Home দেশ-মহাদেশ সমৃদ্ধ দেশ কাতার – মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

সমৃদ্ধ দেশ কাতার – মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

দোহার ইসলামি শিল্পকলা যাদুঘর

কাতার পারস্য উপসাগরের একটি দেশ। সরকারি নাম কাতার রাষ্ট্র, আরবিতে দৌলত কাতার। এটি আরব উপদ্বীপের পূর্ব উপকূল থেকে উত্তর দিকে প্রসারিত কাতার উপদ্বীপে অবস্থিত। কাতারের দক্ষিণে সৌদি আরব এবং পশ্চিমে দ্বীপরাষ্ট্র বাহরাইন। আরব উপদ্বীপের মতো কাতারও একটি উত্তপ্ত ও শুষ্ক মরু এলাকা। এখানে ভূ-পৃষ্ঠস্থ কোনো জলাশয় নেই এবং প্রাণী ও উদ্ভিদের সংখ্যাও যৎসামান্য। বেশির ভাগ লোক শহরে, বিশেষত রাজধানী দোহা শহরে বাস করে। দেশটিতে খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় মজুদ আছে। এই প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে এদেশের অর্থনীতি খুবই সমৃদ্ধ। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে আল-থানি গোত্রের লোকেরা কাতার অঞ্চলটিকে একটি আমিরাত হিসেবে শাসন করে আসছেন। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে দেশটি ব্রিটিশ শাসনের অধীনে আসে। ১৯৭১ সালে এটি পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে।

১৯৩৮ সালে নির্মিত জুবারাহ দুর্গ

কাতারের আয়তন ১১ হাজার ৫৮১ বর্গকিলোমিটার (৪ হাজার ৪৭১ বর্গমাইল)। মোট জনসংখ্যা ২৬ লাখ ৪১ হাজার ৬৬৯ জন। জাতিগত গ্রুপের মধ্যে রয়েছে ১১.৬ শতাংশ কাতারি এবং ৮৮.৪ শতাংশ অ-কাতারি। অকাতারিদের মধ্যে রয়েছে ভারতীয়, নেপালি, বাংলাদেশী, শ্রীলঙ্কান, পাকিস্তানি, সোমালি ও অন্যান্য। কাতারের জনসংখ্যার ৬৭.৭ ভাগ মুসলিম, ১৩.৮ ভাগ খ্রিষ্টান, ১৩.৮ ভাগ হিন্দু, ৩.১ ভাগ বৌদ্ধ এবং ১.৬ ভাগ অন্যান্য।
আরবি কাতারের সরকারি ভাষা। এখানকার প্রায় ৫৬ শতাংশ মানুষ আরবি ভাষায় কথা বলে। প্রায় এক-চতুর্থাংশ লোক ফার্সি ভাষায় কথা বলে। বাকিরা ভারতীয় উপমহাদেশের ও ফিলিপিন দ্বীপপুঞ্জের অন্যান্য ভাষায় কথা বলে। আন্তর্জাতিক কাজকর্মে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা হয়।

