Home উপন্যাস সোনামণির স্বপ্ন

সোনামণির স্বপ্ন

বিশ্বাস আবুল কালাম..

প্রায়ই ক্লাসে মনমরা হয়ে বসে থাকে সোনামণি। মুখচ্ছবিতে স্পষ্ট ফুটে ওঠে তার শারীরিক দুর্বলতার ছাপ। শরীরের গঠনটা চিকন চাকন। হাসি খুশির কোন রেশ তাকে স্পর্শই করে না। মাঝে মাঝে স্কুলে অনুপস্থিত থাকে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে। মেধা তালিকায় ফার্স্ট পজিশনে। এক কথায়, সে সকল শিক্ষকের নজর কাড়ে।
রোজকার মতো আজও সমাবেশের জন্য বাঁশিতে ফুৎকার ছুড়লেন সহকারী শিক্ষিকা সেলিনা বেগম। গত কয়েকদিন আগে জয়েন্ট করা সহকারী শিক্ষক জাহিদ রেজাও আছেন। ছাত্রছাত্রীরা লাইনে দাঁড়িয়ে গেছে। লাইনটা সোজা করার জন্য বাঁশিতে সঙ্কেত দিলেন সেলিনা বেগম। ছাত্রছাত্রীরা একে অপরের কাঁধ বরাবর দু’হাত তুলে লাইন সোজা করে নিলো। দ্বিতীয় বাঁশিতে তিনি হাত নামাতে বললেন। পরক্ষণে তৃতীয় বাঁশিতে তিনি তাদেরকে আরামে দাঁড়াতে বললেন। পেছনে দু’হাত বেঁধে বাম পা-টা কিছুটা প্রসারিত করে সবাই আরামে দাঁড়ালো। অতঃপর আবার তাদেরকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে বললেন। সবাই সোজা হয়ে দাঁড়ালো। কুরআন তেলাওয়াতের জন্য একজন ছাত্রীকে ডাকা হলো। যথারীতি কুরআন তেলাওয়াত শেষ হলো। তারপর একজন ছাত্রকে ডাকা হলো শপথবাক্য পাঠের জন্য। সে শপথ পাঠ করা শুরু করলো। যথারীতি শপথপাঠ শেষ হলে জাতীয়সঙ্গীতের জন্য দু’জন মেয়েকে ডাকলেন তিনি। জাতীয়সঙ্গীত চলছে, হঠাৎ লাইনের দ্বিতীয় স্থানে দাঁড়ানো সোনামণি কেমন যেন দুলছে। ওর পেছনে দাঁড়ানো রুবিনা স্যার বলে চিৎকার দিয়ে উঠলো। সোনামণিকে দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বলে উঠলো, স্যার, সোনামণি কেমন করছে। ততক্ষণে সহকারী শিক্ষক জাহিদ সাহেব ও সেলিনা বেগম বিদ্যুৎ বেগে ছুটে গিয়ে তাকে ধরাধরি করে অফিস কক্ষের বারান্দায় শুইয়ে দিয়ে মাথায় পানি দিলেন। জ্ঞান ফিরলে তাকে একটা বেঞ্চে শুইয়ে দিলেন জাহিদ সাহেব। প্রধান শিক্ষক নাহিদ সাহেব তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার কী হয়েছিলো মা? অমন করছিলে কেন?
মাথাটা ঘুরছিল স্যার। তারপর আর কিছু বলতে পারি না।
সোনামণির মা-বাবাকে খবর দিলেন প্রধান শিক্ষক। সোনামণি তার মা-বাবাকে কাছে পেয়ে কেঁদে উঠলো। প্রধান শিক্ষক সোনামণির দুর্ঘটনার কথা জানালেন এবং তাকে ভালো ডাক্তার দেখানোর পরামর্শ দিলেন।
পরদিন খুব সকাল সকাল গোসল, খানাপিনা সেরে তাকে মেডিসিন স্পেশালিস্ট ডাক্তার সহিদুজ্জামান সাহেবের নিকট নিয়ে গেলেন। তিনি সোনামণিকে অনেকক্ষণ ধরে দেখলেন। তার রক্ত, প্রস্রাব পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিলেন। তারপর চেয়ারে বসে পড়লেন তিনি। অন্য রোগী দেখতে লাগলেন। সোনামণির রক্ত, প্রস্রাব নিয়ে সেগুলো পরীক্ষা নিরীক্ষা করে যথাসময়ে রিপোর্ট দিয়ে দিলেন। ডাক্তার রিপোর্ট দেখে কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর বললেন, আপনার মেয়ের রক্তশূন্যতা দেখা দিয়েছে। বয়স হিসেবে তার শারীরিক গঠন যথেষ্ট নয়। আপনার মেয়ে খুবই দুর্বল। রক্তশূন্য হয়ে এরকম দুর্বলতার কারণে অনেক রোগ দেখা দিতে পারে। এ বয়সে শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সুষম খাবার দরকার। শিশুদের সারাদিনের খাবার পাঁচ ভাগে ভাগ করে খাওয়াতে হবে। যার ফলে তার শরীরের ঘাটতি পূরণ হবে। শরীরে শক্তির পরিমাণ ঠিক থাকবে। আর শক্তির পরিমাণ ঠিক থাকলেই শিশু কর্মচঞ্চল ও স্বতঃস্ফূর্ত থাকবে।
ডাক্তারের অমন কথায় আশ্চর্য বনে যান আবিদুর রহমান সাহেব।
আমি তো নিয়মানুযায়ী কোন খাদ্য খাওয়াই না।
এ জন্যই তো আপনার বাচ্চা দুর্বল। পড়াশোনায় অমনোযোগী।
আবিদুর রহমান সাহেবকে বিমর্ষ দেখে ডাক্তার সাহেব বললেন, চিন্তার কোনো কারণ নেই, সব ঠিক হয়ে যাবে। বাসায় গিয়ে আপনার বাচ্চার জন্য একটি খাদ্য তালিকা তৈরি করবেন।
সকাল সাতটা থেকে আটটার মধ্যে মাঝারি সাইজের তিনটা আটার রুটি অথবা দেড় কাপ ভাত অথবা একটা সিদ্ধ ডিম খেতে দেবেন। সকাল দশটা  থেকে এগারটার মধ্যে একটি ছোট কলা সাথে নোনতা বিস্কুট চারটা অথবা পাঁচটা খেতে  দেবেন।
ডাক্তারের কথায় খুব খুশি হন আবিদুর রহমান সাহেব। বললেন, প্রতিদিন ঐ একই খাবার খেতে দেবো।
আবিদুর রহমান সাহেবের কথায় ডাক্তার মুচকি হেসে বললেন, প্রতিদিন একই খাবার খেতে দেবেন ক্যানো? তাতে তার এক ঘেয়েমি আসতে পারে। খাবারের প্রতি অনীহা প্রকাশ করতে পারে। ঐ একই টাইমে শুধুমাত্র খাবারের পরিবর্তে মিষ্টি আলু সিদ্ধ দুটো অথবা মুড়ি এক কাপ সাথে বাদাম এক মুঠ অথবা ফ্রুট কেক ছোট-টা, দুই পিস খেতে দিতে পারেন।
ডাক্তারের কথায় খুব লজ্জা অনুভব করেন তিনি। ডাক্তার আরও বললেন, বিকেলের দিকে আপনার বাচ্চাকে পেয়ারা, আপেল অথবা অন্য যে কোন ফল খেতে দিতে পারেন অন্তত একটা মাস এভাবে খাদ্য তালিকা ফলো করেন, দেখবেন আপনার বাচ্চার কর্মচঞ্চলতা ফিরে আসবে, পড়ায় মনোযোগী হবে।
প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার সময় আমি ওকে খাবার খাওয়ার জন্য টাকা দিয়ে যাই।
আর দেবেন না। বাচ্চাকে ঘরে তৈরি খাবার থেকেই বিদ্যালয়ের জন্য টিফিন দেবেন। শিশুকে টাকা দিয়ে নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর খাবার খেতে অভ্যস্ত করবেন না।
ডাক্তারের শেষ বাক্যটি শুনে মন্ত্র পড়ার মতো কী যেন বলতে থাকেন তিনি।
ডাক্তার, আবিদুর রহমান সাহেবকে বললেন, কী ভাবছেন? খাদ্য তালিকা মেনটেন করতে খুব সমস্যা হবে বুঝি। না না কোন সমস্যা হবে না। বাচ্চাকে সুস্থ রাখার জন্য এটা তো সব পিতা-মাতারই কর্তব্য। শরীর সুস্থ থাকলে বাচ্চা পড়াশোনা করতেও আগ্রহী হবে। ঠিক বলেছেন, খাদ্যই বাচ্চাকে সুস্থ ও সবল রাখবে। সুতরাং ব্যবস্থাপত্র ও খাদ্য তালিকা ঠিকমতো ফলো করলেই এর আউটপুট আপনি পাবেন। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আসি তাহলে!
আচ্ছা আসেন। আবার আসবেন। আর কোন সমস্যা হলে ব্যবস্থাপত্রে মোবাইল নম্বর আছে।
ও-কে।

দুই.
