Home উপন্যাস ঘোর নিশুতি

ঘোর নিশুতি

শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ..

দপ করে নিভে গেলো হারিকেনের আলো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাশরাফির কাঁধ স্পর্শ করলো ঠাণ্ডা হাত। এ হাত ড্রাকুলার, মাশরাফি নিশ্চিত, না হয়ে পারেই না। পোড়াবাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছে ড্রাকুলাটি। কালো অন্ধকারে মিলিয়ে গেলো পোড়া সলতের লাল আলোটাও। দরদর করে ঘাম ঝরছে মাথা থেকে। শিরায় শিরায় হুটোপুটি করছে গরম রক্ত। আকুলিবিকুলি করে উঠলো মাশরাফি। আর বুঝি রক্ষে নেই।
রক্ষে হবে কী করে, নিজেইতো ডেকে এনেছে বিপদ। বিদ্যুৎ চলে গেলো। সুবোধ বালকের মতো ঘুমিয়ে যাবে। তা না, মাঝ রাতে হারিকেন জ্বালিয়ে ভাবতে বসলো পোড়াবাড়ি রহস্য নিয়ে। যেন এর একটা কিনারা করেই ছাড়বে। এবার হলো তো! বড়রা সবসময়ই মানা করেন- কখনো পোড়াবাড়ির চৌহদ্দি মাড়াবে না, ক্লাসের পড়া চুরি করে হরর-তিনগোয়েন্দা পড়বে না, রাত জেগে অশরীরির কথা ভাববে না। বেশি বেশি ভাবলেই নাকি ওরা এসে হাজির হয়। প্রথম প্রথম বিশ্বাস হতো না এসব কথা। কিন্তু সেদিন নিজের কানে শুনলো ওদের নিঃশ্বাসের শব্দ। নিজের চোখেই দেখলো ভয়ঙ্কর ড্রাকুলাটা। মনে হলো যেন মরা ব্রহ্মপুত্রের তলা ফুঁড়ে গরম রক্ত চুষে নিচ্ছিলো।
এই এই, কাঁপছিস কেনরে তুই? ভয় পেলি নাকি?
কে কে? কে আবার, এখানে ড্রাকুলা আর মাশরাফি ছাড়া আরতো কেউ নেই। কিন্তু কথা বললো যে! ড্রাকুলারা মানুষের সাথে কথাও বলে নাকি! একদম মানুষের মতো গলা।
আ..হা। তুই দেখি একেবারে ভীতুর ডিম। আমি মুমিতু।
মুমিতু? কোন মুমিতু? কে মুমিতু?
আমি মুমিতু রে মুমিতু। তোর খালাতো ভাই মুমিতু। এবার কাঁপাকাঁপি বন্ধ কর দেখি।
কলজেয় পানি ফিরে এলো মাশরাফির। তবে কাঁপুনি বন্ধ হতে একটু সময় নিলো। তারপর এমন ভাব করলো যেন কিছুই হয়নি। বললো, ও মুমিতো…। এতটুকু বলে থেমে যেতে পারলে কোনো ঝামেলা বাঁধতো না। কিন্তু আগের কথার রেশ ধরে মুখ ফসকে বলেই ফেললো, … আমিতো ভেবেছিলাম ড্রাকুলা বুঝি।
বলেছে তো সেরেছে। একেবারে জেঁকে বসলো মুমিতু- কী সাঙ্ঘাতিক কাণ্ড! তুই তাহলে অতিপ্রাকৃতে বিশ্বাস করিস? তুই কি মনে করিস সত্যি সত্যি রক্তচুষা ড্রাকুলা আছে? তোর ধারণা ওরা রাতের অন্ধকারে কফিনের ডালা খুলে বেরিয়ে আসে? এমন ধরনের গোটা দশেক প্রশ্ন করে ফেললো এক নিঃশ্বাসে। মুমিতুর প্রশ্নের তোড়ে লজ্জায় মুখ লাল হয়ে এলো মাশরাফির। তারপরও আত্মপক্ষ সমর্থন করতে ছাড়েনি- আমি কি এমনি এমনি বিশ্বাস করি? তুই জানিস না, ওই পোড়াবাড়িতে একটি ড্রাকুলা থাকে।
কথা শুনে হেসেই কুটি কুটি মুমিতু, দেখেছিস কখনো?
একদম হেঁয়ালি করবি না। প্রায়ই ওটা গরু-ছাগলের রক্ত চুষে খায়। রাত-বিরাতে মানুষও নিখোঁজ হয় ওখানে। প্রায় সকালেই পোড়াবাড়ির সামনে রক্তশূন্য সাদা দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। রাতভর তিয়াশ মিটিয়ে রক্ত পান করে বাড়ির সামনে ফেলে রাখে শরীর। সকালে কারো জ্ঞান ফেরে, কারো ফেরে না।
আরে ধূর। তোদের পোড়াবাড়িতে ড্রাকুলা-ট্রাকুলা আসবে কোত্থেকে? ড্রাকুলা তো ব্রাম স্টোকারের লেখা একটি গা ছমছমে কাহিনী।
দুই দিনের জন্য বেড়াতে এসে চট করে বলে দিলি, এখানে কোনো ড্রাকুলা-ট্রাকুলা নাই।
হরর আর গোয়েন্দা কাহিনী পড়ে পড়ে তোর মাথাটাই খারাপ হয়েছে। ওসব কল্পকাহিনী কেবল বই এর পাতায় মানায়, বাস্তবে নয়।
এটা আমি ভালো করেই জানি, তোকে শিখিয়ে দিতে হবে না। তবে আমাদের পোড়াবাড়িতে যে একটি ড্রাকুলা আছে, সেটা আমি নিজের চোখে দেখেছি।
মহা বিরক্ত হলো মুমিতু- এটা তোর বিভ্রম বা মনের ভয়।
এ বিষয়ে আর কথা বলতে চাচ্ছি না। যদি চাস তোকে দেখাতে পারি।
দেখাতে পারি মানে? তুই কি বলতে চাচ্ছিস ব্রাম স্টোকারের ড্রাকুলার মতো এখানেও বন্দী হয়ে আছে কোনো এক পাপীর অশুভ আত্মা? নিশুতিতে সে কফিন ছেড়ে বেরিয়ে আসে বাদুড়ের রূপ নিয়ে? উড়ে গিয়ে মানুষের গলার রগ ফুটিয়ে চুষে নেয় রক্ত? তারপর ভোরের আলো ফোটার আগেই আবার ঢুকে যায় কফিনে?
