Home গল্প শহুরে এক ছাগলছানা । এ কে আজাদ

শহুরে এক ছাগলছানা । এ কে আজাদ

শহুরে এক ছাগলছানাছাগলের বাচ্চাটা কেবল ব্যা ব্যা করেই চলেছে। লোহার গ্রিলের ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ওটা। সামনেই একটা বড় ছাগল ঘুরাঘুরি করছে। বাচ্চাটা ঐ ছাগলের কি না তা কে জানে? হয়তো তাই হবে।
– ছাগলগুলো ওখানে কী করছে? – বাবাকে জিজ্ঞেস করল আলকারীব।
– ওরা হয়তো খাবার টাবার খুঁজছে। আমরা বাজারে যাচ্ছি, চলো যাই। ওসব দেখে আমাদের কাজ নেই কাটখোট্টাভাবে জবাব দিলেন বাবা।
আলকারীব চাচ্ছিলো- ওখানে একটু দাঁড়াবে। ছাগলগুলোকে দেখবে। ওরা কী করে? কোথায় থাকে? কী খায়? জানার আছে অনেক কিছু? কিন্তু কী করে? শহরে বেশি একটা ছাগল গরু দেখা যায় না। যা আছে তা ঐ শহরতলিতে। আশপাশে দু’একটা গরুর খামার যা আছে তাও আবার দেখতে যাবার সময় নেই। ছাগলের খামার নেই। তাই ছাগল বিষয়ে আলকারীবের কৌতূহল একটু বেশি। এই বার যেহেতু হাতের কাছে পাওয়া গেছে, সুতরাং কিছু জানা যাবে। কিন্তু বাবাটা যে কি! খালি বাজার আর হাবিজাবি কাজ নিয়েই ব্যস্ত। কিছু দেখতেই দিলেন না। হর হর করে টেনে নিয়ে গেলেন আলকারীবকে।
ছোট মানুষ। ছোট্ট হৃদয়। সেই হৃদয়ে কোণে হাজারও প্রশ্ন উঁকি দিতে লাগল। গেটের ওখানে তো ঘাস লতাপাতা কিছু নেই। তাহলে বাবা যে বললেন- ওরা খাবার টাবার খুঁজছে। কী খাবার খুঁজছে ওরা? খাবার যদি নাই থাকে তাহলে গ্রিলের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছে কেন ছাগল দুটো? আর ক্ষুধা যদি লেগেই থাকে তাহলে সামনেই তো একটা আমগাছ আছে, ওখানে কিছু পাতাও পড়ে আছে, ওখানে গেলেই তো কিছু খাবার খেতে পারে। তাহলে ওখানে ঐ খট্খটে জায়গায়, ইট পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে কেন? শিশু মনের এত সব প্রশ্নের উত্তর কোথায়? আর বাবাটাও যে কেমন? চলছে তো চলছেই। কোন প্রশ্ন করার জো নেই।
যা হোক, বাজার শেষে বাসায় ফেরার সময় আলকারীব দেখলো সেই ছাগলের বাচ্চাটা রাস্তার পাশে সেই লোহার গ্রিলের সাথেই দাঁড়িয়ে আছে। ব্যা ব্যা করছে। আরেকটা বড় ছাগল তার গা শুঁকছে। বাবা তো হন হন করে ছুটছে সুকুমার রায়ের সেই ছড়ার মতন – চলে হন্ হন্, ছোটে পন্ পন্। আলকারীব খপ করে ধরে ফেললো বাবার হাত-
ও বাবা! বাবা! ওরা তো ওখানেই দাঁড়িয়ে আছে। ওরা অন্য কোথাও যাচ্ছে না কেন?
বাবা ধমক দিলেন – ধুত্তুরি ছাই! চলো তো বাবা আমরা যাই।
– আচ্ছা বাবা! বড় ছাগলটা ঐ বাচ্চাটার গা শুঁকছে কেন? – আবার প্রশ্ন কর আলকারীব।
– ওটা যে ওর মা, তাই ওকে আদর করছে।
– তাহলে ওর মা ওকে নিয়ে যাচ্ছে না কেন? ঐ দিকে তো ঘাস আছে, পাতা আছে, আরও কত কি! ওগুলো খাওয়ালেই তো পারে?
