Home গল্প সেকালের কিছু কথা- দেলোয়ার হোসেন

সেকালের কিছু কথা- দেলোয়ার হোসেন

একদিন এই বাংলার মানুষের গলায় ছিল গান, গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ। কোনো কিছুর অভাব ছিল না তাদের। খেয়ে-পরে শান্তিতে বাস করতো।
যে কারণে কবি বলেছিলেন-
ধন্য-ধানে পুষ্পে ভরা,
আমাদের এই বসুন্ধরা।
বাংলার ধন-সম্পদের লোভে বাণিজ্যের নামে এ দেশে আসে পর্তুগিজ দস্যু আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্বৃত্তরা। তারা এলো সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দিয়ে। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের মধ্যে কোনো সুনীতি বা সততা ছিল না।
থাকবে কী করে? ওরা তো ছিল আদতেই এক-একটা জলদস্যু এবং দুর্বৃত্ত। চোর-ডাকাত হার্মাদ যারা, তাদের ভিতর কি আর সততা থাকতে পারে?

বিদেশী বেনিয়া এবং পর্তুগিজ দস্যুরা এদেশে এসে প্রথম প্রথম ঘাঁটি গাড়তো সমুদ্র ও বিভিন্ন নদী উপক‚লে। যেসব এলাকায় নিরীহ মানুষজন ওদের সাদা চামড়া এবং পাদ্রির পোশাক দেখে মনে করতো ওরা যেনো এদেশের একেকজন ত্রাণকর্তা। এখনও এদেশের বুকে বিভিন্ন এনজিওর যে কর্মতৎপরতা দেখা যায়, তাÑ শুরু করেছিলো প্রথমে ওরাই। এক দিকে ব্যবসার নামে করতো ওরা চুরি, ডাকাতি, লুটপাট অপর দিকে এদেশের নিরীহ্ নারী-পুরুষদের ধরে নিয়ে বিভিন্ন দেশের বন্দরে-বন্দরে বিক্রি করে দিতো ক্রীতদাস বা দাসী হিসেবে। যারা বাকি থাকতো তাদের ধর্মান্তরিত করতো ওদের তথাকথিত খ্রিষ্টান ধর্মে। ওদের গলায় ঝুলিয়ে দিতো ক্রুশ। বাইবেল থেকে নাম দিলো জর্জ মার্টিন, টমাস, জেরম, জোয়াকিম, বার্নাড, ডগলাস, উইলিয়াম ইত্যাদি। আর নামের সাথে জুড়ে দেয়া হতো পর্তুগিজ পদবি- গোমেজ, রোজারিও, কস্তা, ডি-কস্তা ইত্যাদি।

