Home প্রচ্ছদ রচনা মেঘের ভেলায় শরৎ এলো -শরীফ আব্দুল গোফরান

মেঘের ভেলায় শরৎ এলো -শরীফ আব্দুল গোফরান

শরৎ আমাদের সবার চেনা। শরৎ একটা ঋতুর নাম, শরৎ অসংখ্য কবিতার নাম। শরৎ আকাশে সাদা মেঘের ভেলার নাম।
ষড়ঋতুর দেশ আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। ষড়ঋতুর তৃতীয় ঋতু শরৎ। আম-কাঁঠালের মিষ্টি গন্ধ শেষ হতে না হতেই তালের মদোগন্ধে ভরে যায় গাঁয়ের প্রতিটি ঘর। ভাদ্র-আশ্বিন এ দুই মাস শরৎকাল। অবশ্য ঋতু এবং মাসের এ প্রকারভেদ অন্যত্র প্রযোজ্য নয়। কারণ পৃথিবীর অন্য কোন দেশে ছয় ঋতু নেই। সেখানে তিন ঋতু। যেমন ধরো রাশিয়া। সেখানে বৃষ্টি হয় শীতকালে। শীতের ওখানকার সব পানি জমে বরফ হয়ে যায়। সহজেই অনুমান করা যায় শীতকাল। সে শীত হতে বাঁচতে পাখিরা পালিয়ে যায় দূর-দূরান্তে। আসে আমাদের বাংলাদেশেও। যাদের আমরা বলি অতিথি পাখি, বর্ষার আগে আগে গ্রীষ্মকাল। বৈশাখ এবং জ্যৈষ্ঠ মাসের এ দিনে ভীষণ রকমের গরম পড়ে। আকাশ থেকে যেন আগুন ঝরে। গ্রীষ্মকালীন ঐ নিষ্ঠুরতার দেয়াল ভেঙে স্বস্তি দিতে আসে বর্ষা। আষাঢ় দিয়েই বর্ষার শুরু। গাঁয়ের শিশুরা আষাঢ়ের বৃষ্টি ভেজার আনন্দ লুফে নেয়। আমিও যখন তোমাদের মতো ছোট্ট ছিলাম তখন বটতলার খালে কতো সাঁতার কেটেছি। ডুব দিয়েছি। বাঁশের সাঁকোর ওপর থেকে লাফিয়ে পড়েছি। ছৈলা পানিতে সাঁতার কেটে কম আনন্দ পাইনি তখন।
তারপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে বৃষ্টির ধারা। এক সময় এমন হয় সকাল, দুপুর, বিকেল, রাত শুধু বৃষ্টি আর বৃষ্টি। খাল বিল পানিতে থৈ থৈ করে। মাঠঘাট সব ভরে যায় কানায় কানায়। a-a1
আষাঢ় মাস শেষ হয়ে শ্রাবণের ক’দিন পার হয়ে গেলে আকাশ আর বিলের অবস্থা পাল্টে যায়। এক শান্ত, সমাহিত ভাব নেমে আসে। তখন আকাশে সাদা সাদা পেঁজা তুলোর মতো মেঘ ভেসে বেড়ায়। বিলের পানির খোলা ভাবটা কমে যায়। পানির ঢেউ কম থাকে। মৃদু বাতাসে তখন বিলে পানি কাঁপে মনে হয় যেন চিকন হেউলি পাতার নকশি গোগলা।
ভাটার টানে তখন প্রচুর কচুরিপানা নামে। তখন আমনের রোপা রোপণ চলে। মাঠে মাঠে কৃষকের সমাগম। এ সময় মাঠের কৃষকরা গানের সুরে এলি গায়। অর্থাৎ জারি গান গায়। সকাল হলেই মরিচ পোড়া আর শুঁটকি ভর্তা দিয়ে পেট ভরে পান্থা ভাত খায়। তারপর কাছা দিয়ে নামে ক্ষেতে, রোপা রোপণ করতে। কোথাও কোমর পানি, কোথাও হাঁটু পানি আবার কোথাও আরও কম। তখন কৃষকরা কচুরিপানা নামিয়ে দেন খালে, খাল বেয়ে এসব কচুরিপানা নেমে যায় বড় বড় বিলে। যেখানে অনেক পানি। বিলে এ মৌসুমে কোন ধান লাগানো যায় না। সব বিল মাছে ভরে যায়। বিলে এতো কচুরিপানা জমে যায় মনেই হয় না এটা একটা বিল। মনে হয় যেন বিশাল একটা দীঘি। কচুরিপানার বেগুনি ফুল তখন বাতাসে দোলে। ঢেউয়ের দোলায় বাহারি সে দৃশ্য মন কেড়ে নেয়।
