Home স্মরণ কবি মতিউর রহমান মল্লিক ও শিশুতোষ রচনা

কবি মতিউর রহমান মল্লিক ও শিশুতোষ রচনা

 আফসার নিজাম#

আমি আমার গাঁয়ের বাড়ি
যাই যখনই
ঠিক তখনই
মাটির কান্না শুনতে পাই;
যত দূরেই রই না কেনো মায়ের মতো
গাঁ যে-আমায় ভুলতে পারে নাই।

সুন্দরী গাছে ভরা সুন্দরবন,
ভরে না দু’চোখ দেখে, ভরে নাতো মন
অগণন সারি সারি সমান সারি
অনন্তকাল ধরে রয়েছে দাঁড়ি।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পরানভূমি সুন্দরবন। এই সুন্দরবনের কাছেই বাগেরহাট। যেখানে সুন্দরবনের সৌন্দর্য এসে পাপড়ি মেলে। বাগেরহাট ছিলো পীর খানজাহান আলী রহ. (খান আল আযম উলুঘ খান-ই-জাহান) এর খেলাফত্ব। তিনি ছিলেন সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহর খান-ই-জাহান পদবিধারী একজন সেনানায়ক। তিনি এখানে স্বাধীন রাষ্ট্রগঠন করেন এবং তার নাম রাখেন খলিফাবাদ। খলিফাবাদ নামটি আসে খলিফা বা খিলাফত শব্দ থেকে। আর বাগেরহাট নামটি আসে খানজাহান রহ. একটি বাগ (ফার্সি শব্দ যার অর্থ বাগান) বা বাগিচা থেকে। এ বাগ শব্দ থেকেই বাগেরহাট হয়েছে। এই অঞ্চলে রাজত্ব পরিচালনা হতো দরবার হল বা ষাটগম্বুজ মসজিদ থেকে। খান জাহান রহ. এতদঞ্চলে আবাসিক ভবন, রাস্তাঘাট দিয়ে সজ্জিত করেন এবং এলাকার মানুষের সুপেয় পানির জন্য বহু দীঘি খনন করেন। তার এ খলিফাবাদ পরিচালিত হতো অনেক মুল্লুকে বিভাজিত হয়ে। সেইসব মুল্লকের অধিকর্তা যারা ছিলেন তারা হলেন মল্লিক। মনে করা হয় বারুইপাড়া মুল্লুকে অধিকর্তা ছিলেন যে মল্লিকরা তাঁদেরই বংশধর কবি মতিউর রহমান মল্লিক। যারা ছিলেন এতদঞ্চলে শিক্ষিত, ধার্মিক, সমাজসেবক এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।
এই বারুইপাড়া গ্রামে ১৯৫৬ সালের ১ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন কবি মতিউর রহমান মল্লিক। তাঁর বাবার নাম মুন্সী কায়েমউদ্দীন মল্লিক এবং মাতার নাম আছিয়া খাতুন। মুন্সী কায়েমউদ্দীন মল্লিক ছিলেন এলাকার শিক্ষক ও কবিয়াল। বাংলা আরবি, ফারসি ও উর্দুভাষায় তাঁর ছিলো ব্যুৎপত্তি। আর হাতের লেখাও ছিলো মুক্তার মতো ঝকঝকে। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী শিক্ষিত এই মানুষটি ছিলেন সজ্জন, উদার, সরল ও দানশীল। যে সিলসিলা তার উত্তরপুরুষ পর্যন্ত প্রবহমান আমরা দেখতে পাই। যাঁরা কবি মতিউর রহমান মল্লিককে দেখেছেন তারা জানেন কবি নিজের সকল কিছু উজাড় করে অন্যের জন্য বিলিয়ে দিতেন। শিশুরা তাঁর কাছে এলে ঋণ করে হলেও তাদের মজার মজার খাবার, বই, উপহার দিতেন।
কবি মতিউর রহমান মল্লিক যেমন সারাদেশে কবি হিসেবে পরিচিত তেমনি তাঁর আপন বড়ভাই এলাকায় কবি সাহেব হিসেবে পরিচিত এবং তাঁর চাচা এলাকায় সাংস্কৃতিক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ছিলেন একাধারে গীতিকবি এবং জারি গান রচয়িতা। কবির আম্মা সুরেলা কণ্ঠের অধিকারী ছিলেন। তিনি মায়ের কোলে বসে সুরেলা কণ্ঠে কুরআন তেলাওয়াত শোনতেন। গান, গজল ও আঞ্চলিক মেয়েলী গান করতেন। মায়ের সেই সুরেলা কণ্ঠ কবি মতিউর রহমান মল্লিকের কণ্ঠে এসে আশ্রয় নেয়। তাই শিশুকাল থেকেই তাঁর কণ্ঠের জাদুতে বিমোহিত হয় পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের এই বেড়ে ওঠা কবি মতিউর রহমান মল্লিক মক্তব, মাদরাসায় সাংস্কৃতিক পরিপমন্ডল তৈরি করেন। এলাকায় ফুটবল টিম তৈরি করে ছেলেদের মাঝে সাংগঠনিক পরিচয় তুলে ধরেন। আর ফাইনাল খেলার দিন ফুটবল খেলার সাথে সাথে গান গজলেও মাতিয়ে দিতেন তিনি। এ সময় তিনি নজরুলের মতো ইসলামী গান লেখা সুর করা গাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখতেন।  ইসলামিক আঞ্চলিক গানের সাথে সাথে আধুনিক ইসলামী গান লেখা, সুর করা ও গান পরিবেশন করে সাংস্কৃতিক ময়দানে নতুন জোয়ার আনেন।
শিউলি যেমন খুব সকালে
সাজায় বনোতল,
তেমনি আমি সকাল হলেই
বাড়িয়ে মনোবলÑ
নিজেই নিজের ঘুম তাড়াবো
করবো যা দরকারি,
মন লাগিয়ে মনের মতোই
সাজাবো ঘরবাড়ি।
বা তিনি বলেন,
পথের মত সই যেন গো
সকল অবহেলা
নদীর গতি নিয়ে আমার
যাক কেটে যাক বেলা
রবির মতো নেই যেন গো
সিদ্ধান্ত সঠিক ॥

