Home প্রবন্ধ ফররুখ আহমদের শিশু-সাহিত্য । মুহম্মদ মতিউর রহমান

ফররুখ আহমদের শিশু-সাহিত্য । মুহম্মদ মতিউর রহমান

ফররুখ আহমদের শিশু-সাহিত্য । মুহম্মদ মতিউর রহমানবাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মৌলিক প্রতিভাধর শক্তিমান কবি ফররুখ আহমদ (জন্ম : ১০ জুন ১৯১৮, মৃত্যু : ১৯ অক্টোবর ১৯৭৪)। তিনি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অবদান রাখলেও মূলত কবি হিসেবে সমধিক পরিচিত। বাংলা কাব্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর অবদান অপরিসীম। গীতিকবিতা, সনেট, ব্যঙ্গকবিতা, শিশুতোষ ছড়া-কবিতা, মহাকাব্য, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য ইত্যাদি বিভিন্ন রূপরীতিতে তিনি অনবদ্য কাব্য-সম্ভার রেখে গেছেন। বিগত শতাব্দীর তিরিশ দশকের শেষ দিকে তাঁর কাব্য-প্রতিভার উন্মেষ ঘটে। তবে চল্লিশ দশকের প্রথম থেকে তিনি কাব্যক্ষেত্রে তাঁর অসামান্য অবদান রেখে সকলের সাগ্রহ দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এ জন্য তাঁকে সাধারণত চল্লিশ দশকের কবি হিসেবে অনেকে আখ্যায়িত করে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে, জীবনকালে তিনি সমকালীন কবিদের মধ্যে সর্বাধিক প্রতিভাবান ও জনপ্রিয় কবি ছিলেন। তিনি আদর্শনিষ্ঠ, ঐতিহ্য-সচেতন, স্বদেশপ্রেমিক ও জাতীয় জাগরণের বলিষ্ঠ কবিকণ্ঠ হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত। তাঁর রচিত গীতিকাব্য, মহাকাব্য, সনেট, ব্যঙ্গকাব্য, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য ইত্যাদি সম্পর্কে অনেকেই আলোচনা করেছেন। কিন্তু তাঁর রচিত শিশু-কিশোর রচনাবলি নিয়ে তেমন একটা আলোচনা হয়নি। অথচ বাংলা সাহিত্যে শিশুতোষ ছড়া-কবিতা রচনার ক্ষেত্রে ফররুখ আহমদ অন্যতম শ্রেষ্ঠ। সংখ্যা ও মানগত উভয় দিক থেকে তিনি এ ক্ষেত্রে এ শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করতে পারেন।
ফররুখ আহমদের শিশু-কিশোরদের উপযোগী গ্রন্থের সংখ্যা মোট ছাব্বিশটি। এগুলো যথাক্রমে- ১. পাখীর বাসা, ২. হরফের ছড়া, ৩. নতুন লেখা, ৪. ছড়ার আসর-১, ৫. চিড়িয়াখানা, ৬. ফুলের জলসা, ৭. কিসসা কাহিনী, ৮. ছড়ার আসর-২, ৯. ছড়ার আসর-৩, ১০. সাঁঝ সকালের কিসসা, ১১. আলোকলতা, ১২. খুশির ছড়া, ১৩. মজার ছড়া, ১৪. পাখির ছড়া, ১৫. রং মশাল, ১৬ জোড় হরফের ছড়া, ১৭. পড়ার শুরু, ১৮. পোকামাকড়, ১৯. ফুলের ছড়া, ২০. দাদুর কিসসা, ২১. সাঁঝ সকালের কিসসা, ২২. সাত ডাকাত ও হাতেম তায়ী।
