Home গল্প পল্লবের জায়নামাজ

পল্লবের জায়নামাজ

আহসান হাবিব বুলবুল

ঈদের দিনক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসছে পল্লবের আনন্দ আর ধরে না। আব্বু উৎসব ভাতাটা পেলেই ওরা কেনাকাটা করতে যাবে। ভাইবোনেরা কে কী নেবে তার একটা ছোটখাটো ফিরিস্তি হয়ে গেছে। পল্লবের নতুন জামা তো চাই-ই; তার সাথে বিশেষ কিছু একটা। সেই বিশেষ জিনিসটা কী তা আর বলছে না। ও সবাইকে সারপ্রাইজ দিতে চায়। আলো ও নিশাত ভাবে এতটুকু পিচ্ছি বিশেষ কী আর নেবে! ধরো একটা খেলনা গাড়ি না হয় এক থোকা রঙিন বেলুন।
পল্লবের ভাইয়া তার কথা শুনে মিষ্টি মিষ্টি হাসে। বলে, সবুর করো যখন কিনবো তখন দেখবে।
আম্মু ব্যাপারটা বুঝে ফেলেছেন, কিন্তু কিছু বলছেন না। দাদুর জায়নামাজে পল্লবের উবু হয়ে সিজদা দেয়ার মনোহর দৃশ্য সেই সেদিনের কথা। মনে করে সবাই হাসে। দেখতে দেখতে সেই পল্লবটা কত বড় হয়ে গেল। একদিন হয়েছে কীÑ দাদু পল্লবকে সাথে নিয়ে মসজিদে গেছেন। জামায়াতে দাদুর পাশে দাঁড়িয়ে পল্লব। এক বেরসিক মুসল্লি ছোট শিশুকে পেছনের কাতারে সরিয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে যান। পল্লব ক্ষোভে দুঃখে পেছনে দাদুর পা জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে। দাদু না পারেন নামাজ শেষ করতে, না পারেন ওকে সামলাতে। বাড়িতে এসে দাদুর মর্মস্পর্শী বর্ণনায় সবার চোখে পানি এসে যায়।
দাদু এখন আর নেই। আছে শুধু স্মৃতি। দাদুর জায়নামাজ, তসবিহ, ঘড়ি, চশমা সবই যেন সবার স্মৃতি, তাদের মণিকোঠায় স্থান করে নিয়েছে। দাদুর জায়নামাজে এখন আব্বু নামাজ পড়েন। কখনো আম্মুও। পল্লব আম্মুর পাশে এসে বসে। আম্মুর সাথে সিজদা করে।
জায়নামাজের নরম জমিনে হাত বুলিয়ে পল্লব বলে, অ্যাই জায়নামাজের মতোই দাদুর শরীরটা ছিল তুলতুলে নরম, তাই না আম্মু।
তোর মনে আছে দাদুর কথা?
হ্যাঁ মনে আছে। দাদু যেদিন মরে গেলেন সেদিন আমি কত কেঁদেছি।
মরে গেল না বাবা; বলতে হয় ইন্তেকাল করলেন।
আম্মু! আমি দাদুর মতো নরম তুলতুলে একটা জায়নামাজ কিনব।
আম্মু পল্লবের কথায় সম্মতি জানান। ওকে দোয়া করেন।
আজ মা’র পল্লবের সেই অভিপ্রায়ের কথা মনে পড়ে যায়।
আজ বিশ রোজা। একুশের রাত। মাহে রমজানের শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতে শবেকদর তালাশ করতে হয়। এই রাতের ফজিলত হাজার রাতের ইবাদতের চেয়েও বেশি। হাদিসে এমনটি বলেছেন আমাদের প্রিয় নবী (সা)।
