Home গল্প মিনি ও রিনি – আবুল হোসেন আজাদ

মিনি ও রিনি – আবুল হোসেন আজাদ

ফজরের নামাজ পড়েই কাইয়ুম সাহেব বেরিয়ে পড়লেন। হাতে বাজারের থলে। পাড়ার অনেকেই এই ভোরবেলা কাইয়ুম সাহেবকে থলে হাতে দেখে অবাক হলেন। ভাবলেন এত ভোরে বাজার কোথায় মিলবে। একেতো অজপাড়াগাঁ। শহরতো নয়। এখানে বাজার মিলবে সকাল আটটা-নয়টা নাগাদ। দু’একজন পড়শি জিজ্ঞেস করলেন; এত সকালে বাজারের থলে হাতে নিয়ে কোথায় চললেন। কাইয়ুম সাহেব প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে দ্রুত পা চালাতে লাগলেন। মুখে তার গাম্ভীর্য। সঙ্গে চিন্তার বলিরেখা কপালে।
কাইয়ুম সাহেব হলেন রেনু ও রানীর আব্বু। রেনু রানীর বয়স এই সবে ছয় আর চার। দু’জনের বয়সের ফারাক দু’বছরের হলেও উচ্চতা প্রায় সমান। গড়নও একই ধরনের। রেনু বড় ওর গায়ের রংটা চাপা শ্যামলা। আর রানীর গায়ের রং একেবারে ফর্সা। যাকে বলে দুধে ধোয়া আলতা। তবু অনেকে মাথায় প্রায় সমান সমান দেখে যমজ দু’বোন মনে করে। ওদের দুই বোনকে নিয়েই যত ঝামেলা। ওদের জন্যই তো কাইয়ুম সাহেবকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটতে হচ্ছে।
সপ্তাহখানেক আগে রেনু রানী ওদের মায়ের সঙ্গে গিয়েছিল নানার বাড়িতে বেড়াতে। বাড়িতে ছিলেন ওদের আব্বু একা। এই সময়েই ঘটেছে কাণ্ডটি। রেনু রানীর ছিল একটি পোষা বিড়াল। দু’জনে বিড়ালটিকে আদর যত্ন করে মাথায় তুলেছে। সাদা কালো ডোরা ডোরা দাগ। ঠিক যেন এক বাঘের বাচ্চা। বাঘকে কখনও ওরা চাক্ষুষ দেখেনি। শুধু বই-পত্রের ছবি ছাড়া। তবে আম্মুর কাছে বাঘের গল্প শুনেছে। বিড়াল নাকি বাঘের মাসি। তা বুঝি সত্যি। তা না হলে বাঘের ছবির সঙ্গে মিলালে বিড়ালকে বাঘ বলে মনে হবে কেন? ওই পোষা বিড়ালটি অনেকদিন পর দুটো বাচ্চা দিয়েছে। দেখতে ভারি সুন্দর! একটি বাচ্চা ওদের মায়ের মত সাদার ওপর কালো ডোরা দাগ। আর একটি ধূসর ছাই রঙা। কিছুটা কালো। ওরা দুই বোনে তাই বাচ্চা দু’টিকে আদর করে নাম রেখেছে মিনি ও রিনি। ওরা দেখতে দেখতে মায়ের দুধ ছেড়ে মাছ ভাত খেতে শুরু করেছে। রেনু ও রানী প্রায় সারাদিন ওদের নিয়ে খেলা করে। কোলে কোলে রাখে। এই আদিখ্যেতা ওদের আব্বু কাইয়ুম সাহেবের মোটেই পছন্দ না। যখনই কাইয়ুম সাহেব খেতে বসেন মিনি ও রিনি ওদের মা বিড়ালের সঙ্গে দাওয়ার মাদুরে এসে হাজির। আব্বু লাঠি দিয়ে তাড়িয়ে দেন। যদিও একমুঠো ভাত আর মাছের কাঁটাগুলো দূরে ওদরেকে খেতে দেন। রেনু ও রানীর আম্মুকেও কতবার বলেছেন তিনি; দেখো বিড়াল