Home গল্প দুষ্টুমির ফল । মুহাম্মাদ আলী মজুমদার

দুষ্টুমির ফল । মুহাম্মাদ আলী মজুমদার

সারা বিকেল খোঁজার পরও রাফির কোনো সন্ধান পাননি মা। খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত হয়ে এক পর্যায়ে ক্ষান্ত হন। ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেন ছেলেকে। মনে মনে ভাবতে লাগলেন বেঁচে থাকলে এমনিতেই ফিরে আসবে তার ছেলে।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। মিনার থেকে ভেসে আসছে মুয়াজ্জিনের সুমধুর আজান। আঁধারে ছেয়ে যাচ্ছে সব। ডানা মেলে পাখিরা ফিরছে আপন নীড়ে। শত উৎকণ্ঠা নিয়ে ছেলের জন্য অপেক্ষা করছেন মা। অপেক্ষার প্রহর যেনো শেষ হচ্ছে না। না, এখনো রাফি আসার কোনো নামগন্ধও নেই। অজানা আতঙ্কে কেঁপে উঠল মায়ের মন। তাহলে কি তার ছেলে হারিয়ে গেছে! হার্টবিট বেড়ে যাচ্ছে তার। পুরো শরীর ঘেমে ভিজে গেছে। দুশ্চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়ে গেল তার। হঠাৎ আওয়াজ ভেসে এলো-মা, মা! দরজা খোলো। দরজা খুলতেই মায়ের মন খুশিতে ভরে যায়। তার রাফি তাহলে ফিরে এসেছে! বাইরে দাঁড়িয়ে আছে! কিন্তু দরজা খুলতেই তার চক্ষু ছানাবড়া হয়ে ওঠে। একি! তার ছেলের হাতে আস্ত একটি বাবুই পাখির বাসা। বাসার ভেতরে পাখির ছানার আওয়াজ। চিঁউ চিঁউ করে কাঁদছে। মা মনে মনে ব্যথিত হলেন। ভাবলেন, ছেলেটা বুঝি আর ঠিক হবে না! পাখির বাসা ভাঙতে কতবার যে তিনি নিষেধ করেছেন তার হিসেব নেই। কত বুঝিয়েছেন, মারধর করেছেন! কিন্তু কে শুনে কার কথা!
রাফি। চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। পড়ালেখায় দুর্বল। স্কুলের হাজিরা খাতা খুললে দেখা যাবে মাসে তার উপস্থিতি বড়জোর চার/পাঁচ দিন। সারাদিন বনে বাদাড়ে ঘুরে ঘুরে পাখির বাসা ভাঙা-ই তার একমাত্র কাজ। গাছে গাছে লাফালাফি করাই যেনো তার নেশা। কোন গাছে কোন পাখির বাসা, কোন বাসায় কয়টা ছানা- এসব তার পুরো মুখস্থ। কত পাখির বাসা যে তার খাটের নিচে পড়ে আছে তার হিসেব সে নিজেও জানে না। এখনো দোয়েল, বাবুই এবং মাছরাঙার ছয়টি বাচ্চা তার খাঁচায়। সারাদিন পাখি নিয়েই ব্যস্ত থাকে সে। পাখিদের আদর করবে, খানা খাওয়াবে, গোসল করাবে নিয়মিত। পাখির ডাকাডাকি তার খুব পছন্দ। পাখি দেখলেই তার মন খুশিতে ভরে যায়। বিশেষ করে যখন সে কোন নতুন পাখির সন্ধান পায়, তখন আর তার খুশির সীমা থাকে না।
রাফির দাদা তাকে অনেক বুঝিয়েছেন পাখির বাসা না ভাঙতে। পাখিদের দুঃখ নিয়ে কত গল্প শুনিয়েছেন তাকে! কিন্তু কথায় আছে-চোর না শুনে ধর্মের কথা। তার অবস্থাও সে রকম।
একদিন রাফির ছোটভাই কাফিকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছিল না। সম্ভাব্য সকল স্থানে খোঁজার পরও তার কোন সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। তার মা’র তো কী করুণ দশা! মাটিতে গড়াগড়ি করে বিলাপ করছিলেন। কত মানুষ এসে দেখে যাচ্ছিল এ দৃশ্য। সবাই তার মাকে সান্ত¡না দিচ্ছিল। গ্রামের সবাই মিলে খুঁজছিল তাকে। রাফিরও সে কী কান্না! কাঁদতে কাঁদতে তার হেঁচকি ওঠে। সারা গ্রাম দৌড়ে দৌড়ে খোঁজ করে তার ভাইকে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে নদীর চরে পাওয়া যায় কাফিকে। ভাইকে ফিরে পাওয়ার পর রাফিরও কী আনন্দ! মা যেনো হাতে পায় আকাশের চাঁদ। কান্না থেমে যায় তার। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে প্রাণভরে আদর করেন।
এই ঘটনার দু’দিন পর বিকেলবেলা দাদার সাথে ঘুরতে বের হয় রাফি। দাদা তাকে বোঝাতে লাগলেন। বললেন,
– শোনো দাদাভাই, ঐদিন কাফিকে না পেয়ে তুমি কান্না করছিলে কেন?
– আমার খুব খারাপ লাগছিল দাদাভাই। কাফিকে আমি খুব ভালোবাসি। আমি মনে করছিলাম সে চিরতরে হারিয়ে গেছে। আর কোনোদিন ফিরে পাব না তাকে। জানো দাদাভাই, তখন কষ্টে আমার বুকে চিন চিন করছিল।
– তোমার আম্মুর অবস্থা দেখেছিলে তখন?
– আম্মুকে দেখে আমার তো আরো মন খারাপ হয়ে যায়। মায়ের কান্না দেখে আমি আর ঠিক থাকতে পারিনি। তখন মনে মনে আল্লাহর কাছে দোয়া করছি-আল্লাহ আমার ভাইকে তুমি ফিরিয়ে দাও।
– এবার আসল কথা শোনো দাদাভাই। তোমার যে রকম ভাই আছে, মা আছে, পাখিদেরও আছে। তুমি যে রকম কষ্ট পেয়েছিলে, পাখিদের কোনো ভাই হারিয়ে গেলে তারাও এরকম কষ্ট পায়। তোমার মা যেমন কান্না করছিল, পাখিদের মাও তার সন্তানের শোকে এ রকম কান্না করে।
রাফি বুঝে গেছে দাদা কী বোঝাতে চাচ্ছেন। এসব উপদেশ তার কাছে খুব বিরক্ত লাগে। আগেও দাদা তাকে পাখির বাসা না ভাঙতে অনেক বুঝিয়েছেন। মাও অনেক বারণ করেছেন। কিন্তু এসবের ধার ধারে না সে।

