Home প্রচ্ছদ রচনা মাছগুলো সব অদ্ভুত

মাছগুলো সব অদ্ভুত

এই পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠের ন্যায় সাগর আর মহাসাগরের বিশাল জলরাশির বুকে বাস করছে চেনা অচেনা হাজারো প্রজাতির প্রাণী। এ সকল প্রাণীর অনেকেই স্থলে বসবাস করা প্রাণীদের মত শান্ত প্রকৃতির আবার কতকগুলো হিংস্র। হিংস্রের স্বভাব হচ্ছে বর্বরতা ও বিভীষিকাময় ত্রাসের রাজ্য কায়েম করা। এই সাগর-মহাসাগরে এমনও কিছু প্রাণী আছে যাদেরকে শান্ত ও কোমল প্রকৃতির প্রাণী বলে মনে হলেও অবস্থার প্রতিকূলে এরাও হয়ে ওঠে ভয়ঙ্কর এবং আত্মরক্ষা করতে সৃষ্টি করে প্রাণঘাতী প্রতিরোধ। কখনো কখনো এদের ভয়ানক আক্রমণাত্মক কর্মকাণ্ড ডাঙ্গার বিপজ্জনক প্রাণীর চরিত্রকেও হার মানায়। কয়েকটি মাছের এ অদ্ভুত রকমের কাণ্ডকারখানা নিয়ে লিখেছেন মাসুম কবীর

ড্রাগন ফিশ
সমুদ্রের তলদেশের দানব এই ড্রাগন ফিশ। দেহের তুলনায় বড় মুখের অধিকারী এ মাছের মুখটি এত বড় যে দেখলে মনে হবে এর মাথায় দাঁত ও মুখ ছাড়া আর কিছু নেই। এর মুখের থুঁতনির নিচে আলাদা একটি লম্বা প্রত্যঙ্গ আছে, যা আমাদের ড্রাগনের কথাই মনে করিয়ে দেয়। থুঁতনির নিচের ওই প্রত্যঙ্গটি কখনো কখনো উজ্জ্বল হয়ে শিকারকে আকর্ষণ করে।
পিরানহা
বাংলাদেশে এ মাছটা খুব একটা অপরিচিত নয়। গড়ে ১৪ থেকে ১৬ সেন্টিমিটার হয় একটি পিরানহা। তবে সর্বোচ্চ ৪৩ সেন্টিমিটার লম্বা পিরানহাও দেখা গেছে। হিংস্র ও ক্ষিপ্র স্বভাবের কারণে পিরানহাকে বলা হয় “ঙষভ ড়ভ ধিঃবৎ” বা “জলের নেকড়ে”।
পিরানহা দক্ষিণ আমেরিকার মাছ। মোটামুটি ঊষ্ণ আবহাওয়াই পছন্দ করে। আট থেকে দশ বছর বাঁচে অনুকূল পরিবেশে।
সব ধরনের পিরানহারই উভয় চোয়ালে এক সারি করে ধারালো দাঁত রয়েছে। প্রতিটা দাঁতই ত্রিমাত্রিক কিন্তু নিম্নের পাশটি ব্লেডের চেয়েও তীক্ষè আর ধারালো। এই ধারালো দাঁতগুলো একটি আরেকটির সঙ্গে এমনভাবে লাগানো যাতে সহজে কামড়ে যে কোনো প্রাণীর শরীর থেকে গোশত ছিঁড়ে আনতে পারে। গোশত পিরানহার প্রিয় খাদ্য। এমনকি পিরানহা কখনো কখনো ক্ষুধার তাড়নায় এতটাই আগ্রাসী হয়ে ওঠে যে অন্য পিরানহাকেও খুবলে খায়। আবার কখনো কখনো একঝাঁক পিরানহাকে জলজ্যান্ত ডলফিনকেও খেয়ে ফেলতে দেখা যায়।
ঠিক কতো সংখ্যক প্রজাতির পিরানহা রয়েছে তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায়নি। তবে ধারণা করা হয় এদের প্রজাতির সংখ্যা হচ্ছে ৩০ থেকে ৬০। মানুষের অর্থনৈতিক জীবনেও ভূমিকা রয়েছে পিরানহার। বিভিন্ন ছোট্ট ছোট্ট যন্ত্রপাতি আর অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হয় এদের দাঁত। অ্যাকুরিয়াম মাছ হিসেবে পিরানহার ব্যবহার রয়েছে।