আবিদুর রহমান সাহেব সকালে দৈনিক পত্রিকায় চোখ বুলাচ্ছেন। হঠাৎ তাকিয়ে দেখেন তার নয়নের পুত্তুলি সোনামণি অভিমানের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। ছোট্ট ফুটফুটে মেয়েটির মুখে কোনো কথা নেই। ঠিক যেনো বরফ। আবিদ সাহেব পত্রিকা রেখে তাকে কোলের মধ্যে টেনে নিলেন। বললেন, ওমা, সেকি! অমন করে দাঁড়িয়ে আছ কেন? আটটা বাজতে গেল। নাশতা খেতে হবে যে, ঔষধ খেতে হবে।
তবুও কোন কথা বলে না সে। আবিদ সাহেব ডান হাতের তর্জনি ঘুরান এবং ঈ-ঈ-শব্দ করে মনটাকে বিস্ময়ের সিঁড়িতে চড়িয়ে অনুসন্ধান চালাতে থাকেন। ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে সোনামণি। জন্ম নিবন্ধন অনুযায়ী তার বয়স ৭ বছর ১১ মাস। আবিদ সাহেব সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজার, বিচক্ষণ ব্যক্তি; যখন কোনো সমস্যা এসে উপস্থিত হয় তখন তিনি খুব ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠেন সমস্যা সমাধানের জন্য। আজও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। হঠাৎ তিনি হো-হো করে হেসে উঠলেন। এবং বললেন, আচ্ছা মামণি তোমার অভিমানটা একটু থামাও। তোমার আম্মুকে বল, গুছিয়ে নিতে এক্ষুনি বের হয়ে পড়ব।
আব্বুর কথা শুনে আনন্দে নেচে ওঠে সোনামণি, ‘হুররে হুয়া কেয়া মজা’ বলতে বলতে ডাইনিং রুমে যায় সে। ছুটে আম্মুকে খবরটা দিয়ে আসে। ডাইনিং রুমে সকালের নাশতা তৈরি করছিলেন আঁখি রহমান। স্কুল গ্রীষ্মের ছুটি। সে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী। শ্রেণীতে তাদের সেলিনা ম্যাডাম কয়েকজন পেশাজীবী লোকের কথা বলছিলেন ডাক্তার, কামার, কুমার, তাঁতী, জেলে, কৃষক, ধোপা, প্রকৌশলী এসব শ্রেণীর মানুষ কিভাবে কাজ কর্ম করে কথা বলছিলেন। কিভাবে তারা কাজ কর্ম করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে তা তারা দেখেছে কি না, না দেখে থাকলে তাদের পিতা-মাতাদের সাথে গ্রীষ্মের ছুটিতে যেনো দেখে আসে। সুতরাং সোনামণিও বাসায় এ সম্পর্কে তার আব্বু-আম্মুর সঙ্গে কথা বলেছে। তার আব্বু-আম্মুও খুব খুশি। আবিদ সাহেব সোনামণির গ্রীষ্মের ছুটিটা এই সমস্ত শিক্ষামূলক কাজে ব্যয় করার জন্য বেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তিনি চান যে, প্রাকটিক্যালে সে সব কিছু দেখে আসুক। সুতরাং তিনি তাকে এই বলে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, শুক্র ও শনিবার ছুটির দিনে, তিনি তাকে দেখিয়ে নিয়ে আসবেন। এই সমস্ত পেশার লোকদের কারুকাজগুলোই হলো আমাদের দেশের শিল্প। তার আব্বুর মুখে শিল্পের কথা শুনেই সোনামণি প্রশ্ন করে, শিল্প কী আব্বু?
নিজের হাতে তৈরি জিনিসপত্র।
আমি যাবো, আমি দেখবো, কী মজা।
সকালের নাশতা শেষ হলে একটা ইজি বাইক নিয়ে সপরিবারে বের হয়ে পড়ে তারা। ইজি বাইক আঁখি আবিদের কাছে সবচেয়ে পছন্দের যানবাহন। কচ্ছপের মত ধীরে ধীরে চলে। খোঁজ খবর নিয়ে তারা প্রথমে রামেরডাঙ্গা কামারশালায় যান। ছোট একটি ঘর, চারিদিকে ফাঁকা, ছায়াঘেরা গাছের তলায় এই কামারশালা। ইজি বাইকটি কামারশালার নিকটে গিয়ে থামতেই কর্মকার অবাক হয়ে গেলো। এ রকম পোশাকে কামারশালায় ইতঃপূর্বে কখনও কেউ আসেনি। সুতরাং কর্মকারের কাজ গেল বন্ধ হয়ে। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্ছে সে আবিদ সাহেবের দিকে। আবিদ সাহেব এগিয়ে গিয়ে বললেন, আমরা তোমার কামারশালা দেখতে এসেছি। তুমি কিভাবে গৃহস্থালির নিত্যপ্রয়োজনীয় অস্ত্রপাতি তৈরি করো। তা আমরা দেখার এবং দেখাবার জন্য এসেছি।
কাকে দেখাবার জন্য এসেছেন স্যার?
এই যে আমার মেয়ে, ও তোমার কামারশালা দেখার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
তোমার নাম কী মা?
আমার নাম সোনামণি।
বাহ! বেশ সুন্দর নাম তো! বসেন স্যার, খুব ভালো লাগছে।
কর্মকারের নাম নিত্যানন্দ। মাঝারি গোছের মানুষ। তাকে সাহায্য করার জন্য একজন লোকও আছে। তার নাম মিছির আলী। মুসলমান বলে তিনি আগ্রহ ভরে জিজ্ঞাসা করলেন।
তুকি কি এখানে কাজ করো?
জি স্যার, আমি কাজ শেখার জন্য এখানে আসি।
প্র্যাকটিস করছো তাইতো?
জি স্যার।
ভালো খুব ভালো। পেশা কোন জাত-বেজাত দেখে না। আসল কথা হলো জীবিকা নির্বাহ। আবিদ সাহেবের কথা শুনে খুশি হয় মিছির আলী।
আপনারা আইছেন, আমার যে কী ভালো লাগতাছে!
সোনামণি অবাক হয়ে দেখছে। কর্মকার বাম হাত দিয়ে হাঁফর টানছে আর ডান হাতে একটি হাতা বাউলি সেটি দিয়ে জ্বলন্ত কয়লার ভেতরে অস্ত্র তৈরির লোহা চালিয়ে দিচ্ছে আবার কিছুক্ষণ পর তুলে পেটাচ্ছে। পাশে লোকটি একটি তৈরি অস্ত্রে উকু মেরে শান দিচ্ছে। অবাক চোখে দেখছে সোনামণি।
সোনামণিকে অমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে কর্মকার বললেন, খুব ভালো করে দ্যাখ।
কর্মকারের কথায় আঁখি আবিদও যোগ দিলেন। বললেন, ওকে দেখানোর জন্যই তো এখানে আসা।
নিত্যানন্দ বলল, আজ আনন্দে আমার বুকটা ভরে যাচ্ছে। সবাই অস্ত্র তৈরি করে নেয়ার জন্য আসে। কিন্তু কেউ কখনও এ রকম আগ্রহ করে দেখতে আসে না।
আবিদ সাহেব বললেন, তুমি কি গৃহস্থালির সব রকম জিনিস তৈরি করো?
হ স্যার। প্রায় সব রকম তৈরি করি। দা, বটি, কাঁচি, কোদাল, শাবল, ছুরি, জাতি, খুনতি, হাতা, বাউলি আরও অনেক কিছু তৈরি করি। কিছু তৈরি করে নেবেন স্যার?
ওটা কী তৈরি করছো?
একটি বটি তৈরি করছি স্যার।
ঠিক আছে। তুমি ঐ বটি-টাই আমাদের তৈরি করে দাও। তুমি কিভাবে তৈরি করো তা আজ স্বচক্ষে দেখে যাবো।
স্যার, সত্যি বলতে কী, আজকের দিনটায় আমার বুকে অন্য একটি আনন্দ এসে ভরিয়ে দিচ্ছে। সে আনন্দের ভাষা আমি বুঝাতে পারবো না স্যার।
ঐ সব কথা বলেই, খুব আগ্রহের সাথে হাঁফর টানতে শুরু করলো। সোনামণি তীক্ষè নজর দিয়ে দ্যাখে কুনো ব্যাঙের মতো যন্ত্রটি ক্যামন ফোস্ ফোস্ শব্দ করছে। আর তার মুখে সরু নল খাটানো যন্ত্রটি হাওয়া বাহির করে দিচ্ছে। আর সেই হাওয়া লেগে কয়লাগুলো পুড়ে আগুনের লেলিহান শিখা তৈরি করে দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পরই জ্বলন্ত কয়লার ভেতর থেকে গনগনে লাল লোহাটি হাতা বাউলি দিয়ে তুলে পেটাতে শুরু করলো। আর পেটানোর সাথে সাথেই আগুনের ফুলকি চারিদিকে ছুটতে লাগলো। সোনামণি আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছুটতে দেখে গায়ে লাগার ভয়ে জড়ো সড়ো হয়ে আবিদ সাহেবের কোলে বসে আছে। কর্মকার লোহাটি পিটিয়ে পাশে রাখা পানির পাত্রে চুবিয়ে আবার কয়লার ভেতরে চালিয়ে দিলো। তারপর হাঁফর টানতে শুরু করলো। কিছুক্ষণ পর লোহাটি তুলে পিটিয়ে আবার জ্বলন্ত কয়লার ভেতর রাখলো। এইভাবে খুব সুনিপুণ কায়দায় একটি সুন্দর বটি তৈরি করে দিলো। আবিদ সাহেব খুব আনন্দ ভরে বটিটি নিয়ে বাসায় ফিরে আসলেন।
রাতে খাওয়ার সময় আবিদ সাহেব তার মেয়ে সোনামণিকে জিজ্ঞাসা করলেন, মামণি, কামারশালা আর কর্মকারের অস্ত্র তৈরির কারুকাজ ক্যামন লাগলো তোমার?
