Home সম্পূর্ণ কিশোর উপন্যাস জীবনযুদ্ধের গল্প – দেলোয়ার হোসেন

জীবনযুদ্ধের গল্প – দেলোয়ার হোসেন

[গত সংখ্যার পর]

এদিকে লাল চোখওয়ালা যখন আসে, তার আগেই স্যার বেরিয়ে যান। বকুলতলা বসে এই অধম দু’পক্ষের কথা দু’পক্ষকে বলে যাই। কথায় কথায় লোকটা একদিন বললো, সালু ভাই আপনার বাড়ি কোথায় বলেন তো।
কেনো-বাড়ি দিয়ে আপনি কী করবেন?
মনে হচ্ছে আমাদের এলাকার মানুষ আপনি।
আপনি কোন জেলার লোক?
ঝিনেদা/কালীগঞ্জ
বলেন কি! কালীগঞ্জ আড়পাড়া চেনেন?
খুব চিনি। আমার বাড়ি পুকুরিয়া। তা আপনি এখানে কেন? মহব্বতজানের সাথে আপনার কী সম্পর্ক।
সম্পর্ক আর কী। স্যার আমার আশ্রয়দাতা। তা ছাড়া সারা দুনিয়ার মুসলমানই তো ভাই ভাই।
কতো দিন আছেন।
প্রায় পাঁচ বছরের বেশি ছাড়া কম না।
বাড়ি যান না?
না যাই না। দেশান্তরি হওয়ার পর একটি চিঠিও লিখিনি বাড়িতে।
আমার কথায় লোকটা হা-হা করে হেসে উঠলো। তার আচমকা হাসিতে পানের রসের সাথে চর্বিত পানের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছাবাও ছিটিয়ে পড়লো আমার কাপড়ে। টেরা চোখ দুটো ছোট না হয়ে আরো বড় হয়ে গেলো। এই অবস্থায় ক্ষমা করে মহৎ হওয়ার কথাটা কারো মাথায় আসার সুযোগ পায় না। ঘটে যায় অঘটন। কিন্তু এখানে তেমন কিছুই ঘটলো না। কেননা সে আমার দেশের মানুষ। কত আশা করে প্রাণ খুলে একটা হাসি দিয়েছে, সে হাসির অবমাননা করা যায় না। মনে হলো আমি যেনো কালীগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে দীলিপ দার চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছি।
নয়ন তখন হাই স্কুলে। রিক্সা করে একাই যায় আসে। আমি বাজার করি-পানির বিল, গ্যাসের বিল নিয়ে ব্যাংকে ছুটোছুটি করি। অবসরে বই পড়ি। মাঝে মাঝে স্যার, ভাবী এবং নয়ন সবাই চলে যায় কুমিল্লা বেড়াতে। সেখানে নয়নের নানা বাড়ি। হিন্দু মুসলমান হলেও এদের মধ্যে জাতের বালাই নেই। নিন্দুকের নিন্দাও নেই। সেখান থেকেও আত্মীয়রা এসে দু’চারদিন থেকে যায়। আমার বেশ ভালো লাগে। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’।
সন্ধ্যার পর বড় রাস্তার মোড়ে গেলাম একটা বাজার আনতে। সেখানে দেখা হলো আতিয়ারের সাথে। ও আমার স্কুল এবং কলেজ জীবনের বন্ধু। দীর্ঘদিন পর দেখা। আতিয়ার আমাকে দেখেই বললো, তুই সালু না?
হ্যাঁ। কিন্তু তুই তো পুচ্কে ছিলি-এমন লম্বা হলি কী করে?
ও সব কথা থাক। তুই কোথায় কি করছিস? আর কী পরীক্ষা দিয়েছিলি?
আমি কিছু বললাম না। ও বললো, সার্টিফিকেট না থাকলে কিছুই করা যায় না। আমি বললাম, আমি না হয় সেই কাজ করবো, যে কাজে সার্টিফিকেটের প্রয়োজন হয় না। আমরা যদি সবাই রাজা বাদশা হই, তাহলে প্রজা হবে কে? আতিয়ার অবশ্য সেই ছোট বেলা থেকেই আমার ভালো চায়। কিন্তু চাইলেই কি সব হয়?
