Home ফিচার আমাদের শিশু-কিশোর পত্রিকা ও কিশোরকণ্ঠ

আমাদের শিশু-কিশোর পত্রিকা ও কিশোরকণ্ঠ

নিজামুল হক নাঈম ..
শিশু-কিশোররা জাতির গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। গুপ্ত ধন। মূল্যবান রত্ন। শিশুরা হলো ফুলের মতো পবিত্র, দুনিয়ার সব মানুষ তাদেরকে আদর করে। স্নেহ করে। সমাজের দ্বন্দ্ব-কলহ, বাদ-বিবাদ, হিংসা-বিদ্বেষ সবকিছুর ঊর্ধ্বে শিশুরা। আমাদের সমাজে দেখা যায় ভাইয়ে-ভাইয়ে, বোনে-বোনে, এক ঘরের সাথে অন্য ঘরের, এক বাড়ির সাথে অন্য বাড়ির লোকদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ হয় ঠিকই কিন্তু শিশুরা একইসাথে খেলছে, হাঁটছে, খাচ্ছে ইত্যাদি। কারণ শিশুরা এসব থেকে মুক্ত-পবিত্র, দূরে বহু দূরে তারা। আজকের শিশু-কিশোর জাতির আগামীর কর্ণধার। কবি বলেছেন- ‘লক্ষ আশা অন্তরে ঘুমিয়ে আছে মন্তরে, ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে’। তাইতো শিশু অধিকারের বিষয়ে সবাই সোচ্চার। শিশু-কিশোরদের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ার প্রত্যাশা সবার। তাদেরকে নিয়ে ভাবনা সবার। কবির কবিতায়, লেখকের লেখায়, বক্তার বক্তৃতায়, গবেষকের গবেষণায়Ñ সব কিছুতেই তারা আছে এবং থাকবে।
শিশু-কিশোরদের আগামীর জন্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে চেষ্টার কোনো অন্ত নেই। তাদেরকে গড়ে তোলার জন্য সবাই যার যার জায়গা থেকে ভূমিকা রেখে চলেছেন। এই আলোচনায় সব বিষয়ে আলোকপাত করার কোনো সুযোগ নেই। এখানে আমরা শুধু শিশু-কিশোর পত্রিকার বিষয়ে কথা বলবো। কারণ শিশু-কিশোরদের জন্য পত্রিকা বা সাময়িকী প্রকাশের ঘটনাও অনেক পুরনো।
প্রায় ২০০ বছর আগের কথা। ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাস। জন ক্লার্ক মার্শম্যান (১৭৯৪-১৮৭৭) নামে এক ইংরেজ যুবকের সম্পাদনায় বের হলো একটি পত্রিকা। আজকাল পত্রিকা অবশ্য অনেকই বের হয়, কিন্তু তখন ওই পত্রিকাটি বের হওয়াই ছিল এক মস্ত বড় ব্যাপার। কারণ  সেটির আগে বাংলা ভাষায় আর  কোনো সাময়িকী পত্র বের হয়নি। সেটি ছিল একটি মাসিক পত্রিকা এবং এর নাম ছিল ‘দিগ্দর্শন’। শিশু-সাহিত্যিক ও পণ্ডিত খগেন্দ্রনাথ মিত্র বলেছেন, দিগ্দর্শনকে আমরা কিশোরপাঠ্য সাময়িকপত্রের পর্যায়ভুক্ত করার পক্ষে। এই খানিই বাংলার প্রথম কিশোরপাঠ্য সাময়িক পত্রিকা বলে আমরা মনে করি। ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দে ‘পশ্বাবলী’ নামক পত্রিকায় প্রথম ছবি ছাপা হয়েছিল। এরপর ‘জ্ঞানোদয়’ (১৮৩১), ‘বিদ্যাদর্পণ’ (১৮৫৩), ‘সত্যপ্রদীপ’ (১৮৬০), ‘রহস্য সন্দর্ভ’ (১৮৬৩), ‘জ্যোতিরিঙ্গন’ (১৮৬৯), ‘বিশ্বদর্পণ’ (১৮৭২), ‘বালকবন্ধু’ (১৮৭৮), ‘সখা’ (১৮৮৩), ‘সাথী’ (১৮৮৩), ‘বালক’ (১৮৮৫), ‘সখা ও সাথী’ (১৮৯৪), ‘মুকুল’ (১৮৯৫), ‘মৌচাক’ (১৯২০), ‘সন্দেশ’ (১৯২৩), ‘রামধনু’ (১৯২৭) প্রভৃতি শিশু-কিশোর পত্রিকা বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ অঞ্চল থেকে প্রকাশিত হয়েছিল।
যেহেতু কলকাতা ছিল অবিভক্ত বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতির কেন্দ্র, তাই পূর্ববঙ্গ তথা আধুনিক বাংলাদেশের খ্যাতিমান লেখকরাও কলকাতাকেন্দ্রিক সেই ধারার সঙ্গে  দেশবিভাগ-পূর্ববর্তীকালে যুক্ত ছিলেন। এ প্রসঙ্গে ‘আঙুর’ ও ‘শিশু-সওগাত’-এর কথা উল্লেখ করা যায়। তখনকার অপেক্ষাকৃত পশ্চাৎপদ মুসলিম সম্প্রদায়ের দু’জন মানুষ এ পত্রিকা দু’টি প্রকাশের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন এবং তাঁরা এগুলোর সম্পাদকও ছিলেন। ‘আঙুর’ সম্পাদক ছিলেন জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। অবশ্য তখন তাঁর পরিচয় ছিল মৌলভি মুহম্মদ শহীদুল্লাহ নামে। ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ও কাজী নজরুলের লেখা এতে ছাপা হয়েছিল বলে জানা যায়। এতে গল্প, কবিতা, নিবন্ধ ও ধাঁধা ছাপা হতো। ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দের মার্চে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে বড় কথা হলো, এটি বাংলা ভাষায় মুসলিম সম্পাদিত শিশু-কিশোর উপযোগী প্রথম মাসিক পত্রিকা। এর আগে এ সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে একজন মাত্র ছোটদের জন্য পত্রিকা বের করেছিলেন। তিনি হলেন আবুল কাসেম ফজলুল হক (১৮৭৩-১৯৬২), পরবর্তী সময়ে যিনি শেরেবাংলা নামে খ্যাত হয়েছিলেন। ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের বরিশাল থেকে     ‘বালক’ নামের সেই সাপ্তাহিক পত্রিকাটি তিনি বের করেছিলেন।
১৮৮৩ থেকে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ৬৪ বছরে উল্লেখ করার মতো ১৫টি ছোটদের পত্রিকা ও একটি বার্ষিকী প্রকাশিত হয়েছিল। এ ১৫টির মধ্যে আটটি প্রকাশিত হয়েছিল তখনকার পূর্ববঙ্গের সবচেয়ে বড় শহর ঢাকা থেকে। সেই ১৫টির মধ্যে ১৪টি ছিল মাসিক পত্রিকা। আজকের দিনেও মাসিক পত্রিকারই একচেটিয়া প্রাধান্য চলছে। তবে বাংলা ভাষায় ছোটদের সাপ্তাহিক, এমনকি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের ঐতিহ্যও আছে। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে খগেন্দ্রনাথ মিত্রের (১৮৯৬-১৯৭৮) সম্পাদনায় বাংলা ভাষায় ছোটদের প্রথম ও একমাত্র দৈনিক ‘কিশোর’ প্রকাশিত হয়েছিল। ছোটদের প্রথম বাংলা সাপ্তাহিকটি ১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দে সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল। পত্রিকাটির নাম ‘আর্য কাহিনী’। তবে পূর্ববঙ্গ থেকে প্রকাশিত মুসলিম সম্পাদিত প্রথম ছোটদের সাপ্তাহিক পত্রিকার নাম ‘বালক’। এর পর ১৮৯৮ সালে চট্টগ্রাম থেকে রাজেশ্বর গুপ্তের সম্পাদনায় ‘অঞ্জলী’, ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত ‘প্রকৃতি’, ১৯১০ সালে অনুকূলচন্দ্র শাস্ত্রীর সম্পাদনায় ‘তোষিণী’, ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত ‘সোপান’, ১৯১২ সালে বরদাকান্ত মজুমদারের সম্পাদনায় ‘শিশু’, ১৯২৪ সালে ঢাকার ওয়ারী থেকে শুধাংশু শেখর গুপ্ত ও সত্যেন্দ্র শঙ্কর দাসগুপ্তের সম্পাদনায় মাসিক ‘রাজভোগ’, ১৯২৯ সালে রোহিনী কুমার মণ্ডলের সম্পাদনায় ‘ছোটদের লেখা’, ১৯৩০ সালে রংপুর থেকে প্রকাশিত ‘অরুণ’ প্রভৃতি। এগুলোর মধ্যে ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘তোষিণী’, ‘পাপিয়া’ ও ‘রাজভোগ’ উভয় বাংলায় পরিচিত, দামি লেখকদের লেখায় সমৃদ্ধ ও বিশেষভাবে উজ্জ্বল ছিল।

সাতচল্লিশ-পরবর্তী বাংলাদেশের
শিশু-কিশোর পত্রিকা
দেশ বিভাগের পর ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয় মুকুল ফৌজের মুখপত্র হিসেবে আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দিনের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘মুকুল’ নামের পাক্ষিক পত্রিকাটি এ দেশের সাতচল্লিশ-পরবর্তীকালের প্রথম ছোটদের পত্রিকা। সেই থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা অর্জনের আগ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য ছোটদের পত্রিকার মধ্যে ছিল ১৯৪৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা থেকে প্রকাশিত (১০টি সংখ্যা প্রকাশের পর ১৯৪৯ সালে বন্ধ) মঈদ-উর রহমান সম্পাদিত মাসিক ‘ঝংকার’, বেগম ফওজিয়া সামাদের সম্পাদনায় ঢাকা থেকে ১৩৫৫ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত (দুই বছর চলে ১৩৫৭ বঙ্গাব্দ অর্থাৎ ১৯৫১ সালের বন্ধ) মাসিক ‘মিনার’, ঢাকা থেকে ১৩৫৭ বঙ্গাব্দে ফয়েজ আহমেদের সম্পাদনায় প্রকাশিত ও পৌনে দুই বছর টিকে থাকা মাসিক ‘হুল্লোড়’, এপ্রিল-মে, ১৯৫১ সালের  তৈয়েবুর রহমানের সম্পাদনায় ঢাকা থেকে প্রকাশিত (মোট চারটি সংখ্যা বেরিয়েছিল) মাসিক ‘সবুজ নিশান’, ১৯৫৪ সালের আগস্টে ঢাকা থেকে আবদুল ওয়াহেদের সম্পাদনায় প্রকাশিত (আট বছর টিকে ছিল) মাসিক ‘আলাপনী’, ঢাকা থেকে প্রকাশিত ১৯৫৫ সালের ৭ মার্চ থেকে ১৯৫৬ সালের ১ জুলাই