Home সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস নাবিলের কান্না । জুবায়ের হুসাইন

নাবিলের কান্না । জুবায়ের হুসাইন

গত সংখ্যার পর

নাবিলের কান্নাবিপ্লব যা বলেছিল, তাই-ই হলো। বাড়ির কেউ খেয়ালই করেনি যে তারেক এত রাত অবধি বাড়িতে নেই। মা রানড়বাঘরে পিঠা বানাচ্ছেন। ছোট ভাইটিকে নিয়ে বাবা পড়ার ঘরে, মেয়েকে পড়াচ্ছেন। আর ছোট চাচা বাড়িতে নেই। তারেকের ফুফু বাড়ি গেছেন বিকেলে। মা-বাবা জানলেন তারেক এশার নামাজ পড়তে মসজিদে গিয়েছিল, সেখান থেকে ক্লাসের পড়ার বিষয়ে বিপ্লবের সাথে কথা বলতে বলতে দেরি হয়ে গেছে- এসব কিন্তু তাকে বা বিপ্লব কেউ বলেনি, বাবাই বললেন।
হাঁফ ছেড়ে বাঁচল তারেক। যাক বাবা, কোনো মিথ্যে বলতে হয়নি ওকে। বিপ্লবের বাড়িতেও কোনো সমস্যা হলো না। মা কেবল বললেন, ‘বাইরে এত রাত পর্যন্ত থাকা ঠিক না। দিনকাল তো ভালো না, তাই চিন্তা-আত্তি একটু-আধ্যি হয় বৈকি!
আয়, খেয়ে নিয়ে পড়া বাকি থাকলে তা শেষ করে ঘুমিয়ে পড়।’
বিপ্লবের মা এমনই। ছেলের ওপর তার অগাধ বিশ্বাস। মায়ের এই বিশ্বাসকে বরাবরই সম্মান দিয়েই এসেছে বিপ্লব। কেউ কখনও ওর বিরুদ্ধে নালিশ নিয়ে বাড়িতে আসেনি। বরং বিভিনড়ব বিষয়ে ওর সহযোগিতা বা পরামর্শ চাইতে এবং কোনো কোনো কাজের জন্য ওকে ধন্যবাদ জানিয়ে গেছে ওর মায়ের কাছে- সেটা বিপ্লবের অগোচরেই। সে রাতে কিছু ঘটল না।
রাতে অবশ্য ভালো ঘুম এলো না বিপ্লবের। কেবলই নানান বিষয় মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেল। এলোমেলো করে দিল ভাবনাগুলো। একসময় ঘুমিয়ে পড়ল। তবে ঘুমানোর আগে হাতঘড়িটাতে অ্যালার্ম দিয়ে বালিশের নিচে রাখতে ভুলল না। বারোটার আগেই যে ওকে যেতে হবে গহনার পুঁটলি পাহারা দিতে। সে জন্য অন্তত পনেরো মিনিট আগেই ঘুম থেকে উঠতে হবে।
তারেকের অবশ্য তেমন কিছুই হলো না। নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে মধুর স্বপ্ন দেখল, আর ঘুম ভাঙতেই সব স্বপড়ব হাওয়া হয়ে গেল। হাতঘড়িতে একবার অ্যালার্ম বাজতেই উঠে পড়ল বিপ্লব। কোনো রকম শব্দ না করে বিড়ালের মতো নিঃশব্দ পায়ে বাইরে বেরিয়ে এলো।
সে রাতে তারেক আর পাহারায় এলো না। অবশ্য আগেই এমনটি ভেবেছিল বিপ্লব। মনে মনে একটু রাগ হলেও মুখে ফুটে উঠল প্রশ্রয়ের ক্ষীণ একটা হাসির রেখা।
যা ভিতুর ভিতু ছেলেটা! ও কি আর একা একা পাহারা দিতে পারতো এই যক্ষের ধন?
ভালোই হয়েছে তারেক আসেনি, নইলে যদি ও এখানে ঘুমিয়ে পড়ত বা ওকে ফাঁকি দিয়ে কেউ ওগুলো নিয়ে যেত?