আরবীয় অরিক্স কাতারের জাতীয় পশু

কাতার একটি উচ্চ-আয়ের অর্থনীতির দেশ। বর্তমানে মাথাপিছু আয়ের হিসাবে কাতার বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর অন্যতম। এদেশে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেল মজুদ রয়েছে। তেল আবিষ্কারের আগে কাতারের অর্থনীতি ছিল মাছ ধরা ও মুক্তা আহরণের ওপর নির্ভরশীল। ১৯৪০ সালে দুখান ক্ষেত্রে এদেশের তেল আবিষ্কৃৃত হয়। বর্তমানে এদেশের নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান খুবই উন্নত এবং বৈধ নাগরিকদের কোনো আয়কর দিতে হয় না। বেকারত্বের হার শূন্যের কোঠায়। দেশটি তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বহিরাগত শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল। এদেশে কর্মরত শ্রমিকদের ৮৬ শতাংশই বিদেশী। মুদ্রার নাম রিয়াল। কাতারের আল জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্কের আল জাজিরা টেলিভিশন ও আল জাজিরা সংবাদপত্র সারা বিশ্বে জনপ্রিয়।
কাতার উপদ্বীপ সৌদি আরবের উত্তরে পারস্য উপসাগরের মধ্যে ১৬০ কিলোমিটার (১০০ মাইল) পর্যন্ত বিস্তৃত। দেশটির বেশির ভাগ বালিতে ঢাকা নিচু, উষর সমভূমি নিয়ে গঠিত। উত্তর-পূর্বে রয়েছে খোর আল আবাইদ (অভ্যন্তরীণ সাগর বা খাড়ি) অর্থাৎ পারস্য সাগরের খাড়ি পরিবেষ্টনকারী ঢেউখেলানো একটি বালিয়াড়ি। এদেশে দু’টি ঋতু পরিলক্ষিত হয় মৃদু শীতকাল এবং খুবই গরম আর্দ্র গ্রীষ্মকাল। তাপমাত্রা ১৪ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করে। কাতারের সর্বোচ্চ স্থান কুরাইন আবু আল বাউল। এর উচ্চতা ১০৩ মিটার (৩৩৮ ফুট)। জিকরিত থেকে উত্তর-দক্ষিণে উম্ম বাবের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ সীমান্ত পর্যন্ত বয়ে যাওয়া চুনাপাথরের রেঞ্জ জেবেল দুখানে এর অবস্থান। জেবেল দুখান এলাকায় কাতারের প্রধান সমুদ্র তীরবর্তী তেল মজুদ রয়েছে এবং প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্র রয়েছে উপকূলের উত্তর-পশ্চিমে সমুদ্রতীরের অদূরে। উল্লেখ্য, সৌদি আরব সালওয়া ক্যানাল নামে সৌদি-কাতার সীমান্ত বরাবর একটি খাল খননের প্রস্তাব দিয়েছে। খালটি খনন করা হলে কাতার কার্যত একটি দ্বীপে পরিণত হবে।

কাতারের উট পাখি

প্রাগৈতিহাসিক কাতারে স্থায়ী জনবসতির কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। তবে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে কাতারে প্রাণের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। প্রত্নতত্ত্ববিদ ডে কার্ডির মতে, কাতারে প্রাণের অস্তিত্ব ছিলো। এখানকার আবহাওয়া ছিলো বৃষ্টিবহুল, জলপ্রপাত, উঁচু ঘাস ও স্বচ্ছ পানির নালা ছিলো বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। আধুনিক ইতিহাসের জনক হেরাডোটাসের মতে, কাতারে ‘কান্নানিয়ান’ নামক জেলে সম্প্রদায়ের বসবাস ছিলো। এরা মাছ ধরার মৌসুমে অস্থায়ী অভিযান করে মাছ শিকার করত। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৯৯-৪৪৯ অব্দে পারস্য ও প্রাচীন গ্রিক সাম্রাজ্যের যুদ্ধের রেকর্ড হতে এ তথ্য পাওয়া যায়। প্রাচীনকালে কাতারের বিভিন্ন প্রত্নতত্ত্ব যেমন, মাটির বাসন, চকমকি পাথর, পাথর কাটার যন্ত্র বিশ্লেষণ করে পাওয়া যায়, এ কাতারের পূর্ব উপকূল রাস আব্রুখের সাথে মেসোপটেমিয়ান আল উবায়েদ গোত্রের ব্যবসা ছিলো। পরবর্তীতে টলেমির মানচিত্রে কাতারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। যেখানে একে কাথারা ও এর একটি শহর কাদারা নামে দেখানো হয়।
ইসলাম-পূর্ব যুগে কাতার আরব উপদ্বীপের অন্যান্য দেশের মতোই পারস্যের ‘শাসানি’ রাজবংশের অধীনস্থ ছিলো। পরবর্তীতে সপ্তম শতকে সমগ্র আরব উপদ্বীপে ইসলাম প্রসার লাভ করলে এ অঞ্চলও ইসলামের ছায়ায় চলে আসে। এ সময় বনু আমের বিন আবদ উল কায়েস, বনু সা’দ বিন যায়েদ মিনাহ বিন তাম্মি নামক বিভিন্ন গোত্রের বসবাস ছিলো। বর্তমান শাসকগোষ্ঠী আল-থানি, আ্ল তামিমিরই একটি শাখা। হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দক্ষিণ আরবীয় অঞ্চলে ইসলাম প্রসারে আলা আল হাদরামিকে প্রেরণ করেন ৬২৮ সালে। তখন কাতার অঞ্চলে শাসন করছিলো স্থানীয় বনু তামিম গোত্র। বনু তামিমের গোত্র প্রধান মুনযির ব্নি সাওয়া আল তামিমি ইসলাম গ্রহণে সম্মত হন এবং পরবর্তীতে অন্যান্য গোত্রে ইসলাম প্রসারে ভূমিকা রাখেন।
ইসলামের প্রথম যুগে কাতারে স্থায়ী বসবাস ছিলো। এ ছাড়া ‘মুরওয়াব’ নামক স্থানে একটি দুর্গ ও একশটির মতো পাথুরে বাড়ির সন্ধান মিলে। এ সময় কাতারের মূল ব্যবসা মাছের পাশাপাশি উট ও ঘোড়া পালন ও বিক্রয় জনপ্রিয়তা লাভ করে। হাদিস থেকে জানা যায়, কাতারে এক ধরনের কাপড় তৈরি হতো উটের পশম থেকে। এটিও কাতারের অন্যতম ব্যবসায়িক আকর্ষণ ছিলো। উমাইয়া (৬৬১-৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ) ও আব্বাসীয় (৭৫০-১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দ) আমলে দামেস্ক ও বাগদাদকেন্দ্রিক ব্যবসা গড়ে ওঠে। উমাইয়া আমলে এ অঞ্চল বিখ্যাত উট ও ঘোড়া ব্যবসার কেন্দ্রে পরিণত হয়। আব্বাসীয় আমলে মুক্তা ব্যবসার উন্নতি পরিলক্ষিত হয়। কাতারি মুক্তার চাহিদা প্রাচ্যের দেশগুলোয় বেড়ে চলে, চীনেও কাতারি মুক্তার চাহিদা ছিলো।