ভেরি নাইস আব্বু।
থ্যাঙ্ক ইউ।
কিন্তু আমার খুব ভয় করছিল আব্বু।
কিসের ভয়!
ঐ যে লোহাটিকে পেটানোর সময় আগুনের ফুলকি ছুটছিল। ওটা ওদের গায়ে লেগে পুড়ে যায় না আব্বু?
না-না পুড়বে ক্যানো?
আব্বু-ঐ লোকটির হাতগুলো না ক্যামন মোটা মোটা। আর যখন জ্বলন্ত লোহাটি পেটাচ্ছিল তখন লোকটির গা দিয়ে ক্যামন ঘাম ঝরছিল।
মেয়ের কথায় আঁখি আবিদ বললেন, কত পরিশ্রম করলে তবেই না গা দিয়ে ঘাম ঝরে। ঐ ঘামই সৎ ঘাম, হালাল উপার্জন।
সোনামণি ওর মায়ের কথাগুলো খুবই মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।
আবিদ সাহেব বললেন, আগামীকাল আমরা কুমার পাড়ায় যাবো। কুমাররা কিভাবে হাঁড়ি পাতিল তৈরি করে তা নিজের চোখে দেখে আসবে।
কুমাররা কী কী তৈরি করে আব্বু?
তুমি সেখানে গেলে সবকিছু জানতে পারবে।
আঁখি আবিদ বললেন, ওরা মাটি দিয়ে হাঁড়ি, কলসি, মালশা, নানদা, সোরা, খোলামুচি এছাড়াও বাচ্চাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের খেলনা তৈরি করে।
কী-কী খেলনা তৈরি করে আম্মু? আমার কিন্তু অনেক খেলনা কিনে দিতে হবে।
আগামীকাল চলো কুমার পাড়ায় যাই, তারপর দেখে দেখে সুন্দর সুন্দর খেলনা তোমায় কিনে দেবো। আম্মুর কথা শুনে আনন্দে নাচতে থাকে সোনামণি।

তিন.
বিকেলবেলা ইজি বাইক নিয়ে বের হয়ে পড়লেন আবিদ সাহেব। সাথে আঁখি আবিদ ও সোনামণি। পাঁচ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তারা হাজির হলেন বাবুলিয়া কুমার পাড়ায়। আশ্চর্য হয়ে যান আবিদ সাহেব। মেইন রোডের পাশে কুমারদের দোকান দেখে এই দোকানে হাঁড়িপাতিলসহ বাচ্চাদের বিভিন্ন ডিজাইনের খেলনা ছাড়া বিভিন্ন প্রকারের ঢাকনি। খোলামুচি যা দিয়ে শীত মৌসুমে চিতই পিঠা তৈরি করে পাকা রসে ভেজানো হয়। যা খেতে খুবই সুস্বাদু। এছাড়া মা ও ছেলে মেয়েদের টাকা জমানোর জন্য বিভিন্ন ডিজাইনের রকমারি ফলের তৈরি ব্যাংক, যেমন : বেল, নারকেল, আতা, কুমড়ো, আপেল, পেয়ারা ইত্যাদির খরিদদার আকর্ষণ সৃষ্টির জন্য যে ফলের যে বৈশিষ্ট্য ঠিক সেই আকারে তৈরি করা হয়েছে।
আমি টাকা জমানোর ব্যাংক নেবো আব্বু। বলল সোনামণি।
কিনে দেবো বাবা। সব কিনে দেবো।
আবিদ সাহেব আর একটু  ভেতরে গেলেন।
আঁখি আবিদ বললেন, দাও না কিনে কয়েকটা। ওটা যেমন সৌন্দর্য বৃদ্ধি করবে ঠিক তেমনি স্বল্পমেয়াদি একটা সঞ্চয়ের কাজ করবে। সুতরাং আবিদ সাহেব সোনামণির জন্য দু’টি ছোট ও একটি বড় ব্যাংক কিনলেন। এবং সাথে কিছু সুন্দর সুন্দর খেলনাও নিলেন। যেমন, পুতুল, রান্না বান্নার হাঁড়ি, পাতিল, কলস, সরা, নোড়া, শিল, কড়াই ইত্যাদি। সোনামণির আনন্দ আর ধরে না। কেনাকাটা শেষ হলে তারা দোকানের পেছনে হাঁড়ি পাতিল তৈরির কারখানা দেখতে গেলেন। কুমোররা যার সেই কাজে ব্যস্ত। দুই জন জোয়ান লোক চার পাঁচ হাত লম্বা দুটো সাপোর্ট নেয়া বাঁশ নিয়ে কত যতœসহকারে কাদা চটকাচ্ছে।
তাদের কাদা চটকানো দেখে প্রশ্ন করে সোনামণি, ঐ কাদা চটকিয়ে কী করে আব্বু?
গৃহস্থালির কাজে যে সমস্ত জিনিস যেমন হাঁড়ি, পাতিল, কলস, খেলনা, ব্যাংক ইত্যাদি তৈরি করে। সোনামণির প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে আরও ভেতরে যায় তারা। সেখানে একজন কুমার চাকে কলসি তৈরি করছেন। কুমারের নাম হরিপদ।
তিনি আবিদ সাহেবকে দেখে বললেন, আপনারা কোথা থেকে এসেছেন স্যার?
আমরা সাতক্ষীরা শহর থেকে এসেছি।
আপনারা কিভাবে হাঁড়ি পাতিল তৈরি করেন তার তৈরির কৌশল দেখতে ও দেখাতে নিয়ে এসেছি।
কাকে দেখাতে নিয়ে এসেছেন স্যার?
আমার মেয়েকে, ও নিজের চোখে সব কিছু দেখতে চায়।
বাহ! বহুদিন পর একটা শান্তির কথা শুনাইলেন স্যার। তোমার নাম কী মা?
আমার নাম সোনামণি।
খুব সুন্দর নাম তো তোমার। তুমি নিজের চোখে আমাদের কারখানা দেখতে এসেছ।
হ্যাঁ-আমাদের স্কুলের টিচার সেলিনা ম্যাডাম বলেছেন, সব কিছু পাঠ্য বইতে আছে। তবুও তোমরা কামার, কুমার, তাঁতী, জেলে এই সমস্ত শ্রমজীবী লোকদের কর্মকাণ্ড নিজের চোখে দেখে আসবে।
আমাদের এ কারখানা দেখে তুমি কী করবে মামণি।
কী আর করবো? এগুলো আমাদের দেশের একটি প্রাচীন ঐতিহ্য, প্রাচীনকালের মানুষেরা এই সমস্ত জিনিস ব্যবহার করত। কিন্তু এখন এই সমস্ত ঐতিহ্য হারাতে বসেছে।
ঠিক বলেছো। এখন সবাই টিন, কড়ি, ম্যালামাইনের জিনিসপত্র ব্যবহার করছে। সুতরাং মেটে জিনিসের ব্যবহার এখন খুব একটা নেই।
আপনি ঠিক বলেছেন। এর কদর এখন কমে গেছে।
আঁখি আবিদ সোনামণিকে নিয়ে আর একটু ভেতরে গেলেন। সেখানে কুমারনি তার সুনিপুণ হাতে পুতুল ও বিভিন্ন ধরনের খেলনা তৈরি করছে। আবিদ সাহেব কুমারের পাশেই বসেছিলেন। তিনি কুমারকে বললেন, আচ্ছা, আপনি যে জিনিসটি তৈরি করছেন এটা কলসের ওপরের অংশ না।
জি স্যার, আপনি ঠিক বলেছেন।
এইটার নাম কী?
এই ওপরের অংশটাকে বলে পাকুই। এবং এর নিচের অংশকে বলে খাবরা। আর ঐ দুটো অংশ এক সঙ্গে ফিট করলেই তৈরি হয়ে গেলো কলস।
কুমারনি সোনামণিকে তীক্ষè নজর ছুড়ে দেখার জন্য বলল, এসো তোমাকে পুুতুল তৈরির কায়দা শিখিয়ে দিই।
সোনামণি কুমারনির পাশে বসে শিখে নেয় পুতুল তৈরির কলাকৌশল।
আবিদ সাহেব বললেন, আগেকার মানুষেরা এই সমস্ত মেটে পাত্রেই ভাত, তরকারি সব কিছু রান্নাবান্না করত। আমার দাদার কাছে শুনেছি এর স্বাদও ছিল আলাদা। মেটে কলসের পানি খুবই ঠাণ্ডা। গ্রীষ্মকালে পানি ঠাণ্ডা রাখতে মেটে কলস বেশি ফলপ্রসূ। তাছাড়া পানি দূষণমুক্ত রাখতে মেটে কলসের তুলনা হয় না।
আপনি খুব সঠিক কথা বলেছেন স্যার।
আরও আছে। পানি আর্সেনিক মুক্ত রাখতে মেটে কলস ব্যবহার করা যায়। কারণ মেটে কলসের তলায় বালু থাকে। পানি ফিল্টারিং করলে বালু আর্সেনিকের পয়জনকে ধরে রাখে।
কিভাবে পানি ফিল্টারিং করতে হয় স্যার?