এতসব জানি না। এখানে ড্রাকুলা থাকে, এটাই সত্যি। চল এখন-ই তোকে দেখিয়ে আনবো। প্রস্তাবটা দিয়ে সাথে সাথেই পিছিয়ে গেলো মাশরাফি। কিন্তু ভুল একবার করে ফেললে আর নিস্তার নেই, অন্তত মুমিতুর হাত থেকে।
এখন ভয় পাচ্ছিস কেন? খালাম্মা-খালু টের পাবেন না। চল, ওনারা নাক ডেকে ঘুমুচ্ছেন।
না মানে, বলছিলাম কী…। আমতা আমতা শুরু করলো মাশরাফি।
ও তাহলে মানছিস যে, ওই পোড়াবাড়িতে কোনো ড্রাকুলা নেই। থাকলে তো দেখাতে পারতি।
কথাটা তীরের মতো বিঁধলো মাশরাফির গায়ে। ঠিক করলো সাহস করে মুমিতুকে নিয়ে যাবে পোড়াবাড়ির কাছে। দূর থেকে ড্রাকুলাটিকে একবার দেখিয়েই চলে আসবে। অবশ্য ড্রাকুলার চোখ ফাঁকি দিয়ে আসাটাও আরেক মুস্কিলের কাজ। মহা বিপদে পড়ে গেলো সে। কিন্তু মুমিতু ততক্ষণে চৌকাঠ পেরিয়ে সিঁড়িতে। কী আর করা! মাশরাফিকেও বেরোতে হলো।
ভাগ্যিস জোসনা রাত। কিন্তু জোসনা হলে কী হবে, কুয়াশার মায়াবি জালে লুকোচুরি খেলছে চাঁদের পসর। দূরের গাছ-গাছালি দেখা যাচ্ছে তো যাচ্ছে না। জনমানবের চিহ্ন নেই, ভর নিশিতে থাকার কথাও নয়। একদম নিঝুম নিরালা। মরা ব্রহ্মপুত্র’র কাশবন থেকে হঠাৎ হঠাৎ-ই ভেসে আসছে শিয়ালের ডাক। এমনিতেই ঠাণ্ডা, তার ওপর শিড়দাঁড়া বেয়ে আরেকটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেলো মাশরাফির। আচমকা শোওও করে ভেসে গেলো কনকনে বাতাস। এক মুহূর্তের জন্য নড়ে উঠলো পোড়াবাড়ির সামনের গাছগুলো। ভয়ে আর এগুতে ইচ্ছে করছে না মাশরাফির। আমরা বরং এখানেই দাঁড়াই। ড্রাকুলাটা পোড়াবাড়ি ছেড়ে এদিকেও আসতে পারে, তখন না হয় দেখে নেব।
এতো ভয় পাচ্ছিস কেন? এখান থেকে তো ঠিকমতো পোড়াবাড়িটাই দেখা যাচ্ছে না। আর ওসব ড্রাকুলার ছায়া-টায়া দেখালে হবে না। আমি চাই মূর্তমান ড্রাকুলা। চল সামনে হাঁটি।
এখানে কিছুক্ষণ দাঁড়াই না। তারপর দেখা না মিললে না হয় আরো এগোবো।
আচ্ছা ঠিক আছে, এত করে যেহেতু বলছিস কিছুক্ষণ না হয় অপেক্ষা করলাম।
কাহিনীর জালে আটকা পড়ে কখন যে ওরা এগিয়ে এসেছে পোড়াবাড়ির কাছাকাছি টেরই পায়নি। মাথায় সঙ্কেত বেজে উঠলো, এখন দুপুর রাত। আর ওরা দাঁড়িয়ে আছে পোড়াবাড়ির ঠিক সামনে। ব্রহ্মপুত্র’র তীরেই পুরনো রাজবাড়ি এটি। কেউ থাকে না। সামনের দিকে ছোটবড় অনেকগুলো ফটক। সবগুলো সিল করা। প্রধান ফটকের বাম দিকে আট-দশটি ঘোড়ার মূর্তি, সামনের দু’পা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। যেন এখনি চিঁহি স্বরে ছুটবে। ডান দিকে কয়েকটি জঙ্গলশিঙে হরিণের মূর্তি, তাকিয়ে আছে ঠিক ওদের দিকে। এখন আর কোনো উপায় নেই। আজ নির্ঘাত ড্রাকুলার কবলে পড়তে হবে। তারপর রক্তশূন্য অবস্থায় সাদা হয়ে পড়ে থাকতে হবে এখানে। এ ভাবনা যে কেবল মাশরাফির, এমন নয়। মুমিতুও ভীষণ ভড়কে গেছে। পোড়াবাড়িতে আসার পর মনে হচ্ছে ঠিকই এর ভেতর একটি ড্রাকুলা আছে। প্রতিমূহূর্তে অপেক্ষা করছে এই বুঝি রক্তচুষাটা কাঁধে বসিয়ে দিলো তীক্ষ্ম দাঁত। কিন্তু না, দাঁতও বসাচ্ছে না, আবার ঘোর থেকেও দিচ্ছে না মুক্তি। আটকে গেছে মায়াজালে।

দুই.
আস্তে-ধীরে বাস থেকে নামলেন জাফর হায়দার। নেমেই বুঝতে পারলেন মস্ত ভুল করেছেন তিনি। রিকশা তো দূরের কথা, জনমানবের চিহ্ন পর্যন্ত নেই এখানে। রাত খুব একটা গড়ায়নি। তবুও সবকিছু নিস্তব্ধ। কেমন যেন গা শির শির করে উঠছে। সুরাইয়া বুবুকে একবার ফোন করে এলেই বিপত্তিটা ঘটতো না। এগিয়ে নেয়ার জন্য ঠিক ঠিকই কাউকে না কাউকে পাঠিয়ে দিতেন। যাই হোক, আগে যখন জানানো হয়নি, এখন তীরে এসে তরী ডুবিয়ে লাভ নেই। বরং আচমকা বুবুর সামনে হাজির হয়ে বেশ চমকে দেয়া যাবে।
হুঁশ করে একটি বাস চলে গেলো মহাসড়ক ধরে। জাফর হায়দারও ধুলো উড়িয়ে হাঁটতে শুরু করলেন মেঠো পথে। পায়ের থপ থপ শব্দ আর ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক তার সঙ্গী। মাঝে মাঝে জোনাকির মিছিলও দেখা যাচ্ছে। কাঁচা রাস্তা ধরে কিছুদূর এগুলেই প্রাইমারি স্কুল। তারপর ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে যেতে হবে বাকি পথটা। একটু ভয়ভয় করছে, তবে চেনা পথ। সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তাছাড়া ধবল জোসনায় সব ফক ফক করছে।
রিকশার বেল বাজার শব্দে সামনে তাকালেন জাফর। ওইতো জঙ্গলের দিক থেকে একটা রিকশা এগিয়ে আসছে। যাক, বাঁচা গেলো তাহলে। মুহূর্তের মাঝেই যেন রিকশাটা উড়ে এলো তার সামনে, অনেকটা জাদুর মতো। হাত উঁচু করলেন জাফর। কড়া ব্রেক কষলো চালক। থেমে গেলো রিকশা। তারপর জাফর হায়দারের চোখের দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে থাকলো চালক। ঠাণ্ডা চাহনি, তবে রক্তবর্ণ চোখ। অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে অস্বস্তি লাগলো জাফরের। ভয়ও পেলেন কিছুটা। কিন্তু চেহারায় গোপন রাখার চেষ্টা করলেন, সফলও হলেন। মোটামুটি চড়া গলায়-ই জিজ্ঞেস করতে পারলেন, চান্দেরটেক যাবে নাকি?
