Home সম্পূর্ণ কিশোর উপন্যাস ডাব্বু দ্য গ্রেট । ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ

ডাব্বু দ্য গ্রেট । ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ

ডাব্বু দ্য গ্রেট । ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থগত সংখ্যার পর

ডাব্বুর কোঁকড়ানো চুলগুলো নেড়ে দিতে দিতে বলেন,
‘ডাব্বু বাবুর পিঠের ওপর
গাদা খানেক বই-
হাসবে কখন খেলবে কখন
সময় ওদের কই।
ময়ূরপঙ্খী তেপান্তরের
মাঠ হারালো কই-
মন খারাপের ঢেউ-এ ভাসে
খাতা কলম বই।
সাইকোলজির অধ্যাপক ছিলেন সোমনাথ, নাতির জন্য কবিতাটি তিনি প্রায়ই আওড়ান। ওরই জন্য লেখা দাদানের কবিতাটি শুনলে ওর চোখ দু’টি ছলোছলো হয়ে ওঠে।
রিনা বারবার ছেলের কাছে আসে। বড়রা সবাই মিলে খবর শোনে, নানা আলোচনা-গল্প হয়। এইটুকুন বাচ্চাটিকে মাথা গোঁজ করে পড়তে হবে। সময়ের দাবি- পড়তে হবে। শুধু পড়তে হবে। ব্যালকনির টবগুলোর মাটি খুরপি দিয়ে রিনা আলগা করে দেয়। মায়ের হাতের ঝাঁঝরির জল পেয়ে ফুলগাছের পাতাগুলো চকচক করে।
রিনা বলে, ভয় পাস না ডাব্বু, আমি এখানেই আছি। কাজ করতে করতে গুনগুন করে গান গায় মা।
‘নদী ভরা ঢেউ বোঝে না তো কেউ
কেন মায়ার তরী বাও বাও বাও রে’-
তৈরি গলা মায়ের। পড়া তৈরি করতে আর হোমওয়ার্ক করতে খুব ভালো লাগছে এখন। মায়ের মুখের গুনগুন গান মনটাকে ভালো করে দেয় এক মুহূর্তে। সত্যি গান কাঁদায় আবার আনন্দেও ভরিয়ে দিতে পারে।

মনটা আজ একেবারেই ভালো নেই রিনার। গতকাল রাতে সোমনাথের গাটা গরম হয়েছিল। এত সাবধানে তিনি থাকেন, তাও জ্বর এসে যায় মাঝে মধ্যে।
দাদান কত নিয়মের মাঝে থাকেন। বেলের শরবত, লেবুর শরবত। বাইরের কেনা কোনো জিনিস খান না। তারপরও জ্বর। বয়স হলে বুঝি এমনই হয়!
আজকে পাপা একবারও ফোন করেনি। মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে কাজ করে, সারাক্ষণ ব্যস্ত, মা-ই মাঝে মধ্যে ফোন করে খোঁজ নেয়।
– খেয়েছ তো?
– এখনও খাওনি? কী যে করো না। এক্ষুনি লাঞ্চ করো বলছি।
আজ হয়তো অফিসের বাইরে, হয়তো বিদেশী ডেলিগেটদের নিয়ে পাঁচতারা হোটেলে জরুরি মিটিংয়ে বসেছে পাপা, মা সেসব কিছু বুঝতে চায় না। মলিন মুখে বারবার টিভির খবর দেখে। অস্থির হয়ে পায়চারি করে। সবার কথা ভাবে মা। বলে, ইসস রোড অ্যাক্সিডেন্টে কতজন মারা গেছে দ্যাখো। ঘণ্টাখানেক পর আবার ব্রেকিং নিউজ দেখে রিনা।
– ওমা আজ যে বিশতলা বিল্ডিংয়ে আগুন লেগেছে বাবা। সোমনাথও মন খারাপ করে বসে থাকেন।
ছেলেটা চিরকালের আলাভোলা। অফিসের কাজে যেখানেই যাস না কেন, দু’-একবার ফোন করা কোনো ব্যাপারই তো নয়। তা করবে কেন? বাড়ির সবাইকে ভাবনায় ফেলবে।
ডাব্বু এখন কী করে? কার সঙ্গে কথা বলবে? কার সঙ্গে খেলবে? পাপা যে কি করে? একটা মোবাইল করে নিলেই তো হয়।