কবি মতিউর রহমান মল্লিকের সহযোগী, পিয়ারের দোস্ত, আন্দোলনের ভাই কবি আমিনুল ইসলাম। বরিশালে বাড়ি। দু’জনের মধ্যে যে গভীর সম্পর্ক তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে বন্ধুর বোন আইরিন পরে কথাসাহিত্যিক সাবিনা মল্লিককে জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করেন। চমৎকার এই বন্ধুত্বে বন্ধন চিকালের মতো একীভূত হলো। কবি মতিউর রহমান মল্লিকের পরিবারের মতোই কবি আমিনুল ইসলামদের পুরো পরিবারই সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত। বোন আইরিন (সাবিনা মল্লিক) কথাসাহিত্যিক, ছোটভাই কবি শাকিল রিয়াজ, কবি নাঈমুল ইসলাম মাহিন, ছোট দুই বোনও কণ্ঠশিল্পী।
কবি আমিনুল ইসলামের পরিবারের ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের নিয়ে তার ভালোবাসার অন্ত নেই। কবির মন ছিলো সহজ সরল ও শিশুসুলভ। শিশু-কিশোরদের সাথে সহজেই ভাব জমে উঠতো তাঁর। তারই পরিপ্রেক্ষিতে দেখি তার ছোটদের নিয়ে নানা রকম রচনা :
টিভি দেখবে? দেখো না হয়Ñ
কিন্তু একটু কম দেখো,
নইলে রাতের ঘুমের ভেতর
আস্ত একটা যম দেখো।

বা তিনি বলেন,
সুমাইয়া বেড়ে ওঠে সাগর ঘিরে,
তাহেরার সাথে থাকে আকাশ বুঝি;
জুম্মি ও নাজমির দু’চোখে আশা,
মুন্নার বুক ভরা আলোর পুঁজি।

কবি যেমন ছিলেন আন্দোলনমুখী তেমনি ছিলেন হাস্য-রসিকতায় ভরপুর আনন্দপুরুষ। তিনি ঠাট্টার ছলে শিক্ষামূলক হাসি ছড়িয়ে দিতেন সবার মাঝে।
খুদে মরিচ ক্ষুদ্র তবু
ভীষণ রকম ঝাল তাতে,
একটুখানি চিবাও যদি
জ্বলে ভীষণ গাল তাতে।
বা তিনি বলেন,
ভালো নয়Ñ    বাড়াবাড়ি
আড়াআড়ি,    কাড়াকাড়ি,
মারামারি    করাটা!

ভালো নয়Ñ চড়াচড়ি,
পড়াপড়ি    চোরাচুরি,
ছোরাছুরি    ধরাটা!

ভালো শুধুÑ    ভালো হওয়া,
ভালো মতো    ভালো হওয়া একদম।
ভালো শুধুÑ    আলো হওয়া
আলোকিত    আলো হওয়া একদম।

তিনি তাঁর সন্তানকে নিয়ে দারুণ দারুণ লেখা লিখেছেন, যে লেখা সবার জন্যই হয়ে উঠেছে আনন্দ ও শিক্ষণীয়
পাপা-বাবা ভাল্লাগে না
আব্বু ভালোই লাগে,
মাম্ না বলে আম্মু বললে
মনের আবেগ জাগে।

মুন্নার পান্ডাটা তুলো দিয়ে বানানো
কিনে দিয়েছিল যেটা মুন্নার মা-নানু।

নাম নিয়ে তার সেকি খেলা, শিশুদের চেহারা, সৌন্দর্য কোনো কিছুই বাদ যায়নি তার খেলা থেকে।
তানিশার নাম বেশ,
মিষ্টি ও দাম বেশ,
দুষ্টুর একশেষ
চালাকিতে শেষমেশ
দারুণ পাকা,
তানিশাকে ছেড়ে দূরে যায় না থাকা।

কোঁকড়া চুলের সোনামণির
হাসি মুক্ত ঝরা,
কান্না যে-তার বাঁশির সঙ্গে
সানাই যুক্ত করা।

সুন্দর নাম        পায় খুব দাম;
ঠিক সব সুন্দর যেমন তা পায়।
সুন্দর নাম        ছড়ায় সুনাম
শহর নগর থেকে বহুদূর গাঁয় ॥

আরো সুন্দর করে আজমের নাম
কি করে যে রাখা যায়,
কি ভাবে যে আঁকা যায়,
ভাবতে ভাবতে দেখি ছুটে গেছে ঘাম!

এই অসাধারণ গীতিময়তার কবি আমাদের ছেড়ে জান্নাতের পথে উড়াল দিয়েছেন গত ১২ আগস্ট ২০১০ সালে, ১ রমজান সৌভাগ্যময় রাতে। জান্নাতের রঙিন মেঘের পালকিতে চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আমরাও তাঁর মতো হবো আর বলবো-
রঙিন মেঘের পালকি চড়ে,
চায় হারাতে হাওয়ার জোরে,
ভোরের আলোর সরোবরে
এক নিমিষেই অদ্য।

SHARE

Leave a Reply