Home স্মরণ রসায়নশাস্ত্রের জনক জাবির ইবনে হাইয়ান

রসায়নশাস্ত্রের জনক জাবির ইবনে হাইয়ান

ড. মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম..

খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকের বিখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানী জাবির ইবনে হাইয়ান এক সুপরিচিত নাম। জাবির ছিলেন এক মস্ত বড় বিজ্ঞানী। তাঁর বৈচিত্র্যময় জীবন, বিজ্ঞানের জন্য অপরিসীম সাধনা রসায়নশাস্ত্রে অভূতপূর্ব অবদানে সত্যই বিস্মিত হতে হয়। ড. হোমইয়ার্ড বলেছেন, ‘ঞযব মৎবধঃবংঃ ঈযবসরংঃ ড়ভ ওংষধস ঢ়বৎযধঢ়ং ঃযব ভরৎংঃ ড়ভ ঃযব ড়িৎষফ’ং এৎবধঃ ঈযবসরংঃ ধিং ঔধনরৎ ওনহ ঐধুুধহ.’
অনেকে অনুমান করেন যে আরবি আল (অর্থাৎ ঃযব) আর পরে আরবি শব্দ কেমিয়া থেকে ধষ-পযবসু এবং তা থেকে পরে পযবসরংঃৎু শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। রসায়নশাস্ত্র অদ্যাবধি সে পযবসরংঃৎু নামেই অভিহিত হয়ে আসছে। ড. মুর লিখেছেন, ‘ঈযবসরংঃৎু ধং ংপরবহপব, রং ঁহয়ঁবংঃরড়হধনষু ঃযব রহাবহঃরড়হ ড়ভ ঃযব গঁংষরসং, ঔধনরৎ রং ঃযব ঃৎঁব ভধঃযবৎ ড়ভ সড়ফবৎহ ঈযবসরংঃৎু.’ এম আকবর আলী লিখেছেন, জাবির ইবনে হাইয়ানকে বলা চলে পৃথিবীর সর্বপ্রথম বৈজ্ঞানিক রাসায়নিক। তাঁর পূর্বে যে রসায়নের চর্চা হয়নি তা নয় কিন্তু সে চর্চার মধ্যে ঠিক বর্তমান বিজ্ঞানের চর্চা বলতে যে পর্যবেক্ষণ, যে ধীরস্থির নিয়মানুগতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবোধ্য ধারার কথা বোঝায়, তেমনি কোনো নিয়মানুগতিক ধারার অস্তিত্বই ছিল না। রসায়ন ছিল তখন জাদুবিদ্যার অন্যতম প্রতীক। সাধারণ সমাজ একে দেখত ভয়ের চোখে, বিদ্বানসমাজ একে বিজ্ঞান হিসেবে আমল দিতেন না। রসায়নের এমনি দুরবস্থায় জাবিরের আবির্ভাব। এমনি পটভূমিতে জাবির অমানুষিক পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে রসায়নকে একটি পরিপূর্ণ বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। জাবির ইবনে হাইয়ান রচিত গ্রন্থাবলির মধ্যে রয়েছে ১. কিতাব তাকদিমাতুল মারিফা ২. কিতাবুল মাখদাল ইলাস সানায়াতে ৩. কিতাবুল বুরহান ৪. কিতাব কিমানুল মাআদীন ৫. কিতাবুর রুকন ৬. কিতাবুল আহজার ৭. কিতাবুল হারজিল হাককিল আজম ৮. কিতাবুল হাজর ৯. কিতাবুল তাদবিরির হুকামায়েল কুদামা ১০. কিতাবুল খাওয়াসিল ইকমিরিজ জাহান ১১. কিতাবুত তাদাবিরির রাইয়া ১২. কিতাবুল মিহনাহ ১৩. কিতাবুল আসরার ১৪. কিতাবুল খাওয়াস।
