Home স্মরণ ঈদের সেমাইটা আমার সারা জীবনের পছন্দ

ঈদের সেমাইটা আমার সারা জীবনের পছন্দ

প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ..

ঈদগার মাঠ একটু দূরে থাকায় আশপাশের আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী একত্রে সাত-আটজন গরুর গাড়িতে ঠাসাঠাসি করে যেতাম

কিশোর বয়সের ঈদস্মৃতি কার না মনে পড়ে? এখনো এই বয়সে ঐসব দিনের কথা যখন মনে হয়, তখন অস্থির হয়ে উঠি, অভিভূত হইÑ এত চমৎকার দিনগুলো পার হয়ে গেছে, চলে গেছে, ভব্যিষতে আর আমাদের জীবনে ফিরবে না। ফিরবে হয়তো আমাদের সন্তান, নাতি-নাতনীদের জীবনে। কিন্তু আমরা আমাদের স্মৃতি সম্পদ হিসেবে ওই দিনগুলোকে ধারণ করেছি, মনে গেঁথে রেখেছি। ঈদ তখনকার দিনে খুব সহজ সরলভাবেই উদ্যাপিত হতো। আমার জন্মতো ১৯৩২ সালের ১৫ ডিসেম্বর। পাঁচ-ছয় বছর থেকে অনেক কথা আমার মনে আছে, অনেক বছর হয়ে গেছে বটে তবে অনেক কথাই মনে আছে। তখন মানুষের জীবন যেমন সহজ-সরল ছিল, চাওয়া-পাওয়ার প্রত্যাশার মাত্রাটা খুব সীমিত ছিল। যার যা ছিল তাই নিয়ে সবার খুশি থাকার মানসিকতা ছিল। এখন আমার ছেলে, নাতি-নাতনীরা এটা অনুভবই করতে পারে না। যেমন ঈদের আগে নতুন জামা-কাপড়, জুতো অথবা এরকম যার যার বাবা-মা কিনে দিতেন ঈদের কয়েক দিন আগেই। ঈদের আগের দিন জুতো ঠিক মতো লাগছে কি না সেই জন্য এই বিছানা থেকে ওই বিছানা দৌড়িয়েছি। জামা-কাপড়ও ঠিক মতো লেগেছে কি না তা গোপনে গোপনে পরীক্ষা করতাম। পছন্দ বাবা-মারই, আমাদের পছন্দ বা তাদের ওপর কোনো কথা বা ভাবনারই সুযোগ ছিল না। মনে হতো যে আমার পছন্দের জিনিসটাই তিনি কিনে এনেছেন।
ঈদগায় যাওয়ার আগে বাবা-মাকে সালাম করে যেতে হতো। ঈদের মাঠ থেকে এসে দাদা-দাদী, চাচা-চাচীদের সালাম করতে হতো। সাধারণ মানুষ আশপাশের পাড়া-প্রতিবেশীদের সালাম, বুকে বুক মিলানোÑ এই যে একটা রেওয়াজ ছিল। ওই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে কষ্ট হয়, যা আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেলো।
ঈদের দিনে সেমাই খাওয়ার রেওয়াজটা সার্বজনীন, আগে থেকেই ছিল। আমি যখন খুব ছোট ছিলাম, তখন হয়তো চার থেকে পাঁচ বছর হবেÑ ঈদগাহ ছিল আমাদের বাসা থেকে একটু দূরে, মাইলখানেক। আমাদের একটা গরুরগাড়ি ছিল, তখন বাবা আমাকে, আমার ছোট ভাইকে গরুরগাড়িতে করে ঈদগায় নিয়ে যেতেন। এখন আমাদের সন্তান, নাতি-নাতনীদের জীবনটা একটু বেশিই প্রত্যাশার, একটু কঠিন হয়েছে। পছন্দটা যেন ভিন্ন ভিন্ন রকম হয়েছে। বাবা-মা কিনলেই পছন্দের হতে হবে এমন কোনো কথা নয়। জিনিস কিনতে হলে তাদেরকে সাথে নিয়েই কিনতে হবে। অথবা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের জিনিস কিনে আনতে হবে, এই ব্র্যান্ডটা এই জিনিসটা আনতে হবে। তখন এই জিনিসগুলো ছিল না। ব্র্যান্ডের নামই জানতাম না। কত রকম দ্রব্য আছে তা জানতাম না।