উপরোক্ত শিশু-কিশোর গ্রন্থসমূহের মধ্যে কবির জীবনকালে মাত্র চারটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। তাঁর ইন্তেকালের পর আরো তিন-চারটি গ্রন্থ প্রকাশিত হলেও বাকি গ্রন্থগুলো এখনো অপ্রকাশিত রয়েছে। এ কারণেই শিশু-সাহিত্যে তাঁর অবদান সম্পর্কে আমরা অনেকেই সম্যক অবহিত নই। উপরোক্ত বাইশটি শিশু-কিশোর ছড়া-কবিতা ও গল্পগ্রন্থ ছাড়া ফররুখ আহমদ ছোটদের পাঠ্যপুস্তক হিসেবে আরো চারটি গ্রন্থ রচনা করেন। এগুলো হলো- নয়া জামাত : প্রথমভাগ, দ্বিতীয়ভাগ, তৃতীয়ভাগ ও চতুর্থভাগ। এগুলো যথাক্রমে বিভিন্ন শিশুশ্রেণিতে একসময় পাঠ্য-তালিকাভুক্ত ছিল, সে হিসাবে একসময় এগুলো বিশেষভাবে সমাদৃত ও ব্যাপক প্রচার ছিল।
ফররুখ আহমদের রচিত শিশু-কিশোর রচনাবলির তালিকা দেখে স্পষ্টতই ধারণা করা যায় যে, বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্যে তাঁর অবদান বিশাল ও বৈচিত্র্যপূর্ণ। মূলত বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ শিশু-সাহিত্যিকদের অন্যতম ফররুখ আহমদ। বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ শিশু-সাহিত্যিক হিসাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১), সুকুমার রায় (১৮৮৭-১৯২৩), কবি গোলাম মোস্তফা (১৮৯৫-১৯৬৪), কাজী নজরুল ইসলাম, (১৮৯৯-১৯৭৬), জসীমউদ্দীন (১৯০৩-১৯৭৬), ফররুখ আহমদ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। গ্রন্থসংখ্যার দিক থেকে উপরোক্ত বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিকদের মধ্যে ফররুখ আহমদ অন্যতম শ্রেষ্ঠ। তা ছাড়া, শুধু সংখ্যার বিচারে নয়, মানগত বিচারেও ফররুখ আহমদের শিশুতোষ ছড়া-কবিতা নিঃসন্দেহে উৎকর্ষমণ্ডিত ও বাংলা শিশু-সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।
শিশুতোষ রচনার ক্ষেত্রে বিশেষ কয়েকটি বিষয়ের প্রতি সচেতন থাকা জরুরি। প্রথমত, শিশু-মনস্তত্ত্ব, দ্বিতীয়ত, শিশু-কিশোরদের উপযোগী ভাব ও বিষয় নির্বাচন, তৃতীয়ত, শিশু-কিশোরদের বোধগম্য সহজ, সরল শব্দ ও চতুর্থত, প্রাঞ্জল বর্ণনা। উপরোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে ফররুখ আহমদের শিশু-কিশোর রচনাবলি পাঠ করলে রীতিমতো বিস্মিত হতে হয়। কারণ তাঁর রচিত মহাকাব্য, গীতিকাব্য ইত্যাদি কাব্যের ভাব-ভাষা, বিষয়-বর্ণনা ইত্যাদির সাথে শিশু-কিশোরদের জন্য রচিত রচনাবলির আদৌ কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। ভাব-বিষয় ও উপযোগিতার দিক থেকে এগুলোর ভাষা অনেক উন্নত, অলঙ্কারবহুল ও কখনও কখনও আরবি-ফারসি ইত্যাদি ভাষার শব্দরাজিতে পূর্ণ। বিশেষত তাঁর রচিত সুবিখ্যাত ‘সাত সাগরের মাঝি’, ‘সিরাজুম মুনীরা’ ইত্যাদি কাব্যের ভাষায় আরবি-ফারসি শব্দের ব্যাপক ব্যবহার, কাব্যের উন্নত মহিমান্বিত ভাব, বিষয়ের গভীরতা, মাধুর্যময়, অলঙ্কারবহুল উচ্চাঙ্গের বর্ণনা ইত্যাদি কাব্যামোদী বোদ্ধা পাঠককে অভিভূত করে।
অন্যদিকে, ফররুখ আহমদের শিশুতোষ ছড়া-কবিতা-গল্পের ভাব-বিষয় যেমন সহজ, অনাড়ম্বর, তেমনি এর ভাষা অতি সহজ, সরল ও অনায়াসে বোধগম্য। বলতে গেলে, তাঁর সমগ্র শিশু-সাহিত্যে আরবি-ফারসি শব্দ নেই বললেই চলে। এ সাহিত্যের ভাব, বিষয় ও বর্ণনা অত্যন্ত সহজ, সরল ও সকলের বোধগম্য।