একটু ঝিমুনি মতো এসেছিল বিপ্লবের। কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দে তা ছুটে পালাল দু’চোখ থেকে। না, কিছুতেই ঘুমানো চলবে না। বুদ্ধি করে সঙ্গে চার্জার লাইটটা নিয়ে এসেছে। কিন্তু ভুলেও জ্বালছে না, পাছে ওর উপস্থিতি ধরা পড়ে যায়, সেই ভয়ে।
অনেক ভাবনা-চিন্তা আর কানের কাছে মশার বিরক্তিকর গান শ্রবণ ও সেইসাথে তাদের কামড়ের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হতে লাগল সময়। তবে আজ সময় যেন থেমে থেমে এগোচ্ছে। কিছুতেই কাটতে চাচ্ছে না সময় নামের নচ্ছরটা। নাহ্, সঙ্গে সঙ্গে জিব কাটল বিপ্লব, সময়কে গালি দেয়া একেবারেই ঠিক হচ্ছে না। ওসব মহান আল্লাহপাকের সৃষ্টি। মহান রবের কোনো সৃষ্টিকে গালি দেয়ার কোনো প্রকার অধিকার ওর নেই। ও সারাজীবন সাধনা করেও একটি মুহূর্ত আবিষ্কার করতে পারবে না। তাই অন্যের সৃষ্টিকে কেন গালমন্দ করবে ও? বরং সময়কে কাজে লাগানোর মধ্যেই বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বহন করে। এ কারণে রাতের বাকি সময়টাকে কাজে লাগানোর কথা ভাবল বিপ্লব। কিন্তু কিভাবে তা সম্ভব?
হ্যাঁ, সময়কে কাজে লাগানোর উপায় ও পেয়ে গেছে। বুদ্ধি করে অজু করেই এসেছিল। তাই মহাগ্রন্থ আল কুরআনের যেসব অংশ বা আয়াত ওর মুখস্থ আছে, সেগুলো মনে মনে তেলাওয়াত করে চলল ও। খুব ধীরে ধীরে তেলাওয়াত করছে। এবং আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করল, এতে আয়াতের অনেক অর্থ ও বুঝতেও পারছে। তাই দ্বিগুণ উৎসাহে পুলকিত মনে কুরআন তেলাওয়াত করতে লাগল বিপ্লব। বেরিয়ে এলো বাইরে। একেবারে তর সইছে না। তাই তারেককে নিয়ে রওনা দিল।
দূর থেকেই ডিটু ভাইয়াকে দেখা গেল। পা ছড়িয়ে চিত হয়ে শুয়ে আছে সে। দ্রুত কাছে এগিয়ে গেল ছেলেরা। ধাক্কা দিয়ে জাগাল তাকে। ধড়মড় করে উঠে বসল সে।
বড় বড় চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল ওদের দিকে। তারপর বলল, ‘কী কী হয়েছে?’
বিপ্লব বলল, ‘তুমি ঘুমাচ্ছো? তোমাকে না পুঁটলিটার ওপর নজর রাখার কথা?’ ‘পুঁটলি? কিসের পুঁটলি? আমি এখানে কেন?’
এ ওর দিকে তাকাল বিপ্লব ও তারেক। পুঁটলিটা কেউ নিয়ে গেছে বলে সন্দেহ হলো। আরো সন্দেহ হলো যাওয়ার পথে হয়তো ডিটু ভাইয়াকে কিছু খাইয়ে দিয়ে গেছে। তাই দ্রুত শাল গাছটার কাছে চলে গেল। না, নিশ্চিত হলো যে কেউ ওটা উঠিয়ে নিয়ে যায়নি। মাটি খোঁড়ার কোনো চিহ্ন চোখে পড়ছে না।
এই সময় বিপ্লবের কনুই খামছে ধরল তারেক। বিপ্লব বলল, ‘কী হয়েছে?’ জবাবে রাস্তার দিক দেখাল তারেক। ডিটু ভাইয়ার সমবয়সী দুটো ছেলে এদিকেই এগিয়ে আসছে। গায়ে মর্নিং ওয়াকের পোশাক। তাড়াতাড়ি ডিটু ভাইয়াকে নিয়ে আড়ালে চলে গেল ওরা। নজর রাখল এদিকে।
ছেলে দুটো সোজা চলে গেল ওই কড়ই গাছটার কাছে, যেখান থেকে ডিটু ভাইয়া পুঁটলিটা তুলেছিল কাল সন্ধ্যায়। কিন্তু মাটি খুঁড়েই থ হয়ে গেল। পেল না কিছুই। পাবে কেমন করে? ওরা তো সেটা সরিয়ে রেখেছে!