জবাবে কথা বললো না চালক, দৃষ্টিটা আরো তীক্ষè হয়ে উঠলো কেবল। ব্যাপারটা মোটেও ভালো ঠেকছে না জাফর হায়দারের। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এলো তার। এভাবে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পর চোখের পলকেই রিকশাটা ঘুরিয়ে নিলো চালক। তারপর রহস্য চোখে ইশারা করলো রিকশায় ওঠার জন্য। সম্মোহিতের মতো উঠে বসলেন জাফর হায়দার।
চলতে শুরু করেছে রিকশা, স্বাভাবিক গতিতেই। নিশ্চিন্ত হলেন তিনি। ব্ল্যাক স্যুটের পকেট হাতরিয়ে খুঁজে পেলেন ঘোড়ার ছাপ দেয়া লাইটারটি। তাকালেন কুপি আকৃতির পুরনো লাইটারের দিকে। অনুজ্জ্বল ঘোড়ার ছাপটা এখনো আগের মতোই আছে। লাগামছাড়া একটি ঘোড়া টগবগ টগবগ করে ছুটছে। কাঁধে কোনো সওয়ারি নেই, নেই কোনো পিছুটান। সামনের দু’পা এতটাই ওপরে, দেখে মনে হতে পারে এটি এক অশ্বমানব। কারণ পেছনের পা দুটোর ওপর ভর দিয়ে খাড়া হয়ে আছে ঘোড়াটি। তীক্ষè ও সূঁচালো ক্ষুর। এলোমেলো কেশর। অদ্ভুত আর পুরনো এই লাইটারটি তাকে উপহার দিয়েছিলেন আফ্রিকান এক পুরোহিত। তিনি ঘুরতে এসেছিলেন বাংলাদেশে। এ দেশে ভদ্রলোককে গাইড করার দায়িত্ব ছিলো জাফর হায়দারের ট্যুরিজম কোম্পানির। সেই সুবাদে তার সাথে হৃদ্যতা গড়ে ওঠে পুরোহিতের। জাফরের আতিথেয়তায় তিনি বেশ মুগ্ধ ছিলেন। তাই বাংলাদেশ ছেড়ে যাবার সময় এ লাইটারটি জাফরকে দিয়ে যান। বলেছিলেন, এটি নাকি নানাবিধ গুন সম্পন্ন অসংখ্য ধাতুর তৈরি। পুরোহিত এটি খুঁজে পেয়েছিলেন পুরনো এক সমাধিতে। তার বিশ্বাস, এর কোনো না কোনো ক্ষমতা আছে। কথাটা বিশ্বাস হয়নি জাফরের। এ পর্যন্ত কোনো ক্ষমতার প্রমাণও পাননি তিনি, অবশ্য পাওয়ার কথাও নয়। তারপরও এটা যতœ করে সাথে রাখেন, অদ্ভুত গড়ন আর হাজার বছরের পুরনো বলে।
লাইটারটি ব্ল্যাক স্যুটের পকেটে রেখে দিতেই লক্ষ্য করলেন রিকশার গতি আর আগের মতো নেই। চলছে উল্কার বেগে। এই ব্যাটা, আস্তে চালা। খেঁকিয়ে উঠলেন জাফর হায়দার। কিন্তু চালক তখনো নির্বিকার। আস্তে চালানো তো দূরের কথা বরং তার মাঝে ফুটে উঠেছে পৈশাচিক উল্লাস। রিকশার গতি বাড়ছে, বাড়ছে এবং বাড়ছে। জাফর হায়দার বিচলিত। সিটে বসে থাকতে পারছেন না। উঁচু-নিচু মেঠো পথ দিয়ে রিকশাটা একবার যেন আকাশে উঠছে আবার নেমে যাচ্ছে পাতালে।
একজন মানুষের শরীরে এত জোর আসে কোত্থেকে! হঠাৎ দৃষ্টি গেলো প্যাডেলের দিকে। তারপরই চোখ কচলালেন তিনি। একি ভ্রান্তি নাকি অন্য কিছু? যে পা দুটি অনবরত প্যাডেল মেরে যাচ্ছে, সেগুলো মানুষের নয় ঘোড়ার পা। ঠিক লাইটারের ঘোড়ার মতোই- তীক্ষè ও সূঁচালো ক্ষুর। ‘কী হচ্ছে এসব, এই হচ্ছেটা কী? রিকশা থামাও।’ ভয়ার্ত গলায় চেঁচিয়ে উঠলেও ভালো করেই বুঝতে পারলেন, এই মুহূর্তে থামানোর চেষ্টা নিরর্থক। রিকশাটা ততক্ষণে প্রাইমারি স্কুলের কাছাকাছি চলে এসেছে। মুহূর্তের মাঝেই ঢুাকে যাবে ঘন জঙ্গলে। কী করবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না। কিছু একটা ভেবে পকেট থেকে লাইটারটা বের করলেন আবার। তাকালেন এর দিকে। অদ্ভুত ব্যাপার! ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলেন চালককে। হ্যাঁ, চালকের ঘাড়েও ঘোড়ার মতো কেশর। হালকা, জোসনারঙা কেশর। লাইটারের ঘোড়া আর চালকের ঘোড়ার গড়ন অনেকটাই কাছাকাছি।
ভালো মন্দ ভাবার সময় হাতে নেই। লাফিয়ে পড়লেন রিকশা থেকে। একপাক ঘুরে গিয়ে ঠেকলেন শক্ত গাছের সাথে। কতটুকু আঘাত পেলেন সেটা পরে দেখা যাবে। আগে চোখ ঘুরালেন রিকশার দিকে। থেমে গেছে চালক। ঘাড় ঘুরিয়ে এবার সরাসরি তাকালো জাফর হায়দারের মুখোমুখি। এ এক বীভৎস দৃশ্য! চালকের কাঁচা-পাকা দাড়ি বেয়ে ঝরছে তাজা রক্ত।
অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে কাঁপতে থাকলেন জাফর হায়দার। তখনো লাইটারটা হাতেই আছে। সাহস ফিরিয়ে আনার জন্য স্পার্ক করলেন। দপ করে জ্বলে উঠলো আগুন। কয়েক ইঞ্চি এলাকা ফর্সা হয়ে এলো। লাইটারের আলোয় আবার দেখার চেষ্টা করলেন চালককে, দেখলেনও। তবে মুখ নয়, কেশরসমেত ঘাড়। ভারী পা ফেলে ঢুকে যাচ্ছে স্কুলঘরে। রিকশাটা উধাও।
থমথমে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে বাকি পথ কিভাবে দৌড়ে গেলেন, তা ব্যাখ্যা করার মতো নয়। চোখ বন্ধ করে, রুদ্ধশ্বাসে, খালি পায়ে ছুটেছিলেন তিনি। থামলেন একেবারে সুরাইয়া বুবুর সদর দরজায়।
