Home উপন্যাস ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাস জীবনযুদ্ধের গল্প -দেলোয়ার হোসেন

জীবনযুদ্ধের গল্প -দেলোয়ার হোসেন

[গত সংখ্যার পর]

রাতে খাওয়া দাওয়ার পর বকুলতলা থেকে স্যার আমাকে ডাকলেন। চাঁদের আলোয় মিষ্টি ছায়া পড়েছে বকুলতলায়। আমি একটি চেয়ার টেনে বসলাম। স্যার অপ্রয়োজনে একটু হেসে বললেন, সালু ভাই কেমন আছেন? আমি বললাম, ভালো।
স্যারের যে মতলব আছে তা আমি বুঝেছি, তবে মতলবটা কী সেটাই জানার বিষয়। স্যার বললেন, সালু ভাই আপনি তো গাজী-কালু চম্পাবতীর দেশের মানুষ।
জি।
আচ্ছা ওখানে কি এখনো ফকির-দরবেশ আছে? যারা জাদুটোনা তাবিজ-কবজ করে। মানুষের মন বশীকরণ করে ইচ্ছার অধীন রাখে।
আমার জানামতে সে সব আর নেই।
একেবারেই যে নেই- তা আমার বিশ্বাস হয় না। আমি বলতে চাচ্ছি -এমন তাবিজ কবজ কি নেই, যা ব্যবহার করলে কোনো মানুষ আমার সামনে এসে দাঁড়াতে সাহস করবে না। অথবা আমার বাড়ির সীমানার মধ্যে প্রবেশ করতে পারবে না। আর কোনো ক্ষতিও করতে পারবে না আমার।
এমন লোকের কথা আমি জানি না। তবে, একবার একটা ঘটনা ঘটেছিল আমাদের ওখানে। আমাদের এলাকায় তোখুব হা-ডু-ডু খেলা হয়। তো সেদিন ছিলো ফাইনাল খেলা। দু’পক্ষই বিভিন্ন এলাকা থেকে হায়ার করে এনেছে ভালো ভালো প্লেয়ার। খেলা শুরু হলো। দু’পক্ষই বিজয়ের জন্য জীবন পণ করে খেলে যাচ্ছে। তবে এক পক্ষের একজন প্লেয়ারের কারণে অন্য পক্ষ হেরে যাচ্ছে। বিরতির পর আবার শুরু হলো খেলা। কিন্তু হঠাৎ সেই ভালো প্লেয়ারটা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। সাথে সাথে হুজুরের কাছে নেয়া হলো তাকে। হুজুর তদবির দিলেন আর বললেন, একে বান (জাদু) মেরেছে। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে সে মারা যেতো। পরে সে ভালো হয়ে যায়।
তাহলে সেই হুজুরকে নিয়ে আসা যায় না?
তিনি মারা গেছেন।
স্যার তখন নিরাশ মনে ‘ও’ বলে, উঠে চলে গেলেন ভিতরে। আমার খারাপ লাগতে লাগলো এই ভেবে যে, আমি স্যারের কোনো উপকারই করতে পারলাম না।
এ বিষয়টা নিয়ে স্যার কিন্তু মোটেই বসে নেই। একদিন দুপুরে এক ফকিরকে নিয়ে বাসায় এলেন। ফকিরকে দেখেই আমার পছন্দ হলো। এই ফকিরের দ্বারাই এমন কাজ সম্ভব হতে পারে। মনে মনে অবাক হলাম। এই বেটাকে স্যার জোগাড় করলেন কিভাবে।
ফকির সাহেব লম্বায় ছ’ফিট তো হবেই। কাঁচা পাকা বাবরি চুল। শুকনা শরীর। ভাঙা চোয়াল। দাড়ি নেই, তবে মোটা গোঁফে আরো বিশ্রী দেখায়। গায়ের রং ঠিক যেনো কটা মহিষের পিঠ। দু’হাত ভরা তামা-লোহার বায়লা। আঙ্গুলে পাঁচ-ছ’টা পাথরের আংটি। ঘাড়ে একটি ট্র্যাভেল ব্যাগ।
ফকির সাহেব মুখ-হাত ধুয়ে এসে পদ্মাসনে বসলেন খাটের ওপর। চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে করলেন কিছুক্ষণ। তারপর দু’হাতে তালি বাজিয়ে ব্যাগ থেকে বের করলেন গাঁজার সরঞ্জাম। স্যার এসে আমাকে দেখিয়ে বললেন, ফকির সাব, এই হলো সালু ভাই। আমার ছোট ভাইয়ের মতো। কোনো কিছুর প্রয়োজন মনে করলে সালু ভাইকে বলবেন। না-না লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই।
ফকির সাহেব বললেন, স্যার আপনি এসব নিয়ে চিন্তা করবেন না। প্রয়োজনে সবই বলবো। তা নিয়ে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই।
ফকির সাহেবের বলাটা আমার বেশ লাগলো। তিনি নারকেলের সোবার ছোট একটি বল কলকের মাথায় দিয়ে আমাকে বললেন, ভাতিজা একটু আগুন জে¦লে দেন। আমি যত্ন সহকারে কলকের মাথায় আগুন জে¦লে দিলাম। ফকির সাহেব কলকে টানতে টানতে শেষবার একটা দম টেনে পেটের মধ্যে আটকে রাখলেন। চোখ বন্ধ করে ধীরে ধীরে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে এক সময় গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ভাতিজা খানার কথা বলেন।
ভাবী তখনো অফিস থেকে ফেরেনি। ইরানির মাকে খানার কথা বলতেই সে ফকির সাহেবের খানা রেডি করে দিলো। আমি খাবার এনে ফকির সাহেবের সামনে রাখলাম। ফকির সাহেব হাতের ওপর পানি ঢেলে চারদিকে ছিটালেন। প্লেটের একদিকে কিছু সাদা ভাত লবণ দিয়ে মেখে মুঠা করে, সেই হাতটা দু’পায়ের বুড়া আঙ্গুলে ছুঁইয়ে পাশেই একটা কাগজের ওপর রেখে দিলেন ভাতের মুঠা।
বিষয়টা আমার ভালো লাগলো না। আমি বললাম, এটা কী করলেন?
তার জন্য রেখে দিলাম।
কার জন্য?
ভাতিজা এতো তাড়াতাড়ি ভাতও ফোটে না। আপনি এখনি থলের খবর নিতে চান! কি হতে কি হয়ে যায় ভেবে আমি আর এ নিয়ে প্রশ্ন করলাম না। শুধু দেখে যাচ্ছি। মাছ-মাংস, ডাল-ভাজি একত্রে মাখিয়ে ফকির খেয়ে নিলেন। প্লেটে পানি ঢেলে হাত ধুয়ে প্লেট ধুয়ে সেই পানি চুমুক দিয়ে খেলেন। সারা মুখে ভিজা হাতের প্রলেপ মেখে শুয়ে পড়লেন তিনি।
সন্ধ্যার পর ফকির সাহেবের সাথে স্যার কথা বললেন একান্তে। সে সব কথা যে বশীকরণ সম্পর্কিত তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সকালে স্যার এবং ভাবী নয়নকে নিয়ে অফিসে চলে গেলেন। ফকির সাহেব নাস্তা শেষ করে একটুকরা কাঠের ওপর গাঁজার পাতা রেখে ছুরি দিয়ে টুকরো টুকরো করে হাতের তালুতে ডলাই-মলাই শুরু করলেন। তারপর ঝরঝরে চা পাতির মতো করে কলকের মধ্যে ঢেলে বললেন, ভাতিজা আগুন জ¦ালেন। যথা আজ্ঞা বলে কাজে লেগে গেলাম। ফুঁ দিতে দিতে একটু ধোঁয়া বেরোতেই ফকির সাহেব বললেন, টান লাগান।
আমি? আমার অভ্যাস নেই। শেষে মাথা ঘুরে পড়ে যাবো।
কিচ্ছু হবে না। দম দিয়ে পেটের মধ্যে আটকে রাখেন।
তাতে কী হবে?