কথায় কথায় পাপা গাজীপুর যাবার কথা বলেছিল। মনে হচ্ছে ডাব্বুর সকাল বেলা যে চার-পাঁচটে চড়ুই আর শালিক এসে কিচিরমিচির করে, ডানা ঝাপটায়- ওর যদি দুটো ডানা একদিনের জন্য ধার দিত, আহা কত্ত মজা হতো তাহলে। গাজীপুরে পাপাকে গিয়ে দেখে আসতে পারত। মাকে আর দাদানকে বলত, মিছেমিছি মন খারাপ করে বসে আছ। সাইটটা দেখে চারটের দিকে ওরা ঢাকায় ফিরবে।
এ সবই ডাব্বুর অলীক কল্পনা। শালিক কিংবা চড়ুই কেউ ডানা ধার দেবে না। পাপা ফিরে না আসা পর্যন্ত গুমোট হয়ে থাকবে বাড়ি।
বিনিমাসী খেতে দিল।
ডাব্বুর একটুও খেতে ইচ্ছে করছে না, দাদানের তো নয়ই। তবে দাদানের খেতে হবে। দু’ তিনটে ওষুধ খেতে হয় দুপুরে।
গুটি গুটি পায়ে চেয়ারে বসে ডাব্বু। টেবিলে করলা ভাজি, নিমপাতা দিয়ে বেগুন ভাজি, শজনের ডাঁটা দিয়ে ডাল।
মাসীর দিকে তাকাতে বিনি ফিসফিস করে বলে, খেয়ে নাও বাবা। বসন্ত কালে ওগুলো খেতে হয়।
মলিন মুখে ছড়িয়ে ছিটিয়ে খাবার পর দুধ-কলা ভাত দিয়ে খায় ডাব্বু।
রিনা খাবে কি, রাগে গরগর করে।
– দেখুন তো বাবা, যত কাজই থাকুক, অফিসে একটা ফোন করা যায় না? আপনার ছেলে সবাইকে কেমন ভাবনায় ফেলে দেখুন।
পৌনে চারটেয় একটা ফোন আসে। অফিসের ল্যান্ডফোন থেকে করেছেন সৌম্য।
– আরে বাবা রাগ করছ কেন? চার্জ ছিল না মোবাইলে। এইমাত্র ফিরলাম গাজীপুর থেকে।
একটি ফোনেই বাড়ির ভোল পালটে গেল। রিনা বলল, এখন আর ভাত খাব না রে বিনি, ভালো করে চা বানিয়ে দে তো।
দাদান নিশ্চিন্তে ঘুমোয়। আর ডাব্বু? সারা ডাইনিং স্পেস জুড়ে গাড়ি সাজাতে থাকে।
– এই এই ডাইনে যাও, বাঁয়ে যাও, ব্যাক করো, ব্যাক করো নিসান সানি আসছে।
বাঘ ভালুক সিংহ বানর শিম্পাঞ্জী সাজাতে সাজাতে বলল,
মা – এ হলো গহিন জঙ্গল।
এখানে জিম করবেট শিকার করতে আসবেন।
বিনিমাসী বলে, আমি ড্রয়িংরুমে যেতে পারব না, বেডরুমেও যেতে পারব না। কি করে কাজ করব ডাব্বু?
মা চায়ে চুমুক দিয়ে বলে, ডাব্বু, এখন কি লাফিয়ে লাফিয়ে বিনি কাজ করবে? আমি, তোর দাদান কী করে হাঁটাচলা করব বলতো? তোর পাপা আসলে তো সব ছৈ ছত্রাকার হয়ে যাবে।
ডোরবেল বাজলো। ঘরে ঢুকেন নিরুপিসি আর তার ছেলে নির্মল। সাথে দুটো ঢাউস স্যুটকেস।
নিরুপিসির পা লেগে নিসান সানি, টয়োটা করোলা, ভক্স ওয়াগন, প্রিমিয়ো, প্রাডো জিপ, মিৎসুবিসি হাইহুন্দাই, বিএম ডাব্লিউ- সব সারা ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল।
বাঘ ভালুক সিংহ হাতি- জিম করবেট, আসার আগেই জঙ্গলের সব ছৈ ছত্রাকার হয়ে সারা বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে।
স্যুটকেস-ব্যাগ ডাব্বুর ঘরে গিয়ে ঢুকে। অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকে ছোট্ট ছেলেটা।
রিনা বলে, এ তোমার দিদুন ডাব্বু।
– আয় আয় দাদুভাই, কোলে আয়। সেই কবে এইটুকুন দেখেছি আর আজ দেখলাম। মরার সংসার থেকে বেরোনই যায় না।
রাগে গরগর করতে করতে সিংহ যেমন কেশর ফোলায় ভেতর ভেতর তেমনই ফুঁসছে ডাব্বু। আমার লায়ন-টাইগার বিয়ার, সবাইকে বের করে দেয়া? শিকারি জিম করবেট আসতেই পারল না কুমিল্লার দিদুনের জন্য। দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা!
