Home উপন্যাস পাখির নামে নাম মেয়েটার

পাখির নামে নাম মেয়েটার

আফরোজা পারভীন..

আজ কুটুমের পরীক্ষার রেজাল্ট দেবে। ক্লাস থ্রি থেকে ক্লাস ফোরে উঠবে কুটুম। মার অস্থিরতার শেষ নেই। চার পাঁচদিন ধরে একই কথা বলে চলেছেন
: ওর রেজাল্ট যে কী হবে! লেখা নেই, পড়া নেই, সারাক্ষণ শুধু খেলা। কিছু বললেই বলে, সব পড়া তো সেই কখন হয়ে গেছে মা। কখন যে পড়ে কে জানে। আমি তো কখনই ওকে পড়তে দেখি না। এবার ও রেজাল্ট মোটেও ভালো করবে না দেখে নিও। ওই যে পাশের বাসার শিমুল দিনরাত পড়ছে তো পড়ছেই, আর ওর লেখাপড়ায় মনই নেই। দুঃশ্চিন্তায় ঘুম হয় না আমার।
কুটুমের আব্বা একজন নামকরা আইনজীবী। তার ওপর তিনি রাজনীতি করেন। এবার এমপি ইলেকশনে দাঁড়াবেন বলে ঠিক করেছেন। বাড়িতে তাই সারাক্ষণ লোক গিজ গিজ করে। চায়ের কেটলি চুলো থেকে নামেই না। ট্রে বোঝাই হয়ে চা যাচ্ছে বসার ঘরে, বড় বড় বাটি বোঝাই হয়ে বিস্কুট। ভাত তরকারি রান্না হয় দফায় দফায়। এ নিয়ে মা রাগ করেন। আজকাল আবার কাজের লোকও পাওয়া যায় না। ওরা দিন দিন হয়ে যাচ্ছে লুপ্তপ্রায় প্রজাতি। মায়ের ব্যস্ততার সীমা নেই। আর আব্বা! আব্বার তো শ্বাস ফেলার সময় নেই। দিনে রাতে মায়ের সাথে দু’ চারটে কথা হয় কি না সন্দেহ। নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে আব্বার ব্যস্ততা ততই বাড়ছে। মাঝে মাঝেই আব্বাকে নির্বাচনী এলাকায় যেতে হয়। দিনের খুব অল্প সময়ই আব্বা বাড়িতে থাকেন। তা নিয়েও রাগ করেন মা, এই এক মানুষ হয়েছে। ছেলেমেয়ের কোন খেয়ালই নেই। সংসারের খেয়াল তো নেই-ই। ছেলেমেয়ে খেল কি খেল না, মেয়ে পড়ল কি পড়ল না, স্কুলে গেল কি গেল না সেদিকে বাপের কোন নজরই নেই। সব দায় যেন আমার। এই যে মেয়ের পরীক্ষার রেজাল্ট বেরুবে মনে পর্যন্ত নেই বোধ হয়। এদিকে আমার খাওয়া ঘুম হারাম হয়ে গেছে
আব্বা তখন কোর্ট থেকে ফিরে কাপড় বদলাচ্ছিলেন। মায়ের কথা কানে গেল তার। বললেন, আরে সবই মনে আছে। কিন্তু তোমার মত দুঃশ্চিন্তা করছি না। অতটুকু একটা মেয়ে, ক্লাস থ্রির পরীক্ষা। তাকে নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করার কী আছে। মেয়ে আমার ভালো, মেধাবী এটাই বড় কথা। ওকে চাপ দেয়া ঠিক না। আমি নিশ্চিত ও ভালো করবে
: তুমি তো বলেই খালাস। যত দায় যেন আমার। দিন কালের খবর তো আর রাখো না। চারদিকে কত কমপিটিশন তুমি জানো? লেখাপড়া যেন ছেলেমেয়েরা করে না, করে তাদের বাবা-মারা। দু চারদিন মেয়ের সাথে স্কুলে গেলে বুঝতে। প্যারেন্টস ডেতে পর্যন্ত যাও না। যাকগে, আল্লাহ জানেন কী রেজাল্ট করবে।
আব্বা আর কিছু বলেন না, মুচকি হাসেন। কাপড় পরে বেরিয়ে যাবার সময় কুটুমকে কাছে ডেকে আদর করে বিশ টাকা হাতে দিয়ে বলেন, আইসক্রিম খেও।
যাকে নিয়ে এত দুঃশ্চিন্তা সেই কুটুমেরই কোন চিন্তা নেই। ওরা দুই ভাই বোন। ছোটভাই মুকুটের বয়স মাত্র দুই বছর। বড় দুষ্টু হয়েছে সে। যেটুকু সময় ঘুমিয়ে থাকে ততটুকুই শান্ত। বাকি সময়টা টলোমলো পায়ে ঘরময় হাঁটতে থাকে। এটা ধরে ওটা ফেলে। ভাইয়ের সাথে যত খেলা আর যত দুষ্টুমি কুটুমের। এমন কি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওর ছোট ছোট হাতগুলো ধরে বসে থাকতেও কুটুমের ভীষণ ভালো লাগে। কুটুম ভাইয়ের পাশে বসে ওর ঘুমন্ত গালে আলতো হাত বুলাচ্ছিল। মুকুুট ঠাণ্ডা হাতের স্পর্শ পেয়ে একটু কু কু করে নড়েচড়ে আবার ঘুমিয়ে যাচ্ছিল। ভাইটাকে কুটুমের ভীষণ পছন্দ। রান্নাঘর থেকে মার ডাক ভেসে এলো, কুটুম তাড়াতাড়ি কর, স্কুলে যেতে হবে না? নাকি রেজাল্ট আনার কোন গরজই নেই। আমি ভেবে ভেবে অস্থির। আর যার রেজাল্ট তার কোন তাড়া নেই।
কুটুম তৈরি হয়ে দেখে মা আগেই তৈরি হয়ে গেছেন। স্কুলে পৌঁছে মার মুখ বিবর্ণ হয়ে যায়। সেদিকে তাকিয়ে মার জন্য মায়া হয় কুটুমের। মা দোয়া দরুদ পড়তে থাকেন। কেন যে মা এত ভাবেন!
: অত ভেব না মা, এখনই রেজাল্ট জানতে পারবে।
মা বকা দিতে গিয়ে চুপ করে যান। এ মুহূর্তে বকাটা সমীচীন মনে করেন না বোধ হয়। কুটুম বলেছিল নোটিশ বোর্ডে রেজাল্ট দেবে। নোটিশ বোর্ড খুঁজে রেজাল্ট পাওয়া গেল না। অল্পতে দুঃশ্চিন্তা করা মায়ের স্বভাব। নোটিশ বোর্ডে রেজাল্ট না দেখে মার কপালে অনেক ভাঁজ পড়ল। ঠিক তখনই ক্লাস থেকে একজন টিচার বেরিয়ে এসে বললেন, তোমরা ক্লাসে এসে বসো, রেজাল্ট ক্লাসে দেয়া হবে।
কুটুম ক্লাসে যায়।
মা ঘামতে থাকেন। কুটুম গিয়ে ক্লাসে বসে। টিচার রেজাল্ট দিতে বসেন। ফার্স্ট হিসেবে কুটুমের নাম ঘোষণা করামাত্র দৌড়ে কুটুম গিয়ে রেজাল্ট হাতে নিয়ে টিচারকে সালাম করে। সবার হাততালির মধ্যে এক দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে।
: মা মা আমি ফার্স্ট হয়েছি।
: সত্যি!
মা কুটুমের হাত থেকে রেজাল্ট সিট নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখেন। বারবার দেখেন। তারপর জড়িয়ে ধরেন কুটুমকে। চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে তোলেন ওর গাল কপাল ঠোঁট। বারবার বলেন, আমি জানতাম কুটুম তুই ফার্স্ট হবি। তুই ছাড়া আর কে ফার্স্ট হবে, তুই যে আমার ভালো মেয়ে। তোকে বলেছিলাম না তুই ফার্স্ট হবি।
কুটুম হাসে। মা বাŸাকে ফোন করেন, শুনেছ কুটুম ফার্স্ট হয়েছে, যে সেকেন্ড হয়েছে সে কুটুমের চেয়ে অনেক নাম্বার কম পেয়েছে। তোমাকে বলেছিলাম না ও ফার্স্ট হবে। তুমিতো বিশ্বাসই করতে চাইলে না। দেখতে হবে তো কার মেয়ে!
এবার সত্যি খুব হাসি পেল কুটুমের। তার মা-টা সত্যিই খুব ভালো। সব মা-ই বুঝি এমন ভালো হয়।
সন্তানের জন্য এমন করে ভাবে। মা বলেন, চল কুটুম তাড়াতাড়ি বাড়ি যাই। মুকুট ঘুম থেকে উঠে যাবে। তাছাড়া আজ আমি ভালো কিছু রান্না করব।
কুটুম মাকে বলে, মা তুমি বাড়ি যাও। গাড়িটা পাঠিয়ে দিও, আমি পরে যাবো। আমি বন্ধুদের সাথে একটু খেলা করে আসি।
অন্যদিন হলে মা কিছুতেই শুনতেন না। কিন্তু আজ তার মন ভালো। সহজেই মেনে নিলেন। বললেন, ঠিক আছে আমি বাড়ি গিয়ে গাড়িটা পাঠিয়ে দিচ্ছি। তুই বেশি দেরি করিস না।
মা চলে যান। বন্ধুরা সবাই ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে এসেছে। কেউ কেউ হো হো করে হাসছে। কারো কারো মন খারাপ। তবে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওরা মন খারাপ ভুলে যায়। ছুটে মাঠে নেমে যায় খেলতে। পুরনো ক্লাস পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাবার আনন্দে ওরা বিভোর। খেলতে খেলতে এক সময় মাঠের পেছনে একটা চমৎকার হলুদ গোলাপ দেখে ছুটে যায় কুটুম। হলুদ গোলাপ ওর ভীষণ প্রিয়। আর এ গোলাপ সচরাচর দেখা যায় না। কুটুম নিচু হয়ে গোলাপটা দেখছে তখনই কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে। কে যেন ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদছে। কুটুম এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে গাছের আড়ালে বসে একটা মেয়ে কাঁদছে। কুটুম এগিয়ে যায়। মেয়েটা ওর মুখ চেনা।
: তুমি কাঁদছ কেন? কী হয়েছে?
মেয়েটা কিছু বলে না। কাঁদতেই থাকে। কুটুম ওর কাঁধে হাত রাখে। মেয়েটা ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলে।
: আমি অঙ্কে ফেল করেছি। তাই প্রমোশন দেয়নি। কী করে বাড়ি যাবো আমি। আমার মাকে কী করে বলব এই রেজাল্ট? ভাইটার এতবড় অসুখ!
: তোমার রেজাল্ট খারাপ হল কী করে? পড়াশুনা ঠিকমত করোনি?
মেয়েটা কথা বলে না, চুপ করে বসে কাঁদতে থাকে।
: কী হলো বললে না, পড়োনি?
: পড়ব কী করে, আমার তো অঙ্কের বই-ই ছিল না!
: সে কী! বই ছিল না এ কথা বাড়িতে বলোনি?
: না বলিনি। মা অনেক কষ্ট করে আমাকে পড়াচ্ছেন। অনেক কষ্টে আমাকে পুরনো বই কিনে দিয়েছেন। শেষ দিকে টাকায় কুলোয়নি বলে দুটো বই কিনতে পারিনি। মাকে সে কথা বলিওনি। এর ওর কাছে বই চেয়ে অঙ্ক করেছি। কিন্তু পরীক্ষার সময় বই ধার পাওয়াও কষ্ট। এখন আমি ফেল করে গেলাম। আরো একটা বছর একই ক্লাসে মা আমাকে কিভাবে পড়াবেন?
: কোন ক্লাসে পড়তে তুমি? নাম কী তোমার?
: টু থেকে থ্রিতে উঠবার কথা ছিল। আমার নাম টুসি।
কুটুম কী যেন ভাবে। তারপর বলে, তোমাকে প্রোমোশন দিলে কাভার করতে পারবে?
: পারব, অবশ্যই পারব। অন্য সব সাবজেক্টে আমার নাম্বার ভালো, শুধু অঙ্কেই খারাপ।
: চলো আমার সাথে।
কুটুম ওকে নিয়ে বন্ধুদের কাছে খেলার মাঠে যায়। বন্ধুদের সব বলে টুসিকে নিয়ে যায় প্রধান শিক্ষকের রুমে। অনুমতি নিয়ে ঘরে ঢুকে বলে, বড়আপা টুসি পরীক্ষায় অঙ্কে খারাপ নাম্বার পেয়েছে। তাই ও প্রোমোশন পায়নি। অন্য সাবজেক্টে ওর নাম্বার অনেক ভালো। আপা ওর মা অনেক কষ্ট করে ওকে পড়াচ্ছেন। টাকার অভাবে ও অঙ্ক বই কিনতে পারেনি। ওর ভাইয়ের শরীর খারাপ। এক ক্লাসে দুই বছর পড়বার সঙ্গতি ওদের নেই। ওকে প্রমোশন না দিলে এখানেই ওর পড়া বন্ধ হয়ে যাবে। ওকে প্রমোশন দিয়ে দিন আপা।
: কিন্তু স্কুলের একটা নিয়ম কানুন আছে।
: নিয়ম তো মানুষের জন্য। ওকে প্রমোশন দিন।
কুটুম কাঁদতে থাকে, কাঁদতে থাকে সব মেয়ে। ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদে টুসি।
আপা উঠে আসেন। কুটুমের কাঁধে হাত রাখেন।
: থামো কুটুম। ওকে আমরা প্রমোশন দিয়ে দিচ্ছি। এর পরে ও ফেল করলে কী হবে? বই কেনার পয়সা না থাকলে এর পরও তো ও ফেল করবে?
: করবে না। ও আমার এক ক্লাস নিচে পড়ে। প্রতিবার আমার বইগুলো ও পাবে। আর যে বই পরিবর্তন হবে সেটার দায়িত্ব আমার।
টুসির প্রমোশন হয়ে যায়। সবার মুখে হাসি। শুধু কুটুমকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে টুসি।

