Home গল্প খাঁচায় বন্দী স্বাধীনতা

খাঁচায় বন্দী স্বাধীনতা

 মুহাম্মদ ইয়াছিন আরাফাত #

Bondhi-Kasaছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল। ছোট মামার একটি ময়না পাখি ছিল। বাড়ির উঠানের এক কোণে চিলে কোঠায় চমৎকার খাঁচায় বন্দী থাকতো পাখিটি। ছোট মামা তার সবচেয়ে প্রিয় এই পাখিটিকে আদর করে ময়না বলে ডাকতো। মামা যখনই বাইরে থেকে বাড়ি ফিরতো মামার কণ্ঠ শুনে তাকে উদ্দেশ করে ময়না পাখিটি একটি বিশেষ শব্দে শিস দিতো। মামা খাঁচার পাশে এসে পরম মমতায় ময়নাকে খাবার দিতো। কথা বলতো। মামার প্রতিটি কথায় প্রতি-উত্তর করে সায় দিতো ময়না।
পুরো বাড়িতে ময়না হয়ে উঠেছিল মায়ার প্রতীক। সবাই ময়নাকে আদর করে খাবার দিতো, কথা বলতো। ময়নাও সবার কথায় সায় দিত। যখনই আমি মামাদের বাড়ি বেড়াতে যেতাম ময়নার সাথে খেলায় মেতে উঠতাম। বলা যায় মামাদের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার উদ্দেশ্যই ছিল ময়নার সাথে খুনসুটি করা।
একদিনের ঘটনা। মামার বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে দেখলাম ময়না আর আগের মত আমার কথায় সায় দিচ্ছে না। আমার দেয়া খাবার খাচ্ছিলো না। যতোই অঙ্গভঙ্গি করে ময়নাকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করলাম কোনই কাজ হচ্ছিল না। শেষে ছোট মামাকে ডেকে ময়নার অবস্থা জানালাম। ছোট মামা যতই চেষ্টা করলেন ময়না সায় দিল না। ময়নার আচরণে ছোট মামাও চিন্তিত হয়ে পড়লেন। যে ছোট মামার সকল ভালবাসা বরাদ্দ ছিল ময়নার জন্য, ছোট মামার উপস্থিতি টের পাওয়া মাত্রই যে ময়নার কন্ঠে ছোট মামার উদ্দেশে  বিশেষ শিস বেজে উঠত, সে  আজ কিনা কোনোভাবেই ছোট মামার ডাকে সায় দিচ্ছে না। বরং ময়না চুপচাপ পড়ে রইল। বিমর্ষ বিধ্বস্ত ময়না খাবার খাওয়া বন্ধ করে দিলো। বিষয়টি বাড়ির সবার আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ালো। অন্যদিকে ময়নার চিন্তায় ছোট মামার ঘুম হারাম হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। কবিরাজ, বৈদ্য কারো কাছে যাওয়া বাদ রাখলেন না ছোট মামা। ছোট মামার টেনশন দিনদিন বাড়তে লাগল। ময়না যদি কোনো খাবারই গ্রহণ না করে তাহলে তো তাকে বাঁচানো কঠিন। দিন দিন শ্রী হারা হচ্ছে ময়না। প্রাণোচ্ছল ময়না এখন জড়থড় অবস্থায় পড়ে থাকে। ময়না শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছিল দিন দিন।
এ বিষয়ে বড় মামার কখনো আগ্রহ দেখিনি। পুরো বাড়িতে এই একজনকেই দেখতাম ময়নার ব্যাপারে আগ্রহহীন। মাঝে মধ্যে দেখতাম বড় মামা ছোট মামাকে ডেকে ময়নাকে ছেড়ে দেয়ার জন্য বলতেন, বলতেন বনের পাখিকে বনে ছেড়ে দিয়ে তার স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিতে। মামা সব সময়ই বলতেন ‘বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’। ছোট মামা বলতো, ময়নাকে তো আমি খাবার দিই, আদর করি, যতœ করি, আমার সব ভালোবাসা উজাড় করে দিই ময়নার জন্য। প্রতি-উত্তরে বড় মামা বলতেন, খাঁচায় বন্দী রেখে যতœ, আদর আর ভালোবাসা ঢেলে দিলেও তাতে কোন সুখ নেই। কারণ প্রকৃত সুখ স্বকীয় স্বাধীনতার মাঝে। খাঁচায় বন্দী স্বাধীনতা প্রকৃত অর্থই পরাধীনতা। পরাধীনতার শৃঙ্খলে কে আবদ্ধ থাকতে চায় বলো? ময়নার সুখ তো তার ডানা মেলে উড়ে চলার মাঝে, তার স্বাধীনতা এ ডাল থেকে ঐ ডালে উড়ে বেড়ানোর মধ্যে বরং খাঁচায় বন্দী রেখে পরম মমতায় সুখ দেয়ার চেষ্টা, গরু মেরে জুতা দানের সমতুল্য।
বড় মামা ছোট মামাকে বলতেন, তুমি যে রকম মুক্ত স্বাধীন বাতাসে বিচরণ করতে ভালোবাস, তোমাকে যদি খাঁচায় বন্দি রেখে ভাল ভাল খাবার পোশাক দিয়ে সুখী করার চেষ্টা করা হয়, খাঁচায় বন্দিত্বের সুখ-স্বাধীনতা তোমার কেমন লাগবে? ছোট মামা সেই দিন বড় মামার কথার জবাবে আর কি বলেছিলেন আমার মনে নেই। তবে এইটুকু মনে আছে- সবচেয়ে আদরের সেই প্রিয় ময়না পাখিটিকে খাঁচা থেকে মুক্ত করে স্বাধীন আকাশে উড়ে চলে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। যে ময়না পাখিটি মন মরা ছিল, মুষড়ে পড়ে ছিল খাঁচায়, জানালা খুলে দেয়ার সাথে সাথে সেদিন ময়না সব দুঃখকে পায়ে দলে যেভাবে মুক্তির উচ্ছ্বাসে ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে গিয়েছিল তা ছিল সত্যিই চমৎকার। উফ! কী দারুণ ছিল পরাধীনতা থেকে মুক্তির মহেন্দ্রক্ষণটি।

SHARE

Leave a Reply