পর্যন্ত টিকে থাকা সরদার জয়েন উদ্দীন সম্পাদিত পাক্ষিক ‘সেতারা’ ও একই রকমের আয়ুষ্কালের একই সম্পাদকের সম্পাদনায় একই সময় পর্বে প্রকাশিত পাক্ষিক ‘শাহীন’, আল কামাল আবদুল ওহাবের সম্পাদনায় পাকিস্তান সবুজ সেনার মুখপত্র হিসেবে ১৯৫৫ সালের ঢাকা থেকে প্রকাশিত (১১টি সংখ্যা বেরিয়েছিল) মাসিক ‘সবুজ সেনা’, ১৯৫৫ সালের ঢাকা থেকে জেব-উন নিসা আহমদ সম্পাদিত (আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রকাশিত) মাসিক  ‘খেলাঘর’, অধ্যাপক আলমগীর জলিল ও আলাউদ্দিন আল আজাদ সম্পাদিত ১৩৬৭ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত পাক্ষিক ‘কিশলয়’, ১৩৬৭ থেকে ১৩৭৪ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত ঢাকা থেকে প্রকাশিত মোসলেম উদ্দিন সম্পাদিত মাসিক ‘রংধুন’, ১৯৬২ সালের জানুয়ারিতে রাজশাহী থেকে হাবীবুর রহমান সম্পাদিত মাসিক ‘পাপড়ি’, শাহেদ আলীর সম্পাদনায় ১৯৬২ সালের ঢাকা থেকে প্রকাশিত (এখনো প্রকাশনা অব্যাহত) মাসিক ‘সবুজ পাতা’, ১৯৬৩ সালের অক্টোবরে বগুড়া থেকে তাছির উদ্দিন আহমদ ও সৈয়দ তাইফুলের সম্পাদনায় প্রকাশিত মাসিক ‘সোনারকাঠি’, ১৯৬৪ সালের আগস্ট থেকে ১৯৬৫ সালের মে পর্যন্ত শামিম আজাদের সম্পাদনায় সিলেট থেকে প্রকাশিত মাসিক ‘নবারুণ’, ১৩৭১ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসে ঢাকা থেকে মো: আবদুল কাদেরের সম্পাদনায় প্রকাশিত মাসিক ‘টরেটক্কা’, ১৯৬৪ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইয়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত মাসিক ‘কচি ও কাঁচা’, ১৯৬৪ সালের নভেম্বরে ঢাকা থেকে প্রকাশিত (১৯৬৫-তে বন্ধ) গোলাম মোরশেদ ও নীলুফার বানু সম্পাদিত মাসিক ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’, ১৯৬৬ সালের চট্টগ্রাম থেকে এখ্লাস উদ্দিন আহমদ সম্পাদিত মাসিক ‘টাপুর টুপুর’, ১৯৭০ সালে ঢাকা থেকে আবদুস সাত্তারের সম্পাদনায় প্রকাশিত অদ্যাবধি টিকে থাকা মাসিক ‘নবারুণ’ প্রভৃতি নানা কারণে বিশেষভাবে স্মরণ করা যায়।
এছাড়া সেতারা, শাহীন, খেলাঘর, মুকুল, কচি ও কাঁচা, টাপুর টুপুর, সবুজ পাতা নামে শিশু-কিশোর পত্রিকা হিসেবে এখনও বের হয়ে আসছে।

স্বাধীনতা-পরবর্তীকালের
ছোটদের পত্রিকা
বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তীকালের ছোটদের পত্রিকার মধ্যে রয়েছে ঢাকা থেকে ড. মাযহারুল ইসলামের সম্পাদনায় ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত ত্রৈমাসিক ‘ধান-শালিকের দেশ’, জোবেদা খানমের সম্পাদনায় ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত মাসিক ‘শিশু’, মাসুদ আলীর সম্পাদনায় ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত মাসিক ‘ফুলকুঁড়ি’ যার মূলনীতি ছিলÑ ‘ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল বৈশাখী ঝড় তোরা সব জয়ধ্বনি কর’। বর্তমান সম্পাদক জয়নুল আবেদীন আজাদ, ৩৪ বছর ধরে পত্রিকাটি নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছে। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত প্রকাশিত নূরুল ইসলাম পাটোয়ারী, সৈয়দ মোহাম্মদ পারভেজ ও আহমদ জামান চৌধুরী সম্পাদিত বাংলাদেশের একমাত্র ছোটদের সাপ্তাহিক ‘কিশোর বাংলা’, রাজশাহী থেকে আশির দশকের গোড়ার দিকে প্রকাশিত ও মাহমুদ আনোয়ার হোসেন সম্পাদিত ‘রংধনু’, প্রায় একই সময়ে ঢাকা থেকে প্রকাশিত ও মোখতার আহমেদ সম্পাদিত দ্বিমাসিক ‘কিশোর বিচিত্রা’, ১৯৮৪ সালে ডিসেম্বরে মোখতার আহমেদের সম্পাদনায় প্রকাশিত মাসিক ‘কিশোর জগত’, লুৎফর রহমান রিটন ও আমীরুল ইসলাম সম্পাদিত ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত মাসিক ‘আসন্ন’, ড. মোহাম্মদ মোবারক আলীর সম্পাদনায় ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত মাসিক ‘নবীন বিজ্ঞানী’, আহসান হাবীব ও সাজ্জাদ কবীর সম্পাদিত মাসিক ‘তেপান্তর’ (১৯৮৮), সুফুরা হোসেনের সম্পাদনায় ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত ‘পুটুস’, ইমদাদুল হক মিলনের সম্পাদনায় ১৯৯১ সালে প্রকাশিত মাসিক কিশোর ‘তারকালোক’, কাজী আনোয়ার হোসেনের সম্পাদনায় ১৩৯৮ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত মাসিক ‘কিশোর পত্রিকা’, রাশেদ রউফ সম্পাদিত ১৯৯১-এর ১৪ এপ্রিল চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত মাসিক ‘দুরন্ত’, একই নামে ১৯৯১ সালের নভেম্বরে ঢাকা থেকে আহসান হাবীবের সম্পাদনায় অন্য একটি পত্রিকা বের হয়েছিল, ১৯৯২ সালের জানুয়ারিতে সেলিমা সবিহ’র সম্পাদনায় প্রকাশিত মাসিক ‘টইটম্বুর’ এবং ১৯৯২ সালে চট্টগ্রাম থেকে ফারুক হাসানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় মাসিক ‘কথন’। আগস্ট ১৯৯৫-এ লুৎফর রহমান রিটনের সম্পাদনায় প্রকাশিত মাসিক ‘ছোটদের কাগজ’, শহীদুল ইসলাম মিলু সম্পাদিত ১৯৯৫ সালে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত মাসিক ‘কিশোর কাল’। ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত আহসান হাবীবের সম্পাদনায় প্রকাশিত দেশের প্রথম সায়েন্স ফিকশন ম্যাগাজিন মাসিক  ‘মৌলিক’, ১৯৯৪ সালে চট্টগ্রাম থেকে ফারুক হাসানের সম্পাদনায় প্রকাশিত মাসিক ‘কথন’, দীপক বড়ুয়া সম্পাদিত ও ১৯৯৪ সালে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত ‘ঋতু’, ১৯৯৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রেহানা আশিকুর রহমান সম্পাদিত মাসিক ‘কিশোর ভুবন’, চট্টগ্রাম থেকে ২০০২ সালে পাশা মোস্তফা কামাল সম্পাদিত মাসিক ‘ঝুমঝুমি’, এপ্রিল ২০০৪-এর আবু হাসান শাহীনের সম্পাদনায় প্রকাশিত মাসিক ‘ছোটদের পত্রিকা’, মুহাম্মদ মুনতাসির আলী সম্পাদিত মাসিক ‘গোলাপকুঁড়ি’, ফজলে হাসান আবেদ সম্পাদিত (নির্বাহী সম্পাদক সুবল কুমার বণিক) ‘সাতরং’ প্রভৃতি।
এ ছাড়া সঙ্কলন আকারে আশির দশকে চট্টগ্রাম থেকে বেরিয়েছে আহসান মালেক নান্নু সম্পাদিত ‘ইলিক ঝিলিক’ ও ‘জলসিঁড়ি’। মোশাররফ হোসেন খানের সম্পাদনায় যশোর থেকে ১৯৮১ সালে বেরিয়েছে ‘নবীনের মাহফিল,। ঢাকা থেকে বেরিয়েছে ১৯৮৮ থেকে ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত আইরিন নিয়াজী মান্নার সম্পাদনায় ‘কিশোর লেখা’। ২০০৫ সালে মঈন মুরসালিনের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘কানামাছি’।  একই সময়ে জুবায়ের হুসাইনের সম্পাদনায় যশোর থেকে বের হয়েছে  ‘পরাগ’। পত্রিকা দীর্ঘ তিন বছর নিয়মিত প্রকাশিত হয়। ২০০৭ সালে আবুল হাসান শাহীনের সম্পাদনায় ‘ছোটদের পত্রিকা’, ২০০৮ সালে সাজ্জাদ কবীরের উদ্যোগে ‘কিশোর বেলা’ ও তাকীউদ্দিন মুহাম্মদ আকরাম ভূইয়ার সম্পাদনায় ‘বীরপ্রসূ’ যার মূল কথা হল ‘আল্লাহর হুকুম মেনে প্রিয় হাবীব মুহাম্মদ (সা) এর নির্দেশিত পথে চলা।’ ২০০৯ সালে আ ফ ম মোদাচ্ছের আলীর সম্পাদনায় ‘শাপলা দোয়েল’ ও খন্দকার মাহমুদুল হাসানের সম্পাদনায় ‘কিশোর বেলা’ এবং হাবিবা রিতার ‘নতুন সূর্য’ প্রকাশিত হয়। ২০১০ সালে জিল্লুর রহীম আখন্দের সম্পাদনায় ‘হাওয়াই মিঠাই’, মঈনুল হক চৌধুরীর সম্পাদনায় ‘কিশোর সাময়িকী’ ও জ্যোতির্ময় মল্লিকের সম্পাদনায় ‘কুটুম পাখি’ প্রভৃতি।
স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে শিশু-কিশোর পত্রিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছিল। এর একটি উজ্জ্বল স্মারকের নাম ‘কিশোর বাংলা’। একাধারে সংবাদপত্র, সাপ্তাহিকী ও কিশোর সাহিত্য সাময়িকী ছিল এটি। গল্প-প্রবন্ধ-নিবন্ধ-ছড়া-কবিতা-ফিচার কী ছিল না এতে? কিন্তু পরিতাপের বিষয়, অবিস্মরণীয় ও স্মৃতিময় সেই ট্যাবলয়েড সাপ্তাহিকীকে বাঁচানো যায়নি। আজকের বাংলাদেশের শিশু-সাহিত্যের সব খ্যাতিমান আজও ‘কিশোর বাংলা’র কথা ভেবে আক্রান্ত হন নস্টালজিয়ায়। পত্রিকাটি পরিচালনার প্রসঙ্গ এলে নূরুল ইসলাম পাটোয়ারী, সৈয়দ মোহাম্মদ পারভেজ, সানাউল্লাহ নূরী, আহমদ জামান চৌধুরী, ড. মাহবুব হাসানসহ বহু