Home বিজ্ঞান ও বিশ্ব প্রাণীকে পাথর করে দেয় যে হ্রদ – আল জাবির

প্রাণীকে পাথর করে দেয় যে হ্রদ – আল জাবির

রূপকথার গল্পে আছে স্পর্শের মাধ্যমে সোনা হয়ে যাওয়া। বাস্তবে এভাবে কোনো কিছু স্পর্শ করা মাত্রই সোনায় পরিণত হওয়া অসম্ভব হলেও পাথরে পরিণত হওয়ার কথা কিন্তু অসম্ভব নয়! বলছি তানজানিয়ার নেইত্রন হ্রদের কথা, যেখানে কোনো প্রাণী ও পাখি বসলে সাথে সাথে পাথরের মতো শক্ত বা পাথুরে মূর্তিতে পরিণত হয় বলে জানা হয়েছে।
পশ্চিম আফ্রিকার উত্তর তানজানিয়ায় দুটি লবণাক্ত ও সোডাসমৃদ্ধ হ্রদের খোঁজ পাওয়া গেছে। একটি হচ্ছে নেইত্রন হ্রদ এবং অপরটি হলো বাহি হ্রদ। দুটি হ্রদই রিফট উপত্যকার পশ্চিম পাশে কেনিয়ার সীমান্তে অবস্থিত। নেইত্রন হ্রদে প্রধানত সোডিয়াম কার্বোনেট ডেকাহাইড্রেট বা সোডা অ্যাশ এবং সোডিয়াম বাইকার্বোনেট বা খাবার সোডা পাওয়া যায়। নেইত্রন হ্রদের পানি প্রবাহিত হয় না। শুধুমাত্র বাষ্পীভবন প্রক্রিয়ায় পানির পরিমাণ কমে যায়। এই দুটি হ্রদের মধ্যে নেইত্রন হ্রদটিই বৃহৎ। এটি ৫৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত। অতিরিক্ত লবণাক্ততার জন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের জন্য এই হ্রদ মোটেও অনুকূল নয়। এই হ্রদের তাপমাত্রা ৬০° সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এর পানি অত্যন্ত ক্ষারীয়, যার পিএইচ এর মাত্রা ১০.৫! হ্রদটি দেখতে কমলা-লাল এবং গোলাপি বর্ণের। তবে শুষ্ক মৌসুমে তা নীল রংয়ের হয়। এই অদ্ভুত বর্ণ সেখানে থাকা ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য জীবকণা দিয়ে তৈরি হয়েছে। হ্রদটি দেখতে খুবই স্বচ্ছ, সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন।
নেইত্রন হ্রদের তীরে লক্ষ লক্ষ ফ্লেমিংগো পাখি প্রজননের উদ্দেশ্যে আসে। এখানেই বিশ্বের শতকরা ৭৫ ভাগ ফ্লেমিংগো পাখির জন্ম হয়। পাখিগুলো হ্রদের তীরে বাসা বাঁধে এবং লাল শৈবাল খেয়ে জীবন বাঁচায়। কিন্তু হ্রদের পানিতে পড়ে গেলে আর রক্ষা নেই! দুর্ভাগ্যক্রমে পড়ে গেলে পাথুরে চুনের মতো শক্ত হয়ে যায়। তথাপি নেইত্রন হ্রদকে পাখিদের নিরাপদ প্রজনন আবাস বলা হয়। কারণ সেখানকার বৈরী পরিবেশের জন্য অন্য কোনো শিকারি পশুপাখি খাবার সংগ্রহের জন্য যায় না। পর্যাপ্ত খাবার, শিকারি প্রাণী ও মানুষের উৎপাত না থাকায় ফ্লেমিংগো পাখির প্রজনন ও বাচ্চা উৎপাদনের নিরাপদ আশ্রয়স্থল এই নেইত্রন হ্রদ। এই হ্রদেই প্রতি বছর ২৫ লক্ষ ফ্লেমিংগো পাখির জন্ম হয়। গবেষকদের মতে, ফ্লেমিংগোর পায়ের ত্বক খুবই শক্ত হওয়ায় এই হ্রদের লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। তবে এই হ্রদের পানিতে মানুষও একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পা রাখলে মারা যেতে পারে! বিপজ্জনক হলেও এই হ্রদে এক জাতীয় তেলাপিয়া মাছের প্রজাতির খোঁজ পাওয়া যায়। যারা এই হ্রদে অভিযোজিত হয়েছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ থাকায় নেইত্রন হ্রদটি সম্পর্কে তেমন কোনো আলোচনা হয়নি। কিন্তু অদ্ভুত এ হ্রদটি ২০১৩ সালে আলোচনায় উঠে আসে, যখন ফটোগ্রাফার নিকব্রান্ডট হ্রদটির কিছু ভুতুড়ে দৃশ্যের ছবি প্রকাশ করেন। তিনি ছবিতে দেখান কিছু পাখি ও বাদুড় মূর্তির ন্যায় হয়ে গেছে। কিন্তু কেউই জানতেন না প্রাণীগুলো