উঠে দাঁড়ালো ছেলে দুটো। ঘুরে দাঁড়াল। খুবই আশ্চর্য হয়েছে। কিছুক্ষণ নিচু স্বরে কিছু বলল ওরা। তারপর যেমনি এসেছিল তেমনি চলে গেল।
হাঁফ ছেড়ে বাঁচল বিপ্লবরা। যাক, চলে গেছে ওরা।
‘ওরা কারা?’ প্রশড়ব করল ডিটু ভাইয়া। বোঝা যাচ্ছে এখনও তার ঘোর কাটেনি। ইশ্! নিজের মনে বলল বিপ্লব। ছেলে দুটোকে ভালো করে দেখা হয়নি। এত কাছ থেকে দেখেও কাউকে চিনতে পারল না। অবশ্য খেয়াল করে দেখলে হয়তো চিনতে পারতো।
‘তোমার ঘুমের ঘোর এখনও কাটেনি?’ বলল তারেক।
‘কাটবে কিভাবে? আমার ঘুমই তো পুরো হয়নি এখনও।’
‘এক কাজ করো, তুমি বরং বাসায় চলে যাও। ফ্রেশ হয়ে লম্বা একটা ঘুম দাও।
ততক্ষণে আমরা এদিকে নজর রাখছি।’ বলল বিপ্লব।
এইবার যেন হুঁশ হলো তার, বলল, ‘তাই বলো, আমাকে আবার কে এখানে রেখে যাবে। কাল রাতে তো আমিই এখানে নজর রাখার কাজে ছিলাম। আমি বরং বাসায় যাই। একটু ঘুমিয়ে আসি।’
‘তাই যাও।’
‘তোমরা কিন্তু ভালো করে নজর রেখ। আমি সামান্য একটু ঘুমিয়েই চলে আসব।’
‘না না অত তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। তুমি ভালো করে ঘুমিয়ে তবেই এসো।’
অল্প একটু ঘুমানোর কথা বললেও ডিটু ভাইয়া কিন্তু সহসা এলো না। তার আসতে আসতে সেই সন্ধ্যা হয়ে গেল। আর ততক্ষণে ঘটে গেছে কয়েকটি ঘটনা।

নাবিলের কান্নাচার.