নিবেদিতপ্রাণের কথা মনে পড়ে। ঢাকার বাইরে রাজশাহী থেকে প্রকাশিত অথচ গুণে-মানে ঢাকার পত্রিকার চেয়ে একটুও খাটো তো ছিলই না, বরং রাজশাহীর বহু পত্রিকাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল মাহমুদ আনোয়ার হোসেন সম্পাদিত ‘রংধুন’। কাছাকাছি সময়ে ঢাকা থেকে ‘কিশোর জগত’ বেরিয়েছিল মোখতার আহমেদের সম্পাদনায়। সত্যিকারের আধুনিক ও মানসম্পন্ন পত্রিকা প্রকাশের প্রয়াস থেকে সৃষ্টি হয়েছিল এগুলো। ঢাকার ‘কিশোর পত্রিকা’ ও ‘কিশোর তারকালোক’-এর নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয়তা আজ স্মৃতি। এ ছাড়া ‘ছোটদের কাগজ’, ‘দুরন্ত’ ও ‘মৌলিক’ ছোটদের পত্রিকা। ‘ধান শালিকের দেশ’, ‘শিশু’, ‘নবারুণ’ ও ‘সবুজ পাতা’ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় চলছে।

কিশোরকণ্ঠ : দেশের সর্বাধিক প্রচারিত শিশু-কিশোর মাসিক
উপরে বর্ণিত শিশু-কিশোর পত্রিকার পাশাপাশি বাংলাদেশের ব্যতিক্রম ও বিস্ময়কর স্থান দখল করে আছে একটি পত্রিকা, যার নাম কিশোরকণ্ঠ অতঃপর নতুন কিশোরকণ্ঠ!। জাতির শিশু-কিশোরদের মন ও মননের বিকাশের ক্ষেত্রে পিতা-মাতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি মিডিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর শিশু-কিশোরদের প্রতি দায়বদ্ধতা সবচাইতে বেশি রাষ্ট্র বা সরকারের পাশাপাশি জাতির সচেতন ও দেশপ্রেমিক মানুষদেরও কোন অংশে কম নয়। জাতির সেই প্রত্যাশা পূরণের জন্য দেশের সৎ দক্ষ দেশপ্রেমিক ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একঝাঁক তরুণ কিশোরকণ্ঠ নামে একটি মাসিক শিশু-কিশোর পত্রিকা প্রকাশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, যার মূল স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন গানের পাখি কবি মতিউর রহমান মল্লিক। ১৯৮২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রথম প্রকাশিত হয় কিশোরকণ্ঠ নামক শিশু-কিশোর মাসিক পত্রিকাটি, যার শ্লোগান হলো ‘কিশোরকণ্ঠ পড়বো জীবনটাকে গড়বো’। কিশোরকণ্ঠ প্রকাশের পর থেকেই পরিণত হয় দেশের অগণন শিশু-কিশোরের প্রিয় পত্রিকায়। ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, এমনকি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সার্কভুক্ত দেশ তথা ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, ভুটান, আফগানিস্তানসহ সমগ্র এশিয়া মহাদেশ এবং আফ্রিকা, ইউরোপ, ওশেনিয়া ও আমেরিকা মহাদেশে। এত বহুল প্রচারিত পত্রিকাটির পরিবহনের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন না থাকাটা একটি সমস্যা হিসেবে দেখা দেয় বিধায় এই জনপ্রিয় পত্রিকাটির রেজিস্ট্রেশনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় ২০০৩ সালে। অতঃপর পত্রিকার রেজিস্ট্রেশন হয় ২০০৪ সালের মার্চ মাসে। তবে পত্রিকাটির অফিসিয়াল নাম হয়ে যায় ‘নতুন কিশোরকণ্ঠ’। কিশোরকণ্ঠই একমাত্র পত্রিকা যা প্রকাশের পর থেকে এ পর্যন্ত দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে প্রকাশিত হয়ে আসছে কোন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া। অনেক কষ্ট, সঙ্কট মোকাবেলা করতে হয়েছে কিশোরকণ্ঠকে কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রতি মাসে পত্রিকাটি পৌঁছে যাচ্ছে অগণন পাঠকের হাতে। এজন্য আমরা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি।
কিশোরকণ্ঠ আজ শুধু একটি পত্রিকার নাম নয়, এটি রূপ লাভ করেছে একটি প্রতিষ্ঠানে, একটি আন্দোলনে!। কালের পরিক্রমায় আজ এক মহীরুহ রূপ ধারণ করেছে। কিশোরকণ্ঠের প্রচারসংখ্যা প্রায় দুই লাখ হলেও মূলত দুই লক্ষ পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্য দেশের জনপ্রিয় এই মাসিক। তাইতো আজ লাখো পাঠকের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়Ñ
কিশোরকণ্ঠ পড়বো জীবনটাকে গড়বো
ফুলের মত ফুটব মোরা জ্ঞানের আলোয় জ্বলবো
