Home বিজ্ঞান মহাবিশ্ব নাকি অসংজ্ঞায়িত বিশ্ব -তালহা ইবনে আলাউদ্দিন

মহাবিশ্ব নাকি অসংজ্ঞায়িত বিশ্ব -তালহা ইবনে আলাউদ্দিন

ছাদে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে শাহের নাজিম। ছাদে বসে আকাশের তারা দেখতে ভালোই লাগে তার। কী সুন্দর মিটমিট করে জ্বলছে তারাগুলো! দেখে মনে হচ্ছে আমাদের দেখে হাসছে। নাজিম মাঝে মাঝে এই মহাবিশ্ব নিয়ে চিন্তা করতে করতে হারিয়ে যায় কোন অজানা জগতে। নিজেকে কল্পনা করতে থাকে এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে। মাঝে মাঝে রাতেও ঘুমের মধ্যেও চিন্তা করতে করতে কথা বলতে শুরু করে। এ কারণে অনেক প্রবলেমে পড়তে হয়েছে তাকে।
এ মহাবিশ্বের তুলনায় নিজেকে অতি ক্ষুদ্র বলে মনে হয় শাহের নাজিমের। এত ক্ষুদ্র যেন একটি পিঁপড়াকে এক ট্রিলিয়ন বা দশ হাজার কোটি টুকরো করলে যে রকম আকার থাকার কথা নিজেকে তার চেয়েও অতি ক্ষুদ্র মনে হয়। এই মহাবিশ্বের বিস্তৃতি এত ব্যাপক যার পরিমাপ করা তো দূরের কথা, চিন্তা করাও মানুষের পক্ষে কোন দিনও সম্ভব নয়। একমাত্র মহান আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো পক্ষে চিন্তা করাও সম্ভব নয়। এসব চিন্তা করতে করতে এতই মগ্ন হয়ে গিয়েছিল যে নাজিমের পেছনে কখন একজন জ্বলজ্যান্ত মানুষ এসে দাঁড়িয়েছে তা খেয়ালই করলো না।
“এই বন্ধু, কী খবর? কী নিয়ে এত চিন্তা করছো? মিনিট তিনেক হলো তোমার পাশে দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু তুমি দেখলেই না। ব্যাপারটা কী?” দুষ্ট দুষ্ট চেহারা নিয়ে বলে উঠলো আসাদ।kk-chad
আসাদ নাজিমের খুব ভালো বন্ধু। বন্ধু বললে ভুল হবে, ঠিক যেন ভাইয়ের মতো। সুখে-দুঃখে, বিপদ-আপদে সবসময় এক সাথে থাকে। দেখে মনে হয়ে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। ওরা একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে। আসাদ ফিজিক্সে ও নাজিম কেমিস্ট্রিতে পড়ছে।
“না রে দোস্ত, তেমন কিছু না। এইতো আশপাশ জগৎ নিয়ে চিন্তা করছিলাম। ভাবনার এত গভীরে ছিলাম যে তুই কখন এসেছিস বুঝতেই পারিনি।” মুখে এক টুকরো হাসি রেখে বলে উঠলো নাজিম।
“তা কী নিয়ে চিন্তা করা হচ্ছে? আশপাশ জিন-ভূতদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিস না তো আবার?” আবারও দুষ্টামি ভাব নিয়ে বলে উঠলো আসাদ।
“দেখ ভাই, বেশি ফাজলামি করিস না। আমি আসলে একটা সিরিয়াস বিষয় নিয়ে চিন্তা করছি। তুই যদি চিন্তা করিস তাহলে বুঝতে পারবি আমরা আসলে কত বোকা। এই সামান্য পৃথিবীর জন্য কি না করছি।” একটু কঠোর কণ্ঠে বলে উঠলো নাজিম।
“স্যরি, আসলে আমি বুঝতে পারিনি। তা বিষয়টা একটু বুঝিয়ে বলবি?” স্বাভাবিকভাবে জিজ্ঞাসা করলো আসাদ।
“তাহলে আয়, আমি তোকে বুঝিয়ে বলছি। কিন্তু আমার কথার মাঝখানে কোন উল্টা পাল্টা কথা বলতে পারবি না। আর আমি যা জিজ্ঞাসা করব তার ঠিক ঠিক উত্তর দিবি। ঠিক আছে?”
“ওকে বাবা, এই আমি মুখ বন্ধ করলাম। তুই যা বলবি তাই হবে।”
“একটু গভীরভাবে চিন্তা কর, আমরা এখন কোথায় আছি?”
“কেন আবার তোদের ছাদের ওপর। এটা আবার কোন জিজ্ঞাসার বিষয় হলো নাকি?” বিরক্ত হয়ে উত্তর দিল আসাদ।
“আবার বেশি কথা বলছিস। আমি যা যা জিজ্ঞাসা করবো ঠিক ঠিক সেইগুলোর উত্তর দিবি। আর একটু বিরক্ত করলে কিন্তু আমি উঠে যাবো।” রাগান্বিত হয়ে বলে উঠলো নাজিম।
“স্যরি স্যার, আর হবে না।” মোলায়েম কণ্ঠে বললো আসাদ।
“এখন বল, ছাদ কোথায় আছে?”
