Home গল্প মা

মা

আবুল হোসেন আজাদ 

সূর্যটা পশ্চিমে ঢলে পড়েছে বেশ কিছুক্ষণ হলো। দিগন্ত রেখায় সিঁদুররাঙা হাল্কা মেঘের পাশে ডিমের কুসুমের মতো লাল টকটক করছে সূর্যটা। একটু পরেই ডুব দেবে সে। পাখিরা বাসায় ফিরতে শুরু করেছে। হাওয়ায় পাখা মেলে উড়ে চলেছে বকেরা। সারি বেঁধে। ঝিরি ঝিরি বাতাস বইছে দখিনা। ফাল্গুন মাস। বসন্তÍ এসে গেছে।
সুমির বয়স সাত। শান্তর পাঁচ। ওরা দুই ভাইবোন, দাদীমা ওদের দু’জনকে ঘরের বারান্দায় মাদুর পেতে বসে আগলে রেখেছেন, সুমি ও শান্ত বুঝতে পারে একটা কিছু হয়তো ঘটেছে। ওদের আব্বু বসে আছেন চেয়ারে হেলান দিয়ে, অলস ভঙ্গিতে অমাবস্যার মত অন্ধকার মুখে করে। দাদু ওজু করছেন কলতলায় মাগরিবের নামাজ আদায়ের জন্য। তার মুখে অন্ধকার রেখা। তারও মন ভালো নেই।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মাগরিবের আজান ভেসে এলো মসজিদের মাইক থেকে। ওদের বাড়ির কাছাকাছি মসজিদ। সোজা দক্ষিণে বাজারের পাশে মসজিদ। আব্বু চেয়ার ছেড়ে নামাজের জন্য মসজিদের দিকে পা বাড়ান। চোখে পানি টলটল করছে, সামলে নেন তিনি চোখের পানি। দাদীমারও চোখের পানি শাড়ির আঁচলে মুছে নেন। দাদীমাও নামাজে বারান্দায় জায়নামাজ বিছিয়ে বসে যান। সুমি ও শান্ত চুপচাপ বসে থাকে বারান্দায় এ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে। দাদীমা ঘরে হারিকেন জ্বালিয়ে দিয়েছেন। এখানে এখনও বিদ্যুৎ এসে পৌঁছায়নি। তাই সন্ধ্যা নামলেই অন্ধকারে ঢেকে যায় পুরো গ্রাম। মাগরিবের নামাজ শেষ করে আব্বু বাড়িতে ফেরেন। ইতোমধ্যে দু-একজন করতে করতে ওদের বাড়িটা পাড়া-পড়শি ও আত্মীয়-স্বজনের উপস্থিতিতে ভরে ওঠে। শান্ত চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। দাদীমা ওকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। তবু কান্না থামে না।
সন্ধ্যা পেরিয়েছে। জোনাকিরা মিটিমিটি আলো জ্বেলে মুখরিত করে তুলেছে আশপাশের ঝোপঝাড় আর বাঁশবনের ভেতর। এমন সময় খাটিয়ায় করে একজনের লাশ এসে পৌঁছে বাড়ির উঠোনে। শিউলি ফুল গাছটার নিচে। আবার কান্নার রোল ওঠে। সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ে একনজর লাশ দেখার জন্য। সুমি ও শান্ত বুঝতে পরে এটা ওদের মায়ের লাশ, ওরা মাগো বলে দু’জনে আবার কেঁদে উঠে মায়ের লাশের ওপর আছড়ে পড়ে।
আব্বু নির্বিকার ততক্ষণ বসে ছিলেন। তিনি এবার ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। আজ রাতেই লাশ দাফন করা হবে। গ্রামের মসজিদের মাইকে ঘোষণা হয় মরহুমার নামাজে জানাজা নিজ বাড়িতে রাত সাড়ে ৯টায় অনুষ্ঠিত হবে। এ দিকে কয়েকজন বিকেলেই কবর খোঁড়ার কাজ শেষ করে রেখেছে। তার সঙ্গে বাঁশের চাটাইও রেডি। শিউলিতলা থেকে লাশ নিয়ে গেল বাড়ির ভেতরে পাঁচিলের মধ্যে। ক’জন মহিলা ওদের মাকে ওজু গোসল করিয়ে নতুন কাফনে মুড়ে দিলেন।