মাথা পরিষ্কার হয়ে যাবে।
পরিষ্কার হবে মানে? মাথা ঘুরে বুদ্ধিসুদ্ধি তো সব খিচুড়ি হয়ে যাওয়ার কথা। এ আমি পারবো না।
আরে ভাতিজা, আমার ডেরায় কত ধরনের কতো বড় বড় মানুষ আসে। কবি সাহিত্যিকরাও আসে। মাথায় নাকি বুদ্ধি খেলে না। কিন্তু এই কলকেয় দু’চার টান দিয়েই মাথা পরিষ্কার। তখন গড় গড় করে বুদ্ধির চাকা ঘুরতে শুরু করে।
মনে মনে ভাবতে লাগলাম বুদ্ধির চাকাতো আমারো ঘোরা দরকার। যাও বা একটু নড়াচড়া করতো, এই চার পাঁচ বছরে সেটুকুও বন্ধ হয়ে গেছে। এ সব ভেবে চিন্তে, কষে একটা দম দিয়ে মুখ বন্ধ করে রাখলাম। একটু পরই একটা ধাক্কা দিয়ে মাথার যন্ত্রপাতি বুঝি ঘুরতে শুরু করলো। আরেকটু পর বুঝলাম শুধু মাথা নয়, স্যারের বাড়িঘরও ঘুরতে শুরু করেছে। আমি যেনো মহাশূন্যে, গ্রহ-নক্ষত্রের দেশে চলে যাচ্ছি।
টলতে টলতে পাশের ভাড়াটিয়া ভাবীর ঘরে চলে গেলাম। আমাকে দেখেই ভাবীর বুঝা সারা। খাটের এক পাশে শুয়ে পড়লাম আমি, ভাবী ফুলস্পিডে ফ্যান চালিয়ে দিলেন। তারপর মনে হতে লাগলো ঝিরঝির শব্দে একটা ঢেউ পা থেকে গড়াতে গড়াতে মাথায় উঠে যাচ্ছে। আবার মাথা থেকে নেমে আসছে পায়ের পাতায়। এভাবে পৌনে এক ঘণ্টা ধরে সারাটা শরীর ওয়াশ হওয়ার পর আমি গাঁজার হাত থেকে রেহাই পেলাম।
ফিরে গেলাম ফকির সাহেবের কাছে। বললাম, স্যার যে কাজের জন্য নিয়ে এসেছেন সে কাজ হবে তো?
সেই কাজই তো করছি। দয়াল মুখ তুলে চাইলেই হবে।
তখন আমার মনের মধ্যেও কিছু একটা চাওয়ার ইচ্ছা ক্রমেই প্রবল হতে লাগলো। আর এই বিশ^াসও জন্মালো যে, চাইলেই যখন পাবো, তখন কী চাইবো সেটাই স্থির করতে পারছিলাম না।
ফকির সাহেব হাসতে হাসতে বললেন, আপনি তো রাজকন্যার সাথে রাজ্যও পেতে যাচ্ছেন। এই দশ কাঠা জমির পাঁচ কাঠা তো আপনার।
আমি ফকিরের কথার মাথা মুণ্ডু কিছুই বুঝলাম না। বললাম, আপনি এসব কী বলেন!
যা সত্যি তাই তো বললাম।
তার মানে?
আপনার স্যারের এক বোন আছে না। বয়স হয়েছে, এখনও বিয়ে হয়নি। স্যারের এক ভাইয়ের বাসায় থাকে।
শুনেছি দেখি নাই। কানা না খোঁড়া তাও জানি না।
একদিন দেখে এলেই তো হয়।
দেখে আর লাভ কী? কানা খোঁড়া হলেও আমার সাথে বিয়ে দেবে না।
কেনো দেবে না? ছেলে হিসাবে আপনি কি খারাপ? আপনার মতো ছেলে লাখে একটা মেলে।
কথাটা শোনার পরই আমার ইচ্ছে করতে লাগলো, ভাবীর ঘরে গিয়ে একবার আমার চেহারাটা ভালো করে দেখে আসি। কিন্তু ফকির সাহেব আবার বললেন, আপনাকে একটা মন্ত্র শিখিয়ে দেবো। মন্ত্রটা অবশ্য সব খানেই খাটানো যাবে। আমি বললাম, তাহলে তাই শিখিয়ে দেন।
কালী সন্ধ্যায় একটা রক্তজবা ফুল তুলে এক নিঃশ^াসে মন্ত্রটা তিনবার পড়ে ফুলের ওপর ফুঁ দিতে হবে। ফুলটা কখনো নিচে রাখবেন না। সেই ফুল হাতে নিয়ে সাত দিন তার সামনে যাবেন। ব্যস! তারপর সে নিজে এসে আপনার সাথে কথা বলবে।
এই শহরে রক্তজবা ফুল পাবো কোথায়?
খুঁজলে বাঘের চোখও মিলানো যায়। আর এতো সামান্য একটা রক্তজবা।
তারপর থেকে এ গলি সে গলি ঘুরে ঘুরে দেখে বেড়াতে লাগলাম কোথায় রক্তজবা ফুল গাছ আছে। শেষে খুঁজতে খুঁজতে একটা দেয়াল ঘেরা একতলা বাড়ির পিছন দিকে রক্তজবা ফুল দেখতে পেলাম। এবার মন্ত্রটা ঠোঁটস্থ করতে শুরু করলাম। আমাকে বিড়বিড় করতে দেখে ভাবী একদিন বললেন, সালু ভাই কি আগামী বছর সত্যি পরীক্ষা দেবেন?
জি ভাবী।
ভালো।
মনে মনে বললাম, ভালো হলেই ভালো। কী যে কঠিন পরীক্ষা তা যদি একবার জানতেন।
কালী সন্ধ্যায় অলি-গলিতে লোক চলাচল বেশ কমে যায়। দেখে শুনে একদিন সুযোগ বুঝে ঢুকে পড়লাম সেই বাড়ির মধ্যে। বড় বড় পাতা বাহার আর রজনীগন্ধা গাছের আড়াল দিয়ে পৌঁছে গেলাম রক্তজবা গাছের কাছে। চোখের পলকে একটা ফুল ছিঁড়ে, একদমে মন্ত্রটা তিনবার পড়ে ফুলের ওপর ফুঁ দিয়েই হাঁপাতে হাঁপাতে বেরিয়ে এলাম রাস্তায়। এই কাজটা যে কিভাবে সম্পন্ন হলো, তা আমি নিজেও বলতে পারবো না। তবে এ কথা মনে হলো যে, গাঁজা আমাকে সত্যি ওয়াশ করে এগিয়ে যাওয়ার চোখ খুলে দিয়েছে।
বিনিময়ে ফকির সাহেব একদিন আমার কাছে এক বোতল কোক খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। আমি তার আশা পূরণ করলাম। ভাবলাম আমার আশাও হয়তো পূরণ হবে। পরদিন ফকির সাহেব চলে গেলেন।
কয়েকদিন পর স্যার বাসায় ফিরে রাগে যেনো ফেটে পড়তে লাগলেন।
সব শালা ভণ্ড ফকির। কাজের নামে ঘণ্টা। ভণ্ডটা যে বললো, আপনার মুখের ওপর কেউ কথা বলতে সাহস করবে না। বেটা ভণ্ড!
পরদিন সন্ধ্যায় স্যারের অফিসের পিয়নের কাছে জানতে পারলাম, কোনো এক অভদ্র পাওনাদার স্যারের অফিসে গিয়ে স্যারকে যাচ্ছে তাই বলে গিয়েছে।
স্যার গাঁজা খান না ঠিকই, কিন্তু এ কথা সত্য যে, স্যারের বুদ্ধির সবকটা দরজাই রয়েছে খোলা। দু’দিন পর তিনি আর একজন ফকির নিয়ে এলেন বাসায়। তবে ইনি ফকির নয়- দরবেশ কিসিমের মানুষ। সাদা চুল দাড়ি, দেখতেও সুন্দর আর খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। লোকটা আল্লাহর পবিত্র কালাম দিয়ে তদবির করেন।
স্যার সগর্বে ভাবীকে বললেন, নয়নের মা, এই হলো খাঁটি লোক। ভাইজানের চেহারা মোবারক দেখলেই শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছে করে। ভাবী বললেন, ভাইজানকে কি সালাম করবো?
