Home দেশ-মহাদেশ মধ্যপ্রাচ্যের দ্বীপরাষ্ট্র বাহরাইন – মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

মধ্যপ্রাচ্যের দ্বীপরাষ্ট্র বাহরাইন – মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

মধ্যপ্রাচ্যের দ্বীপরাষ্ট্র বাহরাইন - মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলামবাহরাইন মধ্যপ্রাচ্যের একটি দ্বীপরাষ্ট্র। সরকারি নাম বাহরাইন রাজ্য, আরবিতে বলা হয় মামলাকাত আল বাহরাইন। বাহরাইন এশিয়ায় মালদ্বীপ ও সিঙ্গাপুরের পর তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ। পারস্য উপসাগরের পশ্চিম অংশের ৩৬টি দ্বীপ নিয়ে দেশটি গঠিত। এর পূর্বে কাতার উপদ্বীপ এবং পশ্চিমে সৌদি আরবের উত্তর-পূর্ব উপকূলের মধ্যবর্তী স্থানে দেশটির অবস্থান। সৌদি আরবের সাথে বাহরাইন ২৫ কিলোমিটার (১৬ মাইল) দীর্ঘ বাদশাহ ফাহদ কজওয়ে বা সেতু দ্বারা যুক্ত। সবচেয়ে বড় দ্বীপটিও বাহরাইন নামে পরিচিত এবং দ্বীপটির ৯২ শতাংশ মরুময় ঊষর নিম্নভূমি। কেবল উত্তরের উপকূলে এক চিলতে সমভূমি আছে যেখানে রাজধানী মানামা অবস্থিত। বাহরাইনের মধ্যভাগের ভূমি ক্রমান্বয়ে কিছুটা ওপরের দিকে উঠে গেছে। এখানে বাহরাইনের সর্বোচ্চ স্থান জাবাল আদ দু’খানের উচ্চতা ১৩৪ মিটার (৪৪০ ফুট)।

মধ্যপ্রাচ্যের দ্বীপরাষ্ট্র বাহরাইন - মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম
আরাদে আরাদ দুর্গ। পর্তুগিজ নিয়ন্ত্রণ নেয়ার আগেই এটি নির্মাণ করা হয়

আরবিতে বাহার শব্দের অর্থ সাগর আর বাহরাইন হলো এর দ্বিবচন অর্থাৎ দু’টি সাগর। বর্তমানে বাহরাইনের ‘দুটি সাগর’ বলতে দ্বীপটির পূর্ব ও পশ্চিমের উপসাগর, দ্বীপটির উত্তর ও দক্ষিণের সাগর অথবা ভূমির ওপরে ও নিচে উপস্থিত লবণাক্ত ও মিঠা পানি বুঝানো হয়ে থাকে। উল্লেখ্য, কূপ ছাড়াও বাহরাইনের সাগর এলাকায় লবণাক্ত পানির মাঝখান থেকে মিঠা পানি বুদবুদ আকারে উত্থিত হয়। সেই প্রাচীনকাল থেকেই পর্যটকরা এটা লক্ষ করে আসছেন। বাহরাইনের নামকরণের আরেকটি বিকল্প ব্যাখ্যায় বলা হচ্ছে, দু’টি সাগর বলতে এখানে গ্রেট গ্রিন ওশান (পারস্য উপসাগর) এবং আরবীয় মূলভূমির একটি শান্তিপূর্ণ হ্রদকে বুঝানো হয়েছে।
প্রায় ৫,০০০ বছর আগেও বাহরাইন একটি বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল। সবসময়ই এটি শক্তিশালী প্রতিবেশীদের অধীনস্থ ছিল। ১৭শ শতকে এটি ইরানের দখলে আসে। ১৭৮৩ সালে মধ্য সৌদি আরবের আল-খলিফা পরিবার নিজেদেরকে বাহরাইনের শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে এবং তখন থেকে তারাই দেশটিকে শাসন করে আসছে। ১৯শ শতকের কিছু সন্ধিচুক্তির ফলে যুক্তরাজ্য দেশটির প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক সম্পর্ক রক্ষার দায়িত্ব পায়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত বাহরাইন ব্রিটিশ প্রভাবাধীন ছিল।

