Home নাটিকা পাঁচ পুতের বাপ রজব আলী -হুসনে মোবারক

পাঁচ পুতের বাপ রজব আলী -হুসনে মোবারক

ফজলুর রহমান জুয়েলের ‘রজব আলী তিন পুতের বাপ’ উপন্যাসের ছায়া অবলম্বনে নাটিকা

প্রথম দৃশ্য
(রজব আলী একটি লাঠি হাতে নিয়ে পেছন পেছন দৌড়াচ্ছে আর তার বউকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করছে। বউ মার খেয়ে দৌড়ে পালাচ্ছে।)

রজব আলী : অহন দৌড়াস ক্যা, খাড়া কইতাছি, তরে আইজ দেইখ্যা লিমু। কত বড় লাট সাহেবের মাইয়্যা তুই। আমার মুখে মুখে কথা কয়।
(রজব আলীর বউ দৌড়ে গিয়ে একটা ঝোপের মধ্যে বসে জোরে জোরে হাঁপাচ্ছে, রজব আলী পেছন দিক থেকে তার চুলের মুঠি ধরে)
রজব আলী : কই লুকাবি। তুরে আইজ জানে মাইরা ফালামু।

(চা দোকানের পাশে কয়েকজনের আলাপচারিতা)
চান মিয়া : দেখলা আন্তু মিয়া, তোমার চাচা কেমন খেপছে। তোমার চাচীরে একবারে আখলাক পুরের রাস্তায় নিয়া তুইল্যা দিয়াইছে।
আন্তু : কামডা বাহাদুরির হইলেও এর মধ্যে একটা অসভ্যতা আছে।
কলিম : যার নাই কোন জাততুড়ি, বউ পিডাইয়্যা হে করে বাহদুরি।
চান মিয়া : রজব আলীর কিন্তু খালি বউরে শাসনে রাখনের বাহাদুরিই না। জোয়ান পাঁচ পুতের বাপ রজব আলী।

(রজব আলীর সেজো ছেলে নীরু মিয়ার আগমন। সবাই নড়ে চড়ে বসে।)
নীরু মিয়া : কী খবর কলিম কেমন আছ? চান মিয়া চাচা, কী খবর। এ্যাই আন্তু, বাড়িত আইস, তুর সাথে কথা আছে।

(দোকান থেকে কিছু একটা কিনে চলে যাবে নীরু মিয়া)
(মিলন বাবু ও অনীল বাবু দুই সাংবাদিক রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন।)
মিলন বাবু : স্যার এটা কি সেই মহিলা না? যাকে আমরা সকালবেলায় ঘাসের চেঙ্গরি মাথায় লয়ে হাঁক পাঁক করে হাঁটতে দ্যাখছিলাম?
অনীল বাবু : বিষয়টা বুঝলা?
মিল্টন : আমাদের অত বুঝে লাভ নেই স্যার। আমরা যে মতলব নিয়ে এসেছি, সেটা নিয়েই ব্যস্ত থাকি। চলুন স্যার হাঁটি।
অনীল : না-না। ঘটনাটা বুঝতে হবে। আচ্ছা, দৌড়ে যাবার সময় মহিলাটিকে খুব লজ্জিত ও ফরিয়াদি মনে হয়েছে কি?
মিল্টন : সে রকম কিছুই মনে হয়নি। দৌড়ে যাওয়ার সময় পালিয়ে আসা শেয়ালের মতো কেবল পেছনে, ডানে ও বামে বারবার মুখ ঘুরিয়ে তাকিয়েছে।
অনীল : আচ্ছা, যে লোকটি লাঠি নিয়ে পিছু পিছু দৌড়াচ্ছিল তার হাবভাব কেমন?
মিল্টন : স্যার, আমাদের অত বুঝে লাভ নেই। চলুন হাঁটি।