তা করতে পারো। ধরে নাও, এখন থেকে ভাইজানই আমাদের মুরব্বি।
রাতে লক্ষ করলাম, উনি প্রায় সারা রাতই দোয়া দরুদের মধ্যে কাটালেন। ভোররাতে ফজরের নামাজ পড়ে কখন যে ঘুমিয়েছেন, তা আর আমি জানি না। বেলা আট-টার দিকে তিনি উঠলেন। তারপর নাস্তা খেয়ে কিছু বিশেষ জিনিসপত্র কিনতে বেরিয়ে গেলেন। পরদিন মাগরিবের নামাজের পর বাড়ির গেট থেকে শুরু করে দশ হাত অন্তর অন্তর একটা করে তাবিজ পুঁতে দিলেন রাস্তায়। লম্বা একটা ছুরি হাতে খুঁড়া-খুঁড়ির কাজে আমি সাহায্য করলাম। পোলাও-গোশত খেয়ে একদিন তিনিও বিদায় নিলেন।
ঝিলপাড়ের বস্তি থেকে একজন পাগল লোক প্রায়ই নিজের হাতে ধরা তাজা মাছ দিয়ে যেতো স্যারের বাসায়। সেই লোকটা একদিন বিশেষ এক মহিলার খোঁজ দিলো। মহিলাটি নাকি এমন সব তন্ত্রমন্ত্র জানে, যা চুম্বুকের মতো সাথে সাথে কাজ করে। মন উল্টা-পাল্টা করা কোনো ব্যাপারই না।
যাহোক, একদিন বিকালে বাসার সবাই মিলে গেলাম ঝিলপাড়ের সেই মহিলার বাড়িতে। গাছ-গাছালির ছায়ায় মোড়া পেতে বসে স্যার বর্ণনা করলেন নানাবিধ সমস্যার কথা। মহিলা অনেকগুলো গাছ দেখিয়ে বর্ণনা করলো তার গুণাগুণ। তারপর বললো, ভাই সাহেব! আপনি গরিবের বাড়িতে এসেছেন বলে আমি ধন্য হয়েছি। তবে একটা কথা, এসব কাজ করার ক্ষমতা আমার আছে কিন্তু আমি করি না। যদি করতাম, তাহলে আপনার মতো দশ কাঠা জায়গার মালিক আমিও হবার পারতাম। পরের ক্ষতি করে কোনো দিন সুখ পাওয়া যায় না।
আমি একটু দূরে থাকলেও মহিলার কথাগুলো আমার কানে এলো। ভাবলাম এক্ষুনি একটা ফাটাফাটি কাণ্ড হয়ে যাবে। কিন্তু না, স্যার একটুও রাগ করলেন না। আরো নরম সুরে বললেন, এই মহব্বতজানের মতো গরিব মানুষ ঢাকা শহরে আর একটিও নেই। আপনি কাজ করলে পারিশ্রমিক পাবেন। আমি কি করি বা না করি তা আপনার ভাববার বিষয় নয়। তারপর আরও কিছুক্ষণ পর আমরা ফিরে এলাম বাসায়।
শহরে সব ধরনের জ্ঞানী গুণীদের সাথেই স্যারের আলাপ পরিচয় আছে। সাংবাদিকসহ রেডিও টিভির লোকজনও আসেন স্যারের বাসায়। ভদ্র লোকেরা চা-বিস্কুট খেয়ে বিভিন্ন প্রসঙ্গ তুলে গল্পে গল্পে বিকাল থেকে রাত আট-টা পর্যন্ত কাটান। যে কারণে তাদের সাথে আমারও বেশ ঘনিষ্ঠতা বাড়লো।
অনেকেই প্রশ্ন করেন, সালু ভাই কি কিছু করার চিন্তা-ভাবনা করছেন?
আমি বলি, কী করবো? স্যার আছেন, স্যার যা ভালো মনে করবেন তাই করবো। স্যার বললেন, এই সমাজের ভালো ছেলেদের কি আর ঠাঁই আছে। চোর-ছ্যাঁচড় মিলে দেশ চালাচ্ছে। সালু ভাই করলে বড় কিছুই করবে। আরে মহব্বতজান তো এখনো বেঁচে আছে।
রেডিওর জামান সাহেব বললেন, সালু ভাইয়ের কণ্ঠটা বেশ।
তারপর আমাকে বললেন, আপনি কি কখনো অভিনয় করেছেন?
হ্যাঁ করেছি। স্কুলে একবার আমাকে নায়িকার পাঠ করতে হয়েছিলো। কী যে পিচ্ছিল শাড়ি পরালো। স্টেজের ওপর ঘুরতে ফিরতে শাড়ি গেলো খুলে। শেষে …। কথা শেষ করতে পারলাম না। হো হো শব্দে হেসে উঠলো সবাই। ভাবী বললেন, সালু ভাই, আপনি নায়িকার পাঠ করেছিলেন, কই, একথাতো কোনো দিন বলেননি।
কী বলবো? এসব কি একটা বলার কথা? তো আরেকবার একটা নাটক করতে গিয়ে দেখা গেলো বইটার মাঝখানের পাঁচ-ছটা পাতা নেই। অথচ বইটা ভালো। আমি তখন কলেজে পড়ি। কি আর করা। স্কুলে পরীক্ষার সময় কতই তো শূন্যস্থান পূরণ করেছি। তাই ভাবলাম দেখি না কী করা যায়। তো বইটা ভালো করে দু’একবার পড়লাম। তারপর শূন্যস্থান পূরণ করে দিলাম। হলোও ভালো।
আমার কথা শুনে কেউ বললেন, বাঃ চমৎকার একটা ঘটনা শুনলাম। কেউ বললেন, আমাদের সালু ভাই তাহলে নাট্যকারও বটে। স্যার বললেন, গ্রামের ব্যাপার তো, ভিড়ের মধ্যে বাছুর পরামানিক। আমি তো আছি।
রেডিওর ভদ্রলোক বললেন, মহব্বত ভাই আপনি যাই বলুন, সালু ভাইয়ের এই কাজটি কিন্তু বিরাট ব্যাপার। তারপর আমাকে বললেন, আপনি যদি রেডিওর নাটকে অভিনয় করতে চান তো আমার সাথে যোগাযোগ করবেন।
হাতের মোয়া সময় করে খেলেই হলো। এরকম ভাব-সাবের মধ্যে কেটে গেলো দেড় মাস। তারপর একদিন দেখা করলাম। ভদ্রলোক বললেন, সালু ভাই এতো দেরি করলেন যে! আমি তো কবেই আপনার বরাবর চিঠি পাঠিয়েছি। একটা চরিত্রে আপনাকে সিলেক্ট করেছিলাম। শেষে না দেখে অন্য একজনকে দিয়ে করানো হলো। আমি বললাম, সে চিঠি আমার হাতে পৌঁছেনি।
যাহোক-একদিন দুপুরে চিঠিটা খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলাম স্যারের বেডের নিচে। মনের মধ্যে কাদাকাদা কষ্ট এসে জমলো। যা বেশ ঘন এবং বিশ্রী, ভাবলাম এই মহব্বতজানের মহব্বতে পড়ে থাকলে আমি কোনোদিন পথের সন্ধান পাবো না। স্যার আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন ঠিকই, তবে বিনা পয়সায় একজন বিশ্বাসী এবং নির্বোধ কেয়ার টেকার পেয়েছেন। সেই বিশ্বাসী লোকটা হাত ছাড়া হয়ে গেলে কী ক্ষতি হবে তা মহব্বতজান ভালোই জানেন।
মনে মনে ভাবি, সবাই এক কপাল নিয়ে জন্মায় না। কত বিচিত্র, মানুষের এই জীবন-নাটক, সে কথা ভাবার সময় কোথায় মানুষের। প্রতিটি মানুষই বুঝি মরণের আগ পর্যন্ত সেই নাটকেরই জন্ম দিয়ে যাচ্ছে।
স্যারের এই মানসিকতা বুঝেও আমি অবুঝের মতো রয়ে গেলাম। স্যারের সংগ্রহে প্রচুর বই। স্যার পড়ার সময় না পেলেও আমি পড়ে যেতে লাগলাম নিয়মিত। বই এর মধ্যে পথ খুঁজি। বই একমাত্র প্রকৃত বন্ধু, যে ছলনা জানে না। যে মিথ্যা বলে না।
প্রায় চার মাস পর বিশেষ একটা কারণে আমার মনটার মধ্যে বেশ খুশি খুশি লাগতে লাগলো। এই খুশির বিষয়টা স্যারকে জানানো দরকার বলে মনে করলাম। পরদিন সন্ধ্যায় স্যারকে বললাম, স্যার জাহাঙ্গীর চৌধুরী আমার বইটা নিতে চায়।
বই! কী বই?
জীবনযুদ্ধ।
জীবনযুদ্ধ মানে?