দুই.
কুটুম বাড়ি ফেরে। বাড়িতে আনন্দের জোয়ার। মা ইতোমধ্যে মিষ্টি এনে ফেলেছেন। আব্বার কর্মীরা আসছেন আর মা সমানে তাদের মিষ্টি খাইয়ে চলেছেন। অন্যদিন বেশি লোক আসলে মা বিরক্ত হন, যদিও সেটা প্রকাশ করেন না। আজ যেন মা মনে মনে চাইছেন আরও লোক আসুক, আরও। কুটুমের কৃতিত্বের কথাটা জানুক। আব্বা বসার ঘরে মিটিং করছেন। মা চাইছেন আব্বা ভেতরে এসে মেয়ে প্রথম হবার আনন্দটা তার সঙ্গে শেয়ার করুক। বেশ কয়েকবার খবর পাঠিয়েছেন মা। আব্বা না আসাতে মা ভীষণ বিরক্ত। গজ গজ করছেন।
: কাজ কাম যেন উনি একাই করেন। মেয়েটা পরীক্ষায় ফার্স্ট হলো একবার ভেতরে এসে মেয়েটাকে একটু আদর করবে তা না। এমন মানুষ আর দেখিনি বাপু।
আব্বা এলেন অনেক পরে। মা গম্ভীর মুখে ঘরে চলে গেলেন। আব্বা হাসলেন। মার এ মুখ তার চেনা। আব্বা ঘরে গিয়ে বললেন, মেয়ে প্রথম হয়েছে এটা খুবই আনন্দের কথা। তুমি ভেবো না এ আনন্দ একা তোমার। তবে কি জানো জীবনের পরীক্ষায় ও যখন প্রথম হতে পারবে তখনই বুঝব ও আসলেই প্রথম হয়েছে।
: অতটুকু মেয়েকে নিয়ে তোমার এসব ভারি ভারি কথা আমার ভালো লাগে না বাপু।
কুটুম পড়ার টেবিলে গিয়ে পুরনো বইগুলো গোছাতে শুরু করল। ভালো করে ধুলো ঝেড়ে বইগুলো গোছাচ্ছে সে। গুছিয়ে একটা পলিথিনে ভরছে। মা এক গ্লাস দুধ নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। কুটুমের দিকে তাকিয়ে হাসিমাখা মুখে বললেন, বই নিয়ে কী করছিস। ব্যাগে ভরছিস যে?
কুটুম মাকে টুসির গল্পটা বলল। শুনতে শুনতে মার চোখ ছলছল করতে লাগল। তারপর কুটুমকে বললেন, খুব ভালো করেছিস মা, খুব ভালো। সব সময় এভাবেই অসহায়ের পাশে দাঁড়াবি। বইগুলো তুই টুসিকে দিয়ে দে। আর কোনো নতুন বইয়ের দরকার হলে আমাকে বলিস। আমি কিনে দেব।
কুটুম মাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায়। মা এবার হেসে দুধের গ্লাসটা কুটুমের হাতে ধরিয়ে দেন, নে খেয়ে নে।
: এখন দুধ খাবোনা মা, পরীক্ষার আগে অনেক খেয়েছি। তুমি বলেছিলে পরীক্ষার পরে আর দুধ খেতে হবে না। আইসক্রিম দেবে বলেছিলে।
: দেব তো। দুধটা আগে খেয়ে নে। সামনে আরো কত শক্ত শক্ত পরীক্ষা রয়েছে সেগুলো পার হতে হবে তো।
কুটুম জানে মাকে না বলে লাভ নেই। ও চোখ মুখ কুঁচকে দুধটা খেয়ে নেয়। বলে, মা মুকুট কোথায়?
: ঘুমাচ্ছে।
: কী কাণ্ড ও সারাদিন ঘুমাবে নাকি! যাওয়ার সময়ও দেখলাম ঘুমাচ্ছে। এখনও ঘুমাচ্ছে। ধ্যাৎ, আমার একটুও ভালো লাগে না। আমি এখনই ওকে তুলে দেব।
এতক্ষণ ওদের সব কথা চুপচাপ শুনছিলেন আব্বা। এবার বললেন, আমি শুনতে পেয়েছি। আসলে কুটুম ঠিকই বলেছে। বাড়ির বাচ্চারা যদি হইচই চিৎকার না করে তাহলে এটা কিসের বাড়ি। বাড়ির ছেলেমেয়েরা শোরগোল করবে, হাসবে, কাঁদবে তবেই তো মনে হবে এটা একটা বাড়ি।
মা কাজ করতে করতে ঘুরে দাঁড়ালেন আব্বার মুখোমুখি, ঠিক, ঠিক বলেছ তুমি, একশ ভাগ ঠিক। তবে কি জানো সারাদিন তো বাড়ি থাকো না। গভীর রাতে বাড়ি ফিরে এক ঘুমে রাত পার করো। তুমি কী করে বুঝবে ও কখন হাসে কখন কাঁদে। কখন চিৎকার করে। দায় তো আমার। সারাদিন ওকে সামলাতে আমি অস্থির। রাতের পর রাত জাগতে হয়। কাজেই ওসব বড় বড় লেকচার দেয়া খুবই সহজ।
আব্বা প্রতিবাদ না করে হাসিমুখে বেরিয়ে যান।
কুটুম বলে, তুমি যাই-ই বল মা আমি ভাইকে তুলতে যাচ্ছি।
ঠিক তখনই মুকুটের চিৎকার শোনা যায়। তারপর টলোমলো পায়ে ও এগিয়ে আসে। কুটুম দৌড়ে গিয়ে ওকে কোলে তোলে।
: এই যে আমার ভাই উঠে পড়েছে, সোনাভাই এসে গেছে। ভাই আমি তোর জন্য চকলেট এনেছি।
মুকুট কচি কচি হাতে চকলেট নিয়ে গপ করে মুখে ভরে।
কুটুম বলে, ওভাবে না ভাই, এভাবে আস্তে আস্তে চুষে খা।
কুটুম মুখে একটা চকলেট পুরে চুষে খেয়ে ওকে দেখায়। মুকুট হাসে আর শব্দ তুলে চুষে চুষে খায়। এরপর কুটুম মুকুটকে কোলে তুলে নিয়ে পাশের ঘরে যায়। এটা ওদের খেলার ঘর। সারাঘর জুড়ে পোস্টার আর রঙিন ছবি লাগানো। ঘরে কোন খাট নেই। মেঝেতে ফোমের ওপর অজস্র পুতুল, খেলনা ভিডিও গেম, পাজল ছড়ানো। এক পাশে র‌্যাক বোঝাই ছোটদের মজার মজার বই। কুটুমের মা দোয়েল বাচ্চাদের মানসিক বিকাশের দিকে বরাবরই সতর্ক। সে কারণে সব সময়ই সে চেষ্টা করে বাচ্চাদের আনন্দে রাখতে, খুশিতে রাখতে, ভালো জিনিসের সাহচর্যে আনতে। কুটুম ভাইকে পাশে নিয়ে ফোমের ওপর বসে একটা ট্রেন ঘুরিয়ে দেয়। ট্রেনটা ব্যাটারি চালিত। শব্দ তুলে লাইনের ওপর দিয়ে ঘুরতে থাকে ওটা। মুকুট হাত তালি দিয়ে ওঠে। ট্রেনটা ধরার জন্য বারবার হাত বাড়ায়।
কুটুম বলে, ধরিস না ভাই, ধরিস না। ধরলেই ওটা থেমে যাবে। ওকে ওর মত চলতে দে।
কিছুক্ষণ ট্রেন চালিয়ে কুটুম এবার চালিয়ে দেয় ব্যাটারি চালিত একটা প্লেন। প্লেনটা ঘরময় ঘুরতে থাকে। কুটুমের আনন্দ দেখে কে। সে প্লেনটাকে ধরার জন্য টলোমলো পায়ে ওটার পেছনে ঘুরতে থাকে। কুটুম ওকে নিরস্ত করতে পারে না। দু তিনবার ও পড়ে যায়। উহ আহ করে আবার ওঠে। প্লেন বন্ধ করে কুটুম এবার ওকে হাত ধরে নিয়ে যায় রঙিন ছবির পাশে। একটা শিশু শিশুপার্কে দোলনায় দুলছে। পার্কে অনেক বেলুন, রঙবেরঙের হাতি ঘোড়া, অনেক ফুল, অনেক পাখি। কুটুম ওকে বলে, ভাই আগামী ছুটির দিন আমরা পার্কে যাবো। পার্কে গিয়ে অনেক মজা করব। এই পার্কটাতে অনেক রাইড আছে। তুইতো আবার রাইড বুঝিস না। বড় হলে বুঝতে পারবি। রাইড হচ্ছে মজার জিনিস। সেখানে কেবল কার আছে, তারের ওপর দিয়ে গাড়ি যায়। সুরঙ্গের মধ্য দিয়ে রেলগাড়ি যায়। তারপর অন্ধকার গুহা আছে, মশাল জ্বালিয়ে সেখানে যেতে হয়। অনেক উঁচু থেকে পানির স্রোতে ভেসে ত্ইু নিচে নামতে পারবি। নৌকা চড়া যায়। আরও কত কিছু আছে! তুই আব্বা মাকে বলবি আমরা সেখানে যাব। আমরা চটপটি খাবো, ফুচকা খাবো, আইসক্রিম খাবো, পিজা খাবো, চকলেট খাবো।
মুকুট চোখ বড় বড় করে শোনে। তারপর মত্ত হয়ে পড়ে পার্ক নিয়ে। শিশুদের নিয়ে এই একটা মস্ত সুবিধা। সহজেই সবকিছু ভুলিয়ে দেয়া যায়। মুকুট আধো আধো কণ্ঠে বলে, পালকে যাবো, আইতক্লিম খাবো।
: আরে ভাই তোকে কী বললাম। আজ না, যাবো ছুটির দিন।
: পালকে দাবো, আইতক্লিম খাবো।
: এতো দেখেছি মহা বিপদে পড়লাম। আরে তোকে কখন বললাম আজকে যাবো। তুই এখন এ বায়না করিস না। বায়না শুনলে মা রেগে যাবে। বাড়িতে আজ অনেক মেহমান। মার এমনিতেই কাজের প্রেসার।
কে শোনে কার কথা। আর শোনার কথাও না। বাড়িতে মেহেমান, মায়ের কাজের চাপ এসব কথা বোঝার বয়স কি আর মুকুটের হয়েছে? ও এখন বুঝেছে শুধুই পার্ক। পা ছুড়ে ছুড়ে কাঁদছে আর বলছে, পালকে দাবো, আইতক্লিম খাবো।
: এতো মহাবিপদ হলো। কুটুম ওকে থামাবার চেষ্টা করে।
ওর চিৎকার বাড়ে। চিৎকারে ছুটে আসে মা। ছুটে আসে আনু খালা। আনু খালা মায়ের বাপের বাড়ি থেকে বিয়ের সময় মার সাথে এসেছিল। সেই থেকে এ পরিবারের একজন হিসেবে আছে। মার সাথে তার ব্যবহার অনেকটা গার্জিয়ানের মতো। মাঝে মাঝে মাকে শাসনও করে। মা নিঃশব্দে আনু খালার শাসন শোনে। কুটুমের খুব মজা লাগে। মাকে বকার লোকও তাহলে আছে। এমনকি আব্বাও আনু খালার মুখের ওপর কিছু বলেন না। বরং মাকে আব্বা মাঝে মাঝেই বলেন, আনু বুবুর বয়স হয়েছে। ওনার উপরে বেশি চাপ দিও না যেন।
মা মুখ ঝামটা দিয়ে হেসে বলেন, ইস এ যে দেখছি মার থেকে মাসির দরদ বেশি।
মা একদিন কুটুমকে বলে দিয়েছেন, বুঝলি কুটুম আনু খালা তোর নানার বাড়িতে ছেলেবেলা থেকে বড় হয়েছেন। তোর নানি ওকে কোনদিন কাজের লোক ভাবেননি। আমরাও ভাবি না। কখনও কোন অবস্থাতেই ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করবি না। শ্রদ্ধা ভক্তি করবি, মনে থাকবে?
মুকুটের চিৎকারের সাথে সাথে ছুটে এলেন মা আর আনু খালা।
: কিরে ও চিৎকার করছে কেন?
: আমি পালকে দাবো।
: পার্কে যাবো মানে, এই দুপুরে রোদের মধ্যে কি পার্কে যাওয়ার সময়? বায়নাটা তুলল কে?
: আমি না মা, আমি বলেছিলাম ছুটির দিন যাব।
: ওই হয়ে গেল। ও কি ছুটির দিন খোলা দিন বোঝে? এবার সামলাও ওকে আনু খালা
আনু খালা মুকুটকে কোলে তুলে নেয়। বলে, চল গোসল করে আগে খাও, তারপর পার্কে যাবে।
: আমি গোতল কলব না। পালকে দাবো।
: আগে গোতল কলবে তালপল পালকে যাবে। বুদলে সোনা। কুটুম তুমি তাড়াতাড়ি গোসল করে নাও।
: বারে আমি বুঝি একা গোসল করব?
: না তা কেন, তোমার মা আছে না।