কাতারের একটি মসজিদ

পরবর্তীতে ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র হয় দুইটি উপসাগর ও লোহিত সাগর। ষোড়শ শতকে কাতার আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে। এ শতকের প্রথমার্ধ ছিলো মামলুকের অধিকারে। পরবর্তীতে মামলুকের প্রভাব কমে যাওয়ায় আরব অঞ্চলে অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হয় উসমানীয় সালতানাত। এ ছাড়া, স্থানীয় শক্তি ছিলো হরমুজ। উসমানীয় সালতানাত মামলুককে সরিয়ে আরব অঞ্চলে অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। ইরানের সাফাভি রাজবংশ উসমানীয় থেকে বাগদাদ দখল করে। একই সময় স্প্যানিশ- পর্তুগিজদের হাতে মুসলিম ইউরোপীয় শক্তি আল আন্দালুসের পতন হয়। পর্তুগিজ নৌশক্তি বিভিন্ন স্থানে প্রভাব বিস্তারে ছড়িয়ে পড়ে। এরা খুব অল্প সময়ে দুর্র্ধর্ষতার জন্য খ্যাতি অর্জন করে। ১৫০৯ সালে উসমানীয়, মামলুক ও ভারতীয় মুসলিম রাজশক্তি মিলিত হয়ে পর্তুগিজদের দমনে শক্তি প্রয়োগ করেন। ইতিহাসে এটি তিন রাজার যুদ্ধ নামে পরিচিত। এ যুদ্ধে পর্তুগিজদের নৌবহরের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়।
১৮৬৮ সালে ব্রিটিশ-আল থানি চুক্তির (কাতার ও ব্রিটিশ চুক্তি) মাধ্যমে জন্ম লাভ করে আধুনিক কাতার। ১৮৬৮ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে লুইস পেলি আল ওয়াকরায় মুহাম্মদ আল থানি ও তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সাথে মিলিত হন। ১২ সেপ্টেম্বর মুহাম্মদ বিন থানি চুক্তিবদ্ধ হতে সম্মত হন। বিষয়গুলো ছিলো : ১. দোহায় শান্তিপূর্ণ অবস্থান করা। ২. সমুদ্রে অশান্তি সৃষ্টি হতে বিরত থাকা। ৩. নিজেদের ও প্রতিবেশীর মাঝে সৃষ্ট যে কোন ধরনের সমস্যায় ব্রিটিশদের ফয়সালা গ্রহণ করা। ৪. বাহরাইনের তৎকালীন আমির আলি বিন খলিফার সাথে সুসম্পর্ক রাখা। ৫. বাহরাইনের পূর্ববর্তী আমির মোহাম্মদ বিন খলিফাকে কাতারে পাওয়া গেলে তাকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেয়া।

