Home গল্প প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয়

প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয়

ঝর্না দাশ পুরুকায়স্থ…

পিন্টোর ঢাকা সফর
নীলু ডাকল, জাম্পু, ও জাম্পু- কোথায় তুমি? মায়ের ডাকে সাড়া দিয়ে ডাইনিং টেবিলের কাছাকাছি আসে সে।
– এ্যাই, জাম্পু নামটা কে রাখল রে?
– ধ্যেৎ, এটা কোনো নাম হলো নাকি?
– নামটার মানে কী রে?
মামাবাড়িতে আসার পর একসঙ্গে তিনটি প্রশ্ন শুনে বোকা বোকা হয়ে যায় সে।
নীলু বলে, বাদ দাও তো ভাইয়া- হাম্পু, জাম্পু, কাম্পু- নাম একটা হলেই হলো।
বাংলা শব্দ নিয়ে খুব ভাবেন মেজভাইয়া। বলেন, সে তুমি বললে হবে না নীলু। নামের একটা মানে থাকবে না- তা কি হয়?
নীলু জাম্পুর মা লজ্জা পেয়ে বলে, ওর নাম তো পিন্টু মেজভাইয়া।
– ওহ, হ্যাঁ, হ্যাঁ মনে পড়েছে এবার।
সেই ছোটবেলায়, যখন সে পিচ্চি ছিল, এইটুকুন কাঁথার ওপর শুয়ে, রঙিন টাওয়েলে ছোট্ট শরীর ঢেকে সারাক্ষণই খাটে দুমদাম আওয়াজ করত। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঘুমোবার সময়টুকু ছাড়া চিৎকার করে কাঁদত। সব কিছুতেই ওর রাগ। দুধের বোতল মুখে ধরলে, টিভিতে ছবি দেখে, ডিভিডিতে গান শুনলে- সব কিছুতেই চিৎকার, সব সময় বাবুর গোসসা।
রুনুমামু সে সময় কম্পিউটারে পিন্টোকো ‘কিউ গোসসা আতে হে’ ছবিটি দেখেছে, মামু বলেছে, কি রে পিন্টো, তোর এতো গোসসা কিসের?
সেই থেকে ওর নাম হয়েছে পিন্টু। মামু অবশ্য বলে, এই পিন্টু নয়, পিন্টো পিন্টো।
সে যাহোক পিন্টোর তিন মামাই থাকেন ঢাকায়, গাঁয়ের বাড়ি বিক্রমপুরে। সেখানে তেমন যাওয়া হয় না। পিন্টোরা থাকে সিলেট শহরের তালতলায়, আব্বু ব্যবসায় করেন সেখানে। ব্যবসার কাজে ঢাকায় আসার সময় সঙ্গে নিয়ে এসেছেন- পিন্টো, আম্মু নীলু আর পিন্টোর ছোটবোন বুবলিকে।
খুব মজা তাই পিন্টোর। ওর ক্লাসের বন্ধুরা পরীক্ষা শেষ হলে ছুটিছাটায় বেড়াতে যায়।
সুন্দরবন, সেন্টমার্টিন, হিমছড়ি, সোনারগাঁ। ওদের কোথাও যাবার সুযোগ হয় না। আব্বু সব সময় ব্যবসায় নিয়ে ব্যস্ত। কোনো কোনো বন্ধু, যেমন তোজো, টিটো ওরা দু-একবার ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডাও গেছে। কতো অবাক করা গল্প বলে ওরা। রোদে ভরা সোনালি রঙের সকাল হলেই বিদেশীরা ‘সানি ডে’ ‘সানি ডে’ বলে খুব আনন্দ করে। এমনিতে বেশির ভাগ সময় ঝিরঝিরি বৃষ্টি থাকে, শীতের সময় পেঁজা তুলোর মতো বরফ ঝরে, রাস্তা- বাড়ির সামনের জায়গা- সব দুধের মতো সাদা হয়ে যায়। ঠাণ্ডায় শরীর প্রায় জমে যেতে থাকে। ঘরে ঘরে হিটার থাকে বলে রক্ষে।
– বিদেশে গোসল কিভাবে করি জানিস?
– কিভাবে রে, কিভাবে?
– বাথটাবে।
শান্ত জিজ্ঞেস করে, বাথটাব কী রে? চৌবাচ্চা?
– দুর বোকা, হ্যাঁ চৌবাচ্চার মতোই বলতে পারিস। তবে অনেক ডিজাইন করা গোসলের জায়গা। লিকুইড সাবানের ফেনা তুলে ইচ্ছে মতো শুয়ে থাকো। কী আরাম! জানিস বাথটাব থেকে উঠতেই ইচ্ছে করে না।
তোজোর গল্প শুনে অবাক হয়ে পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকে পিন্টো। ওখানে অবশ্য সবাই জাম্পু বলেই ডাকে। শুধু খেলায় নয়, স্কুলে যাবার সময়, আনন্দ হলে, বাড়িতে সন্দেশ মিষ্টি এলে- পিন্টো দারুণ লাফায়। জাম্প দেয় বলে আম্মু নীলুই আদর করে ডাকে জাম্পু বলে। বন্ধুরা, পাড়ার চেনা-জানা সবাই তাকে ও নামেই জানে।
ওর হাঁ করা মুখের দিকে তাকিয়ে টিটো বলে, মুখ বন্ধ কর না জাম্পু, ভেতরে যে মশা-মাছি, হাতি, ঘোড়া ঢুকে যাবে।
অবাক হয়ে না দেখা বিদেশের গল্প শুনতে গেলেই ওরা এমন হাসাহাসি করে। বলে, জানিস জার্মান দেশে পিঁয়াজুকে কী বলে?
