Home স্মরণ স্মৃতির আঙিনায় কয়েকজন কবি

স্মৃতির আঙিনায় কয়েকজন কবি

মীযানুল করীম..

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। হাজার বছরের বাংলা সাহিত্যে নজরুল ও রবীন্দ্রনাথ দু’টি প্রধান মহীরুহ। ঝাঁকড়া চুলের ‘দুখু মিয়া’র স্বপ্নিল দু’চোখে ছিল জাতিকে জাগিয়ে দেশের দুঃখ দূর করার সুমহান স্বপ্ন। নজরুল একাধারে কবি, ছড়াকার, গীতিকার, ঔপন্যাসিক, গল্পরচয়িতা, প্রাবন্ধিক, সঙ্গীত ও অভিনয়শিল্পী, সুবক্তা, সাংবাদিক ও রাজনীতিক। এই বিস্ময়কর বাঙালিপ্রতিভা মাত্র দু’দশক সময় পেয়েছিলেন সাহিত্যসাধনার জন্য। নজরুলের জন্মস্থান ও জীবন কেটেছে বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। কিন্তু তিনি সে দেশ নন, আমাদের এই বাংলাদেশের জাতীয় কবি। কারণ, বাঙালি হয়েও কলকাতাকেন্দ্রিক রাঢ় বঙ্গ থেকে আমাদের পূর্ববঙ্গের পৃথক জাতিসত্তা, নজরুলের লেখায় তার আবেগ অনুভূতি, আশা-আকাক্সক্ষা ফুটে উঠেছে।
নজরুল ১৯৪২ সাল থেকে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে জীবন্মৃত অবস্থায় ছিলেন। কলকাতার সরু গলিতে আরো অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে ছোট বাসায় তাঁর দুঃখের দিনগুলো কাটছিল নিদারুণ উপেক্ষার মাঝে। স্ত্রী প্রমীলা নজরুল ২৫ বছর রোগে শয্যাশায়ী থেকে ১৯৬১ সালে ইন্তেকাল করেন। বাংলাদেশের মানিকগঞ্জের মেয়ে প্রমীলা বা দুলির পরিবার থাকতো কুমিল্লা শহরে। সেই মানুষটির কবর সুদূর চুরুলিয়ায় যেখানে নজরুলের জন্ম। আর চুরুলিয়ার নজরুল শুয়ে আছেন আমাদের ঢাকার বুকে।
বাংলাদেশ সরকার স্বাধীনতার পরপরই কবি নজরুলকে ঢাকায় আনার উদ্যোগ নেয়। সিদ্ধান্ত হয়, জন্মদিনের আগেই কবিকে আনা হবে। ২৫ মে, ১৯৭২ ছিল নজরুলের ৭৩তম জন্মবার্ষিকী। এর ঠিক আগের দিন বৃদ্ধ কবিকে বিমানবন্দরে বরণ করা হয় বিপুল সংবর্ধনা দিয়ে। হাজার হাজার মানুষ গিয়েছিল প্রিয় মানুষটিকে একনজর দেখে স্বাগত জানাতে। অনুষ্ঠানটি সরাসরি প্রচার করা হচ্ছিল। রেডিওতে আমি সেটা শুনছিলাম আরেকটি বিরাট সমাবেশের মাঝে। তখনো স্কুলের গণ্ডি পার হইনি। সে দিন আমাদের শহর ফেনীতে এসে ছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। প্রধান সড়কে জনতার ভিড় তাঁর কালজয়ী ভাষণ শোনার জন্য। তিনিও নজরুলের মতো আরেক বিদ্রোহী। সমাবেশ শুরুর আগে একটা দোকানে রেডিওতে শুনেছি নজরুল আগমনের ধারাভাষ্য।