রাজধানী দোহায় কয়েকজন বিদেশী শ্রমিক

কাতারের রাজনীতি একটি পরম রাজতন্ত্র কাঠামোয় পরিচালিত হয়। কাতারের আমির হলেন একাধারে রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান। বর্তমান আমির তামিম বিন হামাদ আল থানি ২০১৩ সালে তার পিতা হামাদ বিন খলিফা আল থানির হাত থেকে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। ১৯৯৫ সাল থেকে দেশটির আমির ছিলেন হামাদ বিন খলিফা আল থানি। আবদুল্লাহ বিন নাসের বিন খলিফা আল থানি ২০১৩ সাল থেকে দেশটির প্রধানমন্ত্রী। কাতার বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ মাথাপিছু আয়ের দেশ। সৌদি আরব ও ওমানের পর কাতার অন্যতম রক্ষণশীল রাষ্ট্র। কাতারের নাগরিক সুযোগ সুবিধার মান খুবই উন্নত। এদেশে পার্লামেন্ট হিসেবে ৪৫ সদস্যের একটি আইন সভা এবং একটি পরামর্শ পরিষদ রয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দল নেই।
কাতারের প্রশাসনিক অঞ্চলসমূহ ৮টি পৌরসভায় (আরবিতে বালাদিয়াহ) বিভক্ত। সেগুলো হলো দোহা (রাজধানী দোহার সাথে যুক্ত আল রাইয়ান ও দায়্যান মিউনিসিপ্যালিটি), আল ওয়াকরাহ, আল খোর, আল শাহানিয়া, উম্ম সালাল, আল দায়্যান, আল রাইয়ান ও আল সামাল। পরিসংখ্যানগত কাজের জন্য পৌরসভাগুলো আবার ৯৮টি জোনে এবং জোনগুলো ব্লকে বিভক্ত।
কাতারে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবল। তবে, এদেশে ক্রিকেট, হ্যান্ডবল, বাস্কেটবল, টেনিস, স্কোয়াশ, ভলিবল ইত্যাদি খেলাও হয়ে থাকে। বিশ্ব ফুটবলের পরবর্তী সবচেয়ে বড় আসর বিশ্বকাপ কাতারে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০২২ সালে এই বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে। এ কারণেই এখানে চলছে স্টেডিয়াম ও ভবন নির্মাণের কাজ। কাতারের গরম আবহাওয়ায় জুন-জুলাইয়ে খেলতে বিশ্বের অনেক শীর্ষ ফুটবল খেলুড়ে দেশ আপত্তি করায় শীতকালে নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে বিশ্বকাপের আয়োজন করা হবে। এ উপলক্ষে দেশটিতে নতুন নতুন সড়কও নির্মাণ করা হচ্ছে। আগের অপ্রশস্ত চত্বরগুলো আর নেই। এখন সেসব স্থানে এলিভেটেড ইন্টারচেঞ্জ নির্মাণ করা হয়েছে। পুরোদমে চলছে দোহা মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ এবং শিগগিরই এটা চালু হবে। কাতার আশা করছে, বিশ্বকাপের সময় প্রতিদিন গড়ে দুই লাখ ফুটবলভক্ত আসবেন। এঁদের মধ্যে কেউ হয়তো ক্রুজশিপে ঘুমাবেন, কেউ কেউ মরুভূমিতে ক্যাম্প করতে পারেন। এ ছাড়া, বিশ্বকাপ উপলক্ষে রাজধানীজুড়ে নতুন হোটেল নির্মাণ করা হয়েছে। এসব হোটেলে দর্শনার্থীদের জন্য প্রায় এক লাখ নতুন রুম রয়েছে।

SHARE

Leave a Reply