তিন.
আগামীকাল থেকে কুটুমের নতুন ক্লাস শুরু। তার ক্লাস শুরু মানে টুসিরও ক্লাস শুরু। ক্লাস শুরুর আগে টুসিকে বইগুলো দেয়া দরকার। কুটুম গুছিয়ে রাখা বইগুলো আবার নেড়ে চেড়ে দেখে। ওর হঠাৎ মনে হয় বইগুলোতে নতুন মলাট দিয়ে দিতে পারলে ভালো হয়। বছর ধরে পড়াতে বইয়ের মলাটগুলো বিবর্ণ হয়ে গেছে। নতুন বইয়ের সাথে মলাট লাগাবার জন্য সুন্দর সুন্দর রঙিন কাগজ কিনে এনেছেন মা। আনু খালা সেগুলো দিয়ে তার নতুন বইয়ের মলাট লাগিয়ে দিয়েছেন। বইগুলো ঝকঝক করছে। আর নতুন বইয়ের যে কী সুন্দর মিষ্টি গন্ধ! ইস অমন একসেট নতুন বই যদি টুসিকে দেয়া যেত। ও কী খুশি যে হতো! বেচারা কখনই নতুন বই পড়েনি! কুটুম মনে মনে ঠিক করে টুসি যদি পরের পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে তবে আব্বাকে বলে ওর জন্য একসেট নতুন বই কিনে দেবে। কুটুম ব্যাগ থেকে বইগুলো বের করে আঠা আর কাঁচি নিয়ে বসে। বইগুলো ভালো করে মুছে সুন্দর করে প্রতিটি বইয়ের মলাট লাগায়। এখন বইগুলো দেখতে খুব সুন্দর লাগছে। ওর হঠাৎ মনে হয় টুসিকে একটা ব্যাগ দিতে পারলে ভালো হয়। ইচ্ছে হয় ওর জন্য কেনা নতুন ব্যাগটা দিয়ে দিতে। কিন্তু তাতে মা ভীষণ রাগ করবেন। নিজে অনেক ঘুরে পছন্দ করে ব্যাগটা তার জন্য কিনেছেন। টুসি ওর পুরনো ব্যাগটা বের করে সেটার মধ্যে বইগুলো গোছায়। তার জন্য কেনা খাতা থেকে দুটো খাতা দুটো পেন্সিল আর ইরেজার ব্যাগে গুছিয়ে মার খোঁজে রান্নাঘরে যায়। মা তখন বিশাল এক কেটলি চা বানাতে ব্যস্ত। ভীষণ মেজাজ খারাপ মার। গতকাল অনেক রাতে ঘুমিয়েছেন। গভীর রাতে অনেক লোক সাথে করে আব্বা এসেছিলেন। কোথায় যেন নির্বাচনী প্রচারণায় গেছিলেন। বলা নেই, কওয়া নেই মাঝরাতে অতগুলো মানুষ নিয়ে এলে যা হয়।
আব্বা বললেন, দোয়েল ওনাদের খাবার ব্যবস্থা কর।
আব্বা তো বলেই খালাস। তখন সবার খাওয়া দাওয়া হয়ে গিয়েছিল। আনু খালার শরীরটা খারাপ ছিল। আজ কাল মাঝে মাঝেই তার শরীর খারাপ হচ্ছে। উনি শুয়ে পড়েছিলেন। কাজের বুয়াটাও ঘুমিয়ে পড়েছিল। বেচারা সেই সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত খাটাখাটুনি করে। তাকে ডেকে তুলতে মন চায়নি মার। বেচারা অনেক খেটে খুটে ঘুমিয়েছে। একটু ঘুমাক। সুতরাং মাকেই সে গভীর রাতে অতগুলো লোকের খাবারের জোগাড় করতে হয়েছিল। শুতে শুতে মাঝরাত পেরিয়ে গেছিল। আবার কাক সকালে উঠে শুরু হয়ে গেছে রান্নাঘরের ডিউটি। সকাল থেকে লোক আসছে তো আসছেই। আর কেটলির পর কেটলি চা চলছে। মার ফরসা মুখটায় বিরক্তি। এই সময় কুটুম ঘরে ঢোকে।
: মা আজ রুটিন দেবে। আমি রুটিন আনতে স্কুলে যাচ্ছি।
: তুই স্কুলে যাবি বলিসনিতো। নাস্তাই তো তৈরি হয়নি এখনও।
: দরকার নেই মা, আমি বেশিক্ষণ স্কুলে থাকব না। এসে খাবো।
: তা বললে তো হবে না। একটু দাঁড়া দুটো পাউরুটি সেঁকে জ্যাম দিয়ে দিচ্ছি।
কুটুম জানে মা যখন একবার বলেছেন খেতেই হবে। মা দ্রুত হাতে রুটি সেঁকে জ্যাম মাখিয়ে দেয়। কুটুম মায়ের দ্রুত সঞ্চারমান হাতগুলো দেখে আর ওর মন ভরে যায়। তার মার হাত দুটো কত সুন্দর! কী নিপুণভাবে কাজ করতে পারে তার মা।
কুটুম খাওয়া শেষ করে।
মা বলেন, গাড়ি নিয়ে যাস কুটুম।
: না মা আজ গাড়ি নিয়ে যাব না। এতটুকু তো রাস্তা, হেঁটেই যাবো।
কুটুমকে দেখে বন্ধুরা হৈ হৈ করে ওঠে। এ ওকে জড়িয়ে ধরে। ও রুটিন টুকে নেয়। টুসিকে খুঁজতে থাকে। বন্ধুরা ওকে খেলার জন্য ডাকছে। কিন্তু না আগে টুসিকে পেতে হবে, তার হাতে বইগুলো দিতে হবে। তারপর খেলা। টুসি এত দেরি করছে কেন? ও কি আসবে না? নাকি ও জানে না আজ রুটিন দেবে। কিন্তু জানার তো কথা। রেজাল্ট আউটের দিনই তো বলে দেয়া হয়েছিল আজ নতুন ক্লাসের রুটিন দেবে। নোটিশ বোর্ডেও টানানো ছিল। ও আর টুসি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সেটা দেখেছিল। এই ভাবনার মধ্যেই টুসি এসে যায়। কুটুম গিয়ে ওর হাত ধরে।
: কেমন আছ টুসি? এই দেখো আমি তোমার জন্য বই এনেছি
: ভালো আছি। তুমি কেমন আছ? বাহ নতুন মলাটও লাগিয়ে দিয়েছ। সাথে নতুন খাতা পেন্সিল ইরেজার। সত্যি তুমি খুব ভালো। আচ্ছা ব্যাগটা।
: ওটাও তোমার। ইচ্ছে ছিল তোমাকে একটা নতুন ব্যাগ দেবার। কিন্তু আমার কাছে তো টাকা থাকে না। প্রতিদিন স্কুলে আসার সময় মা দশ টাকা করে দেন। মা ভয় পান এর বেশি টাকা দিলে আমি ফুচকা চটপটি এসব কিনে খাবো। আর টিফিন তো বাড়ি থেকেই দিয়ে দেয়। তাই টাকারও দরকার হয় না। আমার হাতে টাকা নেই। থাকলে তোমার জন্য একটা নতুন ব্যাগ আনতাম। ভাবছি টাকা জমিয়ে তোমাকে একটা নতুন ব্যাগ কিনে দেবো। ততদিন এটাই ব্যবহার করো কেমন! মন খারাপ করবে নাতো?
: আরে না, ব্যাগটা খুবই সুন্দর। আমার মা বলেন বড়লোকদের কোন জিনিসই পুরনো হয় না। ওদের অনেক জিনিস থাকে। এক সাথে অনেক কিছু ব্যবহার করে তাই কোনটাই পুরনো হয় না। কে দেখে বলবে ব্যাগটা পুরনো। আচ্ছা ব্যাগটা খুব দামি তাই না?
: তাতো জানি না। আমার মা কিনেছেন। দামি হতে পারে।
টুসি বারবার ব্যাগটা নেড়ে চেড়ে দেখে। তা দেখে কুটুমের মনটা কেমন করে। একটা পুরনো ব্যাগ পেয়ে ওর এতটা উচ্ছ্বাস, এতটা আনন্দ! মানুষে মানুষে কেন এই বিভেদ এই বৈষম্য!
ওরা রুটিন টুকে নেয়। তারপর খেলার মাঠে যায়। কুটুম ওর বন্ধুদের সাথে টুসির আলাপ করিয়ে দেয়।
: এর নাম টুসি। ক্লাস থ্রিতে পড়ে। আমার নতুন বন্ধু।
: ওকে চিনি তো, ওই যে ওর প্রমোশনের জন্য বড় আপার কাছে গেছিলাম।
: ঠিক ঠিক।
এরপর ওরা সবাই মেতে ওঠে খেলায়। খেলতে খেলতে একসময় ঘেমে যায় সবাই। নয়টায় এসেছিল, কখন যে বারোটা বেজে গেছে খেয়াল করেনি কেউ। মাথার ওপর গনগনে সূর্য। প্রচণ্ড তাপ চারদিকে। গা যেন পুড়ে যাচ্ছে। ওরা খেলা থামায়। কুটুম দৌড়ে গিয়ে পানির বোতল খোলে। টুসি দৌড়ে এসে ওর হাত চেপে ধরে।
: খেও না খেও না, এত গরমের পর পানি খেতে নেই। আমার মা বলে। একটু পরে খেও।
কুটুম হাঁফাতে থাকে। টুসি ওর ঘাম মুছিয়ে দেয়। এবার ওরা বাড়ি যাবে। টুসি বলে, আমাদের বাড়ি চলো। যাবে? আমার মা তোমাকে দেখতে চেয়েছে। মা বলল, কে জানে বড়লোকের মেয়ে, আসতে বললে আসবে কি না। হয়ত আসলে ওর বাবা মা রাগ করবে। তবে ওকে বলিস আমি আসতে বলেছি। অমন দয়াবতী মেয়ে। মেয়েটাকে দেখতে আমার ভীষণ ইচ্ছে করছে। যাবে? আমাদের বাড়ি অবশ্য খুবই ছোট। আসলে ওটা একটা বস্তির ঘর। বসার চেয়ার টেবিলও নেই। তোমাকে বলতে সাহস পাইনে। তবে তুমি গেলে মা খুব খুশি হত। আমাদের বাড়িতে সাধারণত ভাল খাবার হয় না। মা নানান কাজে ব্যস্ত থাকেন। বাড়িতেও থাকার সময় হয় না তার। আমার একটা ছোট বোন আছে। তার কাছেই ভাইটা থাকে। ভাইকে দেখার ফাঁকে ফঁাঁকে বোনটাই একবেলা দুটো ফুটিয়ে নেয়। তুমি যাবে এই আশায় মা আজ পায়েস রেঁধেছে। যাবে?
টুসির কণ্ঠে আকুতি। সে কণ্ঠ শুনে কুটুমের চোখে পানি আসে। এক বন্ধু কেন আর এক বন্ধুর কাছে আকুতি করবে? আজ যদি দুজনের অবস্থান এক হত তাহলে এ বিভেদ থাকত না। কুটুমের যদি সাধ্য থাকত সবার অবস্থান সে এক করে দিত। যেন এক বন্ধু অন্য বন্ধুকে নিজের বাড়িতে ডাকতে সঙ্কোচ বোধ না করে। কুটুম একটু ভাবে। বেলা অনেক হয়ে গেছে। মাকে বলে এসেছে তাড়াতাড়ি ফিরবে। ওদিকে টুসির মা পায়েস রান্না করে তার জন্য অপেক্ষা করছে। যাক মা হয়ত একটু রাগ করবে। কিন্তু বুঝিয়ে বললে অবশ্যই বুঝবে।
: যাবো, অবশ্যই যাবো। আমার খুব পায়েস খেতে ইচ্ছে করছে।
টুসির চোখের তারাগুলো আনন্দে হেসে ওঠে। ও দৌড়ে এসে কুটুমের হাত দুটো ধরে। কাঁধে ব্যাগটা ঝুলিয়ে উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে, চলো চলো আমার হাত ধরো।
দুই বন্ধু হাত ধরে রওনা হয়। কুটুম জানে না কেন ওর এখন সত্যিই পায়েস খেতে খুব ইচ্ছে করছে। মনে হচ্ছে কত দিন যেন খায়নি। অথচ বরাবরই পায়েস রেঁধে মা একটু খা, একটু খা বলে বাটি চামচ নিয়ে ওর পিছু পিছু হাঁটে আর ও দৌড়ে পালিয়ে যায়। কী দিয়ে পায়েস রেঁধেছে টুসির মা? গুড় না চিনি? কুটুমের মনে হল গুড়ের পায়েস চিনির পায়েস থেকে অনেক ভালো খেতে। দেখতেও কেমন লালচে সুন্দর। ওর একবার ইচ্ছে হয় টুসিকে জিজ্ঞাসা করে ওর মা পায়েসটা কী দিয়ে রেঁধেছে। পর মুহূর্তে নিজেকে সামলায়। ওকে জিজ্ঞাসা করে কাজ নেই। ও নিশ্চয়ই তাকে ছুঁচো ভাববে।
দুই বন্ধু রাস্তার একপাশ দিয়ে হাঁটছে, অনর্গল কথা বলে চলেছে টুসি। যা বলছে তার অনেকটাই কুটুম শুনতে পাচ্ছে না গাড়ি চলাচলের শব্দে। আর কুটুম শুনল কী শুনল সেটা নিয়ে খুব একটা মাথাব্যথাও টুসির নেই। কুটুম ওদের বাড়িতে যাচ্ছে এই আনন্দেই সে বিভোর। এরই মধ্য দুপুরে রাস্তা দিয়ে ছুটছে বাস ট্রাক কার টেম্পো সিএনজি। এই রাস্তাতে রিক্সাও অ্যালাউড। সুতরাং গাড়ি ঘোড়া রিকসা আর মানুষের জটলায় সৃষ্টি হয়েছে বিশাল জানজট। গাড়ি থেকে কালো ধোঁয়া বেরুচ্ছে অনর্গল। ফুটপাথ ধরে হাঁটার উপায় নেই। একদিকে রাস্তার অনেকটাই দখল করে নিয়েছে ফকিররা বাকি অর্ধেক দখল করেছে হকাররা। খুব কষ্ট করে এগুচ্ছে ওরা। এর মধ্যে আওয়াজ উঠল গেল গেল। কুটুম আর টুসি একযোগে তাকালো। দেখল কলার খোসাতে পিছলে একটা লোক ফুটপাথে পড়ে গেছে। ভাগ্যিস লোকটা ফুটপাথে পড়েছে। রাস্তায় পড়লে এতক্ষণে বাসের নিচে পড়ত নির্ঘাৎ। লোকটা কাতরাচ্ছে। কুটুম ওকে ধরার জন্য এগিয়ে গেল। তার আগেই ওর হাত ধরে টেনে উঠালো দু’জন লোক। একজন বলল, দেখে চলতে পারেন না? পা ভেঙেছে নাকি?
লোকটা কিছু বলল না। কৃতজ্ঞ চোখে তাকালো। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে লাগল। কুটুম আর টুসি এগোচ্ছে। হঠাৎ কুটুম খেয়াল করল লোকটাকে দু’জনে টেনে তুলেছে ঠিকই কিন্তু কলার খোসাটা ওই ফুটপাথেই পড়ে আছে। কেউ তুলে ডাস্টবিনে ফেলেনি। অর্থাৎ আবারো ওখানে লোকজন পড়ে হাত-পা ভাঙবে। কুটুম টুসিকে একটু দাঁড়াতে বলে পিছিয়ে যায়। কলার খোসাটা তুলে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়। তারপর বলে, বুঝলে টুসি আমার মা বলে যেখানে সেখানে কলার খোসা, ময়লা আবর্জনা এসব ফেলা ঠিক না। এতে একদিকে পরিবেশ দূষণ হয়, অন্য দিকে দুর্ঘটনারও সম্ভাবনা থাকে। বাড়িতে আমরা কখনই যেখানে সেখানে ময়লা ফেলি না। প্রতিটা ঘরেই ময়লা ফেলার ঝুড়ি আছে। সেসব ঝুড়িতে ময়লা ফেলি। পরে ময়লাওয়ালা এসে ময়লা নিয়ে যায়।
টুসি বিমর্ষ কণ্ঠে বলে, আমরা গরিব, ময়লা ফেলার ঝুড়ি পাবো কোথায়? তাছাড়া থাকি বস্তিতে। চারদিকে এমনিতেই প্রচুর ময়লা।
: শোন ময়লা ফেলার জন্য ঝুড়ি দরকার হয় না। তুমি ইচ্ছে করলে পলিথিনে ময়লা জড়ো করতে পারো তারপর দূরে নিয়ে ময়লা ফেলার ডাস্টবিনে ফেলতে পারো। ময়লা জড় করতে পারো ঠোঙাতে। এই যে ধর আমরা যেখানে সেখানে সর্দি কাশি থুথু ফেলি এটাও তো খুব খারাপ। কার শরীরে কী জীবাণু আছে কে জানে। এসব জীবাণু বাতাসে উড়ে উড়ে অন্য মানুষের শরীরে প্রবেশ করে যক্ষ্মা থেকে শুরু করে অনেক বড় বড় অসুখ হয় জানো!
: তুমি তো অনেক কিছু জানে॥
: তুমিও জানো কিন্তু খেয়াল কর না। আমাদের বাড়িতে আমার বাবা মা দু’জনেই এ বিষয়ে সচেতন, তাই এসব আমাদের খেয়াল করতে হয়।
: আমার তো আব্বাই নেই। কোন্ ছোটবেলায় রোড এ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। আমার মা সেলাই মেশিন চালিয়ে আর বাড়ি বাড়ি সাবান বিক্রি করে কোনোভাবে আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। কত অল্প বয়সে মারা গেল আমার আব্বা। আমার আব্বা যদি বেঁচে থাকত এত কষ্ট হত না আমাদের। জানো আমার মার গায়ের রং কত সুন্দর ছিল। সারাক্ষণ হাসত আমার মা। এখন রোদে পুড়ে পুড়ে রংটা নষ্ট হয়ে গেছে। খাটতে খাটতে মার মুখ থেকে হাসিটাও মিলিয়ে গেছে। কী কষ্ট যে করে আমার মা! সেই সকালে বের হয় আর গভীর রাতে ফেরে। যদি জিজ্ঞাসা করি, কষ্ট হচ্ছে মা? মা কখনই স্বীকার করে না। শুধু যদি আমার আব্বা বেঁচে থাকত।
: তোমার আব্বা রোড এ্যাক্সিডেন্টে মারা গেল কিভাবে?
: রাস্তা পারা হতে গিয়ে।
: এর কারণ কী বলত, এর কারণ হচ্ছে হয় চালকেরা বেপরোয়া গাড়ি চালিয়েছে অথবা তোমার আব্বা জেব্রা ক্রসিং বা রোড ক্রসিং এর নিয়ম মানেনি। বলত আসলে কী হয়েছিল?
: আমার আব্বা ঠিকমতোই রাস্তা পার হচ্ছিল। একটা গাড়ি হুড়মুড় করে এসে আব্বার গায়ের ওপর পড়েছিল। শুনেছিলাম গাড়িটার ব্রেক নাকি খারাপ ছিল।
: অর্থাৎ ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় নামিয়েছিল। আমার আব্বা বলেন আমাদের দেশে প্রতিদিন অসংখ্য গাড়িকে লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে, ড্রাইভাররা লাইসেন্স পাচ্ছে অথচ গাড়িগুলো চলাচলের উপযুক্ত কিনা, ড্রাইভাররা গাড়ি চালাতে জানে কিনা এসব দেখা হচ্ছে না। এজন্যই অকালে অসংখ্য মানুষ মারা যাচ্ছে। বুঝলে টুসি, আমাদের এসব নিয়ে ভাবতে হবে।
: কিন্তু কিভাবে? আমরাতো খুবই ছোট।
: আমরা ছোট করে ভাবব। আমাদের পক্ষে যেটুকু করা সম্ভব সেটুকুই আমরা করব।
ওরা অনেক দূরে চলে এসেছে। টুসি কুটুমের হাত ধরে বাঁ দিকের একটা গলিতে ঢোকে। সামনেই একটা বস্তি। বস্তি জুড়ে ছোট ছোট অসংখ্য ঘর। টুসি বলে, এদিক দিয়ে এসো। এটাই আমাদের বস্তি।

চার.
জীবনে কখনই বস্তিতে ঢোকেনি কুটুম। আসলে বস্তির কথা সে দুই একবার শুনেছে কিন্তু দেখেওনি কখনও। এর নাম বস্তি! এত সারি সারি ছোট ছোট ঘর, আর এত নোংরা! অধিকাংশ বস্তির চালে পলিথিন ঝুলছে। সামনের এক ফালি জায়গা জুড়ে অসংখ্য চুলো। তার চারপাশে ছড়ানো অজস্র নোংরা আবর্জনা। কাগজ পলিথিন গাছের পাতা লাকড়ি গোবরের ঘুটে দলা হয়ে পড়ে আছে। সিকনি ফেলছে ছেলেমেয়েরা যেখানে সেখানে। কাশছে খুক খুক করে। চুলো জ্বালাতে গিয়ে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন করে ফেলছে চারদিক। এর মধ্য দিয়েই কুটুমকে নিয়ে যায় টুসি। ওর হাত ধরে বলে, এদিক দিয়ে এসো। জানি তোমার খুব খারাপ লাগছে। কিন্তু কী করব বল এখানেই যে আমরা থাকি।
কুটুম চুপ করে থাকে। সে ভাবতে চেষ্টা করে তাদের আর এদের মধ্যে কত তফাৎ। তাদের বাড়ির প্রতিটি জিনিস ঝকঝক করে। সারাটা বাড়িতে এক চিলতে ধুলো নেই। তিন চারটে কাজের লোক আছে বাড়িতে। তাদের দেখাশুনা করে আনু খালা। তার ওপর আছে মায়ের সতর্ক দৃষ্টি। সকাল বিকেলে ঘরদোর মোছা হয়। ঝক ঝক করে ঘরবাড়ি। ফার্নিচার মোছা হয় প্রতিদিন। জানালার পর্দা বিছানার চাদর পাল্টানো হয় দুদিন বাদে বাদে। এক দিনের জামা মা অন্যদিন পরতে দেয় না। খাবারের প্লেট গ্লাস চক চক করে। আর এখানে! ওই জীবন ওরা কখনও দেখেনি, ভাবতেও পারে না। কিন্তু কেন? এরাও তো মানুষ। এদেরও তো জীবনে চাওয়া পাওয়া আছে। তাদের জন্য যদি পাঁচ হাজার স্কয়ার ফিটের বাড়ি জোটে এদের কেন পাঁচশ জুটবে না? এদের কেন থাকতে হবে বস্তিতে? রোদে জলে শীতে বর্ষায়!
কুটুমকে লক্ষ্য করে টুসি। ভয়ে ভয়ে বলে, তোমাকে নিয়ে এলাম বলে কি রাগ করেছ? তোমার মা বকবে বুঝি! ফিরে যাবে?
: আরে না সেসব কিছু না, চল চল।
টুসি ওকে নিয়ে একটা ঘরের দরজায় দাঁড়ায়। দরজা না বলে ওটাকে একটা ফুটো বলাই ভাল। সেখানে দাঁড়িয়ে টুসি বলে, মা কুটুমকে নিয়ে এসেছি।
: খুব ভালো করেছিস।
বলতে বলতে মাথা নিচু করে দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসেন এক মহিলা। মহিলার পরনের শাড়িটা বিবর্ণ তবে পরিষ্কার। কুটুম লক্ষ্য করেছে টুসির জামা কাপড়ও পুরনো হলেও পরিষ্কার। মহিলার গায়ের রং রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে গেছে তারপরও অপূর্ব সুন্দরী তিনি। এমন সুন্দর সচরাচর দেখা যায় না। ভাসা ভাসা দুটো চোখ। অনেক লম্বা চুল, খাড়া নাক, লাল টুকটুকে ঠোঁট। এ বস্তিতে এ মহিলা যেন নিতান্তই বেমানান। মহিলা এসে কুটুমের হাত ধরে। বলে, কেমন আছো মা? তোমার কথা শুনে তো আমি অবাক। আমার টুসির জন্য এত কিছু করেছ তুমি! অথচ চেনা না, জানা না। সেই থেকে তোমাকে দেখার ইচ্ছে। এতটুকু একটা মেয়ে তুমি। অথচ অন্যের জন্য কত মমতা। তোমার আব্বা মা কেমন আছে? তাদেরকে আমার সালাম জানাবে। এসো, ভেতরে এসো। অবশ্য বস্তির আর ভেতর বাহির কী। ঘরে বসে আকাশ দেখতে পাবে। মাথা নিচু করে এসো মা। মাথায় লাগবে। বস্তির মালিক ধরেই নিয়েছে এ বস্তির সব মানুষই বেটে। আসলে ব্যাপার হচ্ছে দরজা বড় করতে গেলে ইট খুঁটি কাঠ সবই বেশি লাগবে। সেটা বাঁচাবার জন্যই এই ব্যবস্থা।
কুটুম ঘরে ঢোকে। ছোট্ট একটা ঘর। তবে ঘরের ভেতরটা পরিষ্কার ঝকঝকে তকতকে। একপাশে সস্তা একটা খাট। খাটের উপর বসে আছে একটা মেয়ে একটা ছেলে। মেয়েটা টুসির চেয়ে সামান্য ছোট। ছেলেটার বয়স বছর পাঁচেক। দু’জনই ড্যাব ড্যাব করে কুটুমকে দেখছে।
টুসির মা বলে, আমার তিন ছেলেমেয়ে। মেজমেয়ের নাম তুলি। ছেলের নাম মুন্না। ছেলেটাকে পেটে রেখে ওর আব্বা মারা গেল। যাক সে কথা পরে শুনো। এখন বস, তোমার জন্য পায়েস রেঁধেছি। সেটা আগে খাও।
: এখনই খাবো কি, আগে একটু গল্প করি তারপর খাবো।
: না আগে খেয়ে নাও। তুমি কতক্ষণ বসতে পারবে কে জানে। তোমাকে খাওয়াতে পারলে আমার শান্তি।
ঘরে দুখানা সস্তা চেয়ার আছে। টুসির মা তার একটাতে কুটুমকে বসিয়ে দেয়। একটা প্লেটে পায়েস ঢেলে টুসির হাতে দিতে দিতে বলে, গুড়ের পায়েস, জানি না তোমার কেমন লাগবে। এ পায়েস নিশ্চয়ই খাওয়ার অভ্যেস নেই তোমার।
গুড়ের পায়েস দেখে মন ভাল হয়ে যায় কুটুমের। সে তো মনে মনে চাইছিল গুড়ের পায়েসই যেন রান্না করা হয়।
: খালা আমি মনে মনে ভাবছিলাম আপনি যেন গুড়ের পায়েস রান্না করেন। আসলে আমার গুড়ের পায়েস খেতে ইচ্ছে করছিল।
: তাই নাকি! বাহ তুমিতো একটা দারুণ সরল মেয়ে। নাও মা মুখে দাও।
পায়েসটা মুখে দিয়ে কুটুমের অমৃতের মত মনে হয়। মা পায়েসের মধ্যে কত কিছু দেয়। কিসমিস বাদাম, গোলাপ পানি। এ পায়েসে এগুলোর কিছুই নেই। তারপরও যেন এ পায়েস অমৃত। খুব দ্রুত পায়েসটুকু শেষ করে ফেলে কুটুম। ও ভাবতে থাকে, পায়েস তো শেষ হয়ে গেল। খালা আর একটু নিতে বলবেন তো। যদি নিতে না বলে সে লজ্জায় চাইতে পারবে না। এই ভাবনার মাঝেই খালা পায়েসের বাটি সামনে নিয়ে এসে আরো খানিকটা পায়েস পাতে ঢেলে দিয়ে বলে, আর একটু খাও মা, কেমন হয়েছে?
: খুব ভাল খালা।
টুসির মা লম্বা একটা শ^াস ফেলে। খাওয়া হলে নিজ হাতে ওর হাত ধুইয়ে আঁচল দিয়ে মুছিয়ে দেয়। তারপর খাটের এক পাশে বসে বলে, তুমি আমাদের যা উপকার করেছ মা। তুমি বাচ্চা একটা মেয়ে, তোমাকে আর কী বলব। কতটুকুই বা বুঝবে। আর এসব কথা তোমাকে বলারও না। তারপরও বলছি। ও যদি প্রমোশন না পেত ওকে আর পড়াতে পারতাম না। ওর স্কুলের খরচাটা অনেক কষ্টে জোগাড় করতে হয়। এক ক্লাসে দুই বছর ওকে পড়ানো আমার পক্ষে সম্ভব হত না। তুলির স্কুলে যাবার বয়স হয়েছে বেশ আগে। ওকে স্কুলে দিতে পারছি না দুটো কারণে। এক ও স্কুলে গেলে ছেলেটাকে দেখবে কে। দুই, দু’জনের পড়ার খরচ চালাতে পারব তো! ওরা দুই বোন সংসারের জন্য অনেক কাজ করে। আমি একটা টেইলারিংয়ের দোকানে সেলাই করি। আর ওরা ঘরে বসে ঠোঙা তৈরি করে। এসব দিয়ে কষ্টে সৃষ্টে চলে যায়। ওর আব্বা অকালে চলে যাওয়াতেই এই অবস্থা।
: শুনলাম খালু নাকি রোড এ্যাক্সিডেন্টে মা গেছে?
: ঠিকই শুনেছ। এ দেশে কোন মানুষেরই জীবনের নিরাপত্তা নেই। আইন মানার কোন অভ্যাস নেই। গাড়ি চালানোতে কোন নিয়ম কানুনের বালাই নেই। আর তার জন্য মূল্য দিতে হয় অসংখ্য মানুষকে। আজ একজন মানুষের অভাবে আমার সংসারটা ডুবতে বসেছে। যাকগে এসব কথা।
: না খালা বলুন, আমি শুনব।
: ওর আব্বার এ্যাকসিডেন্টের খবর শুনে ছুটতে ছুটতে গিয়েছিলাম আমি। গিয়ে দেখি স্পট ডেড। মাথা ঘুরে গিয়েছিল। পড়ে গিয়েছিলাম সরাসরি রাস্তায়। পেটে লেগেছিল। মুন্না পেটে ছিল তখন। ওর জন্মের সময় খুব সমস্যা হয়েছিল আমার। জন্মের পর দেখলাম ও ঠিক স্বাভাবিকভাবে জন্মায়নি। গ্রোথ ঠিকমত হচ্ছে না। কথাও ঠিকমতো বলতে পারে না। ডাক্তার দেখিয়েছিলাম। ডাক্তার বলেছিল প্রচণ্ড মানসিক শক আর পেটে আকস্মিক আঘাত দুই মিলে ওর এই অবস্থা। তবে ত্র“টিটা খুব সাংঘাতিক নয়। ভাল ডাক্তার দেখালে ও ভাল হয়ে যাবে। কিন্তু তার জন্য প্রচুর টাকার দরকার। সে টাকা পাবো কোথায় বল? তাই ছেলেটা অপূর্ণাঙ্গই রয়ে গেল। এই কষ্টে রাতে ঘুমাতে পারি না। মনে মনে ভাবি আমারও তো মানুষের শরীর। আজ যদি আমি মারা যাই ওর কী হবে। কোন একজন ভাল মানুষ, সহৃদয় লোক যদি ওকে দত্তক নিত তাতেও আমার আপত্তি ছিল না। কিন্তু তেমন মানুষও যে আমি চিনি না।
কুটুম বিস্ময়ে আঁতকে উঠল। বেশ জোরে বলল, আপনি আপনার ছেলেকে দত্তক দিয়ে দেবেন?
: হ্যাঁ মা দেব। ওর ভালর জন্য আমি দিতেই পারি। আমার আবেগ নিয়ে বসে থাকলে তো হবে না। কোন একজন ভাল মানুষ যদি ওকে নিয়ে নিজ সন্তানের মত লালন পালন করে, চিকিৎসা করিয়ে ভাল করে আমার অসুবিধা কী। ছেলেকে ছাড়া থাকতে আমার কষ্ট হবে ঠিকই। কিন্তু আমার সেই কষ্টের জন্য ওর তো কোন ক্ষতি করতে পারিনে। তবে এসব ভেবে লাভ কী। তেমন মানুষ আমি পাবো কোথায়? মনে মনে খুঁজি, পাই না।
খালার কথা শুনে কুটুমের মনে হয় খালা নিশ্চয়ই লেখাপড়া জানে। নইলে অমন সুন্দর করে কথা বলে কী করে? মাঝে মাঝে তো ইংরেজিও বলে। কুটুম জিজ্ঞাসা করে, খালা আপনি বুঝি লেখাপড়া করেছেন?
খালা কিছু বলার আগেই তড়বড় করে টুসি বলে, জানো আমার মা খুব ভালো ছাত্রী ছিল। বৃত্তি পেয়েছিল। ভাল রেজাল্ট করে এসএসসি পাস করেছিল। কিন্তু,
: কিন্তু কী?
এরপর কথা বলতে থাকেন খালা, কিন্তু আর লেখাপড়া হল না। বিয়ে হয়ে গেল। তারপর থেকেই শুরু হল কষ্ট।
খালাকে কে যেন বাইরে থেকে ডাকল, আমেনা আমেনা। বাইরে গেলেন খালা। সেই সুযোগে টুসি বলল, একদিন পাশের বাড়ির চাচিকে মা বলছিল, নিজে ইচ্ছে করে আব্বাকে বিয়ে করেছিল বলে মাকে কেউ দেখতে পারত না।
কুটুম মুন্নার কাছে যায়। মুন্না হাসিমুখে ওর দিকে তাকায়। অস্পষ্ট স্বরে কী যেন বলে। কুটুম বুঝতে পারে না। মুন্নাকে আদর করে কুটুম। ওর ফোলা ফোলা গাল নেড়ে দেয়। চুল এলোমেলো করে দেয়। মুন্না আবারও কিছু বলে। এবার খেয়াল করে মুন্না কী বলছে বুঝতে পারে কুটুম। ও অস্পষ্ট কণ্ঠে আধো আধো উচ্চারণে বলছে, তুমি খুব ভাল, তুমি খুব ভাল।
কুটুম দরজা দিয়ে বাইরে তাকায়। ওই এক চিলতে জায়গাটার মধ্যেই কয়েকটা বাচ্চা খেলছে। এ খেলা কুটুম কখনও খেলেনি। জানেও না। মাটিতে ঘর কেটে ভাঙা মাটির জিনিসের টুকরো দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে খেলছে ওরা।
কুটুম বলে, খেলাটা খুব মজার তাই না?
: খেলেছ কখনও এ খেলা? খেলবে?
: কিন্তু কী করে খেলতে হয় আমি জানি না যে!
: আমি তোমাকে শিখিয়ে দেব।
ওরা খেলতে শুরু করে। খেলতে খেলতে কখন যেন বেলা পড়ে যায়। আমেনা খালা বার বার ডাকে, এবার তোরা খেলা ছাড়। রোদে তেতে যাচ্ছিস একেবারে, এবার যেতে হবে।
খেলা ছেড়ে কুটুম ঘরে এসে খালার সামনে দাঁড়ায়, যাই খালা।
: নারে মা, দুপুর গড়িয়ে গেছে। আলু ভর্তা আর ভাত করেছি, চারটে খেয়ে যাও।
কোন কথা না বলে খেতে বসে কুটুম। শুকনো মরিচ দিয়ে বানানো ভর্তা দিয়ে লাল চালের ভাত কী যে ভাল লাগে! কুটুম খায়। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে খালা।

