Home ধারাবাহিক উপন্যাস ডাব্বু দ্য গ্রেট । ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ

ডাব্বু দ্য গ্রেট । ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ

ডাব্বু দ্য গ্রেট । ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ

গত সংখ্যার পর

সৌম্য ব্যস্ত মানুষ, ছেলের দিকে নজর দিতে পারেন না। তিনিও মাঝে মাঝে বলেন, বড্ড পড়ার প্রেসার আজকাল ছোটদের। বইয়ের ভার নিতে নিতে কুঁজো হয়ে যাচ্ছে বাচ্চারা।
ডাব্বু, পাপার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে।
তাইতো; পাপা আমার কথাও ভাবে?
নিরুদিদুন বিরক্ত হয়ে বলে, তোদের সময় এমন ছিল বল। স্কুলে যাও, পড়াশোনা করো- পরীক্ষায় যা হবার হবে।
টেবিলের নিচে বসা মিনি বলে ওঠে- মিঁয়া, মিঁয়াও।
রিনাই, শুধু হতাশ হয়ে বলে, কী করব বলুন নিরু পিসি। পড়াশোনার সিস্টেমটাই এমন হয়ে গেছে।
বড়রা শুধু চেহারাতেই বড় হয়। ডাব্বু ভাবে- ওরা কি আমার মনের কথা বোঝে? আমার কষ্ট, আমার ইচ্ছে আমার রাগ কিছুই বোঝে না মা-পাপা। ওরা কোনোদিনও আমার মতো আর ছোট হবে না, তাইতো ওরা বুঝতে পারে না- আমি কী চাই, কী পেতে আমার ভালো লাগে। এমনকি স্কুলের ঝুমঝুম ম্যামও তেমন করে বুঝতে পারেন না। শুধু নিরুদিদুন তাকে বুঝতে পারেন। ভালোবাসেন বলেই তো দিদুন তার কষ্ট আনন্দ এক পলকে বুঝে নেন।
বড়দের কিছুই করার নেই? বড়রা ইচ্ছে করলে সব কিছুই করতে পারে। দাদানের কবিতাটি এক্কেবারে ঠিক।
মাল্যবানের পিঠের ওপর
গাদাখানেক বই-
হাসবে কখন খেলবে কখন
সময় ওদের কই?
সোমনাথ বলেন, ওদের পড়ার মাঝ থেকে আনন্দটাই হারিয়ে গেছে। পড়াটা এখন শুধু বোঝা বোঝা এবং বোঝা।
দাদানের কথায় লাফ দিয়ে মিনি বলে মিঁয়াও মিঁয়াও মিঁয়াও-

ঠিক নিজের বাড়ির মতো হাঁটাচলা করেছে, মনে হয় এ বাড়িরই পোষা বেড়াল। সাদা শরীরে সোনালি রঙের ছোপ। ঠিক যেন ছোটখাটো বাঘ।
বিনিমাসীর পায়ে পায়ে ঘুরছে। নিশ্চয়ই ও বুঝতে পেরেছে ওর কাছেই সব খাবার দাবার থাকে। দয়া করে যদি দু-একটি মাছের টুকরো, মাংসের হাড় ছুড়ে দেয় তবেই তো পেট ভরে যায় ওর।
বিনি বিরক্ত হয়ে বলে, কী যন্ত্রণা বলুন তো, পিসি, পরশুদিন জানালা দিয়ে ঢুকে চোখের সামনে দুই টুকরো মাছ নিয়ে গেল।
নির্মলকাকু বলে, বেড়ালের মতো এত ছোঁকছোঁকানি খাবার নিয়ে কেউ করে না।
চিন্টুমামু বলে, সবার বাড়ির বিন তো ঢাকা দেয়া। আগে যখন দিদির বাড়িতে এসেছি, তখন দেখেছি ঢাকা ছাড়া বিনগুলো ফেলে বিড়ালটি খাচ্ছে। এখন তা ঢাকনা দিয়ে আটকানো তাই হয়তো খেতে পাচ্ছে না।
