Home নিবন্ধ কবিতায় কাশ্মীর – সাকী মাহবুব

কবিতায় কাশ্মীর – সাকী মাহবুব

কবিতায় কাশ্মীর - সাকী মাহবুবকাশ্মীর বর্তমান পৃথিবীজুড়ে তুমুল এক আলোচিত নাম। কাশ্মীর পৃথিবীর জান্নাত। নাম শুনলেই চির সবুজে মোড়ানো প্রকৃতির দিকে মন ছুটে চলে যায় বারবার। হৃদয়ে হিল্লোল তুলে মুগ্ধকরা আবেশের।
মনের গহিনে বাজে অসীম প্রেরণার সুর। আহ কী সুন্দর করে সাজিয়েছেন, এ প্রকৃতি। এ ধরা। এ মনোরম জায়গা। যেন বিশ্ব প্রভুর হাতে গড়া সুন্দর, নন্দিত আর চোখ জুড়ানো ভুবন ভুলানো দৃশ্যপট। অপরূপ কাশ্মীরের মনমাতানো সৌন্দর্যে কত মানুষ মুগ্ধ হয়েছে। কাশ্মীরের প্রকৃতির প্রেমে জড়িয়ে কত কবি মনের মাধুরী মিশিয়ে কবিতা লিখেছেন। কত গল্পকার লিখেছেন শত শত পৃষ্ঠার রচনা। মুগ্ধতা ছড়ানো কাশ্মীর দেশ বিদেশের খ্যাতিমান কবিদের কলমে উঠে এসেছে একবার নয়, দু’বার নয়, বারবার। তাই কাশ্মীর হয়ে উঠেছে বিশ্বসাহিত্যের কবিতার খোরাক। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে আমরা কবিতায় কাশ্মীর নিয়ে আলোচনা করার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।
বাংলা সাহিত্যের নোবেলবিজয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা ও গানে কাশ্মীর উঠে এসেছে বারবার। কাশ্মীরের শিল্পমন্ত্রী জগদীশ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কবিকে কাশ্মীর সফরের আমন্ত্রণ জানালে রাওয়ালপিন্ডি পর্যন্ত প্রথম শ্রেণির টিকিট কিনে ১৪ আশ্বিন ১৩২২ সালে রবীন্দ্রনাথ রওনা হলেন। সেখানে তার থাকার জায়গা নির্ধারিত হয় শ্রীনগরের পাদমূলে বিতস্তা নদীবক্ষে। টিকারির মহারাজার ‘পরীস্থান’ নামক গৃহ নৌকাখানি কবির জন্য নির্দিষ্ট হয়। কার্তিকের ৭ তারিখে কবি কাশ্মীর দেখে মুগ্ধ হয়ে একটি জনপ্রিয় গান লিখেছিলেন। গানটি হল-
‘তরুণ প্রাতের অরুণ আকাশ চলেছিলো
নদীর ধারের ঝাউগুলি ওই রৌদ্রে ঝলোমলো।’
কার্তিকের ৯ তারিখে লেখেন আরেকটি জনপ্রিয় গান-
‘আজ আলোকের এই ঝরনাধারায় ধুইয়ে দাও
আপনাকে এই লুকিয়ে রাখা ধুলার ঢাকা ধুইয়ে দাও’
তার পর দু’ একদিনের মধ্যে লেখেন বিখ্যাত ‘বলাকা’ কবিতাখানি-
‘সন্ধ্যারাগে -ঝিলিমিলি ঝিলমের স্রোতখানি বাঁকা
আঁধারে মলিন হল, যেন খাপে ঢাকা
বাঁকা তলোয়ার
দিনের ভাটার শেষে রাত্রির জোয়ার
এল তার ভেসে -আসা তারাফুল নিয়ে কালো জলে
অন্ধকার গিরি তটতলে