বন্ধুদের অবাক চোখের দিকে তাকিয়ে পলাশ বলেছে, ডালের বড়াকে ওরা বলেÑ ফালাফাল। তার মানে তুই।
পিন্টোর দিকে আঙুল তুলে বলে, তুই যে সব কিছুতে ফালাফালি করিস, জাম্প দিস তোর নামেই পিঁয়াজুর নাম হয়েছে জার্মান দেশে।
পিন্টোর স্কুলের নাম- রম্য শাহীন। শাহীন বলে ওকে ডাকতে পারে, রম্য নামটি কি খারাপ? নাহ, তবু ও নামে কেউ ডাকবে না, যে নাম নিয়ে মন খারাপ হয়, কষ্ট হয়, অন্যের সামনে লজ্জা পায়- সে নামটিই ক্লাসমেটরা বেশি করে বারবার বলে।
না হয় বিদেশে যাইনি, নায়েগ্রার জলপ্রপাত, বার্লিন ওয়াল, স্ট্যাচু অব লিবার্টি দেখিনি, মানছি তোমরা ক’জন দেখেছ, তাই বলে কি তোমাদের মাথায় শিং গজিয়েছে? এত হা হা করে হাসো কেন?
দ্যাখো আমিও তোমাদের মজার মজার গল্প শোনাব একদিন- যা শুনে তোমরা সবাই হাঁ করে থাকবে, তোমাদের মুখের ভেতর হাঁস, মুরগি, হাতি, ঘোড়া ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ ব্যাঙ, টিক টিক করা টিকটিকি, আরশোলা সব ঢুকে যাবে। এসব ভাবতে গিয়ে একা ঘরে মিটিমিট হাসে জাম্পু।
মামাবাড়িতে আসা নিয়ে তাই খুব থ্রিল ছিল জাম্পুর। ঢাকায় মামাবাড়ি ক’জনের আছে?
রুনুমামু মানে ছোটমামু কী চমৎকার গান করেন, মিষ্টি মিষ্টি সুরে গান-
বাড়ির পাশে আরশিনগর
সেথা কে পরশি বসত করে-
আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।
– মানেটা কী মামু?
রুনুমামু বলেছেন,- ব্যাপারটা বোঝো নাই ভাগ্নে, পাশের বাড়ির মানুষকে আমি একদিনও দেখিনি। অথচ সে আমার পাশেই থাকে। বেশ জুৎসই একটি কথা মাথায় চলে এল। তোজো পলাশ টিটোকে বলবে, মাই ডিয়ার ফ্রেন্ডস- শুধু বিদেশের গল্প শোনাও- নিজের দেশে কী আছে তা তো ভালো করে জানো না। ছি: ছি: তোজো- শেম অন ইয়ু। লজ্জার কথা।
কল্পনায় ওদের ফ্যাকাসে মুখগুলো মনে করে হাসতে থাকে জাম্পু। এবার মজাটা টের পাওয়াব তোমাদের। ঢাকা ট্যুরটা শেষ করে ফিরে আসি।
কিন্তু খুশির প্ল্যানটা ভেস্তে গেল।
মেজমামু ওর নামের চুলচেরা বিচার করতে বসলেন। জাম্পু, জাম্পু এটা কোনো নাম হলো রে নীলু?
শুনে শুনে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন আম্মু। গম্ভীর গলায় বলেন, না না মেজভাইয়া ওকে আমরা আদর করে জাম্পু বলে ডাকি। যখন তখন জাম্প দেয় তো তাই। ওর নাম এখন থেকে পিন্টু।
– পিন্টু নয় নীলু, উচ্চারণ ঠিক করো বলো পিন্টো, পিন্টো। শুধু উচ্চারণের কথা ভাবতে শেখো নীলু।
নাম নিয়ে যে একটা টালবাহানা চলছে তা আব্বু ভালো করেই বোঝেন। বলেন, ওকেÑ নো প্রবলেম। পিন্টো পিন্টো নট পিন্টু।
নানী বললেন, ওকে আমি জাম্পু বলেই ডাকব, অসুবিধেটা কী শুনি? কী চমৎকার লাফ দেয়। হাই জাম্পে বাঁদরটা নিশ্চয়ই ভালো করে।
নানীর জাম্পু আর সবার পিন্টো হয়েই চারদিন কেটে যায় ওর। বেশ ভালোই লাগে ঢাকার সকাল, দুপুর, সন্ধ্যে রাত। পড়া নেই, স্কুল নেই, হোমওয়ার্ক নেই, বাড়িতে পড়াতে আসা টিচারের চোখরাঙানি নেই। এর মাঝে বাড়ির গাড়ি চড়ে মেজমামু, রুনুমামুর সাথে ঘুরে ঘুরে সংসদ ভবন, শিশুপার্ক, রমনাপার্ক, শিশু একাডেমী, হাইকোর্ট দেখে বেড়ায়, বেশ কাটে দিনগুলো মামাতো ভাইবোন অথৈ, আরাধ্য, এবলু, ডাবলুর সঙ্গে।
ড্রাইভার প্যাঁ পু প্যাঁ পু করে হর্ন বাজায়। কত কিছু দেখল আর জানল পিন্টো। এবার বাড়ি ফিরে পাবলো তোজো টিটো পলাশÑ ওদের সামনে উল্টে দেবে গল্পের ঝুড়ি। শুধু তোমরাই গল্প বলতে পারোÑ আমি পারি না?