পাঁচ.
বস্তি থেকে বেরিয়ে আসে কুটুম আর টুসি। বেরোবার আগে কুটুম খালার কাছ থেকে বড় একটা কাগজের ঠোঙা চেয়ে নেয়। খালা একবার জিজ্ঞাসা করতে গিয়ে করে না। মেয়েটার নিশ্চয়ই কোন দরকার আছে তাই ঠোঙা চেয়েছে। খালা গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে কুটুমকে বিদায় দেয়। বলে, আবার এসো মা।
উঠোনে দাঁড়িয়ে হাত নাড়তে থাকে খালা। কুটুম আর টুসি এগিয়ে যায়। কুটুম যায় আর রাস্তা থেকে কাগজের টুকরো আর ছেঁড়া পলিথিন ঠোঙায় উঠায়। ওর দেখাদেখি টুসিও পলিথিন কুড়াতে থাকে। বস্তির দুই পাশের ড্রেনে ময়লা বোঝাই। গন্ধ ছুটেছে চারদিকে। ওরা নাকে চেপে ধরে হাঁটতে থাকে।
কুটুম বলে, দেখেছ টুসি ময়লা ফেলে ফেলে ড্রেনটা আটকে ফেলেছে। এখন আর পানি পাস করতে পারছে না। এভাবে যদি ড্রেনে ময়লা না ফেলত, পলিথিন না ফেলত তাহলে পানি আটকাতো না।
: কিন্তু পলিথিন ব্যবহার তো নিষেধ কে যেন বলেছিল।
: ঠিকই শুনেছ। পলিথিন নিষেধ আব্বার কাছে শুনেছি। কিন্তু মাত্র নাকি ক’দিন নিষেধ ছিল। এখন নাকি আগের মতই চলছে। আব্বা সেদিন তার এক বন্ধুকে বলছিল, এদেশে সব অদ্ভুত ব্যাপার। কেউ ভাল কাজ করলে পরের সরকার এসে সেটা রাখে না। এই যে পলিথিন বন্ধ করাটা কত ভাল একটা কাজই ছিল। কিন্তু বন্ধ করা গেল না। আব্বা বলছিলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন হয়েছে যদিও সেটাতে অনেক ফাঁক আছে। তারপরও যেটুকু আছে সেটুকুও মানা হচ্ছে না। দুই চারজনকে জরিমানা করলে কাজ হতো তা হচ্ছে না। পরীক্ষায় নকল বন্ধ হয়েছে। এটা একটা ভাল কাজ। কে জানে কদ্দিন ধরে রাখতে পারবে। গাড়ি চালাতে চালাতে ড্রাইভার মোবাইলে কথা বললে তার জরিমানার বিধান করা হয়েছে। এটাও ভালো কাজ।
: তুমি তো অনেক কিছু জানো। এতো কিছু জানলে কী করে?
: ওই যে বললাম আব্বা তার এক বন্ধুকে বলছিল।
ওরা ময়লা কুড়াতে কুড়াতে ঠোঙা ভরে ফেলে। এবার ওরা ওদের বাড়ির পথ থেকে অন্য দিকে হাঁটতে থাকে।
টুসি বলে, ওদিকে কোথায় যাচ্ছ?
: ডাস্টবিনটা ওদিকে।
ঠোঙাটা ডাস্টবিনে ফেলে বাড়ির দিকে এগিয়ে যায় কুটুম। বাড়ির দরজায় এসে টুসি দাঁড়িয়ে যায়।
কুটুম বলে, চলো ভেতরে।
কেমন যেন ভয়ে ভয়ে তাকায় টুসি। তারপর বলে, আজ থাক, আরেক দিন আসব। আজ বাড়ি যাই অনেক কাজ আছে।
ও চলে যায়। কুটুম বাড়িতে ঢুকেই মায়ের তোপের মুখে পড়ে। মা রাগে চেঁচিয়ে বলে, তুই বলেছিলি যাবি আর আসবি। না খেয়ে চলে গেলি আর দুপুর পার করে এলি। আমি চিন্তায় অস্থির। এদিকে আনু খালার প্রচণ্ড জ্বর। জ্বরে ছটফট করছে। যা জামাকাপড় ছেড়ে খেয়ে নে। টেবিলে খাবার দেয়া আছে।
কুটুম বুঝে উঠতে পারে না মাকে বলবে কি না সে খেয়ে এসেছে। বললে যদি মা রাগ করেন। ভীষণ স্বাস্থ্য সচেতন তার মা। বস্তিতে খেয়েছে শুনলে চিন্তায় না পড়ে যান। একবার ভাবে বলবে না। পরে ঠিক করে, সে মিথ্যে কথা বলবে না। ছেলেবেলাতেই মা শিখিয়েছেন, সদা সত্য কথা বলবে। কখনই কোন পরিস্থিতিতে মিথ্যে বলবে না, গুরুজনকে মান্য করবে, অসহায়ের পাশে দাঁড়াবে। একবার পাশের বাড়ির ছেলেটার সাথে মারামারি করেছিল কুটুম। মারামারির এক পর্যায়ে ও ছেলেটাকে ধাক্কা দিয়েছিল। ছেলেটা ধাক্কা খেয়ে পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছিল। ভয়ে কুটুম মাকে বলেছিল, ও ধাক্কা দেয়নি। নিজেই আছাড় খেয়ে পড়ে গেছে। কথাটা পরে জানাজানি হয়ে গেছিল। সেদিন মা কুটুমকে কিছু বলেননি, রাগও করেননি। প্রচণ্ড কান্নাকাটি করে বলেছিলেন, আমার মেয়েটা মিথ্যেবাদী হয়ে গেল। আমার এমনই দুর্ভাগ্য!
মায়ের কান্নায় সেদিন ভীষণ কষ্ট পেয়েছিল কুটুম। এর চেয়ে যদি মার কাছে সত্যি কথা বলে সে মারও খেত সেও ছিল ভাল। সেই থেকে আর কখনও মিথ্যে কথা বলেনি কুটুম। আজও বলল না। নিচুস্বরে বলল, আমি খেয়ে এসেছি মা টুসিদের বাড়ি থেকে। গুড়ের পায়েস আর আলু ভর্তা দিয়ে ভাত।
মা কী যেন বলতে গিয়ে সামলে নেন। তারপর বলেন, থালা বাটি পরিষ্কার ছিলতো? দেখিস পেটে যেন কোন সমস্যা না হয়।
: ওরা খুব পরিষ্কার মা। প্লেট গ্লাস বেশ ঝকঝকে।
: আলু ভর্তা কী দিয়ে করেছিল?
: শুকনো মরিচ।
এবার কাজ করতে করতে মার হাত থেমে যায়। উৎকণ্ঠা নিয়ে বলেন, শুকনো মরিচ দিয়ে আলু ভর্তা বলিস কিরে! তোর যে পেট খারাপ হবেই।
: হবে না। ওটা খুব ভাল ছিল। আর গুড়ের পায়েস যা ছিল মা, কী যে মজার!
: হ্যাঁ আজকাল তো মার রান্না তোর ভাল লাগছে না। যাকগে জামাকাপড় ছেড়ে নে। আমি একটু আনু বুবুর ঘরে যাই।
মা একবাটি স্যুপ হাতে আনু খালার ঘরের দিকে যায়। কুটুমও দ্রুত কাপড় ছেড়ে আনুখালার ঘরে যায়। খালার গায়ে হাত দিয়ে আঁতকে ওঠে। প্রচণ্ড জ্বর। হাত যেন পুড়ে যাচ্ছে। মা আনু খালাকে ডাকেন, আনু বুবু চোখ খোল। সকাল থেকে তো কিছুই খাওনি। একটু স্যুপ খাও। নাও হাঁ করো।
অনেক বলেও হাঁ করাতে পারেন না মা। যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে আনু খালা, আব্বা মা, ও আব্বা ও মা।
মার চোখ ছলছল করে। থার্মোমিটার দিয়ে জ্বর মাপেন। মুখ গম্ভীর হয়। সেদিকে তাকিয়ে কুটুম বলে, কী হয়েছে মা, জ্বর আরো বেড়েছে ?
: হ্যাঁ তুই একটু পাশে বস। আমি পানি আনছি, মাথায় পানি দিতে হবে। পানি দিতে দিতে যদি জ্বর নামে। আজ রাতের মধ্যে যদি জ্বর না নামে কাল ওকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। এদিকে তোর আব্বার ইলেকশন সামনে। বাড়িতে আরও কাজের লোক দরকার। হাজার চেষ্টা করেও কাজের লোক পাওয়া যায় না। আজকাল কাজের লোক পাওয়া হিরে জহরত পাওয়ার চেয়ে কঠিন হয়ে গেছে। যারা আছে তাদের অনেক লোভ দেখিয়ে ধরে রেখেছি। ওদের ওপর চাপ দিতেও ভয় লাগে। একবার গেলে আর পাওয়া যাবে না। তার মধ্যে আনুর এই অবস্থা। বেচারা সারাটা জীবন আমাদের দেখেছে। একদিনের জন্যও নিজের কথা ভাবেনি। যাই পানি আনি।
: তুমি বস মা আমি আনছি।
: আনবি, আন। ছোট বালতিতে করে সাবধানে আনিস।
কুটুম পানি এনে নিজেই আনু খালার মাথায় ঢালতে থাকে। মা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেন। পানি ঢালতে ঢালতে কুটুমের মনে পড়ে কতবার জ্বরে সে ছটফট করেছে, পেটে ব্যথায় চিৎকার করেছে। আনু খালা রাত জেগে তার সেবা করেছে। পেট মালিশ করে দিয়েছে। লবণ পানি করে খাইয়েছে, স্যালাইন বানিয়ে দিয়েছে। দিনের পর দিন তাকে গোসল করিয়েছে, তেল মাখিয়েছে, খাইয়ে দিয়েছে। একটু অসুখ হলেই রাত জেগে তাদের সেবা করেছে। তার, মার, আব্বার, মুকুটের। মুকুটের জন্মের সময় তো আনু খালার দিন রাত ছিলো না। মায়ের পাশে থেকে রাতের পর রাত জেগেছে। জীবনে শুধু দিয়েই গেছে। নেয়নি কিছুই। আজ ওর কেউ নেই। ওর পাশে তারা ছাড়া আর কেউ নেই।
: সাবধানে পানি দিস। দেখিস কানে যেন পানি না ঢোকে।
মা আনু খালার মাথার নিচের অয়েলক্লথটা ঠিক ঠাক করে দেন। পানিতে যদি জ্বর না কমে ডাক্তারের সাথে আলাপ করে বরফ দিতে হবে।
আনু খালা প্রলাপ বকছে, ও মা, ও আব্বা, আমি মার কাছে যাবো, গ্রামে যাবো।
মা বলেন, সেই কোন ছেলেবেলায় মা ওকে বাড়িতে নিয়ে এসেছিল। কোনদিন ওর মুখে বাবা মার কথা শুনিনি। বলেছিল ছেলেবেলায় ওর মা মারা গিয়েছিল। তারপর ওর আব্বা আবারও বিয়ে করেছিল। সৎমা দিনরাত অতটুকু মেয়েটাকে পেটাতো, খেতে দিত না। সারা সংসারের কাজ করাতো ওই অতটুকু মেয়েকে দিয়ে। একদিন আমার মার কাছে এল। ক্ষুধায় কাতরাচ্ছিল। মা তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, খেয়েছে কি না। ও উত্তর দেয়নি। মা বুঝে ফেলেছিলেন। খেতে দিয়েছিলেন। আর বলে দিয়েছিলেন ক্ষুধা লাগলে যেন এ বাড়িতে আসে। তারপর থেকে মাঝে মাঝে আসত। মার কেমন জানি মায়া পড়ে গেছিল। একদিন প্রচণ্ড মেরে ধরে ওকে বাড়ি থেকে বের করে দিল সৎমা। মার সহ্য হল না। ওর আব্বাকে ডেকে বকাঝকা করলেন। বললেন, আমি তোমার মেয়েটাকে রাখতে চাই। এখানে থাকবে আর মেয়ের সাথে বড় হবে। তোমার কোন আপত্তি আছে? আনু বুবুর আব্বা কোন আপত্তি করেনি। যেন মেয়েটাকে মার ওপর গছাতে পেরে বেঁচে গিয়েছিল। সেই থেকে আনু এতগুলো বছর আমাদের সাথে পার করে দিল। আমার বিয়ের পর ওকে মা আমার সাথে দিয়ে দিলেন। কোন দিন ভুলেও ও বাবা মার কথা উচ্চারণ করেনি। এমনকি এত বছরের মধ্যে একবারের জন্যও বাবা মাকে দেখতে চায়নি। এবার অসুখের মধ্যে নিজের অজান্তেই বাবা মার কথা ওর মুখ থেকে উচ্চারিত হচ্ছে। আসলে এতগুলো বছর ধরে বাবা মাকে দেখার অতৃপ্ত ইচ্ছেটা ওর মনে ছিল কিন্তু কষ্টে প্রকাশ করেনি। আহারে বেচারা! থাক থাক কুটুম আর পানি দিস না।
কুটুম পানি দেয়া বন্ধ করে। মা যতেœ মাথা মুছিয়ে দেন। চিরুনি দিয়ে আস্তে আস্তে মাথার জট ছাড়ান। প্রচণ্ড জট হয়েছে মাথায়। কিছুক্ষণ পর আবারো স্যুপ খাওয়াবার চেষ্টা করেন। পারে না। মার চেহারায় হতাশা ফুটে ওঠে। ফার্মোমিটার দিয়ে জ্বর মেপে এবার একেবারেই ভেঙে পড়েন মা।
: কুটুম জ্বর তো একটুও কমেনি বরং বেড়েছে। আমি এখন কী করব! তোর আব্বাকে ডাক এক্ষুনি ডাক। শুনছ শুনছ এদিকে এসো। আনু বুবুর খুব অসুখ।
মা ঘাবড়ে গেলে, হতাশ হয়ে পড়লে, উত্তেজিত হলে, বেশি আনন্দিত হলে, কষ্ট পেলে আব্বাকে ডাকেন। এবারও ডাকতে থাকেন। প্রথমে চেঁচিয়ে ডাকেন। তারপর কুটুমকে বলেন, যা তাড়াতাড়ি তোর আব্বাকে ডাক। তাড়াতাড়ি তাড়াতাড়ি।