দেওদার-তরু সারে সারে;
মনে হল, সৃষ্টি যেন স্বপ্নে চায় কথা কহিবারে
বলিতে পারে না স্পষ্ট করি-
অব্যক্ত ধ্বনির পুঞ্জ অন্ধকারে উঠিছে গুমরি।
সাহিত্যে একাডেমী পুরস্কার বিজয়ী কাশ্মিরী কবি ফারুক নাজকি বলেন, প্রতিদিন উদ্বিগ্ন যত কাশ্মিরীর সঙ্গে আমার দেখা হয়, আমার কবিতা উঠে আসে তাদের সেই উদ্বেগ থেকে। তিনি লিখেছেন,
‘আমাদের দরজা ও জানালায় আতঙ্ক ঝুলে থাকে
মুখোশ পরা শয়তান তখন আঙিনায় অপেক্ষা করে
চিনার গাছের খোড়ল থেকে বিড়াল মিউমিউ ডাকে
আমরা শব্দের জন্য তোতলাতে থাকি
কাঁদব কেমন করে
তরুণ আইরিস ফুল ধুলোতে লুটায়
মধ্য জানুয়ারিতে ক্ষুধার্ত সিংহ যেমন
গ্রামে চলে আসে অরণ্যে শীতের তুষারপাতের পর
হন্যে হয়ে সব শিকার ধরতে যায়,
তারা শিবিরের তাঁবুতে থাকত
স্বপ্ন লুকোনো তাদের চোখে
রাতের বালিশের পাশে রাখত গোলাপ
যাতে গোলাপের টানে ঘুম আসে তাদের চোখে
অথচ সাপঘিরে ধরে
বৃশ্চিক মাথা তুলে তাবুর ভেতর উঁকি দেয়
কোমল গোলাপের শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসে
পৃথিবী তাদের কাছে গনগনে আগুনের চুল্লি হয়ে ওঠে
আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো
রক্তের গোলা নেমে আসে
এখন আমরা আর কোনো গান শুনি না
আমাদের নাম ধরে আর কেউ ডাকে না
ফুলের পাপড়ি নিয়ে কেউ দেবী পুজো করে না
তারারই শরিকের উৎসব দেখতে কেউ যায় না
আমাকে থামিয়ো না,
আমার অনুভবগুলো ঢেলে দিতে হবে।’
রবীন্দ্রোত্তর বৈপ্লবিক ভাবধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্প পুরুষ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তার কবিতায় কাশ্মীরের চিত্র উঠে এসেছে এভাবে-
‘সূর্যের ছোঁয়ায় চমকে উঠেছে ভূস্বর্গ।
দু’হাতে তুষারের পর্দা সরিয়ে ফেলে
মুঠো মুঠো হলদে পাতাকে দিয়েছে উড়িয়ে,
ডেকেছে রৌদ্রকে,
ডেকেছে তুষার -উড়িয়ে নেওয়া বৈশাখী ঝড়কে,
পৃথিবীর নন্দন কানন কাশ্মীর।’
কিংবা
‘সুন্দর মুখ কঠোর করেছে কাশ্মীর
তীক্ষ্ণ চাহনি সূর্যের উত্তাপে,
গলিত বরফে জীবনের স্পন্দন
শ্যামল মাটির স্পর্শে ও আজ কাঁপে।
সাগর-বাতাসে উড়ছে আজ ওর চুল
শাল দেবদারু পাইনের বনে ক্ষোভ,
ঝড়ের পক্ষে চূড়ান্ত সম্মতি …
কাশ্মীর নয়, জমাট বাঁধা বরফ।
কঠোর গ্রীষ্মে সূর্যোত্তাপে জাগা …
কাশ্মীর আজ চঞ্চল-স্রোত লক্ষ:
দিগদিগন্তে ছুটে ছুটে চলে দুর্বার
দুঃসহ ক্রোধে ফুলে ফুলে ওঠে বক্ষ!