সোমনাথ খবরের কাগজ থেকে চোখ সরিয়ে বলেন, কত ভাগ্যি, দেখ বেড়ালটির, এতক্ষণ থেকেও ওকে নিয়ে তোমরা সবাই কথা বলছ, ইমপোরটেন্ট ফিগার হয়ে গেছে ও।
ঘুম ভেঙে ডাব্বু দেখে, সোনালি আর সাদা ছোপের বিড়ালটি। বাহ্- দারুণ তো।
রিনা বলে, তোর কাছে তো সব কিছুই দারুণ।
– দারুণ তো হবেই মা। পরীক্ষায় এসেছিল- তোমার পোষা বিড়াল নিয়ে দশটি সেনটেন্স লিখ।
দাদান বলেন, তুমি তো লিখতে পারনি।
ছলোছলো চোখে ডাব্বু বলে, আমাদের বাড়িতে কি পোষা বিড়াল আছে? শিখব কেমন করে বলো।
নির্মলকাকু গালে হাত দিয়ে মালিন মুখে বলে, তাও তো কথা। বাড়িতে বিড়াল না থাকলে ডাব্বু কি করে লিখবে?
চিন্টুমামু বলে, তোমাকে যদি হাতি দিয়ে দশটি সেনটেন্স লিখতে বলে তুমি তো পারবে না, কারণ তোমাদের বাড়িতে পোষা হাতি নেই।
ডাব্বু বলে, হাতি কি কেউ পোষে নাকি মামু। কুকুর বেড়াল বাড়িতে পোষে। এটি হলো মাই পেট ক্যাট। আমার পোষা বিড়াল।
রিনা বলেন, বেড়াল পোষার অনেক ঝক্কি ডাব্বু, চুরি করে খাবে, দুধে মুখ দেবে। বেড়াল চুক চুক করে দুধ খেলে সে দুধ তুই খাবি, না আমি তোকে খেতে দেবো? এসব বায়না ছাড়ো। সারাদিন আনাচে কানাচে ডাস্টবিনে ঘুরে বেড়ায়- এ হবে পোষা বেড়াল। কী অদ্ভুত বায়না রে তোর ডাব্বু। এখন তো আমাদের বাড়িতেই সারাদিন থাকে।
– তো আমি কাকে নিয়ে খেলব। এতদিন দিদুন ছিল, বাইরের স্পেস-এ, ছাদে দিদুনের সঙ্গে ক্রিকেট খেলেছি, ফুটবল খেলেছি। দিদুন বোলার হয়েছে আমি ব্যাটসম্যান। ওরা চলে গেলে আমি কার সাথে খেলব বলো তো। সোমনাথ গম্ভীর মুখে বলেন, এটি কিন্তু বড় এক সমস্যা বউমা। সত্যিই তো, তুমি, – সৌম্য সবাই ব্যস্ত। আমি হলুম ওল্ড ফুলিশ দাদান। ওরও তো খেলার সাথী চাই।
ডাব্বু খুশি খুশি সুরে বলে, দিদুন চলে গেলে টিনামাসীর বইটি পড়ে পড়ে তুমি আমাকে গল্প শোনাবে আর আমি খাবো।
সে এক ঝকমারি কাণ্ড। টিনার ‘লাল গালিচার জাদু’ বই পাবার পর গাড়ি, স্টেনগান, বাঘ-ভালুক সব খেলা ডকে তুলে দিয়ে ডাব্বু ঘোষণা দিয়েছিল এবার থেকে আমি আর খেলনা দিয়ে খেলব না, আমাকে মা গল্প পড়ে পড়ে শোনাবে আর আমি ভাত খাবো।
রিনা মনে মনে খুশি হয়ে মেনে নিয়েছিল ছেলের কথা। এ আর এমন কি ছেলে খেতে চায় না একদম। সারাদিনেও ওর খিদে পায় না।
সৌম্য বলেন, ঘরে খাবার আছে তো তাই খিদে পায় না। সোমনাথ বলেছেন, মা তো প্লেটে ডিম-মাছ মুরগির রান ফল সব রেডি করে খেতে দেয়, এগুলো সহজেই পাওয়া যায়। তাই খাও না।
বিনি বলে, রাজ্যের চিপস, ক্যাডবেরি চকোলেট খেয়ে খেয়ে তো পেটের খিদে মরে যায়- ও খাবে কী করে?