“কেন আবার? বিল্ডিংয়ের ওপর।”
“বিল্ডিং কোথায় আছে? মানে কোথায় অবস্থিত?”
“উত্তরায়।”
“উত্তরা কোন বিভাগের মধ্যে?”
“ঢাকা বিভাগ।”
“ঢাকা বিভাগ কোন দেশে অবস্থিত?”
“বাংলাদেশে।”
“বাংলাদেশ কোথায় অবস্থিত?”
“পৃথিবীর মধ্যে।”
“তাহলে পৃথিবী, ঠিক আছে। পৃথিবীর ব্যাস কত?”
“৭৯২৬ মাইল।”
“আচ্ছা, ঠিক আছে। আমাদের সোলার সিস্টেমে মানে সৌরজগতের মধ্যে পৃথিবী অবস্থিত। তাহলে আমাদের সৌরজগতে কী কী আছে? মানে কোন কোন বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের সৌরজগৎ গঠিত?”
একটু নড়েচড়ে বসে প্রশ্ন করলো নাজিম।
“সৌরজগতে একটা নক্ষত্র আছে যাকে আমরা সূর্য বলি। বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন নামে আটটি গ্রহ আছে। এর মধ্যে বৃহস্পতি সবচেয়ে বড় এবং পৃথিবীর প্রায় ১১ গুণ মানে ৮৬,৮৮১ মাইল। এ ছাড়াও সৌরজগতে চাঁদের মতো ১৭৩টি উপগ্রহ আছে যেগুলোর অনেকগুলোই আকারে পৃথিবী থেকে বিশাল বড়। আছে পাঁচটি বামন গ্রহ। এ ছাড়াও আছে প্রায় সাত লাখের ওপর গ্রহাণু শিলা এবং কোটি কোটি ধূমকেতু।” এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে গেল আসাদ।
“তাহলে চিন্তা করতে পেরেছিস, শুধুমাত্র আমাদের সৌরজগৎ কত বিশাল? কত বড়? এতক্ষণ আমাদের সৌরজগৎ নিয়ে যে বর্ণনা দিলে সেই সৌরজগতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের দূরত্ব কত? বলতে পারবি?”
“কেন পারবো না। আমাদের সৌরজগতের দূরত্ব তিন বিলিয়ন মাইল মানে তিনশত কোটি মাইল।”
“হুম, ঠিক আছে। আরও একটা মজার বিষয় জানিস কি, আকাশে আমরা যে তারাগুলো দেখি তার মধ্যে নিকটতম তারা থেকে আমাদের সূর্যের দূরত্ব ২৫ ট্রিলিয়ন মাইল মানে ২৫০০০০০ কোটি মাইল। চিন্তা করা যায়?। যাই হোক, এখন বল আমাদের এই সৌরজগৎ কোথায় অবস্থিত? আমাদের এই সৌরজগতের মতো আরও কি কোন সৌরজগৎ আছে?” একটু গম্ভীর হয়ে প্রশ্ন করলো নাজিম।
“কেন থাকবে না। আমাদের মিল্কিওয়েতেই এই সৌরজগতের মতো আরও প্রায় দশ বিলিয়ন মানে এক হাজার কোটি সৌরজগৎ আছে। আমরা আকাশে যে লক্ষ লক্ষ তারা দেখি সেগুলোই সৌরজগৎগুলোর উপস্থিতি নিশ্চিত করে। মানে সেসব সৌরজগৎগুলোতে আমাদের মতো সূর্য আছে (যাদেরকে আমরা তারা হিসাবে দেখি) এবং এদের প্রায় অর্ধেক সংখ্যক তারকাতেই রয়েছে আমাদের সৌরজগতের মতো গ্রহব্যবস্থা। আর এসব তারকা ও সৌরজগৎগুলোকে একসাথে গ্যালাক্সি বা ছায়াপথ বলে। আমাদের সৌরজগৎ যে গ্যালাক্সিতে অবস্থিত তাকে আমরা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি বলি।” বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে গেল আসাদ।
“তাহলে চিন্তা কর। কী সাংঘাতিক অবস্থা, আমাদের সৌরজগতের মতো এক হাজার কোটি সৌরজগৎ নিয়ে একটা গ্যালাক্সি গঠিত। কেমন যেন চিন্তা করতেই আমার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে। তোর কি মনে আছে আমাদের গ্যালাক্সির মধ্যকার দূরত্ব মানে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের দূরত্ব কত?”