বাবা কিছুটা বিরক্ত হলেন- চলো তো বাপু! ওসব গবেষণা করে তোমার কাজ
নেই। ওরা ছাগল, ওদের কাজ ওরা করুক। আমাদের অনেক কাজ আছে, চলো।
কিন্তু আলকারীব নাছোড়বান্দা। হাঁটতে হাঁটতে আবার বাবাকে পেঁচিয়ে ধরে- ওরা ছাগল হলেও ওরা তো আমাদের অনেক কাজে আসে। ছাগল না থাকলে যখন দাদু আসবে তখন ছাগলের গোস্ত কোথায় পাবে? দাদু তো গরুর গোস্ত খান না। তা ছাড়া ছাগল অনেক শান্ত প্রাণী। কুকুর খারাপ। কিন্তু ছাগল তো ভালো। তাহলে ওদের দিকে খেয়াল করছ না কেন?
এইবার বাবা রাস্তার পাশে দাঁড়ান। আলকারীবের দিকে বিস্ময়ে তাকান। ছেলে তো ঠিকই বলছে। পশুপাখি তো আমাদের অনেক উপকারে আসে। তাই তো! ওদের প্রতি তো আমাদের খেয়াল রাখা উচিত। এবার ছেলের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলেন-
আচ্ছা বাবা! আমরা আগে বাসায় যাই চলো। তারপর ওদের বিষয় নিয়ে ভাব যাবে। তোমার যত প্রশ্ন আছে, সব প্রশ্নের উত্তর আমি দেবো। বাসায় চলো। আলকারীব মাথা নেড়ে সায় দেয়।
– ঠিক আছে, চলো। কিন্তু বাসায় গেলে তুমি তো ভুলে যাবে। ঐসব পেপার- টেপার নিয়ে বসে পড়বে।
বাবা মুচকি হাসেন। ছেলেকে নিয়ে বাসায় রওয়ানা দেন। আলকারীব কিছুক্ষণ চুপ থাকে। বাবার পিছু পিছু হাঁটতে থাকে। বাড়ির পাশেই বকশিবাজার। বাসা থেকে তিন-চার মিনিটের পথ। তাই আলকারীব হেঁটেই ওর বাবার সাথে বাজারে গিয়েছিল। শুক্রবার এলেই বাবার সাথে সে বাজারে যায়। বাজার শেষে বাসায় ফিরে গোসল করে। মসজিদে যায়, নামাজ পড়ে। নামাজ শেষে বাসায় আসে। সবার সাথে মজা করে দুপুরের খাবার খায়। মায়ের হাতে রান্না করা ফ্রাইডে স্পেশাল পোলাও। খুব মজা হয়। তাই তো সারা সপ্তাহ ধরে এই শুক্রবারের জন্য অপেক্ষা করে আলকারীব আর তার বোন মণি। আলকারীব নার্সারি ওয়ানে পড়ে, আর মণি পড়ে ক্লাস ফোরে। দুপুরের খাবার শেষে একটু ঘুমিয়ে নেয় ভাইবোন মিলে বাবার সাথে। পড়ন্ত বিকেলে বাবা বের হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেন। আলকারীবও বাবার সাথে যাবার জন্য বায়না ধরে। বাবা নিতে চান না সাথে। কিন্তু আলকারীব নাছোড়বান্দা। অবশেষে ওকে নিয়েই বের হন বাবা। মোটরসাইকেলে বাবা ছেলে। রাস্তার পাশে খোরশেদ উকিল সাহেবের বাসার কাছে যেতে না যেতেই চিৎকার দিয়ে ওঠে আলকারীব।
– বাবা! বাবা! ঐ তো ছাগলের বাচ্চাটা! ও তো গেটের সাথেই দাঁড়িয়ে আছে। ও সারা দিন ধরে এখানেই আছে !