শুরু হলো গল্প শোনার সাথে সাথে খাওয়া দাওয়ার মহড়া।
দাদান বলেছেন, এত বড় নাতি আমার, ক্লাস ওয়ান থেকে ক্লাস টুতে উঠেছে, গল্প এবারে নিজে নিজে পড়বে। তাকে কষ্ট দেয়া কেন দাদুভাই? তুমি কিন্তু সেভেন প্লাস, এইতো আট বছরে পড়বে।
ডাব্বু বলে, বানান করে করে পড়া, আমার ভাল্লাগে না। তোমরা যখন গল্প বলো- তখন ভীষণ ভালো লাগে। মা টিনা আন্টির বই পড়ে গল্প শোনাবে, আমি গপাগপ খেয়ে নেবো, দ্যাখো।
নিরুপিসি গালে হাত দিয়ে বলেন, এ আবার কেমন ধারা নিয়ম রে? খাবি তুই আর বউমা গল্প পড়ে শোনাবে? বলিহারি যাই বাপু।
– তুই আসার আগে এমনই তো চলছিল নিরু। মেলা থেকে আনা বাঁশিতে জোরে ফুঁ দেয় ডাব্বু।
রিনা বলে, আর জ্বালাসনে তো বাপু, কান ঝালাপালা হয়ে গেল।
ডাব্বু বলে, লেটস স্টার্ট মা।
দিদুন, নির্মলকাকু, দাদান হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন। দিদুন বলে, কী অদ্ভুত কাণ্ড সব, যেন ফুটবল খেলা শুরু হবে, রেফারি বাঁশি বাজাল।
রাতের খাওয়া চলছে, স্কুলে যাবার তাড়া নেই।
রিনা শুরু করে, – সে ছিল এক আজব দেশ। মানুষ নেই, গাছগাছালি নেই, আছে শুধু বিশাল এক রাক্ষসপুরী। রাক্ষস খোক্কস আর দৈত্য দানোয় ভরা সেই বাড়ি। সে বাড়িতে থাকে একটি ফুটফুটে মেয়ে। নাও হাঁ করো হাঁ করো ডাব্বু।
দাদান বলে, খাচ্ছিস কোথায় গোল্লু, শুধু তো গল্পই শুনে যাচ্ছিস।
– এই তো খেলাম। আবার শুরু করো মা। হারি আপ। রিনা গল্পের খেই হারিয়ে ফেলে।
– কী যেন বলছিলাম। ও হ্যাঁ- সে বাড়িতে আছে চমৎকার মিষ্টি একটি মেয়ে।
ডাব্বু বলে, তুমি ভুল বলছ মা। তুমি আগে বলছ ফুটফুটে মেয়ে, এখন বলছ চমৎকার মিষ্টি মেয়ে।
নির্মলকাকু, দাদান আর নিরুপিসি আদুরে গলায় বলে,
– আহ ডাব্বু, কথা তো একই।
– কী রকম?