মধ্যপ্রাচ্যের দ্বীপরাষ্ট্র বাহরাইন - মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম
মুর্হারাকের একটি সৈকত

বাহরাইনের আয়তন ৭৭৮ দশমিক ৩ বর্গকিলোমিটার (৩০০.৫ বর্গমাইল)। জনসংখ্যা ২০১৬ সালের হিসাব অনুযায়ী ১৪ লাখ ৪২ হাজার ৬৫৯ জন। এদের ৯৯% মুসলমান। বাকি ১% মূলত ইহুদি ও খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী। মুসলমানদের মধ্যে প্রায় ৭০% শিয়া মতাবলম্বী। বাকিরা সুন্নি। আরব বিশ্বের যে ৩টি দেশে শিয়া জনপ্রাধান্য আছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম বাহরাইন এবং অপর দু’টি ইরান ও ইরাক। যদিও বাহরাইনের রাজপরিবার সুন্নিপন্থী। অমুসলিম বিদেশীদের মধ্যে খ্রিস্টধর্মের বিভিন্ন মতাবলম্বী ছাড়াও হিন্দু, বাহাই, বৌদ্ধ, শিখ ইত্যাদি বিভিন্ন ধর্মের অনুসারী আছে।
জাতিগত গ্রুপের মধ্যে রয়েছে ৫০.৭ শতাংশ আরব (৪৬ শতাংশ বাহরাইনি, ৪.৭ শতাংশ অন্যান্য আরব), ৪৫.৫ শতাংশ এশীয়, ১ শতাংশ ইউরোপীয় এবং ১.২ শতাংশ অন্যান্য।
আরবি বাহরাইনের সরকারি ভাষা। এ ছাড়াও এখানকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে ফার্সি, উর্দু, ও হিন্দিসহ বিভিন্ন ভাষা প্রচলিত। আন্তর্জাতিক ব্যবসা বাণিজ্য এবং পর্যটন শিল্পে ইংরেজি ভাষার ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের দ্বীপরাষ্ট্র বাহরাইন - মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম
আল আরিন বন্যপ্রাণী পার্কে বিচরণরত বাহরাইনের স্থানীয় পাখি ফ্লামিংগো

