Home দেশ-মহাদেশ আল-শাম থেকে সিরিয়া । মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

আল-শাম থেকে সিরিয়া । মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

আল-শাম থেকে সিরিয়া
দামেস্কের জুপিটার টেম্পল

সিরিয়াকে আরবি ভাষায় বলা হয় আস্সুরিয়্যা। সিরিয়া পশ্চিম এশিয়ার মধ্যপ্রাচ্যের একটি রাষ্ট্র। এর সরকারি নাম আরব প্রজাতন্ত্রী সিরিয়া বা আল্জুম্হুরিয়্যা আল্আরাবিয়্যা আস্সুরিয়্যা। রাজধানী দামেস্ক। ইংরেজিতে সিরিয়া নামটির সমর্থক নাম ছিলো এক সময় লেভান্ট, আরবিতে যাকে বলা হতো আল-শাম। বর্তমান সিরিয়া ভূমিতে অতীতে বেশ কয়েকটি রাজ্য ও সাম্রাজ্য ছিল। আলেপ্পো ও দামেস্ক বিশ্বের এমন দু’ট শহর যেখানে বহু প্রাচীন কাল থেকে মানববসতি চলে আসছে। ইসলামিক যুগে দামেস্ক ছিল উমাইয়া খেলাফতের প্রাণকেন্দ্র এবং মিসরের মামলুক সালতানাতের প্রাদেশিক রাজধানী। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি আধুনিক সিরিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
এ দেশের আয়তন ১ লাখ ৮৫ হাজার ১৮০ বর্গকিলোমিটার (৭১ হাজার ৫০০ বর্গমাইল)। জনসংখ্যা ১ কোট ৮২ লাখ ৮৪ হাজার ৪০৭ জন।

সিরিয়ায় বিভিন্ন জাতিগত এবং ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে সিরিয়ান আরব, গ্রিক, আর্মেনিয়ান, আসিরিয়ান, কুর্দি, কার্কাসিয়ান, মানডিয়ান্স এবং তুর্কি। ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রয়েছে মুসলিম (৮৭%), খ্রিস্টান (১০%) এবং অন্যান্য (৩%)। এদের মধ্যে আবার রয়েছে আলাউই, দ্রুজ, ইসমাইল, মান্দিয়া, শিয়া, সালাফি, ইয়াসিদ ও ইহুদিরা। সিরিয়ায় সুন্নি মুসলিমরা বৃহত্তম ধর্মীয় গ্রুপ (৭৪%)।
আরবি সিরিয়ার সরকারি ভাষা। এখানকার প্রায় চার-পঞ্চমাংশ লোক আরবি ভাষায় কথা বলে। সিরিয়ায় প্রচলিত অন্যান্য ভাষার মধ্যে আদিজে, আরামীয়, আর্মেনীয়, আজারবাইজানি, দোমারি (রোমানি ভাষা), কুর্দি এবং সিরীয় ভাষা উল্লেখযোগ্য। আন্তর্জাতিক কাজকর্মে ফরাসি ভাষা ব্যবহার করা হয়।

আল-শাম থেকে সিরিয়া
উপকূলীয় শহর লাতাকিয়া থেকে ভূমধ্যসাগরের দৃশ্য

সিরিয়া বহুলাংশে উসর মালভূমির দেশ। তবে এ দেশে কিছু উর্বর সমভূমি, উঁচু পর্বত ও মরুভূমি রয়েছে। দেশটির ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী উত্তর-পশ্চিম অংশে চমৎকার সবুজ অঞ্চল রয়েছে। দেশটির উত্তর-পূর্ব এলাকা আল-জাজিরা এবং দক্ষিণ অঞ্চল হাওয়ান গুরুত্বপূর্ণ কৃষি এলাকা। সিরিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদী ফোরাত দেশটির পূর্ব অংশের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে। যে ১৫টি দেশ নিয়ে ‘সভ্যতার দোলনা’ গঠিত সিরিয়া সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ দেশের ভূমি আবব প্লেটের উত্তর-পশ্চিমে ছড়িয়ে রয়েছে। সিরিয়ার আবহাওয়া শুষ্ক ও গরম এবং শীতকালে মৃদু ঠাণ্ডা পড়ে। শীতকালে দেশটির উঁচু স্থানে মাঝে মধ্যে বরফ পড়ে। দেশের উত্তর-পশ্চিমে ১৯৫৬ সালে বাণিজ্যিক পরিমাণে পেট্রোলিয়াম আবিষ্কৃত হয়। গুরুত্বপূর্ণ তেলক্ষেত্রগুলো সুয়াইদিয়াহ, কারাতসুই, রুমাইয়ান এবং দায়ির আজ-জাওরের কাছে তাইয়েমে অবস্থিত। এই তেলক্ষেত্রগুলো মূলত ইরাকের মসুল ও কিরকুক তেলক্ষেত্রের প্রাকৃতিক সম্প্রসারণ। পেট্রোলিয়াম সিরিয়ার শীর্ষস্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদ এবং ১৯৭৪ সালের পর প্রধান রফতানি পণ্য। ১৯৪০ সালে এ দেশের জবেজা ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক গ্যাস আবিষ্কৃত হয়েছে। সিরিয়ার মুদ্রার নাম সিরীয় পাউন্ড।

