Home ফিচার হাজার পাউন্ডের প্রশ্ন গরম পানি কেন অধিকতর দ্রুত জমে?

হাজার পাউন্ডের প্রশ্ন গরম পানি কেন অধিকতর দ্রুত জমে?

মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম..

ব্রিটেনের রাজকীয় রসায়ন সমিতি (রয়াল সোসাইটি অফ কেমিস্ট্রি) এমপেমবা বাস্তবতা সম্পর্কিত ধাঁধার সমধানের জন্য ১০০০ (এক হাজার) পাউন্ড পুরস্কার ঘোষণা করেছে। এটা কিন্তু মোটেই সোজা-সাপ্টা ব্যাপার নয়।
গরম পানি কেন ঠাণ্ডা পানির তুলনায় অধিকতর দ্রুত জমে বরফ হয় এর ব্যাখ্যা তুমি যদি জুলাই মাস শেষ হওয়ার আগেই দিতে পারো তাহলে তুমি ১০০০ পাউন্ড জিতে নিতে পারবে। দ্য রয়াল সোসাইটি অব কেমিস্ট্রি (আরএসসি) এমপেমবা বাস্তবতা নামে পরিচিত এই বিষয়ের “সবচেয়ে সৃজনশীল ব্যাখ্যার” জন্য ঐ পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছে। তারা বলেছেন যে, ব্যাখ্যা হতে হবে “নজর-কাড়া, আকর্ষণীয় এবং বৈজ্ঞানিকভাবে সুষ্ঠু” এবং এক্ষেত্রে ফিল্ম সহ যে কোন মিডিয়া ব্যবহার করা যেতে পারে।
মাস শেষে সমস্যাটি হারমেস ২০১২ নামক পোস্ট গ্রাজুয়েট বিজ্ঞানের ছাত্রদের একটি আন্তর্জাতিক সামার স্কুলে উত্থাপন করা হবে। উল্লেখ্য, ম্যাটেরিয়ালস সাইন্স গবেষণা উপস্থাপনের লক্ষ্যে উইন্ডসর গ্রেট পার্কের কাম্বারল্যান্ড লজে ঐ স্কুলের আয়োজন করা হয়েছে। আরএসসির সহযোগিতায় ইম্পেরিয়াল কলেজ আয়োজিত ঐ অনুষ্ঠানকে এক ধরনের বৈজ্ঞানিক অলিম্পিয়াডের আদলে অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সকল ভাল কৌতুক-এমপেমবা বাস্তবতা ব্যতিত প্রথম মোকাবেলায় বৈজ্ঞানিক নির্বোধ ধ্যানধারণা বলে মনে হয়। কিভাবে গরম পানি ঠাণ্ডা পানির তুলনায় অধিকতর দ্রুত জমে বরফ হতে পারে? জমে বরফ হওয়ার উদ্দেশ্যে গরম পানিকে ঠাণ্ডা পানির তুলনায় অধিকতর বেশি তাপ হারাতে হবে। সুতরাং কেন এটা অধিকতর দ্রুত ঘটবে? এমন কি যদি গরম পানির ঠাণ্ডা হওয়ার গতি অধিকতর ঠাণ্ডা পানির ঠাণ্ডা ধরেও ফেলে কেন এটা তখন ছাড়িয়ে যাবে, যদি দুটো পানি একই তাপমাত্রার পর্যায়ে থাকে?
তবুও এই বাস্তবতা প্রাচীনকাল থেকে সত্যায়িত। এরিস্টোটল এটা উল্লেখ করেছেন, আধুনিক বিজ্ঞানের দুই জনক ফ্রান্সিস বেকন এবং রেনে ডেসকারটেসও সপ্তদশ শতাব্দীতে এটা উল্লেখ করেছেন। এই বাস্তবতাকে আজ তাঞ্জানিয়ার স্কুলবালক ইরাসটা এমপেমবার নামে নামকরণ করা হয়েছে। এমপেমবা ১৯৬০ এর দশকে দুধ থেকে আইসক্রিম তৈরির প্রজেক্ট দাঁড় করিয়েছিল। ছাত্রদের তাদের দুধ জ্বালানো, এটাকে ঠাণ্ডা হতে দেওয়া এবং এরপর হিমায়িত করার জন্য এটাকে ফ্রিজে রাখার কথা ছিল। কিন্তু এমপেমবা ফ্রিজে তার জায়গা হারানোর ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে এবং সেকারণে দুধ গরম অবস্থায়ই ফ্রিজের মধ্যে রেখে দেয়। আর আশ্চর্যজনকভাবে এটা অন্যদের তুলনায় দ্রুত জমে বরফ হয়ে যায়।
