Home নিবন্ধ আমাদের শিশু সাহিত্য । হারুন ইবনে শাহাদাত

আমাদের শিশু সাহিত্য । হারুন ইবনে শাহাদাত

আমাদের শিশু সাহিত্যপ্রতি বছর হাজার হাজার বই প্রকাশিত হয়। বিশেষ করে অমর একুশের বইমেলা উপলক্ষে নতুন নতুন সাহিত্য সৃষ্টি ও প্রকাশের উৎসব বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনকে সমৃদ্ধ করার এক সুবর্ণ সুযোগ বয়ে আনে। এই সময় হাজার হাজার বই প্রকাশিত হয়। তারপরও অভিভাবকদের কাছ থেকে অভিযোগের সুরে যে কথাটি শোনা যায় তা হলো, ‘সন্তানদের হাতে তুলে দেয়ার মতো ভালো বই কই?’ কারণ প্রতিটি  সচেতন অভিভাবকই চান তার সন্তানের হাতে ভালো বই তুলে দিতে। বই মনন, চিন্তা চেতনা গড়ার হাতিয়ার। এর প্রতিটি অক্ষর শব্দ বাক্য গল্প ঘটনাপ্রবাহ মনকে আন্দোলিত করে। বিশেষ করে শিশুকিশোরদের কোমল মনে এর চিরস্থায়ী প্রভাব চিরদিন থাকে। তাই এ ক্ষেত্রে সচেতন না হলে হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। প্রত্যেক মা-বাবাই চান তাদের সন্তান আদর্শ মানুষ হোক। ভালো সাহিত্যের লক্ষ্যও তাই।
সাহিত্য পাঠের উদ্দেশ্য শুধু আনন্দ লাভ নয়। সাহিত্য পাঠে মানব মনে মানবতাবোধ, দেশপ্রেম জাগ্রত হয়। একজন পাঠক নিজের ধর্ম ও স্বজাতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে নিজের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার সুযোগ পায়। নিষ্ঠার সাথে নিজের ধর্ম পালন করে বিশ্বজাহানের স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক সুদৃঢ় করার নির্দেশনাও বইপাঠের মাধ্যমে লাভ করা যায়। বিশ্বস্রষ্টার সকল সৃষ্টি বিশেষ করে ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে ভালবাসার শক্তি অর্জন করার মূলমন্ত্রও ভালো বইয়ে থাকে। তাই শিশুদের হাতে বই তুলে দেয়ার সময় অবশ্যই বাবামাকে বিশেষ সতর্ক থাকতে হয়। তাদের হাতে এমন কিছু তুলে দেয়া উচিত নয়, যা তাদের চিন্তায় বিভ্রান্তির বিষ ছড়াবে।


গ্রিক দার্শনিক এরিস্টেটল বলেছেন, ‘শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো ধর্মীয় অনুশাসনে অনুমোদিত পবিত্র কার্যক্রমের মাধ্যমে সুখ লাভ।’ কবি আল্লামা ইকবাল মনে করেন, একজন মুসলিম অভিভাবক তার সন্তানের হাতে বই তুলে দেয়ার সময় চিন্তাইকরবেন, তাকে পূর্ণাঙ্গ মুসলিম হিসেবে গড়ে তোলার উপাদান তাতে আছে কি না?