টাইগার ফিশ
তোমরা তো জানোই কুমির কী খায়। মাছ তো খায়ই আবার সুযোগ পেলে যেকোনো প্রাণীও ধরে খেয়ে ফেলে। আচ্ছা তবে এখন বলো তো কুমিরকে কে খেতে পারে? ভাবছো, আমার মাথার ঠিক আছে কি না, তাই না? হ্যাঁ, কুমিরও কিন্তু কারো কারো খাদ্য। শোনো সেই প্রাণীর কথা।
এক ধরনের মাছ আছে যেগুলো সামনে আসলে কুমিররা খাওয়া দাওয়া ভুলে জান বাঁচাতে পড়িমরি করে দৌড় লাগায়। কারণ এই মাছগুলো খুবই ভয়ানক। ধরে ধরে কুমির খেয়ে ফেলে। এমনকি সুযোগ পেলে মানুষকেও ছাড়ে না। এই মাছের নাম টাইগার ফিশ। নাম টাইগার ফিশ, দেখতেও অনেকটা সেরকম। ছয় ফুট লম্বা এ মাছের মুখের গঠন ও দাঁতের বিন্যাস বাঘের হিংস্রতাকে মনে করিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। নদীর অন্ধকার কোণে বিচরণ করা এই মাছের মুখোমুখি হতে চায় না কেউ। কেননা এটি একই সঙ্গে হিংস্র ও ভয়ঙ্কর। প্রচণ্ড শক্তির অধিকারী এ মাছ অত্যন্ত গতিশীল। সমুদ্রে চলার সময় সামনে কোনো মাছ এসে পড়লে শক্ত দাঁতে তাকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলা টাইগার ফিশের অভ্যাস। মাছটির মুখগহ্বর তার শরীরের চেয়ে বড়, যে কারণে যা তাকে শিকার ধরতে সহায়তা করে। এ মাছটির দেখা মেলে মূলত দক্ষিণ আফ্রিকার স্বচ্ছ পানিতে। এর আছে ৩২টি ধারালো দাঁত। জেলেরা এ মাছটিকে যথেষ্ট সমীহ করে চলে।
এই মাছের নাম টাইগারফিশ হলো কেন ভাবছো? এটা তো বেশ সোজাই জবাব। এরা তো পানির দানবই। বাঘের মতো এর আচরণ, দেহ আর দাঁত। সব মিলিয়েই এই রাজকীয় নাম দেয়া হয়েছে। দাঁতগুলো রেজারের মতোই ধারালো আর উপর নিচে সমানভাবে সাজানো থাকে । একবার হা করলে তো সর্বনাশ! আস্ত একটা কুমির যেন মুখের ভেতরেই সেঁধিয়ে যাবে সহজে। বাঘ তাও অনেকটা ভদ্রই বলতে হবে এদের তুলনায়। কারণ এই টাইগার ফিশগুলো যেন একেকটা বুনো পাগলাটে স্বভাবের। পানিতে কিছু নড়াচড়া দেখলেই ব্যস! দ্রুতগতিতে এসেই ধারালো দাঁত বসিয়ে দেবে। এই মাছগুলো যেখানে থাকে সেখানে কুমির তো যায়ই না, আশেপাশেও ভেড়ে না জানের ভয়ে।
এই মাছগুলো ছোটো অবস্থায় পিরানহার মতোই দল বেঁধে থাকে। মা মাছেরা বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরে বেড়ায় আর কামড় দিয়ে শিকার করতে শেখায়। আর বড়ো হলে তো একেকটা রাক্ষুসে দানবে পরিণত হয়। শুধু তাই নয়, নিজেদের মধ্যে মারামারি করতেও তাদের এতটুকু বাধে না। তবে অনেক সময় একসঙ্গে চার-পাঁচটা টাইগার ফিশ একসঙ্গে ঘুরে বেড়ায় শিকারের খোঁজে। শিকার মিললে শুরু হয় খাবার প্রতিযোগিতা। তবে এরা খাবার সময় কাউকে ভাগ দিতে নারাজ। পারলে একবারেই নিজে সব খেয়ে ফেলে। আর এই নিয়ে নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি করে একে অন্যের লেজও খেয়ে ফেলতে পারে।
টাইগার ফিশগুলোর কেউ কেউ পুরোপুরি ধূসর রঙের হয় আর দেহের পাশ বরাবর একটি দু’টি কালো রেখা থাকতে পারে। আবার কারো কারো সাদা, বাদামী বা ধূসর রঙের ওপর মোটা কালো দাগও থাকতে পারে। লম্বায় ৬ থেকে ৭ ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে এরা। আর ওজনের কথা যদি বলো, তাও নেহাত মন্দ নয়। ৫০ কেজিরও বেশি হতে পারে একেকটার ওজন।
এদের শিকার ধরার ভঙ্গিটিও বিচিত্র। বাঘ যেভাবে ঘাপটি মেরে বসে থেকে দ্রুতগতিতে শিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে শিকার ধরে, এই মাছগুলোও শিকার ধরার বেলায় এমনটি করে। এদের শরীরে গ্যাস ভরা একধরনের থলি থাকে। আর এই থলির সাহায্যে কোথাও শব্দ হলে তৎক্ষনাত সেটি ধরে ফেলতে সক্ষম এই দানবেরা।
তরুণ টাইগার ফিশ যেকোনো আকারের শিকারই ধরে সাবাড় করে দিতে পারে। কিন্তু বাচ্চাগুলো অতোটা পারে না। তারা শুধু কাছে পেলে তবেই হামলা করে, তাও নিজে নিরাপদ দূরত্বে থেকে। এই রাক্ষুসে মাছ আবার যে শুধু পানিতে শিকার করে তা নয় কিন্তু। সুযোগ পেলে ডাঙার প্রাণীও শিকার করে ফেলে। তবে সত্যিকারের বাঘের মতো তো আর জঙ্গলে এসে শিকার করে না। কেবল যেসব প্রাণী নদীর কিনারে যায় তাদের জন্যই বিপদ। আর এজন্যই কুমিরের জন্য বিপদ। কারণ কুমির তো নদীর কিনারেই থাকে। আমাদের কিন্তু ভয় নেই। বাংলাদেশে তারা দয়া করে ঘুরতে আসবে না বলেই মনে হয়।