কবি তাঁর বিখ্যাত বিদ্রোহী কবিতায় বলেছেন, ‘উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না/ অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না / বিদ্রোহী রণক্লান্ত/ আমি সেইদিন হব শান্ত।’ কিন্তু তাঁর জীবন ও সংগ্রামের মধ্যাহ্নেই তাঁকে অকস্মাৎ ‘শান্ত’ হয়ে যেতে হয়েছিল। অথচ উৎপীড়িতের ক্রন্দল রোল আজো আকাশে বাতাসে আর্তধ্বনি তুলছে। আর অত্যাচারীর খড়গ এখন আগের চেয়ে আরো নির্মম নৃশংস।
নজরুলের জন্মস্থান চুরুলিয়ায় গিয়েছিলেন কবি আবদুল হাই শিকদার। আমাকে একদিন তিনি প্রসঙ্গক্রমে বলেছিলেন, ‘চুরুলিয়ার সাথে বাংলার সবুজশ্যামল নিসর্গের মিল নেই। সেখানে উঁচু-নিচু লালচে মাটির রুক্ষতা, গাছপালা কম।’ এলাকাটা বৃহত্তর বঙ্গের পশ্চিমপ্রান্তে। কাছেই কয়লাখনি এবং ভারতের বর্তমান ঝাড়খণ্ড রাজ্য। ওই রুক্ষ প্রকৃতি কবির বিদ্রোহী মানসের একটা কারণ কিনা কে জানে। নজরুল বারবার ঢাকায় এসেছেন যৌবনকালে। এক সময় ছিলেন বর্ধমান হাউসে। আজকের বাংলা একাডেমীর যে তেতলা প্রাসাদ, বটতলার পাশের সেই সুদৃশ্যভবনই বর্ধমানের রাজার অট্টালিকা। কবি সেখানে ছিলেন লেখক অধ্যাপক কাজী মোতাহের হোসেনের মেহমান হয়ে। কক্ষটি সংরক্ষণ করা হয়েছে। নজরুল আজকের রমনা পার্কের যে লেক, তার পাড়ে বসে লিখেছেন গান-কবিতা। ১৯০৮ সালে ব্রিটিশ উদ্যানবিধ প্রাউডলকের সাজানো এই বাগান কবিকে মুগ্ধ করতো। রমনা লেকটির নাম অনেক আগেই করা উচিত ছিল ‘নজরুল সরোবর’। কবিকে শেষজীবনে ঢাকায় এনে রাখা হয়েছিল ধানমন্ডি লেকের উত্তর প্রান্তের কাছে একটি সুন্দর বাড়িতে। পরে অনেক বার গিয়েছি সেখানে। দোতলা ভবনের পাশেই ছিল বাগান ও অঙ্গন। সেটা ভেঙে বড় দালান তৈরি করা হয়েছে। সেখানেই নজরুল ইনস্টিটিউট। কবি নজরুল বিয়ে করেছেন, শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছন এবং চিরশয্যা নিয়েছেন এদেশেই। বাংলাদেশের বহু জায়গায় গিয়েছেন তিনি। বাল্যকালে ময়মনসিংহের গন্ডগ্রামে কাজীর সিমলায় লজিং ছিলেন। সে এলাকায় তাঁর নামে বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। গিয়েছেন কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ফেনী, নোয়াখালী, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, ফরিদপুর, রংপুর প্রভৃতি বহু জায়গায়। আমার নিজ শহর ফেনীতে কবি গিয়েছিলেন ১৯২৫ সালের দিকে, উঠেছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক ওবায়েদ-উল হকদের বাসায়। তিনি তখন ক্লাস টেনের ছাত্র। আমাদের (সরকারি পাইলট) স্কুল মাঠে নজরুলের বক্তৃতা ও গানের অনুষ্ঠানে মানুষ ভেঙে পড়েছিল।