একটি কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে শিখার জন্য শিক্ষা এবং শিক্ষার সর্বজন স্বীকৃত ও প্রচলিত সবচেয়ে উপযোগী মাধ্যম হলো বই। শৈশবের শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো বলেছেন, Education and admonition commence in the first years of childhood, and last to the very end of life. অর্থাৎ শৈশবের প্রথম বছরগুলো যে শিক্ষা ও উপদেশ দিয়ে শুরু হয় তাই তাকে জীবনের শেষ গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্লেটো শিশুদের জন্য প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থায় যে বিষয়গুলো রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন তা হলো, ‘১. শিশুদের মনে ভয় সৃষ্টি করতেত পারে এমন বিষয় তাদের জন্য লেখা বইয়ে আনা যাবে না। ২. সৃষ্টি কর্তা বলে কিছু নেই এমন ধারণা সৃষ্টি করে এমন বিষয় তাদের শিক্ষানো যাবে না। ৩. মিথ্যা ও অলীক বিষয় শিখানো যাবে না। ৪. শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য হলো অজ্ঞতা ও মিথ্যার অন্ধকার দূর করে সত্যের আলোকে বিকশিত করা। ৫. উন্নত নৈতিক চরিত্রের মানুষ গড়া।’
গ্রিক দার্শনিক এরিস্টেটল বলেছেন, ‘শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো ধর্মীয় অনুশাসনে অনুমোদিত পবিত্র কার্যক্রমের মাধ্যমে সুখ লাভ।’ কবি আল্লামা ইকবাল মনে করেন, একজন মুসলিম অভিভাবক তার সন্তানের হাতে বই তুলে দেয়ার সময় চিন্তাই করবেন, তাকে পূর্ণাঙ্গ মুসলিম হিসেবে গড়ে তোলার উপাদান তাতে আছে কি না? তিনি বলেছেন, ‘পূর্ণাঙ্গ মুসলিম তৈরি করাই হবে শিক্ষার উদ্দেশ্য।’ একটি ভালো শিশুসাহিত্য শিশুর শরীর, মন এবং আত্মার উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। মহাকবি মিল্টনের ভাষায়, ‘Education is the development of body, mind and soul.’
আমাদের শিশু সাহিত্যবাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম শিশু সাহিত্য: বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম শিশু সাহিত্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, উল্লেখিত বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়েই শিশুদের জন্য প্রথমত সাহিত্য সঙ্কলনটি প্রকাশিত হয়েছিল। বাংলা ভাষায় শিশুসাহিত্যের গোড়াপত্তন হয় ১৮১৮ সালে কলিকাতা স্কুল-বুক সোসাইটি কর্তৃক প্রকাশিত নীতিকথা নামক গ্রন্থের মাধ্যমে। উপদেশমূলক ১৮টি গল্পের সমন্বয়ে প্রণীত এ গ্রন্থটি স্কুলপাঠ্যরূপে ব্যবহৃত হলেও প্রকৃতপক্ষেত এটিই প্রথম শিশুপাঠ্য গ্রন্থ। মুসলমান শিশুসাহিত্যিকদের মধ্যে প্রথম দিকের লেখক হলেন মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী। তিনি নূরনবী (১৯১৮) নামে একটি উৎকৃষ্ট শিশুপাঠ্য জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন। (সূত্র : বাংলাপিডিয়া) বাংলাপিডিয়ার সূত্রে আরো জানা যায়, শিশুসাহিত্যের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, মদনমোহন তর্কালঙ্কার, স্বর্ণকুমারী দেবী প্রমুখের রচনার মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের বোধোদয় (১৮৫১), কথামালা (১৮৫৬), চরিতাবলী (১৮৫৬), আখ্যানমঞ্জরী (১৮৬৩), বর্ণপরিচয় (১৮৮৫); অক্ষয়কুমারের চারুপাঠ (৩ খন্ড, ১৮৫৫-৫৯); মদনমোহনের শিশুশিক্ষা (৩ ভাগ, ১৮৫০-৫৫) এবং স্বর্ণকুমারী দেবী সম্পাদিত বালক পত্রিকার উল্লেখ করা যায়।
তৃতীয় পর্যায় হচ্ছে রবীন্দ্রযুগ। রবীন্দ্রপূর্ব যুগের শিশুসাহিত্য মুখ্যত জ্ঞানমূলক, উপদেশমূলক ও নীতিকথামূলক; কিন্তু রবীন্দ্রযুগের শিশুসাহিত্য মুখ্যত আনন্দমূলক। সুদীর্ঘ সময়ব্যাপী রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যসাধনায় শিশুরা উপেক্ষিত হয়নি; তাঁর শিশু (১৯০৬) কাব্যগ্রন্থেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে সমকালীন উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী, সুকুমার রায়, দক্ষিণারঞ্জন মিত্রমজুমদার, কাজী নজরুল ইসলাম, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখের নামও উল্লেখযোগ্য। হেমেন্দ্রপ্রসাদের আষাঢ়ে গল্প (১৯০১), যোগীন্দ্রনাথ সরকারের হাসিরাশি (১৯০২), দক্ষিণারঞ্জনের ঠাকুরমার ঝুলি (১৯০৮), আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ভূত পেতনী (১৩০৯), উপেন্দ্রকিশোরের টুনটুনির বই (১৯১০), সুখলতা রাও-এর গল্পের বই (১৯১৩), সুকুমার রায়ের আবোল তাবোল (১৯২৩), পাগলা দাশু, অবাক জলপান, নজরুল ইসলামের ঝিঙে ফুল (১৯২৬) ইত্যাদি গ্রন্থ বাংলার শিশুসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। এ সময়ের উল্লেখযোগ্য পত্রপত্রিকার মধ্যে মুকুল, প্রকৃতি (১৯০৭), সন্দেশ (১৯১৪), মৌচাক (১৯২১), শিশু সাথী (১৯২২), খোকা খুকু (১৯২৩), শুকতারা, টাপুর টুপুর ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।


