Home সায়েন্স ফিকশন আমার একলা আকাশ । সাবিত সাফওয়ান

আমার একলা আকাশ । সাবিত সাফওয়ান

আমার একলা আকাশ । সাবিত সাফওয়ানচোখ-মুখ কুঁচকে তৃতীয় এবং শেষ বারের মতো কফির কাপে চুমুক দিলাম। কফিতে কম করে হলেও ৫-৬ চামচ চিনি দেয়া। আমি কাপটাকে পাশের টেবিলে রেখে সুইচ টিপে কাজলকে ডাকলাম। তারপর রকিং চেয়ারে হালকা একটা দোল দিয়ে আকাশের দিকে তাকালাম। খালি নীল আকাশ কত দিন ধরে দেখি না। পুরোটা আকাশ জুড়েই আছে হাবিজাবি ড্রোন আর হেলিকপ্টার। গত দশ বছর ধরেই এই অবস্থা। সৃষ্টির আকাশ খুব ভালো লাগত। আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কবিতা আবৃত্তি করত ‘সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে …’। এখন আকাশে চিল তো দূরের কথা কাকও দেখা যায় না। রাতের বেলায়ও সারা আকাশটা আলো করে রাখে। হিল জুতার খট খট আওয়াজ আসছে। নিশ্চয়ই কাজল উঠে আসছে ছাদে। কাজল হাসি মাখা মুখে এগিয়ে এলো। কেউ দেখলে বুঝবেই না কাজল যে একটি রোবট। সর্বশেষ তৈরি আধুনিক বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন রোবট কাজল।
কাজলের নামটা রেখেছিল সৃষ্টি। প্রথম যখন গভর্নমেন্ট থেকে ঘোষণা এল- যে যার রোবটের নাম রাখতে পারবে। তখন সৃষ্টি বিপুল উৎসাহে বাসার সব রোবটের আজব আজব নাম রাখা শুরু করল।
একমাত্র কাজলের নামটাই কিছুটা মানসম্মত। আমাদের বাসার ছাদে যে তিনটা রোবট আলু চাষ করে তাদের নাম রেখেছিল সফু, ইফু আর আজু। ও বলাই হয়নি কয়েক বছর হলো সরকার থেকে নির্দেশ এসেছে প্রতিটা বিল্ডিং আর ছাদে ৩ ভাগের ১ অংশে কিছু না কিছু চাষ করতে হবে।
কাজল এসেই হাসি মুখে জিজ্ঞাসা করল, ‘স্যার আমাকে ডেকেছেন?’
আমি বিরক্ত মুখে বললাম ‘কফি কে বানিয়েছে?’
‘স্যার আমি বানিয়েছি, কেন কোন সমস্যা?’
কফিতে এতো চিনি দিয়েছ কেন? খামাখা অপচয়।
স্যার ডাক্তার বলে দিয়েছে চিনি বেশি খেতে, আর আপনি মনে হয় ভুলে যাচ্ছেন প্লেনেট মারসের অধিকাংশ অংশেই এখন চিনি চাষ করা হচ্ছে।
বেশি পটর পটর করবে না। সামনে থেকে কফি নিয়ে যাও।
আমার ধমক খেয়ে কাজল ফিক করে হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই পাশের টেবিল থেকে কফির মগ নিয়ে চলে গেল। মাঝে মাঝে তাকে একদম মানুষের মত লাগে, ভুলেই যাই যে ও আসলে একটা রোবট। যখন হঠাৎ মনে পড়ে তখন অনেক মন খারাপ হয়। আমার বিল্ডিংটার ঠিক সামনে ৭৫ তলার একটা বিল্ডিং, ঠিক ক’বছর আগের মানুষদের বললেও বিশ্বাস করত না যে এর পুরোটাই ফেলে দেয়া প্লাস্টিক থেকে তৈরি। ইদানীং প্লাস্টিকের বিল্ডিং অনেক জায়গাতেই দেখা যায়। ছোটবেলা একটা বাগধারা পড়েছিলাম, যেখানে ইটের মাঝে মানুষকে পোকার মত উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু সমস্যা হলো লাইনটা কিছুতেই মনে পড়ছে না। এখন অবশ্য স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর ট্যাবলেট পাওয়া যায়। ছোটবেলা থেকে এখন পর্যন্ত অনেক কিছুই নাকি মনে পড়ে যায়। মানুষ চাইলে কী না সম্ভব! সৃষ্টির স্মৃতিশক্তি ছিল তুখোড়। কারো নাম একবার শুনলে বহুদিন পর্যন্ত মনে থাকত তার। আজ শুধুই সৃষ্টির কথা মনে পড়ছে। আবারো মন খারাপ হয়ে গেল।
আমি আরেকবার আকাশের দিকে তাকালাম। আকাশেও এখন যানযট লাগে। আকাশে ডিভাইডারও আছে। এখনকার ডিভাইডারে আর লাল, সবুজ, হলুদ বাতি জ্বলে না। জ্বলে নীল, সাদা আর বেগুনি রঙের। আগেকার লোকেরা হাঁ করে তাকিয়ে আকাশের পাখি দেখতো। এখন দু-চারটা পাখি হাঁ করে তাকিয়ে আকাশের যানজট দেখে। মানুষ চাইলে কী না সম্ভব!
হঠাৎ আকাশে মেঘ দেখা গেল। টিপ টিপ করে বৃষ্টি শুরু হলো। ঠিক তখনই একটা ছাতা উড়ে আমার মাথার ওপর এলো। এটা নতুন প্রযুক্তি। বৃষ্টি হলেই হেলিকপ্টার থেকে ইলেকট্রিক ছাতা ফেলা হয়। সেই ছাতাগুলো ঘরের বাইরে বা ছাদে থাকা মানুষের মাথার ওপর চলে আসে। আবার বৃষ্টি শেষ হতেই ছাতা উড়ে চলে যায়। আচ্ছা তাদের ছাতা কি শেষ হয় না? এসব ছাতাওয়ালার কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞেস করতে হবে। মানুষ চাইলে কত কিছুই না সম্ভব!
সৃষ্টির সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল ২০২২ সালের জুলাইয়ের ২৮ তারিখ। সেদিনও এরকম টিপ টিপ বৃষ্টি হচ্ছিল।
খুব নাটকীয়ভাবে আমাদের দেখা হয়েছিল। সেদিন হল কি….। নাহ সুন্দর সুন্দর ঘটনাগুলো মন খারাপের সময় বলা ঠিক না। যেদিন মন ভালো থাকবে সেদিন বলা যেতে পারে। আজ আমার মন খারাপ। খুব খারাপ। কিসের জন্য মন খারাপ? আকাশের জন্য? নাকি পাখিদের জন্য? হতে পারে সৃষ্টির জন্যও। মানুষ চাইলে অনেক কিছু সম্ভব। কিন্তু বেশির ভাগ জিনিসই অসম্ভব। যেমন আমার মন ভালো করা। আরও হতে পারে সৃষ্টিকে ফিরিয়ে আনা। আমার বুকের বেশ ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস এসে বুক কাঁপিয়ে বের হয়ে গেল। বৃষ্টি থেমেছে, ছাতা উড়ে গেছে। রকিং চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালাম। পা বাড়ালাম সিঁড়ির দিকে। হঠাৎ থমকে দাঁড়ালাম। বাগধারাটি মনে পড়েছে ‘ইটের পর ইট, মাঝে মানুষ কীট’।

SHARE

Leave a Reply