হ্যান্ড ব্যাগ থেকে নিরুদিদুন বের করতে থাকে নারকেলের নাডু, ক্ষীরের ছাঁচ সন্দেশ- এই রইল ডাব্বুর রসমালাই।
রসমালাই! ছোট্ট ছেলেটির সব রাগ গলে গলে ঝরে পড়তে থাকে।
দাদান ঘর থেকে বের হয়ে বলে, এত কি নিয়ে এসেছিস রে নিরু?
দিদুনের শরীর খারাপ, ডাক্তার দেখাতে এসেছে- তারপরও নিয়ে এসেছে ওর প্রিয় সব খাবার?
দুটো স্যুটকেস বৈ তো নয়, ওর ঘরে থাকলে কি এমন ক্ষতি? রসমালাই খেতে খেতে ভাবে, সবাইকে নিয়ে মিলেমিশে থাকলেই তো আনন্দ। একা থাকলে এক রকমের জীবন। ঘুম থেকে উঠো, ডিম মাখন পাউরুটি খাও, গাদা গাদা হোমটাস্ক করো, স্কুলে যাও।
সৌম্য ফিরলেন অফিস থেকে। দাদান মৃদু সুরে বলেন, সারাটা দিন কত ভাবনা তোমার জন্য, দু-একবার বাড়িতে ফোন করবি, ব্যস মিটে গেল। সেই যে নটায় গেলি আর কোনো খবর নেই। নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়নি, বললেই হলো? চার্জই বা থাকবে না কেন?
টেবিল ভর্তি খাবার।
চা এলো সবার জন্য। ডাব্বুর জন্য দুধ। নারকেলের নাড়–, ছাঁদ সন্দেশ খেতে খেতে ওর মনে হয়- একা একা থাকার একঘেয়েমির মাঝে নিরু দিদুনের মতো কেউ এলে তো ভালোই লাগে। মিছেমিছিই মন খারাপ করেছে এতদিন।
রিনা চুপিচুপি বলে, একা একা সবাই থাকতে পারে সোনা, এই যে তোমার দিদুন আর নির্মল কাকু এলো, ভাল্লাগছে না বলো? সবাইকে নিয়ে থাকার মাঝেই তো আনন্দ।
সন্ধ্যায় সরফরাজ দাদান এলে ছাঁচের সন্দেশ দেয়া হয়। চোখ বুজে তিনটে সন্দেশ খাচ্ছেন তো খাচ্ছেন। বলছেন, আহ মজা আ গ্যায়া। বহুত খুব সুরাত মেঠাই। দেখনে ভি সুপার্ব হ্যায়, খানে মে বহুত আচ্ছা হ্যায়।
সোমনাথ বলেন, ডায়াবেটিসের মাঝে কেমন সাঁটাচ্ছে দ্যাখো। যতই ভালো বলো ভায়া, আর পাবে না।
হাসিমুখে সরফরাজ বলেন, হামার রিনা বিটিয়া আছে।
এমন সময় গুড় গুড় আওয়াজে মেঘ ডেকে ওঠে। ফাল্গুনের মাঝামাঝি। এমন সময় ঝড় বৃষ্টি হয়। চমকানো বিজলির আলোয় কাচের শার্সি দিয়ে ডাব্বু দেখে, আমগাছের কচি সবুজপাতা, শজনে আর কামরাঙা গাছের পাতাগুলো ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে ভিজে চকচক করছে। ছবির মতো দেখতে লাগছে। সৌম্য বললেন, নির্মলকে ভারী একটা কাঁথা বা অন্য কিছু দিও রিনা। ও ড্রয়িংরুমের সোফা কাম বেড-এ শুয়ে থাকবে। কি রে, অসুবিধে হবে?