আমরা হব ভোর বিহানে পাখির কলরব
জাগিয়ে দেব ঘুমিয়ে থাকা মানুষগুলো সব
যে জানে না জ্ঞান রাখে না
তার মত না হব
তাকেও টেনে তুলবো।
বড় হতে লাগে সবার বড় হৃদয় মন
বড় হৃদয় মন গড়ে দেয় শুধু অধ্যয়ন
অধ্যয়নে অন্ধ মনে
পায় যে আলোক পূর্ণ
সূর্য আলোক পূর্ণ
শূন্য হৃদয় পূর্ণতা পায় বইয়ের মাঝে ভাই
যদি সে বই সত্য পথের সঠিক দিশা দেয়
যে জানে না জ্ঞান রাখে না
তার মত না হব
তাকেও টেনে তুলবো।

কিশোরকন্ঠ সবার
কিশোরকণ্ঠ নামটি দ্বারা নিতান্তই ছোট্ট কিশোর বালককে বুঝালেও আজ কিশোরকণ্ঠের বয়স ৩০। ৩০ বছর একজন ব্যক্তির জন্য গড় আয়ুর অর্ধেকের বেশি হলেও একটি জাতি গঠন এবং ইতিহাস রচনায় সীমিত সময় বলা যায়। কিন্তু গুণে-মানে একটি কিশোর পত্রিকা সরকারি কোন সহায়তা ছাড়া তরুণ উদ্যোক্তাদের সহায়তা ও বিজ্ঞাপনে নিজের ঘর-সংসার সামলিয়ে কবি সাহিত্যিকদের দুঃখের ঘরের ভাঙা খুঁটি ঠেলে ধরা দুঃসাধ্য কাজ। তথাপিও কিশোরকণ্ঠ এগিয়ে চলছে আপন গতিতে। তৈরি করেছে অগণিত ছড়াকার, কবি, সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক। আবার অনেক সাহিত্যিকদেরকে কবিদেরকে শিশু-কিশোরদের উপযোগী লেখার দিকেও টেনে এনেছে কিশোরকণ্ঠ। তাইতো কিশোরকণ্ঠের এক সময়কার নাছোড়বান্দা সহকারী সম্পাদক নূরুল ইসলাম ভাইয়ের তাড়নায় জীবনের প্রথম কিশোর উপন্যাস লিখে কবি আবদুল হাই শিকদার বলেছেন- ‘তাড়নার ভয়ে অস্থির হয়ে লিখে ফেলেছিলাম বাঘ বাহাদুর। কিন্তু ভেতরে ভেতরে কিশোরকণ্ঠের প্রতি আলাদা সমীহ জন্ম নিল আমার মধ্যে। আমার মত অলস ও কিছুটা ফাঁকিবাজ লেখককেও যারা লেখার টেবিলে বসতে বাধ্য করতে পারে, আদায় করতে পারে লেখা, তাদেরকে শুধু সমীহ নয়, ভালো না বেসে করবো কী? অতএব ভালোবেসে ফেললাম। আর একে একে বেরোল আমার ২২টি বই। অর্থাৎ পত্রে-পুষ্পে ভরে উঠলো আমার একটি অঙ্গন। আমি মুক্ত কণ্ঠে গলা ফাটিয়ে বলতে পারি, এই অঙ্গনের মালিক-মোখতার সবই কিশোরকণ্ঠ। কিশোরকণ্ঠের কাছে আমার অনেক ঋণ। সে জন্য কৃতজ্ঞতাবোধ আমার অনেকখানি। সালাম কিশোরকণ্ঠ।’
কিশোরকণ্ঠ শুধুমাত্র শিশু-কিশোরদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, সব বয়স আর মন ও মননের মানুষের হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়ে কিশোরকণ্ঠ। আবু জিবরানের ভাষায়, ‘কিশোরকণ্ঠ বাংলাদেশে একটি ব্যতিক্রমী পত্রিকাকেন্দ্রিক ঐতিহ্যিক পরিবার। যে পরিবারের সাথে সংযুক্ত হয়ে গেছে প্রবীণ, মধ্যবয়সী ও তরুণ-কিশোর। এই তিনটি প্রজন্মই কিশোরকণ্ঠের লেখক, পাঠক, ভক্ত ও অনুরক্ত। একটি পরিবারে মাসের প্রথমে কিশোরকণ্ঠ প্রবেশ করলেই পড়ে যায় পত্রিকাটি নিয়ে তিন প্রজন্মের কাড়াকাড়ি। কে কার আগে পড়বে, তাই নিয়ে বেধে যায় তুমুল হুল্লোড়। পরিবারের একেবারে ছোট্ট শিশুটি পর্যন্ত, যে সবেমাত্র বর্ণ পরিচয় নিয়ে খেলা করছে, সেও হুমড়ি খেয়ে পড়ে কিশোরকণ্ঠের ওপর। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়াসহ সমগ্র বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটা একটি বিরল ও বিস্ময়কর ব্যাপার বৈকি! মজার ব্যাপার বটে যে এই তিন প্রজন্মই কিশোরকণ্ঠের লেখক। দাদা, পিতা, সন্তানÑএকই সাথে কিশোরকণ্ঠের লেখক ও পাঠক। এটাও ব্যতিক্রমী একটি বিষয়। মূলত কিশোরকণ্ঠের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা থেকেই এ ধরনের আবেগাপ্লুত স্রোতধারা বয়ে চলেছে। এই তিন প্রজন্মকে সাথে নিয়েই কিশোরকণ্ঠ পরিবারের চাঁদের হাট।’ কিশোরকণ্ঠ পরিণত হয়েছে আজ সকল প্রাণের জয়ধ্বনিতে। প্রথিতযশা কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষাবিধ অধ্যাপিকা জুবাইদা গুলশান আরা বলেছেন, ‘কিশোরকণ্ঠ নামটি মোটামুটিভাবে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে সব বয়সের মানুষের কাছে, পাঠকের ইচ্ছে এবং সৃষ্টির আনন্দ নিয়ে হাজির হয় সে। অর্থাৎ সবার সঙ্গেই তার সখ্য। বন্ধুতা। সেই শিশু, যে একদিন ছেলেবেলায় কিশোরকণ্ঠের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল, দীর্ঘ সময়ের স্রোত বেয়ে সে হয়ে উঠেছে যুবক। এমন কী লেখকও। সময়কে ধরে রেখেছে হৃদয়ে। শিশু বৈচিত্র্য বা আনন্দ নয়। কিশোরকণ্ঠ একটি নীরব আন্দোলন। মানসিক বিকাশের। চিন্তার। সহমর্মিতা ও ঐতিহ্য চর্চার মাধ্যম হয়ে সে নীরবে কাজ করে যাচ্ছে। আর একটি কথা অবশ্যই বলবো। তা হলো, একই ধরনের লেখা নয়, বিষয় বৈচিত্র্য কিশোরকণ্ঠের একটা বাড়তি গুণ। বিজ্ঞান, কল্পকাহিনী, ধর্মীয় চিন্তা, রহস্য-রোমাঞ্চ, ভ্রমণ, মজার স্বাদের ফিচার আরও অনেক কিছু নিয়ে সাজানো এই ছোট্ট পত্রিকাটি। অত্যন্ত নিয়ম মেনে চলা নিবেদিতপ্রাণ একদল কর্মী সম্পাদকের সার্বক্ষণিক শক্তি। দেশের প্রায় সকল গুণীজনের স্নেহ কেড়ে নিতে সক্ষম হয়েছে কিশোরকণ্ঠ।’

কিশোরকণ্ঠের অন্যান্য কার্যক্রম
সাহিত্য আসর : আগামী প্রজন্মের জন্য একঝাঁক সাহসী ও দেশপ্রেমিক লেখক-কবি ও সাহিত্যিক তৈরির উদ্দেশ্যে খুদে কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে আয়োজন করে নিয়মিত সাহিত্য আসরের। সেখানে স্বরচিত লেখা পাঠ ও আলোচনার মাধ্যমে শুদ্ধ ধারার সাহিত্যচর্চায় উৎসাহিত করা হয়। দিকনির্দেশনা দেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয় প্রথিতযশা কবি-সাহিত্যিকদের।
পাঠক ফোরাম গঠন : কিশোরকণ্ঠ পাঠকদেরকে নিয়ে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায়-উপজেলায় এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘কিশোরকণ্ঠ পাঠক ফোরাম’ গঠন করে নতুন ছাত্রদেরকে পাঠ্যসূচির পাশাপাশি নৈতিক জ্ঞানার্জনে উদ্বুদ্ধ করে চলেছে। মেধা ও মননের বিকাশ এবং দেশপ্রেম ও চারিত্রিক মূল্যবোধ সৃষ্টি, শৃঙ্খলাবোধ, সময়ানুবর্তিতা ও কর্তব্যবোধে উজ্জীবিতকরণ পাঠক ফোরামের নিয়মিত কাজ।
সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ : কিশোরকণ্ঠ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ফ্রি কোচিং ক্লাস, দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রদেরকে আর্থিক সহায়তা প্রদান, ফ্রি ব্লাড গ্রুপিং, বৃক্ষরোপণ ও স্কুল আঙিনা পরিষ্কার অভিযানসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে আগামী প্রজন্মকে সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণে উৎসাহ প্রদান করা হয়।
মেধাবীদের স্বীকৃতি প্রদান : মেধাবীরাই পারে আগামীর বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে পরিচয় করিয়ে দিতে, সুতরাং তারাই আমাদের একমাত্র প্রত্যাশার আলোকবর্তিকা। তারাই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে উত্তরোত্তর সফলতার দিকে। কিশোরকণ্ঠ ফাউন্ডেশন তাদেরকে আরো আত্মপ্রত্যয়ী ও সাহসী হওয়ার জন্য প্রতি বছর জেএসসি-জেডিসি ও এসএসসি-দাখিল জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের কৃতী এবং মেধাবী সংবর্ধনার আয়োজন করে থাকে।
ক্রীড়া কার্যক্রম : এতো কাজের মধ্যেও কিশোরকণ্ঠ ফাউন্ডেশন ছাত্রদেরকে পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলায় উৎসাহ প্রদান করে থাকে। কেননা, সুস্থ দেহে সুস্থ মনÑ এ কথা সর্বজনস্বীকৃত। আন্তঃস্কুল ক্রিকেট ও ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন তারই বহিঃপ্রকাশ।
প্রতিযোগিতার আয়োজন : পড়ালেখার পাশাপাশি জ্ঞানের ভাণ্ডারকে আরো সমৃদ্ধ করতে কিশোরকণ্ঠ ফাউন্ডেশন বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসকে সামনে রেখে নানাবিধ প্রতিযোগিতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করে থাকে। কিশোরকণ্ঠ পাঠ প্রতিযোগিতা, সাধারণ জ্ঞানের আসর, কুইজ, বিতর্ক, গল্প লেখা ও রচনা প্রতিযোগিতা এর মধ্যে অন্যতম।
শিক্ষাকার্যক্রম : অ্যাকাডেমিক লেখাপড়ার পাশাপাশি ছাত্রদেরকে যোগ্য নেতৃত্ব হিসেবে তৈরির লক্ষ্যে কিশোরকণ্ঠ ফাউন্ডেশন বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস ও বাংলাদেশের লোকজ ঐতিহ্য পহেলা বৈশাখ, নবান্ন উৎসবকে সামনে রেখে শিক্ষা সফর, সামষ্টিক ভোজ, পাঠচক্র ও বিজ্ঞান মেলার আয়োজন করে থাকে।