– মিষ্টি মেয়ে, চমৎকার মেয়ে, ফুটফুটে মেয়ে সবগুলোর মানেই তো এক।
– মোটেও নয় দাদান। মা একেক সময় একেক কথা বলে গল্পটিকে অন্যরকম বানিয়ে ফেলে। আমি লাল গালিচার জাদু বইয়ের গল্প আর শুনব না। মা টিনা আন্টির গল্প নষ্ট করে ফেলেছে।
খাওয়া আর হয় না। প্লেটে মাখা ভাত পড়ে থাকে। গোঁজ হয়ে বসে থাকে ডাব্বু।
দিদুন বলে, অ্যাই বুড়ো ধাড়ি ব্যাটা।- নিজের হাতে ভাত মেখে খাবি, মাছের কাঁটা বাছতে শিখবি তা নয়, উনাকে ভাত মেখে খাইয়ে দিতে হবে উনি গল্প শুনে শুনে ভাত খাবেন।
নির্মলকাকু বলে, তুমি কিন্তু মিছেমিছিই রাগ করছ ডাব্বু, টিনাআন্টি যে গল্প লিখেছেন এখন যদি লিখতে দাও উনি হয়তো লিখবেন বিশাল রাক্ষসপুরীতে মানুষ নেই, জন নেই আছে একটি মিষ্টি মেয়ে। তোমার মা বলেছে ফুটফুটে মেয়ে, আরেকবার বলেছে চমৎকার মিষ্টি মেয়ে- দোষটা কোথায়? এইটুকুন ছেলে ওর গোসা দ্যাখো কত্ত।
এবার ফিক করে হেসে ফেলে ডাব্বু।
দাদান বলেন, মাকে তুমি একবার বলো- মা ভাত দাও, আরেকবার বলো- মা ভাত দেবে না।
এবার কথাটি মগজে ঢুকে ডাব্বুর। হ্যাঁ তাইতো। এমন তো হতেই পারে।
রিনা ভাতের প্লেট নিয়ে গম্ভীর মুখে বসা। ছেলে মায়ের গা ঘেঁষে কোমল স্বরে বলে, স্যরি মা, আর এমন করব না, এখন খাইয়ে দাও। দাও না প্লিজ।
রিনা গম্ভীর গলায় বলে, বেশ খাইয়ে দিচ্ছি। এই যে বাবা, নিরুপিসি, নির্মল- সবাই আছেন, সবার সামনে প্রমিজ করো, এমন আর করব না।
– করব না, করব না, করব না। নিরুপিসি বলেন, ডাব্বু তুমি মাকে জ্বালাচ্ছ শুনলেই আমি কিন্তু বড় লাঠি নিয়ে চলে আসব।
– তুমি আসবে? তুমি আসবে দিদুন? আমি দুষ্টুমি করলে ফের তুমি চলে আসবে?
হাসিমুখে ডাব্বু বলে, তাহলে কিন্তু আমি বেশি বেশি দুষ্টুমি করব।
দিদুন ডাব্বুকে কোলে নিয়ে চকাস করে চুমু খেয়ে বলেন, আমার সোনা, একদম দুষ্টুমি করবে না। আমি এমনই তোমাকে দেখতে আসব। তোমাকে কিন্তু গুডবয় হয়ে থাকতে হবে। দিদুন আর ডাব্বুর দুচোখ চিক চিক করে ওঠে।

‘বাড়িতে মানুষ হলো আটজন, দু’জন চলে গেলে ক’জন থাকে- বলো তো ডাব্বু- বাহ কী চমৎকার অঙ্ক তৈরি করে ফেলল ডাব্বু। ঠিক স্কুলের ম্যামের মতো। তবে অংকের প্রশ্নে একটু ভুল রয়েছে।
ওদের বাড়িতে মোট ছয়জন থাকে। স্কুল থেকে ফিরে মা বাড়ির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বিনিমাসী সব গুছিয়ে দেয়, তারপরও দাদান কী খাবে, ডাব্বুর কী খাওয়া উচিত- এসব নিয়ে বকবক করে মা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। চোখ পাকিয়ে মা বলে, উচ্ছে খাবে না, করলা খাবে না, কাঁচকলা-পেঁপে খাবি না- খাবি খালি ড্রামস্টিক। খুব খারাপ ডাব্বু।
দাদান বলে- তেতো হলো লিভারের খাদ্য। তুমি তো সবজি একেবারেই খেতে চাও না। এমন করলে শরীর স্বাস্থ্য কি ভালো থাকে?