দুটো মেটে কলস লাগে। একটি কলসে সারারাত ধরে পানি ভরে রাখতে হয়। সকালবেলা ভরা কলসের অর্ধেক অর্থাৎ ওপরের অংশটা খালি কলসটিতে রাখতে হবে। হয়ে গেল ফিল্টারিং।
বলেন কী স্যার?
হ্যা! সত্যি কথাই বলছি।
পানি ফুটিয়ে খেলে তো আর্সেনিক দূর হয়ে যায় স্যার।
না এ কথা ঠিক নয়। কারণ পানি আগুনে জ্বালিয়ে ব্যাকটেরিয়া নষ্ট করা যায় কিন্তু আর্সেনিক মরে না।
আজ একটা আশ্চর্য কথা শুনাইলেন স্যার। এমন কথা আমি কখনও শুনি নাই।
ঠিক আছে আপনারা আপনাদের পেশাকে টিকিয়ে রাখুন। আমাদের দেশের একটি ঐতিহ্য টিকে থাক। কী বলো?
অবশ্যই স্যার।
কুমারনি সোনামণিকে সব কিছু শিখিয়ে দেয়। সোনামণি খুব তীক্ষè নজর দিয়ে সব কিছু অবলোকন করে। সোনামণির দেখা শেষ হলে ডাক দেন আবিদ সাহেব।
এখন থেকে যান স্যার। আপনাদের পেয়ে খুব ভালো লাগছে। থেকে যান স্যার।
না-না-আমরা যাই। আবার হয়ত কোনদিন হঠাৎ করে এসে পড়বো। যাই।
আবার আসবেন স্যার।
ঠিক আছে।
আপনার অনুপ্রেরণা আমাদের কাজকে আরও বেগবান করবে স্যার।
ইজিবাইক নিয়ে বাসার উদ্দেশে রওনা দেন আবিদ সাহেব। পথিমধ্যে তিনি মেয়েকে বলেন, কেমন দেখলে মামণি। খুব ভালো লেগেছে তাই না?
জি আব্বু, আমার কী যে ভালো লাগছে। আচ্ছা আব্বু, ঐ কাদা কি মাটি দিয়ে তৈরি?
এঁটেল মাটি। আমাদের দেশে সাধারণত তিন প্রকারের মাটি আছে। দোঁআশ মাটি, এঁটেল মাটি ও বেলে মাটি।
কোন মাটিতে কী কী জিনিস তৈরি হয় আব্বু?
দোঁআশ সবচেয়ে ভালো মাটি। এই মাটিতে ধান, পাট, শাক সবজি ইত্যাদি ফসল ভালো জন্মে। এঁটেল মাটি চটকালে খুবই আঠালো হয় ফলে এই মাটি হাঁড়ি, পাতিল তৈরির জন্য উপযুক্ত। অন্য কোন মাটি দিয়ে এই জিনিসগুলো তৈরি করা যায় না।
আর বেলে মাটি কী কী কাজে লাগে আব্বু?
বেলে মাটি দালান তৈরির কাজে লাগে। এই মাটিতে তরমুজ, চিনা বাদাম ইত্যাদি ভালো জন্মে।
সন্ধ্যার সময় এসে বাসায় পৌঁছান তারা। রাতের খাবার খেতে খেতে আবিদুর রহমান সাহেব বলেন, মামণি আগামীকাল আমরা তাঁতী পাড়ায় যাবো। ওর আব্বুর কথায় আনন্দে নাচতে থাকে সোনামণি।

চার.
পরদিন খুব সকাল সকাল ইজি বাইক নিয়ে তাঁতশিল্প ও তাঁতীদের কারুকাজ দেখার জন্য বের হয়ে পড়ে ওরা। প্রখ্যাত সাহিত্যিক মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর জন্মভূমি বাঁশদহা গ্রামের বাজারসংলগ্ন তাঁতী পাড়ায় যান ওরা। পথিমধ্যে ওহাব আলী নামের একজন লোকের কাছে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারেন, তাঁতী পাড়ায় সবচেয়ে পুরাতন এবং এখনও তাঁত শিল্প টিকিয়ে রাখা ষাট বছর বয়সী তাঁতী আজিজার রহমান। তিনি আরও বলেন, এই এলাকায় তাঁত শিল্প আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এখন সবাই ধানচাষের কাজে ব্যতিব্যস্ত। আগে এই এলাকায় রাত-দুপুরে তাঁতীদের যন্ত্রপাতির শব্দ  শোনা যেত। ঠক-ঠকা ঠক শব্দে তাঁতী পাড়া মুখোরিত হয়ে উঠত। এই সমস্ত তাঁতীর কারুকাজগুলো বিলুপ্ত হতে থাকায় আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস যেমন, লুঙ্গি, গামছা, তোয়ালে ইত্যাদির দামও বেড়ে গেছে বহুলাংশে।
আবিদুর রহমান সাহেব বলেন, আপনি ঠিকই বলেছেন। এখন তাঁত শিল্প কেন হস্তশিল্পও সেই কবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আগেকার মায়েরা, মেয়েরা বর্ষকালে ঘরে বসে সুচ-সুতার ফোঁড়ে নকশি তুলে কত সুন্দর সুন্দর কাঁথা তৈরি করত। এগুলো বাংলাদেশের পুরাতন ঐতিহ্য। আবিদুর রহমান সাহেবকে তাঁতী পাড়া দেখিয়ে দেয় ওহাব আলী। ঠিকানা দিয়ে দেন পুরনো তাঁতী, যিনি এখনও তাঁত চালান সেই ষাট বছর বয়সী আজিজার রহমানের বাড়ি। ঠিকানা অনুযায়ী আবিদ সাহেব ইজি বাইক নিয়ে হাজির হন তাঁতী আজিজার রহমানের বাড়ি। তিনি লক্ষ করেন দখিনের বারান্দায় ঠক ঠকা ঠক শব্দে তাঁতযন্ত্র পরিচালনা করছেন তাঁতী আজিজার রহমান। ইজি বাইক থেকে নেমে আবিদ সাহেব আঁখি আবিদ ও সোনামণি আস্তে আস্তে এগিয়ে যান বারান্দার দিকে। তাঁতী আজিজার রহমান কাপড় বুনা বন্ধ করে দিয়ে বাইরে বের হয়ে আসেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, আপনারা? কী ব্যাপার?
আমরা আপনার তাঁত ও কাপড় বুননের কৌশল দেখতে এসেছি। এবং আমার মেয়েকে দেখানোর জন্য নিয়ে এসেছি।
বাহ! বেশ তো। আপনারা বসেন। দিদি মণি এই নাও তুমি এই টুলটায় বসো।
আঁখি আবিদ বললেন, চাচা আমরা আপনার ছেলে-মেয়ের মতো। আপনি আপনি করছেন কেন? চাচা আপনি কত বছর ধরে এ কাজ করছেন?
তা মা জ্ঞান বুদ্ধি হওয়া থেকে আমি তাঁত চালানো শুরু করি। তার আগে আমার বাবা তাঁত চালাতেন। আমি বাবাকে সাহায্য করতাম। আবিদ সাহেব বললেন, আচ্ছা চাচা, আপনার তো অনেক বয়স হয়েছে। কিন্তু এখন তাঁত টানতে আপনার কষ্ট হয় না।
হয় বাবা, কিন্তু কী করবো? বসে থাকলে তো আর চলবে না।
আপনার ছেলেরা কী করে?
বড় ছেলে হাবিবুর চাষের কাজ করে এবং ছোট ছেলে বাঁশদহা, আবাদের হাট, কুশখালি, বৈকারী এই সমস্ত বাজারে ফুটপাথে বসে জামা কাপড় বিক্রি করে।
কাপড় বুনতে কী কী যন্ত্র দরকার হয়?
অনেক কিছু লাগে বাবা। নুরাজ, শর, ব্যাল্লা, শানা, নাইল, ব, নাটা, ফান্দা, মিগা, শিক রং ইত্যাদি।
কাপড় বুনতে প্রথমে কী কী করেন?
তাঁতের প্রধান খোরাক হলো সুতা। এই সুতা বাজার থেকে কিনে আনা হয়। এবং পরবর্তীতে ঝাড়া দিয়ে সাইজ করে নিয়ে নানদার মত একটা বড় পাত্রে ভিজিয়ে রাখতে হয়। তারপর পানি নিষ্কাশন করে মাড় দিতে হয়। এই মাড় দেয়া সুতা রোদ্রে শুকানো হয়। যার ফলশ্রুতিতে সুতা সজীবতা ফিরে পায়। এবং এটা কাপড় বুননের জন্য উপযোগী। শুকনো এই সুতা পরবর্তীতে ফান্দার সাহায্যে নাটায় তুলতে হয়। এবং এরপর চকরার টেকোর মধ্যে চুঙা দিতে হবে এবং ডাটি ধরে পাক দিয়ে চুঙায় গুটাতে হবে। এরপর সুনিপুণ কায়দায় কলে পরাতে হবে।
চলেন দেখবেন।
আবিদ সাহেব, আঁখি আবিদ ও সোনামণি আস্তে আস্তে বারান্দার দিকে এগিয়ে যান। আজিজার রহমান ডান হাত কিঞ্চিত উঁচু করে তর্জনি ছুড়ে বললেন, এই যে খুঁটিগুলো দেখছেন এই খুঁটিতে সুতা টানা দিতে হয় এবং জো অনুযায়ী শানায় পরায়ে আবার লম্বা করতে হয়।
তীক্ষè নজর ছুড়ে চেয়ে থাকে সোনামণি। আঁখি আবিদ বলেন, চাচা, আমার মেয়েকে আপনার তাঁত চালানো এবং চালানো তাঁতে কাপড় বুননের কৌশল দেখাতে নিয়ে এসেছি।
বাহ! বেশ তো।
আবিদ সাহেব বললেন, তারপর কী করতে হয় চাচা?