– মোটেও নয় দাদা। বরং ভালোই ঘুমোব।
রিনা বলে, নিরুপিসি ডাব্বুর সাথে শোবেন।
দিদুন মধুর হেসে বলেন, নাতির পাশে শোব, গল্প করে করে আমরা রাত কাটিয়ে দেবো। কি বলিস রে ডাব্বু?
‘ড্রয়িংরুমটি ফাঁকা পড়ে থাকে, নির্মল কাকু আজ শোবে। ভরা ভরা লাগছে বাসাটি।
খাওয়া-দাওয়ার পাট তাড়াতাড়ি চুকে গেল। বড় পেয়ালায় চা দেয়া হলো সরফরাজ দাদানকে। চা শেষ করে উঠে দাঁড়ান তিনি। বলেন, রিনা বিটিয়া, তোফা বানিয়েছ মালাই চা। কারিষ এসেছে। এবারে চলি।
নিরুদিদুনের পাশে শুয়ে দারুণ লাগে ডাব্বুর। একটুও ভয় লাগে না।
মা বলেছে, সবার সাথে মিলে মিশে থাকতে হয়। একটু কিছু হলেও ভাগ করে খেতে হয়।
দিদুনের মুখে পানের সাথে কিমাম আর চমনবাহারের ঘ্রাণ। বাইরে ঝেঁপে বৃষ্টি এসেছে। হালকা ঝড়ো হাওয়া।
– ঘুম আসছে না দিদুন। প্লিজ, দু-একটি গল্প বলো না।
– কী গল্প বলব রে দাদু? একটু সময় দে, ভেবে নেই। এক পল দু’ পল করে বৃষ্টির রাত বয়ে যাচ্ছে।
– কি দিদুন, ভাবা তোমার শেষ হলো।
– হ্যাঁ দাদুভাই, ঈশপের গল্প বলি?
– ইশপস ফ্যাবল? উফ, দ্যাটস ফ্যানটাসটিক। খুশিতে ওঠে বসে ডাব্বু।
দিদুন বলে, তুমি বিছানায় শোও। গল্প শুনতে শুনতে দ্যাখো ঘুম নেমে আসবে।
নিরু শুরু করেন, এক গাঁয়ে অনেক বড় মুরগির খামার ছিল। একবার বেশ কয়েকটি মোরগ অসুস্থ হয়ে গেল। খবর শুনে বিড়ালের মন খুশিতে টইটম্বুর হয়ে ওঠে। এই তো সুযোগ। গোঁফে তা দিয়ে গলায় স্টেথিস্কোপ ঝুলিয়ে ডাক্তার সেজে চলল সে খামার বাড়িতে।
ফিক ফিক করে চাপা গলায় হাসে ডাব্বু।
– খামারে পৌঁছে ডাক্তার বিড়াল হাঁক দেয়।
– হ্যালো মোরগ-মুরগিরা। তোমরা সবাই ভালো আছ তো? খামারের ভেতর থেকে জবাব দেয় ওরা, – আমরা খুব ভালো আছি বিড়াল ভাইয়া। তুমি যতক্ষণ বাইরে থাকবে আমরাও ততক্ষণ ভালো থাকব ডাক্তার বিড়াল। গল্পটি থেকে কী শিখলে বলোতো ডাব্বু? ভেবে ডাব্বু বলে, দুষ্টু লোক বুদ্ধিমানকে ঠকাতে পারে না।
– তুমি দারুণ গল্প বলতে পার দিদুন, আর একটি গল্প প্লিজ?
