Home সম্পূর্ণ কিশোর উপন্যাস ডাব্বু দ্য গ্রেট । ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ

ডাব্বু দ্য গ্রেট । ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ

ডাব্বু দ্য গ্রেট । ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ

গত সংখ্যার পর

দুপুরের পর উল্টো দিকের বাড়ি থেকে হইচই ভেসে আসছে। হাসি-গান হই-হুল্লোড়ের আওয়াজের শব্দে ডাব্বু বই খাতা ছেড়ে লাফালাফি শুরু করে।
রিনা বলে, এসব কী হচ্ছে? অঙ্ক কষতে দিলাম যে, কমপ্লিট হয়েছে? না ডাব্বু, তোমাকে নিয়ে আর পারি না।
কাচুমাচু হয়ে ডাব্বু বলে শুনছ মা? কেমন চ্যাঁচামেচি হচ্ছে?
হ্যাঁ গান বাজছে- আমাকে আমার মতো থাকতে দাও- আমি আমার মতো থাকি মা। গানেও তো এই কথা বলছে।
বিনি গালে হাত দিয়ে বলে, তোমাকে তোমার মতো থাকতে দিতে হবে- গানেও এমন কথা থাকে?
রিনা বলে, যাও তো তোমার কাজে। সিটিতে তুমি কী নম্বর পাও দেখব। মুখে খালি বড় বড় কথা তোমার।
সোমনাথ এসে দাঁড়িয়েছেন।
– সিটিটা আবার কী বউমা?
– ক্লাস টেস্ট বাবা, ওগুলো আবার আসল পরীক্ষার সঙ্গে যোগ হবে।
– সে তো বুঝলাম রিনা, ঐ শোন ঝমঝম করে কেমন সিনেমার গান চলছে। রবিউলের সঙ্গে দাবায় বসে আমিও মন দিয়ে খেলতে পারছি না, ও একটা বাচ্চা বৈ তো নয়।
– এখন মানুষ কারো কথা ভাবে না বাবা। অস্ট্রেলিয়া থেকে পুরো ফ্যামিলি এসেছে তাই গেট টুগেদার করছে। ওদের আত্মীয় স্বজন বড় কম নয়।
– তা হোক রিনা, পাড়া-প্রতিবেশী সবার কথাই তো ভাবা উচিত। মানুষ এত স্বার্থপর হয় কী করে বুঝি না।
ডাব্বু অংক খাতা নিয়ে বসেছে, অংক কষা তো হচ্ছে না, ও দাদান আর মায়ের কথা শুনছে।
রিনা বলে, গাজালা আন্টির প্রেসারও নাকি বেড়েছে, এই আওয়াজে কি বিশ্রাম নেয়া যায়?
দাদান মলিন মুখে বলেন, একটু আস্তে বাজাও, ডিসটার্ব হচ্ছে বা ভাবীর শরীর খারাপ এসব কিছু বলা যাবে না। গতকালের কাগজেই তো এসেছে, একটি ছেলে এমনই এক ব্যাপারে প্রতিবাদ করায় ওকে সবাই মিলে মারধোর করেছে, ছেলেটি এখন হাসপাতালে রয়েছে।
– দেখতে দেখতে বড্ড সেলফিস হয়ে গেল মানুষ। রিনা বলে, আমাদের এসব সয়েই দিন কাটাতে হবে। ডাব্বু, তোমাকেও এমন হইচইয়ের মাঝে পড়াশোনা করা শিখতে হবে।
টেনশান টেনশান আর টেনশান। পরীক্ষা এলেই টেনশান শুরু হয় সারা বাড়িতে। থমথমে হয়ে ওঠে সারা বাড়ি।
রিনা বলে পড়, পড়-
অফিস থেকে ফিরে সন্ধ্যাবেলা সৌম্যও বলেন, কি রে ডাব্বু, অঙ্ক কষছ নাকি? পড়ার আওয়াজ তো শুনছি না।