ছিপ মাছ
গভীর সমুদ্রে অ্যাংলার ফিশ বা ছিপ মাছ সবচেয়ে দানব সদৃশ। এরা ৩৩০০ ফুট থেকে ৬৬০০ গভীর সমুদ্রে অবস্থান করে। সমুদ্রের অনেক গভীরে অবস্থানরত এ মাছটির নামকরণ এ কারণে করা হয়েছে যে তার মাথায় একটি কাঠি সদৃশ গোশতপিণ্ড আছে যা অনেকটা জেলেদের ছিপকাঠির মতো এবং এ গোশতপিণ্ডটি সে শিকার করার কাজে ব্যবহার করে। শিকার ধরার সময় তার এ গোশতপিণ্ডটি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সে এর মাধ্যমে শিকারের প্রতি টোপ ফেলে। সে সময় ওই গোশতপিণ্ডটিতে একধরনের জৈব আলোর বিচ্ছুরণ ঘটে, যা দেখে শিকারটি কিছুটা বিহ্বল হয়ে পড়ে আর এ সুযোগে অ্যাংলার ফিশ শিকারকে কবজা করে।
মরে ঈল
বিসদৃশ এ প্রজাতির ঈলটিকে পৃথিবীর সর্বত্র দেখতে পাওয়া যায়। সমুদ্রের নিচে, পাথরের খাঁজে ওঁৎ পেতে থাকা এ মাছটি সর্বোচ্চ ১৩ ফুট লম্বা হয়। ধারালো দাঁত ও শক্ত চোয়ালের এ মাছটি খানিকটা বদমেজাজী হয়। তাই প্রায়ই অকারণে সমুদ্রে নামা মানুষদের আঘাত করে বসে। এ মাছের জিভে দাঁত থাকার কারণে আদর করে খাওয়ানোর সময় অনেকের হাত কামড়ে দেয়। এ মাছটির দাঁত ধারালো, পাশাপাশি বিষাক্তও।