বাড়ির সীমানার ওপাশে সারি সারি দু’তিনটি টিনের ঘর। তার একটিতে থাকেন এক প্রফেসর। ম্যাথমেটিক্স পড়ান। এখনো বিয়ে করেননি। খুব রসিক মানুষ। প্রায়ই সন্ধ্যায় বকুল গাছের নিচে আমাদের সাথে চা-চক্রে যোগ দেন। তার ঘরের সামনে দিয়েই আমি বাজারে আসা যাওয়া করি।
একদিন বাজারে যাওয়ার পথে প্রফেসর আমাকে ডেকে বললেন, সালু ভাই বাসার খবর কী।
ভালো।
রোজার মাস এলেই স্যারের কেনাকাটা বেড়ে যায়। ছুটির দিনে স্যারও বাজারে যান। তখন মুরগির সাথে গরুর মাংসও চলতে থাকে। তা ছাড়া বড় মাছের প্রতি স্যারের দুর্বলতা সব সময়ই। মাছ পছন্দ হলে, দাম নিয়ে স্যার কখনো কথা খরচ করেন না।
বাজারে অনেক বন্ধুর সাথেই স্যারের দেখা হয়ে যায়। বন্ধুরা বলেন, মহব্বত সাহেব কী কিনলেন?
কী আর কিনবোরে ভাই, দেশে কিছু আছে নাকি? এই রমজানেই তো একটু ভালো মন্দ খাই। কিন্তু বাজারে এসে যা কিনতে চাই তা তো আর পাই না।
আপনার সাথে কার তুলনা। দু’জনেই মোটা অংকের চাকরি করেন। তার ওপর পাঁচ ছ’টা ঘর ভাড়া।
কী যে বলেন, এই মহব্বতজানের মতো গরিব মানুষ ঢাকা শহরে আর আছে নাকি? তা ভাই এই রমজানে গরিবের বাড়িতে একদিন পদধূলি দিলে বড় ধন্য হবো।
রমজান মাস শুরু হলেই স্যার আমাকে বলে রাখেন, সারাদিনে যতো ভিক্ষুক আসবে তাদের সবাইকে আমার এখানে ইফতারি করার কথা বলে দেবেন। আমি বলে দেই। আর বিকালেই ভাবীর কাছে জানায়ে দেই ক’জন ভিক্ষুক আসবে বলে কথা দিয়েছে। ইফতারির আগ দিয়েই বকুলতলায় ভিড় জমে ওঠে ভিক্ষুকদের। টিভিতে কেরাত পড়তে থাকে, আর এদিকে আমি সবার সামনে ইফতারি দিয়ে আমিও বসে যাই ভিতরে।
পরদিন স্যার অফিস থেকে ফেরার সময় রিক্সায় তুলে নিয়ে এলেন এক ফকিরকে। ফকিরের মাথায় বাবরি, হাতে তাসবিহ এবং কাঁধে লম্বা এক ঝোলা। স্যার এসেই ভাবীকে বললেন, নয়নের মা, এই হুজুর ইফতারির পর ভাত খেয়ে যাবে। সাহ্রির খাবারও নিয়ে যাবে। ভাবী বললেন, চাচা আপনি থাকেন কোথায়? ফকির বললো, ফকিরের কি থাকার জাগার অভাবরে মা। যার কিছু নেই- আল্লাহর দুনিয়াটাই তো তার।
আপনার আর কে কে আছে?