মিথ্যে করেই ডাব্বু বলে, আমি অঙ্ক কষছি যে।
একবারও বড়রা কেউ জিজ্ঞেস করে না, গাড়িগুলো সাজিয়ে তুমি খেলছ তো? ছবি আঁকছ? জানালা দিয়ে আকাশের মেঘ দেখছ? কিংবা দেখেছ ডাব্বু কী চমৎকার ঝিরিঝিরি বৃষ্টি থেকে ঝুমঝুম বৃষ্টি হয়ে গেল।
নাহ্- এসব কোনোদিন মা-পাপা বলেনি। দাদান অবশ্য মাঝে মাঝে বলে, গোল্লু বৃষ্টি পড়ছে, আমার কাছে চলে এসো, দু’জনে মিলে দেখি।
কিংবা বলেন আকাশটা কী নীল- দেখেছিস গোল্লু।
কোনোদিন ডাব্বু আকাশটাকে অমন করে দেখেনি। দাদার পাশে ব্যালকনিতে বসে ও দেখে মেঘ যে কত রঙের হয়। গোলাপি, কালচে, সাদা কমলা- এক নিমেষে আকাশটাকে দুচোখ ভরে দেখে নিল সে মালটিকালার মেঘগুলোকে।
‘মধু গন্ধে ভরা’- গুনগুন করে গাইতে গাইতে রিনা এলো।
– ইসস কী শুরু হয়েছে এসব। ছেলেমেয়েরা গিটার আর ব্যান্ড বাজিয়ে গাইছে-
খায়রুন লো, তোর লম্বা মাথার কেশ-
রবিউল দাবা খেলায় হেরে গেছেন। এবার বাড়িতে ফিরবেন।
– আমি এখন যাই রিনা, মাথা ধরে গেছে আমার। রিনা বলে, – আমরা কোথায় যাবো আংকেল, যতক্ষণ এগুলো চলবে সইতে হবে।
পাশের জানালা থেকে মুখ বাড়িয়ে গাজালা বলেন,
– ক্যায়সা শুরু কিয়া রিনা, খতম তো হোচ্ছে না।
– ওরাই জানে আন্টি কখন খতম হবে।
বই-খাতা-পেনসিল নিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকে ডাব্বু। মা যতই বলুক আজ আর পড়া হবে না এই ধুমধাড়াক্কা বাজনার মাঝে কোনো রকমে হোমওয়ার্কটা সারতে পেরেছে। রাত সাড়ে নটার দিকে হইচই গান কথাবার্তা থামল।
তখন খেতে বসেছেন সৌম্য দাদান ডাব্বু। রিনা পরিবেশন করছে।
রিনা বলে, সেই দুপুর থেকে যে কী হট্টমেলা শুরু হয়েছে, ডাব্বুর পড়াটা আজ হলো না।
সোমনাথ বলেন, মাঝে মাঝে গ্যাপ দেয়া দরকার রিনা। একটানা একঘেয়ে পড়া কি কারো ভালো লাগে?
এ কারণেই দাদানকে এত ভালো লাগে ডাব্বুর। সৌম্য খেতে খেতে বলেন, ডাব্বুর পরীক্ষা আসছে না যেন টারজান আসছে।
টারজান আসছে – হি হি করে হাসতে থাকে ডাব্বু। বিনিমাসী বলে, আমিও তো চামচ বাটি খুন্তি হাতা ধীরে ধীরে নাড়ি, যেন কোনো আওয়াজ না হয়।
দাদান বলে, ওসব কথা বলিস না বিনি, তুই যা মন মন ধানাৎ করে হাতা খুন্তি বেড়ি ফেলিস- আমি তো পত্রিকাই পড়তে পারি না।
লজ্জা পেয়ে বিনি বলে, বড়বাবা যে কী বলে। সৌম্য বলেন, তুমি এমন এক অবস্থা করো রিনা, সত্যি মনে হয় জঙ্গল থেকে টারজান আসছে। বাবা সত্যিই বলেছেন, পাস নয়তো ফেল- একটা তো হবেই, এর জন্য এত সুনসান বাসা। মনে হয় ভুতুড়ে বাড়ি। ডাব্বু ভয় পায় না, ভয় পাস ডাব্বু?