(হাঁটতে হাঁটতে)
অনীল বাবু : এই গেঁও অশিক্ষিত মানুষের মধ্যে আমাদের হাজার বছরের সেই চিরায়ত বাঙালি চেতনা জাগিয়ে তুলতে হবে। পয়লা বৈশাখের শিক্ষাকে এদের শেখাতে হবে সঠিকভাবে।
মিল্টন : স্যার হাজার বছরের আগে তো এখানকার সমাজ বিস্তৃত ছিল শোষণ আর কুসংস্কারে। স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলার যুগও তো সেটাই ছিল। আপনি এদের সে যুগে ফিরিয়ে নিতে বলছেন স্যার!
(অনীল বাবু কিছু না বলে থমকে দাঁড়াবে, রজব আলীর বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করবে।)
অনীল বাবু : মিল্টন, ডিসিশন চ্যাঞ্জ, চলুন…।

দ্বিতীয় দৃশ্য
(রজব আলীর সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন সাংবাদিক মিল্টন বাবু ও অনীল বাবু)

সংবাদকর্মী : আচ্ছা রজব আলী। আপনার সকল গর্ব হলো আপনার এই গুণধর পাঁচ পুত্র নিয়ে। এর কারণ কী?
রজব : কারণ হলো, আমার এই পাঁচ পুলা অনেক গুণের অধিকারী। এরা আমার গর্বের ধন। এদের আমি মনের মতো কইরা মানুষ করছি।
সংবাদকর্মী : আপনার ছেলেদের গুণের কথা যদি একটু বলতেন…।
রজব : আমার বড় ছেলের নাম জজ মিয়া। অত্র এলাকার সবচেয়ে বড় গরু বাজার তরিকপাশা গরু বাজার। ঐ বাজারে যত গরু বেচাকেনা হয়, সবই হয় জজ মিয়ার হাত দিয়া।
সংবাদকর্মী : তার মানে গরুর দালাল!
রজব : আরে দালাল কন ক্যান, এটাতো সেবা- মানবসেবা। এর ছোডডা অইলো গিয়া দারোগা মিয়া। আড়তদার। এই বাজারে যত মাল আছে সব তার হাত দিয়া যায়, এই যে আপনারা চা খাইতাছেন, সবই ওর হাত দিয়া আসে। এর পরে দরুন গিয়া- চাইল, ডাইল, তেল, তরি-তরকারি, বেগুন তার আত দিয়াই আসে।
সংবাদকর্মী : তার মানে মজুদদার! আচ্ছা ঠিক আছে, আর বলতে হবে না আমরা বুঝতে পেরেছি। আপনার নামে আরেকটা অভিযোগ আছে। আপনি নাকি আপনার স্ত্রীকে নির্যাতন করেন?
রজব : দেহেন বউ মানুষটা অন্যায় করলে হেরে শাসন করতে হয়। শাসন না করলে বউ মাথায় ওঠে। শুধু আমিই না, এই গেরামের সবাই এ্যাইডা করে.. আর তা ছাড়া..।

(আন্তু দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো-)
আন্তু : চাচা, চাচা, খারাপ খবর আছে, উত্তর বিলের চর দখল করবার লাইগ্যা নাকি আখলাক পুরের তবারক মাতব্বর লোক জোগাড় করতাছে।
রজব : কস কী, ওর এত বড় সাহস। তবারক আবার মাথা গজাইয়্যা উঠছে। গতবারের ছেঁচাডা তার মনে নাই।
আন্তু : ওলিপুরের তরাকদার নাকি হের লগে জোট বানছে।
রজব : তবারক মাতব্বর, তুই আমারে চিনস নাই। আমার পাঁচ পুলা কই, বাবারাÑ সোনা মানিক আমার। কইরে তোরা, লাঠিসোটা, বল্লম নিয়া বাইর হ.. এখনই বাইর হ..।

(রজব আলীর নেতৃত্বে সবাই লাঠিসোটা, বল্লম নিয়া চর দখল করতে যাবে। )
তৃতীয় দৃশ্য
(রজব আলীর বড় ছেলে গরুর দালাল জজ মিয়া এক ক্রেতাকে নিয়ে যাচ্ছে গরু দেখাতে)

জজ মিয়া : আসেন। আমি কসম কইরা কইতে পারি, এই হাটের সবচে তাজা গরুটা আপনে পাইছেন।
ক্রেতা : হ, হেই বিশ্বাসেই তো আপনার কাছে আইছি।
জজ মিয়া : এই হাটের সবার হইলো আমার চেনা জানা। কেউ আমার মুখের ওপর কথা কইতে পারব না।