হ্যাঁ- জীবনযুদ্ধ। আমার লেখা। বইটা আমি তাকে পড়তে দিয়েছিলাম। তিনি পড়েছেন। আমি বইটা আনতে গেলে তিনি বললেন, বইটা আমাকে দেন। আমি একটা সামাজিক ছবি তৈরি করি। কাহিনীটা খুবই ভালো।
স্যার অনেকক্ষণ দম ধরে থেকে বললেন, আরে ভাই কতো চৌধুরী দেখলাম। সব টাউট-বদমাশ। বইটা নিয়ে সে নিজের নামে চালাবে। ছবি হিট হলে লাখ লাখ টাকা কামাবে, আপনাকে দেবে কচুটা। বইটা যে আপনার সে কথা বলতে গেলেও বিপদে পড়বেন আপনি। আপনার পাশে কেউ আসবে না। কারণ, আপনি লেখক নন, জাহাঙ্গীর সাহেব একজন লেখক এবং পরিচালক। বইটা লিখেছেন- থাক। সময় এলে সবই হবে। এ নিয়ে চিন্তা করবেন না।
দারুণ সত্যি কথা। স্যারের কথায় মনে হতে লাগলো, ওহ! কী বাঁচা বেঁচে গেলাম। স্যারকে কথাটা না বললে তো- মস্তবড় ভুল করতাম। কিন্তু কিছুদিন পরই বুঝলাম, স্যারকে বলেই আমি মস্তবড় ভুল করেছি।
সময় ও স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না। বয়ে চলে আপন গতিতে। আমি রয়ে গেলাম আমার জায়গাতেই। একদিন আবার দেখা হয়ে গেলো আতিয়ারের সাথে। আমি ওকে চিনতে চাইলাম না। কিন্তু আতিয়ার বললো, সালু কেমন আছিস?
ভালো।
পরীক্ষা দিয়েছিলি?
না।
এখন কী করছিস?
আমার কথা বাদ দে। তুই কেমন আছিস তাই বল।
আর বলিস না, ছেলেটা আমাকে পাগল করে ছাড়বে।
ফুটফুটে একটি ছেলে দেখে বললাম, এই তোর ছেলে? বয়স কতো?
পাঁচ বছর। এতো দুষ্টু…। চল আমার বাসায় যাই। এই তো ধানামন্ডি লেকের ওপাড়েই।
সে তো বেশ দূর।
আমার গাড়ি আছে, তোকে পৌঁছে দেবো।
আমি যাবো- এই ভাবে?
তাতে কী? তুই আমার সহপাঠী। স্কুল-কলেজে এক সাথে পড়েছি।
আজ থাক- অন্য একদিন দেখা যাবে।
রাতে আর ঘুম আসে না। ছটফট করতে করতে দরজা খুলে বকুলতলা এসে বসলাম। চারদিকে নিঝুম। চাঁদ নেই। আঁধারের মিষ্টি ছোঁয়ায় এতোই ভালো লাগছিলো যে, দূরের বিজলি বাতি তখন- অসহ্য লাগতে লাগলো। শরীরটা চেয়ারে এলায়ে চোখ বন্ধ করলাম। কিন্তু মন কেবলি আতিয়ারের দুষ্টু ছেলেটাকে ঘিরে মায়ার সুতা ছড়াতে লাগলো। মনে হতে লাগলো ছেলেটাকে আর একবার দেখি। ওর বুকটা আমার বুকের মধ্যে নিয়ে খুব আদর করি। কিচ্ছু ভালো লাগে না। আমার বুকের মধ্যে এই যে কেমন কেমন লাগছে, আমাকে দেখে আতিয়ার কি তা বুঝতে পারবে?
কখন যে দুচোখের কোণ বেয়ে অশ্রু গড়াতে শুরু করেছে তা বুঝতেও পারিনি। চোখ মুছে ভাবলাম, একদিন আতিয়ারের বাসায় যাবো। আমি যেমনই হই না কেনোÑ সবচেয়ে বড় সত্য যে, ও আমার স্কুল এবং কলেজ জীবনের বন্ধু। কিন্তু ওর বাসার ঠিকানা তোÑ জানি না। তাহলে…
কয়েকদিন পরের ঘটনা। নয়নের প্রাইভেট টিচার এলেন ঠিক সন্ধ্যার দিকে। পড়াতে নয়, পড়ানোর টাকা নিতে। নয়ন সামনে এস.এস.সি পরীক্ষা দেবে। তাই ভার্সিটির এক তুখোড় ছাত্রকে পড়ানোর জন্য ঠিক করা হয়েছিল। অনেক দূর থেকে এসে পড়িয়ে যেতো সে। কথা ছিলো পরীক্ষা চলার মধ্যেও সে লেগে থাকবে। কিন্তু প্রায় ছ’মাস পর টাকা-পয়সা নিয়ে লেগে গেলো গোলমাল। এই ক’মাসে ছিঁড়ে ছিঁড়ে এক মাসের টাকাও পায়নি শিক্ষক।
ঘটনাটা তাহলে শুরু থেকেই বলি।
পড়ানোর ব্যাপারে টিচারের সাথে আলোচনা হতেই মহব্বতজান অর্থাৎ, আমার স্যার বলেছিলেন, টাকা-পয়সা নিয়ে আপনি ভাববেন না। বিদ্যা দানের চেয়ে মহৎ কাজ কি আর আছে। অন্য জায়গায় যেমন সম্মানী পান আমি তাই দেবো, তবে আমার নয়নের জন্য আপনি দু’চার মিনিট একটু বেশি ব্যয় করবেন। মহব্বতজানের ব্যবহার, নাস্তা-পানি এবং মাঝে মাঝে রাতের ভূরিভোজে প্রাইভেট টিচার তো-স্যারের প্রতি শ্রদ্ধায় গদগদ। মাস শেষ হলো কিন্তু পুরা মাসের টাকা সে পেলো না। কিছু হাত খরচা দেয়া হলো টিচারকে।
স্যার বললেন, একটু অসুবিধা আছে। এ নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না। দু’চার মাস গেলেই টাকাটা এক সাথে পেলে আপনার উপকার হবে। মনে করুন টাকাটা আপনার পকেটেই রয়েছে।
এর ওপর আর কথা থাকতে পারে না। তো, সেভাবেই কেটে গেলো ছয় মাস। টিচার বললেন, এবার আমার টাকাটা দিয়ে দিন। আমি নয়নের জন্য অনেক করেছি। ওর জন্য একটা ছাত্রকে আমি বাদও দিয়েছি। এই ছ’মাসে চব্বিশ হাজার টাকা। তার মধ্যে দিয়েছেন পাঁচ হাজার।
আমার স্যার বললেন, এটা কি মগের মুল্লুক। চা-নাস্তা খেয়ে, বসে বসে একঘণ্টা পার করেই চার হাজার টাকা। আপনার মতো মাস্টার আমার দরকার নেই। আমার ছেলে আর আপনার কাছে পড়বে না। আপনি এখন যেতে পারেন।
এই নিয়ে ভীষণ চেঁচামেচি। আমি শুধু শুনছি আর ভাবছি। প্রাইভেট টিচার যতো না গরম তার চেয়ে অধিক গরম আমার স্যার। শেষে ধীরে ধীরে টিচারও গরম হতে শুরু করলো। ভার্সিটির সেরা ছাত্র বলে কথা। আমার মনে হলো, এই গরম হাওয়ায় সেও দেখতে পেলো মহব্বতজানের আসল চেহারা। সে যাই হোক, টিচার পরিশ্রমের টাকা খোয়াতে রাজি নয়।
শেষে এই কথা হলো যে, ঠিক একমাস পর এসে আপনার টাকা আপনি নিয়ে যাবেন। টিচার বললো, ঠিক আছে। আমি এক মাস পরই আসবো। সেদিন কিন্তু টাকা না নিয়ে আমি যাবো না।
আজ সেই টাকা নেয়ার দিন। আমি জানতাম টিচার আজ আর স্যারের মিষ্টি কথায় গলবে না। এদিকে স্যারের কোনো অনুচ্ছেদেই কাউকে কোনো টাকা দেয়ার কথা লেখা নেই, এটা আমি বেশ বুঝেছি। অবস্থা যে খারাপের দিকে যাচ্ছে, এটা ভেবে আমি শঙ্কিত।
এমন সময় স্যার আমাকে ডেকে বললেন, সালু ভাই দু’প্যাকেট সিগারেট নিয়ে আসেন।
অবস্থা বুঝেই আমি দ্রুত দোকানের দিকে ছুটলাম। ফিরে এসে দেখি কারবার যা হবার হয়ে গেছে। বকুলতলা থেকে রাস্তা পর্যন্ত ভিড় করে আছে প্রতিবেশীরা। আমার স্যার অর্থাৎ, মহব্বতজানকে চক্ষু হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা চলছে। নয়নের প্রাইভেট টিচারের একটা ঘুষিতেই আমার স্যারের বাঁ চোখের বারোটা বেজে গেছে। উঠোনে ছিটকে পড়ে কোমরে প্রচণ্ড ব্যথাও পেয়েছেন।
প্রতিবেশীদের মুখ দেখে মনে হলো ঘটনার অন্তরালের ঘটনা শুনে ভদ্রেরা লজ্জায় দুর্বল হয়ে গেছে। তবে, মহল্লার মধ্যে এসে একজন নামিদামি সমাজসেবকের গায়ে হাত তোলা এটা মেনে নেয়া যায় না। কিন্তু মেনে তাদের নিতেই হয়। কেননা, প্রাইভেট টিচার আঁটসাঁট বেঁধেই এসেছে। পনেরো বিশজন ছাত্র-যুবক রাস্তায় দাঁড়িয়ে অকথ্য ভাষায় স্যারকে গালমন্দ করছে। তাঁর চরিত্রের বিশ্লেষণ করছে। শুনে আমারই মাথা ঘুরে উঠলো। ভাবলাম, এরা এতসব তথ্য জোগাড় করলো কোথা থেকে।
দু’তিন দিনেই স্যার সুস্থ হলেন। তবে, বাঁ চোখে ব্যান্ডেজ বাঁধা। এখন আর সিগারেট জ¦ালানোর সময় যত্ন করে বাঁ চোখ বন্ধ করার প্রয়োজন হয় না স্যারের। হলে কী হবে- কেমন জানি অশান্তি বোধ করেন স্যার। মনের দুঃখে ভাবী একদিন রাগ করে স্যারকে বললেন, তোমার স্বভাবটা এবার পাল্টাও। পাড়ার ভদ্রলোকদের কাছে মান-সম্মান কিছু থাকলো?
