Home গল্প মশার শাসন । মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন

মশার শাসন । মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন

মশার শাসন । মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনএক বর্ষার বিকেলে বাসার বারান্দায় সত্তরে পা রাখা আহমেদ ইকবাল ও তার নাতি হোসাইন দূর আকাশে তাকিয়ে গল্প করছিল। দাদা বেশ উপভোগ করছিলেন সময়টা। বিশেষ করে নীল আকাশে উড়ে যাওয়া পাখিগুলোর দিকে তাকিয়ে নাতির উড়ার ইচ্ছা তাকে আরো পুলকিত করলো।
হোসাইন বর্তমান আট-দশটি ছেলের চেয়ে একটু আলাদা। অন্যসব ছেলে-মেয়েরা বাসার খাটে বা সোফায় বসে মোবাইল হাতে ইন্টারনেটে সারাক্ষণ কী যেন করে। এতো ব্যস্ত থাকে তারা যেন কোন কিছু করার সময়টুকু তাদের নেই। কিন্তু হোসাইন সকালে কাক ডাকা ভোরে ওঠে যায়। তারপর সব কাজ ঠিকঠাক করে স্কুলে যায়। দুপুরে বাসায় ফিরে গোসল সেরে একটু ঘুমিয়ে নেয়। আর বিকেল হলেই অস্থির হয়ে যায় কখন বাসা থেকে বেরিয়ে একটু খেলবে, অথবা প্রকৃতির মাঝে হাঁটাহাঁটি করবে। আর যেদিন তার দাদা বারান্দায় বসবে সেদিন গল্প শোনার জন্য দাদার কাছে গিয়ে বসে থাকে।
তার সকালে উঠার গল্পটিও বেশ মজার। প্রি-স্কুলে পড়ার সময় একদিন ম্যাডাম কাজী নজরুল ইসলামের ‘আমি হবো সকাল বেলার পাখি’ কবিতাটি আবৃত্তি করে শোনালেন। সে সময় থেকেই-
আমরা যদি না জাগি মা
কেমনে সকাল হবে?
তোমার ছেলে উঠবে মা গো
রাত পোহাবে তবে।
এ কয়টি লাইন জীবনের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে। এমনকি বন্ধের দিন অন্যরা ঘুমিয়ে থাকলেও সে উঠে যায় ঠিক নিয়মেই।
তাদের বাসা চট্টগ্রামের পাহাড় ঘেঁষে। ফলে প্রতিদিনই প্রকৃতির নির্মল হাওয়া ও বিচিত্র পাখ-পাখালি ও লতা-পতায় চোখ জুড়িয়ে থাকে। ঋতু পরিবর্তনের বিচিত্রতা সে বুঝতে পারে। সব মিলে সে বেশ সময় কাটায়।
তবে সেদিনের বিকালটা ছিল জীবনের সেরা এক মুহূর্ত। পূর্ব আকাশে সাদা মেঘের চলন্ত পাহাড়, দক্ষিণ আকাশে পাখির উড়ন্ত ছাতা, আর উত্তরে নীল আকাশের সীমাহীন চাঁদ।
হঠাৎ যেন হোসাইন আতঙ্ক কাটিয়ে কৌতূহলী হয়ে দাদা ইকবালের কাছে একরাশ প্রশ্ন ছুড়ে দিল। দাদাও সাদা দাড়ি নাড়িয়ে আন্তরিকতার সাথে সব প্রশ্নের জবাব দিতে চেষ্টা করলেন।
মূলত পায়ের কাছে বসা একটি মশা হোসাইনকে কৌতূহলী করে তুলেছে। ডেঙ্গু কী, এডিস মশা কী, এরা এতো ভয়ানক কেন, কোথায় এদের জন্ম? এমন অনেক প্রশ্ন।
আচমকা হোসাইন দাদাকে প্রশ্ন করলো, ‘মশা কি আল্লাহর সৃষ্টি?’
-হ্যাঁ, ভাই। পৃথিবীর সব কিছুই আল্লাহর সৃষ্টি।
-যদি তাই হয়, তবে আল্লাহ মশা দিয়ে কেন মানুষকে কষ্ট দিচ্ছেন? আর মশা কি আগে ছিল না এটি নতুন করে আল্লাহ পাঠিয়েছেন?