এক আল্লাহ আর আপনারা দশজন।
স্যার উদাস হওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, কার মধ্যে যে কী আছে নয়নের মা, সে কথা- আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।
রমজানের একটি মাস স্যার চলতে ফিরতে ফকির দেখলেই লম্বা পাঞ্জাবির পকেট থেকে পয়সা তুলে ভক্তি সহকারে ফকিরের হাতে দেন। অনেককে দেখেছি রিক্সা, গাড়ি অথবা পথ চলতে পয়সা ছুঁড়ে দেন ফকিরের দিকে। স্যার কখনো তা করতেন না। সে যাই হোক, বাসায় ভাবীই একমাত্র রোজাদার ব্যক্তি। আমি গ্যাপ দিয়ে দিয়ে শেষটা আর ছাড়ি না। নয়ন দু’একটা রেখেই আনন্দে কাটায় সারা মাস। স্যারকে কখনো রোজা থাকতে দেখিনি। ঈদের নামাজ পড়তেন কি না সে কথাও এখন আর মনে নেই।
স্যারের সান্নিধ্যে অবস্থানকালে এক অবিশ্বাস্য ঘটনার কথা কখনো ভোলার নয়। সেদিন রাত আটটার পরও স্যার বাসায় ফেরেননি বলে আমরা সবাই চিন্তিত। কেননা, তিনি কাউকে কিছু না বলে সন্ধ্যার পর কোথাও থাকেন না। এই আসছে আসছে করে ভাবী কোথাও ফোনও করলেন না। আমি ঘরে বসে বই পড়ছি। এমন সময় স্যার এলেন। স্যারের কথা শুনে বুঝলাম সঙ্গে আরো লোক আছে।
স্যার ভিতরে এসে ভাবীকে বললেন, নয়নের মা, দু’জন মেহমান এসেছে। ভাবী জিজ্ঞেস করলেন, এরা কারা? রাতে থাকবে?
হ্যাঁ। এদের মধ্যে একজন ইমাম মাহ্দী। এই লোক নিজেকে ইমাম মাহ্দী বলে দাবি করছে। আর একজন তার শিষ্য।
আমি তো কথা শুনে অবাক। তাহলে কি পৃথিবী ধ্বংসের আর বেশি দেরি নেই। জীবন তাহলে ধন্য হলো। ইমাম মাহ্দীকে নিজের চোখে দেখবো, তিনি এই বাড়িতে আমার ঘরেই থাকবেন।
বাইরে থেকে ওযু করে সাতাশ আটাশ বছরের এক সুন্দর যুবক তার ভক্তের ঘাড়ের ওপর হাত রেখে ধীরে ধীরে খাটের ওপর এসে বসলেন। যুবকটি বেশ লম্বা এবং শরীরের রং খুবই চমৎকার। শিষ্যের বয়স মনে হলো একটু বেশি। রং কালো। দু’জনের মুখেই দাড়ি। কারো মাথায় টুপি নেই। পরনে লুঙ্গি গায়ে পাঞ্জাবি।
খাটে বসার পর শিষ্য তার নিজের দাড়ি দিয়ে ইমাম মাহ্দীর ভেজা পা মুছে দিলেন। এই দৃশ্য দেখেই আমার উৎসাহ এবং বিশেষ স্বপ্নের বারোটা বেজে গেলো। এরা নামাজ পড়েছিলেন কি না সে কথা আর এখন স্মরণ নেই।
এদিকে স্যার কাগজ কলম নিয়ে খসখস করে লিখে যাচ্ছেন তাদের বিভিন্ন তথ্য। লোকটি কিসের ভিত্তিতে এতো বড় দাবি করছেন এবং তিনি যদি সমাজের সাথে ধোঁকাবাজি বা জালিয়াতির প্রশ্রয় নিয়ে থাকেন, তাহলে তার পরিণতি কত কঠোর হতে পারে এমন সব মন্তব্য করলেন স্যার।