– এটিই কিন্তু শেষ গল্প। এটা হলো গেঁয়ো ইঁদুর ও শহুরে ইঁদুরের গল্প। গেঁয়ো ইঁদুর ফসল ক্ষেতের আনাচে কানাচে গর্ত খুঁড়ে থাকে। এটিই তার বাড়ি। একদিন ও তার শহুরে ইঁদুর বন্ধুকে নিমন্ত্রণ করে এলো আসার জন্য। খাবার দেখে তো শহুরে ইঁদুরের মন খারাপ। শুধু বার্লি আর ভুট্টা- এসব খাবার হলো নাকি? আমি কোনোদিন এসব ছুঁয়েও দেখি না।
যাবার সময় শহুরে ইঁদুরটি গাঁয়ের বন্ধুকে নিমন্ত্রণ করে গেল।
একদিন শহরে যাবার জন্য রওয়ানা হয় গেঁয়ো ইঁদুরটি। শহরের খাবার দেখে ওতো তাজ্জব। জ্যাম জেলি, পনির, মটরশুঁটি আরও কত কিছু। গেঁয়ো ইঁদুরটি এমন খাবার কখনও চোখে দেখেনি, খায়ও নি। সাজানো টেবিলে কুট কুট করে ওরা খেতে থাকে।
অমনি দরজা খুলে কে যেন ঘরে ঢোকে। তাড়াহুড়া করে শহুরে ও গাঁয়ের ইঁদুরটি আলমারির পেছনের গাদা গাদি করা বইয়ের মাঝে লুকিয়ে থাকে। লোকটি চলে যেতেই ওরা বের হয়ে খাবার খেতে বসে। খাবারটি মুখে দেয়ার পরপরই আবার একজন এসে ঘরে ঢুকে। আবার তড়িঘড়ি করে দু’জন লুকোয়।
লোকটি চলে যাবার পর শহুরে ইঁদুরটি গেঁয়ো বন্ধুকে ডাকে, এসো খেতে এসো।
গেঁয়ো ইঁদুরটি বলল, আমি গাঁয়েই ফিরে যাবো। এ কথা সত্যি আমি উপোস করি। ভুট্টা আর বার্লি খাই। ক্ষেতের সাধারণ খাবারই আমার ভালো। আমার গাঁয়ে খেতে বসে বারবার ছুটোছুটি করে লুকোতে হয় না।
ডাব্বু, অ্যাই ডাব্বু- ঘুমোলি নাকি দাদুভাই। ঘুম এসে গেছে ওর। জড়ানো গলায় বলে, গল্প থেকে কী শিখলাম দিদুন?
গল্প থেকে শিখলাম- শাক ভাত খেয়ে শান্তিতে দিন কাটানো অনেক ভালো।
দিদুন আর ডাব্বু ঘুমে ডুবে থাকে। বাইরে জেগে থাকে শুধু বৃষ্টিরাত।
মিঁয়াও মিঁয়াও- ডেকে ওঠে নতুন আসা বেড়ালটি। ওকে আদর করে ডাব্বু ডাকে, – মাই পুষি ক্যাট।
রাস্তায় ঘুরে বেড়াতো সোনালি আর সাদা রঙের বেড়ালটি। কখনও এর বাড়ি ওর বাড়ি ঘুরে বেড়াত। আদর পেয়ে এখন ডাব্বুদের বাড়িতে থাকে পুষি।
গুড় গুড় করে মেঘ ডেকে উঠলে বেড়ালটি বলে, মিঁয়াও- ঘুম জড়ানো গলায় ডাব্বু বলে, গুড নাইটি মাই পুষি ক্যাট।

বাড়িটা যেন আনন্দের হাট হয়ে উঠেছে।
দিদুন যেন ম্যাজিক জানে। স্কুলে যাবার আগে মজার খাবার খায় ডাব্বু। এখন ওর টিফিন বক্সে থাকে অন্যরকম টিফিন। টিফিন আওয়ারে সবাই যখন গোল হয়ে বসে তখন সবাই হাঁ করে তাকিয়ে থাকে ওর ঢাকনা খোলা টিফিন বাক্সের দিকে। সবার বাক্সে বার্গার, নুডলস, স্যান্ডউইচ, চিকেন রোল, এগরোল রয়েছেÑ কিন্তু মাল্যবানের টিফিন একেবারেই অন্যরকম। অনেকখানি ক্ষীরের পুর ভরা পাটিসাপটা, পুলি আর পাটালি গুড়ের মালপো।
সবাই মিলে ভাগ করে রোজ মজা করে খায়। মাল্যবান বলে, দিদুন করে দিয়েছে।
ইসস, আমাদেরও একটা নানী দাদী দিদুন থাকলে বেশ হতো। বন্ধুদের কথা মনে করে, মনে মনে হাসে ডাব্বু। ডাক্তার দেখানো শেষ হলে চার-পাঁচ দিনের ভেতরে দিদুন ফিরে যাবে রে তামিম। তখন আমিও গালে হাত দিয়ে একা একা বসে থাকব।
রিনা বলল, স্কুল থেকে গার্জেন কল করেছে- মনে রেখ। সৌম্য বলে, মনে আছে, কোনো অসুবিধে নেই, আমি ঠিক সময় মতো পৌঁছে যাবো।
রিনা বলে, নিরুপিসি তুমি চলে গেলে আমাদের তো খারাপ লাগবেই, তবে ডাব্বু তোমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।
ডাব্বুকে কোলে বসিয়ে দিদুন বলে, আমাকে আর কতটুকু ভালোবাসবি রে, মাকেই ভলোবাসিস।
কত ছড়াই না জানে দিদুন।
‘দুধ মিঠে মিঠে
আর মিঠে নবনী
সংসারে দুর্লভ মিঠে
মা বড় জননী।
জননীর মানে জানে ডাব্বু, কিন্তু নবনীটা কী?