ঘড়ির কাটা তখনো দশটা পার হয়নি। সদর দরজা ভেঙে ফেলার মতো অবস্থা। কিন্তু ভেতর থেকে সাড়াশব্দ নেই। ডাকাডাকি করছেন, তবুও না। নয়া দিঘীকে সামনে রেখে দক্ষিণমুখী এ বাড়িকে ছোটখাট আধুনিক রাজবাড়ি বললেও ভুল হবে না। জঙ্গলঘেরা চান্দেরটেক কেন, আশপাশের দশ গ্রামেও এমন একটি বাড়ি মেলা ভার।
খুলছে না তো খুলছেই না। মহা মুস্কিলে পড়া গেলো, একদিকে পিশাচ চালকের ভয়, অপরদিকে অজানা শঙ্কা। কী হলো বুবুর, বাড়ির ভেতর কেউ নেই নাকি? পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলেন জাফর। নাহ, হতাশ হতে হলো। মোবাইলের চার্জ একেবারেই নেই। চরম বিস্ময়ে হোঁচট খেলেন তিনি। এত দ্রুত চার্জ নিঃশেষ হলো কিভাবে! রাগে-ক্ষোভে প্রচণ্ড লাথি বসালেন দরজায়। সাথে সাথেই ভেতর থেকে ভেসে এলো আতঙ্কিত চিৎকার।
কে দিলো এমন চিৎকার? এটাতো বুবুর গলা। হ্যাঁ, স্পষ্ট বুঝতে পারলেন তিনি, বুবুই চিৎকার করছেন।

তিন.
ভীষণরকম উত্তেজিত মাশরাফি। প্রথমত কুকুরগুলোর ওপর। দ্বিতীয়ত মুমিতুর ওপর। কারণ কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করে জাগিয়ে তুলেছে ওকে। আর মুমিতু আবারো বিছানা ছেড়ে উধাও। পুরোদস্তুর গবেট একটা! পোড়াবাড়ির ঘটনাটা এখনো মাথায় নিয়ে ঘুরছে। কম করে হলেও দশ-এগারো মাস আগের ঘটনা। এ নিয়ে এতদিন কেউ পাগলামি করে নাকি! ওরা দু’জনইতো অজ্ঞান হয়েছিলো পোড়াবাড়ির সামনে। সকালে ওদের পড়ে থাকতে দেখলো গ্রামের লোকজন। জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর পই পই করে খুঁজেছে ঘাড়ের দিকটা। কোথাও কোনো ক্ষত চিহ্ন নেই। ড্রাকুলাটা ওদের রক্ত খায়নি। হয়তো পছন্দ হয়নি বলে ছেড়ে দিয়েছে। যে কারণেই ছাড়–ক না কেন, বাবার কানমলা খাওয়ার পর ঘটনাটার কথা বেমালুম ভুলে গেছে মাশরাফি। আর কোনো দিন পোড়াবাড়ির ছায়া মাড়ায়নি। কী নিয়ে যেন ব্যস্ত থাকে সারাক্ষণ মুমিতু। পড়ার ঘর স্তুপ করে রেখেছে হরর বই দিয়ে।
আর এসব কারণেই ঢাকায় আসতে হলো মাশরাফিকে। কয়েকদিন থাকতে হবে মুমিতুকে সঙ্গ দেয়ার জন্য । আসলো তো ঘাড়ে বিপদ চাপলো মাশরাফির। সারাক্ষণ বসে বসে মুমিতুর হরর গল্প শুনতে হয়। শুনতে না চাইলেও জোর করে শোনায়। আবার মাঝে মাঝেই কোথায় যেন হারিয়ে যায় ও। তারপর রীতিমত ঠেলা-ধাক্কা দিয়ে বাস্তবে ফিরিয়ে আনতে হয়। রাতে বিছানা হাতড়িয়ে মুমিতুকে পাওয়া যায় না। হয়তো পায়চারি করছে, অথবা দেখা যায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে। এখনো নিশ্চয়ই বারান্দায় আছে সে। বড়জোর ছাদে যেতে পারে।
চুলোয় যাক সব। একদণ্ড ঘুমিয়ে নিতে চাইলো মাশরাফি। চোখজোড়া প্রায় লেগে আসছিলো। আবার সেই কুকুরের ডাক- ঘেউ ঘেউ ঘেউ। এবার যেন গলায় মাইক লাগিয়ে ডাকছে। ঢাকা শহরের মশার আকৃতি বড় হয় এটা জানা আছে মাশরাফির। তবে এখানকার নেড়ি কুত্তার গলাও যে এমন চড়া, তা জানতো না। রাজধানী বলে কথা।
চরম বিরক্তিতে লাইট অন করলো মাশরাফি। নেমে এলো বিছানা থেকে। আজ এর একটা শেষ দেখতে হবে। রাত-বিরাতে ঘুম রেখে ভণ্ডামি! জোরে জোরে ডাকলো মুমিতুকে। দরজা খুলে গেলো বারান্দার। সামনে আম পাতার ভেতর থেকে কিছু একটা জ্বলে উঠতে দেখলো মাশরাফি। চারটে জ্বলজ্বলে চোখ! নড়ে উঠলো ওগুলো।
ওহ্ বাঁচা গেলো তাহলে। ওগুলো কুকুরের চোখ। একজোড়া কুকুর স্থির তাকিয়েছিলো মুমিতুর চোখের দিকে।
মাশরাফি বারান্দায় পা রাখতেই কুঁই কুঁই শব্দ করে পালিয়ে গেল ওগুলো। মুমিতুর দৃষ্টি মাশরাফির দিকে। কিছুটা বিরক্ত, তবে চেপে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু পারলো না। তড়াক করে ছিঁড়ে নিলো আম গাছের একটি পাতা। ঝাঁকুনি খেলো গাছের ডাল। পাতায় পাতায় সৃষ্টি হলো আলোড়ন। আমগাছটা ঠিক তিনতলা সমান। ওরাও দাঁড়িয়ে আছে তিনতলায়, মুমিতুর ঘরের বারান্দায়। বাড়ির নিচতলাটায় বাচ্চাদের স্কুল। দ্বিতীয় তলায় থাকেন বাড়ির অন্যরা। আর তিনতলায় মুমিতুর রুম ছাড়াও রয়েছে একটি গেস্ট রুম। জুরাইন এলাকার অন্য বাড়ির তুলনায় ওদের বাড়িটা ঘিঞ্জি গলিতে নয়। মোটামোটি আরামদায়ক বলা চলে। মুমিতুর বারান্দাটা রাস্তার দিকে মুখ করা। তবুও রাস্তার সব কিছু স্পষ্ট নয় এখান থেকে। ভালো করে কিছু দেখতে হলে ইতিউতি করতে হয়। মাশরাফি ইতিউতি করে বুঝার চেষ্টা করলো কুকুরগুলো কোথায় আছে।
কী ব্যপার, এত জোরে জোরে ডাকলি যে? জিজ্ঞেস করল মুমিতু।
ডাকব না তো কী করব, মধ্যরাতে বারান্দায় করছিসটা কী?
