Home গল্প মায়ের শাসন । খন্দকার নূর হোসাইন

মায়ের শাসন । খন্দকার নূর হোসাইন

মায়ের শাসন । খন্দকার নূর হোসাইনসাড়ে সাত একর জমির ওপর দাঁড়ানো বিশাল এক পুকুর। ওপরে তপ্ত রোদ। সে রোদে পুকুরের পানিও কিছুটা গরম হয়ে আছে। কিন্তু ওসবে যেন খেয়াল নেই দুরন্ত ছেলেদের। কেউ পুকুরের পানিতে সাঁতার কাটছে, কেউ আবার অনেক দূর থেকে দৌড়ে এসে পুকুরের পানিতে ঝাঁপ দিচ্ছে। দুই একজনকে ডলফিন স্টাইলে লাফ দেয়ার অনুশীলন করতেও দেখা যাচ্ছে। ওদেরই একজন রিহাল। আজকে সে যেন পাখির মতো মুক্ত ডানা পেয়েছে। ওর মা আজকে বাড়ি নেই। একটা কাজে খালাদের ওখানে গেছে। তা ছাড়া আজ ওর স্কুলও ছুটি। তাই অনেক দিন পর আজকে পুকুরে গোসল করতে এসেছে সে। মা থাকলে পুকুরে গোসল করা হয় না। মায়ের কড়া নিষেধ। মা বলে পুকুরে গোসল করলে নাকি অসুখ করবে। রিহালের ধারণা ওর মা বাড়ি ফিরতে ফিরতে সে গোসল করে চলে যেতে পারবে।
পানির ওপরে এসে ডলফিন স্টাইলে লাফ দেয়ার জন্য দাঁড়িয়েছে রিহাল। এমন সময় পেছন থেকে এক মুঠো কাদা এসে লাগলো রিহালের পিঠে। সাথে সাথে কয়েকটা ছেলে হে হে করে হেসে উঠলো।
রাগে লাল হয়ে গেলো রিহাল। পেছনে তাকিয়ে টগরকেও হাসতে দেখলো সে। বুঝা গেলো টগরই তাকে কাদা মেরেছে। রিহালও এক মুঠো কাঁদা ছুড়ে মারলো ওর দিকে। কিন্তু তাকে লাগলো না, পানিতে ডুব দিলো সে। রিহালও কম যায় না, কাদা নিয়ে রেডি ছিলো সে। পানির ওপর টগরের মাথাটা ভেসে উঠতেই কাদা ছুড়ে মারলো সে। নিখুঁতভাবে টার্গেটে লাগলো কাদা। কাদা গিয়ে সরাসরি টগরের মুখের ওপর লাগলো। একেবারে ভূতের মতো চেহারা হয়ে গেলো টগরের। সারা মুখে কাদা।
এটা দেখে আরো জোরো হাসতে লাগলো অন্য ছেলেরা। আবার আক্রমণ করলো টগর। এভাবে কাদা যুদ্ধ বেধে গেলো দু’জনের। অনেকক্ষণ পর বাড়ির কথা মনে হলো রিহালের। এতক্ষণে সে খেয়াল করলো, অনেকেই চলে গেছে পুকুর থেকে। সূর্য তখন মাথার ওপর থেকে সরে গেছে। তার মানে তার মা এতক্ষণে বাড়ি চলে এসেছে। সর্বনাশ! আর দেরি করা যাবে না; ভাবলো রিহাল।
তাড়াতাড়ি বাড়ির পথে দৌড় ধরলো সে। বাড়িতে এসে দেখলো সত্যিই তার মা এসে গেছে। বাহির থেকে আসার কারণে মাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছিলো। ভেজা শরীর নিয়ে চোরের মতো আস্তে আস্তে বাড়ির উঠানে এসে দাঁড়ালো রিহাল। ওকে দেখে মা বললো,
‘এতক্ষণ পুকুরে ছিলি? তোকে না মানা করেছি পুকুরে যেতে? অসুখ করলে ঔষধ এনে দেবে কে?’