-এমন প্রশ্ন শুনে দাদা ইকবাল বেশ চমকে উঠলেন। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। ভাবতে লাগলেন কোথা থেকে শুরু করবেন। হঠাৎ নীরবতা ভেঙে নমরুদ ও মশার কাহিনী বলা শুরু করলেন।
ইকবাল সাহেব ভাবলেন এ ঘটনার মাধ্যমে হোসাইন কেবল সত্য জানতে পারবে এবং আজকে মানবজাতির যে ভয়ানক পরিণতি তাও বুঝতে পারবে।
আর দাদার গল্প বলার ভঙ্গি দেখে নাতি মুগ্ধ হয়ে একাগ্রচিত্তে প্রতিটি শব্দের ভাব ও উদ্দেশ্য বুঝতে চাইছে। কোন জায়গায় বুঝতে না পারলেও দাদাকে প্রশ্ন করছে না। নিজের মধ্যে হারিয়ে যায় হোসাইন।
দাদার গল্প বলা শেষ, কিন্তু হোসাইন যেন কোথায় ডুবে আছে। দাদা একটু সময় দিলেন নাতিকে। বুঝতে চাইলেন হোসাইন কি এ গল্পের মর্ম উপলব্ধি করছে না আজগুবি ভেবে নিজের মধ্যে এক অবান্তর রাজ্য তৈরি করছে। এক সময় বুঝলেন হোসাইন সত্যি গল্পটিকে ধারণ করতে পেরেছে।
– আচ্ছা দাদা ভাই, আদিকাল থেকেই তো মশা আছে বললে। আর ইব্রাহিম (আ:) এর সময় নমরুদের শাসন ছিল। নমরুদ না হয় ইব্রাহিম (আ:)-এর কথা বিশ্বাস করেনি বা ইচ্ছা করেই ক্ষমতার লোভে নিজেকে আল্লাহর আসনে বসিয়ে ছিল। কিন্তু সেই যুদ্ধের কথা বললে! অসংখ্য মশা এসে নমরুদের বাহিনীকে পরাজিত করলো। কিন্তু সে সময়ে নমরুদ টিকে গেল আর নিরীহ প্রজারা মারা গেল কেন?
– ভাই, সে সময়ে নমরুদ টিকে গেল মূলত দু’টি কারণে। এক, আল্লাহ তাকে সঠিক পথে আসার সুযোগ দিয়েছেন। দুই, সাধারণ প্রজাদের শিক্ষা দিলেন সুযোগ পেয়ে যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে আসে না, তাদের মৃত্যু কত ভয়ানক হয় তা দেখাতে। আর ঐ যে বললে সাধারণ প্রজাদের দোষ কোথায়? তাদের দোষও দু’টি। এক, তারা তাদের মত একজন মানুষকে আল্লাহর আসনে বসিয়ে বিশ্বাস করলো। দুই, তারা ইব্রাহিম (আ:)-এর মতো একজন আল্লাহভীরু ও সৎ ব্যক্তির আহ্বানে সাড়া দিয়ে জ্ঞানের পথে আসেনি। বরং তারা অন্ধকারের পথেই হেঁটেছে।
– তবে ঐ যে বললে নমরুদ মশার কামড়ে মরলো। এতে কি আল্লাহর কোনো হাত আছে?
– হ্যাঁ, প্রতিটি কর্মের পিছনে আল্লাহর হাত আছে। তিনি দেখিয়ে দিলেন পরাক্রমশালী ব্যক্তিরা অপরাধ করলে এবং আল্লাহর সাথে বেঈমানী করলে তিনি যে মহাপরাক্রমশালী তা বুঝিয়ে দিতে এমন করুণ মৃত্যুর ব্যবস্থা করে থাকেন। কী ছিল না নমরুদের! তবু সে পারেনি নিজেকে রক্ষা করতে। কেবল যদি মশার আক্রমণেই মারা যেত হয়তো মানুষ বিশ্বাস করতো না। কিন্তু আল্লাহ তার মাথায় ক্রমাগত জুতাপেটার ব্যবস্থা করলেন, আর এক সময় জুতার আঘাতে খণ্ডিত মাথা থেকে বেরিয়ে এলো মশা এবং নমরুদের দেহ থেকে বেরিয়ে গেল প্রাণ।
– হোসাইন এতক্ষণে বেশ আশ্বস্ত হলো এবং জিজ্ঞাসা করলো, তাহলে এ যে সারা দেশে এডিস মশার আক্রমণ এটি কি কোন শাস্তি?
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ইকবাল সাহেব বললেন, ‘নিশ্চয়!’
– কিভাবে?
– খেয়াল করে দেখ, ঐ যে আকাশে মেঘ উড়ে বেড়ায় তা কি কোন কিছুর সাথে আটকানো আছে! না। কারণ সৃষ্টিকর্তা নিজে এগুলিকে নিদর্শন হিসাবে দিয়েছেন। আর ঐ যে পাখি তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে আনন্দচিত্তে বাসায় ফিরছে। কিন্তু মানুষকে খেয়াল করো তারা ভাবছে যার যত টাকা তার তত ক্ষমতা। ফলে তারা আল্লাহকে ঠিক মানতে চায় না। ফলে নিজেরা ঐক্যবদ্ধ না হয়ে আত্ম-অহংকার করে থাকে। তাই এদের মধ্যে সুখ-শান্তি যেমন নেই তেমনি একে অন্যকে আঘাত ও অবিশ্বাস করে। আর অবিশ্বাস দিনে দিনে এতো বেড়েছে যে নিজেদের নমরুদের মতো ক্ষমতাধর ভাবে। তারা ভুলে গেছে পৃথিবীর ক্ষণস্থায়ী জীবনের কথা।
– কিন্তু দাদা, গত কয়েক বছর ঢাকায় ছিল আর এবার সারা দেশে কেন হলো?