– একটুও না।
– তো তুমি এত ভয় পাও কেন? মনে হয় তোমার পরীক্ষা। রিনা রেগে বলে, তা হবে না কেন? গার্জেন কল এ কখনো যাও না, তোমার সময় নেই, বিদেশী ডেলিগেটদের সঙ্গে তোমার মিটিং। তুমি তো সব সময় বলো- আমার সময় কোথায়? আমি তা বলতে পারি না। খুশবু ম্যাম, টিপটিপ ম্যাম- সবার কথা আমার শুনতে হয়। ছেলের জন্য অনেক অপমান সইতে হয়।
সৌম্য বলেন ঠিক আছে এবার থেকে আমিই যাবো স্কুলে। সোমনাথ বলেন, ছেলে কি করছে, না করছে- ওর ডিফেক্ট কোথায় তা তো ভালো করে শুনে আসতে পারো। তোয়ালেতে হাত মুছতে মুছতে সৌম্য বলেন, এবার থেকে আমিই যাবো। পরীক্ষার আগে বাসার যা থমথমে অবস্থা হয় এটি তো ঠিক নয়। রিনার ফোবিয়ার মতো হয়ে গেছে।
দাদান বলেন,- দিয়েগো ম্যারাডোনা কি অংকে ১০০ পেয়েছে- বলতো রিনা! পৃথিবীর অনেক নামি মানুষ রয়েছেন ওরা সবাই কিন্তু পড়াশোনায় খুব একটা ভালো ছিলেন না। আমাদের শুধু দেখতে হবে ওর ইন্টারেস্ট কোন দিকে।
কথা শুনতে শুনতে রিনার টেনশন অনেকটা কমে গেছে। সত্যিই তো, সবে ক্লাস টুতে পড়ছে। সামনে অনেক সময় ওর।
রিনা বলে, সিটি পরীক্ষা দিয়ে এলে আমি জিজ্ঞেস করি- কেমন পরীক্ষা দিয়েছিস রে? ও কাঁধ ঝাঁকিয়ে কি বলে বাবা জানেন?
হেসে গড়িয়ে পড়ে রিনা। বলে গোল্ডেন ফাইভ পাবো। বাবা দাদান দু’জনই হাসেন ঠা ঠা করে। পরীক্ষার আগে এমন প্রাণখোলা হাসি এ বাড়িতে কখনো হয় না।
সৌম্য হাসিমুখে বলেন, গোল্ডেন ফাইভ পাওয়া জীবনের একমাত্র লক্ষ্য করো না। প্রথমে ভালো মানুষ হতে হবে। বি অ্যা ম্যান- মানুষ হও ডাব্বু।
দাদান বলেন, পাপার কথা মনে রেখো গুল্লু। ভালো মানুষ হতে হবে, তবে বেসিক একটা পড়াশোনার দরকার। পড়াশোনা ভালো ভাবে না করলে জীবন আর জগৎ সম্পর্কে তুমি জানবে কী করে।
সৌম্য বলেন, ভালো মানুষ হতে গেলে প্রথমে সবার কথা ভাবতে হবে। এই যে আজ দুপুর থেকে ১২ নম্বর বাড়িতে হৈ-হল্লা খাওয়া-দাওয়া আর গান বাজনা হলো- সে তো ভালো কথা। উৎসব না হলে একঘেয়ে জীবন পানসে হয়ে যায়। এ জন্যই তো আমরা কুমিল্লাতে গিয়ে ময়নামতী দেখি, কক্সবাজার গিয়ে সমুদ্র দেখি, সিলেট গিয়ে চা বাগানে যাই। শুধু স্কুলে যাওয়া অফিসে যাওয়া তো কারোর ভালো লাগতে পারে না।
রিনা বলে, ১২ নং বাড়িতে সেলিব্রেট করেছে ভালো কথা। কিন্তু মাইক বাজিয়ে, ড্রাম পিটিয়ে হৈ-হল্লা করার কী দরকার ছিল? তোমার দাদান ঘুমোতে পারেননি, দুপুরবেলা আমি একটু ঘুমোই- তাও পারিনি, তোমার গাজালা দিদুনের এই আওয়াজে প্রেসার বেড়ে গেছে, তুমি পরীক্ষার পড়া পড়তে পারো নি, বলো এটা কি কারো করা উচিত?
– নো নট অ্যাট অল মা। একটা কথা বলি? দাদান বলেন, বল, স্পিক আউট। খোলাখুলি কথা বলা দরকার।
ডাব্বু বলে, আমি যেমন গোল্ডেন ফাইভ পাবো বলে মাকে মিথ্যে বলি, মাও কিন্তু আমার সাথে মিথ্যে কথা বলে। রিনা অবাক।
– আমি আবার কখন মিথ্যা বললাম রে?
