Home খেলার চমক সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার । আবু আবদুল্লাহ

সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার । আবু আবদুল্লাহ

ক্রিকেটে একই সাথে ব্যাটিং, বোলিং ও ভালো ফিল্ডিং করতে পারে এমন খেলোয়াড়কেই বলা হয় অলরাউন্ডার। অর্থাৎ সব বিভাগেই যিনি দক্ষ। আজকের লেখায় আমরা জানব ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা কয়েকজন অলরাউন্ডারের সম্পর্কে।

গ্যারি সোবার্স

সর্বকালের-সেরা-অলরাউন্ডার--গ্যারি-সোবার্সসেরা অলরাউন্ডারদের তালিকায় সবার আগে আসবে স্যার গারফিল্ড সেন্ট আব্রাম সোবার্সের নাম। সংক্ষেপে গ্যারি সোবার্স নামে পরিচিত এই কিংবদন্তি। ১৯৫৪ সালে কিংসটনে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অভিষেক তার। বলা বাহুল্য যে সেটা টেস্ট ম্যাচে, কারণ ওয়ানডে ক্রিকেটের জন্ম হয়েছে আরো অনেক পরে (৫ জানুয়ারি, ১৯৭১)। সে কারণেই আন্তর্জাতিক ওয়ানডে খেলেছেন মাত্র একটি। টেস্ট আঙিনায় ব্যাট বলে দলকে অনেক স্মরণীয় মুহূর্ত এনে দিয়েছেন তিনি। ৯৩ টেস্টের ক্যারিয়ারে ৫৭.৭৮ গড়ে রান করেছেন ৮০৩২। টেস্টে ৮ হাজার রান পূর্ণ করা প্রথম ক্রিকেটারও তিনি। ২৬ সেঞ্চুরির পাশাপাশি আছে ৫০টি হাফ সেঞ্চুরি।
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে তার করা অপরাজিত ৩৬৫ রানের ইনিংসটি ৩৬ বছর পর্যন্ত টিকে ছিলো টেস্টেও সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস হিসেবে। এটি ছিলো তার ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরিও। ১৯৯৪ সালে সেটি ভেঙে দেন তারই স্বদেশী ব্রায়ান লারা (৩৭৫)। (বর্তমানেও এই রেকর্ডটি ব্রায়ান লারার। অপরাজিত ৪০০ রান, ২০০৪ সালে।) টেস্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে কম বয়সী ট্রিপল সেঞ্চুরিয়ানও সোবার্স। ৩৬৫ রানের ইনিংসটি খেলার সময় তার বয়স ছিলো মাত্র ২১ বছর ২১৩ দিন। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এক ওভারে ছয় ছক্কা হাঁকানো প্রথম ক্রিকেটার এই বাঁহাতি মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান। ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেটে এই কীর্তি গড়েন তিনি। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সেঞ্চুরি ৮৬টি, হাফ সেঞ্চুরি ১২১টি।
আর বোলিংয়ে সোবার্স ছিলেন বাঁহাতি মিডিয়াম পেসার। আবার কখনো অফস্পিন কিংবা লেগ স্পিন করতেন। টেস্টে তার উইকেট সংখ্যা ২৩৫টি। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে উইকেট ১০৪৩টি। ব্যাট বলের মতো ফিল্ডিংয়েও সোবার্স ছিলেন অসাধারণ। মাঠের যে কোন জায়গায় অসাধারণ ফিল্ডিং করার দক্ষতা ছিলো যে কারণে অনেকেই তাকে ‘কমপ্লিট প্যাকেজ’ বলে আখ্যায়িত করতেন।
১৯৬৫ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন বার্বাডোজে জন্ম নেয়া সোবার্স। ১৯৭৪ সালে ২০ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারকে বিদায় বলেন এ কিংবদন্তি। ক্রিকেটে বিশেষ অবদানের জন্য ব্রিটিশ রানী তাকে নাইটহুড উপাধি প্রদান করেন। এ ছাড়াও অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন তিনি।