(জজ মিয়া একজন বিক্রেতার কাছে গিয়ে গরু দেখাবে তার দরদাম করে কিনে দেবে। কেনার পর ক্রেতা খুশি হয়ে এক হাজার টাকা জজ মিয়াকে বখশিশ দিবে। পরবর্তীতে বিক্রেতার কাছ থেকে এসেও আবার টাকা নেবে। অন্য দিকে বাজারের অপর প্রান্তে রজব আলীর আরেক ছেলে হীরু মিয়া গ্রামবাসীদের সামনে নিজেদের সাহস এবং শক্তিমত্তার তারিফ করে নিজেরাই আত্মতুষ্টিতে লাফাচ্ছ্।ে)
হীরু মিয়া : শুন তোরা, আমাগো এই গেরামের মান-সম্মান, ইজ্জত হইলো গিয়া সবচেয়ে বড়। তাইর ওপর কেউ আঘাত করলে আমরা ছাইড়া কথা কমু না।
গ্রামবাসী-১ : আমনেরা পাঁচ ভাই থাকতুন আমগো উফরে চোখ তুলার কেউ সাহস ফাইবু না হেই বিশ্বাস আমগো আছে।
নীরু মিয়া : খালি বিশ্বাস থাকলে অইতু না, শক্তি লাগবো মিয়ারা, শক্তি।
গ্রামবাসী-২ : হ হীরু ভাই, শক্তিই হইলো গিয়া আসল।
গ্রামবাসী-৩ : তবে আর যা-ই কন হিরু ভাই, আফনের বল্লমের নিশানায় কিন্তু একটা উড়াল দেউন না পাখিও মিস হয় না।
গ্রামবাসী-১ : হ হীরু ভাই, আপনের বল্লম চালনা আমগোরে শিখাইবেন?
হীরু মিয়া : কাইল আইসো, তোমাগওে পেরিকটিস করাই দিমু নে।

(রজব আলীর সেজো ছেলে নীরু মিয়া গ্রামের কয়েকজন লোকের সাথে বাজারের অন্য প্রান্তে গাছের নিচে বসে কথা বলছে)
নীরু মিয়া : রাজনীতি বেটা তুই আমারে শিখাইবি? কত বড় বেইমান বেডা। চিন্তা করছস? রব শিকদারের ট্যাহা খাইয়্যা এহন পল্টি মারছে। ঘুরছ গিয়া তালুকদারের সাথে।
গ্রামবাসী : নীরু ভাই, অর চৌদ্দগোষ্ঠী বেইমান, অরে আমগো দল থেইক্যা বাদ দিয়া দেন।
নীরু ভাই, আপনের পায়ে ধরি নীরু ভাই। আমার ভুল হইয়া গেছে। আমারে মাফ কইরা দেন।
নীরু মিয়া : মাফ টাফ করা যাইব না। সন্ধ্যায় তুই রব শিকদারের কেলাবে আইছ, তুর বিচার হইব।

(নীরু মিয়া চলে যায়)

চতুর্থ দৃশ্য
(রজব আলীর বাড়ির উঠোন)
(চরিত্র : রজব আলী ও কয়েকজন লোক। রজব আলী একটা পত্রিকা পড়ছে খুব মনোযোগ দিয়ে)

লোক : ও রজব ভাই দ্যাশের খবর কি ল্যাখছে?
রজব : ভাল-মন্দ দুইটাই আছে।
লোক : একটু খুইল্যা কও না আমাগোরে।