– এখন সময় নেই আব্বু! পরে আমরা ছাগল দেখব!
– ছেলের কথায় যেন গুরুত্বই দিলেন না বাবা।
ভোঁ ভোঁ করে পার হয়ে গেল ওরা। আলকারীবের ছোট্ট মনের উঠোন জুড়ে তখন উৎকণ্ঠা! কী হয়েছে বাচ্চাটার? মিটিং শেষে সন্ধ্যার দিকে বাড়ি ফিরছে বাবা ও ছেলে। সেই খোরশেদ উকিলের বাড়ির কাছে আসতেই আবারও চিৎকার দিয়ে উঠলো আলকারীব।
– বাবা, বাবা! ঐ তো ছাগলের বাচ্চাটা ওখানেই আছে। ব্যা ব্যা করছে। ও মনে হয় কাঁদছে।
মোটরসাইকেল থামালেন বাবা। সত্যিই তো! সকাল থেকেই এই ছাগলের বাচ্চাটা লোহার গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছে কেন? আর অনবরত ব্যা ব্যা করছেই বা কেন? কী সমস্যা হয়েছে ছাগলের বাচ্চাটার? উৎসুক হয়ে বাবার সাথে আলকারীবও গেল ছাগলের বাচ্চাটার কাছে। ওর কাছাকাছি যেতেই আরো জোরে ব্যা ব্যা করতে লাগল ছাগলের বাচ্চাটা। কিন্তু মাথাটা নাড়াতে পারছে না। হঠাৎ আলকারীব চিৎকার দিয়ে বলল- বাবা, গ্রিলের ফাঁকের মধ্যে ওর মাথাটা আটকে আছে।
– আরে! তাই তো! ব্যাপারটা কী? তারপর ভালো করে বাবা ও ছেলে মিলে চেষ্টা করল ছাগলের বাচ্চাটার মাথা বের করার জন্য। বেশ বেকায়দাভাবে বাচ্চাটার মাথা আটকে গেছে। তারপর বেশ কসরত করে ছাগলের বাচ্চাটার মাথা বের করা গেল। বের করার সাথে সাথেই ছাগলের বাচ্চাটা মাথা নাড়তে লাগলো। মনে হলো দীর্ঘক্ষণ ধরে মাথা আটকে থাকায় বেশ কষ্ট পেয়েছে। ব্যা ব্যা করতে করতে আর মাথা নাড়তে ছাগলের বাচ্চাটা রাস্তা দিয়ে চলে গেল। বেচারা বেঁচে গেল!
আলকারীব বলল- দেখেছো বাবা, আমি বলেছিলাম না ও একটা সমস্যায় এখানে আটকে গিয়েছিলো। তুমি তো কোনো কথাই শুনলে না। সেই সকাল থেকেই বাচ্চাটা কষ্ট পাচ্ছিল, আর তুমি গুরুত্বই দিলে না। তোমার জন্যই সারা দিন কষ্ট পেল ছাগলের বাচ্চাটা!
ছেলের কথায় আলকারীবের বাবা লজ্জা পেলেন- তাই তো! অনুশোচনা হলো তার- আহারে! ছেলের কথা যদি সকাল বেলা শুনতাম তাহলে ছাগলের বাচ্চাটার কষ্ট কম হতো। সে সারাদিন না খেয়েও থাকত না।
আলকারীব বলল- বাচ্চাটা সারাদিন না খেয়েছিল। ওর খুব কষ্ট হয়েছে তাই না আব্বু?