কিভাবে মারা গেছে। ব্রান্ডট ধারণা করেন, প্রাণীগুলো হয়তো হ্রদের পানিতে আলোক প্রতিফলনের কারণে ভুলক্রমে পড়ে যায় ও পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়। তবে কেউ কেউ মনে করেন, শুধুমাত্র প্রাকৃতিকভাবে মৃত প্রাণীই এই পানিতে পড়ে পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়। পাথরের মতো শক্ত হওয়াকে ক্যালসিফিকেশন বলে। ক্যালসিফিকেশন হচ্ছে শরীরের কোথাও ক্যালসিয়াম জমা হওয়া। আমাদের শক্ত দাঁত, হাড় ইত্যাদি হচ্ছে এই ক্যালসিফিকেশনেরই ফল।
ব্রান্ডট দেখেন, তার কোডাক ছবির বাক্সের কালিও সেখানকার অতিরিক্ত সোডা ও লবণের কারণে নষ্ট হয়ে যায়। তার মতে, প্রাণীগুলোতে ক্যালসিফিকেশন ঘটে ও শুকিয়ে পাথুরে মূর্তির মতো হয়।
নেইত্রন হ্রদে প্রাপ্ত ছবিগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়ে ব্রান্ডট ‘Across the Ravaged Land’ নামের একটি বই প্রকাশ করেন। ব্রান্ডট অপ্রত্যাশিতভাবে নেইত্রন হ্রদে একটি ফিস ঈগল খুঁজে পান যেটি পানিতে মূর্তির মতো পড়ে ছিল। সেটি শক্ত হয়ে যায়। প্রাকৃতিকভাবে অনেকটা মিসরের মমি তৈরির মতো ঘটনা ঘটে। অতিরিক্ত সোডা ও লবণের কারণে শক্ত হয়ে যাওয়া পাখিটিকে তুলে একটি শুকনো ডালের ওপর বসিয়ে দেন তিনি। তারপর মৃত্যুর পূর্বে যে অবস্থায় বসে থাকার কথা, সেই অবস্থায় ছবি তুলে নেন। ব্রান্ডট কিন্তু কোনো প্রাণীকে পানিতে পড়ার পর মারা যেতে দেখেননি। তাই অনেকেই পানি স্পর্শ করলেই শক্ত পাথর হয় কিংবা মৃত্যু ঘটে- এই কথাকে বিশ্বাস করতে চান না।
ব্রান্ডট একটি বাদুড়েরও ছবি তোলেন। বাদুড়টি পানির অতিরিক্ত তাপমাত্রা, উচ্চমাত্রা রক্ষার ও ক্যালসিয়ামের উপস্থিতির কারণে শক্ত হয়েছে বলে জানান। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলের তথ্যমতে, বাদুড়সহ অন্যান্য প্রাণী প্রাকৃতিকভাবেই মারা যায়। পরে অতিরিক্ত লবণ সেগুলোকে জমাট বাঁধিয়ে ফেলে। জিয়ামি বাটলারের মতে, নেইত্রন হ্রদের পানিতেও জীবিত প্রাণীকে স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করতে দেখা যায়। ২০১০ সালে ব্রান্ডট নেইত্রন হ্রদ থেকে একটি মূর্তির মতো ভাসমান ফ্লেমিংগো পাখির ছবি তোলেন। ঈগল, বাদুড়ের মতো একই কারণে ফ্লেমিংগোটিও শক্ত মূর্তির মতো রূপ ধারণ করেছিল।
এ ছাড়া গায়ক পাখি, সোয়ালো পাখি, ঘুঘুসহ আরও অনেক প্রাণীকেই পাথরের রূপে দেখা গেছে। আজকাল যাযাবর লোকদের এই নেইত্রন হ্রদের তীরে গরু চরাতে দেখা যায়। কিন্তু কাউকে সেখানে বসবাস করতে দেখা যায় না। বর্তমানে হ্রদের পানি অনেকটাই বিষাক্ত ও পানের অযোগ্য হলেও প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার বছর পূর্বে হ্রদে প্রচুর বিশুদ্ধ পানি ছিল। ১৯৫৯ সালে Australopithecus boisei নামক মানবজাতির ১.৭৫ মিলিয়ন বছরের পুরনো চোয়াল ও দাঁতের সন্ধান পাওয়া যায় সেখানে। কিন্তু সেই চোয়াল ও দাঁতে ব্রান্ডটের তোলা ছবির মতো ক্যালসিয়াম জমাট বাঁধা ছিল না।
ব্রান্ডটের তোলা ছবির প্রাণীগুলো মারা যাওয়ার পর পানিতে পড়ে পাথুরে মূর্তির রূপ ধারণ করেছে, নাকি পানি স্পর্শ করার কারণে মৃত্যু হয়েছে এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। তারপরেও সকলেই একমত যে, নেইত্রন হ্রদে কোনো মৃত প্রাণী পড়ে থাকলে তা মমির মতো শক্ত হয়ে যায়।

SHARE

Leave a Reply