ক্ষুব্ধ হাওয়ায় উদ্দাম উঁচু কাশ্মীর
কালবোশেখির পতাকা উড়ছে নভে,
দুলে দুলে ওঠে ঘুমন্ত হিমালয়
বহু যুগ পরে বুঝি জাগ্রত হবে।’
বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান কবি আল মাহমুদ। তাঁর কবিতার প্রতিটি ছত্রে ছত্রে কাশ্মীর নিয়ে একটা বিদ্রোহের সুর বেজে উঠেছে। অন্যায় আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে তার কলম গর্জে উঠেছে বারবার।
কাশ্মিরীদের সমব্যথায় ব্যথিত জনগণের জন্যও ফুটে উঠেছে তার হৃদয়ভরা ভালোবাসা ও সমবেদনা। তিনি লিখেছেন-
‘মানবিক বৃত্তির যা কিছু প্রাপনীয়, কিনে নিতে হবে রক্তের দামে।
যেমন কিনে নেয় মানুষের গুলিবিদ্ধ বুক সন্তানের স্বাধীনতা, গ্রামগুলোর সম্ভ্রম।
ভূস্বর্গে আগুন জ্বলছে। আর আমাকে কে যেন চোখ বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে
বধ্যভূমির দিকে-
তবুও কি অদম্য মানুষের স্বাধীনতার গান।
স্বাধীনতা, শব্দটি পারতপক্ষে এখন আর উচ্চার্য নয়।
স্বাধীনতা, এক উপত্যকাবাসীর ফিনকি দেওয়া রক্তের চিৎকার। লেকের ভেতর প্রতিটি নৌকোয় এখন গুঞ্জরিত হচ্ছে কাশ্মীর। মনে হয় প্রতিটি বিষন্ন মুখই উদগীরণ করতে পারে বুলেট।
প্রতিটি যুবতীর বক্ষসুষমায় লুকিয়ে আছে বিস্ফোরক। প্রতিটি কিশোরীর ইজ্জতের ওপর এখন রোপিত আছে স্বাধীনতার পতাকা। অত্যাচারীর প্রতিটি রোমকূপ এখন আজাদির রক্তে সিক্ত। স্বাধীনতা এখন হাত বাড়িয়ে দেওয়া ইতিহাস কিংবা ইতিহাস এখন অপেক্ষমাণ কাশ্মীর।’
ভারতের জনপ্রিয় কবি সুবোধ সরকার। তাঁর কবিতা পড়লেই কাশ্মীরের মানুষ কেমন আছেন তা বুঝতে পারি। তিনি লিখেছেন-
‘কান্না তাকে বাঁচিয়ে রাখে
কান্না তাকে বাঁচায়
ভূস্বর্গের মধুরতম খাঁচায়।
সকাল বেলার আলো যখন
দরজা খুলে ঢোকে
ফুঁপিয়ে ওঠে চোখ
দেখেছি আমি বহু খারাপ লোক
কিন্তু আমি ভালবেসেছি তাকে
কান্না যাকে বাঁচায়।
আমার কাছে কান্না আর কী চায়?’
সুবোধ সরকারের কবিতায় এ এক অন্য কাশ্মীর যেন কাশ্মীর নামক একটা অপূর্ব জেলখানার ভেতর বসে এক তরুণী কাঁদছেন। জেলখানার বাইরে তার দেশ। এখান থেকেই শুরু কবিতা। ভালোবাসার কবিতা। প্রেমের কবিতা।
ভারতীয় সাহিত্যে যে ক’জন কবি ভারতীয় ইংরেজি কবিতার স্বতন্ত্র মানচিত্র নির্মাণ করেছেন আঘা শাহিদ আলি তাদের মধ্যে একজন। ১৯৪৯ সালে কাশ্মীরে জন্ম নেয়া এই কবির কবিতায় কাশ্মীরের একটি স্বচ্ছ চিত্র উঠে এসেছে এভাবে-
‘আমার আব্বাকে বোলো না যে আমি মরে গেছি।
রক্তে ভেসে যাওয়া রাস্তার ওপর দিয়ে আমি
রিজওয়ানের পেছনে
দৌড়াতে লাগলাম আর রাস্তার ওপর শয়ে শয়ে জুতো পড়েছিল
জানাযা নিয়ে যাওয়ার সময় গুলি খেয়ে মরেছিল মানুষগুলি
বাড়ির জানালাগুলি দিয়ে মায়েদের কান্না ভেসে আসছিল
আর শুকনো ছাইয়ের মত আগুনে পুড়ে যাওয়া বরফ
জ্বলতে থাকা বাড়িগুলির আগুনও নেভানো যাচ্ছিল না।
মাঝরাতে সেনারা ঐ বাড়িগুলি জ্বালিয়ে দিয়েছিল।
আগুনে পুড়ে যাচ্ছিল কাশ্মীর।’
কবিতায় কাশ্মীর - সাকী মাহবুববাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি মোশাররফ হোসেন খানের কবিতায় কাশ্মীরের বাস্তব প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে এরকম ভাবে-
‘ঝড়ের তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছো বারবার
তবুও দাঁড়িয়ে আছো! সম্মুখে চলেছো দুর্নিবার!