বাবা মাথা নেড়ে সায় দিলেন ছেলের কথায়। এবার বাবা ছেলে মিলে গবেষণায় লেগে গেল কিভাবে ছাগলের বাচ্চাটা আটকে গিয়েছিল। গ্রিলের গেটের ওপারে সামান্য কিছু ঘাস জন্মেছিল, একটি ক্ষুধার্ত ছাগল ও তার বাচ্চা ঘাস খাওয়ার আশায় গ্রিলের ফাঁকের মধ্যে মুখ ঢুকিয়েছিল। তখন বাচ্চাটির মাথা গ্রিলের মধ্যে আটকে গিয়েছিল। লোহার গ্রিলের ফাঁকাগুলো এমন ছিল যে উপরের অংশটা একটু বেশি ফাঁকা হলেও নিচের দিকে একটু বেশি চাপা। ক্ষুধার্ত ছাগলের বাচ্চাটা পা একটু উঁচু করে গ্রিলের ফাঁকে মুখ ঢুকিয়েছিল ক্ষুধার্ত পেটে একমুঠো ঘাস দেবে বলে। কিন্তু বিধি বাম, যেই মুখটা একটু নিচু করেছে, ওমনি গ্রিলের ফাঁকের মধ্যে মাথাটা আটকে গেছে। পা দুটোও তখন মাটিতে, ফলে বাচ্চাটা আর মাথা বের করার মতো বুদ্ধি এবং শক্তি কোনটাই পায়নি। আর প্রাণী হিসেবেও ছাগলের বুদ্ধি কম, তার ওপর আবার বেকায়দা জায়গা । আলকারীব প্রশ্ন করে- আচ্ছা বাবা, তুমি তো ছোট বেলায় ছাগল চরাতে, তাই না? তোমাদের তো অনেক ছাগল ছিল।
বাবা উত্তর দিলেন- হ্যাঁ বাবা, আমাদের ৩২টি ছাগল ছিল। আমি ঐ ছাগলগুলোকে নিয়ে মাঠে যেতাম, ঘাস খাওয়াতাম, দেখাশুনা করতাম। আর ছোট ছোট বাচ্চাগুলোকে খুব আদর করতাম। আমি যখন ওদের আদর করতাম তখন ওরা খুব আনন্দিত হতো। ওরা খুশি হয়ে নাচানাচি করত। বাচ্চাদের আনন্দিত মুখ যদি তুমি দেখতে তাহলে খুব মজা পেতে।
– তাহলে তুমি এই ছাগলের বাচ্চাটার কষ্ বুঝতে পারলে না কেন? পাল্টা প্রশ্ন করে আলকারীব।
লজ্জা পেল বাবা। বাবা কোনো উত্তর দেন না। মনে মনে ভাবেন – এই শহরের ব্যস্ত জীবনে মানুষের বাচ্চার খোঁজ-খবরই তো রাখতে পারি না, আর ছাগলের বাচ্চার খবর রাখবো কিভাবে? গ্রামের মানুষেরা কতো আন্তরিক! প্রতিবেশী প্রত্যেক বাড়িরই খবর রাখে তারা। একে অন্যের বিপদে ছুটে আসে। এক গ্রামের মানুষ আশপাশের আরও দু’চার গ্রামের মানুষদের চেনে। খোঁজখবর রাখে। আর শহরের মানুষ একই বিল্ডিংয়ের অন্য ফ্ল্যাটের লোকদেরকে চেনে না, একে অপরের সাথে পরিচিত হয় না, কথা হয় না, হয় না কোন আন্তরিকতা। একজনের ঘরে দিনের আলো ঝলোমল, পাশের বাড়ির লোকের ঘরে অন্ধকার। সে অন্ধকার এতই সীমাহীন যে, কেউ সে অন্ধকারের কোন খবরও রাখে না। আর একটা ছাগল কোথায় আটকা পড়ল, কি মারা গেল তা দেখার মতো ফুরসত কোথায়?
বাবার চিন্তায় ছেদ পড়ে ছেলের প্রশ্নে- বাবা এই ছাগলদের কি মালিক নেই? ওরা ছাগলের খেয়াল রাখে না কেন?
– কি জানি বাবু! হয়তো আছে। কিন্তু ছাগলের খোঁজ নেয়ার মত সময় কোথায় তাদের? আনমনা ভাবে উত্তর দেন বাবা।

SHARE

Leave a Reply