বড়মামার বিশাল বাথরুমে দেখেছে সে গোলাপি রঙের নকশা করা বাথটাব। লিকুইড সাবানের উপচে পড়া সুগন্ধি ফেনায় একদিন ওকে শুইয়ে দিয়েছেন নানী।
Ñ ও নানী, আমার ভয় লাগে, ডুবে যাব, ডুবে যাবÑ বলে প্রথমে চ্যাঁচামেচি করে। বাথরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে এবলু ডাবলু আরাধ্য ওরা হেসে কুটিকুটি হয়।
খানিকক্ষণ পর অবশ্য ধাতস্থ হয়ে গেছে সে। ইসস কী আরাম! ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে। গোসলের এই দুপুরটাকে কক্ষনো ভুলবে না পিন্টো।
সিলেট শহরে সবার বাড়ির পেছনে একটি করে পুকুর। প্রথম বর্ষার এই মেঘলা আর ঝিরিঝিরি বৃষ্টির দিনে কচুরিপানায় আর হেলেঞ্চায় ভরে যায় সারা পুকুর। অগুণতি ব্যাঙাচি খেলা করে পুকুরে। পানি হালকা সবুজ রঙের হয়ে ওঠে।
এ সময় থালা-বাসন-ডেকচি কিছুই ধোয়া হয় না পুকুরে। গোসল করা দূরে থাকুক, বিকেলে মাঠ থেকে খেলে এসে পা পর্যন্ত ধোয় না পিন্টো। এ সময় তোলা পানি দিয়ে সব কিছু করা হয়।
যখন অঝোর ধারায় বৃষ্টি ঝরে, সারি সারি পুকুর বর্ষার পানিতে উপচে পড়ে, চারদিকে শুধু টলটলে পানি, ত্রিকোণ জাল নিয়ে জেলেরা ভিজে ভিজে পানিতে মাছ ধরেÑ তখন জানালার কাছে বসে পিন্টো কাগজের নৌকা ভাসায়, কখনো বা মোচার খোলের নৌকা ভাসিয়ে দেয়। মেঘলা দিনগুলো খুব মজার হয়ে ওঠে।
সে চমৎকার ছবি, অবশ্য ডাবলু এবলু ওরা কখনও দেখেনি। শ্রাবণের শেষে কিংবা ভাদ্রের মাঝামাঝি যখন দিনভর রাতভর বৃষ্টি আর হয় না, পুকুরের চারপাশ ভেসে ওঠে, কচুরিপানা ভেসে যায় পানির তোড়ে, ব্যাঙাচিরা হয়তো বড় হয়ে ডাঙায় লাফালাফি করেÑ তখন আবার টলটলে হয়ে ওঠে পুকুরের পানি। বাঁশ আর তক্তা দিয়ে ঘাট বাঁধা হয় নতুন করে। পিন্টোর তখন মনে হয়, সারাক্ষণ গোসল করি, সারাটা বিকেল হাত-পা ধুই এই টলটলে ছলছলে পানিতে।
এখানে অবশ্য বাথটাব ছাড়াও সব বাথরুমে হ্যান্ড শাওয়ার রয়েছে। শাওয়ারটি হাতে নিয়ে সারা শরীরে পানি ছিটিয়ে দাও। ব্যাপারটি খুব মজার।
তালতলার বাথরুমে মাথার ওপরে রয়েছে শাওয়ার। গ্যাঁট হয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকো, মাথার ওপর ঝিরঝিরিয়ে পড়বে পানির ছিটে। ভাবনাটা এলোমেলো হয়ে যায় নানীর উঁচু গলার কথায়। রুনু, এ্যাই রুনুÑ কোথায় গেলিরে? ডাকলে যদি কাউকে পাওয়া যায়।
Ñ জি আম্মা।
Ñ শোন শনিবার রাতের ট্রেনে তো ওরা চলে যাবে। দুটো নারকেল, এক কেজি চালের গুঁড়ো আর চার লিটার দুধ নিয়ে আসিসÑ পিঠে করব।
পিঠের কথা কানে গেছে পিন্টোর। কিন্তু কোন আনন্দের ঢেউ জাগল না বুকের ভেতরটায়। শনিবার রাতে ওরা কমলাপুর স্টেশনে যাবে, স্টেশনের উজ্জ্বল আলো আর ফেরিওয়ালাদের চিৎকারের মাঝে ডুবে যাবে পিন্টোÑ সে কথাটিই মনে উথাল পাথাল করতে থাকে। কিন্তু থাকার উপায় নেই, রোববারেই আব্বুর জরুরি কাজ রয়েছে।
বড় মামু বলেছেন, হ্যাং ইয়োর জরুরি কাজ রফিক। আরও দু’চারটে দিন থেকে যাও, নীলুর তো আসাই হয়নি।Ñ পিন্টো আর বুবলিকে কতদিন পর পেলাম। রফিক আমতা আমতা করেন, বড়ভাইয়া, পিন্টোর স্কুল রয়েছে যে।
পিন্টু তড়িঘড়ি করে বলে, স্কুলে এখন তেমন পড়াশোনা হয় না আব্বু, ক’দিন পরই তো রমজানের ছুটি। ছেলের পড়াশোনায় একদম মন নেই। সারাদিন পাখির বাসা, পিঁপড়ের ডেরা খোঁজা, বল আর ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে সারা বিকেল মাঠে দৌড়ঝাঁপ করা, এরপর স্কুল বাদ দিলে আরও পিছিয়ে যাবে পিন্টো। রফিকের মুখে একথা শুনে নানী বলেন, না না, এভাবে থাকা ঠিক নয় নীলু। তবে ঈদের ক’দিন আগেই চলে আসবে, যাতে আমাদের পিন্টো এনজয় করতে পারে। কী বলো জাম্পু সাহেব?