আজিজার রহমান বলেন, এরপরে হাত দিয়ে শানা টানতে হবে। সুতা পাক খেয়ে নুরাজে জড়ায়ে আসবে পরবর্তীতে নাইলন সুতা দিয়ে ‘ব’ করতে হয়। এই যে, দেখুন এই চারখানা কাঠ দিয়ে ‘ব’ এর মধ্যে ঢুকায়ে আঙুল দিয়ে ছিটাতে হবে। ফলে সুতা উঁচু নিচু সমান হয়ে যাবে। এই যে আমি চালাচ্ছি, আপনারা দেখুন।
এই বাল্লাটা পায়ে খাটালাম। পরে তাঁত খাটালাম। এই যে,  দেখুন মুঠো বাঁধা। এই মুঠো তরে টান দিয়ে নাইল দিয়ে বুনতে হবে। তাঁতী আজিজার রহমান ডান হাত দিয়ে মুঠো ধরে টানতে থাকেন। ঠক-ঠকা ঠক, ঠক-ঠকা-ঠক। তাতে কাপড় বুননের কাজ চলতে থাকে। সোনামণি অবাক হয়ে চেয়ে থাকে তাঁত যন্ত্রের দিকে। আবিদ সাহেব বলেন, চাচা আজ আমরা আসি।
আসবে কেন? আজ থেকে যাও। তোমরা এসেছো কত ভালো লাগতেছে। এ রকম কেউ তো কখনও আসে না। তাতে কাপড় বুননের কাজ আজ আমার সার্থক হয়েছে। আমি যে কত আনন্দ পেয়েছি তা  তোমাদের বুঝাতে পারবো না।
আজিজার রহমান তাঁতযন্ত্র থেকে উঠে সোনামণির মাথায় হাত বুলায় আর বলে, তুমি আমার তাঁত ও তাঁত যন্ত্রে কাপড় বুননের কৌশল দেখতে এসেছ দিদিমণি।
সোনামণি কথা না বলে হাসি মুখে মাথা নেড়ে সায় দেয়।
আঁখি আবিদ বললেন, আমরা খুব আনন্দ পেয়েছি। আসি।
আজিজার রহমান বললেন, আবার এসো মা। ইজি বাইকে উঠলে যানবাহনটি আস্তে আস্তে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেয়। পথিমধ্যে আবিদ সাহেব বললেন, মামণি কাল আমরা জেলে পাড়ায় যাব।
আচ্ছা ঠিক আছে আমিও তো যেতে চাই বলে সোনামণি।

পাঁচ.
পরদিন খুব সকাল সকাল আবিদ সাহেব ইজিবাইক নিয়ে আখড়াখোলা জেলে পাড়ায় গিয়ে পৌঁছান। কপোতাক্ষের শাখা নদীর পাড় ঁেষে এই জেলে পাড়া। আবিদ সাহেব ইজি বাইক হতে নামতেই মধ্যবয়সী কয়েকজন ছুটে আসে। তিনি তাদেরকে বলেন, এটাই কি জেলে পাড়া?
সুরঞ্জন বলে, হ্যাঁ স্যার এটাই জেলে পাড়া, কিন্তু আপনি!
আমি তোমাদের এখানে এসেছি। তোমরা কিভাবে জাল দিয়ে মাছ ধরো, কিভাবে জীবন যাপন করো তা দেখার জন্য।
আপনি এসেছেন খুব ভালো লাগছে স্যার, এরকম করে কেউ কখনও দেখতে আসে না স্যার বলে দীলিপ।
সুরঞ্জন বলে, আমরা খুবই দুর্বিষহ জীবন যাপন করি। কিন্তু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলবেন স্যার।
তা হোক এখানেই দাঁড়িয়ে কথা বলি।
নেপাল বলে, না স্যার চলেন বসে কথা বলবেন।
আবিদ সাহেব বললেন, চলো…
তারা কয়েকটি চেয়ার নিয়ে আসে। আবিদ সাহেব, আঁখি আবিদ ও সোনামণি বসে। আবিদ সাহেব বলেন এবার বল। সুরঞ্জন বলে, এই যে দেখুন স্যার আমাদের বাড়ি ঘরের অবস্থা।
মাটির তৈরি, কাঁচাঘর টালি দিয়ে ছাওয়া টুবলি, টাবলী, কোন ঘরের দেয়ালের মাটি খসে পড়ছে। কারণ চালে কোন কোন স্থানে খোলা নেই। বৃষ্টির পানিতে চাল নষ্ট হয়ে গেছে। এই সব অবস্থা দেখে আবিদ সাহেব একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন, সত্যি, তোমাদের জীবন যাপন খুবই দুর্বিষহ।
দীলিপ বললো, আমরা গরিব মানুষ স্যার। খুব ভোরে উঠে যাই মাছ ধরতে। দুপুর পর্যন্ত জাল টানি। তারপর হাট বেলা হলে যাই মাছ বিক্রি করতে। চাল, ডাল, নুনসহ সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটা করে বাড়ি ফিরি।
নেপাল বলে, নিজেরা তো কোনো ভালো কাপড় চোপড় পরি না। উপরন্তু নিজের সন্তানদেরকেও ভালো জামা কাপড় পরাতে পারি না।
সুরঞ্জন ১০০ হাত লম্বা একটা জাল দেখিয়ে বলে, এটাই আমাদের জীবন যাপনের একমাত্র সম্বল স্যার। এইটা দিয়েই আমরা বাণিজ্য করি।
আঁখি আবিদ বললেন, তোমাদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাও না?
হ আপা, ওরা স্কুলে যায়, আমরা তো লেখাপড়া জানি না, দেখি ছেলেমেয়েদের একটু অ, আ, ক, খ শিখাতে পারি কিনা।
বাহ! বেশ তো, শুনে খুব খুশি হলাম বললেন আঁখি আবিদ। আজ তোমরা নদীতে মাছ ধরবে না?
না স্যার আজ নদীতে মাছ ধরবো না। আজ আমরা পূর্ব পাড়ায় রশিদ সরদারের দীঘিতে জাল টানতে যাব।
চলো, আমরাও তোমাদের সাথে যাব। আমরা আমাদের মেয়েকে তোমাদের জেলে পাড়া, তোমরা কেমন করে জীবন যাপন কর, কিভাবে জাল টেনে মাছ ধর, সবকিছু ওকে দেখাতে নিয়ে এসেছি। বেশ তো চলেন স্যার, সুরঞ্জন, দীলিপ, নেপাল, গোপাল, হরিশচন্দ্র কাঁধে জাল নিয়ে হাঁটতে থাকে।
আবিদ সাহেবও ইজিবাইক নিয়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে যান। দীঘিতে জাল টানতে শুরু করে ওরা। জাল টানতে টানতে দীঘির মাঝ বরাবর গেলে রুই, কাতলা, সিলভার কাপ ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকারের মাছ লাফাতে শুরু করে। সোনামণি তীক্ষè নজর ছুড়ে তাকিয়ে থাকে জালের দিকে। খই ফোটার মতো করে মাছ লাফাচ্ছে দেখে আনন্দে নেচে ওঠে সোনামণি। আস্তে আস্তে জাল যতই সঙ্কীর্ণ হতে থাকে ততই লাফাতে থাকে মাছ।
ইতোমধ্যে গ্রামের মাতবর রশিদ সরদার আসেন পরিচয় হয় আবিদ সাহেবের সাথে। তিনি তার কথা শুনে খুবই খুশি হন। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞাসা করেন, তোমার নাম কি মামণি?
আমার নাম সোনামণি।
বাহ! তোমার নামটা তো খুবই সুন্দর। কোন ক্লাসে পড়?
আমি দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ি।
তোমার রোল নম্বর কত?
আমার রোল নম্বর এক।
বাহ! চমৎকার। তা কেমন লাগলো তোমার জেলেদের মাছ ধরা?