ছয়.
আব্বার চেম্বারে ঢুকতে গিয়ে দাঁড়িয়ে যায় কুটুম। চেম্বারে ঢোকা তার বারণ। মনে আছে একদিন খেলতে খেলতে আব্বার চেম্বারে ঢুকে পড়েছিল কুটুম। আব্বার চেয়ারের সামনে তখন অনেক লোক বসা। আব্বার জুনিয়র তাদের সাথে কথা বলছিলেন। তিনি একজনকে শিখাচ্ছিলেন, আপনাকে যদি বিরোধী পক্ষের উকিল প্রশ্ন করে সেদিন আপনি কী দেখেছিলেন। ধরুন আমি বিরোধী পক্ষের উকিল প্রশ্ন করলাম, সেদিন আপনি কী দেখেছিলেন? আপনি বলবেন, মহামান্য আদালত সেদিন ছিল ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত।
: কিন্তু সেদিন তো ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত ছিল না।
: যা বলছি শুনুন, বলবেন সেদিন ছিল ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত। আমি কাজ সেরে অনেক রাতে বাড়ি ফিরছিলাম। সামনের ঝোপ নড়ে উঠল। আমার হাতে ছিল টর্চ।
: কিন্তু সেদিন আমার হাতে টর্চ ছিল না। আমি ভুলে বাড়িতে ফেলে এসেছিলাম।
: এতো দেখছি ভয়ানক বিপদ। আমি যা বলছি তাই আপনি বলবেন, নাকি আপনার ইচ্ছেমত বলবেন?
: মিথ্যে বলব?
এবার কথা বলে ওঠেন আব্বা, হ্যাঁ বলবেন। মামলা জিততে হলে বলতে হবে। নইলে জেলখানায় পচে পচে মরবেন।
কুটুম ঘরে ঢুকেছে আব্বা খেয়াল করেননি। সে একপাশে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ কথা শুনছিল। এবার বলে উঠল, কিন্তু উনি বলছেন এগুলো মিথ্যে কথা। আব্বা তুমি ওনাকে মিথ্যে কথা শেখাচ্ছ।
আব্বা ভয়নাক বিব্রত হয়ে পড়েছিলেন। ভাবতেও পারেননি কুটুম এ ঘরে এসে তাদের কথা শুনছে। বললেন, কিন্তু মা ওনার বিরুদ্ধে যে মামলাটা হয়েছে সেটা ভয়ানক মিথ্যে, সাজানো মামলা। এটুকু মিথ্যে না বললে ওকে অকারণে জেল খাটতে হবে। সেটা কী ভাল হবে মা?
: তাই বলে তুমি ওনাকে মিথ্যে বলতে বলবে? তুমিই না আমাকে বলেছিলে মিথ্যে বলা মহাপাপ। ওরা মিথ্যে মামলা করে ভয়ানক পাপ কাজ করেছে। সেই মিথ্যে থেকে উদ্ধার পাবার জন্য আরো কতকগুলো মিথ্যে বলে আরও পাপ করছ তোমরা।
: কিন্তু মা তাহলে উপায় কী তুমিই বল? তাহলে কি ও জেল খাটবে?
: সে আমি কী জানি। পারলে তোমরা ওই মিথ্যে মামলাগুলো বন্ধ কর। তোমরা উকিল যারা মিথ্যে মামলা করে তাদের পাশে তোমরা না দাঁড়ালেই তো পারো।
এর পর আব্বা বাড়ি থেকে চেম্বার তুলে নিয়েছিলেন। অত্যন্ত জরুরি প্রয়োজন ছাড়া এ বাড়িতে মামলার আলোচনা হয় না। এখানে শুধু আব্বা লোকজনের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করেন। মামলার কাজ করেন ভাড়া করা চেম্বারে। সেদিন থেকে কুটুমকে এ ঘরে ঢুকতে বারণ করে দিয়েছিলেন। মাকে বলেছিলেন, মেয়েটাকে চেম্বারে ঢুকতে বারণ করলাম ঠিকই কিন্তু মনটা কেমন জানি করছে। ওতো সত্যি কথাই বলেছে। আমরা যদি মিথ্যে মামলা যারা করে তাদের পাশে না দাঁড়াই তাহলে তো মিথ্যে মামলা বন্ধ হয়ে যায়।
: দাঁড়াও কেন, দাঁড়ানো তো উচিত নয়।
: আমি না দাঁড়ালে কি বন্ধ হবে মিথ্যে মামলা? হবে না। ওদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বিস্তর লোক আছে। তারাই বাঁচিয়ে রাখবে মিথ্যেকে। তবে এবার থেকে মেয়ের কথা ভেবে আমি আর কখনও মিথ্যে মামলা নেব না। আগেও বুঝে সুঝে কখনও নিইনি। এবার থেকে মামলা নেবার সময় অনেক ভেবে চিন্তে নেব। আমরা মাত্র চারটে প্রাণী। কতই বা প্রয়োজন আমাদের। চাহিদা বাড়ালেই বাড়ে।
সেই থেকে আব্বার এই চেম্বারে আর ঢোকেনি কটুম। আজও ঢুকতে পা সরছিল না। কিন্তু আজকের ব্যাপারটা গুরুতর। আনু খালা সমানে বমি করছে। বমি করতে করতে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে একদম। একটা কিছু ব্যবস্থা তো করতেই হবে।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে কুটুম দেখে একসাথে চার পাঁচজন সমানে কথা বলছে, ভাই আপনি সততা নিয়ে বসে থাকলে কিন্তু ইলেকশনে পাস করতে পারবেন না। ওরা কেন্দ্র দখলের সব ব্যবস্থা পাকা করে ফেলেছে আর আপনি হাত গুটিয়ে বসে আছেন। এভাবে ইলেকশন হয় না।
: ওরা ওদের এলাকাগুলো দখল করছে আমরা আমাদেরগুলো করি। আপনার জন্মস্থানের আশপাশের চার পাঁচটা কেন্দ্র দখল করা আমাদের কাছে পানির মত সহজ কাজ।
: অসম্ভব, এসব করতে যেও না। জনগণ যদি আমাকে ভালবেসে ভোট দেয় তাহলেই আমি জিততে চাই নইলে না।
: কিন্তু জনগণকে ভালবাসার সুযোগটা দিচ্ছে কে। তার আগেই তো কেন্দ্র দখল হয়ে যাবে। বাক্স ছিনতাই হয়ে যাবে। কী হল, নির্দেশ দিন কী করব?
: বললাম তো ওসব করতে যেও না।
: এমন হলে আমরা কাজ করতে পারব না ভাই। এত খেটে হারতে রাজি নই আমরা। আপনার যা করার করেন।
: রাগ করছ কেন? তোমাদের কথাতেই কিন্তু আমি ইলেকশন করতে রাজি হয়েছি। তোমরাই তখন বলেছিলে আমার বিপুল জনপ্রিয়তা। আমার কিন্তু ইলেকশনে দাঁড়ানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না।
: জনপ্রিয়তা তো আছেই। কিন্তু ওরা যদি জোর জবরদস্তি করে ভোট ছিনিয়ে নেয় তখন?
: ওরা ভোট ছিনিয়ে নিলে আমাকেও তাই করতে হবে নাকি? বেশ তোমরা কাজ করতে চাইছ না করো না। আমি বসে যাব।
এবার কর্মীরা ঘাবড়ে যায়। দ্রুত একজন বলে, ভাই আপনি অহেতুক অভিমান করছেন। একটা কিছু ব্যবস্থা অন্তত করেন।
: ঠিক আছে আমি ইলেকশন কমিশনে বলব, প্রোটেকশনের ব্যবস্থা নেব।
কুটুম ঘরে ঢুকে আস্তে ডাকে, আব্বা!
: কিরে মা তুমি এ ঘরে !
: আব্বা আনু খালার ভীষণ শরীর খারাপ। মা তোমাকে অনেকক্ষণ ধরে ডাকছে।
: আনু বুবুর কী হয়েছে? আমাকে ডাকছে নাকি? কই চলোত দেখি। হ্যাঁ শোন তোমরা একটু বস। আমি আসছি।
আব্বা দ্রুত আনু খালার ঘরে ঢোকেন।
: কী হয়েছে, হয়েছে কী?
: জ্বর ছিল, জ্বরটা এখন কমেছে। তবে প্রচণ্ড বমি করছে। কফে বুকের ভেতরটা ঘড় ঘড় করছে। নিঃশ^াস নিতে পারছে না ঠিকমত। আসলে অনেকদিন ধরে খেতেও পারছিলো না। নিজের কথা কখনই তো কিছু বলে না। তারপরও আমি লক্ষ্য করেছিলাম। কয়েকদিন বলেছিলাম, কি খাওয়া দাওয়া করছ না যে। চলো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। কিন্তু ও কি ডাক্তারের কাছে যাওয়ার মানুষ। ওই দেখ কী সব বলছে।
আনু খালা বলছিল, আব্বা আব্বা তুমি কোথায়? কতদিন তোমায় দেখিনি আব্বা।
: আচ্ছা ওর আব্বা কি বেঁচে আছে? তাকে খবর দিলে হত না। আব্বাকে বোধ হয় ওর খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।
: আমিও তো তাই ভাবছি। কিন্তু এতগুলো বছরের মধ্যে ও কখনও ওর আব্বার কথা বলেনি। ওরাও কখনও যোগাযোগ করেনি। বেঁচে আছে না মারা গেছে কে জানে। ঠিক আছে বাড়িতে চাচিরা আছে। তাদেরকে দেখব একটা ফোন করে।
হঠাৎ প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হয় আনু খালার। বুক প্রচণ্ডভাবে উঠছে আর নামছে। দেখলে ভয় হয়। মনে হয় এখনই দম বন্ধ হয়ে যাবে।
: শোন অবস্থা যা দেখছি এভাবে ফেলে রাখা যাবে না। হাসপাতালে নিতে হবে এখনই।
: কিন্তু এই এত রাতে হাসপাতালে কি সিট পাওয়া যাবে?
: হাসপাতাল ক্লিনিক যাই হোক কোথাও একটা যেতে হবে। রিস্ক নেয়া ঠিক হবে না। আমি এ্যাম্বুলেন্সে ফোন করছি। তোমরা তাড়াতাড়ি গুছিয়ে নাও।
মা দ্রুত একটা ব্যাগে আনু খালার জিনিস গোছায়। মার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ে। কুটুম উচ্চস্বরে কাঁদতে থাকে। অল্প সময়ের মধ্যেই এ্যাম্বুলেন্স এসে সাইরেন বাজাতে থাকে। দ্রুত স্ট্রেচার নামানো হয়। আব্বার কর্মীরা আনু খালাকে যতেœ স্ট্রেচারে শুইয়ে এ্যাম্বুলেন্সে তোলে। দুটো ক্লিনিক ঘোরার পর একটা ক্লিনিকে সিট পাওয়া যায়। কিন্তু ক্লিনিকের অবস্থা খুবই খারাপ। অক্সিজেনের ব্যবস্থা পর্যন্ত নেই।
মা কেঁদে ফেলেন, ওকে এখানে এনে লাভ কী হল! শ^াসকষ্ট হচ্ছে, অক্সিজেনের ব্যবস্থা পর্যন্ত নেই।
: আরে তবুতো এটা একটা ক্লিনিক। অক্সিজেন নেই, স্যালাইন আছে। ওর শরীর থেকে প্রতি মুহূর্তে বমির সাথে প্রচুর পানি বেরিয়ে যাচ্ছে। স্যালাইন অন্তত সেটা পূরণ করবে। আর এটা যেহেতু ক্লিনিক যে কোন এমার্জেন্সির দায়িত্ব এদের। রাতটা এখানে থেকে সকালে কোন ভাল হাসপাতালে সিফট করব। তুমি ভেব না।
সারারাত আনু খালার মাথার কাছে বসে রইল মা। আব্বা বেশ কিছুক্ষণ বসে থেকে একসময় পাশের বেডে গিয়ে শুয়ে পড়লেন। মা এখানে আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই কুটুমকে বাড়িতে গিয়ে ঘুমাবার জন্য চাপ দিতে থাকলেন। কুটুম কিছুতেই রাজি হল না। মুকুটকে পাঠিয়ে দেয়া হল তার ছোটখালা কোয়েলের বাসায়। কুটুম কোন কথা না শুনে মার পাশে বসে রাত জাগতে লাগল। মা দু একবার মৃদু বকাবকি করে চুপ করে গেলেন। আজ যেন বকাবকি করার মত এনার্জিও মার নেই। সারাজীবন আনু খালা মার জন্য করেছে। আজ বোঝা গেল মা আনু খালাকে কতটা ভালবাসেন। আনু খালা একটু পর পর বমি করছে। মা বমির গামলাটা বাড়িয়ে দিচ্ছেন বার বার। একবার বাথরুম পেল আনু খালার। মা বেডপ্যান দিয়ে বাথরুম করালেন। চামচে নিয়ে একটু একটু করে স্যুপ খাওয়াবার চেষ্টা করলেন। বার বার বললেন, আনু বুবু কেমন আছ, কেমন আছ, বল না কেমন আছ তুমি?
সারাটা রাতে ঠায় বসে রইলেন মা। একটুও ঘুমালেন না। মাঝরাতে ঘুমিয়ে পড়েছিল কুটুম। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখল একইভাবে বসে আছেন মা।
সকালে আনু খালাকে সিফট করা হল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। প্রথমে ডাক্তাররা বিপাকে পড়ে গেল। তারা ধরতে পারছিল না আনু খালার সমস্যাটা কী। বক্ষব্যাধি বা মেডিসিন সংক্রান্ত কিছু না অন্য কিছু। দু’দিন পরীক্ষা নিরীক্ষার পর জানা গেল কিডনি ড্যামেজ হয়ে গেছে আনু খালার। নতুন কিডনি লাগাতে হবে দ্রুত। আর সেটা অনেক ব্যয়বহুল ব্যাপার। কম পক্ষে লাখ পঁচিশ খরচ হবে। ওটা শুধুমাত্র কিডনি কেনার খরচ। অপারেশনের খরচ আর ওষুধপত্র তো আছেই। মাথায় হাত দিয়ে বসলেন মা।