কে ভদ্রলোক? ঐ সব ঘুষখোররা? নয়নের মা, চার-পাঁচ তলা বাড়ি বানালেই সে ভদ্রলোক হয় না।
থাক। তুমি আর কথা বলো না।
কিন্তু স্যারের যতো রাগ গিয়ে পড়লো- ফকিরদের ওপর। স্যার উত্তেজনায় ছটফট করতে করতে বললেন, সব শালা ভণ্ড। বেটাদের পেট ফাড়লে ‘ফ’ খুঁজে পাওয়া যাবে না, আবার ফকির কওলায়। ভাবী বললেন, ডা: সাহেব তোমাকে উত্তেজিত হতে নিষেধ করেছেন। আমিও ভাবীর কথায় সায় দিয়ে বললাম, ভাবী ঠিকই বলেছেন। চোখ নিয়ে খেলা করা ঠিক না। সৃষ্টিকর্তা এই অমূল্য ধন একবার দান করেছেন, নষ্ট হলে তিনি আর দেবেন না। শুধু একটা জিনিসই তিনি দু’বার দান করেন।
সে আবার কী জিনিস? স্যার প্রশ্ন করলেন।
আমি বললাম, দাঁত। দুধের দাঁত পড়ে গেলে তিনি হাড় চাবানোর জন্য নতুন করে আবার দাঁত দেন। কিন্তু আমরা দাঁত থাকতে দাঁতের মর্তবা বুঝি না।
সপ্তাহখানেক পর কুমিল্লা থেকে ভাবীর চাচাতো ভাই আর বোন মিলে চারজন মেহমান এলো বাসায়। তখনো স্যারের চোখ লাল। চোখে ড্রপ চলছে। শালীরা বলল, দাদা বাবু আপনার চোখে কী হয়েছে? স্যার বললেন, তেমন কিছু না।
কিছু না মানে, কদম ফুলের মতো লাল হয়ে আছে।
কথা শুনে স্যার হেসে উঠলেন। ভাবী অন্য ঘর থেকে বললেন, ওই তোরা কি কস্। কদম ফুল কি লাল রে? শালীরাও একযোগে হাসতে হাসতে বললো, দিদি রক্তজবা ফুলের নাম মনে আসছিলো না তো, তাই কদম ফুল বলে ফেলেছি।
শালীদের মধ্যে একজনের বিয়ে হয়েছে, আর একজনের এখনো হয়নি। কলেজে পড়ছে। দু’জনই প্রচণ্ড রসিক। আমার রুমটা বেশ বড়, দু’দিকে খাট পাতা। টেবিল ও দু’তিনটা চেয়ার রয়েছে। নয়ন মাঝে মাঝে এখানে পড়াশুনা করে। তো মেহমানরা আমার খাটে বসেই আড্ডা দিচ্ছে। আমি বকুলতলা বসে যাযাবরের সুনন্দা আর আধারকারের মিষ্টি প্রেমের সৌরভে ভাসছি। তবে ওদের টুকরো টুকরো কথা আমার কানে আসছে।
কলেজপড়ুয়া মেয়েটি বলছে, নয়ন তো এবার পরীক্ষা দিচ্ছিস।
নয়ন বললো, অবশ্যই দিচ্ছি।
ঐ লোকটা তোদের এখানে থাকে?
হ্যাঁ।
তোর মাস্টার?
না। সালু চাচা অনেক দিন ধরে আমাদের এখানে। বাড়িতেও যায় না।
লোকটা কী করেরে?
কিচ্ছু না। তবে, সালু চাচা খুব ভালো লেখে। জীবনযুদ্ধ নামে একটা বই লিখেছে চাচা। এক পরিচালক বলেছে, বইটি সে সিনেমা করবে।
এর মধ্যেই স্যার ভিতর থেকে জামা-কাপড় পরে এসে নয়নকে বললেন, বাপ আমি ডাক্তারের ওখান থেকে ঘুরে আসি। তুমি তোমার খালাদের সাথে গল্প করো। ভাবী এগিয়ে এসে বললেন, কাজ শেষ হলেই সোজা বাসায় চলে এসো।
সন্ধ্যায় ছায়া নেমেছে। ভাবী বকুলতলা এসে বললেন, সালু ভাই, দোকান থেকে মুড়ি আর চানাচুর নিয়ে আসেন। আমি দোকান থেকে মুড়ি-চানাচুর এনে ইরানির মায়ের কাছে দিয়ে বকুলতলা বসলাম। ভাবী তখন বোনদের নিয়ে আমার রুমটাতে গল্প করছে।
বড় মেয়েটা বলছে, দিদি তোমাদের তো টাকা পয়সার অভাব নেই। এতো জায়গা, বিল্ডিং করো না কেনো? ভাবী বললেন, সময় যখন হবে, তখন অবশ্যই করবো। এতো তাড়াহুড়া কেনো। কলেজ পড়ুয়া মেয়েটি বললো, তোমাদের তো মাত্র দু’টি ঘর, আর সবই তো ভাড়া দিয়ে রেখেছো। রাতে আমরা থাকবো কোথায়?
ভাবী বললেন, কেনো এই ঘরে থাকবি।
ঘর একটা হলেও খাটতো দুটোই আছে।
রাতে আমি চলে গেলাম পাশের বাড়ির প্রফেসরের বাসায়। প্রফেসর ব্যাচেলর। বড় একটি টিনের ঘরে সে একাই থাকে। পাশে আরো দু’তিন ঘর খ্রিষ্টান পরিবার।
প্রফেসর হাসতে হাসতে বললেন, কী খবর সালু ভাই?
আমি বললাম, ভালো।
বাড়িতে অনেক মেহমান দেখলাম।
দেশ থেকে ভাবীর বোনরা এসেছে।
প্রফেসর সাহেব নিজেই রান্না করে খান। লিকলিকে মানুষ, মেপে-ঝুকে পা ফেলেন। কিন্তু দারুণ রসিক। তিনি রস ভোগ করেন ঠিকই, তবে ধরি মাছ না ছুঁই পানি অবস্থা। প্রসঙ্গ পাল্টে বললেন, সালু ভাই কেমন বুঝতাছেন, খেল কিন্তু মাত্র শুরু হলো। ফকির দরবেশ দিয়ে কুলাইবো না। আমি বলি কি আপনি কেটে পড়েন। উটকো ঝামেলা আপনার ঘাড়ে এসেও পড়তে পারে।
কথা মিথ্যা নয়। তবে, আমি যাবো কোথায়? কোনো রকম একটা কাজ যদি পেয়ে যেতাম, তাহলে আর ভাবনা থাকতো না।
প্রফেসর বললেন, আমার কলিগ মিসেস করিমের ওখানে আপনাকে আমি রেখে দিতে পারি। উনার তিনটি ছোট ছোট ছেলে মেয়ে, ওদের একটু আগলে রাখতে হবে। থাকা খাওয়া ফ্রি।
আমি বললাম, সেই একই কথা। বাঘের খোঁয়াড় থেকে সিংহীর খোঁয়াড়ে যাওয়া।
তাহলে হুদা সাহেবের সাথে একটু কথা বলে দেখি।
তিনি কী করেন?
