Home খেলার চমক মুমিনুল হক আমাদের লিটল মাস্টার । আবু আবদুল্লাহ

মুমিনুল হক আমাদের লিটল মাস্টার । আবু আবদুল্লাহ

মুমিনুল হক আমাদের লিটল মাস্টার২০০২ সালের শেষ দিকের কথা। কক্সবাজার স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত একটি ক্রিকেট ম্যাচে এক কিশোরের ব্যাটিং দেখে মুগ্ধ হন বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিকেএসপির প্রশিক্ষক নাজিম উদ্দিন। বড় হয়ে ক্রিকেটার হতে চায়- শুনে তিনি ছেলেটিকে পরামর্শ দেন বিকেএসপিতে ভর্তি হতে। যেন স্বপ্ন পূরণের রাস্তা খুঁজে পায় ছেলেটি। ভর্তিপরীক্ষা দেয় সাভারের বিকেএসপিতে। তবে লিখিত পরীক্ষা ও ক্রীড়া দক্ষতায় টিকে গেলেও উচ্চতা কম হওয়ায় বাদ পড়ে যায় ছেলেটি। ভাঙা মন নিয়ে ঢাকা থেকে কক্সবাজার ফিরে যায় সে। যদিও সাগরের গর্জন শুনে বড় হওয়া ছেলেটি সাহস হারায়নি। বাবামায়ের উৎসাহ আর নিজের সাধনা অব্যাহত রেখেছে। কার কাছে যেন শুনেছে সাইকেল চালালে উচ্চতা বাড়ে- পরের বছর ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার অনেক আগে থেকেই শুরু হয় ক্রিকেট চর্চার পাশাপাশি প্রতিদিন সাইকেল চালানো।
পরের বছর ছেলেটি ঠিকই ভর্তি হতে পারে স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান বিকেএসপিতে। (এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি- বর্তমান সময়ের সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহীম, সৌম্য সরকার, এনামুল হক বিজয়, নাসির হোসেন ছাড়াও সাবেকদের মধ্যে নাইমুর রহমান দুর্জয়, আল শাহরিয়ার বিদ্যুৎ, আবদুর রাজ্জাকসহ জাতীয় দলের অনেক ক্রিকেটারই উঠে এসেছেন বিকেএসপি থেকে। সাধারণত ভর্তিপরীক্ষার মাধ্যমে প্রতি বছর সপ্তম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয় এখানে।) বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই লেখাপড়ার পাশাপাশি ক্রিকেটমাঠে সৌরভ ছড়াতে থাকে মুমিনুল হক সৌরভ। সার্টিফিকেটের নামেই ক্রিকেটাররা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি পান, যে কারণে পরিবারের আদরের সৌরভ নামটিতে তাকে অনেকেই চেনে না।
ক্রিকেটার মুমিনুলের উঠে আসার গল্পটা লেখার শেষ দিকে বলছি। তার আগে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের কথা বলে নেই। কিছুদিন ধরেই ওয়ানডে দলের বাইরে থাকলেও বাংলাদেশ টেস্ট দলের ‘অটো চয়েজ’ মুমিনুল হক। অনেক দিন ধরেই টেস্ট দলের তিন নম্বর জায়গাটা নিজের করে নিয়েছেন। টেস্ট দলে তিন নম্বরে সাধারণত ব্যাটিং করেন দলের সেরা ব্যাটসম্যান। ডন ব্রাডম্যান, ব্রায়ান লারা, রিকি পন্টিং, রাহুল দ্রাবির, বিরাট কোহলি, স্টিভ স্মিথ- এসব তারকা নিজ নিজ দলের তিন নম্বর পজিশনের ব্যাটসম্যান। বাঘা বাঘা ব্যাটসম্যানদের নামগুলো দেখে বুঝতেই পারছ পজিশনটির গুরুত্ব কত। মুমিনুল হকের ওপর শুরু থেকেই দায়িত্ব পড়েছে ওয়ানডাউনে ব্যাটিং করার। সেটি তার টেকনিক আর টেম্পারমেন্টের কারণেই। ছোটোখাট গড়নের কারণে অনেকেই তাকে ডাকেন ‘লিটল মাস্টার’ বলে।