অন্ধকার দেখছিলাম। উপভোগ করছিলাম ঘোর নিশুতি।
আমি তো দেখলাম, তুই কুকুরের সাথে চোখে চোখে প্রেম করছিলি। আমাকে দেখে লজ্জায় সরে গেলো ওগুলো।
বলতে পারিস অনেকটা প্রেমই করছিলাম। অন্ধকারের ভেতর থেকে কুকুরের দুই জোড়া চোখ একটা নীলাভ ঘোর তৈরি করেছিলো।
আ-হা-রে …। এতদিনে তাহলে কুকুর-প্রেমিক হয়েছিস? মুখে চুক চুক ধরনের শব্দ করলো মাশরাফি। কিন্তু মোটেও খেপিয়ে তুলতে পারলো না মুমিতুকে। এবার ওর হাত ধরে টান দিলো মাশরাফি, বাদ দে তোর প্রেম। ঘুমোতে যাবি চল।
কিন্তু মুমিতুকে এক পা পর্যন্ত নড়াতে পারলো না। বরং ওর পাল্টা ঝাঁকুনিতে স্থির দাঁড়িয়ে যেতে হলো মাশরাফিকে, কিছুক্ষণ দাঁড়া না এখানে। দেখবি অন্ধকারেরও একটা সৌন্দর্য্য আছে।
তাই নাকি! অন্ধকারের ভেতরও তুই সৌন্দর্য্য খুঁজে পেয়েছিস? খোঁচা মারলো মাশরাফি। কিন্তু এবারও বিচলিত হলো না মুমিতু, হ্যাঁ, তুই আঁধারে তলিয়ে যেতে যেতেই একসময় আলোর সন্ধান পাবি। এ আলোর রঙ কেমন জানিস?
কেমন?
কালো।
বলিস কি, আলোর রঙ আবার কালো হয় কিভাবে?
এই আলো অন্ধকারের। কালো রঙের আলো।

চার.
একশ’ থেকে গুনতে শুরু করলো মাশরাফি। উল্টো করে গুনে তিন, দুই, এক, শূন্য পর্যন্ত এসে থামলো। তারপর কিছুক্ষণ নীরবতা। মাশরাফির চোখ বন্ধ। মুমিতু উবু হয়ে আছে মাশরাফির দিকে। লাইট অফ। স্তব্ধ পরিবেশ। বাইরে কুকুরগুলোও ডাকছে না আজ। ঝিম মেরে আছে পুরো কামরা। মেঝেতে একটি পিন পড়লেও শব্দ হবে। মশার অত্যাচার নেই। মেডিটেশনে বসার আগে কড়া করে এরোসল ¯েপ্র করেছে। তারপর বাতাসে ছড়িয়ে দিয়েছে এয়ার ফ্রেশনার। ফুলের সুগন্ধিতে ভরে উঠেছে কামরা।
নিঃশব্দে নড়ে উঠলো মুমিতু। শান্ত, কিন্তু ভারী গলায় কথা বললো সে- আমাকে শুনতে পাচ্ছিস?
দুর্বল গলায় জবাব দিলো মাশরাফি, হু।
মাথার ভেতরটা ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছে?
হু।
চোখ ভারী হয়ে এসেছে?
হু।
ঠোঁট নাড়তে ইচ্ছে করছে?
হু।
এবার মুমিতু নিশ্চিত হলো, মাশরাফির চিন্তা এখন স্থির। আসলে ঠোঁট নাড়তে মোটেও ইচ্ছে করছে না মাশরাফির। ওর মাঝে ভর করেছে জড়তা। আরামে অসাড় হয়ে এসেছে ঠোঁট। মস্তিষ্কও স্থির। অপেক্ষা করছে সুন্দর, আরামদায়ক কিছুর জন্য। তিনবার ‘হু’ বলার পর মাশরাফি এখন ‘হু’ জড়তায় ভাসছে। তাই চতুর্থবার ‘না’ শব্দটা উচ্চারণ করা কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে ওর কাছে।
এরপর যতগুলো প্রশ্ন করল মুমিতু, প্রতিটির জবাব দিল ‘হ্যাঁ’ বলে।
সামনে কিছু দেখতে পাচ্ছিস? কী দেখতে পাচ্ছিস? একটা বাগান? তুই বাগানের ভেতর আছিস? ওখানে কী বসন্ত এসেছে? কী কী ফুল ফুটেছে? লাল গোলাপ, সাদা গোলাপ। সারি সারি গাঁদা ফুল? শিউলি, পলাশ, টগর, জবা, সোহেলিÑ সব ফুলই আছে? ঘ্রাণ পাচ্ছিস, মাতোয়ারা ঘ্রাণ? ওটা বেলি ফুলের ঘ্রাণ। আর কিছু দেখতে পাচ্ছিস? একটা ছিমছাম ঘর আছে ওখানে? ঘরের চারপাশে ফুল। ওপরে ফুটে আছে গন্ধরাজ। সামনের বারান্দায় গাঁদা ফুলের কার্পেট? ফুলেল ঘর থেকে ঝলমলে কিরণ ছড়াচ্ছে? ওটা তোর ঘর। আর এই বাগান, এই পৃথিবী, এই ঐশ্বর্য সবটাই তোর বাড়ি। মনের বাড়ি। মনের বাড়িতে শরীর নিয়ে ঢুকতে মানা। ওখানে কেবল মন নিয়ে ঢুকার অনুমতি আছে। তুই ঢুকতে চাস? তাহলে বারান্দায় উঠে দাঁড়া, গাঁদা ফুলের কার্পেটের ওপর। আলতো পা ফেলবি, ফুলগুলো থেতলাবি না। ওখানে অপেক্ষা কর। একদম তাড়াহুড়ো করবি না। এটা তোর ওয়েটিং রুম। এবার শরীর থেকে মনকে আলাদা করার চেষ্টা কর। তোর মাথার চুলগুলো মাটির তৈরি? তোর কপাল, নাক, চোখ, মুখ সব মাটি হয়ে যাচ্ছে?