মাথা নিচু করে ধরা পড়া চোরের মতো জবাব দিলো রিহাল, ‘তুমি বাড়ি ছিলে না তো তাই ভাল লাগছিলো না। এ জন্য গেছিলাম একটু আগে। এখনই তো চলে এলাম। এই অল্প সময় পুকুরে থাকলে জ্বর আসবে না মা।’
‘অল্প সময় পুকুরে ছিলি এ জন্যই চোখ দুটো অমন লাল হয়েছে তাই না?’
প্রশ্নটা শুনে থতমত খেয়ে গেল রিহাল। কোন মতে বললো সে,
‘ওটা মনে হয় অনেকদিন পর পুকুরে গোসল করার জন্য হয়েছে।’
এবার রেগে গেলো রিহালের মা। এসে ঠাস ঠাস করে কয়েকটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলো ওর গালে। তারপর বললো, মিথ্যা বলে আবার আমার সাথে তর্ক করছিস? তোকে না বলেছি মিথ্যা বলবি না কখনো।
জবাবে বেসুরো গলায় ভ্যা ভ্যা করে কাঁদতে লাগলো রিহাল। কিন্তু মায়ের আরেকটা ধমকে আর কান্না করার সাহস হলো না ওর।
মা এসে ওর মাথা মুছিয়ে দিয়ে রান্নাঘরে চলে গেলো। মনটা তেতো হয়ে গেলো রিহালের। ভিজা কাপড় পাল্টে হাফ প্যান্ট ও একটা জামা পরে বাড়ির বাইরে চলে এলো সে।
রিহালদের পাড়ার মাঝখানে, ডালপালা ছড়িয়ে সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক আম গাছ। গাছটা অনেক বড়, কিন্তু গাছে তেমন আম হয় না। দুপুরের রোদে গাছটা ছাতার মতো বিশাল এক ছায়া ফেলেছে মাটিতে। দুপুর বেলাতে এই গাছতলায় বসলে বেশ ভালো লাগে।
বাদলদের এই গাছতলায় এখন বসে আছে পাড়ার বেশ কয়েকজন ছেলে। রিহালকে দেখে হাসাহাসি শুরু হলো সেখানে। রিহালের থাপ্পড় খাওয়া দেখে নিয়েছিলো ওদের মধ্যে কেউ একজন। আর সেটা নিয়েই ওকে খেপাচ্ছে ওরা। রাকিবের কথা শুনে রাগ ১০০ ডিগ্রিতে পৌঁছালো রিহালের। রাকিব বললো,
‘এত বড় ছেলে, এখনো মায়ের হাতে মার খায়।’ বলেই হাসতে শুরু করলো সে। তার সাথে যোগ দিলো অন্যরা। রাগে অপমানে কেঁদে দিলো রিহাল। ইচ্ছে হচ্ছিল কষে শয়তানগুলোর নাকে একটা করে ঘুষি বসিয়ে দিতে। কিন্তু সে একা আর ওরা ছয় সাতজন আছে। খুব কষ্টে নিজের ইচ্ছেটা চাপা দিলো রিহাল। সেখান থেকে সরে এলো সে। এমনিতেই মায়ের মার খেয়ে মন খারাপ ছিলো রিহালের। এখন সেই মন খারাপটা রাগে পরিণত হলো। মায়ের ওপর ভীষণ রাগ হচ্ছে এখন তার। সিদ্ধান্ত নিলো সে আর বাড়ি ফিরে যাবে না। হাঁটা ধরলো অজানার উদ্দেশে। হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে এলো সে।