মুমিনুল হক আমাদের লিটল মাস্টারক্রিকে্টে লিটল মাস্টার শুধু একটি ডাক নাম নয়, এই নামটির সাথে জড়িয়ে আছে মর্যাদাও। অতীতে পাকিস্তানের হানিফ মোহাম্মদ, ভারতের শচিন টেন্ডুলকার নিজ নিজ যুগে পেয়েছিলেন লিটল মাস্টার হিসেবে পরিচিতি।
সাকিব আল হাসান ইনজুরিতে পড়ায় তার বিকল্প হিসেবে জাতীয় দলে অভিষেক মুমিনুলের (২০১২)। কাজেই সাকিবের অভাব পূরণের প্রত্যাশা নিয়েই তার মাথায় জাতীয় দলের ক্যাপ তুলে দিয়েছিলো দল। দলের আস্থার প্রতিদানও দিয়েছেন মুমিনুল। রানের পর রান করে গেছেন। প্রথম ১৪ টেস্টে ৬০ গড়ে মমিনুলের ১৩৮০ রান। ৪ সেঞ্চুরির পাশাপাশি ৯ হাফ সেঞ্চুরি। টানা ১১ টেস্টে পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংস খেলেছেন এ সময়। যে কীর্তি আছে ভিভ রিচার্ডস, বিরেন্দ্র শেবাগদের। পরের ১২তম টেস্টে হাফ সেঞ্চুরির দেখা পেলে এবি ডি ভিলিয়ার্সের সাথে যৌথভাবে বিশ্ব রেকর্ডের মালিক হতেন।
২০১৩ সালের মার্চে টেস্ট অভিষেক তার। শুরু থেকেই প্রতিটি ম্যাচে ছিলেন দারুণ ধারাবাহিক। সে বছরই অক্টোবরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্টে ১৮১ রানের ইনিংস খেলে হইচই ফেলে দেন। ঢাকায় পরের টেস্টে খেলেন অপরাজিত ১২৬ রানের ইনিংস। সিরিজ ড্র করে বাংলাদেশ। ম্যান অব দ্য সিরিজ হন মুমিনুল। এই সিরিজই তারকা বানিয়ে দেয় তাকে।
পাঁচ ফুট সাড়ে তিন ইঞ্চি উচ্চতার মুমিনুল এভাইে ব্যাট হাতে নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছেন শুরু থেকে। তবে মাঝখানে খারাপ সময়ও গেছে। যে ওয়ানডে দিয়ে তার জাতীয় দলে অভিষেক- সেই ওয়ানডেতে বেশির ভাগ সময় থাকছেন দলের বাইরে। টেস্ট দল থেকেও বাদ পড়েছিলেন। এগুলো অবশ্য অন্য আরেক গল্প। অনেকের মতেই মুমিনুলের ক্যারিয়ারের এই অংশটার জন্য দায়ী জাতীয় দলের সাবেক কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহে। মুমিনুলের ক্যারিয়ারটাকেই প্রায় শেষ করে ফেলেছিলেন এই শ্রীলঙ্কান কোচ। কোন এক অজানা কারণে তিনি একের পর এক দোষ খুঁজে বের করতে থাকেন মুমিনুলের। হাতুরাসিংহে এসেই বলে দিলেন মুমিনুল শর্টপিচ বলে দুর্বল। ওয়ানডে দল থেকে ছেঁটে ফেলেন তাকে। ২০১৭ সালে শ্রীলঙ্কা সফরের প্রথম টেস্টের উভয় ইনিংসে লঙ্কান অফস্পিনার সান্দাকানের বলে আউট হওয়ার পর হাতুরা ঘোষণা দেন ‘মমিনুল অফস্পিন খেলতে পারেন না’। ব্যাস! পরের ম্যাচে অর্থাৎ দেশের শততম টেস্টে দল থেকেও বাদ দেয়া হয় তাকে।