Home গল্প রকেট । হাজ্জাজ মিন সাগর

রকেট । হাজ্জাজ মিন সাগর

রকেট । হাজ্জাজ মিন সাগররকেট। বয়স হবে তেরো কিংবা চৌদ্দ। নয় ফর্সা নয় কালা, তবুও তার মুখে একটা মায়াবী ছাপ রয়েছে। মাথার চুলগুলো কোঁকড়ানো। কানগুলো খাড়া খাড়া। একেবারে ঠিক খরগোশের মতো। চোখগুলো ডাগর ডাগর। চার বছর বয়সে তার মা মারা যায়। মা মারা যাবার পর সে বাবার ঘরেই বড় হতে থাকে। মায়ের ভালোবাসা সে পায়নি বললেই চলে। অত্যন্ত চঞ্চল ছেলে। এমন চঞ্চল ছেলে এলাকায় আর একটা পাওয়া দুষ্কর। এলাকাতে যদি দুষ্টু ছেলেদের একটা তালিকা করা হয় তাহলে তার নামটা সবার ওপরেই স্থান পাবে। এমন কোনো দুষ্টুমি নেই, যা সে করে না। একদিন রউফ চাচার খড়ের স্তূপে আগুন ধরিয়ে দিয়ে গ্রাম থেকে উধাও হয়। এ নিয়ে বিচারও বসে। এবার ধরে প্রায় তেরো বার তার জন্য বিচার বসে সেই গ্রামে। সন্ধ্যার পর গ্রামের মাতবর সাহেবরা রকেটের বাড়িতে আসে। বাবা অনেক ভয় পায়। কী হতে যে কী হয়। লজ্জায় মুখ লুকিয়ে অসাড় হয়ে বসে থাকে। কোনো কথা বলাতে সাহস হয় না। কিন্তু রকেটের তেমন কোনো ভয় ভীতি নেই। কারণ এর আগেও বারো বার তাকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিলো। ও কিছুই মনে করে না। গ্রামের মাতবরেরা সিদ্ধান্ত নেয় এবার তাদেরকে গ্রাম থেকে বের করে দিবে। রকেটের জ্বালাতন আর কেউ সহ্য করতে চায় না। কিন্তু মা-মরা ছেলে বলে এবারের যাত্রায় বেঁচে যায়। কিন্তু বাবাকে অনেক কথা শুনতে হয়।
সেই রাগে সেদিন রাতে রকেটকে অনেক মারধর করে তার বাবা। রফিক চাচা এগিয়ে এসে বলে একটু কম মার খায় ও। সে যতবার মার খায় ততবারই রফিক চাচা এগিয়ে আসে। রফিক চাচা রকেটকে মায়ের মত আদর করে। কিন্তু মায়ের ভালোবাসা কি আর পাওয়া যায়। রাতে রকেটকে মারার পর রকেটের বাবা অনেক কষ্ট পায়। কিন্তু কী করার! মানুষের কথা তো বুলেটের মত এসে বুকে আঘাত হানে। গ্রামের সুপারিগাছে সুপারি থাকতো না। লিচুর মৌসুম, আমের মৌসুম এসব মৌসুমে চলতো তার নানা রকমের অপারেশন। শুধু কি এসব! কোন বৃদ্ধলোক রাস্তা দিয়ে হাঁটলে বৃদ্ধকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিত আর সাথে সাথে কোথায় লুকাতো ধরার উপায় নেই। কেউ আবার পাতিলে করে দুধ নিয়ে হাঁটলে তাকে কোনো না কোনোভাবে অপদস্থ করবেই, দুধ ফেলে দিবেই। দিনের আলোতে যারা তাকে গালি দিতো রাতের আঁধারে তাদের বিরুদ্ধে চলতো অভিযান। বাড়িতে ঢেল ছুড়তো, আবার গোবর ছুড়তো। তার বন্ধু ছিলো অনেক কম। কোনো বাবাই চাইতো না তার ছেলে রকেটের সাথে মিশুক।
একবার কোথা থেকে যেন এক হুজুর আসেন তাদের গ্রামে। তিনি গ্রামের মানুষকে ইসলামের পথে দাওয়াত দিতে থাকেন। গ্রামের মানুষও সাড়া দেয়। মসজিদে ইসলামের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করে আর গ্রামবাসী মনোযোগ দিয়ে শোনে। কিন্তু রকেট তার ধারে কাছেও যেতো না। তার দুষ্টুমি চলতেই থাকে। একদিন বিকেলে হুজুর মাঠের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে ছিলেন। হুজুরের চোখে পড়ে একটা ছেলে ছাগল দিয়ে ধান খাওয়াচ্ছে। তাই তিনি একটু এগিয়ে গিয়ে তাকে নিষেধ করেন এবং মসজিদে ডাকেন। রকেট তার কথায় কান দেয় না। হুজুর চলে যান সেখান থেকে। রকেট জানে এখন সবাই মসজিদে যায়, একটা নাকি হুজুর এসেছেন। তিনি অনেক ভালো বয়ান করেন। রকেটকে গ্রামের অনেকেই মসজিদে যাওয়ার জন্য ডাকে কিন্তু কোনো দিন তার মনে মসজিদে যাওয়ার কথা মনে হয় না।
এতো দিনে মসজিদের হুজুর রকেটের ব্যাপারে সব জেনে গেছেন। তাই তিনি নিজ উদ্যোগে রকেটকে ভালো করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি যখন রকেটের কাছে গিয়ে ইসলামের নানা দিক তুলে ধরতেন, তার দুষ্টুমির খারাপ দিক তুলে ধরতেন তখন রকেট অনেক রাগ করতো। এভাবে চলতে থাকে দিন।
কিন্তু হঠাৎ সেই হুজুর গ্রাম থেকে চলে যান। রকেট ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ে। তার মায়ের কথা মনে হয়। অপকর্মের কথা মনে হয়। সে হুজুরকে অনেক খোঁজে কিন্তু কোথাও হুজুরের দেখা মিলে না। কারণ সে হুজুরের হাত ধরে ভালো হতে চায়। একদিন ভোরে তার অবস্থা অনেক আশঙ্কাজনক। বিছানায় অসাড় হয়ে পড়ে থাকে। দুচোখ বেয়ে জল পড়তে থাকে। রহিম চাচা পাশে বসে পা ছড়িয়ে কাঁদতে থাকেন।

SHARE

Leave a Reply