১৯৩০-এর দশকে বাহরাইন পারস্য উপসাগরের প্রথম দেশ হিসেবে তেলভিত্তিক অর্থনীতি গঠন করে, কিন্তু ১৯৮০-র দশকের শুরুর দিকেই এর সমস্ত তেল ফুরিয়ে যায়। তবে দেশটি এই পরিবর্তনের কথা মাথায় রেখে আগেভাগেই অন্যান্য শিল্পে বিনিয়োগ করে রেখেছিল এবং দেশটির অর্থনীতি এখনও উন্নতি করে যাচ্ছে।
বর্তমান বাহরাইন অঞ্চলে ব্রোঞ্জ যুগে দিলমুন নামক সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল। ৫ হাজার বছর আগেও বাহরাইন সিন্ধু অববাহিকা ও মেসোপটেমিয়ার সভ্যতাগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২০০০ অব্দের দিকে ভারত থেকে বাণিজ্য আসা বন্ধ হয়ে গেলে দিলমুন সভ্যতার পতন ঘটা শুরু করে। ৭৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে আসিরীয় রাজারা বাহরাইনকে ক্রমাগত নিজেদের বলে দাবি করতে শুরু করে। ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের কিছু পরে দিলমুন আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্যের অধীনে চলে যায়। এরপর অনেক দিন যাবৎ বাহরাইনের কোনো ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায় না। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে পারস্য উপসাগরে মহাবীর আলেকজান্ডারের পদার্পণ ঘটলে আবার এর হদিস পাওয়া যায়। যদিও আরব গোত্র বনি ওয়াএল এবং পারসিক গভর্নরেরা অঞ্চলটি শাসন করতেন, খ্রিস্টীয় সপ্তম শতক পর্যন্তও এটি গ্রিক নাম তিলোস নামে পরিচিত ছিল। ঐ শতকে এখানকার অধিবাসীরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। বাহরাইন ছিল আঞ্চলিক বাণিজ্য ও মুক্তা আহরণ কেন্দ্র। সপ্তম শতক থেকে বিভিন্ন পর্বে এলাকাটি সিরিয়ার উমাইয়া বংশীয় খলিফাগণ, বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফাগণ, পারসিক, ওমানি এবং পর্তুগিজদের দ্বারা শাসিত হয়। শেষ পর্যন্ত বনি উতবাহ গোত্রের আল খালিফা পরিবার ১৭৮৩ সালে ইরানিদের কাছ থেকে অঞ্চলটি দখল করে এবং তখন থেকে আজ পর্যন্ত তারা বাহরাইনের শাসক।
১৮৩০-এর দশকে আল খালিফা পরিবার একটি চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে বাহরাইনকে একটি ব্রিটিশ প্রটেক্টোরেট বা আশ্রিতরাজ্যে পরিণত করে, অর্থাৎ যুক্তরাজ্য বহিরাক্রমণ থেকে দেশটির সুরক্ষার দায়িত্ব নেয় এবং এর বিনিময়ে বাহরাইন যুক্তরাজ্যের অনুমতি ছাড়া অন্য কোন বিদেশী শক্তির সাথে সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ হারায়। বাহরাইনে বড় আকারে খনিজ তেলের উৎপাদন শুরু হবার কিছু পরেই ১৯৩৫ সালে পারস্য উপসাগর অঞ্চলে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর প্রধান ঘাঁটিটি বাহরাইনে নিয়ে আসা হয়।

মধ্যপ্রাচ্যের দ্বীপরাষ্ট্র বাহরাইন - মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম
বহুমুখী সাগর মহড়ায় অংশগ্রহণরত রাজকীয় বাহরাইনি নৌবাহিনীর জাহাজ আরবিএনএস সাবহা

১৯৬৮ সালে যুক্তরাজ্য সরকার পারস্য উপসাগরের শেখশাসিত রাজ্যগুলোর সাথে ইতোমধ্যে করা চুক্তিগুলো রদ করার সিদ্ধান্ত নেয়। সে সময় বাহরাইন কাতার এবং বর্তমান সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাতটি শেখরাজ্যের সাথে মিলে একটি বৃহৎ সংযুক্ত আরব আমিরাত গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু ১৯৭১ সাল নাগাদ এই নয় রাজ্য সংযুক্তিকরণের বিভিন্ন ব্যাপারে একমত হতে পারেনি। ফলে ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট বাহরাইন একক রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে।
নতুন রাষ্ট্র বাহরাইনের জন্য একটি সংবিধান রচনা করা হয় এবং ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ নির্বাচিত হয়, কিন্তু মাত্র দুই বছর পরে ১৯৭৫ সালে বাহরাইনের আমির সংসদ ভেঙে দেন, কেননা নির্বাচিত সংসদ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে আল-খলিফা শাসনের অবসান এবং মার্কিন নৌবাহিনীকে সেখান থেকে বিতাড়নের প্রচেষ্টা করছিল।

মধ্যপ্রাচ্যের দ্বীপরাষ্ট্র বাহরাইন - মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম
জুফাইর থেকে তোলা রাজধানী মানামার আকাশচুম্বী ভবনসমূহের দৃশ্য