জ্যাক ক্যালিস

সর্বকালের-সেরা-অলরাউন্ডারসর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারের মুকুট নিয়ে গ্যারি সোবার্সের সাথে অদৃশ্য এক লড়াই আছে দক্ষিণ আফ্রিকার জ্যাক ক্যালিসের। যার যার যুগে সেরা ছিলেন উভয়ে; কিন্তু কে সর্বকালের সেরা সেটি অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। স্টিভ ওয়াহসহ বিখ্যাত অনেক ক্রিকেটার মনে করেন ক্যালিসই সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার।
টেস্ট ও ওয়ানডে- দুই ফরম্যাটের ক্রিকেটেই ১০ হাজারের ওপর রান জ্যাক ক্যালিসের। টেস্টে সর্বকালের সেরা রান সংগ্রাহকদের মধ্যে তিনি আছেন তিন নম্বরে (১৩২৯৮), আর ওয়ানডেতে সাত নম্বরে (১১৫৭৯)। ১৬৬ টেস্টে গড় ৫৫.৩৭। টেস্টে শচীন টেন্ডুলকারের পরই সেঞ্চুরি সংখ্যায় দ্বিতীয় তিনি (৪৫), হাফ সেঞ্চুরি ৫৮টি। ওয়ানডেতেও আছে ১৭টি সেঞ্চুরি, হাফ সেঞ্চুরি ৮৬টি। ৩২৮ ওয়ানডেতে গড় ৪৪.৩৬। ক্যারিয়ারের বেশির ভাগ সময় তিন নম্বরে ব্যাটিং করেছেন এই ডানহাতি। বোলার হিসেবে ছিলেন মিডিয়াম পেসার।
১৯৯৫ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষিক্ত ক্যালিসের টেস্ট ও ওয়ানডেতে উইকেট সংখ্যা যথাক্রমে ২৯২ ও ২৭৩টি। দুই ফরম্যাটে ১০ হাজারের ওপর রান ও আড়াই শ’ উইকেট আর কারো নেই ক্রিকেট বিশ্বে। ব্যাটিং বোলিং এর বাইরে ফিল্ডার হিসেবেও ক্যালিস ছিলেন সেরাদের একজন। টেস্টে ক্যাচ নিয়েছেন ২০০টি, ওয়ানডেতে ১৩১টি। স্লিপে তার দু’টি বিশ্বস্ত হাত যে কোন বোলারের জন্য ছিলো বড় আস্থা।
২৫টি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিও খেলেছেন কেপটাউনে জন্ম নেয়া এই সুদর্শন ক্রিকেটার। সেখানে ৬৬৬ রানের পাশাপাশি নিয়েছেন ১২টি উইকেট। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটের সেরা সাফল্য ১৯৯৮ মিনি বিশ্বকাপ জয়। সে আসরে সেরা ক্রিকেটার ছিলেন ক্যালিস। ২০০৫ সালে নির্বাচিত হয়েছিলেন আইসিসির বর্ষসেরা ক্রিকেটার।
দীর্ঘ ১৮ বছরের ক্যারিয়ার শেষ হয়েছে ২০১৪ সালের জুলাই মাসে। বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে কিছু আক্ষেপও আছে ক্যালিসের। দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে ৫টি বিশ্বকাপ খেলা এই কিংবদন্তির ছুঁয়ে দেখা হয়নি বিশ্বকাপ শিরোপা। ক্রিকেট থেকে বিদায়টাও সুখকর হয়নি। মাঠ থেকে ঘোষণা দিয়ে বিদায় নিতে পারেননি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দেশকে নেতৃত্বও দিতে পারেননি। তবু জ্যাক ক্যালিস ক্রিকেটকে যা দিয়েছেন তা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে ক্রিকেট ইতিহাসে।

কপিল দেব

সর্বকালের-সেরা-অলরাউন্ডারসেরা অলরাউন্ডারদের সংক্ষিপ্ত তালিকায় কপিল দেবের নামটিও রাখতে হবে। ভারতীয় ক্রিকেটের উত্থান তার হাত ধরেই। কপিল দেবের হাত ধরেই ১৯৮৩ সালে ভারত প্রথম জেতে বিশ্বকাপ শিরোপা। ব্যাটের চেয়ে বল হাতেই কপিল দেব ছিলেন বেশি আগ্রাসী। ১৩১ টেস্টে উইকেট ৪৩৪টি, আর ২২৫ ওয়ানডেতে ২৫৩টি। দারুণ ফার্স্ট বোলিংয়ে প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দিতেন হরিয়ানা হারিকেন খ্যাত কপিল। আবার ব্যাট হাতে লোয়ার অর্ডারে কখনো একাই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারতেন। টেস্টে ৮ সেঞ্চুরিতে ৫২৪৮ রান, আর ওয়ানডেতে এক সেঞ্চুরিতে ৩৭৮৩। ১৯৮৩ বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে ১৭ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ভারত যখন খাদের কিনারে, তখন ক্রিজে নেমে কপিল খেলেছিলেন ১৩৮ বলে ১৭৫ রানের অতিমানবীয় এক ইনিংস।