নবনী হলো মাখন, ব্রেডে লাগিয়ে রোজ তো খাস। মানে জানিসনে?
সত্যি মাকে খুব ভালোবাসে ডাব্বু, কিন্তু দিদুন এত ভালো তাকে ভালোবাসতেই হবে।
এই তো সেদিন, সকালে একটু রোদ ছিল, তারপরই কেমন মেঘলা হয়ে এলো আকাশ। সারাদিন গুমোট ছিল। খুব মন খারাপের দিন। কিছুই ভালো লাগে না। সরফরাজ দাদান সুন্দর করে বলেন, মনটা বড় উদাস উদাস লাগে রে ডাব্বু।
বিকেলে ঝেঁপে বৃষ্টি এলো। বাতাসের তোড়ে গাছের পাতারা ঝরল। মায়ের কোলে বসে, জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখছিল সে। বেশ লাগে তার বৃষ্টি, ঝড়ো বাতাস আর ভেজা মাটি দেখতে।
দিদুন বাটিতে করে তেল-নুন মাখা চালভাজা নিয়ে এলো। মায়ের বাটিতে কাঁচালঙ্কা কুচো। বাইরে বৃষ্টি ঝরছে, এলোমেলো বাতাস বইছে, তার মাঝে কুরুর মুরুর করে চালভাজা খাচ্ছে তিনজন- দারুণ ব্যাপার! ডালমুট- চানাচুর, ঘটি গরম, এগুলো তো হরহামেশা খায় ডাব্বু। কিন্তু চালভাজা? অন্য রকমের খাবার। চাল দিয়ে ভাত হয় খিচুড়ি হয়। পোলাও হয়- কিন্তু চালভাজা? বড়দের কাছ থেকে অনেক কিছু জানা যায়। এমন দিদুনকে কি ছাড়তে ইচ্ছে করে?
ডাব্বু জানে নিরুপিসি চলে যাবে কুমিল্লা। ডাক্তার দেখানো শেষ, ওষুধপত্র দিয়ে দিয়েছেন- এবার বাড়ি ফিরে যাবার পালা। কিন্তু ডাব্বু ওর দিদুনকে কখনো ভুলতে পারবে না।
ছোট্ট বাটিতে এক চিমটি চালভাজা নিয়ে দিদুন সোমনাথের কাছে যান।
– বড়দা, ও বড়দা শুয়ে আছ নাকি? উঠে দ্যাখোই না কী অঝোর বৃষ্টি হচ্ছে। এমন দিনে তো তুমি চালভাজা খেতে পছন্দ করতে। ওঠো, বাটিটা ধরো।
হাসতে হাসতে দাদান উঠে বসেন।
– আমি কি আগের মতো আছি রে নিরু? দাঁত নেই।
– আরে বাবা, বাঁধানো দাঁত তো আছে। মাংসের হাড়ও তো চুষে চুষে খাও, আমি বুঝি দেখিনি।
ঠা ঠা করে হেসে ওঠেন দাদান।
নির্মল কাকু হাসতে হাসতে বলে, মায়ের পাল্লায় পড়েছ, খেয়ে নাও মামু। বৃষ্টির দিনে ভালোই লাগবে।
সন্ধ্যার দিকে ব্যালকনির গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে ডাব্বু, বুকের ভেতর ওর মন খারাপের মেঘ। এমন বাদলা দিনে এমনই হয়। আজ ওর সরফরাজ দাদানের মতো বলতে ইচ্ছে করে- মনটা বহুত উদাস উদাস লাগছে।
উদাস হবার কথাই তো। দিদুন চলে গেলে বাসাটা আবার সুনসান হয়ে যাবে। নির্মল কাকু চুপচাপ, কথা বলে কম। কিন্তু দিদুন একাই একশ। তার রান্না, পিঠে বানানো, তার হাসি-গল্প- সব কিছুতেই জমজমাট ভাব।
দিদুন গেলে আমি চুপি চুপি খুব কাঁদব। আমার বড্ড কষ্ট হবে। কিছুই আমার ভালো লাগবে না।
পাপা ইঞ্জিনিয়ার, ছেলে ভয় পেলে হেসে বলেন, ধ্যেৎ ভূত বলে কিছু আছে নাকি? কখনো দেখেছিস?