১৯৯০-এর দশকে বাহরাইনের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া সম্প্রদায়ের অসন্তুষ্টি বিভিন্ন রাজনৈতিক সংঘাতের আকারে প্রকাশ পায়। এর প্রেক্ষিতে বাহরাইনের আমির প্রায় ২০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মত, ১৯৯৫ সালে, বাহরাইনের মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনেন এবং আইন পর্যালোচনাকারী কাউন্সিলের সদস্যসংখ্যা ৩০ থেকে ৪০-এ বৃদ্ধি করেন।
বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে বাইরাইন ব্যাংকিং ও পর্যটন খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করে। রাজধানী মানামায় বহু বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি রয়েছে। এদেশের মানব উন্নয়ন সূচক বেশ উন্নত এবং বিশ্বব্যাংক এ দেশকে উচ্চ আয়ের অর্থনীতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাহরাইন জাতিসংঘ, জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন, আরব লিগ, ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) এবং উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার সদস্য।
বাহরাইনে একক সংসদীয় ইসলামিক সাংবিধানিক রাজতন্ত্র পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত। বাহরাইনের বর্তমান রাজা শেখ হামাদ বিন ইসা আল খালিফা, যুবরাজ সালমান বিন হামাদ আল খলিফা এবং প্রধানমন্ত্রী খলিফা বিন সালমান আল খলিফা। বাহরাইনের আইনসভা দুই-কক্ষবিশিষ্ট। ৪০ সদস্যের নিম্নকক্ষ বা প্রতিনিধি পরিষদ। এর সদস্যরা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসেন। ৪০ সদস্যের উচ্চকক্ষ তথা শূরা কাউন্সিলের সদস্যদের রাজা নিয়োগ দেন। যুবরাজ সালমান বাহরাইনের সেনাবাহিনীর কমান্ডার। বাহরাইনের প্রশাসনিক এলাকা ৪টি প্রদেশে বিভক্ত। সেগুলো হলো রাজধানী প্রদেশ, মুর্হারাক প্রদেশ, উত্তর প্রদেশ ও দক্ষিণ প্রদেশ। প্রত্যেক প্রদেশে একজন করে গভর্নর আছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের দ্বীপরাষ্ট্র বাহরাইন - মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম
মানামার গুদায়বিয়া মসজিদ

পারস্য উপসাগরের অপর পাড়ে ইরানের জাগরোস পর্বতমালার কারণে বাহরাইনে বাতাস বেশ কম আসে। অপর দিকে সোদি আরব ও ইরাক থেকে উত্তর-পশ্চিম বাতাসের সাথে আসে ধূলিঝড় (যা স্থানীয়ভাবে শামল বায়ু নামে পরিচিত)। এর ফলে জুন ও জুলাই মাসে এখানকার দৃশ্যমানতা কমে যায়। গ্রীষ্মকাল খুবই গরম। বাহরাইনের চারদিকের সাগরগুলো খুবই অগভীর। গ্রীষ্মকালে দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে যায় এবং বিশেষ করে রাতে আর্দ্রতা খুব বেশি বেড়ে যায়। গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা ভালো অবস্থায়ও ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে যায়। বাহরাইনে বৃষ্টিপাত খুব কম এবং অনিয়মিত হয়। বৃষ্টিপাত শীতকালে হয়, যার পরিমাণ বছরে ৭১.৮ মিলিমিটার।
বাহরাইনের অর্থনীতি প্রধানত পেট্রোলিয়াম উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ ও রিফাইনিংয়ের ওপর নির্ভরশীল। এই খাত ৬০% রফতানিতে ও ৩০% জিডিপিতে অবদান রাখে। এ দেশের শ্রমবাজারের ৫ ভাগের ৩ ভাগ দখল করে আছে বিদেশি শ্রমিকেরা। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো হওয়ায় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অনেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এখানে সদর দফতর স্থাপন করেছে। পর্যটন খাত অনেক উন্নতি সাধন করেছে। এই খাত জিডিপিতে ৯% অবদান রাখছে। শুধুমাত্র ১% ভূমি চাষযোগ্য হওয়ায় বাহরাইনিরা প্রয়োজনীয় খাদ্য নিজেরা উৎপাদনে অক্ষম। তারা এ ক্ষেত্রে আমদানির ওপর নির্ভর করে। তাদের মাথাপিছু আয়ও অনেক বেশি। প্রায় ৫১ হাজার ৯৫৬ মার্কিন ডলার। এ দেশের মুদ্রার নাম বাহরানি দিনার।

SHARE

Leave a Reply