– এইতো শনিবার বলেছ।
– কী বলছিস রে?
– হ্যাঁ মা বলেছ। তুমি মুখ কালো করে বলেছ, ডাব্বু আজ তেমন কিছু রাঁধতে পারিনি। আমার জ্বর হয়েছে ভীষণ। বিনিও ওর মেয়েকে দেখতে গেছে।
মন খারাপ করে আমি টেবিলে রাখা বাটির ঢাকনাগুলো তুলে দেখি- তুমি কৈ মাছ রেঁধেছ, শামি কাবাব করেছ।
সবাই হেসে ওঠে
সৌম্য বলে, এটা কিন্তু তোমার মায়ের মিথ্যে বলা নয়। এটা হলো ফান। এগুলো মাঝে মাঝে করা যায়।
নিচে শোরগোল শোনা যাচ্ছে। তিন তালায় ওরা আছে বলে মোটামুটি চিৎকার-চেঁচামেচি শুনতে পাওয়া যায়। ডাব্বু উত্তেজিত হয়ে বলে, ডাকাত পড়লো নাকি পাপা? সৌম্য হেসে বলেন, দূর ব্যাটা সোয়া দশটা বাজে। চোর-ডাকাত আসে গভীর রাতে।
ডোর বেল বেজে ওঠে।
সোমনাথ বলেন, ‘আই’ দিয়ে আগে দ্যাখো, তারপর দরজা খোলো।
দরজা খুলে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন সৌম্য। শুধু বলতে পারেন ওহ মাই গড।
চারতলার মকবুল ড্রাইভারের হাতে মিনি বিড়ালটি ঝুলছে।
মকবুল বলে, গেটের মধ্যিখানে আন্ধাইরের মাঝে শুইয়া রইছে। গাড়িটা ভেতরে ঢোকাইতেই ক্যাঁচ কইরা আওয়াজ হইল। নাইম্যা দেখি আমাগো ডাব্বু ভাইয়ার পুষি ক্যাট। মইরা গ্যাছেগা।
সৌম্য বলেন, দাঁত বের করে হাসছে মকবুল? বিড়াল মেরে খুব আনন্দ হচ্ছে? তুমি কি মানুষ?
চিৎকার করে কেঁদে ওঠে ডাব্বু।
– আমার পুষি ক্যাট মরে গেছে পাপা?
সোমনাথ বলেন, বিড়ালটিকে তুমি দেখতে পেলে না? গাড়ির সামনে কি আছে না আছে দেখবে না? শুধু স্টিয়ারিং চালালেই হয়?
রিনা মৃদু স্বরে বলে, তুমি জানো মিনিটাকে কত ভালবাসত ডাব্বু। তোমার গাড়ির নিচে চাপা দিয়েছো। আমাকে আবার দেখাতে নিয়ে এসেছো?
মকবুল বলে, আফনেরা এত মন খারাপ করতাছেন ক্যান? চাইরতলার খালাম্মায় কইতো এ্যাই বিলাইটা বড় জ্বালায়।
বিনি রেগে বলে, সে তো আমাদের দুধ খেয়েছে মাছ ভাজি খেয়েছে। তাতে কি? বিড়াল তো চুরি করেই খায়। আমাদের ডাব্বু ওকে খেতে দিত। জানো ডাব্বু ভালোবাসে, মরা বিড়ালটাকে দেখাতে নিয়ে এসেছ কেন?
ডাব্বু কাঁদছে।
আমার পুষি ক্যাট আর আসবে না, তাই না দাদু। মা বিনিমাসী ওরা পুষির ওপর রাগ করত, দুধ খেয়ে নিয়েছে, মাছভাজা চুরি করে নিয়ে পালিয়েছে। এবার তো আর আসবে না ও। মকবুল আঙ্কেল, আপনি কেন ওকে গাড়ির নিচে চাপা দিলেন?
দারোয়ান আলী বলে, ও তো ইচ্ছা কইরা মারে নাই। আতকা গাড়ির নিচে আয়া পড়ছে। এতে কান্দনের হইছেটা কি? মকবুল দাঁত বের করে আগের মতো হাসছে।
– মরলে কান্দেনি?
