Home গল্প সোনা ঝরা সময় – নাহিদ জিবরান

সোনা ঝরা সময় – নাহিদ জিবরান

রাফিন আর সাইফ দুই ভাই!
রাফিন সাইফের থেকে পাঁচ বছরের বড়।
বয়সে বড় হলে কী হবে? দু’জনেই খুব ডানপিঠে।
রাফিন ঢাকায় থাকে। আর সাইফ থাকে গ্রামে।
সাইফ ফোন দিয়ে খুব করে ধরলো গ্রামে আসার জন্য।
রাফিন শুধু আশ^াসই দিয়ে গেল। আসবো সময় পেলেই আসবো। তুই ঠিকভাবে পড়াশোনা কর।
সাইফের মন খারাপ হয়ে যায়। কোনো কিছু না বলেই ফোনটা কেটে দেয়। রাফিন বুঝতে পেরে আবার ফোন দেয় সাইফকে। ফোন রিসিভ করে বলে তোমার আসা লাগবে না, তুমি ঢাকায় থাকো, কাজে মন দাও এই বলে আবার ফোন কেটে দেয়। খুব অভিমানী ছেলেটা।
রাফিন ছোটখাটো একটা জব করে। খুব কম বেতন পায়। যা পায় তা দিয়ে কোনো মতে মাস চলে যায়। এর মধ্যে গ্রামে গেলে আবার বাড়তি খরচ। সব কিছু মিলিয়ে রাফিন দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। এভাবে বেশকিছু দিন চলে যায়। সাইফের আর কোনো খবরই নেই। ফোন দিলেও ধরছে না। রাফিন চিন্তায় পড়ে গেল।
রাফিন তার অফিস থেকে সপ্তাহ খানেক ছুটি নিলো। সাইফকে না জানিয়েই গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। গ্রামে পৌঁছানোর পর রাফিন সাইফকে দেখতে পেলো না। সবার কাছে জিজ্ঞেস করতেই বলে মাঠে বসে আছে একা একা। কয়দিন ধরে সাইফের মনটা ভীষণ খারাপ। রাফিন বুঝতে পারলো কী কারণে মনটা খারাপ।
রাফিন বিশ্রাম না নিয়েই চলে গেল মাঠের দিকে। খুঁজতে খুঁজতে দেখলো খেজুর গাছের নিচে বসে আছে। রাফিন সাইফের চোখ দুটো পেছন দিক থেকে ধরে ফেললো। সাইফ বললো ভাইয়া তুমি এসেছো? রাফিন অবাক হয়ে সাইফকে বললো তুই বুঝলি কিভাবে? সাইফ বললো, ভায়ের স্নেহ কি কখনো ভোলা যায়?
রাফিন সাইফকে জড়িয়ে ধরলো! আহা কি ভালোবাসা ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের। দু’ভাই ঘাড়ে হাত দিয়ে বাড়ির দিকে ছুটলো। রাফিন ফ্রেশ হয়ে খেতে বসলো সবার সাথে। গ্রামের খাবারে কোনো ভেজাল নেই! তরকারি, পুকুরের মাছ বেশ তৃপ্তি নিয়েই খেলো রাফিন।
সাইফ বললো, ভাইয়া চলো ঘুরে আসি! রাফিন বললো এই ভরদুপুরে কোথায় যাবিরে! রেস্ট নেই তারপর দেখা যাবে। সাইফ কোনভাবেই রাফিনকে রেস্ট নিতে দিলো না।
মুখ দিয়ে বলেছে যাবে তো যাবেই! রাফিন আর কিছু বললো না। রাফিনের ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে। রাফিন সাইফকে বললো হেঁটে যাবি! সাইফ বললো, আমার সাইকেল আছে চলো এটাতে করেই ঘুরবো। রাফিন বললো আমার যা শরীর তুই কি চালাতে পারবি আমাকে নিয়ে? সাইফ হো হো করে হেসে উঠলো। ভাইয়া কি যে বলো না তুমি। উঠে পড়ো চলো যাই। রাফিন সাইকেলে বসা মাত্রই সাইফ বললো ভাইয়া পিছনের চাকা দেবে গেছে তুমি বসাতে। রাফিন সাইকেল থেকে নেমে পড়লো। রাফিন বললো, চলতো সময় নষ্ট না করে হেঁটে যাই। সাইফ বললো আমি তো দুষ্টুমি করেছি তুমি বসো আমি চালাচ্ছি।
সাইকেলে প্যাডেল দিলো সাইফ। প্রথমে একটু হাত কাঁপলো সাইফের। এরপর সাইকেল ছুটছে ক্রমাগত। প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে যাচ্ছে রাফিন। সাইফ সাইকেল চালাচ্ছে আর তার জমানো কথাগুলো রাফিনকে বলছে।
রাফিন কোনো কথাই কানে নিচ্ছে না। শুধু প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে আছে আর ভাবছে তার শৈশব নিয়ে। কিছু দূর যেতে না যেতেই ঝুম বৃষ্টি। কোন মতে একটা কুঁড়েঘরের নিচে সাইকেলটা থামিয়ে দু’ভাই ঘরের ছাউনিতে দাঁড়ালো!
রাফিন সাইফকে বলছে, চল ভাই বৃষ্টিতে ভিজি আর সাইকেল চালাই। রাফিন ভেবেছিল সাইফ না বলবে। কিন্তু রাফিন বলার সাথে সাথে উত্তর দিলো চলো ভাইয়া আজকে বৃষ্টিতে ভিজি!
দু’ভাই বৃষ্টিতে ভিজে সাইকেল চালাচ্ছে।