বিষাক্ত ছোবলে কতবার আক্রান্ত হয়েছো তুমি
তবুও ছাড়নি এতটুকু তোমার নিজস্ব ভূমি।
কত না হয়েছে পাশাখেলা, কত না ফানুস ছল
কত যে উঠেছে ফুঁসে নরপশু, হায়েনার দল।
কতভাবে হয়েছো ঝাঁঝহ, তবু স্থির আছো তুমি,
তবুও ছাড়নি এতটুকু তোমার প্রাণের ভূমি।
এখানে ঝরেছে কত প্রাণ হিসাব রাখেনি কেউ
আছড়ে পড়েছে রক্তবন্যা-ঝিলাম নদীর ঢেউ!
শহীদের খুন মেখে সবুজ হয়েছে গাঢ় লাল,
কাফনের পতাকায় লিখে গেছো নাম চিরকাল।
আসুক তুফান আরো! তবু পাহাড়ের মত তুমি
আগলে রাখো তোমার ইতিহাস, অস্তিত্বের ভূমি॥’

কাশ্মীর নিয়ে বর্ষীয়ান কবি আবদুল হালীম খাঁর উচ্চারণ শুনি-
‘ভারত মেশিন গানের আঘাতে
যত ক্ষতবিক্ষত করছ কাশ্মীর
তারচেয়ে অধিক ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে তোমার বুক
বিশ্ব মানবাধিকার
পাশবিক শক্তির উন্মাদনায় দিনরাত করছ হত্যালুট
জ্বালাচ্ছ পোড়াচ্ছ বাড়িঘর
ঝিলাম চেনাব নদীত ভেসে যাচ্ছে কত লাশ
তারচেয়ে বেশি ভাসছে তোমার ইতিহাস
আপেল কমলাবাগানে বারুদের গন্ধ ছাড়া হাওয়া নেই
নির্যাতনেই মিটিয়ে দিতে চাচ্ছ কাশ্মিরীদের
স্বপ্ন সাধ- আজাদীর সংগ্রাম
ভাবছ নির্যাতনই সুখের চুমুক।’

এমনি ভাবেই বিশ্ব সাহিত্যের অনেক নামীদামি জ্ঞানী, গুণী কবি সাহিত্যিকগণ ভূস্বর্গ কাশ্মীরের বর্ণিল শোভায় মুগ্ধ হয়ে প্রাণ উজাড় করে লিখেছেন কাশ্মীরের কবিতা। অন্য কোনো দেশকে নিয়ে কোন দেশের কবি সাহিত্যিকগণ এভাবে খুব কমই কবিতা লিখেছেন। যেমনটা লিখছেন কাশ্মীর নিয়ে।
তাই কাশ্মীর নিয়ে, কাশ্মীরের জনগণকে নিয়ে, কাশ্মীরের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সারা বিশ্বের কবি-সাহিত্যিকদের আরো সোচ্চার হওয়া দরকার, তাঁদের পাশে দাঁড়ানো দরকার। হওয়া দরকার আরো প্রতিবাদী। হয়তো কবিতার এই প্রতিবাদের ভাষাই একদিন তাদের এনে দেবে স্বাধীনতার স্বপ্নের ঠিকানা।

SHARE

Leave a Reply