসকষ শিঙ্গাড়া বুলবুলি মস্তক…..

জানালার পাশে বিছানায় বসে খেলছিল শাহরিন আইরিন বুলবুলি ও পুতলি। পুতলি চৌধুরীদের এককালের মৌড়সি রায়ত আমিরের মেয়ে। এ বাড়ির দু’পাশে দুটো পরিবার বাস করে যারা চৌধুরীদের পূর্বপুরুষের আদি মৌড়সি রায়ত। তাদের অবস্থা এখন বেশ ভালো। ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া শিখেছে। বিদেশে থাকে কেউ কেউ। তাই তাদের বাড়িও আগের মতো মাটির নেই। ভিটে পাকা হাফ বিল্ডিং এবং টিনের চাল। পুতলি কনরের নাতনি। কনর বেঁচে নেই। একসময় রায়তদের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে চৌধুরী বাড়ির ছেলে মেয়েরা খেলাধুলা করত না। সে অনেক আগের নিয়ম। এখন এসব নেই।
পুতুল থেকে পুতলি নামটি এসছে তা আন্দাজ করা যায়। হ্যাঁ, পুতলি পুতুলের মতই সুন্দরী। বয়স দশ কি বারো হবে। স্কুলে পড়ে। ফোরে। গ্রামের পরিবেশে বয়স অনুপাতে একটু পিছিয়ে।

শাহরিন সবার আঙুল গুনে যাচ্ছিল-বারবার-
রসকষ শিঙ্গাড়া বুলবুলি মস্তক….
রসকষ শিঙ্গাড়া বুলবুলি মস্তক…..
এমন সময় সুমন ভাই ধারিত (উঠান) এসে চিৎকার শুরু করে
– মাই, ও মাই-মাইগো…কিয়ান গেলা –
– কিতা অইছে বা কিতা অইছেবা –
আকমল চাচী রান্নাঘর থেকে বের হয়ে এলেন হাত মুছতে মুছতে। বিকালের নাস্তা তৈরি করছিলেন তিনি। তার সঙ্গে সুমন আর আমিরের বউ সহযোগিতা করছিল।
– মাই, সর্বনাশ অইগেছে মাই, রাকিনরে পেরতে কি জিনে মোকাম টিলার এক বড় কড়ইগাছের মগডালে তুলিয়া রাখছুইন। রাকিনের জ্ঞান নাই।
– কিতা কইরি সুমন-ইয়াল্লা-এহন কিতা করতি-আই পুতলি যা জলদি যা তোর বাপেরে খবর দে-জলদি পুতলি-পুতলি-
– কিতাগো মাইঝি-যাই মাইঝি-
পুতলি খেলায় মাশগুল ছিল। কিন্তু মাইঝির ডাক উপেক্ষা করা যায় না। তাই খেলার সাথীদের বলল-আমি মাইঝির ডাক শুনিয়া আই- তোমরা খেলা চালাইয়া যাও।
হাত দুটো উঠিয়ে এক দৌড়ে হাজির হলো ধারিত পুতলি।
– পুতলি-যা জলদি যা যা আমিররে খবর দে, কইস মাইঝি ডাকছুইন- পুতলি কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই ভোঁ দৌড় দেয় বাপ আমিরকে ডেকে আনতে। নিশ্চয়ই কোন গুরুতর বিষয় আছে আন্দাজ করে সে।
– মাই, আমরার চার্জার লাইট দুইটা কিয়ান আর টর্চ দুইটা?
– দেখোগি আমার ঘরো, ওয়াড্রবের ওপর মনে কয়। আকমল চাচী উঠান থেকে আসেন বৈঠক খানায়। এখানে শাহরিন আইরিন বুলবুলিরা খেলছিল। কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে ভাবেন-খবরটা এদের কানে দেবে কি না।