সাইফের কষ্ট হয়ে গেছে রাফিনকে নিয়ে চালাতে। মুখে না বললেও দেখে বুঝা যাচ্ছে। রাফিন সাইফকে থামতে বললো। সাইফ থামালো, বললো কী হয়েছে ভাইয়া! রাফিন বললো সাইকেলটা আমাকে দে, আমি চালাবো! সাইফ দিতে চাইলো না। রাফিন জোর করেই নিলো। প্যাডেলে চাপ দিয়েই দেখলো রাফিনের হাত কাঁপছে। সাইফ বললো ভাইয়া অনেকদিন চালাওনি এজন্য এমন হচ্ছে!
রাফিন বললো ওরে থাম। প্রথমে এমন একটু হবেই তা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না! সাইফ আর কোন কথা বললো না। অনেক দূর এভাবে বৃষ্টিতে ভিজেই সাইকেল চালাচ্ছে। রাস্তায় কোন মানুষ নেই।
ঝুম বৃষ্টির সাথে মেঘের গর্জন! রাফিনের ভয় হচ্ছে আবার আনন্দও হচ্ছে। আঁকাবাঁকা পথ, রাস্তার দু’ধারে ধান লাগিয়েছে কৃষকেরা। বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে গেছে রাস্তা। চারিদিকে সবুজের সমারোহ!
কিছুদূর যেতেই ঘটলো অঘটন! রাফিন সাইকেলের ব্যালান্স রাখতে না পেরে রাস্তার পাশে ঝোপ-ঝাড়ে ফেলে দিলো চলন্ত অবস্থায় সাইফকে নিয়ে।
রাফিন সামনে থাকাতে একটু বেশিই ব্যথা পেয়েছে। সাইফও পেয়েছে তবে সামান্য। রাফিন সাইফের দিকে তাকাতে পারছে না লজ্জায়। সাইফ উঠে বললো ভাইয়া তোমার লাগেনি তো! রাফিন বললো নারে, তোর কোথাও লেগেছে! সাইফ বললো না ভাইয়া লাগেনি। সাইফ আমার হাত থেকে সাইকেলটা নিয়ে বললো অনেক চালিয়েছো এবার আমাকে দাও। রাফিন আর কিছু না বলে সাইকেলটা সাইফকে দিয়ে দিলো। সাইফ সাইকেল চালানো শুরু করলো, কিন্তু এক কদম যেতে না যেতেই আবার ধপাস! রাফিন এবার একটু রেগে গেল। কিরে তুই এবার কী করলি?
সাইফ কিছুই বুঝতে পারলো না। কেন পড়ে গেল। সাইকেলের সামনে গিয়ে দেখে হ্যান্ডেল বেঁকে গেছে। এ জন্যই পড়ে গেছে। সাইফ বললো ভাইয়া সাইকেলটা ধরো আমি ঠিক করছি। রাফিন সাইকেল ধরলো সাইফ ঠিক করছে। সাইকেল ঠিক হলো কিন্তু কেউ আর সাইকেল চালাতে চাচ্ছে না। এদিকে বাড়ি থেকে অনেক দূরে চলে আসছে। শরীর ভেজা, বৃষ্টি থেমে গেছে, শরীরের ক্লান্তি বেড়ে গেছে। দু’ভাই একটা চা দোকানের সামনে বসে আছে। সাইফ বললো ভাইয়া চলো এবার হাঁটা যাক। রাফিন বুঝতে পারলো সাইফ আর সাইকেল চালাবে না এখন!
রাফিন বললো চল ভাই বাড়ি ফিরে যাই। আজকে অনেক মজা হয়েছে। সাইফ বললো চলো ভাইয়া যাওয়া যাক। দু’ভাই হেঁটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। হাঁটছে এক মনে।
দু’ভাই কোনো কথাই বলছে না। রাফিন কিছুক্ষণ পর বললো, কিরে সাইফ চুপ কেন?
সাইফ বললো, ভাইয়া এই দিনটা কি আর কখনো আসবে! রাফিন আর সাইফ দু’জনেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। রাফিন বললো ভাইরে স্মৃতিগুলো তো এভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে। দু’জনই হাঁটা বন্ধ করে রাস্তার পাশে বসে পড়লো! সাইফ বললো, ভাইয়া এমনটা কেন হয় বলো তো! স্মৃতিগুলো একে একে হারিয়ে যাচ্ছে। তুমিও একদিন ব্যস্ত হয়ে যাবে। আমিও পড়াশোনার চাপে তোমাকেও সময় দিতে পারবো না। রাফিন সাইফকে বললো এরকম ধারণা কেন করছিস! কিচ্ছু হবে না। সব কিছু চেঞ্জ হবে কিন্তু আমাদের ভালোবাসা অটুট থাকবে। রাফিন এ কথা বলেই আকাশের দিকে চেয়ে থাকলো। সাইফ গুমরে কেঁদে উঠলো।
রাফিনকে জড়িয়ে ধরে বললো ভাইয়া তাই যেন হয়। আমরা বাড়ি ফিরে যাই।
রাফিন পরের দিনই ঢাকায় চলে যায় সাইফকে বিদায় জানিয়ে। রাফিন আগের মতোই ব্যস্ত হয়ে পড়লো। আর সাইফ পড়াশোনায় ব্যস্ত। সত্যি সত্যিই দু’ভাইয়ের ব্যস্ততা বেড়ে গেলো। আগের মতো আর কথা হয় না। রাফিন বাড়িতেও আসতে পারে না ব্যস্ততার কারণে।
রাফিন আর সাইফ দু’জনই ভাবতে থাকে স্মৃতিগুলো। বহুবার মনে পড়ে। কিন্তু ফিরে আর আসে না কখনোই!

SHARE

Leave a Reply