এ সময় কিছু কিছু লোক ডিঙি নৌকা আর হোলনাডাল নিয়ে নামে বিলে। কচুরিপানার নিচে জাল দিয়ে চিংড়ি মাছ ধরে। ধরে নানা জাতের মাছ। সারা বিলে তখন একটা মেলা মেলা ভাব জমে যায়। আমি যখন গাঁয়ে ছিলাম তখন তালের কোদা ভাসিয়ে লগি মেরে চলে যেতাম বিলে। রঙ্গু, রহিস, কালাসিয়া, আলস্যার কতো মাছ ধরেছি। এসব দৃশ্য মনে পড়লে আরও আনন্দ পাই। মন তখন নেচে ওঠে।
দুপুর হলে যখন ক্ষিধায় পেট চোঁ চোঁ করতো তখন ডুলা ভর্তি মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরতাম মাছ দেখে মা কতো যে খুশি হতেন।
শ্রাবণ শেষ হতে না হতেই বাতাসে বাতাসে ভাদ্রের আগমনবার্তা আসতে থাকে। ভাদ্র মাসের দুপুর যেমন আনন্দের, আবার ভেপসা গরমও। দুপুর হলে গোসল সেরে তাল দিয়ে পেট ভরে ভাত খেতাম। মা বলতেন, এখন বাইরে বের হয়ো না। আরাম করে ঘুমিয়ে পড়ো। কিন্তু এতো গরমে কি ঘুম আসে? একদিকে ভাদ্রের ভেপসা গরম, অন্য দিকে তালের গরমতো আছেই। একটু ঠান্ডার জন্য উত্তর খালের বাঁশের সাঁকোর ওপর গিয়ে বসে থাকতাম। আমি, কালা, চান্দু, আনার রহিম মিলে গল্প করতাম। তখন ছোট ছোট ঢেউয়ের ওপর দিয়ে ভেসে আসা ঠান্ডা বাতাস শরীর জুড়িয়ে দিতো। ভুলে যেতাম গরমের কথা। আবার ঝির ঝির করে বৃষ্টি আসতো। গাঁয়ের লোকরা বলতো, ‘হিয়াল দড়াইন্যা জড়ি আইছে’। তখন আমরা এক দৌড়ে চলে আসতাম কাচারি ঘরে। হাবি কাকু কাচারি ঘরে বসে বসে, আন্তা চাই, হারাল, এসব মাছ ধরার সরঞ্জাম তৈরি করতেন, আর পুরনো দিনের কিচ্ছা বলতেন। আমরাও সারা বিকেল অবধি আড্ডায় মেতে থাকতাম। পুকুর পাড়ের তালগাছটা থেকে যখন ধপাস করে একটা পাকা তাল পড়তো তখন সবাই দৌড় দিতাম। প্রতিযোগিতা লেগে যেতো তখন। কে আগে গিয়ে বোগল দাবা করবে পাকা তালটি। কি আনন্দই না হতো তখন। a-a2
এখনও গায়ে ভাদ্র আসে। পুকুর পাড়ের লম্বা তালগাছ থেকে তাল পড়ে। কেউ হয়তো কুড়িয়ে নেয়। আবার কারও অজান্তে হয়তো খালের পানিতে ভেসে যায় দূর-দূরান্তে, অজানার উদ্দেশে। ওসব কথা যখন মনে পড়ে তখন নিজের মনের অজান্তে হারিয়ে যাই অচিনপুরে। মন চলে যায় দোয়াপুকুরের উত্তর পাড়ে তালগাছটার নিচে। আমি এক সময় গাঁয়ে ছিলাম। এক্কেবারে গাঁয়ে। অনেক বছর যাবৎ আমি গাঁয়ে ছিলাম। আমার জন্মই গাঁয়ে। তখন ছিলাম একটি গাঁয়ের শিশু। আমার শৈশব কৈশোর কেটেছে গাঁয়ের আলো বাতাসে। এ সময়টি ছিল আমার জীবনের মধুময় সময়।
আমি বড় হয়েছি গাঁয়ের হাওয়ায়। গাঁয়ের আদরে। কিন্তু আজ শহরে এসে এর অনেকটা বুঝতে পারি না। এই শহরে আমি অনেক কিছু টের পাই না। কখন আসে শরৎ, কখন চলে যায় ভাদ্র-আশ্বিনের বৃষ্টিমাখা হাসি। বুঝতে পারি না তালের মদোগন্ধ। মায়ের হাতে তৈরি তালের পিঠা খেতে এখন আর কেউ ডাকে না। গাঁয়ের রাখাল ছেলে ওমর আলী এখন আর ডাকে না জালা ক্ষেতে মাছ মেরে হাডুডু খেলতে। কারণ এই শহরে তো আর শরৎ নেই, ভাদ্র নেই, নেই আশ্বিনের দূর্বাঘাসের শিশিরমাখা হাসি। খালি পায়ে জড়িয়ে ধরে না শিশির কণা। দেয় না পায়ের তালুতে কাতুকুতু।