স্নেক হেড ফিশ
মাছ হলেও আসলে দেখতে সাপের মতো। এ মাছের মাথা অবিকল সাপের কথা মনে করিয়ে দেয়। মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভারত ও আফ্রিকায় এ মাছের দেখা মেলে। দেহের তুলনায় বড় আকৃতির মুখগহ্বরের এ মাছটি তার ধারালো দাঁতের মাধ্যমে পানির ভেতর এবং ওপরে বিচরণশীল যে কোনো প্রাণীকে খেয়ে ফেলে। চাই সে মাছ পাখি, উভচর প্রাণী বা স্তন্যপায়ী প্রাণী হোক। হিংস্র এ মাছটি আবার যথেষ্ট সন্তানবৎসল। অনেক ক্ষেত্রে সন্তানকে বাঁচাতে তার আশপাশে আসা মানুষকে মা মাছ কামড়ে দিয়েছে এমন অনেক নজির আছে। এ মাছের প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার ক্ষমতা অন্য মাছের চেয়ে অনেক গুণ বেশি। অনেক সময় কাদার মধ্যেও এ মাছটি বেঁচে থাকতে পারে এবং শরীর ও কানকোর সাহায্যে সাপের মতো এঁকেবেঁকে পাশের জলাশয়ে চলে যেতে পারে।

ভাইপার ফিশ
ভাইপার সাপ সদৃশ আরেকটি হিংস্র মাছ। এ মাছটির শরীর স্বচ্ছ। এরা সমুদ্রের তলদেশে শিকার করে। সমুদ্রের প্রায় সাতশ ফুট নিচে যেখানে খাবার অনেক বেশি সহজলভ্য সেখানে শিকার করতে পছন্দ করে এ মাছটি। এ মাছ প্রায় দুই মিটার লম্বা হয়। দীর্ঘ দাঁতের অধিকারী বলে এ মাছটিকে বিজ্ঞানীরা জায়ান্ট ফিশ বলতে পছন্দ করে।

ফ্যাংটুথ ফিশ
সমুদ্রের তলদেশে আরেক অদ্ভুত দর্শন মাছ হলো ফ্যাংটুথ মাছ। সমুদ্রের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার নিচে এ মাছের দেখা মেলে। সাপের বিষদাঁতের মতো দীর্ঘ দু’টি দাঁতের অধিকারী এরা। নিচের দাঁত দু’টি অপেক্ষাকৃত বড়। সমুদ্রে যে কোনো প্রাণীর শরীরের তুলনায় দাঁতের আকারের দিক থেকে এ মাছের দাঁত দীর্ঘতম। প্রায় সর্বভুক এ মাছটি যে কোনো খাবারকে তার দুই দাঁত দিয়ে শিকার করতে পারে। এমনকি তার নিজের শরীরের চেয়ে বড় কিছুকেও সে অনায়াসে ঘায়েল করতে পারে।

গালপার ফিশ
শরীরের চেয়ে অনেক বড় মাথা বিশিষ্ট এ মাছটির দেখা মেলে মধ্যাঞ্চলে। মাছটির রয়েছে চাবুকের মতো লেজ। মাছটি তার বিশাল মুখের কারণে চাইলেই বড় মাছ সাবাড় করতে পারে কিন্তু বিপত্তি বাধে তার ছোট ছোট দাঁতের জন্য। চোয়ালের তুলনায় ছোট দাঁতের কারণে মাছটিকে ছোট মাছই সাবাড় করতে হয়। এ মাছটির বাসস্থানের গভীরতা প্রায় ১০ হাজার ফুট নিচে।

কনগার ঈল
১০ ফুট লম্বায় এ মাছটির আকর্ষণ করার মতো তেমন কিছু নেই। এদিকে কনগার ঈলকে মরে ঈলের আত্মীয় বলা হয়। অন্য কোনো আকর্ষণী ক্ষমতা না থাকলেও আমেরিকান কনগার ঈল সবচেয়ে বেশি পরিচিত তার খেলুড়ে স্বভাবের কারণে। তবে এ কথাও ঠিক, সামনের দিকে ছোট, পুরু মাথা, প্রশস্ত মুখ এবং শক্ত দাঁতবিশিষ্ট এ মাছটি কিছু ক্ষতি কিন্তু করতে পারে।

SHARE

Leave a Reply