হাসতে হাসতে ড্রাইভার আর দারোয়ান বিড়ালটি নিয়ে লিফটে ওঠে।
ডাব্বুর কান্না আর শেষ হয় না।
মা বাবা পাপা সবাই বলছে, এমনই হয় রে ডাব্বু। এ যে খুব স্বাভাবিক, জীবন আর মরণ পাশাপাশি থাকে। এটা তো বুঝতে হবে তোমার।
ছেলের কান্না তবু থামে না।
পাশে জানালা দিয়ে সরফরাজ জিজ্ঞেস করেন, ক্যায়া হুয়া বেটা? কান্না ভাঙা সুরে ডাব্বু বলে, মকবুল আঙ্কেল আমার পুষি ক্যাটকে গাড়িতে চাপা দিয়ে মেরে ফেলেছে।
হুঙ্কার দেন সরফরাজ।
মকবুল ড্রাইভার তো? বহুৎ বেত্তমিজ আছে। গিদ্ধর বুরবাক কাঁহিকা। মানুষ মরুক, কুকুর মরুক, বিড়াল মরুক ওর তো কিছু আসে যায় না।
দাদান বলেন, ওর কান্না কিছুতেই থামছে না দোস্ত।
– কাঁদতে দাও ওকে সোমনাথ। আচ্ছা দিল হোনা বহুত জরুরি হ্যায়। পুষি ক্যাটের জন্য সবার তো রোনা আসবে না।
রাত সাড়ে দশটা বাজে। সরফরাজ চলে আসেন ছেলেটাকে সান্ত্বনা দিতে।
সরফরাজের বুকে মুখ চেপে ডাব্বু কাঁদে।
– আমার মিনি, মাই পুষি ক্যাট- ওকে কেন গাড়িচাপা দিয়ে মেরে ফেলল?
সৌম্য বলেন, কাম টু দ্য পয়েন্ট। মকবুলের কাজই তো হলো গাড়ির নিচে কুকুর-বেড়াল আর মানুষ চাপা দেয়া। সরফরাজ মৃদু গলায় বলেন, জিওন এয়্যাসাই বেটা। দাদান বলেন,- আমার ছেলেবেলায় রাজকাপুরের সিনেমা দেখেছি। ইস ইস কী চমৎকার গান।
‘জিনা ইহা মরনা ইহা
ইসকে সেওয়া যায়ু কাঁহা-
ডাব্বুকে আদর করতে করতে সরফরাজ বলেন রোনা বহুত আচ্ছা হে বেটা। বিড়ালের জন্য কি সবার চোখ থেকে আঁসু নিকালতে?
ডাব্বুর দু’ চোখ আর গাল মুছিয়ে দিতে দিতে বলেন- এ তো ডাব্বু ভাইয়া কি আসুঁ নেহি, মোতি আসলি মোতি। সৌম্য বলেন বলেন, চিয়ার আপ মাই বয়। দাদান যে গানটি গাইলো,
জিনা ইহা মরনা ইহা- জীবন আর মরণ পাশাপাশিই থাকে। যে খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। কষ্ট হবে, বিড়ালটি তো আর আসবে না। তারপরও আমাদের মেনে নিতে হয়।
বেশ কিছুদিন লেগেছিল ডাব্বুর পুষি ক্যাটকে ভুলতে। এখনো মাঝে মাঝে কোন বিড়ালের মিউ মিউ ডাক শুনলে বই-খাতা-পেন্সিল মার্কার সব ফেলে জানালা দিয়ে বাইরের রাস্তা দেখতে থাকে সে। অংক কষতে ভুলে যায়। ভালো করে দেখতে না পেলে ব্যালকনিতে গিয়ে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে দেখতে থাকে ডাব্বু।
বুকের ভেতরে আবার মন খারাপের মেঘ জমতে থাকে।

ডাব্বু দ্য গ্রেট । ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থপাপা, আমাকে একটি পাখি এনে দিতে হবে। আমি একা একা থাকি। বিনিমাসী মাছ ভাজে, মুরগির ঝোল রাঁধে। দাদান খবরের কাগজ পড়ে, নিরু দিদুন চলে গেছে। একা একা আমার ভালো লাগে না, আমাকে একটা পাখি এনে দিতে হবে কিন্তু। স্টেন গান, পিস্তল বাঘ ভাল্লুক সিংহ জলহস্তী রং পেন্সিল খাতা ছবির বই সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘোষণা দেয় ডাব্বু।