নজরুল এদেশের জাতীয় কবি। বিপুল জনতার উপস্থিতিতে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কাফন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশেই কবির চিরশয্যা। কারণ, তিনি তো অনেক আগেই আকুতি জানিয়ে গেছেন- ‘মসজিদের পাশে আমার কবর দিও ভাই/ যেন গোরে থেকেও মুয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই।’

বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত কবিদের মধ্যে রবীন্দ্র-নজরুল-মাইকেলের পরে রয়েছেন জসীমউদদীন, গোলাম মোস্তফা, ফররুখ আহমদ প্রমুখ। এঁদের কথা কিছু উল্লেখ করছি।
তখন আমি ক্লাস ফোরে পড়ি। ততদিনে কবি গোলাম মোস্তফা আমার অন্যতম প্রিয় কবি। স্কুলের বিভিন্ন ক্লাসের পাঠ্যবইতে তাঁর কবিতা থাকতো অপরিহার্য হিসেবে। বনভোজনের ওপর তাঁর লেখা ‘নূরু পুষি আয়েশা শফি সবাই এসেছে’Ñ কবিতাটি কি কখনো ভোলা যায়? ওরা এত জোগাড়যন্ত্র করে চড়–ইভাতি করছিল, অথচ লবণ আনেনি। এই একটা জিনিসের অভাবেই সব আনন্দ একদম মাটি হয়ে গেলো। গোলাম মোস্তফার ‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুদের অন্তরে’ কথাটা তো বাংলাভাষায় বাণী চিরন্তনীর মর্যাদা পাচ্ছে। যা হোক, আমরা গাঁয়ের বাড়ি গিয়েছিলাম এক বিয়েতে। যে দিন সেখানে যাই সেদিন বিকেলে রেডিও’র খবরÑ কবি গোলমা মোস্তফা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন। শুনে যে কত দুঃখ লেগেছিল সে কিশোর বয়সে, বলে বোঝানো যাবে না। অনেক বছর পরে আমি সাংবাদিক হিসেবে কবি গোলাম মোস্তফার ছেলে মুস্তাফা মনোয়ারের সাক্ষাৎকার নিয়েছি। গিয়েছি কবিকন্যা ফিরোজা খাতুনের বাড়িতেÑ ঢাকায় মৌচাক মার্কেটের পেছনে। কবি গোলাম মোস্তফার বিখ্যাত ‘বিশ্বনবী’ গ্রন্থে প্রকাশক হিসেবে তাঁর এই কন্যার নামই লেখা থাকতো। পরীক্ষায় ভালো রেজাল্টের জন্য ক্লাস এইটে এই বইটি প্রাইজ পেয়েছিলাম। কবির ছেলে মোস্তফা আজিজকে মাঝেমাঝে দেখতাম ঝোলাকাঁধে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন এলাকায় কারো কারো ছবি আঁকছেন। সে সব লোকের পরিচিতি ও কিছু তথ্যসহ ছবিগুলো দৈনিক সংগ্রামের সাহিত্য পাতায় ছাপা হতো। আমি তখন ওই পত্রিকার সাংবাদিক।
গোলাম মোস্তফা আমাদের ধর্মীয় বিষয়েও বহু বিখ্যাত কবিতা লিখে গেছেন। লিখেছেন হামদ-না’ত। মিলাদ মাহফিলে ‘তুমি যে নূরের নবী/ নিখিরের ধ্যানের ছবি,/ তুমি না এলে দুনিয়ায়/ আঁধারে ডুবিতে সবি’Ñ এই না’ত আমরা সবাই একসাথে গেয়ে থাকি। এটা গোলাম মোস্তফার রচিত। অনেকেই জানে না, তিনি কলকাতার বালিগঞ্জ স্কুলে এমন একজনের শিক্ষক ছিলেন, যিনি পরে হন তাঁর মতো খ্যাতনামা কবি। সে দিনের সেই কিশোর ছাত্রের নাম ফররুখ আহমদ। গোলাম মোস্তফা ভাল গাইতেনও। অনেক আগে রেডিওতে তাঁর ইসলামী গানের রেকর্ড শুনেছিলাম।