– মনে রেখ হোসাইন, রাজধানী হিসাবে সব কল্যাণকর কাজ যেমন ঢাকা থেকে শুরু হয় তেমনি টাকা পয়সা মানুষের কাছে থাকায় ক্ষমতাবানরা নিজেদের মহা পরাক্রমশালী ভাবেন। তারা দিনের পর দিন অত্যাচারী হয়ে উঠেছে। আর দেশের সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে মূলত শত অন্যায় দেখেও নীরবতা ভেঙে মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য চায়নি। মনে রাখবে অহংকারী মানুষের শাস্তির দায়িত্ব সৃষ্টিকর্তার হাতে থাকে।
– তাহলে অনেক দেশ রয়েছে যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে না। তাদের পরিণতি তো আমাদের মতো হলো না!
– কারণ যারা অবিশ্বাসী তাদের আল্লাহ পৃথিবীতে সব দিয়ে থাকেন। তা ছাড়া তাদের জন্য সৃষ্টিকর্তার শাস্তি অন্য উপায়ে আসে। এ যেমন পশ্চিমা দেশগুলোতে প্রায় স্কুল-কলেজে সন্ত্রাসীরা গুলি করে মানুষ হত্যা করে এবং এমনকি সেখানে সন্তানরা বাবা-মায়ের সাথে এক পর্যায়ে সম্পর্ক রাখে না। কিন্তু দেখ আমার অনেক বয়স হয়েছে, এবং কিছুই করতে পারি না, তাও তোমার বাবা-মা আমাকে কত শ্রদ্ধা করে। তাদের ঐ বঞ্চনা নিশ্চয় অভিশাপ।
ছোট হোসাইন এত কিছু না বুঝলেও বুঝতে পারে শান্তির জায়গা কোথায়। তাই আবার প্রশ্ন করে বসল দাদা ইকবালকে। বলল, কিন্তু আমাদের দেশে ছোট শিশুরাতো কোনো অপরাধ করেনি, তাহলে তারা মারা যায় কেন?
– ভাই এর পিছনে দু’টি কারণ আছে। এক, আল্লাহ বান্দার সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকে তার কাছে নিয়ে যান বাবা-মাকে পরীক্ষা করার জন্য। দুই, বাবা-মা যখন বেপরোয়াভাবে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে তখন তাদের শাস্তি দেয়ার জন্য আল্লাহ এমন শাস্তির ব্যবস্থা করেন। তবে মনে রেখ এসব মোমিনকে সঠিক পথের সন্ধান দেয়।
– দাদা ভাই তোমার কথা শুনে আমার মনে কিছু কথা বাসা বেঁধেছে। লক্ষ কর একটা দেশ চালাতে সরকার লাগে, লাগে সংসদ, আর্মি, পুলিশ, র‌্যাব, গোয়েন্দা, আদালত, স্কুল কলেজসহ আরো কত কী। এরপরও কি সরকার সফল হতে পারে? না পারে সবাইকে এক করতে! কিন্তু দেখ মশার কি ক্ষমতা!! তাদের নাই সরকার, নাই আর্মি, র‌্যাব, পুলিশ বা কিছু। তবু তারা হাজার মানুষকে শাসন করে রেখেছে। প্রতিদিন হাসপাতালে পাঠিয়ে দিচ্ছে অনেক মানুষকে। কারো কোন কথা বলার সুযোগ নেই। তাহলে তাদের যিনি শাসনকর্তা তিনিইতো শ্রেষ্ঠ।
এমন অনেক কথা দাদা নাতির মধ্যে চলল আরো কিছুক্ষণ। তখন হোসাইনের মুখ দিয়ে অস্পষ্টস্বরে বেরিয়ে এলো-
আল্লাহ আমার রব
এই রবই আমার সব
দমে দমে তনু মনে তারই অনুভব।
নাতির এমন গুন গুন সুরে তাল মিলিয়ে দাদাও গাইতে গাইতে হোসেনকে বুকে টেনে নিলেন। আর তখনই দূর মসজিদ থেকে বেজে উঠল- আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার…। তখন ওজু করে নামাজে দাঁড়িয়ে গেল দু’জনে।

SHARE

Leave a Reply