ব্যস, শুরু হয়ে গেল ঘ্যান ঘ্যানানি। সোম্য অফিসে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছেন। মুখভর্তি ফেনা সেভ করতে করতে বলেন, আমাকে আমার মত থাকতে দাও- গানটি তুমি মাঝে মাঝে গাও তো।
হ্যাঁ গাই।
এর মাঝে একটি কথা আছে- সব পেলে নষ্ট জীবন- সেটা তো তুমি গাও না বাবা। তুমি একটার পর একটা জেদ ধরবে, এটা এনে দাও। ওটা এনে দাও- এটা খুব খারাপ ডাব্বু। তুমি যদি বল আকাশের চাঁদ এনে দাও- আমি দিতে পারবো- বল! কত দামি দামি গাড়ি তোমার- হ্যাঁ রোলস রয়েস, মার্সিডিজ বেঞ্চ শেভ্রলেট, মাজদা, ডাটসন রোলস রয়েস অস্টিন এলোমেলো হয়ে পড়ে রয়েছে।
ডাব্বুর টানা টানা দু’ চোখের কোণে কান্না। মুখে রাজ্যের বিষাদ, অনুযোগের অন্ত নেই ওর।
আমার সঙ্গে কেউ খেলে না, মা স্কুলে, তুমি অফিসে চলে যাও। দাদান পত্রিকা পড়ে, বিনিমাসী সারা দিন রাঁধতেই থাকে। একা একা আমি কী করবো?
সৌম্য টাইয়ের নট ঠিক করতে করতে বলেন- যার যার কাজ সে করবে না? তোমার কাজ পড়া- তুমি তাই করবে।
ঘোঁতঘোঁত করে ডাব্বু।
আমার কাজ সারাদিন পড়া? খেলা নয়? ঘুড়ি ওড়ানো নয়?
তড়িঘড়ি করে খাচ্ছেন পাপা, মাও তৈরি। আজ ডাব্বুর স্কুল ছুটি, মায়ের স্কুল নয়।
দিদুন, বলার হতো আর আমি ব্যাট করতাম। দিদুন গোলকিপার হতো আর আমি জোরে জোরে কিক করতাম।
টিভিতে তুমি কার্টুন দেখতে পারো। টম এন্ড জেরি দেখতে পারো।
কখন দেখবো? সকাল বেলা স্কুল, ফিরে অল্প রেস্ট নিয়ে আবার হোমওয়ার্ক। যখন পড়া শেষ হয় তুমি আর দাদান তখন নিউজ দেখো, মা দেখে সিরিয়াল। আমি যখন দেখতে যাই তোমরা বল, তোর পড়াশোনা নেই ডাব্বু? অংক কষা শেষ?
বলতে বলতে ঠোঁট ভেঙে কাঁদতে থাকে সেভেন প্লাস ডাব্বু।
একবারও তো বলো না, ডাব্বু তুই ক্রিকেট খেলবি? আয় আমরা খেলি। আমি তামিম হয়ে ব্যাট করব। তুমি বলার হও তাসকিন না হলে মোস্তাফিজুরের মত। হাইড অ্যান্ড সিক খেলার মত কোনো জায়গা নেই, মাঠ নেই। ঘরে বসে গাড়ি আর বাঘ ভালুক নিয়ে খেলতে ভালো লাগে?
সোমনাথ বলেন, দাদুভাই এসো আমার কাছে। রিনা, ও যা কমপ্লেন করেছে তা তো মিথ্যে নয়। ওর সঙ্গে আমাদের কাউকে না কাউকে খেলতে হবে। ওকে দেখলেই পড়ো পড়ো, নয়তো হোমওয়ার্ক শেষ হয়েছে তোমার- এমনই করি আমরা। বড়দের কথা শোনাই যেন ওদের কাজ, ওদের যে একটা মন আছে সে কথা ভাবি না কেন? আসলে বড়রা ছোটদের মন বুঝতেই পারি না।
দেরি হয়ে যাচ্ছে, মা আর পাপা চলে গেলেন। দাদানের কাছে শুয়ে থাকে ডাব্বু।
তোমার একটা কাকাতুয়া খেলনা ছিল না গোল্লু? টকিং বার্ড? কথা বলা পাখি?