বাচ্চা দুটো বেশ জ্বালাচ্ছে। ওদেরকে বাড়ি থেকে বের করো। আম্মু কিছু বলেন না। কচি মেয়ে দুটোর মুখের দিকে তাকিয়ে নীরব থাকেন। ভাবেন ওরকম একটু আধটু বলে বলুক। মিনি রিনিও বেশ চতুর। ওরা দুটো অর্থাৎ রেনু রানী চোখের আড়াল হলে ওরাও উধাও হয়ে যায়। ঘরের খাটের তলায় কখনও বা খাবার ঘরে মিটসেটের তলায় গিয়ে দিব্যি নাক ডাকিয়ে ঘুম তুলে দেয়। কখনও বা আবার দুটোতে খেলায় মেতে ওঠে।
কিছুদিন আগে নানা এলেন আম্মুকে নিতে সপ্তাহখানেকের জন্য। রেনু ও রানু আম্মুর সাথী হলো। আর এই সময়েই বিপত্তি। ওরা দু’বোন নানাবাড়ি থেকে ফিরেই মিনি ও রিনিকে ডাকতে লাগলো। কিন্তু ওরা এলোরনা তারপর রীতিমত খোঁজাখুঁজি শুরু হলো কিন্তু ওদের আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথায় গেলো মিনি ও রিনি? মা বিড়ালটা রেনু রানীর কাছে এসে লেজ ঘষতে লাগলো। তন্ন তন্ন করে খুঁজেও যখন ওদের পাওয়া গেল না তখন দু’বোনই কাঁদতে শুরু করলো। আম্মু ও দু’বোনের কান্না দেখে বিষণ্ন হয়ে পড়লেন। কাইয়ুম সাহেব বাড়িতে ছিলেন না। সন্ধ্যার পর বাড়িতে এসে দু’বোনের কাণ্ড দেখে আর ঠিক থাকতে পারলেন না। তিনি স্বীকার করলেন বাচ্চা দুটোর জ্বালাতনে অতিষ্ঠ হয়ে ও দুটিকে বাজার পেরিয়ে মসজিদের পাশে ফেলে দিয়ে এসেছেন। আম্মু আব্বুকে মৃদু তিরস্কার করলেন। বিড়াল বাচ্চা দুটো কি এমন তোমার ক্ষতি করছিলো যে ঐ দুটি ভিটে ছাড়া না করলে হলো না? কাইয়ুম সাহেব কথা দিলেন রিনি ও মিনি যেখানেই থাক কাল সকালেই ওদের খুঁজে বাড়িতে নিয়ে আসবো।
পরদিন সকাল বেলা। চারিদিকে তাকাচ্ছেন আর হাঁটছেন কাইয়ুম সাহেব। যাকে পাচ্ছেন এই ভোরবেলায় তাকেই বলছেন সেই বিড়াল বাচ্চা দুটোর কথা। যদি কোন খোঁজ মেলে। ওদেরকে ফিরে আনতে হবে বাড়িতে। ওদের জন্য ছোট্ট মেয়ে দুটোরও রাতে ঠিকমত ঘুম হয়নি। যতক্ষণ জেগে ছিল ততক্ষণ মন খারাপ করে কাটিয়েছে। কাইয়ুম সাহেবকে তাই মিনি ও রিনিকে খুঁজে পেতে প্রত্যেকের বাড়ি বাড়ি যেতে হচ্ছে। যদি ওদের পায়।
মসজিদের উত্তর পাশে একটি বাঁশঝাড়। কাইয়ুম সাহেবের হঠাৎ চোখ গেলো বাঁশঝাড়ের গোড়ায়। দেখতে পেলেন মিনি ও রিনি গুটিশুটি মেরে দু’জনেই গা ঘেঁষাঘেঁষি করে ঘুমিয়ে আছে। কাইয়ুম সাহেবের চোখ দুটো খুশিতে চকচক করে উঠলো। তিনি পরম মমতায় বাচ্চা দুটিকে দু’হাতে তুলে নিলেন। বাচ্চা দুটোরও ঘুম ভেঙে গেলো। ওরাও কাইয়ুম সাহেবকে দেখতে পেয়ে খুশিতে গরগর করতে লাগলো। বাচ্চা দুটোর চোখে মুখেও খুশির ঢেউ বয়ে গেল।

SHARE

Leave a Reply