এমপেমবা যখন কয়েক বছর পর জানলেন যে, এটা আইজাক নিউটনের উদ্ভাবিত তাপ স্থানান্তর তত্ত্বের বিরোধী তখন তিনি দার এস সালাম থেকে আগত সফররত বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক ডিজি অসবোর্নকে জিজ্ঞাসা করলেন এক্ষেত্রে কী ঘটেছে। অসবোর্ন তার টেকনিশিয়ানকে পরীক্ষাটির পুনরাবৃত্তি করতে বললেন এবং ১৯৬৯ সালে তিনি একটি পদার্থবিদ্যা শিক্ষা জার্নালে ফলাফল প্রকাশ করেন।
তবুও প্রকৃতপক্ষে কেউ জানে না, এমপেমবার কাজের ফলাফল বাস্তব কিনা। কলোরাডোর বোলডারে অবস্থিত ন্যাশনাল সেন্টার ফর এ্যাটমোস্ফোরিক রিসার্চ এর বরফ বিশেষজ্ঞ চার্লস নাইট বলেন, এই দাবি এতটাই দুর্বল-সংজ্ঞায়িত যে এটা কার্যত অর্থহীন। এতে কি বুঝা যায় যে, বরফ কখন দৃষ্টিগোচর হতে শুরু করে এবং কখন পানির শেষ অংশটুকু জমে বরফ হয়।
যাই ঘটুক না কেন উভয়ই পর্যবেক্ষণ করা কঠিন। এখানে এত বেশি জিনিস আসে যা তুমি পরিবর্তন করতে পারবে : পানির পরিমাণ, পাত্রের আকার, প্রাথমিক তাপমাত্রার পার্থক্য, ঠাণ্ডা হওয়ার হার ইত্যাদি। তুমি কি ট্যাপের পানি, পাতিত পানি, বায়ুবিহীনকৃত পানি, ফিলটারকৃত পানি ব্যবহার করছো? হিমায়িত হওয়া সুবিদিতভাবে খেয়ালি বিষয় : ফ্লাস্কের পাশের ক্ষুদ্র আঁচড় অথবা তরল পদার্থে ভাসমান ধূলিকণার মাধ্যমে এর সূত্রপাত হতে পারে, সুতরাং শুধুমাত্র শুরুর তাপমাত্রা ভেদে সত্যিকারভাবে একই রকম নমুনা তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। এ কারণে এমনকি একই সময়ে শুরু করা দুটি নমুনা বৈশিষ্টসূচকভাবে ভিন্ন সময়ে বরফে পরিণত হতে পারে।
এমপেমবার পর্যবেক্ষণের একটা মামুলি ব্যাখ্যা আছে। গরম পানি অধিকতর দ্রুত বাষ্প হয়ে উড়ে যাবে, সুতরাং ফ্লাস্কের ওপর কোন ঢাকনা না থাকলে হিমায়িত হওয়ার জন্য কম পানি অবশিষ্ট থাকবে-এটা দ্রুত ঘটবে। দ্রবণে গ্যাসের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বুদবুদ বরফের স্ফটিকের জন্য বীজ হিসেবেও কাজ করতে পারে-এবং গরম পানি ঠাণ্ডা পানির তুলনায় কম দ্রবীভূত গ্যাস ধারণ করে।
এই সবগুলোতে বুঝা যায় যে, কোন একক পরীক্ষায় তুমি বেশি কিছু জানতে পারবে না- তোমাকে সম্ভবত কোনটা গুরুত্বপূণ এবং কোনটা নয় তা খুঁজে বের করতে বহু ভিন্ন পরিবেশে বহুকিছু করতে হবে। আর তুমি পেয়েছো মাত্র এক মাস সময়, সুতরাং কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ো।
(ব্রিটেনের দা গার্ডিয়ান পত্রিকা অবলম্বনে।)

SHARE

Leave a Reply