নানী স্কুল টিচার ছিলেন, ইতিহাস আর বাংলা সাহিত্য পড়াতেন। তার কাছে পড়াশুনা আগে এরপর সব কিছু।
সবাইকে লুকিয়ে বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কিছুক্ষণ কাঁদে পিন্টো। মনে মনে ঠিক করে আমি যখন নানু, আব্বু আর মামুদের মতো বড় হব- তখন ছোটরা যা চাইবে- তাই দেব। ছোটরা যা বলবে, তাই শুনব।
পিন্টোর মনের এই প্রতিজ্ঞাটি কেউ জানতেও পারল না। জানল শুধু আকাশের মেঘ আর নিঝুম রাত।

উদাস বাউল আষাঢ়
চারটে দিন বেশ মেঘলা ছিল। মনমরা, ভেজা ভেজা আষাঢ়। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে পিচঢালা পথভেজা। পিন্টোর মনের সাথে পাল্লা দিয়ে একটানা অঝোর ধারায় কাঁদছে আকাশ শুক্রবার বিকেল থেকে।
নানী পিঠে বানানো নিয়ে ব্যস্ত। পাটিসাপটা, পুলি, তার চৈতি পিঠে। সাথে গোলাপি রঙের ঘন দুধ। ইসস কী মজাদার খেতে!
বিকেল থেকে জমাটি আসর বসেছে। ঢাকার মানুষ কি আর বৃষ্টিকে পরোয়া করে? আমরা কি রফিক সাহেবের মতো গাঁও-গেরামের মানুষ যে, একটু বৃষ্টি হলো মোলায়েম কাঁথা গায়ে দিয়ে দে ঘুম। আলসে কোথাকার। কথাগুলো রুনুমামুর। এসব কথা একশ বার বলতেই পারে মামু, কারণ রফিক সাহেব- পিন্টোর আব্বু তার দুলাভাই।
লাজুক হাসি মুখে লেগে আছে রফিক সাহেবের। না না রুনু, ভুল বললে, তুমি। সিলেট একটা বিভাগ, মাইন্ড ইট, মোটেও গাঁও- গেরাম নয়।
বারিধারা থেকে নীলুর বড় বোন মীলুও এসেছেন। খুব মজা! জমজমাট ফ্ল্যাটটি, বাইরে জুঁইফুলী বৃষ্টি। ডাইনিং টেবিলের ছোট ছোট বাটিতে ঘন দুধ, চিতে পিঠে ডুবিয়ে ডুবিয়ে খাও।
মীলুখালার ছেলে মিলকী বলল, এবার গল্প বলার আসর শুরু করো।
ঘন আঁধার আষাঢ়ের রাতে দু’বার বাতি নিভে গেল। জেনারেটর ছিল, তাই রক্ষে। তবে ইন্টারকমে দারোয়ান জানাল, এবার কারেন্ট গেলেও বাতি আর জ্বলবে না, কারণ জেনারেটরের তেল ফুরিয়ে গেছে। লে বাব্বা: হালুয়া। পিন্টো ভাবে খুব ভালো, অন্ধকারে সবাই বসে থাকো, এবলু ডাবলু পিল্টো মিলকী সবাই ছুটোছুটি করছে।
কখন হাত-পা ভাঙ্গে কে জানে! হ্যাঁ, গল্প শুরু করলে শান্ত হয়ে বসবে। অথৈ, আরাধ্য চুপচাপ বসে আছে গালে হাত দিয়ে।
যে পারো শুরু করো। ভূতের গল্প? না, না ভূতের গল্প বলে আর ভয় ভাঙিয়ে দিয়ো না তো!
সায়েন্স ফিকশন? না না- তাও নয়। সিরিয়াস গল্প আজ রাতে নয়, শুধু মজার গল্প। কে বলবে?
বড় মামু মেজমামু রুনুমামা রয়েছেন, আছেন মীলুখালা। কে বলবে গল্প? স্টার্ট করো।
বড়মামু চেঁচিয়ে বলেন, ডিনারে আজ কী খাব আম্মা?
নানী সামনে এসে বলেন, মুগ ডালের খিচুড়ি, ডিম ভাজি, বেগুন ভাজি আর মুরগি ভুনা। কি খুশি তো?