খবর দিলে খেলা বন্ধ হইবে। থাকুক। কিছু না বলে পাশের রুমে যায়। এখানে শুয়ে আছে রায়হানের বউ রেহানা। তাকে বিষয়টা জানান দরকার। কারণ অনেক বড় একটি দুর্ঘটনা। রাকিনকে উদ্ধার না করতে পারলে এদের ফিরে যাওয়া হবে না। অবশ্য রাকিনকে উদ্ধার করা যাবে। এমন ঘটনা গ্রামে প্রায়ই ঘটে। একবার আমিরের বউকে বেলগাছে নিয়ে রেখে দিয়েছিল। ম্যাসাব (হুজুর) এসে নামায়। ঝাড়ফুঁক দিয়ে জিন ছাড়ায়। গ্রামে এটাকে ‘উপরি’ বলে।
– রেহানা- রেহানা-ঘুমোনি?
– জি ভাবী-
– রেহানা দুই ডাকেই জবাব দেয়। মানে গভীর ঘুমে ছিল না।
– জি ভাবী কিছু বলবেন? শোয়া থেকে উঠে বসে বিছানায় রেহানা।
– বলব- রাকিনরে মোকাম টিলার এক বড় কড়ই গাছে মগডালে জিন কি প্রেতে উঠাইয়া রাখছে, সুমন আইয়া খবর দিলা।
– কী বলছেন ভাবী! রেহানা চিৎকার দেয়।
– এখন কী হবে রাকিনের? রেহানা বিচলিত হয়ে পড়ে।
– তুমি চিন্তা করিও না। রাকিনরে গাছ থাকি নামাইয়া আনার ব্যবস্থা করা যাইব।
– সেই ব্যবস্থাটা কী রকম ভাবী? রেহানা জানতে চায়।
– ব্যবস্থাটা হইল একজন ম্যাসাব লাগবে আর শক্তিশালী দুইজন পুরুষ লোক। যদি প্রেতের কাম হয়। তাহলে আমাদের মসজিদের ম্যাসাব মোহররম গেলেই অইব। যদি জিনের কাম হয় তাহলে গিলাছড়া থাকি বড় ম্যাসাব আনতে অইব।
– মাই, আনসার চাচা কইছুইন মোহররম ম্যাসাব লগে নিতাম।
– তুই যাওয়ার সময় ম্যাসাবরে লগে লইয়া যাইস।
– চাচী, ডাকছুইন-
আমির এসে হাজির। পুতলি বাপকে ডেকে দিয়ে খালাস। এক দৌড়ে ছুটে যায় খেলার মজলিসে।
– ও বা আমির, সুমনোর লগে যাওবা মোকাম টিলায় আনসার ভাইর ভাইঝি রাকিনরে গাছে তুলিয়া রাখছে কিতায়- জিরন না পেরতে- ইতায় জিয়ারতে গেছিল-
– হাছানি চাচী- ইয়াল্লা! বড় ভাইসাবরে লগে নিতামনি?
– জামির আছেনি ঘরত-অয় তারেও লগে লও-
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো প্রায়। সূর্য ডোবার আর বেশি বাকি নেই। আমির জামির ম্যাসাব মোহররম সুমনসহ ফিরে এসেছে ঘটনাস্থলে। এসেই দেখতে পেলো রাকিনের জ্ঞান ফিরেছে। চিৎকার করে বলছে-
রসকষ শিঙ্গাড়া বুলবুলি মস্তক…..
রসকষ শিঙ্গাড়া বুলবুলি মস্তক…..
রসকষ শিঙ্গাড়া বুলবুলি মস্তক…..
রসকষ শিঙ্গাড়া বুলবুলি মস্তক…..
রাকিনের উচ্চারণে ছিল কিছুটা অস্পষ্টতা। তার মানে রাকিনের মুখ দিয়ে অন্য কোন সত্তা কথা বলাচ্ছিল।
ম্যাসাব মোহররম গাছের নিচে গিয়ে ভালো করে পরখ করল। ম্যাসাবকে রাকিন ভেংচি কাটে এবং একটা গাছের ছোট্ট ডাল ভেঙে ফিকে মারে গায়ে।
– কে কে গাছে উঠতা? ম্যাসাব মোহররম জানতে চায়।
– ম্যাসাব কয়জন? আনসার চাচা প্রশ্ন করে।
– দুইজন। জিন নিছে না। ইতা খারাপ আত্মায় নিছে। আমারে দেখিয়া ডরাইছে। যে বলা দোয়া-দরুদ পড়া দিমু। ভাগব। ওই সময় ছেলেটা গাছ থাকি পড়ি যাইব। এর আগেই তারে গিয়া ধরতে অইব। জোরাজুরি করা লাগত নায়।
হুজুরের কথামত আমির জামির উঠে যায় গাছে। রাকিন যে ডালে আড়শোয়া সেই ডালের নিচে মোটা বড় একটা ডাল-ওই ডালে গিয়ে পজিশন নেয় তারা।
আমির জামিরকে দেখে রাকিন আবার বলতে শুরু করে – রস কষ শিঙ্গাড়া বুলবুলি মস্তক….