– হ্যাঁ হ্যাঁ, দাদান, ছিল তো।
হাসতে হাসতে ডাব্বু বলে, ওর মুখে সন্দেশের টুকরো দিয়ে বলতাম, খাও।
পাখিটিও বলতো তুমি খাও।
দাদান বলেন, ইট ইমিটেটস, যে যা বলতো ও তাই বলতো। বেশ মজা কাকাতোয়া। এটা দিয়ে এখন খেলো না কেন শুনি?
– আমাদের ক্লাসের দীপ একদিন এসেছিল, ভারী দুষ্টু। ভেতরের মেশিনটাই ভেঙে ফেলেছে। কাকাতুয়া এখন আর কথা বলে না।
– ভেরি স্যাড।
গেল বছর ওর জন্মদিনে রিনা বলেছে, এখন কেক কেটে নাও, হ্যাপি বার্থডে টু ইউ, কাকাতুয়াটি সঙ্গে সঙ্গে বলেছে, কেক কাটো, হ্যাপি বার্থডে টু ইউ।
সোমনাথ ভাবেন, ছোটরা কি একা বাসায় সারাক্ষণ পড়া আর হোমওয়ার্ক নিয়ে থাকতে পারে? ওদেরও তো সঙ্গী চাই।
ডাব্বু বলে, মাকে কত প্রশ্ন করি দাদু, মা একটিরও আনসার দিতে পারে না। প্রশ্নের উত্তর মা জানেই না।
– বলো কি প্রশ্ন করেছ মাকে, যার উত্তর দিতে পারেনি?
– ক’দিন আগে আমার জ্বর হয়েছিল তো, মনে নেই তোমার? মা স্যুপ বানিয়ে আমাকে খাইয়ে দিয়েছিলো। আমি জিজ্ঞেস করেছি, জ্বর হয়েছে তাই মুরগির স্যুপ খাচ্ছি। মুরগির জ্বর হলে ওরা কিসের স্যুপ খায় মা? ঠা ঠা করে হেসে ওঠেন সোমনাথ।
– মা কি বলল শুনি?
– মা কিছু বলতে পারল না। জানেই না মা। বলল, সারাদিন মাথায় তোর উদ্ভট সব প্রশ্ন।
– আমি কিন্তু দাদু, সব প্রশ্নের জবাব জানি। টিপটিপ ম্যাম জিজ্ঞেস করেছিল, মাছ কোথায় থাকে? আমি গেল বছর গাঁয়ের বাড়িতে গেছি তো, সেখানে দেখেছি পুকুরে খালে বিলে মাছ থাকে। জেলেরা জাল দিয়ে মাছ ধরে। আমি তাই বলতে পেরেছি, মাছ জলে থাকে।
– এ প্রশ্নের উত্তর সবার জানা উচিত।
– না না দাদান, সবাই জানে না। অথৈ, তুহিন, মীলু আর রুবাই বলেছে, মাছ ডিপফ্রিজে থাকে। ও কী বোকা- তাই না দাদান?
সোমনাথ প্রাণ খুলে হাসতে থাকেন। সত্যি- গোল্লু ভাই, তোর সাথে কথা বললে মনটা ভালো হয়ে যায়।
বিনিমাসী দাদানকে লিকার চা আর পাঁপর এনে দেয়। ডাব্বুর জন্য প্লেটে রয়েছে পাঁপর কাজু আর সন্দেশ।
বিনি হেসে বলে, বড় বাবা আর ডাব্বু থাকলে আসর খুব জমে।
ডাব্বু বলে, তুমি এখন যাও বিনিমাসী, দাদুর সাথে সিরিয়াস ব্যাপার নিয়ে আলাপ করছি।
– যাচ্ছি বাবা যাচ্ছি, আমার অনেক কাজ বাকি।
সোমনাথ বলেন, আরো সিরিয়াস কথা আছে নাকি গুল্লু।
– আছে দাদান। অফ কোর্স আছে। খুশবু ম্যাম একদিন প্রশ্ন করেছিল, ধান গাছের তক্তা দিয়ে কী হয়- বল তো। সবাই বলেছি, আলমারি চেয়ার টেবিল ড্রেসিং টেবিল খাট সব হয়।
ম্যাম খুব গম্ভীর হয়ে বলেছে, শেম অন ইউ, তোমরা কিছুই জানো না। ধান গাছের তক্তাই হয় না। ম্যাম রাগ করেছিলেন সেদিন।
– তোমাদের মা-বাবারা ছুটিতে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইংল্যান্ড নিয়ে যান, কিন্তু নিজেদের গাঁয়ে তোমাদের নিয়ে যান না। নিজের দেশকে তোমরা জানবে না, দেখবে না?