– ফ্যানটাস্টিক আম্মা।
পিন্টো বলে, গল্পের কথা তোমরা ভুলে গেছ? গল্প বলো। মিলকী বলল, কে বলবে? জলদি বলো। দাদী তুমি বলবে? পিন্টো বলে, আজ নানী গল্প বলবে।
মীলু খালা হাসতে হাসতে বলেন, আম্মা বলবে, বলিস কি রে?
তোজো বলে, কেন? যে রাঁধে সে কি চুল বাঁধে না? নানী চিতৈ পিঠে পুলি পিঠে করেছে বলে কি গল্প বলতে পারবে না?
পিন্টো তোজো টিটো মিলকী নানীকে এনে বড় সোফাতে বসিয়ে দেয়। আরাধ্য বলে, প্লিজ দাদী শুরু করো।
– করিস কিরে? ফেলে দিবি যে, বুড়ো বয়সে আর হাড়গোড় ভাঙিস না দাদু ভাইরা।
বড়মামু বলল, আম্মা শুরু করে দাও, নইলে এ বিচ্ছুর দল তোমাকে ছাড়বে না।
দাদী-নানী কথা শুরু করেন স্নিগ্ধ সুরে।
– আমি রূপকথার গল্প জানি কিন্তু তোমরা তেপান্তরের মাঠ, ব্যাঙমা-ব্যাঙামী, সোনার কাঠিÑরূপোর কাটি, ময়ূরপঙ্খি নৌকা- এসব গল্প তো শুনতে চাও না। কিন্তু জানো রূপকথার গল্প স্বপ্ন দেখতে শেখায়, কল্পনাশক্তি বাড়িয়ে দিতে পারে।
মিলকী খুব পাজি ছেলে, বলে- ঝেড়ে কাশো নানী। সবার হাসির মাঝে নানী বলেন, এই তোরা থাম থাম। বলছি- একদম সত্যি গল্প। সত্যি গল্প শুনতে চাস?
– সত্যি গল্প? ওফ ফ্যানটাস্টিক।
তোজো বলে, সত্যি গল্পই ভালো নানু। আব্বু তো টিভিতে আমাদের সিরিয়াল দেখতে দেয় না। বলে, সংবাদ আই মিন- খবর হলো সবচেয়ে সত্যি। তাইতো আব্বু সারাদিন খবর শোনে। নো নাটক, নো সিরিয়াল- কিছু না- তাই না আম্মু?
নীলু বলল, একদম চুপ কেউ কথা বলবে না, সত্যি কথা শুনতে চাও তো কথা বলা বারণ।
– ওকে ফুফ্ফি।
দাদী-নানী শুরু করেন, অনেক আগের ঘটনা, খুব সম্ভব সেভেনটি সিক্সের কথা। কুমিল্লাতে থাকি, তখন অন্য রকম ছিল সব। সকাল-সন্ধ্যা শোনা যেত চেঁচিয়ে পড়া। চেঁচিয়ে না পড়লে কি পড়া হয়? কেউ আস্তে পড়লে ওর আব্বা-আম্মা চেঁচিয়ে বলতেন, কি রে পড়া শুনতে পাচ্ছি না কেন? কী করিস দুষ্টুমি শুরু করেছিস বুঝি? পাড়া-প্রতিবেশী মানে সবাই আপন। কেউ পর নয়। দেখা হলেই- কেমন আছ, পিঠের ব্যথাটা কমেছে তো? ছেলে কি ভার্সিটিতে ভর্তি হতে পেরেছে? মেয়ের বিয়ের কী হলো? সব কিছু না জানলে যেন ভাবনার শেষ হতো না।
সে সময় আব্বা এসে বললেন, রুহীদের বাড়িতে গাঁ থেকে ওদের আত্মীয় এসেছে, একটি বাচ্চার খুব অসুখ। কিছুতেই নাকি সারছে না। আম্মা খুব চিন্তায় পড়ে বলেন, তো ওরা ঢাকা না গিয়ে কুমিল্লায় এলো কেন?
– সে কি ওরা যায়নি? ঢাকায় ডাক্তার দেখিয়ে এসেছে, ওষুধ খাইয়েছেÑ কিছুতেই নাকি রেসপন্স করছে না। বাগিচাগাঁওয়ে একজন হোমিওপ্যাথ ডাক্তার আছেন না- ডা: রবীন রায়, উনাকে দেখাতে এসেছেন, শেষ চেষ্টা আর কী!
শুনে আম্মার মন খুব খারাপ। রেঁধেবেড়ে আমাদের খাইয়ে দুপুরেই তিনি রুহীদের বাড়ি যান। হ্যাঁ দু’মাস থেকে নাকি আট মাসের বাচ্চাটির এ অবস্থা! খেতে চায় না, ঘুমোয় না ঠিকমতো। কেমন যেন নেতিয়ে পড়েছে।
পাড়া-প্রতিবেশী সবার ভাবনা এখন- বাবুসোনাটি ভলো হবে তো! হোমিওপ্যাথ ওষুধ খাওয়ানো হলো, কোনো ডাক্তারই ধরতে পারছে না কী হয়েছেÑ সেটাই সবচেয়ে মুশকিল।
ছোট বাচ্চাদের তো এমনিতেই দেখতে ভালো লাগে, এই বাবুসোনাটা যেন সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। ধবধবে গায়ের রঙ, টানা টানা দু’টি চোখ বড় বড় পাপড়িতে ঘেরা, ভুরু দু’টি কুচকুচে কালো, ওর কথা এতদিন পরও মাঝে মাঝে মনে পড়ে। কী চমৎকার ছিল!