কিশোরকণ্ঠ লেখক সম্মেলন ও সাহিত্য পুরস্কার : ২০০২ সাল থেকে কিশোরকণ্ঠ ফাউন্ডেশন একটি শিশু-কিশোর পত্রিকার মাধ্যমে দেশের কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে লেখক সম্মেলন বাংলাদেশে প্রথম সূচনা করে। সুষ্ঠু ও গঠনমূলক সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে এই সম্মেলন এক যুগান্তকারী আয়োজন। এ সম্মেলন সকল আধিপত্যবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে দেশপ্রেমিক লেখক, কবি ও সাহিত্যিক তৈরির ও প্রেরণার এক বাতিঘর। প্রথম লেখক সম্মেলন থেকেই স্বনামধন্য লেখক, কবি ও সাহিত্যিকদের সম্মাননা প্রদান করা হয়। এটিও এদেশের ইতিহাসে প্রথম সংযোজন।
২০০২ সাল থেকে শুরু করে ২০১১ সাল পর্যন্ত শিশু-কিশোর সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য যারা কিশোরকণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন :
২০০২ সাল : সানাউল্লাহ নূরী (মরণোত্তর), কবি আল মাহমুদ, অধ্যাপিকা জুবাইদা গুলশান আরা, সাংবাদিক আবুল আসাদ, আবদুল মান্নান তালিব।
২০০৩ সাল : সৈয়দ আলী আহসান (মরণোত্তর), অধ্যাপক শাহেদ আলী (মরণোত্তর), কবি গোলাম মোহাম্মদ (মরণোত্তর), কবি মতিউর রহমান মল্লিক, কবি মোশাররফ হোসেন খান।
২০০৪ সাল : ড. কাজী দীন মুহম্মদ, আফজাল চৌধুরী, কবি আসাদ বিন হাফিজ।
২০০৫ সালে সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করা হয়নি।
২০০৬ সাল : প্রফেসর চেমন আরা, কবি আবদুল হাই শিকদার, মাহবুবুল হক।
২০০৭ সাল : আবদুল মান্নান সৈয়দ, শাহাবুদ্দীন আহমদ (মরণোত্তর), সাজজাদ হোসাইন খান।
২০০৭ সালের পর থেকে প্রতি দুই বছর অন্তর সাহিত্য পুরস্কার প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
২০০৯ সাল : কবি ফররুখ আহমদ (মরণোত্তর), কবি আসাদ চৌধুরী, কবি জাহানারা আরজু।
২০১১ সাল : কথাশিল্পী আতা সরকার, কথাশিল্পী দিলারা মেসবাহ্, কবি সোলায়মান আহসান।
কিশোরকণ্ঠের দীর্ঘ পথ চলাকে যাঁরা আগলে রেখেছেন
উপদেষ্টা : শুরু থেকে এ পর্যন্ত অনেক হাত মাড়িয়ে দীর্ঘদিন কিশোরকণ্ঠ পরিবারের সাথে থেকে বর্তমানে উপদেষ্টার পদ অলঙ্কৃত করে আছেন দেশের প্রধান কবি, আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অহঙ্কার আল মাহমুদ। কবির ৭৭তম জন্মদিনের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে কবি বলেন, ‘আমি বহুদিন ধরে কিশোরকণ্ঠের সাথে পরিচিত এবং তাদের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড, অনুষ্ঠানাদিতে অংশগ্রহণ করে থাকি।’
সম্পাদক : তিন দশকে ১৪ জন সম্পাদকের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন এ সময়ের বিশিষ্ট কবি, শিশু সাহিত্যিক ও ঔপন্যাসিক মোশাররফ হোসেন খান।
প্রকাশক :  কিশোরকণ্ঠের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা কবি মতিউর রহমান মল্লিক দীর্ঘদিন প্রকাশকের দায়িত্ব পালন করে ২০০৮ সালে মহান রবের দরবারে পাড়ি জমানোর পর দায়িত্ব পালন করছেন মতিউর রহমান আকন্দ।
প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ : শিল্পী হামিদুল ইসলাম তার নিপুণ হাতের রঙতুলি দিয়ে তখন থেকে কাজটি করে আসছেন।

কিশোরকণ্ঠে প্রকাশিত লেখা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে-
কিশোরকণ্ঠ গল্পসমগ্র-১, কিশোরকণ্ঠ উপন্যাসসমগ্র-১, কিশোরকণ্ঠ সায়েন্স ফিকশন সমগ্র-১, সাহসী মানুষের গল্প, মোরা বড় হতে চাই-এর মত জনপ্রিয় বই। এই ধারা এখনও অব্যাহত আছে। সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায়- কিশোরকণ্ঠের তুলনা কেবল কিশোরকণ্ঠই। মহান রব কিশোরকণ্ঠকে দীর্ঘজীবী করুন এবং এর সকল প্রকার তৎপরতা অব্যাহত রাখার তৌফিক দান করুন। আজকের দিনে এটাই আমাদের একান্ত কামনা।

 

SHARE

1 COMMENT

  1. আমাদের দেশের শিশু-কিশোরদের আরো ভাল লেখা চাই

Leave a Reply