খুব ভালো।
আবিদ সাহেব বললেন, আপনার দীঘিতে বেশ মাছ আছে।
আছে বৈকি। তাদের পরিচর্যার জন্য তালিকা অনুযায়ী সময় মতো খাদ্য দেওয়া ভিটামিনযুক্ত ঔষধ প্রয়োগ অর্থাৎ সার্বিক তত্ত্বাবধানের জন্য দুইজন লোক ২৪ ঘণ্টা কাজ করে যাচ্ছে। তাদের বেতন আছে। সব খরচ বাদ দিয়েও বেশ লাভ পাচ্ছি। মাছ চাষ এখন খুব লাভজনক ব্যবসা।
জেলেরা জাল টেনে উপরে উঠতেই আবিদ সাহেব রশিদ সরদার ও জেলেদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসার মুহূর্তেই রশিদ সরদার বললেন, আপনারা আজকে আমার মেহমান, চলেন আমার বাড়িতে।
আবিদ সাহেব বললেন, না থাক, অন্য একদিন যাওয়া যাবে।
রশিদ সাহেব, আবিদ সাহেবের হাতে ৫ কেজি ওজনের একটি কাতলা মাছ ধরিয়ে দিয়ে বললেন, থাকবেন না যখন এটা নিয়ে যান। অন্তত একটা পুরাতন ঐতিহ্য বজায় থাক।
আবিদ সাহেব বললেন, কোন ঐতিহ্য?
রশিদ সাহেব বললেন, আরে বুঝেন না, ‘মাছে ভাতে বাঙালি।’
দু’জন হেসে ওঠে।
জেলে ও রশিদ সাহেবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ইজিবাইকে ওঠেন তারা। পথিমধ্যে আবিদ সাহেব বলেন, জেলে জেলেপাড়া আর জেলেদের মাছ ধরা কেমন দেখলে মামণি?
আমার খ্বুই ভালো লেগেছে আব্বু। যখন জেলেরা জাল টানতে টানতে মাঝ বরাবর নিয়ে গেল তখনি খইয়ের মত লাফাতে লাগলো মাছেরা।
আঁখি আবিদ বললেন, জেলেদের জীবন কষ্টের হলেও কথাবার্তা, চাল-চলন ব্যবহার আমার খুবই ভালো লেগেছে। আবিদ সাহেব বললেন, তুমি ঠিকই বলেছো গরিব হলেও ওদের মনটা কত হাসি খুশি কত সুন্দর করে আপ্যায়নের সুরে কথা বলে।
রাতের খাওয়ার সময় আবিদ সাহেব বললেন, একচুয়ালি রশিদ সাহেব উদার প্রাণের মানুষ। আঁখি আবিদ বলেন, আমিও তোমার সাথে একমত। উনি যে কাজটি করলেন তা তার মানবিকতারই পরিচয় মেলে।

ছয়.
শুক্রবার আবিদ সাহেব বারান্দায় বসে দৈনিক পত্রিকায় চোখ বুলাচ্ছেন। তিনি খুবই তীক্ষè নজর ছুড়ে দেখছেন দেশের খবর বিদেশের খবর, ব্যবসা, বাণিজ্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শেয়ারবাজার ছাড়া ও খেলাধুলার পাতাও তার অতি প্রিয়। পাশের টেবিলে বসে সোনামণি গ্রামের বর্ষণমুখর বিকালের একটি ছবি আঁকছিল। আবিদ সাহেব পত্রিকার পাতা হতে চোখ তুলে বললেন, নাশতা করেছ? আবিদ সাহেবের কথায় হালকা ঘাড় নাড়ে সোনামণি। তারপর তিনি বলেন, মামণি আস্তে আস্তে তোমার ছুটি ফুরিয়ে আসছে। আর দুইদিন পরেই তোমার স্কুল খুলবে। চলো আজকে আমরা রিকশাওয়ালার জীবন সম্পর্কে জানবো। আনন্দে নেচে ওঠে সোনামণি। সে বলে, ইজিবাইকে ওঠে কি রিকশওয়ালার জীবন জানা যায়?
প্রতি-উত্তরে আবিদ সাহেব বললেন, যদি আমরা রিকশায় না উঠি তাহলে রিকশাওয়ালার জীবন সম্পর্কে জানবো কিভাবে?
সত্যি তো আব্বু! তুমি ঠিকই বলেছ।
সাজগোজ করে আবিদ সাহেব আঁখি আবিদ ও সোনামণি চৌরঙ্গী মোড়ে দাঁড়িয়ে আছেন রিকশায় ওঠার জন্য। অনেকক্ষণ ধরে তিনি একটি ছিমছাম, সুন্দর মজবুত রিকশা খুঁজছেন । হঠাৎ তিনি দেখেন মধ্যবয়সী একটা লোক গোঁফ-দাড়ি প্রায় হাফ হাফ পেকে গেছে, তার দেহটা বেশ সুঠাম। তিনি হাতের ইশারায় রিকশাওয়ালাকে ডাক দিলেন। রিকশায় উঠে তিনি বললেন, চলো একটু ঘুরি।
ঘুরি মানে, কই যাইবেন স্যার?
আবিদ সাহেব বললেন, আজ সমস্ত শহর ঘুরবো।
বলেন কী স্যার! এমন করে তো কেউ কখনও ঘোরে না।
আজ আমরা ঘুরবো তোমার সাথে একটু গল্প করবো। আচ্ছা, তোমার নামটা কী যেন?
আমার নাম দবির আলী স্যার।
কোথায় থাকো?
কদমতলী। গেল বছরে দু’টা রুমসহ একটি বাড়ি করছি স্যার। টালির ছাউনি।
তোমার ছেলেমেয়ে কয়জন?
আমার একটা ছেলে একটা মেয়ে স্যার।
বাহ! বেশ তো তোমার সংসার। তুমি লেখাপড়া জানো?
আগে জানতাম না, এখন জানি স্যার।
এখন জান মানে, কিভাবে শিখলে?
আমি নিরক্ষর ছিলাম, তো আমাদের গ্রামে বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র খুলছে ওখানে পড়ে আমি স্বাক্ষর করতে পারি। আমি বিভিন্ন রকমের বই পত্রিকা পড়তে পারি।
বাহ! তুমি তো চমৎকার একটা কাজ করেছ।
জি স্যার, এখন মনে আনন্দ লাগে। আর আগে কাউকে লিখতে পড়তে দেখলে ভীষণ লজ্জা পেতাম।
এই যে রিকশা তুমি চালাচ্ছ, এটা কি তোমার নিজের?
হ স্যার এটা আমার নিজের রিকশা, আগে সমিতির রিকশা চালাতাম। যা আয় করতাম তার কিছু মালিককে দিয়ে সংসার চালানো খুবই কষ্টকর হয়ে পড়তো স্যার। দুই বছর আগে ইসলামী ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে এই রিকশাটা কিনছিলাম। এখন দিনে তিনশত টাকা আয় করি। সকাল ৮টা হতে রাত ৯টা পর্যন্ত রিকশা চালাই। আমার একটা গাভীও আছে। দোআছলা জাত। দুই আড়াই কেজি করে দুধ হয়। দুই কেজি বিক্রি করি আধা কেজি খাই। তা ছাড়া গোবর দিয়ে নুড়ি তৈরি করে আমার বৌ ছখিনা। ভালোই আছি স্যার।
তাইতো দেখছি। বেশ তো তোমার জীবন।
আমি তো আমার জীবনের কথা কইলাম। কিন্তু কী জন্য যে ঘুরতাছেন তা তো কইলেন না স্যার। এই যে আমার মেয়ে সোনামণি। স্কুলে পড়ে, ও দেখতে এসেছে, তোমরা কেমন করে রিকশা চালাও। কিভাবে জীবন যাপন কর এই সব।
এই সব জাইনা কী হইব স্যার?
দবির আলী আমাদের এই দেশ বড় আজব। এই ছোট্ট একটি দেশে বিভিন্ন পেশার লোক বাস করে। যেমন তুমি এক পেশায় আছ। কামার, কুমার, তাঁতী, জেলেও এক একজন এক এক পেশায় আছে। এই শ্রেণীর পেশার লোকদের এবং তাদের কারুকাজ দেখানোর জন্য নিয়ে আসা। এটা ওর স্কুলের পাঠ্য বইয়ে আছে।
জি-জি-এখন বুঝছি স্যার। চলেন একটু চা খেয়ে লই।
কোথায়?
এই তো, এই দোকানে।
আবিদ সাহেব রিকশা থেকে নামেন, আঁখি আবিদ, সোনামণিও। চা খেতে খেতে আবিদ সাহেব বললেন, বাহ! তুমি তো বেশ চা তৈরি কর। আর তোমার টি স্টলও বেশ বড় এবং নিট অ্যান্ড ক্লিন।
দবির আলী বলে। স্যার, প্রতিদিন আমি এই দোকানে বসেই চা খাই। ক্লান্তি দূর করি। একটু সতেজ হয়ে আবার চালানো শুরু করি।
তুমি বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্রে পড়ে বেশ চমৎকার কথা শিখেছ।
আবিদ সাহেব চায়ের দামটা দিয়ে আবার রিকশায় উঠলেন। রিকশা চলতে থাকে। কোর্ট রোডে রিকশা চলতে থাকে। কোর্ট রোড হয়ে রিকশা এসে থামে নারকেলতলা চৌরঙ্গী মোড়ে। রিকশা থেকে নেমে একশত টাকার তিনটি নোট দবির আলীর হাতে দিয়ে বললেন, আজ আর রিকশা চালাবে না তুমি।
দবির আলী টাকাটা পকেটে রাখে। তার বুকটা আনন্দে ভরে ওঠে।

সাত.
আবিদ সাহেব প্রতিদিনকার মতো পত্রিকার পাতায় চোখ বুলাচ্ছেন। আঁখি আবিদ বললেন, আজ কোথাও যাবে নাকি?
যেতে তো চেয়েছিলাম।
কোথায়?