সোমনাথ বলেন, একদম ঠিক। মাঝে মাঝে গাঁয়ের বাড়িতে যাওয়া তো উচিত। অবশ্যই উচিত। কত কিছু রয়েছে আমাদের গাঁয়ে।
মা ফিরে এসেছেন। টেবিলে খাবার দেয়া হয়েছে। এবার দাদু নাতির জমাটি আড্ডা শেষ। এবার খাবে সবাই। এরপর ঘুম, ঘুম থেকে ওঠে হোমওয়ার্ক। এভাবেই আজকের দিন ফুরিয়ে যাবে।
হোমওয়ার্ক সবে শেষ করেছে, এবার গাড়ি দিয়ে খেলবে না চড়ুই পাখির কিচির মিচির শুনবে- গালে হাত দিয়ে ভাবছে ডাব্বু।
সেই মুহূর্তে ডোরবেল বেজে ওঠে। বিনিমাসী দরজা খুলে দিতেই চিন্টুমামু ভেতরে ঢুকে।
সত্যি পৃথিবীতে যখন-তখন মিরাক্যাল ঘটে যেতে পারে- এ কথা দাদান প্রায়ই বলেন।
সত্যি জীবনে অনেক সময় ম্যাজিক ঘটে যায়। তুমি যা চাও তাই তোমার হাতের মুঠোয় চলে আসে।
চিন্টুমামার হাতের মাঝারি ধরনের খাঁচার মাঝে ময়না পাখি। কালো কুচকুচে গায়ের রঙ, ঠোঁট দু’টি হলদে।
খুশিতে ডাব্বু চেঁচিয়ে ওঠে। স্বপ্ন কি এমন করে সত্যি হয়?
– কেমন আছেন? ভালো তো?
রিনরিনে এই স্বর শুনে সবাই তাজ্জব!
চিন্টু বলে, এই ময়না ভীষণ সুন্দর কথা বলে। অভাবের জন্য লোকটি বিক্রি করে দিয়েছে।
রিনা আস্তে করে বলেন, সে না হয় হলো। এর আগেও তো আরেকটি টিয়ে ছিল। খাঁচার সামনে থেকে কিছুতেই ওকে সরানো যেত না।
সোমনাথ বলেন, টিয়ে পাখিটি শেষ পর্যন্ত খাঁচা থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। পাখিকে কি আর খাঁচাতে বন্দী করে রাখা যায়? রিনা চাপা গলায় বলেন, আমিই খাঁচার দরজা খুলে রেখেছিলাম রে চিন্টু।
অবাক হয়ে চিন্টু জিজ্ঞেস করে- ডাব্বু কাঁদেনি?
– কাঁদেনি আবার! খুব কেঁদেছে। আমিই ওকে বুঝিয়ে বলেছিলাম- ও মায়ের কাছে চলে গেছে। তুই আবার নতুন ঝামেলা আনলি কেন বলতো?
চিন্টু বলে, একা একা থাকে দিদি, একটা খেলার সঙ্গী তো দরকার।
খুশিতে ডাব্বু ঘরের ভেতরে ছুটে বেড়াচ্ছে।
– মাই ডিয়ার চিন্টু মামু, থ্যাংক ইয়ু সো মাচ। মুখে খই ফুটছে ওর।
– দ্যাখোনা, এই তো ক’দিন আগে মকবুল আংকেল আছে না, ও গাড়ি চাপা দিয়ে আমার পুষি ক্যাটকে মেরে ফেলেছে। জানো- খুশবু ম্যাম সব সময় বলেন, অবোলা জীবকে কষ্ট দিতে নেই।

[চলবে]

SHARE

Leave a Reply