ডাব্বুর মাথার ভেতরে কিছুই কাজ করছে না। আমাদের বাড়িতে থাকে ছয়জন।
– আমাদের বাড়িতে ছয়জন থাকি না মা?
– ছয়জন কোথায় রে?
– কেন, দাদানকে নিয়ে আমরা চারজন, দিদুন নির্মলকাকু আর মিনি বেড়াল-
সবাই হেসে ওঠে।
না বলে, তোর খালি উদ্ভট ভাবনা রে ডাব্বু। দিদুন-নির্মলকাকু ওরা তো বাড়ির মানুষ নন, বেড়াতে এসেছিলেন। গেস্ট বলতে পারো।
ডাব্বু গম্ভীর মুখে বলে, আমি একটা অঙ্ক তৈরি করেছি মা। বিনিমাসী দিদুন আর কাকুকে নিয়ে আমরা সাতজন, পুষিকে তো বাদ দেয়া যাবে না, ও আমার পোষা ক্যাট ও আমাদের বাড়িতে এখন থাকে, ও বাড়ির একজন মেম্বার- তাই না দাদান?
মিটিমিটি হেসে সোমনাথ বলেন, সত্যিই তো ও একজন ফ্যামিলি মেম্বার।
– ডাব্বুর খালি আজগুবি কথা। বলতে বলতে বিনিমাসী রান্নাঘরে যায়। আরও ডাল-তরকারি আনতে হবে। ফুঁসে ওঠে ডাব্বু।
– এটি আজগুবি কথা মা? মিনি বেড়াল আমাদের বাড়িতে রয়েছে ওরও আমাদের মতো লাইফ আছে, ওকে কেন কাউন্ট করব না বলতে পারো? মাসী এটিকে ‘কক অ্যান্ড বুল স্টোরি’ (cock and bull story) বলল কেন? এটি আনরিয়েল নয়। দাদান- পানিশ হার। বলো- এটি আজগুবি কথা নয়।
সোমনাথ বলেন, ওকে পানিশমেন্ট তো দিতেই হবে। না বুঝে সব কিছুতে কথা বলে বউমা। তোমার অঙ্কটি এবার বলো গোল্লু।
– হ্যাঁ তাহলে শোন- আমাদের ফ্যামিলি মেম্বার হলো আটজন, দিদুন নির্মলকাকু চলে গেল। তার মানে দু’জন নেই- এবার বাড়িতে কতজন রইলো?
– বাহ্ সুন্দর কোয়েশ্চান।
শোনার লোক পেয়ে ডাব্বু উৎসাহ পেয়ে বলে, ডালিম্যাম-এর প্রশ্নগুলো অন্যরকম। ঝুমঝুম ম্যাম, মধুরা ম্যামও ভালো কোয়েশ্চান করতে পারে না।
রিনা জিজ্ঞেস করে, কী রকম?
– এই তো, হারাধনের দশটি ছেলে ছিল, একটিকে বাঘ খেয়ে নিলে ক’জন থাকে? বাঘ কেন খেয়ে নেবে দাদান? ওর মা কি ওকে জঙ্গলে যেতে দেবে? সেখানে বাঘ-ভালুক-সিংহ রয়েছে। ওর বাবাও তো বলবে, খবরদার জঙ্গলে যেও না- তাই না দাদান? তাহলে একটি ছেলেকে বাঘ খাবে কেন?
ছলছল করে ডাব্বুর দু’চোখ।
সোমনাথ গম্ভীর গলায় বলেন, তাইতো। মা-বাবার কথা না শুনে ছেলেটি কেনই বা বনে যাবে?