এই শহরে মন ছোটে না প্রকৃতির কাছে। মন ছোটে না ধানের ক্ষেতে। মন খোঁজে ভাদ্র মাসের তালের মদোগন্ধ। মন খোঁজে মায়ের হাতে অতি যতেœ তৈরি তালের পিঠা। মা কখনও কলাপাতায় তাল মাখানো আটা জড়িয়ে পাটিসাপটার মতো, আবার কখনও বড় বাসনে তালের সাথে চালের গুঁড়া মিশিয়ে বড় একটা মিটার বানিয়ে কেটে কেটে খেতে দিতেন। এসব স্মৃতি এখনও মনে পড়ে। মা এ পিঠাকে বলতেন সানকি পিঠা। কিন্তু এখন আর এসব খুঁজে পাই না।
ভোর হলে মা ঘুম থেকে ডেকে দিতেন। বলতেন, তাড়াতাড়ি উঠে মক্তবে যাও। তখন বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধপাস করে উঠতো। বিছানা ছেড়ে উঠতেই মা বাসন; ভর্তি সানকি পিঠা খেতে দিতেন। ওসব খেয়ে ঘর থেকে বের হতাম। তারপর উঠান, রাস্তা এরপর দেখা হতো শরতের সাথে। যেতে যেতে প্রাণ ভরে উপভোগ করতাম।
আমি তো ছিলাম গাঁয়ের কিশোর। গাঁ যেন আমার মা। মুরগাঁও গ্রাম যেন আমার হৃদয়। ভালোবাসার স্থান। এ জন্যই আমার বুঝতে দেরি হতো না কখন। আসে ভাদ্র, কখন আসে আশ্বিন। কারণ আমিতো শরৎ খুঁজতাম, নবান্ন খুঁজতাম। আমি খুঁজতাম বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ ভাদ্র। আমি গুনতাম গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত।
তোমরা যারা গ্রামে থাকো, তারা ভাদ্র মাসের চিত্র দেখো, তাল পড়ার ধপাস শব্দ তোমাদের কানে ভেসে আসে। মন ভরে তালের গন্ধ নিতে পারো। প্রাণ ভরে খেতে পারো মায়ের হাতে তৈরি নানান পিঠে। তোমরা সবাই বুঝতে পারো। কারণ গ্রামে যে প্রাণ আছে। জীবন আছে। তাহের মুন্সীর সুরেলা কণ্ঠে ভেসে আসা ফজরের আজান ধ্বনি- আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম। a-a3
আমি যখন গ্রামে থাকতাম, তখন ক্ষেতের আইল ধরে হাঁটতাম। ক্ষেতের কোমর দোলানো সবুজ ধান দেখে মন ভরে যেতো। মন আনন্দে নেচে উঠতো। যখন পশ্চিম আকাশে সূর্য হেলে পড়তো তখন ধীরে ধীরে মিষ্টি রোদ ছড়িয়ে পড়তো আমার গাঁয়ের ওপর। আকাশের দিকে তাকালে মনে হতো সাদা সাদা মেঘ যেন পাহাড়ের মতো সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে হাত নেড়ে ডাকছে, বলছে- ঐ বালক উঠে এসো। প্রাণটা জুড়িয়ে নাও।
এখনও যখন একা একা থাকি তখন উড়ে যায় দূর গাঁয়ে। মনের অজান্তে হারিয়ে যাই গাঁয়ের মেঠো পথে। গাঁয়ের বনবনানীতে শীতল বাতাস গায়ে মেখে নিতে ইচ্ছে করে। আবার কল্পনায় ধোয়াপুকুর পাড়ের লম্বা তাল গাছটার টসটসে লাল তাল পড়ার শব্দে চেতন ফিরে পাই। চলো না আমরা গাঁয়ে যাই, শরৎ দেখি ভাদ্র দেখি। আশি^নের সাথে কোলাকুলি করে প্রাণ জুড়াই।

SHARE

2 COMMENTS

  1. ami Atghoria thana, pabna jala takay bolsi. amr request ta holo apnadar posnar ans ta email a patanor niom ta jodi janatan taholay onak uopokar hoto. Assalamualikum valo takban

Leave a Reply to alamin Cancel reply