সাত.
দেড় মাস হাসপাতালে কাটিয়ে আনু খালা বাড়িতে ফিরেছেন। মলিন মুখে মুকুটকেও বাসায় দিয়ে গেছে ছোটখালা। আনু খালার শরীর ভেঙে একেবারে খান খান। মোটা সোটা শরীরটা শুকিয়ে প্যাকাটি। হাসপাতালে থাকা অবস্থায় মাঝে মাঝেই অসুখের ঘোরে আনু খালা বাবা মার কথা বলত। মা অনেক চেষ্টা করেছেন আনু খালার বাবা মার সাথে যোগাযোগ করার। আনু খালার নিজের মাতো সেই কোন ছেলেবেলায় মারা গেছেন। সৎমার অত্যাচারেই আনু খালা আশ্রয় নিয়েছিল কুটুমের নানার বাড়িতে। মা জানতেন ওর সৎমাকে খবর দিয়ে কোন লাভ নেই। আনু খালার বাবার খোঁজ খবর করেছিলেন মা। দেশে মায়ের চাচারা থাকেন। তাদের মাধ্যমেই যোগাযোগ করেছিলেন। খবর পেয়েছিলেন ওনার এখন অনেক বয়স। চলাফেরা তেমন একটা করতে পারেন না। অসুখ বিসুখে জর্জরিত। দ্বিতীয় পক্ষের ছেলেরা তাকে তেমনভাবে দেখেও না। আজকাল মাঝে মাঝেই আনু খালার কথা ভেবে চোখের পানি ফেলেন। আনু খালার প্রতি অবিচার করেছেন একথা বলে কাঁদেন। মেয়ের অসুস্থতার কথা শুনে মেয়েকে দেখতে আসার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। বারবার ছেলেদের বলেছিলেন তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। মায়ের চাচারাও তার ঢাকায় যাওয়ার ব্যবস্থা করতে রাজি ছিলেন। কিন্তু ছেলেদের প্রচণ্ড বিরোধিতার মুখে যেতে পারেননি। ছেলেরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল একবার বাড়ি থেকে বের হলে বাড়িতে আর ফিরতে পারবে না। তার থাকা খাওয়ার কোন দায় দায়িত্ব আর তাদের নেই। মেয়ের কাছে গেলে সেখানেই যেন থেকে যায়। জ্ঞান ফেরার পর অবশ্য আনু খালা একবার ভুলেও বাবা মার কথা উচ্চারণ করেনি। এ বিষয়টা নিয়েও মার মন ভীষণ খারাপ। মুখে না বললেও মনের মধ্যে সারাক্ষণই নিশ্চয়ই বাবা মার জন্য আনু খালার আকুলতা। ওর মা চলে গেছেন, তাকে ফিরিয়ে আনার উপায় নেই। কিন্তু বাবাকে তো আনতে পারতেন। সেটাও সম্ভব হল না। আনু খালার একটাই মাত্র ইচ্ছে তাও অপূর্ণ রয়ে গেল। তার ওপর আনু খালার এতবড় একটা অসুখ। সারাক্ষণ মন মরা হয়ে থাকেন। অসুখের আসল খবরটা আনু খালাকে জানানো হয়নি। বলা হয়েছে সামান্য অসুখ হয়েছে একটু নিয়ম করে ওষুধ খেলে, বিশ্রাম নিলে ঠিক হয়ে যাবে। আনু খালাকে মা কোন কাজই করতে দেন না। কাজ করতে গেলেই বাধা দেন।
: শোন আনু বুবু তুমি কিন্তু কোন কাজে হাত দেবে না। এখন পরিপূর্ণ বিশ্রাম। আগে ভাল হও তারপর দেখা যাবে।
: কিন্তু সারা দিন রাত হাত গুটিয়ে কি বসে থাকা যায়? সারাটা জীবন ধরে কাজ করার অভ্যেস। বসে থাকতে থাকতে আমার কিন্তু পাগল পাগল লাগছে।
: এ কি কথা, কটা দিনই বা হয়েছে। এখন কিন্তু মোটেও কাজে হাত দেবে না। মনে থাকে যেন।
শেষের দিকে মায়ের কণ্ঠ গম্ভীর হয়ে যায়।
স্কুল থেকে ফিরে বিকেলে আনু খালার কাছে যায় কুটুম। আনু খালার চুল আঁচড়ে দেয়। আজকাল আনু খালার চুলে জট বেঁধে থাকে সারাক্ষণ। মনে হয় বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতে এটা হয়েছে। কুটুম কাছে গেলে আনু খালা খুব খুশি হন। ওর হাতটা মুঠোর মধ্যে ধরে বসে থাকেন। কুটুম ভাবে যদি আলাদীনের একটা চেরাগ পাওয়া যেত আর আনু খালার জন্য দুটো না হোক একটা কিডনি যদি অন্তত পাওয়া যেত। কুটুম হাসপাতালে ডাক্তারদের মুখে শুনেছিল একটা কিডনিতেই নাকি মানুষ বঁাঁচতে পারে।
সেদিন আনু খালার চুলের জট ছাড়িয়ে কমলার কোয়া ওর মুখে তুলে দিচ্ছিল কুটুম। আনু খালা হঠাৎ করে বলল, আচ্ছা আমার অসুখটা কি, তুমি জানো?
কুটুম সাধারণত মিথ্যে বলে না। মিথ্যে না বলতে ছেলেবেলাতেই বাবা মা শিখিয়েছেন। তাই মিথ্যে কথাটা বলতে ওর বাধছিল। কিন্তু মা বাবা বাড়ির সবাইকে বলে দিয়েছিলেন, শোন আনু বুবুকে ওর অসুখের কথাটা এখন বলা যাবে না। বললে ও ভয় পেয়ে যাবে। তাতে ওর শরীর আরও খারাপ হয়ে যাবে। যে কটা দিন বঁাঁচত তা আর ওকে বাঁচানো যাবে না। তাই তোমরা ওকে কিছুই বলবে না। ঠিক আছে, মনে থাকবে তো? কাজেই আসল কথাটা কুটুম আনু খালাকে বলতে পারল না। বলল, আসলে খালা আমি ঠিক জানি না। তবে শুনেছিলাম সামান্য কি একটা অসুখ হয়েছে। একটু নিয়ম করে ওষুধ খেলে ঠিক হয়ে যাবে।
আনু খালা হাসে। তারপর বলে, তোমাকে একটা কথা বলি, তোমার মা বাবা ভেবেছে আমি জানি না। আসলে আমাকে ওরা খুব ভালবাসে তো তাই গোপন রেখেছে। আমি জানি আমার অনেক জটিল অসুখ হয়েছে। যে অসুখের কোন চিকিৎসা নেই। আমার কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে। এ অসুখের চিকিৎসা কিডনি বদল করা। আমি আর বঁাঁচব না। হাসপাতালের ডাক্তারদের আলোচনায় আমি সব জেনেছি। কিন্তু তোমার মা যেমন অসুখের কথাটা আমার কাছে গোপন করছে আমিও জানার ব্যাপারটা তোর মার কাছ থেকে গোপন করছি। আমি জানি না জানলে ও কিছুটা নিশ্চিন্ত থাকবে তাই। তুমিও তোমার মাকে বলো না আমি জানি।
আনু খালার চোখের কোনা দিয়ে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে নামে। কুটুম আনু খালার চোখ মুছিয়ে দিয়ে ওর গালে গাল চেপে আদর করতে করতে বলে, তুমি ভেবোনা আনু খালা, আমি বলছি তুমি ভাল হয়ে যাবে।
আনু খালা চোখে পানি নিয়ে হাসেন। কুটমকে আদর করতে করতে বলেন, যাও এবার গিয়ে কিছু খেয়ে নাও। স্কুল থেকে এসে তো কিছুই খাওনি। আমি অসুস্থ, তোমাদের দেখে শুনে খাওয়াবার তো কেউ নেই। তোমার মাতো আমাকে নিয়েই অস্থির।
কুটুম পাশের ঘরে যায়। ওর মনটা অস্থির হয়ে থাকে। যদি কোনও ভাবে আনু খালার জন্য একটা কিডনির ব্যবস্থা করা যেত। শুধু একটা কিডনি। মানুষের জীবনের জন্য প্রয়োজন যে জিনিস তার দাম এত বেশি হলে কী করে চলে!
কুটুম মুকুটের সাথে খানিকক্ষণ খেলা করে। মুকুট খিল খিল করে হাসতে হাসতে লাইনের ওপর দিয়ে ট্রেন চালায়। আর চালিয়েই চলন্ত ট্রেনে বার বার বাধা দেয়। ট্রেন লাইনের বাইরে পড়ে যায়। মুকুট খিল খিল করে হাসতে থাকে। কুটুম ট্রেনটাকে লাইনে তুলে দেয়। ও যতবার লাইনে তুলে দেয় ততবারই মুকুট লাইন থেকে ফেলে দেয় ট্রেনটাকে। রেগে যায় কুটুম, এই বার বার ফেলছিস কেন, আর ফেলবি না বলছি।
ও আবার চালায়, মুকুট আবারও ফেলে দিয়ে হি হি করে হাসতে থাকে। খুব রেগে যায় কুটুম। প্রচণ্ড জোরে ধমক দেয়। ভ্যা করে কেঁদে ফেলে মুকুট। কুটুম ওকে থামাবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। কান্নার শব্দে ছুটে আসে মা।
: কী করেছিস তুই? ওকে মেরেছিস কেন?
: মারিনি। দেখ না বারবার ট্রেনটাকে লাইনের বাইরে ফেলে দিচ্ছে। তাই বকেছি।
: বকলি কেন। ও ফেলে দিলে তোর সমস্যা কী?
: বারবার ফেলে দিলে ভেঙে যাবে না?
: ভাঙলে তোর কী। তাই বলে ওকে বকবি? থাক থাক বাবা কাঁদিস না। ওকে আমি মেরে দেব। দেখ দেখি কাণ্ড ছেলেটা কিভাবে গাল ফুলাচ্ছে। উহুরে বাবারে, আয় কোলে আয়। আমি এদিকে নানান চিন্তায় অস্থির। এই আর কখনও ওকে কাঁদাবি না। ওকে কাঁদালে কিন্তু মার খাবি। যা খাবার খেয়ে নে। টেবিলে চিকেন রাখা আছে যা।
টেবিলে বেশ কয়েকটা চিকেন ভাজা ঢাকা দেয়া রয়েছে। চিকেন ওর ভীষণ প্রিয়। মা খুব একটা চিকেন খেতে দেন না। মার পরিষ্কার কথা প্রচুর শাকসবজি ডিম দুধ খেতে হবে। এসবে শরীরের গ্রোথ হয়। শুধু মুরগি খেলে অনেক কিছুর ঘাটতি থেকে যাবে শরীরে। চোখের পাওয়ার কমে যাবে, হাড় শক্ত হবে না। স্কিন ভাল থাকবে না, চুল পড়ে যাবে, হজমে গোলমাল হবে। মা একটা শব্দ ব্যবহার করেন, সুষম খাদ্য। আর খেতে হবে প্রচুর পানি। তাই ইচ্ছে না থাকলেও শাকসবজি ফল দুধ খেতে হয় কুটুম মুকুটকে। চিকেন ওদের দেয়া হয় মার হিসেব মত। আজ মা নিজেই চিকেন করে রেখেছেন। অথচ কুটুমের খেতে ইচ্ছে করছে না। বিভিন্নœ কারণে আজ ওর মন ভীষণ খারাপ। টুসি দুদিন স্কুলে আসেনি। ওকে মাঠে দু’দিন না দেখে গতকাল খোঁজ নিয়ে জেনেছিল ও স্কুলে আসছে না। ভেবেছিল আজ ওর বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসবে। কিন্তু সকালে ওর ক্লাসে গিয়ে দেখল টুসি এসেছে। মুখ শুকনো। দেখলেই বোঝা যায় কিছু হয়েছে। টুসি বলেছিল ওর অসুস্থ ভাইটার নাকি ভীষণ শরীর খারাপ। ডাক্তার দেখানোর পয়সা নেই। ওর মা পয়সা রোজগার করার জন্য দিনরাত খাটছে। ওরাও দু’ হাতে ঠোঙা বানাচ্ছে। কিন্তু তাও কুলিয়ে উঠতে পারছে না। একদিন নাকি কিছু পয়সা খরচ করে ডাক্তার দেখিয়েছে। ডাক্তার অনেক টেস্ট দিয়েছে, অনেক ওষুধ। ওসবের টাকা জোগাড় করার জন্য এখন ওরা পাগলের মতো কাজ করছে। তাই দুদিন স্কুলে আসতে পারেনি। সব শুনে ভীষণ মন খারাপ হয়েছিল কুটুমের। তাদের বাড়িতে আনু খালার এতবড় অসুখ, আর টুসিদের বাড়িতে মুন্নার। পার্থক্য হচ্ছে কুটুমদের অসুখ হলে চিকিৎসা পয়সা আছে, আনু খালা বা টুসিদের তা নেই। তারপরও কুটুম বলেছিল, শোন টুসি, সবই বুঝলাম কিন্তু কোন অবস্থাতেই স্কুল কামাই দেয়া চলবে না। মনে রাখবে তোমাকে প্রথম হতেই হবে।
: তাতো বুঝলাম। কিন্তু ভাইয়ের চিকিৎসার জন্য কাজ করাও তো দরকার। ঠোঙা না বানালে টাকা আসবে কোথা থেকে?
: তাইতো ভাবছি, আমরা এত ছোট। ইচ্ছে থাকলেও অনেক কিছু করতে পারিনে।
এসব নিয়ে আজ কটুমের কিছুই ভাল লাগছে না। টুসির পঙ্গু ভাইটা মাঝে মাঝেই অসুস্থ হয়। কী একটা অপারেশন করালে ও ভাল হয়ে যাবে। সেই অপারেশনটা হচ্ছে না বলে দু’দিন পর পর ও অসুস্থ হচ্ছে। এদিকে আনু খালা জেনে গেছে তার কিডনির সমস্যা। এই জানাটাও ওর জন্য খুবই খারাপ হয়েছে। মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে খালা। হয়ে পড়েছেও। বিষয়টা আবার মাকেও বলতে পারছে না। মাকে বললে দুশ্চিন্তায় মার শরীর খারাপ হবে। কী করবে এখন কুটুম!
কটুম এক টুকরো চিকেন খেয়ে বাইরের ঘরের দিকে যায়। তখনই বেল বেজে ওঠে। কুটুম গিয়ে দরজা খোলে। ছোটখালা এসেছে।
: খালা তুমি হঠাৎ?
: হ্যাঁ এলাম। কেন আসতে নেই নাকি?
: না তা না, দু’দিন আগেই তো এলে। কখনও এত তাড়াতাড়ি আসো না তো তাই।
: তা তুই ঠিকই বলেছিস। আসলে মুকুটটা অনেক দিন আমার কাছে ছিল। আগে কখনও থাকেনি। ভীষণ মায়া পড়ে গেছে ওর ওপর। রাতে ওকে কাছে নিয়ে ঘুমাতাম। এখন ঘুমাতেই পারছি না। তাই ওকে দেখতে এলাম।
খালা সে রাতে মায়ের পাশে ঘুমায়। রাত জেগে গল্প করে দুই বোন। আর সে রাতে ওদের আলাপের এক পর্যায়ে কুটুম শোনে খালা বলছে, দেখ আপা একটা বাচ্চার আমার এত শখ অথচ হল না। তাই ভাবছি একটা দত্তক নেব। অন্য কারো সন্তানকে আনি নিজের বলে গ্রহণ করব। তার সব ভার আমি নেব।
সেই মাঝরাতে হঠাৎ কথা বলে ওঠে কুটুম, অন্যের সন্তানকে তুমি নিজের বলে ভাবতে পারবে? একদম নিজের?
: কী কাণ্ড তুই ঘুমাসনি! আমাদের কথা শুনছিস?
: ঘুম আসছে না। বলো খালা অন্যের সন্তানকে নিজের সন্তান বলে ভাবতে পারবে?
: কেন পারব না, অবশ্যই পারব। তাকে লেখাপড়া শেখাবো, মানুষের মত মানুষ করব, নিজের পরিচয় দেবো। সব সব কিছু করব।
: চিকিৎসার দরকার হলে করাবে, যদি অনেক টাকার চিকিৎসা হয়?
: কেন করাবো না, অবশ্যই করাবো। ও যে তখন আমার নিজেরই সন্তান। তবে একটাই শর্ত, যাদের কাছ থেকে ওকে দত্তক নেবো তারা আর কোনদিনই ওকে দাবি করতে পারবে না।
এবার মা কথা বলেন, আচ্ছা কোয়েল ওকে এসব কথা বলে লাভ আছে? তুই কি পাগল হয়েছিস? ও একটা বাচ্চা মেয়ে।
: ও জানতে চাইল তাই। সত্যিই আমি পাগল হয়েছি আপা, সত্যিই।
ছোটখালা কাঁদতে থাকে।