– আমিও তো তাই বলি। ডালিম্যাম-এর বোকা বোকা কোয়েশ্চান। গাছের ডালে আটটি পাখি বসে গান গাইছে। গুলতি দিয়ে একটি ছেলে তিনটি পাখির দিকে গুলতি ছুড়লে অন্য পাখিরা তো উড়ে যাবে।
দাদানের কোটরে ঢোকা ফ্যাকাসে দুটি চোখ খুশিতে চকচক করে ওঠে।
– তুমি ঠিক বলেছ, গোল্লুভাই।
– আর একটি পয়েন্ট আছে দাদান।
– বলো।
– তুমি একবার বলেছ আমরা যা কিছু শুনব, যা কিছু বলব, যা কিছু দেখব- সব যেন সুন্দর হয়।
– হ্যাঁ দাদুভাই।
– তাহলে পাখিরা আপনমনে গান গাইছে, ছেলেটি- গুলতি দিয়ে ওদের মারবে কেন? দিজ ইজ নট ফেয়ার
– তাই না দাদান?
অবাক হয়ে সোমনাথ বলেন, হ্যাঁ ঠিক তো।
ছেলেটার ভাবনা অন্যরকম- বরাবরই এ দিকটা খেয়াল করেছে রিনা।
মা বলে, আজ গল্প করতে করতে দেরি হয়ে গেছে। হোমওয়ার্ক না করে এবার ঘুমোবে- চলো।
সত্যি অনেক ঘুম পাচ্ছে ওর। আগের মতো বাড়িটা আর কথায় হাসিতে গমগম করে না। কাকু চুপচাপ থাকলেও নিরুদিদুনের কোনো তুলনা নেই। একাই একশ। রেঁধে বেড়ে, পিঠে বানিয়ে গল্পে-হাসিতে জমজমাট থাকত সারা বাড়ি।
ওনারা চলে গেছেন। কিছুদিন পর আবার ডাক্তার দেখাতে আসবেন। ডাব্বু কখনো কাউকে কষ্ট দিতে চায় না, কারোর খারাপ কিছু হোক তাও চায় না, তবে চুপি চুপি সে বলতে থাকে- দিদুনের যেন অসুখের বাড়াবাড়ি হয়। ঢাকায় যেন আবার তাকে ডাক্তার দেখাতে আসতে হয়। তাহলে দিদুনের সাথে অনেক মজা করতে পারবে। মনের এই ইচ্ছেটুকু গোপন করে রাখে সে, মাকেও বলে না।
ঘুমের মাঝে সব মন খারাপগুলো ওর কান্না হয়ে আসে।
বাংলার ক্লাসে খুশবু ম্যাম বলেছেন, তোমাদের একটি কবিতা পড়ে শুনিয়েছি। এবার বলতো বড় হয়ে তুমি কী হতে চাও? সবাই বলেছে, আমি মাঝি হবো, মাঝি হবো।
কেউ কেউ কবিতায় বলেছে, বড় হলে হবই আমি খেয়া ঘাটের মাঝি।
চুপ করে বসেছিল ডাব্বু। সে ভাবছিল- মাঝিটা কে? মাঝি কেমন দেখতে?
ওদের শোবার ঘরে একটি ক্যালেন্ডার আছে। সেটাতে রয়েছে সর্ষে ক্ষেত, নদী পুকুর ধানক্ষেতের ছবি। মাঝির একটি ছবি রয়েছে। বৈঠা দিয়ে সে কোষা নৌকা বাইছে।
আমি শুধু ছবিতেই মাঝিকে দেখেছি। ওকে তো আমি সামনাসামনি দেখিনি। মুখোমুখি বসেও তো মাঝির সঙ্গে কথা বলিনি। বরং ও টিভিতে দেখেছে স্পাইডারম্যানকে। মাকরসা মানুষকে ওর অনেক কাছের মনে হয়।
খুশবু ম্যাম জিজ্ঞেস করেছেন, কী ব্যাপার মাল্যবান, তুমি বড় হয়ে মাঝি হতে চাও না? চুপ করে আছ কেন? কী হতে চাও তুমি? কবিতা থেকেই উত্তর দাও।
মুখভরা হাসিতে সে বলে, ম্যাম আমি স্পাইডারম্যান হতে চাই।
হি হি হি হি করে হাসে সবাই। চেঁচিয়ে সবাই একসাথে বলে স্পাইডারম্যান স্পাইডারম্যান।
ম্যাম বলেন, ঠিক আছে তুমি স্পাইডারম্যান হতে চাও, কিন্তু তোমার যখন প্রশ্ন আসবে সেই প্রশ্নের জবাবে তাই বলতে হবে তোমাকে। তুমি নতুন কিছু বলতে পারবে না।
মন খারাপ করে ডাব্বু জিজ্ঞাসা করে, আমার ভালো না লাগলেও তাই বলতে হবে?