ইমাম মাহ্দী পৃথিবীতে আসবেন এ সম্পর্কে বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থ থেকে জানা যায়, কিয়ামতের পূর্বে মানুষের মধ্যে মৌলিক শিক্ষা, মনুষ্যত্ব এবং সত্য ও সুন্দরের আলোকময় পথগুলো ক্রমেই অন্ধকারে ছেয়ে যাবে। ব্যভিচার মদ্যপান বেড়ে যাবে। একজন পুরুষের পঞ্চাশ জন নারীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন হবে। কেননা, তখন পুরুষের সংখ্যা একেবারেই কমে যাবে।
মিথ্যাচার বেড়ে যাবে। অযোগ্য লোকের হাতে চলে যাবে দেশের শাসনভার। প্রবাহিত নদ-নদীর গতিধারার পরিবর্তন ঘটবে। ফোরাত নদীর পানি শুকিয়ে যাবে। তলদেশে জেগে উঠবে স্বর্ণের পাহাড়। সেই স্বর্ণ লুটপাট করতে যাবে লক্ষ লক্ষ মানুষ। তখন মারামারি কাটাকাটিতে নিরানব্বই জনই মারা যাবে।
হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের প্রথম আলামত এই যে, ভূমি থেকে এমন এক আগুন বের হবে, যা মানুষকে তাড়া করে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে নিয়ে জড়ো করবে। আল্লাহর নবী আরো বলেছেন, যতক্ষণ একটি বছর একটি মাসের সমান না হবে, ততক্ষণ কিয়ামত কায়েম হবে না।
একজন খলিফার মৃত্যুর সময় একজন নতুন খলিফা নির্বাচন নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেবে। তখন মদীনা থেকে এক ব্যক্তি মক্কার দিকে ছুটে পালাতে থাকবে। তখন মক্কাবাসীরা তাকে ধরে আনবে। তার কর্ম এবং চেহারায় নূরানী জ্যোতি আর উন্নত নাক দেখেই লোকেরা চিনতে পারবে ইনিই ইমাম মাহ্দী।
তারপর দাজ্জাল আসবে। আকাশ থেকে আসবেন হযরত ঈসা (আ.) এবং ঈসা (আ.) এর হাতেই খতম হবে দাজ্জাল। তারপর একদিন পৃথিবীর মানুষ সিঙ্গার ফুঁ শুনতে পাবে এবং পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে।
হিসাব করে দেখা গেলো- এই লোকটা ভণ্ড ছাড়া কিছু নয়। পরদিন সন্ধ্যায় স্যার তাদের তাড়িয়ে দিলেন বাড়ি থেকে। তারপর বেশ কিছুদিন ধরে এ বিষয় নিয়ে স্যার তার বন্ধুদের সাথে মুখরোচক গল্পে কাটালেন বুকলতলা বসে।
আমার অবস্থানকালে স্যারের ঘটনার যেমন শেষ নেই, তেমনি আমার দেখার শেষ ছিল না।
একদিন অপরিচিত মেয়ে এলো বাসায়। আমি তাকে দেখলাম।
সারা দিন গল্প হাসাহাসি এবং খাওয়া দাওয়ার পর ঘনিয়ে এলো তার বিদায়ের ক্ষণ। আমি বকুলতলা বসে আছি, যাবার বেলা আর একবার তাকে দেখবো বলে। স্যার মেয়েটির হাতে আসা-যাওয়া বাবদ কিছু টাকা দিতে গেলেন। কিন্তু মেয়েটি কিছুতেই নেবে না। শেষে ভাবী বললেন, আরে বুবু নাওনা। অতো আদর করে যখন দিচ্ছে, তখন আর না করো না। এতো আদর করে সে তো আমাকেও কিছু দেয় না।