এবার আর শব্দ করলো না মাশরাফি। কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করলো মুমিতু। তারপর নিজের মতো করে ছেড়ে দিলো মাশরাফিকে। তবে ছাড়ার আগে শেষ বারের মতো বলে দিলো, ধীরে ধীরে তোর সারা শরীর মাটি হয়ে যাবে। তারপর শরীর গুড়িয়ে যাবে মাটির সাথে। মন আলাদা হবে শরীর থেকে। তখন দেখবি খুলে যাচ্ছে মনের বাড়ির দরজা।
অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হলো মুমিতুর কথা। মাশরাফি বুঝতে পারলো ওর থুতনি, গলা, বুক মাটি হয়ে যাচ্ছে। ক্রমেই মাটি হতে লাগলো পেট, কোমর, পা এবং সর্বশেষ পায়ের নখ।
মাশরাফিকে আরো অবাক করে দিয়ে ওর মাটির শরীর ভেঙে পড়তে শুরু করলো। প্রথমে ধস নামলো মাথার দিকটায়। মাথার খুলি ধসে পড়লো শরীর থেকে। তারপর ধসে পড়লো কাঁধ, পেট এবং সর্বশেষ পদ্মাসনে পেঁচানো দুই পা। গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে মিশে গেলো মাটির সাথে। এখন আর একবিন্দু শরীরের অস্তিত্ব নেই। অস্তিত্ব আছে কেবল মাশরাফির মনের। হালকা মনে হলো নিজেকে। কেমন যেন পাখা গজিয়েছে মনে। চড়–ই পাখির মতো ফুড়–ৎ করে উড়ে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে।
ওম্মা, দেখ দেখি কী কাণ্ড! মনের বাড়ির দরজা একেবারে হাঁ হয়ে আছে। কখন খুলে গেলো টেরই পায়নি মাশরাফি। খুব চমৎকার বাড়ি। দেখে মন জুড়িয়ে যাচ্ছে। মাশরাফি এগিয়ে গেলো দরজায়। বাহ্, ওখানটায় লাল গোলাপের পাপড়ি আর পাপড়ি। কে যেন সব আয়োজন করে রেখেছে। লাল গালিচা বিছিয়ে রেখেছে মাশরাফির জন্য। আলতো করে পা রাখলো গালিচার ওপর। সাথে সাথেই বদলে গেলো সব। এ এক অন্য জগত! অন্য পৃথিবী!!
বাতাসের হালকা ঢেউ খেলে গেলো। ঝিরিঝিরি বাতাস। সামনের চুলগুলো দুলে উঠলো মাশরাফির। নাকে ফুলের ঘ্রাণ। চোখে বসন্তের রঙ। আর মনে প্রশান্তির আমেজ। আহ, ও একাই এক পৃথিবীর মালিক।
‘কুউও’ করে ডেকে উঠলো কোকিল। প্রথমে মৃদু, সুরেলা। তারপর ধীরে ধীরে গলাটা কর্কশ হতে লাগলো। একসময় মনে হলো ওটা কোকিল নয়, কাকের গলা।
মূলত কাকেরও নয়, সেটা হলো মুমিতুর গলা। এবার সে মনের বাড়ি থেকে ফিরিয়ে আনতে চাইছে মাশরাফিকে, এই মাশরাফি, শুনতে পাচ্ছিস আমাকে?
হু।
মনের বাড়িটা খুব ভালো লেগেছে বুঝি?
হু।
এবার মনের বাড়ির দরজাটা খোঁজ।
হু।
দরজা খুঁজবি আর একশ’ থেকে উল্টো করে গুনতে থাকবি।
হু, হু, হু … এভাবে একশ’বার ‘হু’ উচ্চারণ করলো মাশরাফি। খুবই ধীরে এবং সতর্কভাবে। তারপর ওকে চোখ খুলতে বললো মুমিতু। আস্তে করে চোখের পাতা দুটি আলাদা করলো। ভীষণ ক্লান্ত। চেহারা ঢুলুঢুলু। মাশরাফির কাঁধে ঝাঁকুনি দিলো মুমিতু, এবার স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা কর।
মাশরাফি বুঝতে পারলো সে আর মনের বাড়িতে নেই। বসে আছে মুমিতুর কামরায়। ইস্, আর কিছুক্ষণ যদি থাকা যেতো! মুমিতুটা যে কী, জোর করে মনের বাড়িতে ঢোকালো। আবার হুট করেই ফিরিয়ে নিয়ে এলো।
ঘরের বাতি জ্বাললো মুমিতু। সব স্বাভাবিক হয়ে এলো। মাশরাফির মাথাটা কেমন হালকা হালকা লাগছে। কোনো দুশ্চিন্তা নেই।

পাঁচ.
মানুষের টাক কয় ধরনের হয় জানিস?
এটা আবার কেমন প্রশ্ন করলো মুমিতু! কপালে ভাঁজ পড়লো মাশরাফির। মুমিতুর বাদরামীর একটা সীমা থাকা উচিত। প্রথমে ভাবলো প্রশ্নটা এড়িয়ে যাবে। কিন্তু কৌতূহল দমাতে পারলো না। জিজ্ঞেস করেই বসলো, কয় ধরনের হয়?
তিন ধরনের। একটা হলো সুখটাক।
সুখটাক!
হ্যাঁ, সুখটাক। এ ধরনের টাক সাধারণত দেখা যায় উচ্চবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তদের মাথায়। তবে সবকিছুরই ব্যতিক্রম আছে। সুখটাকওয়ালাদের টাক থাকে তেলতেলে, মোলায়েম। রোদের আলো পড়লে চিক চিক করে। টেনশনে থাকলে ওদের টাকে শিশিরবিন্দুর মতো ঘাম জমে।
হা হা করে হেসে উঠলো মাশরাফি, বাহ, ভালো ব্যখ্যা দিলি তো।
আর একটা হলো দুঃখটাক।
দুঃখটাক! ওটা কি দুঃখী মানুষের টাক নাকি?