বেশ ক্লান্তও হয়ে গেছে সে। ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। রিহাল বাড়ি থেকে অনেক দূরে একটা জঙ্গলে চলে এসেছে। এখানে এসে ভালো লাগছে রিহালের। তাকে জ্বালাতন করার কেউ নেই। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে পাখিরা কিচির মিচির শব্দ করে নীড়ে ফিরে আসছিলো। দ্রুত জঙ্গলে রাত নেমে এলো। এখন জঙ্গলের পরিবেশটা যেন স¤পূর্ণই পাল্টে গেলো। তবুও ভয় পেলো না রিহাল। ওর সবচেয়ে বেশি ভয় মাকে। এখানে তো তার মা নেই। ঘাসের ওপর বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলো রিহাল; তার মা এখন কী করছে? তাকে কি খুঁজছে? খুঁজলে খুঁজুকগে। তার কি? মার না খেলে তো সে আর এদিকে আসতো না। হঠাৎ খসখস শব্দে ভাবনায় ছেদ পড়লো তার। সামনে কোন কিছুর অস্তিত্ব অনুভব করলো রিহাল। চোখের সামনে ¯পষ্ট হলো একটা খরগোশের অবয়ব। ছোট্ট একটা খরগোশের বাচ্চা। রিহালের বেশ কাছে চলে এসেছে। ছোট হওয়ায় এখনো মনে হয় শত্রু চিনতে পারেনি বাচ্চাটা। কিছুক্ষণ রিহালের আশপাশে ঘুরে অন্ধকারে আবার হারিয়ে গেলো ওটা। একটু পর শেয়ালের ডাক শুনতে পেলো রিহাল। দ্রুত সে একটা গাছে উঠে গেলো। পাশাপাশি দুইটা ডাল। বেশ প্রশস্ত ডাল দুইটা। অনায়াসে যে কেউ এর ওপর ঘুমিয়ে রাত কাটিয়ে দিতে পারবে। গাছের নিচে চোখ পড়তেই চমকে উঠলো রিহাল। সেখানে বেশ কয়েকটা শেয়াল এসে জড়ো হয়েছে। ভাগ্যিস গাছে উঠে পড়েছে সে। একটু পর অবশ্য আর দেখা গেলো না শেয়ালগুলোকে। গাছের ডালে শুয়ে পড়লো সে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে দুই তিনটা তারা দেখা যাচ্ছিলো। তারা গুনতে গুনতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লো রিহাল।
সকালে ঘুম ভাঙতেই পাখির কিচির মিচির ডাক শুনতে পেলো সে। অল্প অল্প রোদ উঠেছে তখন। ঘুম থেকে জাগার পর টের পেলো রিহাল; তার সারা শরীরটা ব্যথা হয়ে আছে। গাছের ডালে ঘুমানোর জন্যই এটা হয়েছে। আস্তে আস্তে উঠে বসলো সে। এ সময় পাশের একটা গাছের ডালে চোখ আটকে গেলো রিহালের।
একটা পাখির বাচ্চা গাছের ডালে বসে চিঁ চিঁ করছে। অল্প অল্প উড়া শিখেছে বাচ্চাটি। একটু পরেই সেখানে বাচ্চা পাখিটার মা এসে হাজির হলো। মা পাখিটার মুখে খাওয়ার। বাচ্চাটাকে খাইয়ে দিলো মা পাখিটা। পাখির বাচ্চার খাওয়া দেখে রিহালের পেটটাও মোচড় দিয়ে উঠলো। ক্ষুধায় শরীরটা দুর্বল লাগছে তার। গতকাল দুপুর থেকে কিছু খায়নি সে। হঠাৎ একটা কথা মনে হয়ে শঙ্কিত হয়ে উঠলো রিহাল। যেহেতু সে দুপুর থেকে কিছু খায়নি, তার মানে তার মাও কিছু খায়নি। তাকে না খাইয়ে তো তার মা কখনো খায় না। মায়ের ওপর সমস্ত রাগ অভিমান দূর হয়ে গেলো তার। মুহূর্তে মায়ের জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠলো রিহালের। বাবা মারা যাবার পর সব দায়িত্ব ওর মা-ই পালন করছে।