একজন একজন করে সকালের নাস্তা সেরে এলো বিপ্লব ও তারেক। চলল বিরতিহীন নজরদারি। দুপুরের আগ পর্যন্ত কিছুই ঘটল না। ওদের যখন প্রায় বিরক্তি ধরে গেছে, ঠিক সেই সময় ভাঁজ করা কাগজটার কথা মনে পড়ল বিপ্লবের। ওর প্যান্টের পকেটেই আছে ওটা। বের করে চোখের সামনে মেলে ধরল। বোঝার চেষ্টা করল আঁকিবুঁকি দাগের অর্থ। কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টা করেও কিছুই উদ্ধার করতে পারল না।
‘আমার মনে হয় এমনিতেই কাগজটাতে কেউ আঁকিবুঁকি করেছে।’ এক সময় অধৈর্য হয়েই বলল তারেক।
‘আমার তা মনে হয় না।’ বলল বিপ্লব। তারেকের কথা মানতে রাজি নয় ও।
‘তাহলে ডায়েরিটার মধ্যে যতড়ব করে রেখে দিত না। তা ছাড়া তুমি খেয়াল করে দেখলে দেখবে দাগের মাঝে একটা শিল্পীর ছাপ আছে। অর্থাৎ এটা এমনি এমনি কেউ করেনি। নিশ্চয়ই এর কোনো মানে আছে।’
তারেক বলল, ‘বুঝলাম একটা শিল্পীর ছাপ আছে। কিন্তু সেটা কী?’ নিচের ঠোঁটে ওপরের দাঁত দিয়ে একটা চিমটি কাটল বিপ্লব। বলল, ‘সেটাই তো বের করার চেষ্টা করছি।’
আবার কাগজটার ওপর ঝুঁকে পড়ল দু’জন। আঁকিবুঁকি দাগের এ-মাথা থেকে ওমাথা নজর বুলালো কয়েকবার করে। কিন্তু ফল হলো একই, কিছুই বুঝল না। ‘এটা একটা ম্যাপ হতে পারে।’ একসময় বলল বিপ্লব। ‘এই তীর চিহ্নটা দিয়ে উত্তর দিক বোঝানো হয়ে থাকতে পারে। আমরা যেমনটা বাংলাদেশের ম্যাপ আঁকলে ওপরের দিকটা সবসময় তীর চিহ্ন দিয়ে উত্তর দিক বুঝিয়ে থাকি। …আর এই ডট চিহ্ন দুটো দিয়ে সম্ভবত শুরু এবং শেষ বোঝানো হয়েছে।…’ হঠাৎ করেই থেমে গেল বিপ্লব।
‘হ্যাঁ, আমারও এখন সেটাই মনে হচ্ছে।’ অনেকটা না বুঝেই বিপ্লবের সাথে একমত হলো তারেক।
‘এখন আমাদের খুঁজে বের করতে হবে এর শুরুটা হবে কোথা থেকে। তাহলেই হয়তো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারব।’ কথাটা বেশ রহস্যময়ভাবেই উচ্চারণ করল বিপ্লব।
‘কিন্তু এই গুপ্তধনের কী হবে?’
বিপ্লব প্রথমে বুঝতে পারে না। কিন্তু পরক্ষণেই বুঝতে পেরে হেসে দিল। বলল, ‘দারুণ বলেছ। আমিও ভাবছিলাম এর একটা নাম দেয়া দরকার। যাক, গহনার পুঁটলিকে এখন তাহলে আমরা গুপ্তধন বলেই ডাকব।’ একটু সময় চুপ থেকে আবার বলল, ‘বুঝতে পারছি না এখন আমাদের কী করা উচিত। সকালে ওরা এলো অথচ আমি এতই আপসেট হয়ে গিয়েছিলাম যে কিছুই করতে পারিনি তখন।’
‘কী করবে তাহলে এখন? এভাবেই পাহারা দিতে থাকবে?’
তারেকের কথার জবাব দিতেই যেন বাতাসে ভেসে এলো একটা মোটরসাইকেলের শব্দ। তাই চট করে আরেকটু আড়ালে লুকালো ছেলেরা। চোখ রাখল রাস্তার দিকে।
মোটরসাইকেলটা এসে থামল রাস্তার ধারে। স্টার্ট বন্ধ হলো। গাবগাছটার পাশ দিয়ে এগিয়ে এলো দুটো ছেলে। বয়সে ওদের চেয়ে একটু বড়ই হবে। ভ্রূ জোড়া কুঁচকে উঠল বিপ্লবের। নাহিদ ও নাদের, দুই যমজ ভাই, এখানে কী করছে?
দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে ফেলল ও। ফিসফিস করে তারেককে চুপ থাকতে বলল। এরাই যে সকালে এসেছিল তা বুঝতে পারছে বিপ্লব। কিন্তু কেন? গহনার পুঁটলির সাথে এদের কী সম্পর্ক? নাকি মিছেই ভাবছে এদের নিয়ে? আসল ঘটনাটা বুঝতে হলে ওদেরকে অপেক্ষা করতেই হবে।
নাহিদ ও নাদের এগিয়ে গেল। আবার খুঁড়লো মাটি। ফল হলো একই, ফাঁকা।
তারেকের নাকের মধ্যে অনেকক্ষণ ধরে সুড়সুড় করছিল। হাঁচি আটকে রেখেছিল অনেক কষ্টে। কিন্তু এক্ষণে আর পারল না। বিকট শব্দে হাঁচি বেরিয়ে এলো। যেন হৎপিণ্ডের সমস্ত বাতাস ও একসাথে বের করে দিল। পাঁই করে ঘুরে দাঁড়ালো নাহিদ ও নাদের। দেখে ফেলল ওদেরকে। আর লুকিয়ে থেকে লাভ নেই, বেরিয়ে এলো বিপ্লব তারেককে নিয়ে।
‘তোমরা এখানে কী করছ?’ প্রশ্ন করল নাহিদ।
‘না মানে আসলে…’ আমতা আমতা করতে লাগল বিপ্লব। বুঝতে পারছে না সত্যিটা বলে দেবে কী না।
‘তোমরা কি কিছু জানো?’ আবার প্রশ্ন করল নাহিদ।
‘হ্যাঁ মানে…, ইয়ে মানে না…’ বলতে গিয়েও পেটে বিপ্লবের গুঁতো খেয়ে থেমে গেল তারেক।
এ ওর দিকে তাকাল নাহিদ ও নাদের। নাদের বলল, ‘কী জান তোমরা বল।’
‘আসলে আমরা..’ থেমে গেল বিপ্লব।
‘দেখ আমরা খুবই বিপদে পড়েছি। আর তোমাদেরকে আমরা ভালো ছেলে বলেই জানি।’ নাদেরও নাছোড় বান্দা।
‘আমরা ওটা সরিয়ে রেখেছি।’ সত্যি কথাই বলল বিপ্লব।
‘তবে পুঁটলিটা কিন্তু ডিটু ভাইয়াই উঠিয়েছে।’ বলল তারেক।
‘ডিটু ভাইয়া!’ বুঝতে পারে না নাহিদ। কিছু ভাবে। একটু পর হাসি তার দু’কানে গিয়ে ঠেকে। বলল, ‘ও তোমরা ডিটেকটিভ ডিটুর কথা বলছ। দেখলি নাদের, আমি তো তখনই বলেছিলাম ও আমাদের ওপর নজর রাখছে। কিন্তু তুই তো গুরুত্বই দিলি না।’
নাদের বলল, ‘আসলে তখন কি মাথার কোনো ঠিক ছিল? তখন তো ওগুলো কোথাও রাখতে পারলেই বাঁচি।’ ফিরল ওদের দিকে। বলল আবার, ‘ডিটুর সাথে তোমাদের কিভাবে সাক্ষাৎ হলো?’
বিপ্লব সব খুলে বলল।
নাহিদ বলল, ‘কোথায় রেখেছ ওগুলো?’
‘গুপ্তধনগুলো আমরা অন্য জায়গায় রেখেছি।’ বলে উঠল তারেক।
‘গুপ্তধন!’ সমস্বরে বলে উঠল নাহিদ ও নাদের। প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না।
পরে বুঝতে পেরে হেসে দিল।
নাদের বলল, ‘ঠিকই করেছো। এখন ওগুলো নিরাপদেই থাকবে।’
‘কিন্তু,’ বলল বিপ্লব। ‘তোমরা ওগুলো এই জঙ্গলে লুকিয়ে রেখেছো কেন? কোথায় পেয়েছ গহনাগুলো?’