ইবনে আল নাদিমের ‘কিতাব আল ফিহিরিস্ত’ গ্রন্থের তথ্যানুযায়ী জাবির রসায়নশাস্ত্রের পুস্তক ছাড়াও চিকিৎসাবিজ্ঞানের গ্রন্থসহ অন্যান্য বিভিন্ন বিষয়ে গ্রন্থাদি রচনা করেছেন। জাবিরের কিছু পুস্তক ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়েছিল। এসব গ্রন্থের মধ্যে দি বুক অব সেভেন্টি (ঞযব ইড়ড়শ ড়ভ ঝবাবহঃু), দি বুক অব মারসি (ঞযব ইড়ড়শ ড়ভ গবৎপু), চেস্ট অব উইসডম (ঈযবংঃ ড়ভ ডরংফড়স) সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য। এসব গ্রন্থের ল্যাটিন ও আরবি সঙ্কলন অদ্যাবধি বিদ্যমান।
মুসলিম ও ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের ওপর জাবির ইবনে হাইয়ানের বিরাট প্রভাব রয়েছে। ভগ্নপাতন পদ্ধতি সম্বন্ধে আজ পর্যন্ত যত আলোচনা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে জাবিরের ‘সাম অব পারফেকশন’ গ্রন্থে সর্বাধিক বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে। ভগ্নপাতন (ঋৎধপঃরড়হ ধহফ উরংঃরষষধঃরড়হ) পদ্ধতি হচ্ছে রসায়নশাস্ত্রে এমন একটি পদ্ধতি যাতে তরল পদার্থের মিশ্রণ থেকে পদার্থগুলোকে পৃথক করার জন্য বিভিন্ন মাত্রার তাপ প্রয়োগ করা হয়। এ পদ্ধতি জটিল মিশ্রণ পৃথকীকরণের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যেতে পারে। ভগ্নপাতন প্রণালী ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় শিল্পক্ষেত্রে, বিশেষ করে পেট্রোলিয়াম শিল্পে, অশোধিত তেলের মিশ্রণ পৃথকীকরণের উদ্দেশ্যে। এ পদ্ধতিটি জৈব রাসায়নিক শিল্পেও প্রয়োগ হয়।
জাবিরের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হচ্ছে ধাতব পদার্থের গঠন প্রণালী সম্পর্কে প্রদত্ত তত্ত্ব। জাবিরের বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের একটি ব্যবহারিক দিক হচ্ছে সাধারণ লোহা থেকে স্টিল বা ইস্পাত তৈরি করা, ধাতব পদার্থ পরিশুদ্ধকরণ ওয়াটার প্রুফ কাপড়ের রঙ ঝকঝকে করা, মরিচা ধরা থেকে লোহাকে রক্ষা করা। এসব পদ্ধতি সম্বন্ধে তিনি বিস্তারিত লিখেছেন। তাঁর অন্যতম উদ্ভাবন হচ্ছে নাইট্রিক এসিড। টেস্ট অব উইসডম নামক গ্রন্থে তিনি নাইট্রিক এসিড প্রস্তুত প্রণালী সম্বন্ধে বর্ণনা দেন। বিভিন্ন ধরনের এসিড আবিষ্কার, সালফিউরিক এসিড তৈরি এবং সোডিয়াম কার্বোনেট, পটাশিয়াম আর্সেনিক ও সিলভার নাইট্রেটের নিষ্কাশনের ক্ষেত্রে আধুনিক রসায়নবিদদের মধ্যে সর্বপ্রথম যারা বিশেষ অবদান রেখেছেন জাবির ইবনে হাইয়ান তাদের অন্যতম।
এ মহান বিজ্ঞানী ৮১৫ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। ইমাম জাফর সাদেক (রহ)-এর চার হাজার প্রথম শ্রেণীর ছাত্রের মধ্যে বিজ্ঞানী জাবির ছিলেন অন্যতম।

SHARE

Leave a Reply