(রজব আলী পত্রিকার হেডলাইন পড়ে পড়ে বড় গলায় শুনাচ্ছে। লোকজন আগ্রহভরে শুনছে)
রজব আলী : বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা। জলবায়ু পরিবর্তনে বিশ্বের অনেক দেশ তলিয়ে যাবে পানির নিচে। মঙ্গল গ্রহে মানুষ বসবাস করতে পারবে…।
এক বৃদ্ধ : বাজান রে! মালোশিয়া দ্যাশের খবর-অখবর কী ল্যাহেছে কও হুনি।
রজব আলী : নাহ। আইজ ল্যাহে নাই কিছু।
গ্রামের এক লোক : আমাগো গেরামের হ্যাইদিনের এ্যাত্তবড় ঘটনাটা বিবিছি থেইক্যা কিছুই কইল না। বিবিছিও অহন আগের মত নাই মনে লইতাছে। না হি কও রজব ভাই?
রজব : (গাঢ়কণ্ঠে) ঠিহই কইছো। বিবিছিও অহন আগের মতন নাই। ভালো আছে আর কোন জিনিস? হগগলেতেই দুই লম্বরি। ভেজালে বিশ্বটা ভইরা গ্যাছে।

(রজব আলাীর স্ত্রী রহীমা বানুর প্রবেশ। হাতে পানের বাটা)
বৃদ্ধ : রজব মিয়া। জজের মা আইছে। আমরা অহন যাই।
(গ্রামবাসী উঠে চলে যাবে)
জজের মা : সারাদিন গল্প-গোজব কইরাই কাটাইবেন, নাকি কাম কাইজ কিছু করবেন।
রজব আলী : বুঝলা জজের মা, আমার পাঁচ পুলা থাইকতে আমি কাম কাইয করমু ক্যান।
জজের মা : মাইনসে তো আপনের পাঁচ পুতের বাপ ডাইক্যাই শেষ করছে। নিজে কোন কাজ করতে চান না।
রজব আলী : আমার গৌরবতো ঐ পাঁচ পোলাই। এ্যাই তরিকপাশা না শুধু, আশপাশের পাঁচ দশ-গেরামে কয়জনের এরকম পাঁচ পোলা আছে কও দেহি।
জজের মা : এই গর্বই আফনেরে একদিন শেষ করব।
রজব আলী : এ্যাই, বেশি কতা কও ক্যা। দাও, শুফারি দাও, মাইয়া মানুষ খালি বেশি বুঝে।

পঞ্চম দৃশ্য
(তরিকপাশা বাজার। চায়ের দোকানে বসে আখলাক পুর, তরিকপাশা ও অন্য গ্রামের আরো কয়েকজন)

গ্রামবাসী-৪ : রজব আলী যদি মনে করে আগের মত জোর কইরা উত্তরের ধান চাষ করবো তাইলে এ্যাইডা অইবো গিয়া তার সবচে বড় ভুল। শোন মিয়ারা এতদিন তালুকদার আমগো বিপক্ষে আছিলো। তার লগে আমার কথা আইছে, তার গেরামের লোক দিয়া আমগোরে সহযোগিতা করবো।
গ্রামবাসী-১ : রজব আলীর পাঁচ পুতের কথা শুনলেই তো আর ডরে কেউ আগাইতে চায় না।
গ্রামবাসী-৪ : হেইদিন আর নাই, এহন যে কইরাই হোক এ চর আমাগো উদ্ধার করতেই হইবো।
গ্রামবাসী-২ : রজব আলীর পাঁচ পুতের একজনই এক শ’।
গ্রামবাসী : তবারক মাতব্বর এইবার উচিত শিক্ষা পাইব।
গ্রামবাসী-৪ : উচিত শিক্ষা কী, তবারইক্কার হাড্ডি গুড্ডি গুড়া কইরা দিতাম না।
গ্রামবাসী-৫ : বউ ফিডান আর এইডা এক জিনিস না মিয়া।
গ্রামবাসী-১ : এ্যাই ব্যাডা খোঁচা মাইরা কথা কস ক্যা।
গ্রামবাসী-৫ : খোঁচা মারার কি অইল, যা হাঁচা তা কইলাম।
গ্রামবাসী-১ : হাঁচার দেখছসটা কি, তুই মনে অয়-
গ্রামবাসী-৩ : তবারইক্কার চর, ধর অরে.. ধর ধর..
গ্রামবাসী-৫ : না আমি ঠিক..।