শিশুদের হাতে এমন কিছু তুলে দেয়া উচিত নয়, যা তাদের চিন্তায় বিভ্রান্তির বিষ ছড়াবে। একটি কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে শিখার জন্য শিক্ষা এবং শিক্ষার সর্বজন স্বীকৃত ও প্রচলিত সবচেয়ে উপযোগী মাধ্যম হলো বই।


মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরীর নূরনবীর পরবর্তী উল্লেখযোগ্য মুসলিম শিশুসাহিত্যগুলো হলো: হাবিবুর রহমানের হাসির গল্প (১৯১৭), ইমদাদুল হকের কামারের কান্ড (১৯১৯), ইব্রাহিম খাঁর ছেলেদের শাহনামা (১৯২২), মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর সিন্দাবাদ সওদাগরের গল্প (১৯২২), বন্দে আলী মিয়ার চোর জামাই (১৯২৯), মেঘকুমারী (১৯৩২), জঙ্গলের খবর (১৯৩৪), জঙ্গলের রাজা (১৯৩৭); মোহাম্মদ মোদাব্বেরের হীরের ফুল (১৯৩১), হবীবুল্লাহ বাহারের ওমর ফারুক (১৯৩১), আবুল কালাম শামসুদ্দীনের কচিপাতা (১৯৩২) প্রভৃতি। আরো পরে যাঁরা শিশুসাহিত্য রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেন তাঁরা হলেন : গোলাম মোস্তফা, জসীমউদ্দীন, কাজী কাদের নেওয়াজ, ফররুখ আহমদ, তালিম হোসেন, মোহাম্মদ নাসির আলী, শাহেদ আলী, আতোয়ার রহমান, হাবিবুর রহমান প্রমুখ। জসীম উদ্দীনের চলে মুসাফির একটি সুখপাঠ্য শিশুতোষ ভ্রমণকাহিনী। সাম্প্রতিক কালে বিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থ রচনা করে আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দিন (১৯৩০-১৯৯৮) বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন। তাঁর এসো বিজ্ঞানের রাজ্যে (১৯৫৫), অবাক পৃথিবী (১৯৫৫), খেলতে খেলতে বিজ্ঞান প্রভৃতি গ্রন্থের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বেগম সুফিয়া কামাল, আশরাফ সিদ্দিকী, রোকনুজ্জামান খান, মাহবুব তালুকদার, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, মাহবুবুল হক, হুমায়ুন আহমেদ, মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, মতিউর রহমান মল্লিক, মোশাররফ হোসেন খান, আসাদ বিন হাফিজ, শরীফ আবদুল গোফরান, গোলাম মোহাম্মদ, মাহফুজুর রহমান আখন্দ, আমিরুল ইসলাম, আনিসুল হক, জাকির আবু জাফর, মনসুর আজিজ প্রমুখ গদ্য ও পদ্যে শিশুতোষ সাহিত্য রচনা করেছেন।আমাদের শিশু সাহিত্যবাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিশুসাহিত্য চর্চার বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ শিশু একাডেমী (১৯৭৬) প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এযাবৎ প্রায় ৪২৪টি শিশু-কিশোর উপযোগী গ্রন্থ প্রকাশ করেছে। গ্রন্থগুলির বিষয়বৈচিত্র্যও উল্লেখযোগ্য, যেমন: কবিতা, ছড়া, উপন্যাস, গল্প, নাটক, জীবনীগ্রন্থ, বিজ্ঞানগ্রন্থ, বাংলাদেশ সিরিজ ইত্যাদি। পাঁচ খন্ডে সমাপ্ত শিশু বিশ্বকোষ (১৯৯৩-৯৮) শিশু একাডেমীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। এই প্রতিষ্ঠানের মাসিক পত্রিকা শিশু ১৯৯৯ সালে ২৩ বর্ষ পূর্ণ করেছে। বাংলা একাডেমী থেকেও এযাবৎ শতাধিক শিশুতোষ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে উপরিউক্ত বিষয়ভিত্তিক গ্রন্থ ছাড়াও রয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতিবিষয়ক গ্রন্থ, বিশ্বসাহিত্যের অনুবাদগ্রন্থ ইত্যাদি। বাংলা একাডেমী শিশুসাহিত্যে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য লেখককে ‘অমর একুশ’ উপলক্ষে পুরস্কার প্রদান করে থাকে। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে বাংলা সাহিত্যে শিশু (২০০২) ও দুই খন্ডে আকর্ষণীয় শিশু বিশ্বকোষ ছোটদের বাংলাপিডিয়া (২০১১) এবং মুক্তধারার মতো বেসরকারি প্রকাশনা সংস্থাও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশুতোষ গ্রন্থ প্রকাশ করে এ ধারার সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।

SHARE

Leave a Reply