আদরের সময় আদর আর শাসনের সময় শাসন করেন তিনি। কত কষ্ট করে মা নিজে না খেয়ে তাকে খাওয়ায়। অথচ সামান্য কয়েকটা থাপ্পড়ের জন্য মাকে এতক্ষণ না খাইয়ে রেখেছে সে। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হলো রিহালের। চোখের সামনে মায়ের ছবিটা ভেসে উঠলো। আর এক মুহূর্তও দেরি করলো না রিহাল। গাছ থেকে নেমে বাড়ির পথে হাঁটা ধরলো। বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়ালো সে। বাড়ির ভেতর থেকে কোন শব্দ আসছে না। বাড়িতে ঢোকার গেটটা আস্তে আস্তে ফাঁক করে ভেতরে তাকালো সে। মা বাড়ির বারান্দায় বসে আছে। মায়ের চেহারাটা ক্লান্ত বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। নিশ্চয় ওকে অনেক খুঁজেছে ওর মা। কিন্তু খুঁজে পায়নি তাকে। ভোরের শিশিরের মতো জ্বলজ্বল করছে মায়ের চোখের অশ্রু। বাবা মারা যাবার পর দ্বিতীয় বারের মতো মায়ের চোখে অশ্রু দেখলো রিহাল। তার কারণে মা কাঁদছে। ভাবতেই নিজের ওপর একরাশ ঘৃণা এসে জড়ো হলো। উঠানে এসে দাঁড়িয়েছে রিহাল। অদ্ভুত একটা অনুভূতি গ্রাস করেছে তাকে। সে মা বলে ডাকার ক্ষমতাটাও যেন হারিয়ে ফেলেছে। মাকে সে ডাকতে চাইছে কিন্তু তার মুখ দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছে না। বুকটা ফেটে যাচ্ছে রিহালের। চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু বের হয়ে ততক্ষণে গাল বেয়ে পড়তে শুরু করেছে। বোবা এক অনুভূতি নিয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে রিহাল। সে কথা না বলতে পারলেও তার উপস্থিতি মা ঠিকই টের পেলো।
রিহালকে দেখা মাত্র মা দৌড়ে এসে তাকে কোলে তুলে নিলো। এতক্ষণ চেপে রাখা কথাগুলো যেন বাঁধভাঙা অশ্রুতে পরিণত হলো রিহালের। মাও কাঁদছে।
মা বললো, ‘কোথায় গিয়েছিলি বাবা? চোখ-মুখের এ কি হাল করেছিস? না খেয়ে নিজেকে কেন এত কষ্ট দিলি বাপ!’
‘তোমারও তো মুখটা শুকনো। কাল থেকে কিছু খাওনি। আমার জন্য তোমার কষ্ট হয়েছে। আর কখনো এমন হবে না মা। আমাকে ক্ষমা করে দাও।’
মা তার আঁচল দিয়ে রিহালের চোখের পানি মুছে দিয়ে তার কপালে একটা চুমু খেলো। তারপর বললো, ‘থাক ওসব কথা বাদ দে। এখন চল খাবি।’
হ্যাঁ, সাথে তুমিও চলো। আমি জানি তুমিও কিছু খাওনি। তুমি না খেলে আমি কিছু খাবো না।
খুব পাকনামি শিখেছিস না?’
‘শিখবই তো। তোমার ছেলে বলে কথা।’
মা রিহালের কথা শুনে হেসে দিলো। রিহাল আরো শক্ত করে মাকে জড়িয়ে ধরলো। মায়ের কোলে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে সে। রিহাল তার মাকে ভয় পেলেও খুব ভালোবাসে। কিন্তু একটা মিথ্যা কথা মায়ের কাছ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলো তাকে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো সে, আর কোনদিন মিথ্যা কথা বলবে না। মায়ের কোল ছেড়ে যাবে না আর কোথাও।

SHARE

Leave a Reply