শুধু তাই নয়। স্যার আরো বললেন, একা যেতে পারবে তো? দরকার হলে সালু ভাইকে বলি বাসে তুলে দিয়ে আসবে। আমি মনে মনে ভাবলাম এ কথাটা স্যার অন্যায় বলেননি। বাস পর্যন্ত এগিয়ে দিলে তো আর চিন্তা থাকে না। যে দিনকাল পড়েছে। মেয়েটি বললো না-না কোনো অসুবিধা হবে না। এই তো রিক্সা করে গিয়ে বাসে উঠলেই পৌঁছে যাবো।
এই মেয়েটি তিন চার মাসের মধ্যে আরো তিনবার এসেছে। শেষ বার আমি তার চোখে মুখে কষ্টের এলোমেলো ছায়া দেখে চমকে উঠলাম। চোখে তার শ্রাবণের ধারা। স্যারের কণ্ঠে অন্যরকম সুর। ভাবীর মুখে সান্ত¡নার বাণী। মেয়েটি কিছুতেই যেতে চাইছে না। আমি বুঝতে পারলাম, মেয়েটিকে খালি হাতে পাঠানো হচ্ছে তার সংসার নামে ক্ষুধার্থ বাঘের গুহায়। অথচ সে চাইছে তার গচ্ছিত অস্ত্রটা।
শেষে চোখের পানি মুছে নিজের ভাগ্যটাকেই দোষারোপ করতে করতে ঘর থেকে বকুলতলা এসে দাঁড়ালো। এ যেনো তার শেষ বিদায়। দু’দিনের বড় প্রিয় আর বড় আপন ভাবা এই বাড়ি, বাড়ির মানুষগুলো কেমন করে পর হয়ে গেলো। এমন সব ভাবনাই বুঝি তাকে বিমর্ষ করে তুলছিলো।
অবস্থা বুঝে ভাবী আমাকে বললেন, সালু ভাই আপনি একটু যান তো ওর সাথে। প্রয়োজন মনে হলে বাড়ি পর্যন্ত দিয়ে আসবেন। আমি তখনই তৈরি হয়ে তার সঙ্গী হলাম। রিক্সা করে যেতে যেতে মেয়েটি একটু স্বাভাবিক হয়ে বলেলো, সালু ভাই, এই মহব্বত ভাই যে আমার এতো বড় ক্ষতি করবে তা আমি কল্পনাও করতে পারি নাই।
তার কথার কোনো উত্তর করলাম না আমি।
মেয়েটি আবার বললো, আপনার কথা আমি শুনেছি। কিন্তু মুখোশ পরা ঐ ভণ্ড লোকটার কাছে আপনি কেনো পড়ে আছেন?
আমি বললাম, আমি বাড়ি থেকে দেশান্তরি হয়ে আসার পর স্যার আমাকে ঠাঁই দিয়েছেন। তাই এখানেই পড়ে আছি। এখন ইচ্ছে করলেও কোথাও যেতে পারি না।
কেনো পারেন না?
আমার তো কোনো টাকা পয়সা নেই।
জানেন এই লোকটা আমার কি ক্ষতি করেছে!
না।
তাহলে শুনুন। ঘটনাটা আপনাকে বলা দরকার। একদিন রাসমনিতে আমার এক খালাকে দেখতে আসি আমি। যে রুমটাতে আমার খালা ছিলো, সেখানে ঐ মহব্বতজানের পরিচিত একজন রোগীও ছিলো। ঐ দিন বুবুরা দু’জনে উপস্থিত ছিলো সেখানে। বুবু আমাকে দেখে হাত ইশারায় কাছে ডাকলো। আমি কাছে আসতেই বুবু আমার হাত ধরে বললো, বুবু তোমার নাম কী? আমি আমার নাম বললাম।
কি নাম বললেন? আমি প্রশ্ন করলাম।
মেয়েটি কিছু না বলে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। আমি বললাম স্যরি। সে বললো, নাম শুনে আপনি কি করবেন?
তেমন কিছু না। আপনাকে মনে রাখার জন্য।
আমাকে মনে রেখে আর কি হবে, তবু বলছি, আমার নাম মনি। আমার বিয়ে হয়ে গেছে। আমার একটি ছেলে আছে। এবার ক্লাস টুতে পড়ছে।
খুব ভালো। এবার আপনার কাহিনী বলুন।