নজরুলের সাথে তাঁর ছিল গভীর বন্ধুত্ব। সেই সুবাদে একে অপরকে ব্যঙ্গও করতেন। নজরুলকে নিয়ে গোলাম মোস্তফা লিখেছেনÑ ‘কবি নজরুল ইসলাম/ বাসায় একদিন গিয়েছিলাম… প্রাণে ফুর্তির ঢেউ বয়/ এ ধরায় তার কেউ নয়।’
এই লেখাটি যখন লিখছি তখন পত্রিকায় কবি জসীমউদ্দীনের আসমানীর মৃত্যু শয্যার খবর। ‘আসমানীকে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও/রহিমুদ্দির ছোট্টবাড়ি রসুলপুরে যাও।’ এই কবিতা পড়েছি ক্লাস ফোর কি ফাইভে। মুখস্থ লিখতে হয়েছে বেশ কয়েক লাইন। হাইস্কুলে পড়েছি একই কবির ‘তুমি যাবে ভাই, যাবে মোর সাথে আমাদের ছোট গাঁয়,/ গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়।’
আর তাঁর ‘কবর’ কবিতা তো বিশ্বের একটি সেরা সাহিত্যকর্ম। এটি এসএসসির সিলেবাসে পড়েছি আমরা। ‘কবর’ পড়ে দাদুর দুঃখে চোখে পানি আসে না- এমন মানুষ কমই। অবাক ব্যাপার হলো জসীমউদ্দীন এমন একটি বিখ্যাত কবিতা লিখেছেন ছাত্রজীবনেই। কিছুদিনের মধ্যেই এটা স্কুল সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
যা হোক, কবি জসীমউদ্দীনকে প্রথম দেখি ১৯৪৭ সালে। ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছিল। কবি তখন কিছুটা অসুস্থ, হাঁটতে কষ্ট হয়। গায়ে বরাবরের মতো পাজামা আর পাঞ্জাবি। কিছুটা দীর্ঘ শরীর। তিনি বক্তব্য রেখেছিলেন। তখন কবি মতিঝিল টি অ্যান্ড টি কলেজে বাংলার অধ্যাপক। আমার এক ভাইপো সেখানে তাঁর ছাত্র ছিল। কিছুদিন পর কবি অসুস্থ হয়ে পিজি হাসপাতালে ভর্তি হন। এখন এর নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়। আমার বড় ভাইও তখন একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সবচেয়ে বড় কথা বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও সে সময় ওই হাসপাতালে।
সেখানে আমার এক ভাগ্নের সাথে জসীমউদ্দীনের কথা হতো মাঝে মাঝে। কবি পুরনো কাগজপত্র সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর কাছে বিভিন্ন জনের লেখা চিঠি অন্যদের দেখাতেন। স্মৃতিচারণ করতেন। আমার সে আত্মীয়কে শুনিয়েছিলেন একটা ঘটনা। কবির এক মেয়ের শ্বশুরবাড়ি নোয়াখালী জেলায়। একবার বাসে করে সেখানে যাওয়ার পথে এক জায়গায় সুন্দর গ্রামীণ দৃশ্য দেখে কবি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। মাঝ পথেই বাস থেকে নেমে গাঁয়ের সাধারণ মানুষের সাথে অন্তরঙ্গ আলাপ শুরু করে দিলেন। পল্লী জীবনের জন্য এমন দরদ না থাকলে কি ‘পল্লীকবি’ হিসেবে স্মরণীয় হতে পারতেন?