নবকাল পত্রিকার মালিক। ওখানে যে কোনো কাজে ঢুকতে পারেন। আমার মনে হয়- আপনার উপকার হবে। একদিন খুব বড় মাপের লেখকও হয়ে যেতে পারেন।
তাহলে ওখানেই একটু চেষ্টা করে দেখেন। আপনি একটু জোর দিয়ে বললে তিনি হয়তো না করতে পারবেন না।
তারপর সত্যি একদিন হুদা সাহেবের পত্রিকায় আমার চাকরি হয়ে গেলো। যাওয়ার সময় স্যারকে বললাম, আমি চলে যাচ্ছি।
স্যার আমার দিকে তাকালেন কিন্তু কিছু বললেন না। ভাবী বললেন, কোথায় যাচ্ছেন?
এখন ঠিক বলতে পারবো না। তবে বেঁচে থাকলে আবার দেখা হবে।
স্যার বললেন, ঠিক আছে যান। তবে অসুবিধা হলে আবার চলে আসবেন। আরে এই মহব্বতজান যতো দিন বেঁচে আছে, ততদিন আপনার দুয়ার খোলাই থাকবে।
ভাবী বললেন, আমি যে মনে মনে কতো আশা করেছিলাম।
আমি বললাম, ভাবী মানুষের সব আশা কি আর পূরণ হয়?
পুরনো ঢাকায় হুদা ভাইয়ের তিন তলা বাড়ি। নিচে কাগজের গোডাউন। দোতলা তিন তলা জুড়ে উনি থাকেন। দোতলায় ব্যক্তিগত একটা অফিস রয়েছে তার। আমার আদ্যপান্ত তিনি শুনলেন এবং আমার দু’একটি লেখাও তিনি দেখলেন। শেষে বললেন, আরে ভাই কোথায় কোন্ ম্যাসে গিয়ে থাকবেন আপনি। দরকার নেই। আমার বাড়িতে থাকার জায়গার কি অভাব আছে? আর স্যার স্যার বলে কাজ নেই। হুদা ভাই বললেই হবে।
থেকে গেলাম। শুরু হলো অন্য এক জীবন। হাতে এলো প্রচুর স্বাধীন সময়। হুদা ভাইয়ের উৎসাহে লেখালেখি চলতে লাগলো ঝড়ের গতিতে। নামে বেনামে প্রকাশ হতে লাগলো সে লেখা। হুদা ভাই চতুরতা জানেন না। কারো জন্য কিছু একটা করতে পারলে তিনি সত্যিকারের সুখ অনুভব করেন। এটা আমি বেশ লক্ষ করেছি।
প্রায় এক বছর পর হুদা ভাই একদিন আমাকে ডেকে বললেন, সালু ভাই, আপনার একটা সুখবর আছে। জীবনে এই প্রথম এমন একটি দুর্লভ শব্দ আমার কানে এলো। আমি তখন ভাবতে লাগলাম, প্রমোশন অথবা বেতন বৃদ্ধি এমনই কিছু হবে হয়তো।
হুদা ভাই বললেন, সুখবরটা জানতে চাইলেন না?
আমি যেদিন থেকে আপনার এখানে এসেছি-সেদিন থেকে প্রতিদিনই আমি সুখবরের মধ্যে আছি। হুদা ভাই বললেন, না-না, অতোটা ভাবা ঠিক নয়। আমি কারো উচিত মূল্য দিতে পারলে ভাবি কিছু একটা করতে পারলাম। এতেই আমার তৃপ্তি।
সে আমি জানি।
আপনার ‘জীবনযুদ্ধ’ ছবির জন্য মনোনীত হয়েছে।
কথাটা শুনেই আমি সহসা কিছুই বলতে পারলাম না। তারপর চোখ দুটো ভিজে উঠলো। তবে মনের দৃষ্টিতে একটা আলোকময় পথ আমি দেখতে পেলাম। হুদা ভাই আমার চোখে পানি দেখে বললেন, সালু ভাই আপনাকে আর কিছু বলতে হবে না। আপনি শান্ত হন। আপনার জন্য আরো অনেক কিছু করার ইচ্ছে আছে আমার। দু’এক দিনের মধ্যেই আপনাকে ডাকবে ওরা।
তারপর আরেক নতুন জীবন এলো আমার। ছুটোছুটি আর ব্যস্ততার মধ্যে কাটতে লাগলো প্রতিটি দিন। হাতে এলো অনেক টাকা। একদিন হঠাৎ করেই হুদা ভাইয়ের গাড়ি নিয়ে ছুটলাম গাবতলী কুদ্দুস নানার হোটেলে। শুনলাম কুদ্দুস নানা সেখান থেকে অনেক দিন আগেই চলে গেছে।
একটা বয়কে বললাম, তার ঠিকানা বলতে পারো?
সে বললো, মতিঝিল আছে।
শুধু মতিঝিল বললে তো তাকে পাওয়া যাবে না।
ভিতর থেকে একজন বয়সী লোক এসে বললো, কুদ্দুস উস্তাদ ‘রজন’ হোটেলে আছে।
আমি তখনই ছুটলাম। হোটেলের রিসিপশনে নানার নাম বলতেই একটি মেয়ে বললো, আপনি এখানে বসুন আমি খবর পাঠাচ্ছি।
দশ মিনিটের মধ্যেই নানা এলো। অনেক দিন পর দু’জন দু’জনকে দেখে কিছু না বলে দু’জনেই তাকিয়ে আছি। নানা এবং নাতি দু’জনেরই আমূল পরিবর্তন। শেষে আমিই বললাম, কেমন আছো বলে আর সময় নষ্ট করবো না। ড্রেস পাল্টে এসো।
নানা বললো, এতো দিন পর এই তোমার আসার সময় হলো?
হ্যাঁ-সময় পেয়েই আমি ছুটে এসেছি।
ঠিকানা পেলে কোথায়?
সেই হোটেলে।
কিন্তু এখন তো আমার সময় হবে না।
হবে। গাড়ি করে একটু ঘুরবো দু’জন। তারপর- আবার তোমাকে এখানে পৌঁছে দিয়ে আমি যাবো পুরান ঢাকা।
গাড়ি কি তোমার?
না-হুদা ভাইয়ের। সে অনেক কথা। যেতে যেতে বলবো।
অবস্থা বুঝে হোটেলের ম্যানেজারকে সব খুলে বললাম। ম্যানেজার হেসে বললেন, তা যখন নানা-নাতির ব্যাপার তখন আর কী বলবো আমি।
পথে বেরিয়ে বড় একটা হোটেলে ঢুকেÑদু’জন ইচ্ছা মত খেয়ে নিলাম। এলিফ্যান্ট রোডে এসে কিছু কেনাকাটা করলাম। কুদ্দুস নানা বললো, এর মধ্যে কি আর বাড়িতে গিয়েছিলে?
না।
আর কতকাল দেশান্তরি হয়ে থাকবা-এবার যাও।
আর একটু দেরি হবে।
সেদিনের মতো ফিরে এসে ভাবতে লাগলাম, এখন একবার মহব্বত স্যারের বাড়িতে আমার যাওয়া উচিত। মহব্বত স্যার আর যাই করুক, পথের মানুষের জন্য তার যে বিশাল হৃদয়, তার তুলনা হয় না। ভাবী আর নয়নের কথাও খুব মনে হতে লাগলো।
হলো না। এর মধ্যেই অনেক দায়িত্ব এসে মাথায় চাপলো। তা ছাড়া নানান কাজে কেবল ছুটোছুটি। হঠাৎ একদিন স্যারের অফিসের পাশ দিয়ে যেতেই মনে হলো সুযোগটা হাত ছাড়া করা ঠিক হবে না। দেখাটা করেই যাই।
ভিতরে ঢুকে সালাম দিতেই স্যার বললেন, আরে সালু ভাই, কেমন আছেন?