– তারপর বলো, বলো না- কী হলো!
– হ্যাঁ, দু’ ডোজ ওষুধ খাওয়ার পর বাবুসোনাটা হড় হড় করে বমি করল। বমির সাথে কী বেরোল জানো? ছেলে মেয়ে নাতিরা সবাই তাকিয়ে আছে তার দিকে।
– কী বেরোল? কী বেরোল?
নানী কিছুটা আনমনা। কষ্টের স্মৃতিচারণ করলে বুঝি তাই হয়।
– বেরোল একটা টিকটিকির লেজ।
সবাই হতবাক।
– সবে তো খুঁটে খাওয়া শিখেছিল, হাতে-পায়ে গুটি গুটি হামা দিত। মেঝেতে কোন কিছু পেলেই হলো, সবাইকে লুকিয়ে মুখে পুরে দিত। কোনোভাবে হয়তো মরা টিকটিকি পেয়ে খেয়েছিল।
মীলু বলে, টিকটিকি খুব বিষাক্ত। যে কোন সরীসৃপ বা প্রাণী সবার মাঝেই বিষ রয়েছে। সাপ ব্যাঙের মাঝেও গরল রয়েছে। তাই তো আম্মা?
– এরপর কী হলো নানী? কী হলো দাদী?
বুকভাঙা নিঃশ্বাস ফেলে বলেন, রবিন ডাক্তার বললেন, আগে যদি বুঝতে পারতাম বিষাক্ত টিকটিকির জন্য এমন হয়েছে তাহলে অন্য রকম ওষুধ দিতে পারতাম। বিষে বিষ হরণ করে- কিন্তু এখন তো বাচ্চাটা নেতিয়ে পড়েছে। প্রায় দেড় মাস ধরে এ ডাক্তার সে ডাক্তারের কাছে গেছেন ওর মা-বাবা। শেষ পর্যন্ত চলে গেল বাবুসোনা।
আমাদের পাড়ার কারো বাড়িতে সে রাতে আর খাওয়া হয়নি। আব্বা বাড়িতে এসে শুয়ে রইলেন। বললেন, না রে গোলাপ, আমি খাব না, তোরা খেয়ে নে।
আম্মা বারবার চোখ মুছতে থাকেন। আমাদেরও খুব মন খারাপ, টেবিলেই থেকে থেকে নষ্ট হয়েছিল সে রাতের খাবার।
না দেখা বাবু সোনার জন্য সবার মন ভারী হয়ে উঠল। অন্যরকম গল্প এবং সত্যি গল্প।
– দ্বিতীয় গল্প বলো নানু।
অথৈ দাদীর স্টিলের ঝকঝকে পানের বাটা এনে সামনে রাখে। খোপে খোপে খয়ের, মুড়িভাজা, চমন বাহার, শুকনো কমলালেবুর খোসা- কতো কী!
– দ্বিতীয় গল্প আমাদের এক বুবুর। আমি সব সময় বাড়িতে বলি তোমরা সাবধান হয়ে কাজ করো। খাবারের পাত্রগুলো ঢেকে রাখো, মশা মাছি তো বসেই, টিকটিকি, তেলাপোকা- কী নেই আমাদের ঘরের কোণে? একটু সাবধান হলে, ছেলেটাকে একটু দেখলে কি টিকটিকি মুখে দিতে পারতো?
তোজো বলে, সে তো প্রথম গল্পের কথা বলছ দাদী, দ্বিতীয় গল্প শুরু করো।
– এটা আঞ্জুবুবুর গল্প। আমি তখন কলেজে পড়ি। বড় চাচার মেয়ে এক সপ্তাহের জন্য বাপের বাড়ি এসেছে, সঙ্গে বছর খানেকের মেয়ে। সোনা ময়না টিয়া চন্দনা- কোন নাম তার বাদ নেই ওর, ঠিক ফুলের মতো মেয়েটি। ফুল ফুল বলতে বলতে ওর নাম ফুল হয়ে গেল।
ফিরোজা বুয়া এসে মাঝখানে দাঁড়ায়।
– খাইবেন না? রাইতে তো সাড়েদশটা বাজে, মীলু আপা বারিধারা যাইব।
মেজমামু বলল, আজ এই বৃষ্টির রাতে কেউ কোত্থাও যাবে না, সবাই আমরা একসাথে থাকব।
হাততালি দেয় ছোটরা। কী মজা, কী মজা।
নীলু বলে, আঞ্জুখালার কী হলো আম্মা?