কবি ফররুখ আহমদ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। তিনি ছিলেন মানবতা ও জাগরণের কবি। তাঁর লেখা পাখির বাসা, হরফের ছড়া প্রভৃতি বই শিশু-সাহিত্যের সেরা সম্পদের মধ্যে গণ্য। শুধু পাখিদের নিয়ে ছড়ার বই ‘পাখির বাসা’। আমরা যখন স্কুলে পড়ি, তখন প্রায় সব ক্লাসেই ফররুখের কবিতা বা ছড়াকবিতা পাঠ্য। আমাদের প্রিয় ছিল প্রতি শুক্রবার সকালে ঢাকা রেডিওর অনুষ্ঠান ‘কিশোর মজলিস’। পরিচালনা করতেন কবি ফররুখ আহমদ। তাঁর ভরাট গলার আকর্ষণীয় আওয়াজ এখনো যেন শুনতে পাচ্ছি। তাঁর বহু গান ছিল সুমধুর সুরের, সুন্দর বাণীর। ‘তোরা চাসনে কিছু কারো কাছে খোদার মদদ ছাড়া,/ জয়ের পথে যা এগিয়ে বাজিয়ে নাকাড়া’- গানটি রেডিওতে শিশুদের শেখানো হতো। আমরা ক্লাস থ্রিতে পড়েছি তাঁর লেখা বৃষ্টির ছড়া। ‘বৃষ্টি পড়ে রিমঝিমিয়ে … গাছের ডালে টিনের চালে/ বৃষ্টি পড়ে তালে তালে…. বাদলা দিনের একটানা সুর/ বৃষ্টি পড়ে মিষ্টি মধুর।’ ফররুখ দেশাত্মবোধক, ইসলামী গান লিখেছেন অনেক। যখন আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি, তখন তিনি জাতীয় পর্যায়ে একটি পুরস্কার পেয়েছিলেন। সে সময় প্রথম তাঁর ছবি দেখি সম্ভবত মাসিক মাহে নও-এ। চশমা পরা কবির স্বপ্নোজ্জ্বল চোখ দু’টির কথা ভোলা যায় না। বহুদিন অসুস্থ থেকে তিনি ১৯৭৪ সালে ইন্তেকাল করেন। রেডিওতে তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে এলাম। তখন কবির এক পুত্রের সাথে পরিচয় ঘটে। কবির ইন্তেকালের কিছুদিন পরে আমার পরিচিত এক ব্যক্তির সাথে তাঁর ইস্কাটন গার্ডেনের বাসায় গিয়েছিলাম। এত বড় একজন কবিকে আজ আমরা প্রায় ভুলতে বসেছি; এটা জাতির একটা বড় দুর্ভাগ্য।
কবি ফররুখকে নিয়ে একটি ঘটনা। একবার জানতে পারি, কবি যখন স্কুলের ছাত্র, তখন তাঁর সহপাঠীদের একজন ছিলেন আবুল হাশেম। ইনি পরে টিচার্স ট্রেনিং কলেজের প্রিন্সিপাল হয়েছিলেন। ঘটনাক্রমে খুলনায় তাঁর জুনিয়র সহকর্মী ছিলেন আমার আপন দুলাভাই মরহুম আবদুল ফাত্তাহ। হাশেম সাহেব অবসর নিয়ে তখন বন্দরনগরীতে। তিনি চট্টগ্রাম জেলার পটিয়ার এক সুশিক্ষিত পরিবারের সন্তান। আমি চাটগাঁয় তখন ভার্সিটির ছাত্র। আমরা কয়েকজন চট্টগ্রাম সাহিত্য সংগঠনে মিলিত হয়ে লেখালেখির চেষ্টা করতাম। আমি হাশেম সাহেবের কথা বন্ধুদের জানালে তারা হদিস পেল, মোমিন রোডের কাছে তাঁর বাসা। তিনি আমাদের অনুরোধে ফররুখ স্মরণসভায় বক্তব্য রেখেছিলেন। বোধ হয় একটা প্রবন্ধও লিখেছিলেন।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একজন বিখ্যাত কবি সৈয়দ আলী আহসান। নামটির সাথে ভেসে ওঠে মুখভর্তি সুন্দর দাড়ির একটি গম্ভীর মুখ। লেখা ও বলা, দু’দিক দিয়েই তিনি ছিলেন অনন্য। কবিতা ও প্রবন্ধের মতো। তাঁর বক্তৃতার ভাষাও ছিল অসাধারণ প্রাঞ্জল ও মানসম্পন্ন। স্কুলের বইতে তাঁর কবিতা ‘আমার পূর্ব বাংলা’ পাঠ্য ছিল। আমি সাংবাদিক হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করার কিছুদিন পর বাসায় গিয়ে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। ঢাকার কলাবাগান বশিরউদ্দিন রোড মসজিদের অদূরে একটি ভবনে থাকতেন। পাশেই অধ্যাপক মুহাম্মদ আবদুল হাইয়ের বাসা। দু’জনে মিলে লিখেছিলেন বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত নামের বৃহৎগ্রন্থ।
