Home বিশেষ রচনা শিশুশিক্ষায় বৈষম্য

শিশুশিক্ষায় বৈষম্য

সোহেল আজিজ..

রাজধানীর একটি পরিবারের একজন শিক্ষার্থীর গল্প। দশম শ্রেণীর বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী সে। ১০ জন শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়ে। এ জন্য মাসে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। অঙ্ক, ইংরেজি থেকে শুরু করে বাংলা, ধর্ম সব বিষয়ে প্রাইভেট পড়ে। এক বিষয়ে দু’জন শিক্ষকের কাছেও পড়ে কখনো কখনো।
প্রাইভেট পড়া ছাড়াও স্কুলের বেতন, যাওয়া আসার খরচ সব মিলিয়ে মেয়েটির পেছনে পড়াশোনা বাবদ মাসে প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হয় পরিবারটির।
এ তো গেল রাজধানীর একটি নামকরা বাংলা মিডিয়াম স্কুলে একজন শিক্ষার্থীর পেছনে এক ধনাঢ্য পরিবারের খরচের কথা। এবার আসা যাক নামকরা একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের বিষয়ে। আইএসডি স্কুলে একজন শিক্ষার্থীর মাসিক বেতনই হলো কমপক্ষে দেড় লাখ টাকা। সেখানে স্কুল ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের বিনোদন, বিশ্রাম, খেলাধুলা এমনকি ঘুমানোরও ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে সুইমিং পুল। ঢাকার সবচেয়ে ধনী ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, বহুজাতিক কোম্পানির মালিক, এমডিদের সন্তানরা এখানে লেখাপড়া করে। এসব অভিভাবক তাদের স্কুলপড়–য়া সন্তানদের পেছনে মাসে দুই থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করেন। রাজধানীর এরূপ আরেকটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল দিল্লি পাবলিক স্কুলে এক লাখ ৭০ হাজার টাকা মাসিক খরচ। সেশন ফি ২০ হাজার টাকা। টিউশন ফি পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা। আইটি ফি এক হাজার চার শ’ টাকা।
রাজধানীর অপর নামকরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল স্কলাশটিকায় শিক্ষার্থীদের বেতন পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা। ভর্তি হতে লাগে কমপক্ষে ৮০ হাজার টাকা। মাস্টারমাইন্ড স্কুলে প্লে গ্রুপে ভর্তির জন্য লাগে ৪০ হাজার টাকা। আর এই স্কুল নিয়ে অভিভাবকদের অভিযোগও আছেÑ তারা শুধু এ বি সি ডি পড়াচ্ছে এখন। এ জন্য এত টাকা নেয়ার কোনো মানে হয়!
রাজধানীর নামকরা বাংলা মিডিয়াম স্কুল যেমন ভিকারুননিসা, আইডিয়াল প্রভৃতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি বাবদ অভিভাকদের খুব বেশি খরচ হয় না। ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা লাগে সব মিলিয়ে। কিন্তু এসব স্কুলে পেছনের দরোজা দিয়ে ভর্তি করাতে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত অভিভাবকরা খরচ করতে রাজি আছেন। যাদের এ সামর্থ্য রয়েছে তারা সন্তানদের পেছনে মাসে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ করেন প্রাইভেট কোচিং বাবদ।