ভালো। স্যার, ভাবী আর নয়ন কেমন আছে?
এই তো-গরিবের দিন কেটে যাচ্ছে এক রকম।
আমি মহব্বত স্যারের হাতে পঁচিশ হাজার টাকা দিয়ে বললাম, স্যার নয়নকে কিছু কিনে দিবেন। দেশান্তরি হওয়ার পর নয়নকে পেয়ে আমি অনেক কিছুই ভুলেছিলাম।
স্যার টাকা পেয়ে গদগদ হলেন না। কারণ, সে আরো কিছু চায়। তবু বললেন, সালু ভাই ঠিক সময় এসেছেন। বড় অভাবের মধ্যে দিন যাচ্ছিলো। আপনার টাকাটা আমি অবশ্যই ফেরত দিয়ে দেবো। তবে কয়েকটা দিন দেরি হবে।
টাকা আপনাকে ফেরত দিতে হবে না।
তাই কি হয়!
আপনি আমার জন্য অনেক করেছেন।
আরে ভাই-এই মহব্বতজান-মানুষের জন্য কিইবা এমন করতে পারলো।
ঠিক চলে আসার সময় স্যার বললেন, সালু ভাই প্রফেসর সাহেবের সাথে আপনার যোগাযোগ আছে?
অনেক দিন দেখা হয় না।
বেটাতো বিয়ে করেছে।
বেশতো। প্রফেসর সাহেবের টাকা-পয়সা আছে, বয়সও হয়েছে, নিজে রান্না করে খান। বিয়েটা আগেই হওয়া উচিত ছিলো। কথাটা বলেই আমি আর দেরি করলাম না।
ছবির শুটিং চলছিলো। হঠাৎ একদিন পরিচালক ডেকে পাঠালেন। তখনই ছুটলাম স্টুডিওতে। সেখানে প্রযোজক সাহেবও আছেন। পরিচালক বললেন, সালু ভাই এই দৃশ্যটা একটু পাল্টাতে হবে।
কেনো?
নায়ককে যে আপনি সদর দরজা দিয়ে নায়িকার বড়লোক পিতাকে জব্দ করতে পাঠালেন- এটা কি ঠিক হলো? কেমন যেনো গুণ্ডা গুণ্ডা ভাব। এমন হলে নায়িকার ভালোবাসা কি থাকবে?
থাকবে না কেনো? ভালোবাসা আরো গাঢ় হবে। নায়িকাতো নায়কের আদর্শ দেখেই তাকে ভালোবেসেছে। আর পোশাকের মধ্যে গুণ্ডা গুণ্ডা ভাব না থাকলেই হবে।
এসব আগের দিনের কিচ্ছা। এখন ওসব চলে না। এখন মেয়েরা বাবার বিরুদ্ধে যায় না। আরে টাকা থাকলে ভালো ছেলে গণ্ডা গণ্ডা পাওয়া যায়।
আমাকে এখন কী করতে হবে।
নায়ক মুখোশ পরে স্পাইডারের মতো বাড়ির পেছনের দেয়াল বেয়ে দশ তলায় নায়িকার ফ্ল্যাটে ঢুকে যাবে। নায়িকা ক্রিকেটের ব্যাট দ্বারা আঘাত করবে নায়কের মাথায়। নায়ক অজ্ঞান হয়ে পড়বে। তখন নায়কের মুখোশটাও খুলে পড়বে। নায়িকা হায় হায় করে উঠবে। চিৎকার শুনে বাবা বন্দুক হাতে ছুটে আসবেন।
কী হয়েছে রে মা।
কিচ্ছু না বাবা।
চিৎকার করলি কেনো?
স্বপ্ন দেখে।
কোনো খারাপ স্বপ্ন?
দেখলাম- তুমি ছাদ থেকে নিচে পড়ে যাচ্ছো।
বাবা হেসে বললেন, পাগলি আর কাকে বলে।
বুঝলেন সালু ভাই- সম্পূর্ণ নতুন এক ক্লাইমেক্স। আরে দর্শক তো এমন কিছুই চায়। কিছু বুঝলেন?
কিন্তু নায়িকা ঐ রাতে ব্যাট পাবে কোথায়?
প্রযোজক বললেন, সালু ভাই আপনার কাহিনী ভালো। তবে একটু মাথা খাটাতে হবে। এখনকার মেয়েরা খেলা দেখেই না- নিজেরাও খেলে। এক ফাঁকে নায়িকার হাতে একটা ব্যাট দেখিয়ে দিলেই হলো। তা না হলে একটা ক্রিকেট খেলার দৃশ্য লিখে ফেলুন। খেলার মাঝখানে ভিলেন এসে ঝামেলা করবে। হঠাৎ নায়কের আবির্ভাব। চোখের পলকে নায়ক ব্রুসলির মতো দু’একটা ফ্লাইং কিক দিতেই ভিলেন খোঁড়াতে খোঁড়াতে দৌড়ে পালাবে।
পরিচালক আর প্রযোজকের কথা শুনে আমার মাথার মধ্যে চক্কর দিয়ে উঠলো। চোখের সামনে ভেসে উঠলো-ব্রুসলির বিড়াল মার্কা শরীরের তির-ধনুক আক্রমণ। তবু ধীরস্থির হয়ে বললাম, তাতে যে জীবনযুদ্ধের আদর্শই ভেঙে পড়বে।
পরিচালক বললেন, আপনি স্ক্রিপটা নিয়ে আর একটু ভাবুন। এটুকু হলেই দু’সপ্তাহের মধ্যে শুটিং এর কাজ শেষ করা যাবে।
অফিসে মন বসলো না। বাসায় এসে গভীর চিন্তার মধ্যে ডুবে গেলাম। হুদা ভাই বললেন, কী ব্যাপার? কোনো সমস্যা? হুদা ভাইকে সব খুলে বললাম। তিনি বললেন, ওরা যা চায় তাই করে দেন। ওরা জানে পাবলিক কী খায় আর কী খায় না।
তাই বলে…।
আগে দাঁড়াবার জায়গা করেন রে ভাই। তারপর বসা- তারপর শোয়া। তারপর গড়াগড়ি- বুঝলেন কিছু?
কিছু কিছু।
দেখতে দেখতে এসে গেলো ঈদ। কিছু কেনাকাটার জন্য বসুন্ধরায় গেলাম। তবে আমার জন্য নয়, হুদা ভাইয়ের বাচ্চাদের জন্য।
বাড়িতে যাবো বলে মনঃস্থির করলাম। তবে কোরবানির ঈদের পর। ‘জীবনযুদ্ধের’ প্রদর্শনী শুরু হলে।
দেখতে দেখতে এসে গেলো ঈদ। কিছু কেনাকাটার জন্য নিউ মার্কেটে গেলাম। ভিড়ের মধ্যে একটা ছোট ছেলেকে দেখে চেনা চেনা মনে হতে লাগলো। আস্তে আস্তে গিয়ে ওকে ধরে ফেললাম। বললাম, তুমি কে? তোমার আব্বুর নাম কী?
আমার চোখে তখন সানগ্লাস। ঢিলাঢালা কোর্ট প্যান্ট। ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়েই চিৎকার শুরু করলো।
আতিয়ার আব্বা- ছেলে ধরা আমায় ধরে নিয়ে গেলো।
আতিয়ার মুখ ফিরিয়ে হাসতে হাসতে বললো, আরে সালু কেমন আছিস?
ভালো। তাই তো বলি এই দুষ্টুটাকে খুব চেনা চেনা লাগছে। তা আতিয়ার আব্বা বলার অর্থ কী?
অর্থ এই যে, ভিড়ের মধ্যে অনেক ছেলেমেয়েরাই বাবাকে না দেখতে পেয়ে আব্বা, আব্বু করতে থাকে। তো বাবারা কি করে বুঝবে যে তার ছেলেই তাকে ডাকছে। কোথাও যাবো বললে, পাছ ছাড়ে না। নিয়ে গেলে স্থিরও থাকে না। তাই এই ব্যবস্থা।
আমি হাসতে হাসতে বললাম, যেমন বাবা- তেমন তার পুত্র। তো বাচ্চার জন্য কী কিনলি?
কিনবো।
তখন আমি একটা সেট দেখে আতিয়ারকে বললাম, দেখতো এটা কেমন হয়। ও বললো, তুই রাখ আমি দেখছি। আমি সেট-টা প্যাকেট করায়ে দোকানিকে টাকা দিয়ে দিলাম। আতিয়ার আমার দিকে তাকিয়ে বললো, আজ তোকে অন্যরকম লাগছে।
কী রকম?