“ঠিক যেন মনে করতে পারছি না। চার ট্রিলিয়ন … না না পাঁচ ট্রিলিয়ন… না হয়নি। ঠিক কত যেন?” মাথা চুলকিয়ে বলতে থাকলো আসাদ।
“৫.৭ মিলিয়ন ট্রিলিয়ন মাইল মানে  ৫৭০০০০০০০০০০০০০০০০ মাইল!!!!!! গাণিতিক ভাষায় সংক্ষেপে বলে ৫.৭দ্ধ১০১৭। ঠিক আছে না?” অনেকটা অবাক হয়ে বললো নাজিম।
“ভাই, আমি আর চিন্তা করতে পারছি না। আমাকে মাফ কর। আমার মাথা হ্যাং হয়ে যাচ্ছে।” মাথা নাড়াতে নাড়াতে বললো আসাদ।
“আরে দাঁড়া, আরও বাকি আছে। এখনও তো মজার বিষয়টি বলিইনি। এখন বল এই এরকম কতগুলো গ্যালাক্সি আছে?”
“এক শ’ বিলিয়ন মানে দশ হাজার কোটি গ্যালাক্সি আছে। কি ঠিক আছে?” মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললো আসাদ। যখন কোন বিশাল চিন্তার মধ্যে পড়ে যায় তখন অনবরত মাথা চুলকাতে থাকে আসাদ।
“এই তো ঠিক আছে” আসাদের পিঠ চাপড়িয়ে বলে উঠলো নাজিম। “চিন্তা কর কী বিশাল অবস্থা। আর কয়েকশো থেকে কয়েক হাজার কোটি গ্যালাক্সির সমষ্টিকে বলে গ্যালাক্সি ক্লাস্টার। তাহলে চিন্তা কর, একটা ক্লাস্টারের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত দূরত্ব কত হতে পারে? তুই কি চিন্তা করতে পারছিস?”
“না রে ভাই আমি আর কিছু চিন্তা করতে পারছি না।”
“এক একটা ক্লাস্টারের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত দূরত্ব ৪ বিলিয়ন ট্রিলিয়ন মাইল বা ৪দ্ধ১০২১ মাইল (৪০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০ মাইল)। এ রকম অনেকগুলো ক্লাস্টার নিয়ে হয় সুপারক্লাস্টার। এরপর হয়তোবা অনেক সুপার ক্লাস্টার নিয়ে হবে সুপার সুপারক্লাস্টার। তারপর সুপার সুপার সুপারক্লাস্টার এইভাবে চলতেই থাকবে। আর মানুষের পক্ষে যা চিন্তা করে সম্ভব না।” এক নাগাড়ে বলে চললো নাজিম। খানিকটা দম নিয়ে আবার বলতে শুরু করলো, “এবার মজার বিষয়টি বলি, আমরা যা চিন্তা করছি বা দেখছি বিজ্ঞানীরা বলেছেন সেটা পুরো মহাবিশ্বের মাত্র চার ভাগ। মানে ১০০% এর মধ্যে শুধুমাত্র ৪%। আর বাকি ছিয়ানব্বই ভাগ আমরা চিন্তাও করতে পারছি না। কি আশ্চর্য! তাই না? সুবাহান আল্লাহ্! এই মহাবিশ্বকে কত বড় বা এর আয়তন কত আমাদের আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান দ্বারা আমরা চিন্তাও করতে পারছি না।”
“আসলেই, আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো পক্ষে জানা সম্ভব না। তাই আমাদের জন্য আমরা মহাবিশ্বকে অসংজ্ঞায়িত বিশ্ব বা অসীম বিশ্ব বলতে পারি। এর শেষ কোথায় ¯্রষ্টা বা আল্লাহ্ ছাড়া আর কেউ সে কথা জানে না, আর জানাও সম্ভব নয়। আসলে আমাদের কাছে যেটা অসীম আল্লাহর কাছে সেটা অতি ক্ষুদ্র একটা বিষয়।” অনেকটা আবেগে আপ্লুত হয়ে বললো আসাদ।
“আরও একটা মজার বিষয় কি জানিস, এই সমগ্র মহাবিশ্বের তুলনায় আমরা কত নগণ্য প্রাণী। এতই নগণ্য যে একটি পিঁপড়াকে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন বা দশ হাজার কোটি কোটি টুকরা করলে যে রকম আকার থাকার কথা নিজেকে তার চেয়েও অতি ক্ষুদ্র মনে হয়। তাহলে এ পৃথিবীতে আমরা এত হাঙ্গামা করি কিসের জন্য? দ্য বিগ ব্যাং তত্ত্ব মতে আজ থেকে প্রায় ১৩.৭ বিলিয়ন বছর বা প্রায় ১৪০০ কোটি বছর আগে এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে। আর আমরা মাত্র ৬০-৭০ বছর বেঁচে থাকি। আর মাত্র এই ৬০-৭০ বছরের জন্য আমরা কি না করি।’’ এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে গেল নাজিম। সত্যিই অবাক বিষয়। মহারহস্যের আঁধার এই মহাবিশ্ব, যা চিন্তারও বাইরে। কল্পনারও বাইরে। আসাদও জানে এসব কিন্তু নাজিমের মত এভাবে চিন্তা করে দেখেনি কখনো। নাজিমের সাথে কথা বলে আসাদের ভাবনার দিগন্ত খোলে গেল।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply to রবিউল ইসলাম Cancel reply