আল-শাম থেকে সিরিয়া
সিরিয়ার জনপ্রিয় খাবার ফাত্তুশ

সিরিয়ার রাজনীতি একটি সংসদীয় প্রজাতন্ত্রের কাঠামোয় পরিচালিত হয়। রাষ্ট্রের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতি এবং বাথ পার্টির হাতে ন্যস্ত। সিরিয়া সাংবিধানিকভাবে একটি সংসদীয় প্রজাতন্ত্র হলেও ১৯৬৩ সাল থেকে দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি রয়েছে এবং বর্তমানে সরকার পরিবর্তনের কোনো ক্ষমতা নেই জনগণের। দেশটি তাই কার্যত একটি একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র। সিরিয়ার সরকার ইসরাইলের সাথে ক্রমাগত যুদ্ধকে জরুরি অবস্থার মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করে থাকে। সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ এবং প্রধানমন্ত্রী ইমাদ মুহাম্মদ খামিস। এ দেশে ২৫০ আসনের একটি পার্লামেন্ট রয়েছে। সিরিয়ার পরলোকগত প্রেসিডেন্ট হাফিজ আল-আসাদ পাঁচ বার গণভোটে বিজয়ের মাধ্যমে নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখেন। তার ছেলে ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদও ২০০০ সালের এক গণভোটে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট পদে বহাল হন। প্রেসিডেন্ট ও তার মূল সহযোগীরাই, বিশেষত সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর লোকেরা সিরিয়ার রাজনীতি ও অর্থনীতির মূল সিদ্ধান্তগুলি নিয়ে থাকেন। সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বাহিনী ও বিদ্রোহীদের মধ্যে প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ। এই সংখ্যা জাতিসঙ্ঘ ঘোষিত সংখ্যার দ্বিগুণ। এর বাইরে বাস্তুচ্যুত হয়েছে ৪৫ শতাংশ সিরীয়। সিরিয়া যুদ্ধে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সিরিয়ান সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের’ (এসসিপিআর) একটি প্রতিবেদনে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধের বিভীষিকায় পড়ে সিরিয়ার জাতীয় সম্পদ ও অবকাঠামো প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। নিহত হয়েছে ৪ লাখ ৭০ হাজার লোক। দেড় বছর আগে পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে এ ব্যাপারে জাতিসংঘ যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছিল এটি তার প্রায় দ্বিগুণ। জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ সংখ্যা আড়াই লাখ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাকুল্যে সিরিয়ার জনগণের সাড়ে ১১ শতাংশই নিহত বা আহত হয়েছে। ‘আরব বসন্ত’ নামে পরিচিত স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের জোয়ার সিরিয়াতেও এসে লাগে ২০১১ সালে। ওই বছরের মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় পাঁচ বছরে এই জোয়ারের সুফল না মিললেও এই সময়ে হতাহত হয়েছে বিরাট সংখ্যক জনগোষ্ঠী। প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট করে আহত ব্যক্তির সংখ্যা বলা হয়েছে ১৯ লাখ। যুদ্ধ শুরুর আগে ২০১০ সালে সিরিয়ার মানুষের গড় আয়ু যেখানে ছিল ৭০ বছর, সেটাই ২০১৫ সালে নেমে দাঁড়ায় ৫৫ বছর ৪ মাসে। দেশটির অর্থনীতির সার্বিক ক্ষতির পরিমাণও নিতান্ত কম নয়, আনুমানিক ২৫ হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার।আল-শাম থেকে সিরিয়া এসসিপিআরের মতে, নিহত ৪ লাখ ৭০ হাজার লোকের মধ্যে প্রায় ৪ লাখই মারা গেছে যুদ্ধের প্রত্যক্ষ সহিংসতার শিকার হয়ে। বাকি ৭০ হাজার মারা গেছে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধের ঘাটতিতে, সংক্রামক ব্যাধিতে, খাবার ও পানির অভাবে।
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ ২০১০ সালে শুরু হওয়া আরব বসন্তের বিপ্লবের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়। সিরিয়ান সেনার একটি কঠোর ব্যবস্থার দ্বারা অনুসৃত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের একটি চেইন হিসেবে ২০১১ সালে শুরু হয়। জুলাই ২০১১ সালে সেনাবাহিনীর দলত্যাগীরা ফ্রি সিরিয়ান সেনা গঠনের ঘোষণা করেন এবং যুদ্ধ ইউনিট গঠন শুরু হয়। এই বিরোধিতা সুন্নি মুসলমানদের দ্বারা প্রভাবিত হয়, যেখানে নেতৃস্থানীয়রা আলাউয়ি। গ্লোবাল পিস ইনডেক্স ২০১৬-তে বিশ্বের সবচেয়ে অশান্ত দেশ সিরিয়া। সে কারণে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বেশ উদ্বেগজনক।