– নাহ।
– ভূত বলে কিছু নেই, তাই দেখিসনি।
স্কুল থেকে ফেরার পর (দিদুন আসার আগে) বাসাটা সুনসান থাকত। দাদান শুয়ে শুয়ে খবরের কাগজ পড়ত। ডাব্বু কার সঙ্গে কথা বলবে? বিনিমাসীর পিছু তখন ঘুরঘুর করত ও।
– ও মাসী, তোমার গাঁয়ের গল্প বলো না। গাঁয়ের গল্প বলতে বললেই বিনি ঘন ঘন করুণ নিঃশ্বাস ফেলে।
– গাঁয়ের গল্প আর কি বলব বাবা? আমাদের গাঁয়ে বড় অভাব।
– অভাব? কিসের অভাব মাসী!
– বড় ভাতের অভাব বাবা। মানুষ পেট ভরে খেতে পায় না। এক বেলা খেলো, আরেক বেলা না খেয়েই কাটিয়ে দিলো। নুন দিয়ে ভাতের ফেন খায়। কচু শাক, হেলেঞ্চা সেদ্ধ করে খায়।
– হেলেঞ্চা কিগো মাসী?
– গাঁয়ের ছোট ছোট পুকুরে হেলেঞ্চা ভরা। সেদ্ধ করে খেলে তেতো তেতো লাগে, তারপরও পেট ভরে ডাব্বু। পুকুরে সিঙ্গড়াই হয়-
– সিঙ্গড়াই কী মাসী?
– ডাব্বুর বোকা বোকা গালে আদর করে বিনি বলে, শহরে সিঙ্গড়াইকে বলে পানিফল। কোনোদিন খাওনি?
ডাব্বু নিজের গালে আঙুল দিয়ে মুদা ঠোনা মেলে বলে,
– ও বুঝেছি। পানিফল আমি খেয়েছি।
– আমরা গাঁয়ের মানুষ বনে বাদাড়ে ঘুরে বেতফল খাই, পানিফল খাই, লটকন খাই।
বিনির চোখে তখন নেমে আসে দুঃখের ছায়া।
– এজন্যই তো বাবা শহরে কাম করবার আইছি। এসব গল্প শুনতে শুনতে মনটা ফের উদাস হয়ে যায় ডাব্বুর।
বিনি সুনসান দুপুরে এর পরই শুরু করে ভূতের গল্প।
– এত্তো বড় বড় চোখ, হাত-পা সুপারি গাছের মতো লম্বা। ওরা তেঁতুল গাছের মগডালে থাকে। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে চারদিক অন্ধকার করে বৃষ্টি নামে। ভেজা কাকগুলো যখন কা কা করে ডাকে- তখন ওরা আসে।
বিনিমাসীর গল্প শুনতে শুনতে শিউরে ওঠে সারা শরীর। মনে হয় কাঁধের কাছে কেউ যেন নিঃশ্বাস ফেলছে।
দাদান-পাপা যতই বলুক ভূত বলে কিছু নেই, বিনিমাসীর গল্প শুনে শুনে ওর মনে হয় কিছু একটা আছে, না হলে হঠাৎ করে গা ছমছম করে ওঠে কেন? একলা ঘরে বসে থাকলে মনে হয় কেউ একজন পাশে বসে আছে। কাঁধে গরম নিঃশ্বাস ফেলছে।
দিদুনের পাশে শোয় বলে এই ভয়টা ওর উবে গেছে। বৃষ্টি ঝরে, গুড় গুড় করে মেঘ ডাকে, বিদ্যুৎ চমকায়- দিদুনকে জড়িয়ে ডাব্বু শুয়ে থাকে বলে ভয়গুলো কর্পূরের মতো উধাও হয়ে যায়।
স্কুল থেকে ফিরে দিদুনের সঙ্গে রাজ্যের গল্প।
– দিদুন দিদুন শোন-
– আগে কেক আর শরবত খাও, তরপর গল্প শুনব।
– খাব তো, শোনই না। আজ আমাদের ক্লাসে নতুন একটি ছেলে ভর্তি হয়েছে।
শরবতের গ্লাসটি মুখে ধরে নিরু বলেন, এটি কোনো খবর হলো? ছাত্র তো স্কুলে ভর্তি হবেই।
– এরপর শোনই না। টিফিন ছুটিতে ও বলে ভাতরুমটা কোনদিকে বলতো!