ইমরান খান

সর্বকালের-সেরা-অলরাউন্ডারপাকিস্তান ক্রিকেটের উত্থান ইমরান খানের হাত ধরে। দলকে এনে দিয়েছেন বহু কাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ শিরোপা (১৯৯২)। ব্যাট কিংবা বল হাতে দলকে টেনে নেয়ার পাশাপাশি ইমরান খান বিখ্যাত হয়ে আছেন তার জাদুকরী নেতৃত্বের জন্য। ভাঙাচোরা পাকিস্তান দলকে এক সুতোয় গেঁথে বিশ্বসেরা দলে পরিণত করা সম্ভব হয়েছে তার আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, দূরদর্শী চিন্তা আর নেতৃত্বের অসাধারণ ক্ষমতার জন্য। পাকিস্তান ক্রিকেটে এখনো তিনি ‘দ্য কাপ্তান’ হিসেবে পরিচিত।
১৯৭১ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক, আর অবসরে গেছেন বিশ্বকাপ ট্রফি জিতে ১৯৯২ সালে। ৮৮ টেস্টে রান ৩৮০৭ আর ১৭৫ ওয়ানডেতে রান ৩৭০৯। দুই ফরম্যাট মিলে সেঞ্চুরি ৭টি। বল হাতে টেস্ট উইকেট ৩৬২টি ও ওয়ানডেতে ১৮২টি। টেস্টে দ্রুততম ৩০০০ রান ও ৩০০ উইকেট দখলের রেকর্ড এখনো তার দখলে।
বর্তমানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এই কিংবদন্তি ক্রিকেটার। ক্রিকেট ছাড়ার পর রাজনীতিতে যোগ দিয়ে সেখানেও পেয়েছেন চূড়ান্ত সফলতা। আসল অলরাউন্ডারতো একেই বলে!

শহীদ আফ্রিদি

সর্বকালের-সেরা-অলরাউন্ডারআধুনিক ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় এন্টারটেইনারদের একজন পাকিস্তানের শহীদ আফ্রিদি। ক্রিকেটকে দর্শকদের জন্য আনন্দদায়ক করে তোলায় তার অবদান অনেক। মারদাঙ্গা ব্যাটিংই আফ্রিদির সবচেয়ে বড় পরিচয়। তবে লেগস্পিন বোলার হিসেবেও ছিলেন দারুণ কার্যকর। ৩৯৮ ওয়ানডেতে ৮০৬৪ রান ও ৩৯৫টি উইকেটই তার অলরাউন্ডার পরিচয়ের সার্থকতা। ব্যাট হাতে কখনোই ধারাবাহিক ছিলেন না; কিন্তু যেদিন জ্বলে উঠতেন একাই পাল্টে দিতেন ম্যাচের চিত্র।
টেস্ট খুব বেশি খেলেননি। ২৭ টেস্টের পর নিজেই অবসর নিয়েছেন। রান ১৭১৬ উইকেট ৪৮টি। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ৯৯ ম্যাচে ১৪১৬ রান আর ৯৮টি উইকেট বুমবুম আফ্রিদির। সব মিলে আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি ১১টি, হাফ সেঞ্চুরি ৫১টি। আইসিসির র‌্যাঙ্কিং চালু হওয়ার পর অনেকদিন ছিলেন শীর্ষে।

ইয়ান বোথাম

সর্বকালের-সেরা-অলরাউন্ডারইংল্যান্ডের এ যাবৎকালের সেরা তারকা। ব্যাট কিংবা বল- দুই ভূমিকাতেই ম্যাচ বের করে নিয়েছেন অনেকবার। ১০২ টেস্টে ১৪ সেঞ্চুরিতে ৫ হাজারের বেশি রান আর ৩৮৩ উইকেট। ১১৬ ওয়ানডেতে ২ হাজারের বেশি রান আর ১৪৫ উইকেট নিয়েছেন স্যার ইয়ান বোথাম। এক সময় ছিলেন টেস্টের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি। তবে পরিসংখ্যান দিয়ে সব সময় আসল চিত্রটা পাওয়া যায় না। মাঠের খেলায় ইয়ান বোথামের প্রভাব ছিলো অপরিসীম। ১৯৭৭ সালে ক্যারিয়ার শুরু করে অবসরে গিয়েছেন ১৯৯২ বিশ্বকাপ খেলে।

SHARE

Leave a Reply