Home প্রচ্ছদ রচনা স্বাধীনতার স্বপ্ন স্বপ্নের স্বাধীনতা – ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

স্বাধীনতার স্বপ্ন স্বপ্নের স্বাধীনতা – ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

পাখিটা উড়ছিলো। ডাল থেকে ডালে। গাছ থেকে গাছে। এ পাড়া থেকে ও পাড়া। এ গ্রাম থেকে ও গ্রাম। বন থেকে মাঠে। মাঠ থেকে বিলে। বিল থেকে নদীর বাঁক মোহনায়। দেখতেও যেমন, ওর চঞ্চলা স্বভাবটা আরো বেশি আকর্ষণীয়। মাঝে মাঝে গান গায় কিচিরমিচির করে। একা কোথাও গেলে আবার ফুড়ুৎ করে উড়ে এসে বসে আরেকটা পাখির কাছে। কখনো কখনো ঝাঁক বাঁধে। এক সাথে গানের সুরে কোরাস তোলে। কেউ সুরে, কেউ বা বেসুরে। তখন শুধু কিচিরমিচির শব্দই বুঝা যায়। মা পাখিটা ভোর বেলাতেই বেরিয়ে পড়ে বাচ্চাদের খাবার আনতে।
হঠাৎ শিকারির হাতে ধরা পড়লো মা পাখিটা। ছোট পাখিটাও আটকা পড়লো। তারপর থেকে আলাদা খাঁচায় বন্দি হলো ওরা। কান্নার আওয়াজ শুধু কিচিরমিচির মনে হয় মানুষের কাছে। কেউ কেউ মনে করে ওটা বোধ হয় পাখির গান। কিন্তু আসলে কি গান? হ্যাঁ, গানও হতে পারে। তবে তা সুখের নয়। শোকগাঁথা। পাখিটা স্বাধীন থাকতে চায়। বনে বাদারে উড়ে উড়ে ঘুরে ফিরে মনের সুখে গান গাইতে চায়।
মানুষ কথা বলতে পারে। মনের ভাব প্রকাশের ক্ষমতাও অনেক বেশি। বিবেক দিয়ে পরিচালিত হবার ক্ষমতা মানুষকে দেয়া হয়েছে। তাইতো মানুষ আরো বেশি স্বাধীনচেতা। আরো বেশি সংবেদনশীল বা সেনসেটিভ। একটুতেই রেগে যায়। একটুতেই চোখের পানি ফেলে। মানহানি সহ্য করতে পারে না। অধিকারের বিষয়ে দারুণ সচেতন। নিজের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং সংরক্ষণে ব্যস্ত থাকে তারা।
বাংলাদেশ আমাদের প্রিয় জন্মভূমি। বংশপরম্পরায় আমরা এখানকার সন্তান। আমার আব্বা-মাকে যেমন ভালোবাসি তার চেয়েও বেশি ভালোবাসি আমাদের দেশকে। এমনকি জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। কেননা দেশ ভালো থাকলে আমরা ভালো থাকবো। দেশ স্বাধীন থাকলে আমাদের স্বাধীন থাকার সুযোগ থাকে। তাইতো দেশের জন্য আমরা লড়াই করি। দেশের জন্য আমরা জীবন পর্যন্ত বিলিয়ে দিয়ে থাকি।
ইশা খাঁর নাম আমরা জানি। তিনি গর্জে উঠেছিলেন দেশের জন্য, স্বাধীনতার জন্য। বারো ভূঁইয়াদের নাম আমরা শুনেছি। তাঁদের মধ্যে ইশা খাঁর নাম অন্যতম। বারো ভূঁইয়াদের আন্দোলন ছিলো স্বাধীনতার জন্য। স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক বাঁশের কেল্লা। ব্রিটিশের জুলুম নির্যাতনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন তিতুমীর। তিতুমীর মানে মীর নেসার আলী তিতুতীর। ব্রিটিশের কালো থাবা থেকে দেশকে স্বাধীন করার জন্য তিনি মুক্তিযোদ্ধা বাহিনী গঠন করেছিলেন। সেনাপতি মাসুম খাঁসহ তিতুমীরের বাহিনী ব্রিটিশের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। শহীদ হয়ে প্রমাণ করেছেন স্বাধীনতার জন্য জীবন বিলিয়ে দেয়ার মধ্যেই সার্থকতা। হাজী শরীয়তুল্লাহর ফরায়েজি আন্দোলন, বালাকোটের জিহাদ আন্দোলন পরাধীনতার শৃংখল ভাঙার স্বপ্ন বুনে দিয়েছে।
আমরা স্বাধীন হয়েছিলাম ব্রিটিশের কবল থেকে। স্যার সৈয়দ আহমদ খান, নবাব মহসিন উলমূলক, নবাব ভিকার উলমূলক, নবাব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমির আলী, হাজী মুহম্মদ মুহসীন, মন্নুজান প্রমুখ ত্যাগী মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টায় স্বাধীনতার আলো ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ বাংলার অনেক বিখ্যাত মানুষ ব্রিটিশের হাত থেকে বাংলাকে স্বাধীন করেন।