নামকরা বাংলা মিডিয়াম স্কুল, নামি-বেনামি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, কিন্ডারগার্টেনে ছেলেমেয়েদের এভাবে মাসে ৩০ হাজার থেকে তিন লাখ টাকা খরচের আরেকটি বিপরীত দিক রয়েছে এ দেশে। ঢাকার মোহাম্মদপুর রাহমানিয়া মাদরাসার অধ্যক্ষ জানান, তাদের মাদরাসায় দুই বেলা ফ্রি খাবারের ব্যবস্থা আছে নিতান্ত গরিব শিক্ষার্থীদের জন্য। যারা টাকা দিতে পারে শুধু তাদের কাছ থেকে টাকা নেয়া হয়। যারা পারে না তারা ফ্রি খায়। মাদরাসায় থাকেও ফ্রি। জানা যায়, ফ্রি দুইবেলা খাবার ছাড়া অনেকে আর কোনো খাবার খেতে পারে না। যেসব ছাত্রকে মা-বাবা টাকা দেন তারা সকালে নিজের টাকায় নাশতা কিনে খায়। কিন্তু ওই সমস্ত শিক্ষার্থীর নিতান্ত দরিদ্র মা-বাবা কোনো টাকা দিতে পারে না। তাই তারা সকালে কিছু খেতে পারে না। দুপুরের ফ্রি খাবারের জন্য অপেক্ষা করে। অর্থাৎ সকালে শুধু পানি খায়। দেশে যে ১৫ হাজারের মতো কওমি মাদরাসা এবং আরো যেসব আলিয়া মাদরাসায় লিল্লাহ বোর্ডিং রয়েছে সেসব মাদরাসায় এই শিক্ষার্থীর মতো হাজার হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে যারা এভাবে শুধু সকালে পানি খেয়ে দুপুরের ফ্রি খাবারের অপেক্ষায় থাকে।
সাধারণত এলাকাবাসী, ধনী ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদদের অনুদানে চলে কওমি মাদরাসাগুলো। অনেক গরিব শিক্ষার্থী অনেক মাদরাসায় সম্পূর্ণ ফ্রি থাকা-খাওয়া এবং পড়াশোনার সুযোগ পায়। কিন্তু তারপরও অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের সকালের নাশতা, খাতা-কলম কেনার জন্য মাসে সামান্য দু-এক শ’ টাকা পর্যন্ত দিতে পারেন না।
এবার গ্রামের একটা চিত্র নেয়া যাক। শহর ও গ্রামে সরকারি প্রাইমারি স্কুলে পড়ালেখা ফ্রি। বছরে পরীক্ষার ফি বাবদ এক শ’ থেকে দুই শ’ টাকা দিতে হয় স্কুলভেদে। এ ছাড়া খাতা-কলম বাবদ কিছু টাকা তাদের খরচ করতে হয়। কিন্তু স্কুলে পড়াশোনা ফ্রি হলেও তাতে পাস জোটে না তাদের। অভিভাবকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রাইমারিতে পড়া অনেক শিক্ষার্থীকেই আবার মাসে মাসে টাকা দিয়ে প্রাইভেট পড়াতে হয়। স্কুলের পড়ায় কোনো কাজ হয় না। ওতে পাস মেলে না।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়Ñ উপবৃত্তিপ্রাপ্ত অনেক শিক্ষার্থীকেই প্রাইভেট পড়া বাবদ প্রতি মাসে টাকা গুনতে হয়। ভাবনার বিষয় হচ্ছে, বৃত্তি বাবদ সে যে টাকা পায় তার চেয়ে বেশি খরচ হয় প্রাইভেট পড়ার পেছনে। স্কুলে যা পড়ায় তাতে অঙ্ক-ইংরেজিতে নাকি পাস করতে পারে না। তাই বাধ্য হয়ে প্রাইভেট পড়তে হয়। কয়েকজন ক্ষুব্ধ অভিভাবক জানান, এতে মাসে তাদের ছেলেমেয়েদের পেছনে পাঁচ শ’ বা তারও বেশি খরচ হয়। আবার অনেকে বৃত্তির টাকা পরিবারের কাজেই খরচ করে ফেলে অভাবের কারণে। পড়াশোনার পেছনে সে টাকা আর খরচ করতে পারে না।
শহরে বা গ্রামে প্রাইমারি স্কুলে যারা পড়ে তাদের সবাইকেই মোটামুটি এখন প্রাইভেট বাবদ মাসে এক শ’ থেকে পাঁচ শ’, হাজার টাকা খরচ করতে হয়। গ্রামে তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণীতে ওঠার পরপরই প্রাইভেট শুরু করেন অনেক অভিভাবক। শহরে বা গ্রামে যাদের সামর্থ্য আছে তারা প্রথম শ্রেণী থেকেই শুরু করেন প্রাইভেট কোচিং। তবে তুলনামূলক বিচারে শিক্ষার পেছনে এখনো সবচেয়ে কম খরচ করতে হয় মাদরাসার শিক্ষার্থীদের। মাদরাসার মধ্যে আবার সবচেয়ে কম খরচ কওমি মাদরাসায়। এরপর এবতেদায়ি ও আলিয়া মাদরাসায়। কওমি মাদরাসায় এককালীন অল্প কিছু টাকা দিয়ে ভর্তি হয়ে প্রতি মাসে খাবার খরচ এবং নামে মাত্র বেতন দিতে হয়।