খুশবু ম্যাম বিরক্ত হয়ে বলেন, যা তোমাকে জিজ্ঞেস করব, তোমাকে সেই জবাব দিতে হবে। বুঝতে পেরেছ?
সেই থেকে দারুণ মন খারাপ ডাব্বুর।
ট্যাবলেটে ও থানডার ক্যাটস, স্পাইডারম্যান, সুপারম্যান, স্কুবিডু দেখে চিন্টুমামুর সঙ্গে বসে। খেয়াঘাটের মাঝিকে ও কখনো দেখেনি। ঘুমের মাঝে, স্বপ্নের মাঝে খুশবু ম্যাম বারবার ফিরে আসেন।
বলো- ‘বড় হলে হবই হব, খেয়াঘাটের মাঝি’-
খুশবু ম্যাম প্রশ্ন করেন, বড় হলে তুমি কী হবে সোনামনিরা? সবাই বলে- আমি মাঝি হবো ম্যাম।
ঘুমের মাঝে ডাব্বু বিড়বিড় করে – আমি স্পাইডারম্যান হবো। আমি হবো না, কখনো হবো না।
এই ডাব্বু ওঠ ওঠ বাবা, সন্ধ্যে হয়ে এসেছে, বোকার মতো মাঝি হবো না মাঝি হবো না বলছিস কেন? বোকা ছেলে।
উঠে পড়ে সে। বাইরের দিকে তাকায়, সন্ধ্যার মুখে রোজই মেঘ-বৃষ্টি একসাথে নামে, গুরু গুরু মেঘ ডাকে, লিকলিকে সাপের মতো বিদ্যুৎ চমকায়।
একে তো সন্ধ্যার আঁধার, তার মাঝে বৃষ্টি আর পাগলা হাওয়া এসে মন খারাপ করে দেয় ডাব্বুর। রিনা বড় পেয়ালায় হরলিকস আর প্লেটে কাজু বিস্কিট নিয়ে আসে।
– খেয়ে নাও, জলদি, তারপর হোমটাস্ক শেষ করে নাও। হ্যাঁ দুপুরে হোমটাস্ক করা হয়নি, এবারে শেষ করতে হবে। পড়তে লিখতে ওর কোনোদিন ভালো লাগে না, ভালো লাগে ছবি আঁকতে।
মাঝে মধ্যে চোখে পড়লে সৌম্য বলেন, ছবি আঁকা খুব ভালো ব্যাপার ডাব্বু। সবাই তো শিল্পী হতে পারে না। তবে আগে পড়াশোনা করতে হবে, এরপর ছবি আঁকো ইচ্ছে মতো। তার মানে- আগে পড়াশোনা, এরপর অন্যসব। পড়তে ওর ভালো লাগে না- এ কথা বললে ভুল হবে। সারাক্ষণ পড়া, সকাল বিকেল পড়া- এখানেই আপত্তি ডাব্বুর। আমার যখন ভালো লাগবে তখন পড়ব। এত নিয়ম, এত ডিসিপ্লিন ওর ভাল্লাগে না। ছোটদের যখন ভালো লাগবে, তখনই পড়তে বসবে- মা এ কথাটি বুঝতেই চায় না।
ঝেঁপে বৃষ্টি এলো আবার। হাওয়ার তোড়ে দরজা জানালায় ঠাস ঠাস আওয়াজ হতে থাকে।
রিনা জানালা দরজা বন্ধ করতে থাকে।
– এই মাসে এত ঝড় বৃষ্টি কেন হয় মা?