ম্যাসাব জোরে জোরে দোয়া কালাম পড়তে থাকেন এবং হাওয়ায় রাকিনের উদ্দেশে ফুঁ দিতে থাকেন। এভাবে পনের-বিশ মিনিট ম্যাসাবের দোয়া ও ফুঁ দানের পর রাকিন চুপ হয়ে যায়।
এক সময় রাকিন জ্ঞান হারায় এবং ডাল থেকে গড়িয়ে পড়ে যেতে লাগে, আমির জামির খপ করে কোলে তুলে নেয়।
এরপর দু’ভাই ধরাধরি করে নিচে নামিয়ে আনে রাকিনকে। ম্যাসাব একটি গ্লাসে পানি পড়ে রেখেছিলেন তা সারা গায়ে ছিটিয়ে দিতেই রাকিন চোখ খুলে তাকায়। কিন্তু রাকিন কোন কথা বলে না।
– ওর বুকোত চাপি আছিলা এত্ত বড় পাথর-পরতটা-এহন রাকিন মাততো পারত নায়-বাড়িত নিয়া বেদনার ঔষধ খাওয়াইত অইব-গরম পানি খাওয়াইবা-ব্যথা কমলে কথা বাড়াইব মুখ থাকি। ম্যাসাব বললেন।
– হুজুর, কখন কথা বলতে পারবে? জিসান বলল।
– আইজ রাইত নয়টা-দশটা লাগাদ–
মোকাম টিলা থেকে রাকিনকে নিয়ে সবাই ফিরতে ফিরতে মাগরিবের ওয়াক্ত পার হয়ে যাওয়ার জোগাড়।
ম্যাসা মোহরম আনসার চাচা, রায়হান, সুমন, আমির, জামির মসজিদের দিকে ছুটে।

ইতোমধ্যে রাকিনের খবর পেয়ে গ্রামের আশপাশ থেকে ছেলে-মেয়ে-জোয়ান-বৃদ্ধ-বৃদ্ধা উৎসাহী মানুষ এসে উঠোন ভরে যায়। বারান্দার জানালা দিয়ে উঁকি দেয় রাকিনকে দেখার জন্য। রাকিন যেনো চিড়িয়াখানার আজব প্রাণী- দেখার জন্য তাই এতো ভিড়।
রাকিনের মাথায় ওপর ফুল স্পিডে ফ্যান ঘুরছে। শুধু জিসান মাথার পাশে বসে। বেশ কিছু সময় পর রাকিনের মুখ নড়ে উঠে- রস-কষ-শিঙ্গাড়া-বুলবুলি-মস্তক।
জিসান চিৎকার করে- কথা বলেছে রাকিন কথা বলেছে।

SHARE

Leave a Reply