‘সব বলব তোমাদের।’ বলল নাহিদ। ‘এক কাজ করো, আজ সন্ধ্যার পর আমাদের বাসায় চলে এসো। তখন সব বলা যাবে।’
নাদের বলল, ‘হয়তো তোমরা আমাদের সাহায্য করতে পারবে। তোমরা যে রহস্যপ্রিয় তা আমরা জানি। বিশেষ করে বিপ্লব যে বেশ কয়েকটা জটিল রহস্যের সমাধান করেছো তা আমাদের অজানা নয়। ডিটুকেও এনো সঙ্গে করে।’ নাহিদ বলল, ‘আমরা এখন যাই। বেশিক্ষণ বাইরে থাকলে আবার বিপদ হতে পারে।’ বলে ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মোটরসাইকেল স্টার্ট দিয়ে চলে গেল ওরা।
‘থ’ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল বিপ্লব ও তারেক। কিছুই মাথায় ঢুকল না। তবে নাহিদের শেষ কথাটা বিপ্লবের মাথার মধ্যে কেবলই ঘুরপাক খাচ্ছে- ‘বেশিক্ষণ বাইরে থাকলে আবার বিপদ হতে পারে।’ কিসের বিপদ? জানতেই হবে ওকে।

পাঁচ.
নাহিদের ছোট চাচা মারা গেছেন কয়েকদিন আগে। ছোট চাচার একটা ছেলে আছে। নাম নাবিল। বয়সে বিপ্লবদের থেকে দু’বছরের ছোটই হবে। তবে খুবই ট্যালেন্ট। একবার বিপ্লবের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিল ছেলেটার। শুরুতেই জটিল একটা প্রশ্ন করেছিল বিপ্লবকে। প্রশ্নটা ছিল, ‘ধরো বিপু ভাইয়া, তোমার ঠিক এক হাত সামনে একটা ভয়ঙ্কর বাঘ আছে। আর বাঘটা খুব দ্রুতই তোমার দিকে তেড়ে আসছে। সে ঘণ্টায় প্রায় দেড় শ’ মাইল বেগে দৌড়াচ্ছে,
তাও তোমার নাগাল পাচ্ছে না। এটা কিভাবে সম্ভব?’
বেশ বেকায়দায় পড়ে গিয়েছিল বিপ্লব। অস্ফুটে মুখ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, ‘সেটা কিভাবে সম্ভব?’
অনেক ভেবেছিল বিপ্লব, আসলে ভাবার ভান করেছে, কারণ ও উত্তরটা জানত।
তারপরও ছোট ছেলেটা এমন একটা প্রশ্ন করেছে, উত্তরটা বলে দিলে তো ছেলেটার মজা নষ্ট হয়ে যাবে। ও নাবিলের সুন্দর হাসিমাখা মুখটা মলিন করে দিতে চায়নি। তাই বলেছিল, তুমিই বলে দাও নাবিল ভাইয়া।’
নাবিল হো হো করে একগাল হেসেছিল। বলেছিল, ‘বুদ্ধু, বিপু ভাইয়া বুদ্ধু।’ নিজের মতো আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠেছিল নাবিল। তারপর তাকিয়েছিল বিপ্লবের দিকে।
বিপ্লবের চোখে মুখে বোধ হয় কিছু একটা দেখতে পেয়েছিল। তাই মুহূর্তেই আনন্দটা উধাও হয়ে গিয়েছিল ওর মুখ থেকে। বলেছিল, ‘আমার ধারণাই ঠিক বিপু ভাইয়া, তুমি এই ধাঁধাঁর জবাব জানো। কারণ, তুমি তো বিপু ভাইয়া। আমার খুব প্রিয় বিপু ভাইয়া।’
বলে বিপ্লবের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নাবিল। বিপ্লব এটা অবশ্য চায়নি। ও তো ছেলেটার মুখ থেকেই জবাবটা শুনতে চেয়েছিল।
নাবিলের মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘আমি তোমার আনন্দটা মাটি করতে চাইনি বলে জবাব না জানার কথা বলেছি। আসলে মোবাইলে কোনো ছুটন্ত বাঘের ভিডিও দেখলেই এমনটি হওয়ার কথা।’

সন্ধ্যা নামতেই বেরিয়ে পড়ল ওরা। পথ থেকে ডেকে নিল ডিটু ভাইয়াকে।
নাহিদদের বাড়িটা বেশ খানিকটা জায়গা নিয়ে। বাড়ির চারপাশে বুক সমান উঁচু
পাঁচিল দেয়া।

[চলবে]

SHARE

Leave a Reply