আল-শাম থেকে সিরিয়া
ইসরাইলের দখলে সিরিয়ার গোলান মালভূমি

সিরিয়ার প্রশাসনিক অঞ্চলসমূহ ১৪টি গভর্নরেটে বিভক্ত, গভর্নরেটগুলো ৬১টি জেলায় এবং জেলাগুলো উপজেলায় বিভক্ত। গভর্নরেটগুলো হলো লাতাকিয়া, ইদলিব, আলেপ্পো, রাকা, আল-হাসাকাহ, তারতুস, হামা, দিয়ের এজ জোর, হোমস, দামেস্ক, রিফ দিমাস্ক, কুনেইত্রা, দারা ও আলসুইয়েইদা।
সিরিয়া ভূমধ্যসাগরের পূর্ব দিকে আরব উপদ্বীপের উত্তরে দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায় অবস্থিত। সিরিয়ার সীমান্তে রয়েছে উত্তরে তুরস্ক, পশ্চিম ও দক্ষিণপশ্চিমে লেবানন এবং ইসরাইল, পূর্বে ইরাক এবং দক্ষিণে জর্দান। এটি পশ্চিমে পর্বতশ্রেণী এবং অন্তর্দেশীয় অঞ্চলে অবস্থিত।
এ ছাড়া পূর্বের সিরিয়ান মরুভূমি এবং দক্ষিণে জবাল আল-ডুরজ রেঞ্জ। সাবেক ইউফ্রেটিস উপত্যকা দিয়ে বিভক্ত দেশটি। ১৯৭৩ সালে নির্মিত একটি বাঁধের সাহায্যে সিরিয়ার বৃহত্তম হ্রদ লেক আসাদ নামক একটি জলাধার নির্মাণ করে। সিরিয়ায় সর্বোচ্চ স্থান লেবাননের সীমান্তে হর্মোন পর্বত (২,৮১৪ মি., ৯ ২২২ ফুট)। সিরিয়ার কৃষিভূমি ৭৫.৮ শতাংশ, আবাদযোগ্য ২৫.৪ শতাংশ, স্থায়ী ফসল আছে ৫.৮ শতাংশ ভূমিতে, চারণভূমি ৪৪.৬ শতাংশ এবং বন ও বনভূমি আছে শুধুমাত্র ৩ শতাংশ ভূমিতে।

আল-শাম থেকে সিরিয়া
আলেপ্পোর উমাইয়া আমলের একটি মসজিদ

সিরিয়ায় সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হলো ফুটবল, বাস্কেটবল, সুইমিং ও টেনিস। পঞ্চম ও সপ্তম প্যান আরব গেম্স দামেস্কে অনুষ্ঠিত হয়। দামেস্ক, আলেপ্পো, হোমস, লাতাকিয়া ইত্যাদি বিভিন্ন স্থানে বহু জনপ্রিয় ফুটবল টিম রয়েছে। সিরিয়ার জাতীয় ফুটবল দলের নিজস্ব স্থান হলো দামেস্ক। এই দল এশিয়া কাপ প্রতিযোগিতায় যোগ্যতা অর্জন করে কিছুটা সাফল্য দেখিয়েছে। এই দল ১৯৪৯ সালের ২০ নভেম্বর প্রথম আন্তর্জাতিক খেলায় নেমে তুরস্কের কাছে ৭-০ গোলে হেরে যায়।
২০১৮ সালের ফিফা র‌্যাংকিংয়ে সিরীয় দলের অবস্থান ছিলো ৭৬তম।
অঞ্চলভেদে সিরিয়ায় বেশ কয়েকটি খাবারের উদ্ভব ঘটেছে। সিরীয় খাবার সমৃদ্ধ এবং উপাদানে বৈচিত্র্যময়। সিরীয় খাবার বহুলাংশে দক্ষিণ ভূমধ্যসাগরীয়, গ্রিক ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশীয় খাবারের সমন্বয়ে গঠিত। কিছু সিরীয় খাবারের উদ্ভব ঘটেছে তুর্কি ও ফরাসি রন্ধন প্রণালী থেকে। যেমন- শিশ কাবাব, ইয়াবরা। এ ছাড়া সিরীয় রন্ধন প্রণালীর প্রধান খাবার হলো কিব্বেহ, হুম্মুস, তাবাওলেহ, ফাত্তুশ, লাবনেহ, শর্মা, মুজাদারা, শাংকলিশ, পাসতুরমা, সুজুক ও বাকলাভা। সবজি, গোশত, আঙ্গুর, মধু, মসলা ইত্যাদি দিয়ে এসব খাবার তৈরি করা হয়। আরবি বা তুর্কি কফি সিরীয়দের জনপ্রিয় পানীয়।

SHARE

Leave a Reply