বুবু তার স্বামীকে বললো, দেখো তো মনিকে আমার বোনের মতো মনে হয় কি না। মহব্বজান বললো, সব ওপরওয়ালার ইচ্ছা। তার খেলা কি কেউ বুঝতে পারে। তোমার বোন ছিলো না, এবার বোন হলো। আর আমার এক ঘর আত্মীয় বাড়লো।
লোকটার কথাবার্তা আর ব্যবহারে আমার মন গলে গেলো। মনে মনে ভাবলাম, খালাকে দেখতে না এলে এমন ভালো মানুষের দেখা পেতাম না। তখনই মহব্বতজান আমাকে তার বাসায় নিয়ে আসবে। আমি বললাম, তা কি করে হয়। সে বললো, পরিচয় বাসি হলে তোমাকে কি আর ধরতে পারবো। তারপর দু’জনই এলো আমার খালাকে দেখতে। এমন ভাব যে, আমার জন্মের আগ থেকেই তারা আমার খালাকে চেনে। খালাও খুব খুশি।
আমি অন্য একদিন বুবুর বাসায় যাবো বলে কথা দিলাম। তারপর বুবু তার বাসার ঠিকানা দিয়ে আমার জয়দেবপুরের বাসার ঠিকানা নিলো। আমি ওখানে এক এনজিও স্কুলে শিক্ষকতা করি। আমার স্বামী প্রাইমারি স্কুলে। খুব যে টাকা পয়সা তা নয়। বাসাভাড়া দিয়ে কোনো রকম দিন যায়।
এক ছুটির দিনে বুবুসহ মহব্বতজান আমার বাসায় গিয়ে হাজির। হাতে মিষ্টির প্যাকেট। আমার স্বামী বললো, ইনাদের তো চিনলাম না। শেষে আমি পরিচয় করিয়ে দিলাম। বললাম, খালাকে দেখতে গিয়ে রাসমনিতে পরিচয়। বুবু আমাকে ছোট বোন বলে ডেকেছে।
শুনে আমার সাহেবতো ব্যস্ত হয়ে উঠলো। একে তো ঢাকার মানুষ, তার ওপর নতুন আত্মীয়তা। কিন্তু মহব্বতজানের ব্যবহারে সে যেনো বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো। ঢাকায় দশ কাঠার ওপর নিজের বাড়ি। একি চাট্টিখানি কথা?
বুবু আমার রান্নাঘরে ঢুকে নিজেই রান্না করতে লেগে গেলো। আমার সাহেব হায় হায় করে উঠলো। কিন্তু তাতে কাজ হলো না। শেষে ডাল ভাজি ভর্তা দিয়ে ভাত খেয়ে তারা চলে এলো। বলে এলো বাসায় যাওয়ার জন্য।
কিছুদিন পর আমি একাই একদিন এলাম। আমি বাস থেকে নেমে এক রিক্সাওয়ালাকে ঠিকানা বলতেই সে বললো, মহব্ব স্যারের বাড়ি যাবেন?
হ্যাঁ, তুমি চেনো তাকে?
কেনো চিনবো না। উনার মতো মানুষ হয় না। উঠুন পৌঁছে দেই।
তারপর এই মহব্বতজান হঠাৎ একদিন দুপুরে একা আমার বাসায় গিয়ে হাজির। বড় মন মরা হয়ে বললো, বুবু লজ্জার কথা কাকেই বা বলবো। তোমাকে বড় আপন মনে করেই ছুটে এসেছি।
তার অবস্থা দেখে আমার ভীষণ খারাপ লাগতে লাগলো। আমি বললাম, দুলা ভাই, কি হয়েছে সব খুলে বলুন তো।
সে বললো, বুবু, কি আর বলবো, কিছু টাকার বড় প্রয়োজন পড়ে গেলো। এই পনেরোটা দিন পরই আমি নিজে এসে দিয়ে যাবো। এ কথা কাউকে বলার প্রয়োজন নাই। তোমার বুবু শুনলে আমার ওপর ভীষণ বকাবাদ্য করবে।
কত টাকা?
তুমি কত দিতে পারো?