ওদের খল চরিত্র ধরা পড়লো অনেকের কাছেই। সে সময়ের শাসকসমাজ ওদের দমন করতে গেলেই সাদা পতাকা উড়িয়ে সন্ধি স্থাপন করতো। এটা ছিলো ওদের একটা কৌশল। ভেতরে ভেতরে শক্তি সঞ্চয় করে দল গঠন করে, সৈন্য-সামন্ত, গোলা-বারুদ জোগাড় করে বড় ধরনের আঘাত হানার জন্য। যে আঘাতে উলট-পালট হয়ে যেতে পারে অনেক কিছু।
অবশেষে সেই সুযোগটা এসে যায় ওদের হাতে। লর্ড ক্লাইভ ছিলো তখন ওদের ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রধান। এ দিকে মীর জাফর ছিলো নবাব সিরাজউদ্দৌলার ফুফা এবং প্রধান সেনাপতি। ঘসেটি বেগম ছিলো নবাব সিরাজউদ্দৌলার আপন খালা। এ ছাড়াও সিরাজের সভাসদ ছিলো জগৎশেঠ, রাজা-রাজবল্লভ, উমিচাঁদ, ইয়ার লতিফসহ বেশ কয়েকজন শয়তানের প্রতিনিধি, বেঈমান, বিশ্বাসঘাতকের কারসাজিতে পড়ে পলাশীর যুদ্ধটা হয়ে গেলো একটা প্রহসন।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পরাজিত হলেন বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার নবাব সিরাজউদ্দৌলা। মুর্শিদাবাদ থেকে পালাতে গিয়েও পালাতে পারলেন না নবাব। ভগবান গোলায় ধরা পড়ে নির্মমভাবে নিহত হলেন ৩ জুলাই মোহাম্মাদী বেগের হাতে। বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ডুবে গেলো।
এ কাহিনী অনেকেরই জানা। মাত্র বছর কয়েকের মধ্যেই সোনার বাংলার ধন-সম্পদ লুট করে নিয়ে ওরা ওদের দেশে প্রথম ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেÑ ব্যাংক অব ইংল্যান্ড নামে। তখন সারা বাংলায় নেমে এলো দুর্ভিক্ষ। লাখো লাখো মানুষ মারা যায় এই দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে।
ইংরেজদের আসল চরিত্র তখনও বুঝতে পারেনি এদেশের মানুষ। ফলে, নিরুপায় হয়ে শুধুমাত্র খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার জন্য অনেকেই খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করতে থাকে। সে সময় যারা রাজনৈতিক সচেতন ছিলেন তারা বুঝতে পেরেছিলেন, মীর জাফর ইংরেজদের হাতের পুতুল।
পলাশীর পরাজয়ের পর শাহ্্-আলম নামক এক দেশপ্রেমিক বীর সেনানী বাধ্য হন বিহার আক্রমণ করতে। ১৭৬০ সালে পুর্নিয়ায় বিদ্রোহ ঘোষণা করেন সাদেক হোসেন। ১৭৬১ সালে মীর জাফরের জামাতা মীর কাশিমের নেতৃত্বে পরিচালিত হয় উদয়নালার যুদ্ধ। ১৭৬৪ সালে সংঘটিত হয় বক্সারের যুদ্ধ। ১৭৩৮-৮৯ সালে ঘটে বীর হায়দার আলীর অভ্যুদয়। ১৭৭২ সালে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন টিপু সুলতান। তাতে ইংরেজ বাহিনী ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে পড়লেও ১৭৯৫ সালে জামান শাহ্্ আসাদউল্লাকে সংগঠিত করে শুরু হয়ে যায় টিপু সুলতানের সর্বাত্মক যুদ্ধ প্রস্তুতি। কিন্তু এখানে মীর জাফরের অপর এক বংশধর মীর সাদেক আলী বিশ্বাসঘাতকতা করলে যুদ্ধে শাহাদত বরণ করলেন বীর টিপু সুলতান।
১৮০৪ সালে হাজী শরীয়ত উল্লাহর নেতৃত্বে ইংরেজদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান এদেশের একদল দেশপ্রেমিক নওজোয়ান। মুফতি আয়াত উল্লাহর নেতৃত্বে সংঘটিত হয় আর একটি বিপ্লব। ১৮২০-৩১ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ ১১টি বছর ধরে সৈয়দ আহ্মেদ বেরলভির নেতৃত্বে ঘটতে থাকে একটানা ইংরেজ বিরোধী বিপ্লব।
এভাবেই সারা ভারতবর্ষ জুড়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ হয়। শেষ পর্যন্ত ১৮৫৭ সালে এই যুদ্ধ রূপ নেয় সিপাহি বিপ্লবের। বাংলাদেশের হাবিলদার রজব আলীর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠিত হয়, দুই শত দুইজন কয়েদিকে কারামুক্ত করেন হাবিলদার রজব আলী।
‘লাতু’ নামক স্থানে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে শাহাদৎ বরণ করেন হাবিলদার রজব আলী। আন্দামান জেল পরিদর্শনের সময় তৎকালীন ইংরেজ বড় লর্ড মেয়োকে হঠাৎ আক্রমণ করে হত্যা করেছিলেন বন্দী সিপাহি শের আলী খান।
সিপাহি বিদ্রোহের কারণে রাজধানী দিল্লি থেকে শুরু করে দিল্লির শহরতলি পর্যন্ত এদেশের হাজার-হাজার আলেম-উলামাকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে হত্যা করেছিল ইংরেজরা। একই ঘটনা ঘটানো হয়েছিল ঢাকায়ও। জগন্নাথ কলেজ থেকে বেরিয়ে আসার পর সামনে যে বাহাদুর শাহ পার্কটি, এখানেও শত-শত সিপাহিকে ফাঁসি দিয়ে গাছে-গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।
চেতনার চেরাগ জ্বলে-জ্বলে নিভে যাওয়ার মাত্র চার বছর পর ১৮৬১ সালে যশোর ঘোপ নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মুনশী মোহাম্মদ মেহের উল্লাহ। তিনি বড় হয়ে হাতে তুলে নিয়েছিলেন কলম। তিনি যেমন ছিলেন বাগ্মী তেমনি একজন লেখকও। কলমের লেখা যে অস্ত্রের চেয়েও বেশি শানিত- এটা ইংরেজ জাতিও স্বীকার করে বলে- Pen is mightier than the sword সেই মসি হাতে মুন্শী মেহের উল্লাহ্ ভ‚মিকা পালন করেন এক সিপাহসালার বা মর্দে মুজাহিদের মতো।
অথচ তাঁর জীবনে না ছিলো উচ্চ শিক্ষা, না ছিল অর্থনৈতিক দৃঢ় বুনিয়াদ। এদেশের হাটে-বাজারে, গ্রাম-গঞ্জে কর্মরত লাখো-লাখো দর্জি বা খলিফার মতো তিনিও ছিলেন একজন অতি সাধারণ দর্জি। সেই সামান্য একজন দর্জি একদিন লেখনীর মধ্য দিয়ে খলিফাতুল্লাহ বা আল্লাহর প্রতিনিধি হয়ে উঠেছিলেন। তিনি খ্রিষ্টানদের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করেন। ধর্ম প্রচার করেন নানান রকম গল্পের মধ্য দিয়ে।

SHARE

Leave a Reply