ফররুখ আহমদের শিশু-সাহিত্য । মুহম্মদ মতিউর রহমানসর্বোপরি, তাঁর শিশুসাহিত্যের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য এই যে, খেলার ছলে, মজা করে, গল্পের মতো করে অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে তিনি একটির পর একটি যেন ছবি এঁকে গেছেন, যা শিশু-কিশোরদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও চিত্তাকর্ষক হয়ে উঠেছে। তাঁর সমগ্র শিশু-সাহিত্যে আমাদের পরিচিত পরিবেশ, প্রকৃতি, মানুষ ও কাছের জানাশোনা পৃথিবী সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। যেমন নানা বর্ণ-গন্ধের বিভিন্ন-বিচিত্র ফুল, পাখি, শস্য, জন্তু-জানোয়ার ইত্যাদি আমাদের চারপাশের পরিচিত বিভিন্ন বিষয়ের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের তাঁর পরিচিত জগৎ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান প্রদান করা হয়েছে। শিশুরা বাস্তবে যা দেখছে, যা জানা তাদের একান্ত প্রয়োজন, সেসব বিষয় নিয়েই তিনি সহজ, সুন্দর ভাষায় ছড়া-কবিতা-গল্প লিখেছেন। ফলে এগুলো পড়ে শিশু-কিশোররা শুধু আনন্দ লাভ করছে তাই নয়, সঙ্গে সঙ্গে তারা অনেক কিছু জানতে ও শিখতে পারছে। বাস্তব জগতের সাথে শিশু-কিশোরদের পরিচিত করে তোলা ও জীবন-জগৎ সম্পর্কে তাদের যথার্থ জ্ঞান দান করাই কবির প্রধান লক্ষ্য। সহজ ভাষায়, সুন্দর বর্ণনা ও ছন্দময় ভঙ্গিতে কবি এ সবের সাথে শিশু-কিশোরদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন তাঁর অসাধারণ ছড়া-কবিতার মাধ্যমে।
ফররুখ আহমদের শিশুসাহিত্যের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই যে, এতে খেলার ছলে, মজা করে বলতে বলতে তিনি শেষ পর্যন্ত এমন একটি শিক্ষণীয় বিষয় উপস্থাপন করেছেন, যা শিশু-কিশোরদের সুস্থ মানসগঠনে অত্যন্ত সহায়ক। মূলত শিশু-কিশোরদের উন্নত চরিত্র, মানবীয় মহৎ গুণাবলি ও আদর্শিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ-পরিগঠিত করাই তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য। এ কারণে ফররুখ আহমদের শিশুতোষ রচনাবলির একটি আলাদা গুরুত্ব ও মর্যাদা রয়েছে। তাই শিশু-কিশোরদের সুষ্ঠু মানসগঠন, উন্নত চরিত্র, মহৎ চিন্তা ও জগৎ-জীবনকে জানার উদগ্র বাসনা সৃষ্টির জন্য ফররুখ আহমদের শিশুতোষ ছড়া-কবিতা-গান-গল্প ইত্যাদি অত্যন্ত উপযোগী। এ জন্য তাঁর শিশু-সাহিত্যের ব্যাপক প্রচার- প্রসার একান্ত জরুরি।
দুর্ভাগ্যবশত, ফররুখ আহমদের সমগ্র শিশু-সাহিত্য এখনো অপ্রকাশিত। তাঁর রচিত সমগ্র শিশুসাহিত্য অবিলম্বে প্রকাশিত হওয়া প্রয়োজন। তাহলে বাংলা শিশুসাহিত্য যেমন সুসমৃদ্ধ হবে, তেমনি শিশুসাহিত্যে ফররুখ আহমদের মূল্যবান অবদান সম্পর্কেও সকলে সম্যক অবহিত হবেন এবং শিশু-কিশোর এমনকি বড়রাও তাঁর শিশু-সাহিত্য পাঠে অপরিসীম আনন্দ লাভ করার সাথে সাথে সবিশেষ উপকৃত হবেন।

SHARE

Leave a Reply