আট.
কথা বলতে বলতে কুটুমের দুচোখে ঘুম নেমে এসেছিল। ছোটখালার কান্নায় সে ঘুম ভেঙে যায়। চোখে আর ঘুম নামে না। ওর ভীষণ মন খারাপ হয়ে যায়। ছোটখালা কত ভাল, মানুষকে কত আদর যতœ করে, গরিব দুঃখীকে সাহায্য করে। বিপদে সবার পাশে দাঁড়ায়। সেই ছোট খালার কেন এত কষ্ট, কেন এত দুঃখ? একদিন ছোট খালার শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গেছিল কুটুম। খালার শাশুড়িকে কুটুম নানু ডেকেছিল। আশির ওপরে বয়স নানুর। সোজা হয়ে হাঁটতে পারেন না। অসুখ বিসুখ লেগেই আছে। তারপরও মুখে হাসি লেগেই থাকে। কুটুমকে কাছে ডেকে ওর সারা শরীরে আদরের হাত বুলিয়েছিলেন। ওর কপালে চুমু খেতে খেতে বলেছিলেন, বৌমা এই বুঝি তোমার বোনের মেয়ে। ভারি মিষ্টি তো। কী নাম তোমার?
: কুটুম। নানু তুমি এখানে একা থাকো?
: একা কোথায়? এত বড় বাড়ি আমার। চারপাশে কত প্রতিবেশী, গাছপালা, পুকুর, হাঁস মুরগি। এরা তো সবাই আমার আপন । একা কোথায় বলত দাদু?
এবার ফোঁস করে উঠেছিল ছোটখালা,
: হ্যাঁ সবাই আপন আর পর আমি আর আপনার ছেলে। এমন আর দেখিনি। বিয়ের পর থেকে সেই যে পই পই করে বলছি একা এখানে থাকার দরকার নেই। চলেন ঢাকায় সবাই মিলে একসাথে আনন্দে থাকব। আপনি এখানে একা একা থাকেন আর সারাক্ষণ আমরা দুঃশ্চিন্তায় ভুগি। আপনার ছেলে আপনার চিন্তায় খায় না, ঘুমায় না। আপনিও আমাদের জন্য চিন্তায় থাকেন। সবাই একসাথে থাকলে এই চিন্তাটা থাকবে না। আমি না হয় পরের মেয়ে, আমার কথা নাই বা ভাবলেন কিন্তু নিজের ছেলেটার কথা তো ভাববেন। এটা যেমন আপনার বাড়ি, ঢাকার বাড়িটাও তো আপনার। ওই বাড়ি, ওই বাড়ির মানুষজন তাদের প্রতি কি আপনার কোন দায়িত্বই নেই? থাক এসব কথা আর বলব না।
শেষদিকে অভিমানে গলা বুজে এসেছিল খালার। চোখ মুছতে মুছতে সরে গেছিলেন। নানু হাসতে হাসতে বলেছিলেন, বুঝলে দাদু আমার বৌমাটা বড় ভাল। অনেক কপাল করলে এমন বৌমা কারো ভাগ্যে জোটে।
: তাহলে আপনি ঢাকায় যান না কেন? এখানে একা একা থাকেন কেন?
: যাই তো মাঝে মাঝে। দুই চারমাস থেকেও আসি। কিন্তু তাতে ওদের মন ভরে না। রক্তের সম্পর্ক থাকলেই কি সবাই আত্মীয়, না হলে সবাই পর? সেই ছেলেবেলা থেকে এই বাড়িতে আছি। এ বাড়ির মাটির স্পর্শ না পেলে আমি অস্থির হয়ে উঠি। এই বাড়ির প্রতিটি গাছপালার প্রতিটি পাতার দুলুনি আমাকে ছুঁয়ে যায়। পাড়া প্রতিবেশীদের কত জনকে চোখের সামনে জন্মাতে দেখেছি। ওরা ওদের আনন্দ বেদনায় আমার কাছে ছুটে আসে। এসব ফেলে একেবারে যাবো সেদিন যেদিন এ পৃথিবী আমাকে ছাড়তে হবে। তার আগে পারব না। তবে মাঝে মাঝে নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে হয়। অনেক কপালগুণে এমন বৌমা কারো ভাগ্যে মেলে। এমন সুন্দর মন আজকাল দেখা যায় না।
কুটুমের সেই ভাল খালা, সুন্দর মনের খালা কাঁদছে। কুটুমের ইচ্ছে হয় এখনই উঠে গিয়ে ওর চোখের পানি মুছিয়ে দিতে। কিন্তু তা সম্ভব নয়। কুটুমের ঘুম আসে না, ঘুম আসে না। ছোটখালার কথা ভাবতে ভাবতে শেষরাতে ঘুমিয়ে পড়ে কুটুম। সকালে ঘুম থেকে উঠে তড়িঘড়ি স্কুলে যাবার জন্য তৈরি হয়। অন্যদিন মাকে তাগিদ দিতে হয়। কুটুম খেয়ে নে, কুটুম ড্রেস পর। আজ কিছুই বলা লাগে না। আর মাও তেমন খেয়াল করতে পারেন না। একদিকে অসুস্থ আনু খালা, অন্যদিকে আব্বার নির্বাচন সমাগত তারপর ছোট খালা এসেছেন, মুকুটের দুষ্টুমি আর তার যতœ নেয়াতো আছেই। মায়ের নাজেহাল অবস্থা। সকাল থেকে চর্কির মত ঘুরছেন। কুটুম একা একাই খেয়ে নিয়ে স্কুলে রওনা হয়। সাধারণত সে গাড়ি নিয়ে স্কুলে যায়। আজ মা গাড়ি নেবার কথা বলতে ভুলে যায় আর কুটুমও এটাই চাইছিল। গেট থেকে বের হবার মুখে ড্রাইভার গ্যারেজের দিকে হাঁটতে শুরু করলে কুটুম বলে, আজ গাড়ি লাগবে না।
: মা বকবে কিন্তু। মাকে বলেছ?
কুটুম একথার কোন জবাব না দিয়ে হনহন করে হাঁটতে থাকে। ড্রাইভার অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। একবার ভাবে কুটুমের মাকে বলবে কুটুম গাড়ি না নিয়ে একা হেঁটে চলে গেছে। পরমুহূর্তে ভাবে, সেধে সেধে ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ নেই। বরং এই সুযোগে আরও খানিকটা ঘুমিয়ে নেয়া যাক। সারাটা বছর স্কুলের ডিউটি করতে গিয়ে তার ঘুমের বারোটা বেজে যায়।
কুটুম হন হন করে হাঁটে। স্কুলের অনেকটা আগেই সে বেরিয়েছে। বেরিয়েছে ইচ্ছা করে। টুসির ভাই মুন্নার অসুখ খুব বেড়েছে। কে জানে সে স্কুলে আসবে কিনা। আর আসলেও লাভ নেই। ওকে কথা বলতে হবে টুসির মা আমেনা খালার সাথে।
টুসিদের বস্তিতে ঢুকে কুটুম অবাক হয়। ওই অত সকালেও যেন বস্তিতে মধ্য দুপুরের ব্যস্ততা। হুড়মুড় করে ঘরগুলো থেকে গার্মেন্টসের মেয়েরা বেরিয়ে আসছে। তারা ছুটছে কর্মস্থলের দিকে। রিক্সাওয়ালারা অনেক আগেই বেরিয়ে গেছে। নাইট কোচের যাত্রী আর ট্রেনের প্যাসেঞ্জার ধরার জন্য ওরা অনেক সকালে বেরিয়ে যায়। বাড়তি যে দু চার পয়সা আসে তা এখান থেকে। সারারাত জার্নি করে এসে যাত্রীরা রিক্সাভাড়া নিয়ে দরদাম করে না। বাচ্চারা বদনা হাতে নিয়ে লাইন দিয়ে ল্যাট্রিনে যাচ্ছে। ওটাকে ল্যাট্রিন অবশ্য বলা যায় না। চট ঝোলানো এক চিলতে জায়গা। জায়গাটায় কোন দরজা নেই। তাদের বাড়ির ল্যাট্রিনের টাইলস ঝকঝক করে। ও টাইলসে যেন মুখ দেখা যায়। আর বাথরুমের আয়না! ওটা শুধু নামে বেলজিয়াম গ্লাস না, আসলেই বেলজিয়াম থেকে আনা। মা একদিন প্রতিবেশী আন্টির কাছে গল্প করছিলেন, বুঝলেন ভাবি আমার হাসবেন্ডের তেমন একটা টাকা পয়সা নেই, তবে রুচিটা আছে ষোল আনা। একবার বেলজিয়াম যাবার সুযোগ পেয়েছিল। মানুষ বিদেশে গেলে পছন্দের এটা ওটা আনে। উনি কী আনলেন জানেন? আনলেন কতকগুলো বেলজিয়াম গ্লাস। এমন শুনেছেন কখনও?
আসলেই কুটুমদের বাড়ির গ্লাসগুলো দারুণ ঝকঝকে। এমন স্বচ্ছ গ্লাস খুব একটা দেখা যায় না। ছোট খালা অনেক বড়লোক। তারপরও তার বাথরুমের গ্লাস এতটা ঝকঝকে না। কুটুম ভাবে তাদের বাথরুমগুলো এত সুন্দর আর এখানে এই বস্তিতে এতগুলো মানুষ আর তাদের জন্য দুটো চট ঝোলানো জায়গা। ওগুলোর ভেতরটা কেমন কে জানে। এসব ভাবলে মন খারাপ হয়ে যায় কুটুমের। এই এত সকালে অনেক চুলো জ্বলছে। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেছে চারদিক। মুখের মধ্যে ধোঁয়া ঢুকে কুটুমের কাশি আসতে থাকে। ও খুক খুক করে কাশতে কাশতে টুসিদের ঘরের দিকে এগোয়। উঠোনের অন্য দিক থেকে একসাথে দুই তিনজন মহিলা ডাকতে থাকে, এই খুকি তুমি কে? কোথায় চললে?
: ভুল করে এসেছ নাকি?
: না না ও খুকি আগেও এসেছে। ও টুসিদের ঘরে যায়।
খুকি, আশ্চর্য! এমন ডাক কখনও শোনেনি কুটুম। খুকি আবার একটা ডাক হয় নাকি?
কুটুম টুসিদের ঘরের দিকে এগোয়। তখনই একসাথে কয়েকটা বাচ্চা ছেঁকে ধরে। কেউ ওর জামা ধরে টানে, কেউ চুলের ব্যান্ড ধরে, দেখেছিস দেখেছিস কী সুন্দর গন্ধ ওর গায়ে।
: মনে হয় খুব দামি সাবান মাখে।
: পায়ের জুতোটা দেখেছিস? ওরকম জুতো টিভিতে দেখা যায়।
কুটুম বুঝতে পারে না আজ এক সাথে এতগুলো বাচ্চা কী করে এল। আরও তো একদিন সে এখানে এসেছিল তখন তো এত মহিলা, এত বাচ্চা দেখেনি। পর মুহূর্তে ওর মনে হয় সেদিন ছিল দুপুর। তাই বুঝি সবাই সেদিন কাজে বেরিয়েছিল। কিন্তু বাচ্চাগুলো কোথায় ছিল? ওরা স্কুলে যায় বলে তো মনে হয় না। ছোট একটা বাচ্চা কুটুমের হাত ধরে বলে, তোমার জুতোটা আমাকে দেবে? দেবে বল?
কুটুম ওদের কাটিয়ে অনেক কষ্টে টুসিদের দরজায় এসে দাঁড়ায়। ডাকে, টুসি?
প্রায় সাথে সাথে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে টুসি আর তার পরপরই টুসির মা।
: মাগো তুমি এসেছ এত সকালে!
: স্কুলে যাবার পথে এলাম। এখনই চলে যাব। আপনার সাথে একটা কথা ছিল খালা।
: আসো মাগো, ঘরে আসো।
কুটুম ঘরে ঢুকে খাটের ওপরে বসে। সেদিনের মত আজও বিছানায় শুয়ে আছে টুসির ভাই মুন্না। তবে দেখলেই বোঝা যায় ও ভীষণ অসুস্থ। শ্বাস নিতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে ওর। চোখগুলো কোটরে ঢুকে গেছে। কুটুম ওর কপালের চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে আদর করে। মুন্নার ফ্যাকাসে চেহারাটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
: বলো মাগো কী যেন বলতে চাচ্ছিলে?
: খালা আমি আপনার সাথে একটু একা কথা বলতে চাচ্ছিলাম।
: এখানে তো একা কথা বলার জায়গাও নেই।
খালা বাইরে যান। এদিক ওদিক তাকান । ফিরে এসে বলেন,
: চল মা বাইরে যাই, দেখি ওদিকটায় দাঁড়িয়ে দুটো কথা বলা যায় কিনা।
ওরা উঠোনের একদিকে এসে দাঁড়ায়। এ দিকটাতে অপেক্ষাকৃত লোক কম। কুটুম বলে, মুন্নার চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা হয়েছে খালা?
: চিকিৎসার পয়সা কোথায়? যা হচ্ছে তা জোড়াতালি। যেদিন হাতে দুটো পয়সা পাই দেদিন ওষুধ পথ্য জোটে, যেদিন পাই না জোটে না। একসাথে বেশি ওষুধ কিনতে পারি না। মাঝে মাঝেই ওষুধ বাদ পড়ে। আর অপারেশনটা করার টাকা কোনদিনও জোগাড় করতে পারব না। আমার ছেলেটা সুস্থও হবে না। মাঝে মাঝে নিজর ওপর প্রচণ্ড ঘৃণা হয়। মনে হয় কেমন মা আমি সন্তানকে না পারি খাওয়াতে না পারি পরাতে। না পারি ওদের লেখাপড়া শিখাতে, না করাতে পারি ওদের চিকিৎসা।
: খালা ওভাবে বলবেন না। সব ঠিক হয়ে যাবে। যাক খালা আমি একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছি। আপনি সেদিন বলেছিলেন, মুন্নাকে দত্তক দেবেন। আমার খালার কোন ছেলে মেয়ে নেই। তিনি একটা সন্তান দত্তক নিতে চাচ্ছেন। যাকে নেবেন তার সমস্ত ভার খালা নেবেন। লেখাপড়া চিকিৎসা সব কিছু। নিজের সন্তানের পরিচয়ে মানুষ করবেন। শুধু একটাই শর্ত, যাকে দত্তক নেবেন তাকে আর কখনই দাবি করা যাবে না। খালা আপনি যদি রাজি থাকেন মুন্নাকে খালা দত্তক নিতে পারেন। তাহলে ওর অপারেশন হবে। ও ভাল হয়ে যাবে।
খালা স্থানুর মত দাঁড়িয়ে থাকেন। তার মুখ বিবর্ণ হয়ে যায়। তারপর একসময় নড়ে ওঠেন খালা। ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে বলেন, মাগো তুমি তোমার খালার সাথে কথা বল। আমি রাজি। আমি সব লিখে পড়ে দেব।
বলতে বলতে ঘরে ঢোকেন খালা। তখনও আপন মনে বলে চলেছেন, আমি ওকে দত্তক দেব মা। যে মা খাওয়াতে পারে না, চিকিৎসা করাতে পারে না সে কিসের মা? আমি মুন্নাকে দিয়েই দেব। কাঁদতে থাকেন খালা।
গোঙড়ানির শব্দে ফিরে তাকায় ওরা। আপ্রাণ চেষ্টায় কী যেন বলতে চাচ্ছে মুন্না। কী বলছে বোঝা না গেলেও বোঝা গেল ও হাত নাড়িয়ে না না করছে। খালা সেদিকে তাকিয়ে চোখে আঁচল চেপে ধরে বলেন, গরিবের ইচ্ছের কোন মূল্য নেই মাগো। আমি ওকে দত্তক দেব। কোনো দিন দাবি করব না। আমি চাই ও সুস্থ হোক।