– ভাতরুম? সেটি আবার কী?
– এটিই তো খবর দিদা। ভাতরুম নয় বাথরুম বাথরুম। বিনিমাসী হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে।
– এরপর শোন না। ঝুমঝুম ম্যাম বলেছেন, তোমার কী করতে ভালো লাগে রুবাই?
– রুবাইটা কে?
– এই যে নতুন ছেলেটির গল্প বলছি ওর নাম রুবাই্। ও বলল, ম্যাম আমি গান জানি। করব? ঝুমঝুম ম্যাম বলেন, হ্যাঁ করো। ও কী গান করল জানো?
– আমি তো জানি না, তুমি বলো।
– ও গাইল- আমার সোনার ময়না ফাঁকিÑ
– বাহ্ সুন্দর গান।
– সুন্দর গান? ও যে পাখিকে ফাঁকি বলল সেটা খেয়াল করোনি। আমরা সবাই মিলে খুব হেসেছি আজকে। দিদুন বলেন, হাসবে কেন? কাউকে নিয়ে হাসাহাসি করা ঠিক নয়, ডাব্বু। তুমি ওকে শিখিয়ে দেবে ফাঁকি নয়- শব্দটি হবে পাখি। ভাতরুম বললে হাসবে কেন, বলবে শব্দটি ভাতরুম নয় ওটা হবে বাথরুম- স্নানঘর।
তাইতো- দিদুনের মুখের দিকে তাকিয়ে ও শিখল- কাউকে নিয়ে হাসাহাসি করা ঠিক নয় বরং ওর ভুলগুলোকে ধরিয়ে দিয়ে ঠিক করে দেয়া উচিত।
দিদুনের সাথে খোলাখুলি গল্প করে বলে ও এসব জানল। মা দূরের এক স্কুলের আন্টি। ফিরে এসে পরনের কাপড় চেঞ্জ করে ম্যাক্সি পরেন। ঘরদোর গুছিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। শুধু গল্প হয় খেতে বসে। পাপা ফিরেন সেই বিকেলে। চা খেতে খেতে পাপা খবরের কাগজ পড়েন। সন্ধ্যে হলে টিভিতে খবর শোনেন। যত গল্প তার দাদানের সাথে। তার শরীরও তো সব সময় ভালো থাকে না। দিদুনের সাথে ও তাই সারাক্ষণ জড়িয়ে থাকে।
এখন লুডু খেলা, ক্যারম খেলা সব নিরু দিদুনের সাথে। ডাব্বুর সাথে খেলতে বসে দিদুনও ছোট মেয়ের মতো হয়ে যান।
– অ্যাই অ্যাই ডাব্বু, আমি কিন্তু ছক্কা মেরেছি।
– ইয়ু আর লায়িং দিদুন।
– জিজ্ঞেস কর বিনিকে।
বিনি বলে, নিরুপিসি তো ছক্কাই মেরেছে।
কাঁদে কাঁদো গলায় ডাব্বু বলে, তোমরা দু’জন একজোট হয়ে আমাকে হারাচ্ছো। খেলব না আর তোমার সাথে।
এমন অভিমান আর কারো সাথে করা যায়? মা-পাপার কাছে সে ছোট ছেলে। দাদান আর দিদুনের কাছে ও একজন মানুষ। সরফরাজ দাদানও তাই ভাবেন। তিনি তো প্রায়ই বলেন, আমরা ভাবি ছোটরা কিছুই বোঝে না। ওরা আমাদের চেয়ে আরও বেশি বোঝে। ওদের অনুভব শক্তি বড়দের চেয়ে অনেক বেশি। ইয়ে বাচ্চেলোগ বহুত আচ্ছে সমঝদার হ্যায়।

[চলবে]

SHARE

Leave a Reply