কৃষকদের কৃষিকাজ দেখাতে চেয়েছিলাম।
সোনামণির ছুটি আজ শেষ, আগামীকাল ওর স্কুল খুলবে। আবিদ সাহেব বললেন, সোনামণি মামণি আজকে আমরা কৃষকদের জীবন সম্পর্কে জানবো। কী তোমার কেমন লাগছে?
এসব পেশার লোকদের দেখে আমি অনেক কিছু জানতে ও বুঝতে পেরেছি আব্বু।
বেশ তো। বড় হলে আরও জানতে পারবে। নাশতা খেয়ে ইজিবাইক নিয়ে বের হয়ে পড়েন ওরা। ইজিবাইক চলতে থাকে। এক সময় ওরা এসে পৌঁছান বকচরা মাঠে। অবারিত মাঠ সবুজ ধানের শীষে আঁকছে সবুজের আল্পনা। মাঠের মাঝখানে একটা বটগাছ। শান্ত শীতল হাওয়া বয়ে যাচ্ছে বটগাছের শাখায়। আবিদ সাহেব তাকিয়ে দেখেন বটগাছের নিচে নিশ্চিন্তে শিকড়ের ওপর গামছার ভাঁজ ফেলে তার ওপর মাথা রেখে অঘোরে ঘুমাচ্ছে এক কৃষক।
বটগাছের তলায় ইজিবাইক থামিয়ে লোকটির পাশে দাঁড়ালেন তিনি। অপলক চোখে দেখছেন লোকটিকে।
আঁখি আবিদ বললেন, দেখেছো লোকটি কী অনাবিল সুখে গাছের তলায় ঘুমাচ্ছে।
আবিদ সাহেব বললেন, তাই তো দেখছি। কিয়ৎপর তাদের কথোপকথনের মধ্যে কেমন আড়মোড় ভেঙে জেগে উঠলো লোকটি। কেমন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্ছে আবিদ সাহেবের মুখের দিকে। লোকটির বয়স মধ্যম, রঙে মরা, দেহ চিকন চাকান। আবিদ সাহেব বললেন, তুমি কে? কী নাম তোমার?
প্রতি-উত্তরে লোকটি বলল, আমার নাম ছলিমদ্দি, আমি একজন কৃষক।
এই যে তোমরা ধান চাষ কর, বীজতলা তৈরি কর কী মাসে?
কার্তিক মাসে আমরা চাতর তৈরি করি। যে ধানের বীজ বপন করবো তা আমরা একটা বস্তায় ভরে পানিতে ভিজিয়ে দুই থেকে তিন দিন হাঁফরে রাখি। তারপর ধানের কল বের হলে   তৈরি করা চাতরে বীজ বপন করি। তারপর ভালো পাতা তৈরির জন্য চাতরে সেচ দিই। প্রয়োজন হলে সার প্রয়োগ করি। তারপর পাতার বয়স এক থেকে দেড় মাস হলে জমি চাষ করি। চাষ করে কয়েকদিন চাপা দিয়ে রাখি যাতে করে আগাছা মাটির তলায় পড়ে পচে যায় এবং জমিটা উর্বর ও চারা বেড়ে ওঠার উপযোগী হয়।
চাষে সার প্রয়োগ করে জমিটা ভালো করে চাষ করে মই দিয়ে সমান করি। সুতা টাঙিয়ে ধানের চারা রোপণ করি। যাতে করে প্রত্যেকটি গোজের মাঝে সমান ফাঁকা থাকে। চারার শিকড় ছাড়া পর্যন্ত জমিতে উপযুক্ত পরিমাণ পানি রাখা হয়। ধানের চারা বেশ সজীব হয়ে উঠলে ১৫ থেকে ২০ দিন পর জমিতে সার প্রয়োগ করে চাপা দেয়া হয়। তারপর জমিতে আগাছা পরিষ্কার করার জন্য জমি হাঙলানো হয়। এভাবে ধানের চারা আস্তে আস্তে বয়স হয়ে গেলে পোকা মাকড় দমনের জন্য কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়। এরপর আবার সার প্রয়োগ করা হয়। পরবর্তীতে ধান ফুলে গেলে ধান পুষ্ট ও চেহারা সোনালি করার জন্য স্কোর প্রয়োগ করা হয়। ধান পেকে গেলে আমরা ধান কাটি। ঐ কাটা ধান কয়েক দিন রাখার পর রৌদ্রে শুকিয়ে গেলে বিচুলি বেঁধে বাড়ি নিয়ে আসি। তারপর কয়েকদিন পরে শুরু হয় ধান ঝাড়া। ওই ধানেই আমাদের খোরাকি, হাট, ঘাট সব হয়ে যায়। অতিরিক্ত ধান বিক্রি করি।
বাহ! বেশ তো, তোমরাই হলে দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড।
আপনি ঠিক বলেছেন কিন্তু স্যার আমরা যদি সরকার থেকে ভালো বীজ পাই সময়মত সার পাই তাহলে ফসল করতে আমাদের আনন্দ লাগে। সময়মত খাদ্য প্রদান করলে জমিও ভালো ফসল দেয়। বাম্পার ফলন হয়।
তুমি ঠিকই বলেছ ছলিমদ্দি। ভালো বীজ ভালো ফসল। তোমরা কত কষ্ট করে রৌদ্রে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে ফসল ফলাও।
জি স্যার, কষ্ট করি তাইতো সুখে আছি।
তোমাদের কাছে অনেক কিছু শিখবার আছে।
কী যে বলেন স্যার!
আচ্ছা ঠিক আছে ভালো থেকো, চলি।
যাবেন কেন স্যার? আমার বাড়িতে চলেন।
না আজ থাক। আমরা একটু ধোপা পাড়ার দিকে যাবো।
ইজিবাইক নিয়ে ধোপা পাড়ার উদ্দেশে রওয়ানা হয় তারা।

আট.
ধোপা পাড়া কত দূরে আব্বু? ধোপারা দেখতে কেমন আব্বু?
মেয়ের কথায় মৃদু হেসে, আবিদুর রহমান সাহেব বলেন, তারাও আমাদের মতো দেখতে।
ওদের কাজ কী আব্বু?
ওদের কাজ হলো কাপড় চোপড় ধৌত করা। এখন যেমন বিভিন্ন প্রকারের সাবান ও পাউডারের প্রচলন হয়েছে। দেশ স্বাধীনের আগে ও পরে এত সাবানের ব্যবহার ছিল না। তখনকার যুগে গ্রামের মানুষরা কলাগাছ একটু একটু করে কেটে রৌদ্রে শুকাতো এবং শুকানোর পরে  পোড়ায়ে ক্ষার তৈরি করতো। তারপর কড়ায় করে পানি গরম করে সেই গরম পানিতে পরিমাণ মতো ক্ষার দিত। ক্ষার পানির সাথে মিশে গেলে সেই পানিতে কাপড় চোপড়, কাঁথা, মশারি ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস সিদ্ধ করতো এবং পরে পাটে কেচে কেচে কাপড়ের ভেতরের ময়লা বের করে আনতো।
ঐ ক্ষারে কি কাপড় চোপড় পরিষ্কার হতো আব্বু?
পরিষ্কার যদি না হবে তাহলে তখনকার মানুষ ওটা করতে যাবে কেন? এ ছাড়াও আমি ছোটবেলায় দেখেছি তোমার দাদি মা কাপড় চোপড় কাচতে ক্ষারের অনুরূপ সোডা ব্যবহার করতো।
সোডা কী দিয়ে তৈরি আব্বু?
সোডা বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের সংমিশ্রণে তৈরি?
আমরা তো অনেক দূর চলে এসেছি, ধোপা পাড়া আর কতদূর? বললেন আঁখি আবিদ।
প্রতি-উত্তরে আবিদুর রহমান সাহেব বললেন, ঐতো এসে গেছি।
ধোপা পাড়ায় পৌঁছাতেই-সোনামণি, আঁখি আবিদ ও আবিদ সাহেব অবাক হয়ে যান ধোপাদের ধৌত করা কাপড় চোপড় না দেখে। ছিমছাম দ্বিতল একটি বাড়ি। ইজিবাইক বাড়ির উঠোনে থামতেই ছুটে আসেন অসিত ধোপা আর তার স্ত্রী মিলি। আবিদ সাহেব ইজিবাইক থেকে নামতেই অসিত ধোপা জিজ্ঞেস করে, কী ব্যাপার, আপনারা?
আমরা আপনাদের কাজকর্ম দেখতে এসেছি কিন্তু তার কোনো নমুনাই দেখছি না যে!
কিসের নমুনা?
কাপড় চোপড় ধৌত করে রৌদ্রে শুকানোর নমুনা।
দুঃখিত! আমরা ঐ কাজ এখন আর করি না।
করি না মানে!
করি না মানে করি না। আমার জ্যাঠা ঐ কাজ করতেন। বাবা জ্যাঠাকে সাহায্য করেছেন। কিন্তু এখন ঐ কাজ আমাদের কেউ করে না।
তাহলে কী করেন?
ব্যবসা করি, বেশ আছি। আমাদের পেশার লোকদের কাজ কর্মের খোঁজ-খবর নেয়ার উদ্দেশ্যটা কী?