রাকিবুর রাজা সাহেব আজ তাই বাসাতেই ইফতার করবেন। ব্যস্ততার কারণে তাঁর সব দিন বাসায় ছেলেমেয়েদের নিয়ে এক সাথে ইফতার করা হয় না। আব্বুকে নিয়ে পল্লব, আলো, নিশাত সবাই মেতেছে।
ইফতারির আয়োজন চলছে। পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্য পল্লবও আজ রোজা রেখেছে। তাই সবার মনেই একটু উৎকণ্ঠা উচ্ছ্বাস কাজ করছে। ইফতারের টেবিলে সবাই বসেছে। রাজা সাহেব বললেন, তোমরা কি জান রোজাদারদের জন্য দু’টি আনন্দ কী কী?
বলো না আম্মু! পল্লব বলে।
আমাদের মহানবী (সা) বলেছেন, রোজাদারের জন্য দু’টি আনন্দ। একটি হলো যখন সে ইফতার করে। আর দ্বিতীয়টি হলো, হাশরের মাঠে আল্লাহতায়ালা যখন তাদের সাক্ষাৎ দেবেন। টেলিভিশনে কুরআন তেলাওয়াতের সুমধুর সুর ভেসে আসে।
নিশাত বলে, আর বেশি সময় নেই, আব্বু মুনাজাত করো। রাজা সাহেব দুই হাত তোলেন। নিশাতদের আম্মুও মুনাজাতে এসে শরিক হন।
সকাল থেকে তিন ভাইবোনের মধ্যে বেশ চাঞ্চল্য লক্ষ করা যায়। আজ ওরা আব্বুর সঙ্গে ঈদ মার্কেটে যাবে কেনাকাটা করতে। বৃষ্টিভেজা সকাল। মেঘ ভেঙে রোদ বেরিয়েছে। রাজা সাহেব তাড়া দেন, সময়টা কাজে লাগাতে হবে, চল সবাই। পল্লবের মা বলেন, আমার সোণামনির বিশেষ জিনিসটা কিনতে ভুলো না যেন।
ওরা বেরিয়ে পড়ে। মার্কেট থেকে মার্কেটে ঘুরে কেনাকাটা প্রায় শেষের দিকে। রাজা সাহেব বলেন, পল্লব এবার বল তোমার সেই বিশেষ জিনিসটা কী। পল্লব আব্বুর কানের কাছে মুখ লাগিয়ে বলে, আমার একটা এক চিলতে জায়নামাজ দরকার।
ছেলের অভিলাষ শুনে বাবার মনটা আনন্দে ভরে যায়। ভালোবাসা ও গর্বে বুকটা ফুলে ওঠে। অনেক খুঁজে পল্লবের জন্য সবুজ এক চিলতে জায়নামাজ কেনা হয়। নিশাত, আলো এর আগে এত ছোট জায়নামাজ দেখেনি। বাড়িতে পল্লবের জায়নামাজের প্রতি সবার আকর্ষণ বেড়ে যায়। আম্মু দেখে খুব খুশি হন।
আজ ঈদ। ঘরে ঘরে আনন্দ। পথে পথে শিশুদের কলরব। বড়দের সাথে তারাও চলেছে ঈদগাহে। তাদের গায়ে রঙবেরঙের পোশাক। ঈদগাহ সাজানো হয়েছে বর্ণাঢ্য সাজে। বাতাসে সুবাস ভেসে আসছে। পল্লব আব্বু ও ভাইয়ার সাথে ঈদগাহে এসেছে। ও জায়নামাজ বিছিয়ে বাবার পাশেই বসেছে। ওর পাশে বসেছে অন্য একটি শিশু। শিশুটি বার বার পল্লবের জায়নামাজটি হাত দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে। পল্লব শিশুটির সাথে ঈদ শুভেচ্ছাও বিনিময় করেছে।
জামায়াত দাঁড়িয়ে যায়। পল্লব শিশুটিকে নিজের এক চিলতে জায়নামাজে টেনে নিয়ে পিতার জায়নামাজে গিয়ে দাঁড়ায়। ওদিকে ইমাম সাহেবের কণ্ঠে আল্লাহু আকবার ধ্বনি উচ্চারিত হতে থাকে।

SHARE

Leave a Reply