হ্যাঁ, দুঃখী মানুষের টাক। এ ধরনের টাক হয় খসখসে, রুক্ষ। এটা বেশি দেখা যায় নিম্নবিত্তদের মাথায়। কদাচিৎ উচ্চ ও মধ্যবিত্তদের মাথায়ও থাকে। দুঃখটাকওয়ালারা সারাক্ষণই দুশ্চিন্তায় থাকে। আর মাথা থাকে সবসময় গরম। তাই টাকে ঘাম জমার সুযোগ-ই হয় না। একটু জমলো তো, মাথার তাপে সব বাষ্প হয়ে গেলো। নিম্নবিত্তদের দুঃখটাকে সবসময় ধুলো-ময়লা জমে থাকে। তৃতীয় টাক হলো, টুকটাক। এর উদাহরণ আমাদের ডান দিকেই দাঁড়িয়ে আছে, বলে ইশারা করলো মুমিতু।
তাকিয়ে দেখলো মাশরাফি। ছিপছিপে ধরনের এক লোক দাঁড়িয়ে বাদাম চিবুচ্ছে। মাথায় টাক। তবে টুকরো টুকরো। কোথাও চুল, কোথাও ফাঁকা। ওরা মাথার বা দিকটা দেখতে পাচ্ছে। লম্বা জুলফি। এর ওপরে টুকরো টুকরো দুই জায়গায় চুল নেই। ভীষণরকম তেলতেলে। কিছুটা লালচে রঙা। বাদামওয়ালার কাছ থেকে লবণ নিতে গিয়ে একটু ঘুরলো লোকটা। পেছনের দিকটা দেখা গেলো এবার। ওখানেও টুকটাক কয়েক জায়গায় চুল নেই। দেখে মনে হচ্ছে বেরসিক কাক ঠুকরে নিয়েছে। তাও অপরিকল্পিতভাবে।
লোকটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে দু’জন। অপরের দুর্দশা দেখে হাসতে নেই, এটা ওরা জানে। কিন্তু হাসি এসে গেলে কী করবে।
টুকটাকওয়ালা লোকটা অনবরত বাদাম চিবুচ্ছে। আর মুমিতু মাশরাফি দাঁড়িয়ে আছে বাসের অপেক্ষায়। মতিঝিল শাপলা চত্বর থেকে জুরাইন যেতে হলে মোটামুটি ঝক্কি পোহাতে হয়। কিছুদিন পর পর সরাসরি জুরাইনের বাস চালু হয়, আবার কী কারণে যেন বন্ধ হয়ে যায়। অবশ্য সবসময়ই কিছু মাইক্রোবাসকে দেখা যায় শাপলা চত্বর থেকে যাত্রী নিয়ে জুরাইনের উদ্দেশ্যে যেতে। কিন্তু রাজধানীতে মাইক্রোবাসে যাতায়াত ভয়ঙ্কর ব্যপার। আচমকা ভেতর থেকে প্যাসেঞ্জারদের কেউ অস্ত্র ধরে বসে। সাথে যা থাকে তাও দিতে হয় এবং জখমও হতে হয়। তারপর নীরব কোনো জায়গায় গাড়ি থামিয়ে নামিয়ে দেয় ছিনতাইকারীরা। তাই সহজে মাইক্রোবাসে উঠতে চায় না যাত্রীরা।
কিন্তু যে রাস্তায় বাসের সঙ্কট, সেখানে অনেক সময় বাধ্য হয়ে মাইক্রোবাসেই উঠতে হয়। জুরাইনের দু’একটা বাস এসে দাঁড়ালেই হলো, মৌচাকের মতো ঘিরে ফেলে যাত্রীরা। ঠেলাঠেলি করে উঠতে একদম ভালো লাগে না মুমিতুর। আর মাশরাফিরতো নয়ই। আজ বোধহয় মাইক্রোবাসে চড়েই যেতে হবে।
‘এই জুরাইন রেলগেট বিশ টাকা’, ‘জুরাইন রেলগেট বিশ টাকা’ হাঁকডাক করছে মাইক্রোর ড্রাইভাররা। ওখানেও ভীড় কম নয়। তবে আজ একটার পর একটা আসছে দেখে ততটা চাপ পড়ছে না। মাশরাফিকে টেনে নিয়ে মাইক্রোতে উঠে বসলো মুমিতু। মজার ব্যপার হলো মুমিতুর পাশের সিটে এসে বসলো সেই টুকটাক লোকটা।
ওরা ভাবতেও পারেনি লোকটার মাথায় গণ্ডগোল আছে। গাড়িটা তখন গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনের সামনে। লোকটা সম্ভবত এই প্রথমবার তাকালো মুমিতুর দিকে। তারপরই শুরু হলো সেই বিব্রতকর ঘটনার। আচমকা হাত চেপে ধরলো মুমিতুর- দেবতা! দেবতা!!
সচকিত হয়ে উঠলো মাইক্রোর যাত্রীরা। তাতে কোনো ভ্রƒক্ষেপ নেই টুকটাকের। সে অনবরত ‘দেবতা, দেবতা’ বলে চেঁচাচ্ছে। এক রহস্যময় উল্লাস ভর করেছে তার ওপর। এবার মুমিতুর হাত ছেড়ে পা ধরে টানাটানি শুরু করলো। মুখে ঐ এক কথা- দেবতা, দেবতা।
মাশরাফি হতচকিত। হতচকিত মাইক্রোবাসের যাত্রীরা। ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে দিলো। কিন্তু যাত্রীরা ইশারা করতেই আবার চালাতে শুরু করলো। একটা পাগলের জন্য খামোখা রাস্তায় দেরি করে লাভ নেই। ওদিকে টুকটাকের বেপরোয়া ভক্তিতে মুমিতুর অবস্থা কাহিল। কে দেবতা, কিসের দেবতা!
যাত্রীরাও বেশ মজা পেয়ে গেলো। একজন মুমিতুকে পরামর্শ দিলো, পাঁচ-দশ টাকা থাকলে দিয়ে দাও। টাকার জন্যই এসব করছে। মুমিতুও দশ টাকার একটি নোট বের করে বাড়িয়ে দিলো টুকটাকের দিকে। কিন্তু টাকা নিতে রাজি নয় সে- আপনি আমার দেবতা। আপনি আমারে জানে বাঁচাইছেন।
হাসির রোল পড়লো গাড়িতে- এ দেখছি অভিজাত পাগল। পাঁচ-দশ টাকা নেয় না।
কিন্তু টুকটাক এসবের কিছুই গায়ে মাখছে না। দুই হাত জড়ো করে ভক্তি করলো মুমিতুকে, হাঁ ভগবান, সব তোমার লীলা। আমি দেবতারে খুঁইজা মরি। আর তুমি কি না আমার পাশে আইনা বসাইয়া দিলা। হাঁ ভগবান, তোমার লীলা বোঝার সাধ্য কার!