আমি অনেক কষ্টে তিল তিল করে পঁচিশ হাজার টাকা জমা করেছি। ভেবেছি এই টাকাটা ছেলের ভবিষ্যতের জন্য ব্যাংকে রেখে দেবো। আমার সাহেবও কি একটি কাজের জন্য চেয়েছিলো। আমি দেইনি। মহব্বতজান বললো, অবশ্যই রাখবে। তবে এই ফাঁকে আমারো একটু উপকার হোক।
তখন আমার যে কী হলো, একটা ঘোরের মধ্যে পড়ে আলমারি খুলে পনেরো হাজার টাকা তার হাতে দিলাম। বললাম, দুলা ভাই আমার সাহেবের অজান্তেই টাকাটা আমি আপনাকে দিলাম। আপনি কিন্তু পনেরো দিন পরই টাকাটা ফেরত দিবেন।
এর মধ্যেই আমরা বাসে বসে বসে কথা বলতে বলতে জিয়া বিমানবন্দর পার হয়ে গেছি। আমি বললাম, আর কিছু না বললেও চলবে। এবার বলুন আমি কি নেমে যাবো, না থাকবো।
আপনাকে আর কষ্ট করতে হবে না ভাই। আমি বুঝে নিয়েছি ঐ টাকা আমি আর কোনো দিন পাবো না। আমার যা হয় হবে। আমি আর ওদের মুখোমুখি হবো না। ঘৃণায় আমার গলা বেয়ে বমি আসে। তবে ভাই আপনার কথা আমার মনে থাকবে।
বলতে বলতে আঁচলে চোখ মুছলো মেয়েটি। আমি বাস থেকে নেমে অন্য বাসের অপেক্ষায় দাঁড়ালাম।
এসব কারণেই কয়েকদিন ধরেই মন মরা হয়ে আছি। ভাবী বললেন, মন খারাপ কেনো, দেশের কথা মনে পড়ছে? সামনে ঈদ আসছে, দেশ থেকে একবার ঘুরে আসুন না। আমি কিছুই বললাম না। স্যার বললেন, নয়নের মা ঈদ বড় লোকদের জন্য। বড় বড় গরু বড় বড় খাসি কোরবানি দিয়ে তারা বাহ্বা নেয়। কিন্তু কোনো শালার বেটার দেখলাম না- গরিবের পাতে দু’মুঠো ভাত দিতে।
বাড়ি যাওয়ার প্রতি আমারো তেমন বাসনা জাগে না। তবু ছেলে বেলার বাঁধন হারা স্মৃতিগুলো কেবলই মনের মধ্যে কৈ মাছের মতো পাট-পুট করে।
তখন আমার কতই বা বয়স। ক্লাস টু কিংবা থ্রিতে পড়ি। নানা বাড়ির আম-বাগানের শেষ দিকে একটা জাম গাছ ছিলো। সেই জাম গাছে উঠে চিকন ডাল টেনে এনে থোকা থেকে বড় বড় কালো জাম তুলে খাচ্ছি। তখন ভর দুপুর। ও পাশে হলদির ক্ষেত। তারপর একটা ছোনের জমি। সেই ছোনের জমির মধ্যে ছোট্ট একটা পুকুর। পুকুরের পঞ্চাশ গজ দূরেই একটি বাড়ি। সেই বাড়ির গোল্লা মার্কা একটি মেয়ে কখন যে জাম তলা এসে দাঁড়িয়েছে তা আমি জানিও না।
হঠাৎ কানে এলো-সালু একটা ঝাঁকি দে না। মেয়েটির নাম ফুটফুটি। আমি বললাম, ঝাঁকি দিলে সব পাকা জাম পড়ে ভত্তা হয়ে যাবে। তার চেয়ে তুই আঁচল পাত আমি থোকা ধরে ফেলে দেই।
এক সময় কিছু জাম শার্ট আর প্যান্টের পকেটে করে নিচে নেমে এলাম। ফুটফুটি বললো, কাউকে যদি না বলিস তাহলে একটা জিনিস দেখাবো তোকে।
কী জিনিস রে?
কোয়েল পাখির বাসা। বাসায় অনেক ডিম।
আমি নেচে খাড়ালাম। ঠিক আছে চল।
ছোনের ক্ষেতে বিলি কেটে সেই বাসার কাছে পৌঁছেই দু’জন গলা ফাটিয়ে চিৎকার শুরু করলাম। সাপ সাপ। দেখি মস্ত বড় একটা গোখরা সাপ মনের সুখে কোয়েল পাখির ডিম খাচ্ছে। আমাদের চিৎকার শুনে দুই বাড়ি থেকেই ছুটে এলো লোকজন।
আমার এক মামা বললো, কোথায় সাপ?
ঐ ছোনের মধ্যে।
তোরা ওখানে গিছলি কেনো?
কোয়েলের ডিম দেখতে।
দাঁত কিড়মিড়িয়ে মামা বললো, কোয়েলের ডিম-তাই না, সাপে যদি কামড় দিতো তখন কী হতো?