স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক বাঁশের কেল্লা

সালটা ছিলো ১৯৪৭। দেশের নাম হয় পাকিস্তান। স্বাধীনতার আলো ফুটতে না ফুটতেই কুয়াশায় ঢেকে যায় পূর্ববাংলার আকাশ। আমরা গর্জে উঠি আবারো। গর্জে উঠি বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে। প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কবি ফররুখ আহমদসহ বুদ্ধিজীবী শ্রেণী এ দাবিকে যৌক্তিক হিসেবে উপস্থাপন করেন। অবশেষে এলো ১৯৫২ সাল। এ দাবিতে কারফিউ ভেঙে রাস্তায় নেমে আসে তরুণ, যুবকসহ বাংলার সাধারণ মানুষ। পাকিস্তানি পুলিশের গুলিতে রক্তাক্ত হয় রাজপথ। শহীদ সালাম, বরকত, জব্বার, শফিউর প্রমুখের রক্তে রঞ্জিত হয়ে হেসে ওঠে বাংলাভাষা। ভাষা আন্দোলন শিখিয়ে দেয় নতুন করে অধিকার আদায়ের কর্মসূচি। আমরা আর বসে থাকিনি। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালে গণআন্দোলন এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ের মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীনতার জন্য উন্মুখ হয়ে পড়ি।
আন্দোলন আর আন্দোলন। মিছিল আর মিছিল। সংগ্রামে উত্তাল স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। হাট-বাজার, রাস্তা-ঘাট সবখানে আন্দোলন আর মিছিল-শ্লোগান। শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন। আন্দোলন হচ্ছে জুলুম, নির্যাতন এবং বঞ্চনার বিরুদ্ধে। অবশেষে ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দান থেকে ভেসে এলো যাদুকরী ভাষণ। দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
আন্দোলন-সংগ্রাম রূপ নেয় দ্রোহ এবং মুক্তিসংগ্রামের। উড়িয়ে দেওয়া হয় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এবং আইনশৃংখলা বাহিনী আরো উগ্র হয়ে ওঠে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আগ্রাসী চরিত্র আমাদের দ্রোহকে দাবানলে রূপান্তরিত করে। পঁচিশের কালরাতে তারা নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায় নিরীহ বাঙালির ওপর। আমরা আরো বেশি উত্তেজিত হয়ে উঠি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা ভেসে আসে। শুরু হলো স্বাধীনতা আন্দোলনের নিয়মতান্ত্রিক পথচলা। এ শ্লোগান আর থামেনি। সামনে এগিয়ে গেছে নির্ভয়ে। কোন বাধা বিঘ্ন পরিবেশ একে থামাতে পারেনি। পারেনি দমিয়ে রাখতে। সবশেষে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হলো বিজয়; হাতের মুঠোয় ধরা দিলো আমাদের স্বপ্নের স্বাধীনতা।
বিজয়ের উল্লাসে আমরা ভুলে গেছি রক্তের দাগ। লক্ষ মায়ের সম্ভ্রম হারানোর বেদনা এবং চোখের জলের পাশে খেলা করেছে বিজয়ের উচ্ছ্বাস। কষ্টের রাত কেটে গেলো। আর কোন মায়ের চোখে অশ্রু ঝরবে না। বঞ্চিত হবে না আর কোন অসহায় মানুষ। অধিকার আর আত্মসম্মান নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে দেশের সকল মানুষ। চিরতরে বিদায় নেবে ধর্ম, বর্ণ কিংবা রাজনৈতিক বিভেদের বৈষম্য। এ দেশ, দেশের মাটি ও মানুষ এবং মানুষের সংস্কৃতি হবে একান্তভাবে বাংলাদেশের। মুক্ত পাখির মতো উড়ে বেড়াবে চঞ্চলা কিশোর-কিশোরী। সম্ভ্রম হারানোর ভয় থাকবে না কোন মা-বোনের। শিক্ষা-সাহিত্য, শিল্প-সংস্কৃতিসহ প্রত্যেক ক্ষেত্রে তৈরি হবে স্বকীয় ধারা। অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে ঘরে ঘরে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বিদায় নেবে চিরতরে। এখানে আমরা, শুধুই আমরা। এ দেশ আমাদের। আমরা এ দেশের।

মীর নেসার আলী তিতুতীর

আজ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে। অথচ অধিকাংশ স্বপ্নই বিবর্ণ হয়ে রয়ে গেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের সৈনিকরাও বিভাজনের শিকার। অনেক স্বাধীনতাসংগ্রামীও নিপীড়নের শিকার। কল্পিত স্বপ্নগুলো বিবর্তিত হচ্ছে। বাংলাদেশের আকাশ, মাটি, শিল্প-সংস্কৃতি, শিক্ষা-সাহিত্য সবকিছুই পরনির্ভরশীল হয়ে আছে এখনও। এখনও সীমান্তে খুন হয় নিরীহ বাংলাদেশী। হত্যা, গুম, ভূমিদখল চলে আগের মতোই। তাহলে শহীদের রক্তের মর্যাদা কোথায়?
সত্যিকারভাবে স্বাধীনতার স্বাদ পেতে হলে আমাদের আরো বেশি আন্তরিক হতে হবে। নতুন প্রজন্মের সামনে আশার স্বপ্ন বুনিয়ে দিতে হবে। প্রত্যেকে স্ব স্ব জায়গা থেকে ঐক্যের মিছিলে শামিল হতে হবে। দু’খানা হাত আর স্বপ্নকে মিশিয়ে সুখী-সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করা এখন সময়ের দাবি।

SHARE

Leave a Reply