আজ সোমবার। স্কুলে যায়নি রাফি। চলে গেছে সোজা নদীর চরে। সেখানে ঝোপঝাড়ে অনেক পাখির বাসা। মাসে দুয়েকবার চরে যায় সে। দশদিন আগেও এসেছিল। চরের উত্তর পাড়ের একটি গর্তে মাছরাঙার বাসা আবিষ্কার করেছিল সে। বাসার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দশটি ছানা বের করেছিল। কী ছোট ছানাগুলো! তখনো চোখ ফোটেনি। পালক গজায়নি। সবে মাত্র জন্ম নিয়েছিল। হাতের মধ্যে চিঁউ চিঁউ করে কান্না করছিল। মনে মনে ভাবতে লাগল এই দশ দিনে নিশ্চয়ই ছানাগুলো অনেক বড় হয়ে গেছে। চোখ ফুটেছে। পালক গজিয়েছে। একটু একটু উড়তেও পারে। ছানাগুলো হাতে পেলে অনেক মজা হবে। বাড়িতে নিয়ে পালবে। বড় হলে মজা করে খাবে। এসব ভাবতে ভাবতে চলে আসল মাছরাঙার বাসার সামনে। খুশিতে নাচছে তার মন। উত্তেজনা বেড়ে গেছে তার। ধুকপুকানি শুরু হয় বুকে। না, আর দেরি করা যায় না। ডান হাত ঢুকিয়ে দিলো গর্তের ভেতর। কিন্তু কই? কোনো পাখির অস্তিত্ব অনুভব করছে না সে। তাহলে কি পাখি চলে গেছে? সাত পাঁচ ভেবে আরো ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দিল সে। হঠাৎ কী যেন একটা ছোবল মারে তার কব্জিতে। ‘ও মাগো’ বলে সজোরে একটা চিৎকার মারল। তাড়াতাড়ি করে হাত বের করে নিয়ে আসল। একদম দাঁত বসে গেছে কব্জিতে। চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত বের হচ্ছে। একটু পরই বড় একটা সাপ বের হলো গর্ত থেকে। ফণা তুলে দাঁড়িয়ে ফোঁসফাঁস করছে সাপ। ভয় পেয়ে যায় রাফি। বুকের ভেতর ধুকধুক শব্দ হতে লাগল। ব্যথায় সারা শরীর নীল হয়ে গেছে তার। যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে পড়ে সে। ডান হাতটা কয়েক মণ ভারী মনে হলো তার কাছে। আল্লাহ……
বাঁচাও! বলে দৌড়ানো শুরু করল বাড়ির দিকে।

SHARE

Leave a Reply