(দৌড়ে একজন গ্রামবাসীর প্রবেশ)
গ্রামবাসী-২ : দৌড়াও ক্যা মিয়া কি অইছে
রতন : খবর আছে, গরম খবর।
গ্রামবাসী-২ : এ্যাই রতন, খেরছ না বেডা কি অইছে।
রতন : তবারক মাতব্বর রজব আলীর পাঁচ পুতের কথা হুইন না, চর দখলের চিন্তা বাদ দিয়া শহরে গিয়া মাইয়্যার বাইত উঠছে।
গ্রামবাসী-২ : কস কি আসলে আমগো রজব আলীর পাঁচ পুত আইলো গিয়া এ্যাই তরিকপাশা গেরামের রতœ। যতদিন হেরা আছে, ততদিন আমগো গেরাম্যে আর কেউ ঠ্যালা মারার সাহস পাইব না।

(আখলাকপুরের লোকজন আস্তে করে কেটে পড়বে। গ্রামবাসীর মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যাবে, তারা খুশিতে গান বাজনা করে এবং নাচানাচি করে। রজব আলী, তার স্ত্রী, পাঁচ পুত্রসহ তাদের এই আনন্দে অংশগ্রহণ করে। রজব আলী হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যাবে, অসুস্থ হয়ে পড়লে সবাই তাকে ধরে বাড়ির ভেতর নিয়ে যায়)

ষষ্ঠ দৃশ্য
(রজব আলী, তার পাঁচ পুত ও রহিমা বানু)

রজব আলী : তোমাদের বাবার শইলডা বেশি বালা যাইতাছে না।
রহিমা বানু : তোমরা যদি হুগগলে মিইল্যা টাউনের একটা বড় ডাকতার দেহাইতা। বাবা জজ মিয়া।
জজ মিয়া : একটুক খানি কাশি আর জ্বর তেমন আরকি, কুচিলা ফাতার রস বাইটা খাওয়ালেই শাইরা যাইবু। খালি খালি টাউনে নিয়া– টেহা খরচ করার কী দরকার।
রহিমা বানু : করিম কবিরাজের অষুধ তো অনেকদিন ধইরায়ে খাইতাছে।
রজব : (উত্তেজিত হবে) না না, আমারে বড় ডাকতর দেহান লাগব না, আমি এমতেই বালা অইয়্যা যামু, তোরা আমার চোখের সামনে থেইক্যা যা, আমি এ্যামতেই বালা অইয়্যা যামু।
দারোগা মিয়া : বাবা একখান কতা কইতাম।
রজব আলী : কী কবি, ক।
দারোগা মিয়া : না মানে অইযে উত্তর চরের জমিতে তেমন বালা ফসল অয়না। তাই ঐ জমিডা বেইচ্যা দিলে বালা অয়।
রজব আলী : কি তুই আমার বাপ-দাদার জমি বেচপার কস?
দারোগা মিয়া : কাজীপুর বাজারে একটা দোকান রাইখ্যা একটা ব্যবসা করুম।
রহিমা বানু : তুর বাপে অসুখে মরতাছে, ট্যাহা খরচ কইর‌্যা কেউ ডাকতর দেহায়তি চাছ না। আর তুই কস জমি বেইচতি।
(নীরু মিয়ার প্রবেশ)
নীরু মিয়া : জমি বেইচত খালি মিয়া ভাই-ই কয় না, আমগো হুগলেরই মত, আমরা চাই জমি জায়গা ভাগ কইরা সব আমগরে বুঝাইয়্যা দেয়া হউক।
রজব আলী : অ জজের মা, এ্যা আমি কারে জন্ম দিলাম। যে ফুলাদের দিয়া আমার এত গৌরব সেই ফুলারা আমার খবরডাও ঠিকমত লয় না। আইজ সাত দিন বিছানায় পইড়া আছি। জজের মা তোমার ফুলাগরে লইয়্যা সারা গেরামে এক সময় আমি গৌরব কইরা ঘুইরা বেড়াইতাম।
রহিমা বানু : আফনের ছোট ফোলা আইছিল।
রজব আলী : হে আবার কী চায়?
রহিমা বানু : বড় নাও কিনব, ট্যাহা চায়।
রজব আলী : উফ ! জজের মা, তোমার ফুলাগরে আমার সামনে থেইক্যা যাইতে কও…।
সপ্তম দৃশ্য
(রজব আলী কল্পনায় দেখে তার সন্তানরা তার কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নিচ্ছে। বিভিন্ন প্রকারের দাবিদাওয়া করছে)