মাইক্রোবাসটা ততক্ষণে চলে এসেছে। রেলগেটে থামার পর নেমে গেলো যাত্রীরা, মাশরাফি আর মুমিতু ছাড়া। মুমিতু এড়াতে পারছে না টুকটাককে। আর মাশরাফি নামতে পারছে না মুমিতুকে রেখে। যাত্রীদের কয়েকজন লক্ষ্য করলো ব্যপারটা। তারপর এগিয়ে এলো সাহায্য করতে।
টাকার জন্য পাগলরা কত কিছুই করে। প্রতিনিয়ত আবিষ্কার করে টাকা খসানোর নতুন নতুন কৌশল। কিছুদিন আগে রাজধানীর পথে-ঘাটে দেখা যেতো অদ্ভুত পাগল। ময়লা হাতে দাঁড়িয়ে থাকতো ওরা। মাঝে মাঝেই চড়াও হতো ভদ্র যাত্রীদের ওপর। টাকা দিতে না চাইলে ময়লা ঢেলে দিতো গায়ে। ইদানিং ওই কৌশলটা পুরনো হয়ে গেছে। তবে টুকটাকওয়ালার এই ‘দেবতা’ কৌশলটা বেশ উপভোগ্য মনে হলো মাশরাফির। যদিও মুমিতুর অবস্থা বেগতিক।
টুকটাকওয়ালার গালে ঠাস ঠাস করে দুটি চর বসিয়ে দিলো যাত্রীদের একজন। চেহারাটা কালো হয়ে এলো ওর। ছেড়ে দিলো মুমিতুর পা। তারপর মুমিতু, মাশরাফি দু’জনেই দৌড়।
ওদের পেছন পেছন দৌড়াতে লাগলো টুকটাকওয়ালাও। দৌড়ালো মুমিতুদের বাড়ির গেট পর্যন্ত।

ছয়.
রাত গভীর। চান্দেরটেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে দু’জন- জাফর হায়দার ও লোকাল থানার ওসি। এল আকৃতির দো’তলা বিল্ডিং। সামনে চৌকোনো মাঠ। মাঠের উত্তর দিকেই বিশাল কবরস্থান। মাঠ আর কবরস্থানের মাঝে ঠিক যেখানটাতে পিশাচটা এসে থেমেছিলো সেখানেই দাঁড়িয়ে আছেন ওরা। ঘন জঙ্গলের ভেতর চাঁদের আলো পড়ছে না। ওরা ঢেকে গেছেন অন্ধকারের চাদরে। থেকে থেকে ডাকছে রাতজাগা পাখি। থমথমে পরিবেশ। কথা বলছেন ওসি সাহেব, আপনি আসলে বদ্ধ পাগল। এমন কথা কেউ বিশ্বাস করে?
আমি যা দেখলাম, যা শুনলাম তারপরও অবিশ্বাস করি কী করে?
এ এলাকায় আমি চাকরি করছি অনেকদিন। এখানকার মানুষ এমনিতেই একটু রহস্যজনক। চোর-ডাকাত, বদমাশের এলাকা এটি। এখানে অনেক কিছুই অসম্ভব নয়।
মানলাম অসম্ভব নয়। কিন্তু আমি যে নিজের চোখে দেখলাম?
আপনারও বিভ্রম হয়েছে। বাস থেকে নেমে থমথমে অবস্থা দেখে আপনি ভয়ঙ্কর কিছুর মুখোমুখি হওয়ার জন্য মানসিকভাবে তৈরিই ছিলেন। তারপর আপনার তৈরি ভয়-ই আপনাকে তাড়া করলো।
আর গ্রামের অন্যরা?
অশিক্ষিত মানুষদের কথা বাদ দিন। খেয়াল করবেন গ্রামের অশিক্ষিতদেরকেই ভূতে ধরে বেশি। ভূতে ধরার প্রধান লক্ষণ হল এমন কিছু ব্যবহার করা যা সাধারণ অবস্থায় তার পক্ষে করা সম্ভব নয়।
আপনি ভুলে যাবেন না, আমি মনোবিজ্ঞানের ছাত্র।
ওহ, ভুলেই গিয়েছিলাম। দুঃখিত, মায়ের সাথে মাসির গল্প করে ফেললাম। আপনিতো আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে পাস করেছেন। তা মনোবিজ্ঞানে পড়ালেখা করে ট্যুরিজমের দিকে ঝুঁকলেন কেন?
ক্ষেপে যাচ্ছিলেন জাফর হায়দার। কিন্তু তার আগেই ক্ষেপে উঠলো থমথমে কবরস্থান। চান্দেরটেকের নীরবতা খান খান করে ভেসে এলো শিয়ালের মরণচিৎকার। ওদের চোখের সামনেই লাফিয়ে উঠলো কবরের মাচান। মাটিমাখা কাফনের কাপড় আর মাচানটিকে ঝুলে থাকতে দেখলো গাছের ডালে। তারপরই চোখে পড়লো বীভৎস সেই দৃশ্য- পিশাচটার এক হাতে শিয়ালের মুণ্ডু, আর এক হাতে ধড়। ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে। তাজা রক্তে ঢাকা পড়ে গেছে পিশাচের মুখ। উবু হয়ে কিছু একটা করলো ওটা। কয়েকমুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে ছিলো পুরো পৃথিবী। তারপরই আশপাশ থেকে মাতম শুরু করে দিলো অন্য শিয়ালেরা।
আর দেরি নয়। হোলস্টার থেকে পিস্তল বের করলেন ওসি সাহেব। লক্ষ্য স্থির করার ধৈর্য নেই। এলোমেলো গুলি ছুঁড়লেন দুই দুইবার। গুলির শব্দে আরো এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হলো জঙ্গল। তারপর আবার শুরু হলো মাতম। মাঠের দিকে এগিয়ে আসছে পিশাচটা। আরেকবার গুলি ছুঁড়লেন তিনি। পিশাচের গায়ে লাগলো কি না বোঝা গেলো না।
(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)

SHARE

2 COMMENTS

  1. oshadharon romanch.
    Jemon lekhar speed, temni shobder bebohar.
    moner barite dhukar bishoyta bhalo lageche.
    porte porte mone holo nijei dhuke jachi.
    tobe pishachtar bepare ekhono porishkar hote parchina.
    shamner shongkhar opekhay thaklam.

Leave a Reply to main Cancel reply