এই বলেই আমার কান ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেলো বাড়িতে। তখন পাকা জামের মধুর রসে আমার শার্ট আর প্যান্টের বারোটা বেজে গেছে।
এতোদিন পর হঠাৎ এই ঘটনাটা কেনো আমার মনে পড়লো তা নিয়ে ভাবতে লাগলাম। এক সময় এমনই মনে হলো যে, মনি মেয়েটার জমানো টাকাগুলোই যেনো কোয়েলের ডিম। আর আমার স্যার মহব্বতজান হলো সেই সুন্দর নক্সা আঁকা অদ্ভুত এবং ভয়ঙ্কর গোখরা সাপ।
ক’দিন এমন হলো যে, কিছুই আর ভালো লাগে না। শেষে আতিয়ারের কথাগুলো মনে পড়লো। তখন জীবনের কথা ভাবতে গিয়ে মাথার মধ্যে এমন চক্কর দিলো যে, সে ভাবনা নিয়ে আর এগুতে পারলাম না। শেষে সব ভাবনা ঝেড়ে ফেলে সোজাপথ বেছে নিলাম। আমি ফকির হবো। পথে হাঁটবো, পথে ঘুমোবো আর পথেই খেয়ে নেবো। যার চাল চুলা নেই তার ভাবনা করে কাজ নেই।
একদিন চেনাজানা এক কাঠ মিস্ত্রির সাথে দেখা। তারও চাল-চুলা নেই, থাকার ঠিকানাও নেই। তো তাকে বললাম, দাদা আপনাকে দেখি এখানে সেখানে ঘুরে ঘুরে কাজ করে বেড়ান। একজন জোগালেরও তো প্রয়োজন হয়। আমি যদি আপনার জোগালের কাজ করি, তাহলে আমাকে কতো দেবেন? সে বললো, রোজ ত্রিশ টাকা। তয়, আপনার হাতে যে ফোসকা পড়ে যাবে।
তারপর লোকটা আর আমাকে ডাকতে এলো না। এর মধ্যেই কালিগঞ্জের লোকটা এসে হাজির। সালু ভাই আপনার স্যার বাসায় আছে?
জি। তবে একটা কথা। আমরা যে একই জায়গার মানুষ- এ কথা কিন্তু স্যারকে বলতে যাবেন না।
লোকটা তখন নিজের থেকেই গলা চড়ালো। মহব্বত সাহেব বাসায় আছেন?
স্যার সাড়া দিলেন না।
লোকটা আবার বললো, আমি গোলাম আলী। কাওরান বাজার থেকে আসছি। আজ আপনার টাকা দেয়ার কথা।
স্যার তখন ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। বললেন, কাওরান বাজারের গোলাম আলী? তাতে হয়েছে কী? আপনার টাকা পরিশোধ হয়নি?
গোলাম আলী তো অবাক!
একটু মেজাজেই সে বললো, আপনি টাকা দিলে তো শোধ হবে। কতবার বলছেন দোকানে টাকা দিয়ে আসবেন। কিন্তু দোকানে আপনি যাননি। বছর ধরে যদি আমার টাকা এভাবে পড়ে থাকে, তাহলে ব্যবসা করবো কিভাবে। আজ টাকা না নিয়ে আর যাচ্ছি না। রোজ রোজ অতোটা পথ পাড়ি দিয়ে আসতে, লাভের ধন তো পথেই খাইলো।
স্যার বললেন, দু’খানা চাটাই দিয়ে আপনি কি আমার মাথা কিনে নিয়েছেন? মহব্বতজানের টাকা বারো ভূতে খায়। টাকার গরম দেখাবেন না, যান, তিন তারিখে সালু ভাই টাকা দিয়ে আসবে।
এমন কথা তো কতবারই কইলেন।
মানুষের সুবিধা অসুবিধা থাকতেই তো পারে। আপনি এখন যান।
গোলাম আলী লোকটার লাল চোখ আরো লাল হয়ে উঠলো। হঠাৎ সে কোমর থেকে ডেগার বের করে টেরা চোখ আরো টেরা করে বললো, আজ আমি যাচ্ছি। কিন্তু তিন তারিখে টাকা না পেলে আপনাকে যেখানে পাবো সেখানেই ভুঁড়ি ফুটো করবো। এই আমার শেষ কথা।
[চলবে]

SHARE

Leave a Reply