আলী আহসান সাহেবের সুললিত ভাষণ প্রথম শুনেছি হঠাৎ করে। বোধ হয় তখন তিনি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শিক্ষা উপদেষ্টা (মন্ত্রীর মর্যাদায়)। বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর-পশ্চিম কোণে ছিল টালির ছাদওয়ালা একটা বিল্ডিং। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রথম ভবন এটিই। আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন। ঢাকায় কী কাজে এসে সেদিক দিয়ে যাচ্ছি এক সন্ধ্যায়। রাস্তা থেকেও শোনা যাচ্ছিল হলের মাইক্রোফোনের শব্দ। অনবদ্য কাব্যিক শব্দচয়নে কে যেন অনর্গল বলে চলেছেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছি। জানলাম, ইনি প্রফেসর সৈয়দ আলী আহসান। ১৯৮৯-৯০ সালের দিকে তিনি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান। অফিস ছিল পুরান আবহাওয়া ভবনে। জিয়ার মাজারের কাছের সে জায়গায় এখন বিশাল আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র। একটা সাক্ষাৎকারের কাজে সৈয়দ আলী আহসানের সে অফিসে গিয়েছি। তিনি বেশ ভালো রাঁধতে জানতেন, সে বিষয়ে বইও লিখেছিলেন। শেষ জীবনে তাঁর জন্য একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো মোহাম্মদপুর ইকবাল রোডে। তিনি নানা বিষয়ে খোলামেলাভাবে অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি প্রকাশ করতেন। সবশেষে থাকতো ভোজনের আয়োজন। আমি কয়েকবার এতে হাজির ছিলাম।
কবিতা লিখে জেলে গিয়েছিলেন প্রখ্যাত লেখক ও বাগ্মী সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাব্যচর্চার জন্য কবির কারাদণ্ডের সেটাই প্রথম নজির। সাহিত্যে ও রাজনীতি, দুই অঙ্গনেই শিরাজী ছিলেন অনলবর্ষী বিদ্রোহী। তাঁর ‘অনল প্রবাহ’ কাব্য সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ শাসকদের মসনদে যেন অনল বা আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। তাই যেতে হলো কারাগারে। শিরাজী ছিলেন মুসলিম নবজাগরণের প্রবক্তা এবং ইসলামী আদর্শে উদ্বুদ্ধ। শৈশবে শুনেছি, বাংলাদেশজুড়ে বক্তৃতায় মানুষকে জাগাতে নেমে ইসমাইল হোসেন শিরাজী এসেছিলেন আমাদের বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলেও। আমার পিতা মরহুম শামসুল করীম তখন স্কুলছাত্র। তাদের উদ্দেশ্যে শিরাজী যে ওজস্বী ভাষণ দিয়েছিলেন, এর সামান্য শুনলেই বোঝা যায় তাঁর ভাষা কত শক্তিশালী ছিল। তিনি সম্বোধন করেছিলেন, ‘হে ফুল্ল কুসুমবৎ বালকবৃন্দ।’

SHARE

1 COMMENT

  1. মীযানুল সাহেব। আপনার লেখাটা পরে ভাল লাগলো, বেশ কিছু কবি সম্পর্কে জানলাম। আপনার লেখার কোন এক জায়গায় বলেছেন কবি ফররুখ আহমদ এর সহ পাঠি ছিল কবি আবুল হাশেম। আসলেই কি সহপাঠি ছিলেন? আমি যত টুকু জানি, কবি আবুল হাশেম ছিলেন ফররুখ আহমদ এর শিক্ষক। একটু যাচাই করে নিবেন।

Leave a Reply