নয়.
টুসিদের বস্তি থেকে বেরিয়ে আসে কুটুম। মুন্নার চিকিৎসা হবে একথা ভেবে ওর মন যেমন ভাল তেমনই মন খারাপ মুন্নাকে ওর মা বোনদের ছেড়ে চলে যেতে হবে ভেবে। কুটুমের যদি সামর্থ্য থাকত এখানে রেখেই মুন্নার অপারেশনের ব্যবস্থা করত। আর টুসিদের থাকার ব্যবস্থা করতো একটা সুন্দর স্বাস্থ্যকর জায়গায়। ওদিকে খালার জন্যও সে একটা সুন্দর স্বাস্থ্যবান সন্তানের ব্যবস্থা করে দিত। কিন্তু সে যে বড় ছোট। ইচ্ছে করলেই অনেক কিছুর ব্যবস্থা সে করতে পারে না। তাই এক সাথে ওর মনে আনন্দ আর কষ্ট। আরও একটা কষ্ট, আজও টুসি স্কুলে যেতে পারল না। ফেরার পথে কুটুম টুসিকে বলল, স্কুলে চলো, রেডি হওনি যে?
: আজ যেতে পারব না কুটুম।
: সে কী এভাবে স্কুল কামাই করলে তোমার রেজাল্ট খারাপ হয়ে যাবে। আমি যে বড় আপাকে বলেছি তুমি ভাল রেজাল্ট করবে। তোমাকে যে ফার্স্ট হতেই হবে।
: আজ যাওয়া যাবে না। আজও আমাকে অনেক ঠোঙা বানাতে হবে। মুন্নার ওষুধ ফুরিয়েছে। ঠোঙা ডেলিভারি দিয়ে পয়সা পেলে সে পয়সাতে ওষুধ কেনা হবে।
: কিন্তু স্কুল!
: তুমি ভেব না রেজাল্ট ভালো হবে আমার।
: ভালো না শুধু, তোমাকে ফার্স্ট হতে হবে। আর সেদিন আমরা অনেক ঘুড়ি ওড়াবো। আর তোমাকে আমি সেদিন কী দেবো জানো?। না থাক এখন বলব না।
একথার পর কুটুম টুসিদের ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল। ওর মন ভীষণ খারাপ হয়েছিল। এভাবে টুসি ফার্স্ট হবে কী করে সারাক্ষণ যদি টোঙা বানানো আর ওষুধ কেনার চিন্তা ওর মনে থাকে?
উঠোনে পা ফেলে কুটুম। একইভাবে ধোঁয়া উড়ছে। আর খুক খুক করে কাশছে মহিলারা। কুটুম এগিয়ে যায়।
: আন্টি এভাবে যদি ধোঁয়া হতে থাকে আপনাদের শরীরের ভীষণ ক্ষতি হবে।
: কী করব মা, আমরা গরিব মানুষ তোমাদের মত আমাদের ঘরে গ্যাস নেই। এদিকে রান্নাও তো করতে হয়।
: তা ঠিক, কিন্তু আন্টি ভিজা কাঠ দিয়ে না রেঁধে কষ্ট করে শুকনো কাঠ জোগাড় করে রাঁধবেন। তাতে আপনাদের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। কাশিটা হবে না। আর চারপাশের পরিবেশও ভাল থাকবে। ধোঁয়ায় বাচ্চাদের ক্ষতি হবে না।
: তুমি তো বেশ মেয়ে। তুমি একটা ছোট্ট মেয়ে, কোন এনজিওতে তোমার কাজ করার কথা নয়।
: না আন্টি আমি কোন এনজিওর লোক না। এসব কথা আমি বই পড়ে শিখেছি আর স্যারদের মুখে শুনেছি, আব্বা মাও বলেছেন, টেলিভিশনে দেখেছি। এই যে আপনাদের উঠোনের চারপাশে অনেক মাটির পাত্রে পানি জমে আছে এগুলোর মধ্যে জীবাণু বাসা বাঁধে। ডেঙ্গুর জীবাণুসহ অনেক মারাত্মক রোগ এখান থেকে ছড়ায়। তারপর ছেলে মেয়েরা এই যে যেখানে সেখানে সর্দি কাশি ফেলছে এ থেকেও কিন্তু নানা অসুক বিসুখ হয়। কার শরীরে কি অসুখ আছে কেউ তো তা জানে না। সর্দি কাশি থেকে সেই জীবাণুগুলো বাতাসে ছড়িয়ে অন্যের শরীরে প্রবেশ করে। এগুলো যদি বাচ্চাদের বলে দেন তাহলে ভালো হয়। আমার মা বলেন, ভাল কাজ যিনি করেন মহান আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন।
: মা তুমি বড় ভাল মেয়ে। আর কোন বড়লোকের মেয়েকে এমন দেখিনি। আসলে বড়লোকের ছেলে মেয়েরা আমাদের ছায়াও মাড়ায় না।
ওদের একজন মহিলা এসে কটুমের গায়ে মাথায় হাত বুলায়। কুটুমের খুব ভাল লাগে। কিছুক্ষণ আদর নিয়ে ও এগোয়। হাত নাড়ে। বাচ্চাগুলো আর তার মায়েরা একসাথে হাত নাড়ে। কেউ কেউ বলে, খোদা হাফেজ।
কুটুম স্কুলে আসে। স্কুলে এসেই ও শুনতে পায় অঙ্কের আপা নাকি গুরুতর অসুস্থ। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আছেন উনি। বাঁচবেন কি না সন্দেহ। সবাই আপাকে দেখতে যাচ্ছে। স্কুল ছুিট দিয়ে দেয়া হয়েছে।
অঙ্কের আপা খুবই কড়া। অঙ্ক না পারলে শাস্তি দেন। আবার নিজেই হাতে ধরে সবাইকে শেখান। উনি কখনও ঘণ্টা ধরে ক্লাস নেন না। ক্লাস টাইমের পর ছেলে মেয়েদের জন্য বাড়তি সময় স্কুলে থাকেন। তাছাড়া উনি বলে দিয়েছেন, অঙ্ক শেখার জন্য যে কোন সময়ে যে কেউ অফিস রুমে ওনার কাছে যেতে পারে। যারা অঙ্কে একটু কাঁচা তারা প্রায়ই আপার কাছে গিয়ে অঙ্ক বুঝে নেয়। অঙ্কের জন্য কাউকেই প্রাইভেট টিউটর রাখতে হয় না। আর আশ্চর্যের ব্যাপার উনি এতোটাই সহজ করে শেখান যে কেউ অঙ্কে ফেল করে না। তাই অঙ্কের আপাকে সবাই যেমন ভয় পায় তেমনই পছন্দ করে। এইতো গতকালও অঙ্কআপা অঙ্ক শিখিয়ে গেলেন। শরিফা অঙ্ক পারছিল না বলে তাকে বোর্ডে ডেকে নিয়ে বারবার অঙ্ক করিয়ে শেষাবধি অঙ্কটা করিয়ে তবে ছাড়লেন। অঙ্কটা হলে আপা বললেন, তোর আসলে সমস্যা কী জানিস, তোর সমস্যা হচ্ছে তুই সবই পারিস কিন্তু আগেই ভয়ে নার্ভাস হয়ে যাস। তোর মধ্যে কনফিডেন্সের ভীষণ অভাব। ভয় পাবি না। সব সময় মনে করবি আমি পারব, পারবই। শুধু অঙ্কের ক্ষেত্রে না, জীবনের সব ক্ষেত্রে।
সেই অঙ্ক আপা এমনই অসুস্থ যে বাঁচবে কি না সন্দেহ। ওরা সবাই মলিন মুখে হাসপাতালে গেল। ঢুকবার মুখে বড়আপা বললেন, শোন কেউ হৈ চৈ করবে না। নিঃশব্দে ঢুকবে, কথা বলবে না। ডাক্তার যেমন বলবে তেমনই করবে। দেখতে দিলে দেখবে না দিলে চলে আসবে। মনে থাকবে? রোগীদের ডিস্টার্ব করো না যেন।
ডাক্তার কাউকেই দেখার পারমিশন দিলেন না। আপাকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। ৪৮ ঘণ্টা না কাটলে বোঝা যাবে না অবস্থা কেমন। আপার মেয়ে ডুকরে ডুকরে কাঁদছে। আপার স্বামী গম্ভীর মুখে বসে আছেন। তার চেহারায় রাজ্যের দুঃশ্চিন্তা। বড়আপা মেয়েটাকে সান্ত্বনা দিলেন। আপাকে জড়িয়ে ধরে উচ্চস্বরে কাঁদতে লাগল মেয়েটা। এখন অঙ্ক আপাকে দেখা যাবে না। কাজেই পরে আসতে হবে। বড় আপা ডাক্তারের সাথে কথা বললেন। ডাক্তার আপাকে বললেন, প্রচুর রক্ত লাগবে। এ পজেটিভ রক্ত। নিজেদের মধ্য থেকে দিতে পারলে ভালো হয়।
: আমি ব্যবস্থা করছি।
আপা অন্য আপাদের সাথে বিষয়টা নিয়ে আলাপ করলেন। দেখা গেল একজন মাত্র আপার রক্ত এ পজেটিভ। কিন্তু তিনি অসুস্থ। ছাত্রীদের বয়স কম তাদের কাছ থেকে রক্ত নেয়া সম্ভব না। তাহলে উপায়! বড়আপার মুখ গম্ভীর হলো। তখন কুটুম বলল, আপা একটা কাজ করলে হয় না? আমাদের গার্জিয়ান মানে বাবা মা বড় ভাইবোনদের অনেকের রক্তের গ্র“প এ পজেটিভ হতে পারে। তাদের কাছ থেকে রক্ত নিলেই তো হয়
আপা বললেন, তুমি খুব ভালো বুদ্ধি দিয়েছ তো! এটাই করব। তোমরা সবাই তোমাদের বাবা মাকে বলে রক্ত সংগ্র্রহের ব্যবস্থা করবে। আর আমি আজই স্কুলের তরফ থেকে সবাইকে অনুরোধ জানিয়ে একটা চিঠি দিচ্ছি।
এক সাথে দুই তিনজন হাত তুলে বলল, আমার মায়ের রক্ত এ পজেটিভ, আমার আব্বার রক্ত এ পজেটিভ, আমার ভাইয়ের রক্ত এ পজেটিভ।
বড় আপার মুখে হাসি ফুটল। তিনি বললেন, পৃথিবীতে কোন পেশার লোক সবচেয়ে ভাগ্যবান জানো? জানোনাতো? শিক্ষকরা। কারণ যেখানেই তারা যায় সেখানেই ছাত্রছাত্রীর দেখা পায়। আর ছাত্রছাত্রীদের মাধ্যমে কোন কাজেই তারা পরাজিত হয় না।
বড় আপা ডাক্তারকে বলে এলেন, অতি দ্রুত রক্তের ব্যবস্থা করছেন। তিনি যেন রক্ত নিয়ে চিন্তা না করেন।
কুটুম বাসায় ফিরে এল। বাসায় ফিরে দেখে প্রচণ্ড হৈ চৈ। আব্বার ইলেকশন এগিয়ে এসেছে। পুরো শহর ছেয়ে গেছে প্রার্থীদের পোস্টারে। তার মধ্যে আব্বার পোস্টারও আছে। বাসার সামনে অনেক লোক। তাদের হাতে ব্যানার। মাইকও দেখল দুই তিনটে। লক্ষণ দেখে কুটুম বুঝল এখনই আব্বা কোনো সভা বা মিছিলে যাবেন। ওকে দেখে এগিয়ে এল দুই তিনজন।
: কী মামণি, আব্বা ইলেকশন করছে কেমন লাগছে?
: ভাল, তবে ইলেকশনে জিতে মানুষের উপকার করলে আরো অনেক ভালো লাগবে। মানুষই তো ভোট দিয়ে আব্বাকে নির্বাচিত করবে তাই না!
ওরা পরস্পরের দিকে তাকাল। কুটুম আর কথা না বলে বাড়িতে ঢুকল। ওর মন ভাল না। একদিকে মুন্নার অসুখ, অন্য দিকে অঙ্ক আপার অসুখ। আব্বা মাকে জিজ্ঞাসা করে জানতে হবে তাদের রক্তের প্র“প কী। তবুতো অঙ্কের আপার রক্তের একটা ব্যবস্থা হবে। কিন্তু আনু খালার কিডনির কী হবে? কুটুমের কপালে কয়েকটা ভাঁজ পড়ল। ও চিন্তা করলেই কপালে ভাঁজ পড়ে। একদিন দেখে মা বলেছিলেন, কিরে তুই এতটুকু মেয়ে কপালে ভাঁজ ফেলেছিস কেন?
: ফেলিনিতো পড়েছে।
: একবার অভ্যেস হয়ে গেলে কিন্তু আর ছাড়াতে পারবি না। কপালে ভাঁজ ফেলবি না খবরদার। কপালে ভাঁজ পড়লে দেখতে খুব খারাপ লাগে। মানুষ ভাবে তুই বুঝি বিরক্ত হয়ে আছিস। চেহারায় বিরক্তি থাকলে মানুষ পছন্দ করে না।
সেই থেকে কপালে যাতে ভাঁজ না পড়ে সে ব্যাপারে সচেতন কুটুম। মা যা অপছন্দ করে তা সে করতে চায় না। কিন্তু তারপরও আজ কপালে ভাঁজ পড়ল। তবে একটা কথা মনে করে সাথে সাথে কপাল থেকে ভাঁজ সরে যায়। হেসে ওঠে ওর চোখমুখ। ছোটখালাকে তার খুব দরকার। দ্রুত মার ঘরে ঢোকে কুটুম। ম্লানমুখে গালে হাত দিয়ে বসে আছে ছোটখালা।
: খালা তোমাকে একটা জিনিস দেব। তুমি আমাকে কী দেবে বলত?
: আগে বল কী দিবি?
: একটা ছেলে।

দশ.
আনু খালার শরীর ভীষণ খারাপ। ডাক্তার বলে দিয়েছে দেরি না করে কিডনির ব্যবস্থা করতে। আর তা যদি না হয় ডায়ালিসিস করতে হবে। সেটা যেমন কষ্ট তেমনই টাকা খরচ। মাসে চল্লিশ পঞ্চাশ হাজার টাকা লাগে। বড়লোকেরাই এ চিকিৎসা করাতে পারে না আর আনু খালা তো নিতান্তই গরিব। মার মনও খারাপ। কিডনি এমন একটা জিনিস যা চাইলেই পাওয়া যায় না। আর পেলেও নাকি ম্যাচিংয়ের ব্যাপার আছে। তবে কি আনু খালা চোখের সামনে ধুঁকে ধুঁকে মারা যাবে? কুটুমের কিছু ভালো লাগে না।
অঙ্কের আপা সুস্থ হয়ে বাড়ি এসেছেন। দু চারদিনের মধ্যেই স্কুলে আসবেন। ওনাকে যেদিন হাসপাতাল থেকে বাড়িতে আনা হল তার মেয়ের সে কী আনন্দ! একবার হাসছিল একবার কাঁদছিলো। বারবার বড়আপাকে বলছিল, আপা আপনাদের জন্য আমার মা বেঁচে গেল।
: আমাদের জন্য না, আল্লাহ বাঁচিয়েছেন।
: সেতো ঠিকই কিন্তু আপনারা না থাকলে, বিপদের দিনে পাশে না দাঁড়ালে ওর মাকে কিছুতেই বাঁচানো যেত না।
মেয়ের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলেছিল ওর বাবা।
শেষদিকে এমন হয়েছিল যে আপার আর রক্তের প্রয়োজন নেই জেনেও সবাই রক্ত দিতে চাচ্ছিল। সত্যি এভাবে যদি সব মানুষ সবার পাশে এসে দাঁড়াত তাহলে পৃথিবীতে কোন দুঃখ যন্ত্রণা থাকত না।
মুন্নাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসেছে ছোটখালা। ওকে নিয়ে অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই ব্যাঙ্ককে যাচ্ছে খালা খালু। ডাক্তার আশ^াস দিয়েছে চিকিৎসা করলে মুন্না ভাল হয়ে যাবে। ছোটখালার মুখে হাসি ধরে না। এক মুহূর্তের জন্যও মুন্নাকে খালা কাছছাড়া করে না। আর মুন্নার আসল মা আমেনা খালার অবস্থা মর্মান্তিক। চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে সেদিন ছোটখালার দেয়া কাগজপত্রে স্বাক্ষর করেছিল। এক ফোঁটা চোখের পানি ফেলেনি। শুধু হাপুস নয়নে কেঁদেছিল টুসি আর তুলি। পরদিন টুসি কুটুমকে বলেছিল, জানো কুটুম মা কাল সারারাত আচড়ে পিছড়ে কেঁদেছে। খুঁটিতে মাথা ঠুকে কপাল ফাটিয়ে ফেলেছে।
: কিন্তু ওকে দেয়ার সময় তো খালা কাঁদেনি।
: কাঁদেনি কারণ কাঁদলে ওকে দিতে পারত না। আর না দিলে ওর চিকিৎসা হতো না ও ভালো হতো না। আমরা গরিব। ওকে খাওয়ানোর পয়সাই আমাদের নেই। তাতে চিকিৎসা।
শেষদিকে ওর গলা ধরে এসেছিল। তারপর ভয়ে ভয়ে বলেছিল, আচ্ছা কুটুম আমি যদি মাঝে মাঝে তোমাদের বাড়িতে যাই ভাইকে কি একটু দেখতে পাবো? শুধু একনজর চোখের দেখা? তুমি যদি বল লুকিয়ে দেখব। ওকে হারিয়ে ঘরটা কেমন খা খা করছে।
এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারেনি কুটুম। ও তো জানে না টুসি গেলে ছোটখালা কী বলবে, কিভাবে নেবে। কুটুমকে চুপ করে থাকতে দেখে টুসি যা বোঝার বুঝে নিয়েছিল। আর কিছু বলেনি। কিন্তু টুসির মুখের দিকে তাকিয়ে, ওর কথা শুনে কুটুমের চোখে পানি এসে গেছিল। সেই সময়ে ওর শুধু একটা কথাই মনে হয়েছিল, মুকুটকে ছেড়ে সে একবেলা থাকতে পারে না। মুন্নাকে ছেড়ে টুসি থাকবে কী করে?
কুটুম মাকে খুঁজতে থাকে। রান্নাঘরে রান্না করছেন মা। কুটুমকে দেখে বলেন, সকাল থেকে ছিলি কোথায় বলত? এদিকে আনু বুবুর শরীরের যা অবস্থা। ওর কাছে খানিকক্ষণ বসে থাকলেও তো পারিস। আমি তো মরারও সময় পাই না। মিনিটে মিনিটে চা নাস্তা ভাত ডাল তরকারি চলছেই। সারা জীবনের যা সঞ্চয় ছিল সবই তো শেষ করে দিল। গাদা গাদা সিগারেট, গাদা গাদা পান। কর্মীদের প্রতিদিনের খরচ। অজস্র টাকার ব্যাপার। কে যে তোর আব্বাকে ইলেকশনের বুদ্ধিটা দিয়েছিল! বড় সুখে ছিলাম আমরা। কী যে হবে কে জানে!
: মা আনু খালার কিডনির কী ব্যবস্থা হবে?
: তাই তো ভাবছি, কোন উপায়ই তো দেখছি না।
: কিন্তু মা ইলেকশনের পেছনে এত টাকা খরচ না করে সে টাকা দিয়ে আনু খালার জন্য একটা কিডনি জোগাড় করলেই তো হত। মানুষ মরে যাচ্ছে আর তোমরা ইলেকশন করছ।
মা অবাক হয়ে তাকান। কোন জবাব দেন না।
: মা আব্বাকে বলো আনু খালার জন্য একটা কিডনি জোগাড় করতে।
: তুই বল না।
: তাই বলব, এক্ষুনি বলব।
কুটুম বাইরের ঘরের দিকে যায়। কে জানে আব্বা এতক্ষণে বেরিয়ে গেছেন কি না। হ্যাঁ আব্বা ঠিকই বেরিয়ে গেছেন। মিছিল হবে। আব্বা সবার সামনে দাঁড়ানো। তাকে ঘিরে অনেক লোক। কুটুম ভিড় ঠেলে আব্বার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। সবাই ওকে জায়গা করে দেয়।
আব্বা অবাক হয়ে বলেন, তুমি এলে কেন হঠাৎ?
: আব্বা আনু খালার জন্য একটা কিডনির ব্যবস্থা করে দাও।
সবাই অবাক হয়ে তাকায়। আব্বা বিরক্তি মাখানো কণ্ঠে বলেন, তুমি ঘরে যাও। এ বিষয়ে পরে কথা হবে।
: না আনু খালার অবস্থা খুবই খারাপ। দ্রুত কিডনি দরকার। তুমি যদি কিডনির ব্যবস্থা না করো আমি কিন্তু আমার কিডনি দিয়ে দেব খালাকে।
মিছিল চলতে শুরু করেছিল। আব্বা থমকে দাঁড়ান। সাথে সাথে পেছন থেকে কিছু লোক তার গায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে। আব্বা টুসির মাথায় হাত দিয়ে বলেন, বাসায় যাও মা। তুমি ছেলেমানুষ এসব বিষয় নিয়ে তোমার না ভাবলেও চলবে।
: বড়রা ভাবছে না যে! আমি কিন্তু আমার কিডনি দিয়ে দেব।
: ও চিন্তা বাদ দাও। আচ্ছা আচ্ছা দেখা যাবে।
: দেখা যাবে না, বলো ব্যবস্থা করবে।
: ঠিক আছে ইলেকশনে যদি জিতি।
কুটুম ঘরে এসে আনু খালার পাশে বসে ওর মাথায় হাত বুলাতে থাকে। মুখে তুলে পানি খাওয়ায়। ওর মন খুব ভাল হয়ে যায়।
দিন কয়েক পরের কথা। ইলেকশনের রেজাল্ট হয়েছে। প্রচুর ভোটে জিতেছেন আব্বা। সবার মুখে হাসি। বাড়িতে আনন্দের বন্যা। আনু খালার পাংশু মুখেও হাসি। ক্ষীণ কণ্ঠে বলেন, আমি জানতাম ভাইজান জিতবে, সব মানুষ ওনাকে ভোট দেবে। ওনার মত মানুষ হয় না।
মালা হাতে একের পর এক লোক আসছে। ফুলের মালায় মালায় এখন আর আব্বাকে দেখা যাচ্ছে না। কুটুম বাইরের ঘরে ঢোকে। জোরে ডাকে, আব্বা!
: কিরে মা?
: তুমি বলেছিলে জিতলে আনু খালার জন্য কিডনির ব্যবস্থা করবে।
: করবই তো। আমি আমার মাকে কথা দিয়েছি। কথা আমি রাখবই। খুব তাড়াতাড়ি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে আনু বুবুর জন্য কিডনি জোগাড় করব।
: কিন্তু টাকা?
: সে চিন্তা আমার।
পনের দিনের মাথায় আনু খালার অপারেশন হল। নতুন কিডনি লাগিয়ে বাড়ি ফিরল আনু খালা। অবাক চোখে চারদিকে তাকাতে তাকাতে বলল, ভাবিনি বাঁচব, কী কাণ্ড।
: কাণ্ড আমাদের নয়, তোমার কুটুমের। আব্বা বললেন।

আজ পরীক্ষার রেজাল্ট হয়েছে। নোটিশ বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে আছে কুটুম আর টুসি। কুটুম বরাবরের মত ফার্স্ট হয়েছে। টুসির রেজাল্ট খুঁজছে কুটুম। নিচ থেকে উপরে উঠছে ও। পাচ্ছে না পাচ্ছে না। তবে কি টুসি ফেল করেছে? ঘামছে কুটুম। আবার নিচ থেকে উপরের রোলগুলো পড়তে থাকে। পড়ছে পড়ছে। একেবারে উপরে চোখ গেল ওর। হুররে তুমিও ফার্স্ট!
হাত ধরাধরি করে রাস্তায় হাঁটছে ওরা। দু’জনের হাতে বেলুন। নিজের কাঁধ থেকে টুসির কাঁধে নতুন একটা স্কুল ব্যাগ ঝুলিয়ে দেয় কুটুমÑ তোমার পুরস্কার।
ওরা খোলা মাঠের পাশে এসে দাঁড়ায়। দুটি হাত এক করে দু’হাতের চারটি বেলুন ছেড়ে দেয় আকাশে। বেলুন উপরে ওঠে, আরও উপরে। ওরা হাসতে থাকে হা হা হি হি।

 

SHARE

2 COMMENTS

Leave a Reply