নানুর মুখের পান থেকে মৌরী চমনবাহার কমলার খোসার মিশেল গন্ধ ভরিয়ে দিয়েছে সারা ঘর।
নানু বলেন, বাসার সবাইকে বলি সাবধানে থেকো, কেউ তো আমার কথা শোনে না। তো আঞ্জু আপা মেয়েকে যখন খাওয়াতো তখন মনে হতো বিশাল এক উৎসব। গ্লাক্সোর টিন, চিনির বোয়াম, গরম পানির ফ্ল্যাক্স সব শোবার ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে মেয়ের দুধ বানিয়ে বোতলে ভরত। আমরা সবাই চুরি করে গ্ল্যাক্সো দুধের সঙ্গে চিনি মিশিয়ে গপাগপ খেতাম। দুই দিনেই দুধ শেষ। আঞ্জুবুবু আম্মার কাছে নালিশ করে চাচী দ্যাখেন তোÑ আঞ্জু পর্যন্ত ফুলের দুধ খেয়ে শেষ করে ফেলছে।
আম্মা ধমক দিতেন, ছি: ছি: ছি:- ছোটরা খায় সে এক কথা, তুমি কলেজে পড়ো, বোনঝির দুধ চুরি করে খাও কী লজ্জার কথা!
রুনুমামু বলে উঠেন, ভেরি ব্যাড আম্মা, দিস ইজ ভেরি ব্যাড। তুমি চুরি করতে!
ফিরোজা বুয়া হেসে গড়িয়ে পড়ে।
– আম্মা গো আম্মা, সবাই মিইল্যা চুরি করে- বিলাইয়ের খালি দোষ হয়।
নীলু চোখ পাকিয়ে বলে, বুয়া তুমি আম্মাকে বলছ। মেজমামু বলেন, তুমি থাম নীলু, গল্পের আসরে সব জায়েজ। নানু যেন কী এক ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে আছেন।
বলেন, সবাই বাড়ির উঠোন থেকে- ফুলমনি, ফুলসোনা, ফুলু ফুলু ফুলি- কোথায় তুই গেলি- বলতে বলতে বাড়িতে ঢুকত। ফুল ছিল সবার এমন আদরের।
সেদিন হলো কী সন্ধ্যা বেলা। খুব সুন্দর চাঁদ উঠেছে, জোৎস্নায় ভরে গেছে সারা শহর। আমগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে হীরের টুকরোর মতো আলো ছড়িয়ে পড়েছে।
এবলু ফিসফিসিয়ে বলে, দাদী কবি হয়ে গেল নাকি রে?
নানু বলে যান, একটু আগে আঞ্জুবুবু ‘আয় আয় চাঁদমামা টিপ দিয়ে যা’ বের ফুলের কপালে টিপ পরিয়ে দিয়েছে। হঠাৎ কেঁদে উঠতেই বুবু বলে, ওহ ন’টায় তো ওর দুধ খাবার কথা।
বুবু ঘরে চলে গেল। আমি বারান্দায় মোড়ার ওপর বসে আছি। আমার শরীরে চাঁদের আলো। কী যে অদ্ভুত মায়াময় রাত। এখনকার মতো আকাশ ছুঁই ছুঁই বিল্ডিং ছিল না, তাই চাঁদের আলো আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত।
দু’চার মিনিটও হয়নিÑ হঠাৎ ফুলের কচিগলার কান ফাটানো চিৎকার। আঞ্জুবুবু দুধের বোতল হাতে পাথর হয়ে গেছে।
সবাই অবাক। কী হয়েছে ফুলের? একছুটে ঘরে যাই।
বুবু দুধ চিনি মিশিয়ে ফ্ল্যাক্স থেকে গরম পানি ঢেলেছে, ফুল ফ্ল্যাক্সটা তুলেই হাঁ করে উল্টে দিয়েছে নিজের মুখে। টাটকা গরম পানি মুখে-গলার ভেতরে গিয়ে পড়েছে। সবাই ছুটোছুটি করে হাসপাতালে নিয়ে গেল। জীবন্ত ফুল আর ফিরে আসেনি। এই কষ্টের ধাক্কা সামলাতে আমাদের অনেক দিন লেগেছে। বড়মামু বিষাদমাখা গলায় বলেন, ইসস, একটু সতর্ক হয়ে ফ্ল্যাক্সের মুখ বন্ধ করলে কিন্তু এ দুর্ঘটনা ঘটতো না।
নীরব হয়ে থাকে সবাই। বাইরে টুপটাপ বৃষ্টি ঝরার আওয়াজ। বুয়া বলে, এইবার টেবিলে ভাত দেই আম্মা? এগারোটা বাইজ্যা গেছে। আমার তো ধোয়া পাকলাও আছে।
বড়মামু গম্ভীর গলায় বলেন, না- আম্মা, উঠবেন না, আরেকটা গল্প হোক। দেখেছে পিন্টো সত্যি গল্প শুনলে কেমন লাগে, মনটা ছুঁয়ে যায়।
দাদী-নানু বলেন, ঠিক আছে এটাই শেষ গল্প কিন্তু।
মীলু বলে, আম্মা যে এত ভালো গল্প বলেন জানতাম না তো।
রুনুমামু বলে, এবার জানলি তো আপু?