ওরা দুই ভাইবোন কাঁদতে কাঁদতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে কেউ জানে না। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ওরা স্বপ্ন দেখে। মা ওদের সামনে সদ্য ফোটা ফুলের মত হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। দেখতে পায় ওরা ক’জন ফুলপরী ওদের মাকে ফুলের মালায় সাজাচ্ছে। মা-ও ওদের মালা নিজের হাতে গলায় পরে নেন। তারপর ফুলপরীরা ডানায় তুলে নেয় মাকে। মুহূর্তের মধ্যে মাকে নিয়ে উড়ে চলে ফুলপরীদের দল। ওরা মা মা বলে ডাকতে থাকে। মা আর পেছন ফিরে তাকান না। হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় দু’জনের এবং সাথে সাথেই দু’জন দু’জনার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। চারিদিকে দেখতে থাকে অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে। কোথায় মা? রাত শেষ, ঘুম যখন ভাঙে তখন ভোরের পাখিরা জেগে উঠেছে। মসজিদে ফজরের আজানও শেষ হয়েছে। মৃদু হাওয়া জানালার ফাঁক গলে ঘরের ভেতরে ঢুকেছে। ওরা দু’জন দাদীমার দু’পাশে খাটে শুয়ে শুয়ে এদিক ওদিক তাকাতে থাকে। তখনও ঘরের ভেতর অন্ধকারের আলো-ছায়া।
দাদমীমা উঠে পড়েন। ফজরের নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে তসবিহ হাতে দোয়া দরুদ কলেমা পড়তে থাকেন। আব্বু মসজিদের জামাতে গেছেন নামাজ আদায়ের জন্য। তিনি ফিরে আসেন। দাদীমা তসবিহ পড়তে পড়তে বেভোলা হয়ে যান। বয়স হয়েছে। সত্তর পেরিয়েছে। বারবার মনের ভেতরে ভিড় করতে থাকে, সুমি ও শান্তর মায়ের কথা। এইতো মাসখানেক আগেও সে ছিল চঞ্চল একজন সুস্থ মানুষ। অথচ এই ক’দিনের মধ্যেই ঘটে গেল এই বিপর্যয়। প্রথমে জেলা সদরের একটি ক্লিনিকে তাকে ভর্তি করা হলো। কিন্তু শরীরে কোনো উন্নতি হলো না বরং অবনতি হতে লাগলো। ডাক্তারের পরামর্শে তাকে কলকাতার আর জি কর হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। ডাক্তার বললেন, ব্লাড ক্যান্সার, শরীরের দ্রুত অবনতি হতে থাকলো। সপ্তাহ না পেরোতেই মঙ্গলবার ভোরেই হাসপাতালের বেড থেকে কাউকে কিছু না বলে চিরবিদায় নিয়ে চলে গেলেন না ফেরার ঠিকানায়। নানু ও সেজ মামা ছিলেন মায়ের সঙ্গে হাসপাতালে। ওরা ট্রাকে করে লাশ নিয়ে আসে সীমান্ত ঘেঁষা ওপারের গ্রাম দন্ডিরহাট পর্যন্ত। সেখান থেকে নৌকায় করে ইছামতি পাড়ি দিয়ে এপারে নিয়ে আসা হয়।
গত রাতে মায়ের কবর হয়ে গেছে। বাঁশের বেড়াও দেয়া হয়ে গেছে। বাড়ির পুব দিকটায় বড় লতা আমগাছটার তলায় মায়ের কবর। পুবের আকাশ রাঙিয়ে সূর্যটা ঝলমল করে উঠতে শুরু করেছে। আব্বু এতক্ষণে নামাজ শেষ করে পায়ে পায়ে কবরের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন কবর জেয়ারতের উদ্দেশ্যে। আব্বু দু’হাত তুলে চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে মুনাজাত করছেন। শান্তও বিছানা ছেড়ে কখন যে দাঁড়িয়ে আব্বুর সাথে হাত তুলেছে। সুমিও এসে পড়ে পরক্ষণেই। আব্বু ও শান্তকে মুনাজাতরত দেখে সেও হাত তুলে দাঁড়িয়ে যায়।
মুনাজাত শেষ করেন আব্বু। অবুঝ শান্ত হঠাৎ করে আব্বুকে প্রশ্ন করে, মা কবরের ভেতর কী করছে? আব্বু শান্তর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলেন, মা এখন ঘুমাচ্ছেন, ঘুম ভাঙলেই উঠে আসবেন। আর তখনই আমগাছের একটি ডালে বসে একটি কোকিল কুহু কুহু ডেকে ওঠে।

SHARE

Leave a Reply