মুমিনুল হক আমাদের লিটল মাস্টারতবে যার মধ্যে প্রতিভা আছে তাকে আটকে রাখা যায় না। মুমিনুল হাতুরাসিংহেকে মোক্ষম জবাবটা দিয়েছেন ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে। বাংলাদেশ দলের চাকরি ছেড়ে শ্রীলঙ্কার কোচ হন হাতুরা। দল নিয়ে আসেন বাংলাদেশ সফরে। চট্টগ্রামে তার দলেরত বিপক্ষেই সিরিজের প্রথম টেস্টে মুমিনুল জোড়া সেঞ্চুরি করেন। প্রথম ইনিংসে ১৭৬ রানের পর দ্বিতীয় ইনিংসে খেলেন ১০৫ রানের ইনিংস। এ যেন এক মধুর প্রতিশোধ! এক টেস্টে দুই ইনিংসে সেঞ্চুরির কৃতিত্ব বাংলাদেশীদের মধ্যে একমাত্র তারই। আবার এক টেস্টে বাংলাদেশীদের মধ্যে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডও দখলে নেন এই ম্যাচে।
এরপর পুরো ২০১৮ সালটিই দারুণ কেটেছে লিটল মাস্টারের। সব মিলে চারটি টেস্ট সেঞ্চুরি করেছেন ওই বছর। বছরের শেষ দিকে জিম্বাবুয়ে ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজে করেছেন একটি করে সেঞ্চুরি। ক্যারিয়ারে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৩৩ টেস্টে ৬১ ইনিংসে ৪৪ গড়ে রান করেছেন আড়াই হাজার। ৮ সেঞ্চুরির সাথে ১২ হাফ সেঞ্চুরি। ওয়ানডে খেলেছেন ২৮টি। কোনো সেঞ্চুরি নেই, ২২ গড়ের সাথে ৩টি হাফ সেঞ্চুরি। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচত খেলেছেন ৬টি।
এবার আসি মুমিনুলের উঠে আসার গল্পে। এসএসসির পরপরই ঢাকা বিভাগের হয়ে তার অভিষেক প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে, সেটা ২০০৮-০৯ মৌসুমে। এরপর খেলেছেন ২০১০ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপেও। ২০১১ সালে ডাক পান বাংলাদেশ ‘এ’ দলে। ওই দলের হয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের একটি ম্যাচে দেড় শ’ রানের ইনিংস খেলে নজর কাড়েন। এরপর ঘরোয়া ক্রিকেটে পরপর দু’টি সেঞ্চুরি করে জাতীয় দলের নির্বাচকদের মন জয় করে নেন মুমিনুল হক।
২০১২ সালের নভেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে সাকিব আল হাসান ইনজুরিতে পড়লে খুলনায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় মুমিনুল হকের। দল জিতলেও সেই ম্যাচে অবশ্য ব্যাটিং করা হয়নি তার। চার মাস পর ২০১৩ সালের মার্চে শ্রীলঙ্কা সফরে অভিষেক হয় টেস্ট ক্রিকেটের অভিজাত আঙিনায়।
মুমিনুলের আশা আগামী বিশ্বকাপের আগেই আবার ফিরবেন ওয়ানডে দলে। ইতঃপূর্বে ঘরোয়া ক্রিকেটে দারুণ পারফরম্যান্স দেখিয়েও ওয়ানডে দলে জায়গা হয়নি। তার বিশ্বাস এবার আর নির্বাচকরা তাকে শুধুই টেস্ট ক্রিকেটার বানিয়ে রাখবেন না। ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো করেই ফিরতে চান ওয়ানডে দলে।

SHARE

Leave a Reply