মনে হচ্ছে- ফাগুন তব দুয়ারে, শরাব পিয়ালা হাতে প্রতীক্ষায় সাকান।
বাঃ কথাটাতো চমৎকার।
বিয়ে করেছিস?
না।
এখন কী করছিস?
করছি একটা কিছু। তোর একটা কার্ড দেতো। ক’দিন পর একটা খবর দিবো তোকে।
তাহলে বিয়ে কি ঠিকঠাক।
আরে ওসব কিছু না। এখন আর ওসব চিন্তা মাথায় নেই।
আতিয়ার আর কিছু না বলে একটা কার্ড আমার হাতে দিয়ে বললো, ঈদের দিন বাসায় আয়। আমি বললাম, ঐ দিন প্রযোজকের বাসায় না গেলেই নয়।
প্রযোজকের বাসায় কেনো?
কথাটা তোকে বলেই ফেলি। ঈদের দিন আমার ‘জীবনযুদ্ধ’ রিলিজ পাচ্ছে। সময় পেলে বইটা দেখিস।
তোর বই মানে তোর লেখা বই?
হ্যাঁ।
মধুমিতা হলে হুদা ভাইসহ আমরা কয়েকজন বসেছি। কুদ্দুস নানাও আছে আমাদের সাথে। হাউজফুল। এক সময় ছবি শুরু হলো। হলে ‘টুঁ’ শব্দটি নেই। পরিচালক প্রযোজক ছুটে বেড়াচ্ছেন বিভিন্ন সিনেমা হলে।
ছবি শেষ হওয়ার পর আমরা বেরিয়ে আসছি। নানান জনের নানান অভিমত। কেউ বলছে, কাহিনীর সাথে সার্থক নাম হয়েছে- ‘জীবনযুদ্ধ’। কেউ বলছে, বইটা সত্যি ‘জীবনযুদ্ধ’। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রক্ত কেমন টগবগিয়ে ওঠে। গেটের কাছে আসতেই ধাক্কা খেয়ে পড়তে পড়তে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম আমি। কতকগুলো তরুণ আমার দিকে তাকিয়ে বললো, কিছু মনে করবেন না ভাই। এখন রক্ত বড় গরম। কুদ্দুস নানা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। আমি নানাকে বললাম, খবরদার এ সময় কিছু বলতে যেয়ো না। ওরাই তো জীবনযুদ্ধের নায়ক-নায়িকা।
দেশান্তরি হওয়ার প্রায় দশ বছর পর মনটা কেনো জানি বাড়ি যাওয়ার জন্য উতলা হয়ে পড়লো। ফেলে আসা কতো স্মৃতি জেগে উঠলো মনের মধ্যে। খুব ছোটবেলার একটা ঘটনার কথা মনে পড়ায় মনে মনে হাসলাম আমি। একথাও ভাবি যে, সেই ঘটনার সাথে জীবনের কোনো দৃশ্য খুঁজে পেলাম না।
মিয়া বাড়ির বড় মিয়া, নাম সারাফাত মিয়া। তখনকার ডাকসাইটে চেয়ারম্যান। চৈত্রের এক দুপুরে, তিনি পাড়ার লোকদের সঙ্গে আমতলায় হাওয়া খেতে বসেছেন। আমি তখন স্কুলে যাই কি না যাই- ঠিক মনে নেই। তবে একথা মনে আছে যে, আমি ঘুরতে ঘুরতে চেয়ারম্যান সাহেবের খুব কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। আর আমার হাতটা আস্তে আস্তে চেয়ারম্যান সাহেবের লোমওয়ালা একটি কানের লতি ধরে ফেললো। তিনি নীরবে গরম চোখে তাকালেন আমার দিকে। আমি কান ছেড়ে দিলাম। আবার ধরলাম। এভাবেই চলতে থাকলো। চেয়ারম্যান সাহেব না পারছেন কিছু বলতে না পারছেন উঠে যেতে। শেষে ছেলেরা আমতলায় ফুটবল নিয়ে আসতেই আমি দৌড়ে চলে গেলাম সেখানে। স্কুলে পড়ার সময়ও ভেবেছি অতটুকু বয়সে চেয়ারম্যানের কান ধরেছি, বড় হয়ে কার কান ধরবো তা শুধু আল্লাহই জানে।
যাহোক, বাড়ি ফেরার কথাটা টেলিফোনে কুদ্দুস নানাকে জানাতেই নানা যেনো খুশিতে নেচে উঠলো। বললো, কবে যেতে চাও বলো। আমাকে তো সেভাবেই ছুটি নিতে হবে। আমি বললাম, আজ রবিবার। আসছে রবিবারে আমরা রওনা হবো। তারপর শুক্রবার ফিরে আসবো ঢাকা।
কথা এক রকম পাকাই হয়ে গেলো। বাড়ি যাওয়ার আগে একবার স্যারের বাড়িতে যাওয়ার কথাও মনে হলো আমার। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো সময় বের করতে পারলাম না। একদিন বিশেষ একটা কাজে কমলাপুর স্টেশন থেকে ফেরার পথে কাকরাইল এসে ভাবলাম, এখনই একটু ঘুরে যাই। তা না হলে আর সময় হবে না। তখন রাত প্রায় দশটা। গলির মোড় থেকে এক প্যাকেট মিষ্টি নিয়ে সেই বকুলতলা গিয়ে দাঁড়িয়ে নয়নকে ডাকলাম।
কোনো সাড়া মিললো না। একটু পরই দরজা খুললেন ভাবী। বললেন, সালু ভাই আসেন। ভাবীর মনটা কেমন বিষণ্ন। এতো দিন পর বাসায় গেলাম, কোথায় হৈ চৈ শুরু হয়ে যাবে, অথচ ঠিক তার উল্টো দৃশ্য। যেনো মৃত বাড়ির শোকসন্তপ্ত এক পরিবার।
ভাবী, নয়ন কি ঘুমিয়েছে?
না।
স্যার কি বাসায় নেই?
না।
কোথায়?
বসেন বলছি।
হঠাৎ লক্ষ করলাম ভাবী যেনো খুব সাবধানে চোখের পানি মুছলেন আঁচলে। আমি তখন নয়নকে ডাকলাম। অন্য ঘর থেকে নয়ন এসে আমার পাশে বসলো।
কী হয়েছে নয়ন?
নয়ন সে কথার উত্তর না দিয়ে- আমাকে জড়িয়ে ধরে চাচা বলে কেঁদে উঠলো। আমি চমকে উঠলাম। নিশ্চয়ই স্যারের কিছু হয়েছে। কালীগঞ্জের সেই চোখ টেরা লোকটা কি তাহলে স্যারকে খুন করেছে! কিন্তু আলোচিত এই মহব্বতজানের মৃত্যু সংবাদ কখনো চাপা থাকতে পারে না। নাকি ভাবীর সাথে রাগারাগি করে আমার মতো শহরান্তরি হয়েছে। শেষে ভাবীকে বললাম, ভাবী, কী হয়েছে খুলে বলুন তো।
ভাবী বললেন, ডা: সামাদ আদালতে তার নামে কেস করেছিলেন। নোটিশ পেয়ে আদালতে হাজির হতেই তাকে অ্যারেস্ট করে জেলে পাঠিয়েছে।
কবেকার ঘটনা।
আজ তিন দিন।
আপনারা জামিনের চেষ্টা করেননি?
নয়নের চাচা উকিল নিয়ে জামিনের চেষ্টা করেছে- কিন্তু লাভ হয়নি।
কেসটা কী?
সে নাকি ডা: সামাদের কাছ থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা নিয়েছিলো। সেই টাকা সময় মতো ফেরত দেয়নি বলেই এই অবস্থা। টাকা পয়সা নেয়ার ব্যাপারে আমরা কিছুই জানি না। আজ তিন দিন কী অবস্থায় যে আমাদের দিন যাচ্ছে তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। নয়ন তো খাওয়া দাওয়াই ছেড়ে দিয়েছে।
বলতে বলতে ভাবী কেঁদে ফেললেন। আমি বললাম, ভাবী শান্ত হন। আপনারা আমাকে একটা খবর পাঠাতে পারতেন।
কে কী করবে। মানুষটাকে কতবার বলেছি তোমার স্বভাবটা এবার পাল্টাও। দান খয়রাত করতে চাও নিজের পয়সায় করো।

SHARE

Leave a Reply