জজ মিয়া : ঐ দক্ষিণের জমিডা আমার লাগবই। আমি জমি খামু।
দারোগা : ব্যবসা করুম, ট্যাকা দাও।
হীরু মিয়া : আমরা ভাগ চাই, বুঝাইয়্যা দাও।
নীরু ও হীরু মিয়া : আমরা সব চাই, সব।

(রজব আলী) ঘুম থেকে চিৎকার করে জেগে উঠবে)
জজ মিয়া : জজের মা, ও জজের মা।
রহিমা বানু : কি অইছে? আফনে এমন করেন ক্যা, খারাফ হফন দেখছেন?
রজব আলী : হ জজের মা, এইডা আমি কী দেখলাম। আমার শরীরটা যেমন কাঁপতাছে, আমারে একটা খেতা দেও, আমার জ্বর উটতাছে, জজের মা আমি একডা কতা কইতাছি রাখবা, আমি মরণের সময় আমার মুখে কলমা তুইল্যা দিও। আমার পোলাগরে কইও তারা যাতে আমার পাশে বইসা দোয়া দুরুদ পড়ে। আর তুমি কাইন্দো না।
রহিমা বানু : আপনের কান্দন দ্যাখলে আমার কুল আলম আইন্দার হইয়্যা যায়।
রজব আলী : আমি কান্দি তোমার লাগি, তোমারে জীবনে বউত আজাব দিছি। আমারে খেমা কইরা দিও।
রহিমা বানু : আপনে ইসব কথা কইয়েন না যে, আপনেরে আল্লায় বাঁচাইবু।
রজব আলী : হগগলরে কও, হগগলে আমারে খেমা কইরা দেয় যে।
রহিমা বানু : এরুম কথা কির লাইগ্যা কইতাছেন।
রজব আলীর : আমার বয়স ৬০ বছর চলতাছে, ইসাব কইরা দেখছি, ওহন যে কাল বেরামী ধইরছে, মনে লইতাছে থুইয়্যা যাইব না, লইয়্যা যাইব। আমি মইরলি তুমি কাইন্দ না, হাত উঠাইয়া দোয়া কইরও। হুজুরগরে কইয়্যা আমার লাইগ্যা দোয়া করাইও। জজ মিয়ারে কইও, মউতের সময় আমার কানের কাছে কলমা পড়াইতে। দারোগা মিয়ারে কইও আমার মুখে পানি দিতে আর তুমি কুরআন মজিদ পইড়ো। আমার পুতেরা কই গেছে, আমার ছামনে নিয়া আও।

(ছেলেরা রজব আলীর শয্যার পাশে সবাই আসবে। কেউ বাতাস করবে। কেউ পা টিপে দেবে। কেউ পানি খাওয়াবে)
রহিমা বানু : ও বাপ জজ, কলমা পড়, তোর বাপে কইছে তুই যেন মরার সময় কলমা পড়াইছ।
জজ মিয়া : মা, আমি তো কলমা পারি না।
দারোগা মিয়া : আমি মনে লইতাছি পারি।
রহিমা বানু : ক, বাপ, ক।
দারোগা মিয়া : লা ইলাহা, ইল্লা আন্তা—
হীরু মিয়া : এইডা তো কলমা না-
দারোগা : কোনডা কলমা- আমি তো এইডাই জানি।
নীরু মিয়া : আমি কুল ফু আল্লাহ সুরা পারি।
হীরু মিয়া : ঠিক আইছে ভাইজান কও, তুমিই কও।
নীরু মিয়া : কুল ফু আল্লাহ..
রহিমা বানু : (চিৎকার করে) ও পুতেরা… তোগো বাপেতো আর কথা কয় না–।
জজ মিয়া : বাবা, অ বাবা, তোমার কি হইছে কথা কও। আমরা কলমা পড়তাছি, তুমিও পড়…।

(চিৎকার করে সবাই হাউমাউ করে কাঁদতে থাকবে।
রজব আলী মারা গেছে। কলমা তার ভাগ্যে জুটে নাই।)

SHARE

Leave a Reply