তখন ঈদের মাঠে যাওয়ার আগে মা ডান হাতে একটু আতর লাগিয়ে দিতেন। এখন যে কতো রকমের আতর হয়েছে তা হিসাব করা যাবে না। তখন আতর আতরই, তার বিকল্প ছিল না। তখন তা শুঁকতে শুঁকতে নিজে একা যাওয়ার তো অবস্থা ছিল না। বাবা নিয়ে যেতেন, যেনো কোনো অসুবিধা না হয়।
ঈদের আগের রাতটা ঘুমানো কঠিন ছিল, কত গভীর রাতে যে ঘুমিয়েছি তা-ও মনে নেই। আবার কখন ভোর হবে সেই অপেক্ষা। কখন ভোর হবে, কে সবার আগে উঠবে, শীতের দিন হলেও সকালে গোসল সেরে নতুন জামা-কাপড় পরার আগ্রহ ছিল অধিক। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমার বড় দুই বোন ছিল তারা অথবা মা আমাদের গোসল, জামা-কাপড় পরতে সাহায্য করতেন।
আমাদের বাড়ির পাশেই একটা পুকুর ছিল। কিন্তু আমরা পুকুরে গোসল করতাম না। আমাদের বাড়িতে একটা কুয়া ছিল, সেখান থেকে পানি উঠিয়ে গোসল করিয়ে দিতেন মা অথবা বড় বোন।
আমার বাবার সাথে, কোনো কোনো সময় বাবার দুই ভাই ছিল তাদের সবাই একত্রে মাঠে যেতাম। ঈদগার মাঠ একটু দূরে থাকায় আশপাশের আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী একত্রে সাত-আটজন গরুর গাড়িতে ঠাসাঠাসি করে যেতাম।
আমাদের গ্রামটা বেশ বড়ই ছিল। তার এক প্রান্তে আমাদের বাড়ি ছিল। আমাদের পরিবারটা বেশ বড় ছিল। দাদা, দাদার ছোট ভাই, আমার বাবা, বাবার বড় ভাই, মেজভাই, আত্মীয়স্বজন সবাই মিলে একটা পাড়া। ঘোরাফেরা ঠিক ঘোরাফেরা নয়, পাশের আত্মীয়স্বজন প্রতিবেশী তাদের বাড়িতে যাওয়া, মুরব্বিদের সালাম করা, তাদের কাছ থেকে দোয়া নেয়া। এতে খানাপিনা একটু বেশি হতো। কারও বাড়িতে গেলে না খাইয়ে তো ছাড়তো না।
তখন খুব বেশি খেলাধুলা ছিল না। লোকাল যে খেলাধুলা, সেই সব হতো আমাদের পাশেই একটা মস্ত বড় খেলার মাঠ ছিল, সেখানে। ফুটবল খেলাটা হতো বেশি। তখন ঈদের দিনে খেলাটা হতো বেশ মজা করেÑ বয়স্ক যারা এক দিকে, তরুণ যারা অন্যদিকে। বিনোদনের অন্য কোনো মাধ্যম ছিল না। রেডিও তখন তৈরি হয়নি, টেলিভিশন তো প্রশ্নেই ওঠে না। মাঝে মাঝে পুঁথিপাঠের আসর বসতো, সেটাও সিজনাল। ভাদ্র-আশ্বিনে যখন ধান কাটা শেষ হয়ে যেতো, মানুষের কাজ কাম কমে যেতোÑ তখন তারা এই পুঁথিপাঠের আসর জমাতেন। আমরা যখন ছোট তখন ঈদের দিনে বিশেষ কোনো বিনোদনের আয়োজন হতো না। আমাদের পাশের পাড়াটা হিন্দুদের ছিল। আমরা যখন ক্লাস এইট-নাইনে পড়ি, তখন ওদের সবাইকে নিয়ে একটা নাটক করা যায় কি না এরকম চিন্তা করেছি। কিন্তু নাটক করেছি কিংবা করতে পেরেছি এরকম আমার মনে হয় না। স্টেজ কিভাবে করতে হবে অথবা কিভাবে নাটকের ডাইরেকশনটা করতে হয় সেটা আমরা জানতাম না।
ঈদের সেমাইটা আমার সারা জীবনের পছন্দ। ঈদের দিন সেমাই না হলে ঈদ হলো কিভাবে? আমার ব্লাড সুগার একটু বেশি, তা-ও আমার ঈদের সেমাই না হলে চলে না। আর দুপুরে তখন রোস্ট বেশি চালু ছিল বলে আমার মনে হয় না। কিন্তু একটু টক, একটু মিষ্টি দিয়ে গোশত রান্না করা হতো। বেশ লাগতো খেতে। তখন পোলাও-কোরমা দুপুরের মেইন খাবার। এমনভাবে রান্না করা হতো এটাই যেন রাতে খাওয়া হয়।

SHARE

Leave a Reply