সরকারি প্রাইমারি স্কুলের একজন প্রধান শিক্ষক চাকরির শেষজীবনে গিয়ে সর্বসাকুল্যে বেতন পান ১৫ হাজার টাকা। সরকারি একটি প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক হয়েও তার পদমর্যাদা তৃতীয় শ্রেণীর। সরাসরি প্রধান শিক্ষক হিসেবে যারা নিয়োগ পান তাদের বেতন শুরুতে আট হাজার টাকার মতো হয়। সহকারী শিক্ষকদের শুরুতে বেতন থাকে সাত হাজার টাকার মতো। অন্য দিকে রাজধানীর কোনো কোনো কিন্ডারগার্টেন ও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের প্রধান শিক্ষকের বেতন মাসে তিন লাখ টাকার মতো রয়েছে। এর পাশাপাশি তারা মাসে কয়েক লাখ টাকার অন্যান্য সুবিধা পান স্কুলের পক্ষ থেকে। সাধারণ শিক্ষকদেরও বেতন মাসে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা কারো কারো।
স্কুলের বেতন নেয়া ছাড়াও রাজধানীর নামকরা স্কুলের শিক্ষকেরা মাসে প্রাইভেট কোচিং বাবদ লাখ লাখ টাকা উপার্জন করেন। অন্য দিকে গ্রামের সরকারি প্রাইমারি স্কুলের একজন শিক্ষককে স্কুলে শিক্ষাদানের পাশাপাশি তাকে দিয়ে আদমশুমারি, শিশু জরিপ, ভোটার তালিকা প্রণয়ন, নির্বাচনে দায়িত্ব পালনসহ হাজারো কাজ করানো হয় তাদের দিয়ে। এতে অনেক সময় ক্লাসে শিক্ষাদানকার্যক্রম ব্যাহত হয়। আর শিক্ষকদের পারিবারিক জীবনের বিড়ম্বনা তো রয়েছেই। অনেক সময় কাজের চাপে নিয়মিত এবং অর্জিত ছুটিও ভোগ করতে পারেন না তারা।
শিক্ষার পেছনে বিনিয়োগকে এখন সর্বশ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে। শিক্ষার পেছনে বিনিয়োগ করলে সবচেয়ে বেশি এবং ভালো আউটপুট পায় একটি জাতি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিনিয়োগ করবে কেÑ রাষ্ট্র না ব্যক্তি? রাষ্ট্র যদি শিক্ষার পেছনে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতো তবে দেশের সাধারণ মানুষ উপকৃত হতো। কিন্তু শিক্ষার পেছনে রাষ্ট্রের পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকায় এখানে শিক্ষা এখন পণ্যে পরিণত হয়েছে। যার টাকা আছে সে তার সন্তানের জন্য উচ্চমূল্যে ভালো শিক্ষা কিনে নিচ্ছে। লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে নামকরা স্কুলে ভর্তি করাতে পারছে। মাসে প্রাইভেট কোচিং বাবদ হাজার হাজার টাকা খরচ করে প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে তুলছে। ভালো ফল করছে। কিন্তু যাদের অর্থ নেই তারা তাদের সাথে প্রতিযোগিতায় পারছে না। তারা অবধারিতভাবে চলে যাচ্ছে পেছনের সারিতে। শিক্ষার জন্য ধনিক অভিভাবক যেমন উচ্চ বিনিয়োগ করে তার সন্তানের জন্য ভালো শিক্ষার ব্যবস্থা করছেন, তেমনি এক শ্রেণীর লোক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পেছনে পুঁজি বিনিয়োগ করে ভালো ব্যবসায় করছেন। সব নাগরিকের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু রাষ্ট্র সে দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করার কারণে শিক্ষাক্রম চলে যাচ্ছে বেসরকারি খাতে এবং তাদেরই কারণে শিক্ষা উচ্চমূল্যের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। শিক্ষা পরিণত হয়েছে বাণিজ্যিক পণ্যে।
বাংলাদেশে বাজেটে এখনো শিক্ষা খাতে আড়াই ভাগের ওপর বরাদ্দ দেয়া হয় না। অথচ শ্রীলঙ্কাসহ আমাদের পাশের অনেক দেশেই শিক্ষা খাতে মোট বাজেটের ৬ ভাগ বরাদ্দ দেয়। তবে অনেক সময় অর্থ বরাদ্দ দিলেই সাধারণ মানুষ তা থেকে উপকার পায় না। যথাযথ ব্যবস্থাপনা এবং সঠিক পাত্রে সুবিধা পৌঁছে দেয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে শিক্ষা ক্ষেত্রে বিরাজমান বৈষম্য কিছুটা কমবে।

SHARE

Leave a Reply