– হবে না? বছর শেষ হয়ে যাচ্ছে, চৈত্র মাস হলো বছরের শেষ মাস। বছরটি শেষ হয়ে যাচ্ছে- ও কাঁদবে না। দিদুন যখন চলে গেল- তোমার কষ্ট হয়নি, তুমি কাঁদনি বলো। যে চলে যাবে সে তো কাঁদবেই। তাই তো বছরের শেষ মাসে ঝড় বৃষ্টি হয়।
মেঘ কাঁদে, বাতাস কেঁদে কেঁদে বলে- বিদায়।
– ডাব্বু কৌতূহলী হয়ে বলে, সত্যি মা বাতাস কাঁদে, মেঘ কাঁদে? সত্যি ইন্টারেস্টিং মা, তাহলে তো তোমার নয়নতারার গাছ, মানিপ্ল্যান্টের লতা, বেগুনি রঙের ক্যাকটাস সবাই তো কাঁদে। তাই না মা? দাদান বলেছেন, জগদীশ চন্দ্র বসু বলেছেন, গাছেরও প্রাণ আছে।
রিনা বলে, সে তো আছেই ডাব্বু। তবে আমরা তো ওদের কথা বুঝতে পারি না। তবে বছর চলে যাচ্ছে, ওরা কাঁদবে না? দিদুন- কাকু যখন গেছে তুমি কাঁদনি?
– সে তো কেঁদেছি মা। দিদুনকে দেখতে পাবো না, ওর গল্প আর শুনতে পাবো না- এগুলো ভাবলে খুব মন খারাপ হয় আমার। তবে মোবাইলে তো কথা হয়, দিদুন খুব শিগগির আসবে বলেছে, আবার দেখা হবে, খুব আনন্দ হচ্ছে আমার।
– সে তো হবেই ডাব্বু।
– তাহলে এই চৈত্র মাসের শেষে মেঘ, গাছপালা বৃষ্টি সবাই কাঁদে কেন, মা? নতুন বছরতো আবার আসবে, কত আনন্দ করব সবাই মিলে।
– সে তো ঠিক আছে। ১৪২৫ সাল চলে যাবে, নতুন বছর ১৪২৬ সাল আসবে কিন্তু পুরনো বছর আর ফিরে আসবে না। তোমার দাদান সব সময় বলেন- সময় চলে গেলে আর ফিরে আসে না। তাইতো বলি, সময়কে অবহেলায় নষ্ট হতে দিও না।
বিনিমাসী বলে, টেবিলে ভাত দিয়েছি ডাব্বু, খেতে চলো। এবার ব্যাপারটি ভালো করে বুঝল ও। ১৪২৬ আসবে, নতুন বছর কিন্তু ১৪২৫ যে চলে যাচ্ছে সে আর কোনোদিনও ফিরে আসবে না। তিতির অথৈ ওদের সাথে কত ভাব, কতো খুনসুটি-ওগুলো আর ফিরে আসবে না। এ কথা ভাবলেই টা টা বাই বাই বাই বলতে ইচ্ছে করে। গুডবাই শব্দটি উচ্চারণ করতে কষ্ট হয়।
সরফরাজ দাদান সুর মাখিয়ে চমৎকার করে বলেন, কভি আলবিদা না কেহে না, ডোন্ট সে গুডবাই।
সোমনাথ দাদান বলেন, কী ব্যাপার দাদুভাই, মুখ গোমড়া করে রেখেছ কেন? করলা উচ্ছে নিমপাতা নেই। তাকিয়ে দেখ, রুই মাছের ফ্রাই আর ইলিশ-ভাপা রয়েছে।
ওসব প্রিয় খাবার ওর। ফিক করে হেসে ফেলে দাদানের কথায়।

[চলবে]

SHARE

Leave a Reply