এবলু-ডাবলু পিন্টো ওরা বলে, শুরু করো, স্টার্ট করো নানু হারি আপ।
নানু বলেন, এটা অবশ্য আমার শোনা গল্প, তবে সত্যি। ধানমন্ডিতে আমর এক বান্ধবী থাকে রাকা।
মীলু-নীলু দু’জনেই বলে, রাকা আন্টিকে চিনি তো আম্মু, আগে প্রায়ই আসতেনÑ তাইতো।
– হ্যাঁ, কুমিল্লায় আমরা একসঙ্গে পড়েছি। হঠাৎ বিক্রমপুর থেকে খবর এলো ওর শাশুড়ির অসুখ। এটা কিন্তু আমার গল্প নয়Ñ রাকা আন্টির গল্প।
– হ্যাঁ হ্যাঁ বলো।
রাকার স্বামী মাজেদ ভাই সবে কাঁচাবাজার সেরে ফিরেছেন। মায়ের এখন তখন অবস্থা। ডাইনিং স্পেসে নানা রকম সব্জি, মসলার প্যাকেট, মাছ পড়ে থাকে। কোনো দিকেই খেয়াল নেই রাকা আর মাজেদ ভাইয়ের। ছোট্ট একটা ব্যাগে পরনের দু-একটা শাড়ি, লুঙ্গি, গেঞ্জি টুথপেস্ট-ব্রাশ তোয়ালে নিয়ে তড়িঘড়ি করে বের হয়ে যায় ওরা।
মাওয়া লাইনে সারাক্ষণই বাস পাওয়া যায়। মায়ের অবস্থা খুবই নাজুক। নারায়ণগঞ্জে ওদের আত্মীয়স্বজন থাকে, সেখানকার হাসপাতালে আইসিইউতে থাকেন উনি। হায়াত ছিল বলেই বেঁচে গেলেন রাকার শাশুড়ি।
ঢাকায় ফিরে আসার সময় রাকা বারবার বলতে থাকে, বাজার করে সব তো ডাইনিং স্পেসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে এসেছি। কী যে অবস্থা হয়েছে কে জানে! সাতটি দিন ছিলাম না। মাজেদ বলেন, তাতে কী হলো?
Ñ তাতে কী হলো মানে? বড় একটা রুইমাছ এনেছিলে না?
Ñ হ্যাঁ হ্যাঁ, আড়াই হাজার টাকা নিয়েছিল।
মাথায় হাত রেখে রাকা বলে, মাছটা তো ফ্রিজে ঢুকিয়ে আসনি। সব্জিগুলো না হয় পচে নষ্ট হবে। কিন্তু মাছটা তো পচে নিশ্চয়ই একসা হয়ে গেছে। এবার কী হবে। অন্য ফ্ল্যাটের ভাড়াটেরা তো আমাদের গালাগালি দিয়ে শেষ করে দেবে। কিভাবে ওদের মুখোমুখি হবো বলতো!
গেটের ভেতরে ঢুকলে দারোয়ান সালাম দিল, মুখে কিছু বলল না। পা টিপে টিপে সিঁড়ি ভেঙে উপরে মানে চারতলায় উঠতে থাকে রাকা ওরা। ভয় হয়Ñ কেউ হয়ত এসে বলবে কোথায় ছিলেন ভাবী? আপনাদের ফ্ল্যাট থেকে কী যে বিচ্ছিরি গন্ধ আসছেÑ কী রেখে গেছেন শুনি? এত কেলাস হলে চলে?
নাহ্Ñ কারো সঙ্গে মুখোমুখি হতে হলো না!
দরোজার লক খুলে ভেতরে ঢুকে ওরা অবাক। ঢ্যাঁড়সগুলো নষ্ট হয়ে পানি বেরোচ্ছে, মিষ্টি কুমরোর ফালি দগদগে হয়ে গেছে, ডাঁটা শুকিয়ে দড়ির মতো, পটোলগুলো হলদে হয়ে শুকিয়ে গেছে।
কিন্তু যে রুইমাছটাকে নিয়ে এত ভাবনা, পচে গলে যে মাছটির একাকার হয়ে যাবার কথাÑ এটির কিছুই হয়নি। দিব্যি তাজা হয়ে যেভাবে রাখা হয়েছিল ঠিক সেভাবেই বহাল তবিয়তে রয়েছে। যেন বলছে এত ভাবনা কিসের আমার জন্য? আমি তো দিব্যি আছি। ভালো আছি আমি, খাসা আছি।
ফরমালিন দেয়া মাছটি ডাস্টবিনে ফেলতে ফেলতে মাজেদ ভাই বলতে থাকে, দ্যাখো, আমরা কী খাই। ফ্ল্যাটের সবাই ভাবতে বসে, সত্যিই তো আমরা কী খেয়ে বেঁচে আছি?
মীলু নীলু বলে, সত্যিই তো আম্মা, আমরা কী খাই?
রুনুমামু খিচুড়ি-ভাজি খেতে খেতে গুণগুণ করে গান ধরে -আমি জেনেশুনে বিষ করেছি পান।
মেজমামু ধমক দিয়ে বলে,- এই রুনু খেতে বসে বিষের কথা বলবি নাতো, বড্ড ভয় করে রে।
আগামীকাল রাতের ট্রেনে সিলেটের তালতলার বাসায় চলে যাবে পিন্টো। বুকের ভেতরটা কেঁদে ওঠে ওর। পিন্টো নামটি হারিয়ে গিয়ে ফের জাম্পু নামে ফিরে যাবে ও। কিন্তু নানুর বলা বুকের ভেতরটা ছুঁয়ে যাওয়া প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয়- তিনটি সত্যিকারের গল্প কক্ষনো কি ভুলে যেতে পারবে সে? কোনোদিনও নয় এগুলো যে সত্যি সত্যি গল্প। একটুও মিথ্যে নয়।

SHARE

Leave a Reply