একচুয়ালি উদ্দেশ্যটা হলো আমার মেয়ে সোনামণি। ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে। কামার, কুমোর, তাঁতী, জেলে, ধোপা এই সমস্ত পেশাজীবী মানুষের কাজ-কর্ম নিজের চোখে দেখবে এবং তা থেকে কিছু শিক্ষাগ্রহণ করবে।
ও আচ্ছা বুঝতে পেরেছি, আর বলতে হবে না। এখন আমাদের দেশে অনেক পেশাজীবী মানুষের কর্মকাণ্ড বিলুপ্ত হতে চলেছে।
আপনি ঠিকই বলেছেন। এখন মানুষ অনেক সভ্য হয়েছে। নিজেদের পেশা ছাড়াও ব্যবসা বাণিজ্য করে জীবিকা নির্বাহ করছে।
সবই ঠিক আছে। কিন্তু আগেকার মানুষের পেশার বহিঃপ্রকাশ ঘটতো। যেমন জেলে পাড়া মুখরিত হয়ে উঠতো তাদের জাল টাঙানোয়। ধোপা পাড়া মুখরিত হয়ে উঠতো ধৌত করা টাঙানো কাপড় চোপড়ে।

নয়.
পরদিন ইজিবাইক নিয়ে তারা রওনা হয় ইঞ্জিনিয়ারের কারুকাজ দেখতে। সাতক্ষীরা লস্কর পাড়ায় একটা বিল্ডিংএ ছাদের কাজ চলছিল। ইজিবাইক  থেকে নেমেই এদিক ওদিক তাকাতে থাকেন আবিদ সাহেব। সাথে আঁখি আবিদ, সোনামণিও।
সোনামণি বলে, ইঞ্জিনিয়ার কই আব্বু?
আবিদ সাহেব তাকিয়ে দেখেন একজন ভদ্রলোক কর্মরত শ্রমিকদের দিকে হাত নেড়ে নেড়ে ইঙ্গিত করছেন। আবিদ সাহেব ধীরে ধীরে এগিয়ে যান সেদিকে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আবিদ সাহেব, আঁখি আবিদ ও সোনামণি তীক্ষè নজর ছুড়ে দেখেন। আবিদ সাহেবকে দেখে ইঞ্জিনিয়ার শফিক আহমেদ বলেন, আরে ম্যানেজার সাহেব যে, বসেন বসেন।
চেয়ারে বসতে বসতে আবিদ সাহেব বলেন, আমার স্ত্রী আঁখি আর এ হচ্ছে আমার মেয়ে সোনামণি। আমরা সপরিবারে দেখতে এসেছি ইঞ্জিনিয়ারের কারুকাজ।
বাহ! বেশ তো!
বিশেষ করে আমার মেয়ে সোনামণিকে ইঞ্জিনিয়ারের কাজগুলো প্রাকটিক্যালে দেখাবার জন্য নিয়ে এসেছি।
ও আচ্ছা! এবার বুঝেছি।
খুব ভালো করে দ্যাখ মামণি, ঘুরে ঘুরে সব কিছু দেখে নাও।
আঁখি আবিদ বললেন, ইঞ্জিনিয়ারের প্রথম কাজটা কী?
ইঞ্জিনিয়ারের প্রথম কাজ হলো একটা বিল্ডিংয়ের ডিজাইন তৈরি করা। তারপর সেই ডিজাইন অনুযায়ী স্টেপ বাই স্টেপ বিল্ডিং এর কাজ কমপ্লিট করা।
একটা বিল্ডিংয়ের স্থায়িত্বকরণে ইঞ্জিনিয়ারের কাজ কী?
আপনি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রশ্ন করেছেন ভাবি। প্রকৃতপক্ষে, একজন ইঞ্জিনিয়ারের সততা এবং তার তদারকির ওপরই নির্ভর করে একটা বিল্ডিংয়ের স্থায়িত্ব।
যেমন? বললেন আঁখি আবিদ।
যেমন ধরেন এক নং ইট, সবচেয়ে ভালো বালু, ভালো সিমেন্ট, ছাদ দেয়ার সময় ইঞ্জিনিয়ারের তদারকি আরও বেড়ে যায়। খোয়া বালু সিমেন্ট পরিমাণ মতো হলারে পড়ছে কিনা সেটা দেখা খুবই জরুরি। এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ, ঐ যে দেখুন কিভাবে তৈরি হচ্ছে মশলা। শ্রমিকরা ঝুড়িতে করে পরিমাণ মতো খোয়া বালু, সিমেন্ট দিচ্ছে এবং তাতে পরিমাণ মতো পানিও দিচ্ছে।
সত্যি! খুব চমৎকার একটা সময় কাটালাম আপনার সঙ্গে।
আজ খুব ভালো লাগছে ভাবি।
আসলে এ রকম করে কেউ কখনও দেখতে আসে না।
আবিদ সাহেব বললেন, চলো উঠা যাক। আঁখি আবিদ বললেন, হ্যাঁ চলো।
ইঞ্জিনিয়ার শফিক আহম্মদ বললেন, আজকে আপনারা আমার বাসায় চলেন ভাবি।
না আজ থাক না ভাই অন্য একদিন যাওয়া যাবে।
কিভাবে বিল্ডিং তৈরি হচ্ছে দেখেছ মামণি?
ইঞ্জিনিয়ারের কথায় হালকা ঘাড় নাড়ে সোনামণি।
ইঞ্জিনিয়ার সোনামণির মাথায় হাত রেখে বললেন, তুমি কি ইঞ্জিনিয়ার হতে চাও মামণি?
হ্যাঁ বলে ঘাড় নাড়ে সোনামণি। আবিদ সাহেক বললেন, আসি তাহলে।
আচ্ছা আসেন। আবার আসবেন।
ইজিবাইকে উঠেই বাসার উদ্দেশে রওনা দেয় তারা।

দশ.
আজ রবিবার। সকাল বেলা গোছ গাছ করে অফিসে বের হয়ে পড়লেন আবিদ সাহেব। সোনামণিও নাশতা করে বের হয়ে পড়লো স্কুলে।
ঘণ্টা পড়ার পর তাদের শ্রেণী শিক্ষিকা সেলিনা বেগম ক্লাসে ঢুকলেন। নাম ডাকার পর সোনামণিকে দাঁড়াতে বললেন তিনি, সোনামণি দাঁড়িয়ে গেল।
তাকে হাসিখুশি দেখে শিক্ষিকা সেলিনা বেগম বললেন, সোনামণি তুমি আগের চেয়ে অনেক সুন্দর হয়েছ। বেশ উৎফুল্ল দেখা যাচ্ছে তোমাকে।
সোনামণি বলল, ম্যাডাম আপনি যে সমস্ত পেশার লোকদের কারুকাজ যেমন, কামার, কুমার, তাঁতী, জেলে, ডাক্তার, কৃষক সব পেশার লোক কিভাবে কাজ করে, কেমন করে তাদের জীবিকা অর্জন করে সব আমার আব্বা-আম্মার সাথে ঘুরে ঘুরে দেখে এসেছি। কিছু জিনিসপত্র কিনে এনেছি।
তাই নাকি। বাহ! চমৎকার একটা কাজ করেছ তুমি। এইটুকু বয়সে স্বচক্ষে তাদের কর্মস্থল তাদের কাজ এবং তাদের নিকট থেকে তাদের তৈরি জিনিসপত্রও কিনে এনেছ। কত সৌভাগ্য তোমার! এগুলো আমাদের দেশের প্রাচীন ঐতিহ্য। কী কী কিনেছ?
কামারের কাছ থেকে বটি, কুমারের কাছ থেকে খেলনা কিনেছি, হাঁড়ি, কলস, পুতুল আরও কত কী?
আর একটা জিনিস কিনেছি ম্যাডাম।
কী জিনিস?
মাটির ব্যাংক।
বাহ! খুব সুন্দর একটি কাজ করেছ।
টাকা সঞ্চয় কর, দেখবে তোমার মনটা ভালো থাকবে। তুমি মিতব্যয়ী হবে।
ক্লাসের ঘণ্টা পড়লে সেলিনা বেগম অফিসে গেলেন। সব টিচাররা এক এক করে অফিসে ঢুকলেন। সহকারী শিক্ষিকা সেলিনা বেগমকে হাসতে দেখে সবাই বললেন, কী ব্যাপার আপনি হাসছেন কেন? তিনি বললেন, একটি মজার খবর আছে। সবাই সমস্বরে বললেন, কী খবর? সেলিনা বেগম বললেন, সোনামণি একটা চমৎকার কাজ করেছে। তাকে আমি গ্রীষ্মকালের ছুটিতে যে সমস্ত পেশার লোকদের কারুকাজ নিজ চোখে দেখে আসতে বলেছিলাম সে তার পিতা-মাতার সঙ্গে প্রাকটিক্যাল দেখে এসেছে।
প্রধান শিক্ষক বললেন, বলেন কি ম্যাডাম?
হ্যাঁ, আমি সত্যি বলছি।
টিচাররা সমস্বরে বলে উঠলেন, বাহ! সুন্দর একটা কাজ করেছে সোনামণি।
স্কুল ছুটির পর সহকারী শিক্ষক জাহিদ রেজা ও সহকারী শিক্ষিকা সেলিনা বেগম সোনামণিকে ডেকে তার দেখা কিছু অভিজ্ঞতার কথা শুনতে শুনতে বাসার উদ্দেশে পা বাড়ালেন।

SHARE

Leave a Reply