Home উপন্যাস রিনির ভুবনখানি

রিনির ভুবনখানি

দিলারা মেসবাহ..
ফুলের বনে যার পাশে যাই
ছয়টি চড়–ই গালগল্পে মত্ত। কিচিরমিচির … কিচিরমিচির … কিচ কিচ! দক্ষিণ দিকের ঝাপড়া টগর গাছটার কাছে কয়টা ঝগড়াটে ভাতশালিক কলহ করছিল বোধ হয়। রিনির অপূর্ব সকাল বেলাটা যেন নরম মসলিনের পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। আহ … তুলনাহীন এই ভোরবেলা। মাথার ওপর দিগন্তজোড়া আসমানিরঙ আকাশ। রিনি তার নিজে হাতে গড়ে তোলা ছাদের বাগানে আসে রোজ। তার এ ব্যাবিলনের শূন্যোদ্যানে নীলজাতের ফুল লতাগুল্ম। মজার ব্যাপার ঝোপালো গাছের ফাঁকে পাখিরা জটলা পাকায় খোশগল্প করে। রিনি গুণ গুণ করে গায়, ‘ফুলের বনে যার পাশে যাই/ তারেই লাগে ভালো।’ ও যেন টের পায় তার পায়ের শব্দ পেয়ে ফোটা ফুলগুলো হাসছে আর গাঢ় সবুজ পাতারা হাসছে। ‘রয়্যাল প্লাজা’ গ্রিনরোডের এই ফ্ল্যাট বাড়িটার ছাদের বাগান রিনি নামের দরদি মেয়েটির প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেয়ার অমূল্য বেহেশত। রিনি প্রায় পাঁচ বছর ধরে নানা জাতের ফুল লতা অর্কিড লিলি লাগিয়েছে। লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে ও গাছগুলোর যতœ নেয়। গোড়া নিড়ায়। ঘাসগুলো বেছে বেছে ফেলে দেয়। রিনির গাছ ফুল-লতার পরিচিতি বর্ণনা দেয়া সচিত্র বই আছে বেশ কয়েকটি। মা নুসরাত এগুলো মেয়েকে কিনে দিয়েছেন। আর আছে কাঁচি, নিড়ানি, ¯েপ্র করার বোতল। রিনি প্লাস্টিকের ঝুড়িতে সবকিছু গুছিয়ে রাখে। শুধু কি তাই, ডিমের খোসা একটিও ডাস্টবিনে ফেলতে পারে না বেদানা বুয়া। আর চায়ের ফেলে দেয়া পাতি। জমতে থাকে ডিমের খোসা পাটায় বেটে চা পাতার সঙ্গে মিশিয়ে রিনি প্রাকৃতিক সার দেয় গাছগুলোর গোড়ায়। কী স্বাস্থ্যবান হয়েছে গাছ-লতা! ফুলও ফোটায় অগুন্তি। বেগম নুসরাতও গাছগাছড়ার জন্য পাগল।
রিনি যখন চুম্বক আকর্ষণে ছাদে এসে শান্তি পায় তখন যেন হাসিমুখে বাগানবিলাস, রঙ্গন নয়নতারা অভ্যর্থনা জানায়, সাদর অভ্যর্থনা। ডাগর ডাগর চোখ মেলে রিনি তাকায় পশ্চিম আকাশে-আকাশের গায়ে হালকা রক্তরেখা? ঝোপানো জবাগাছে ঘনপাগড়ির হলুদ ফুলগুলো টর্চলাইটের মতো ওর দু’চোখে আলো ছড়াতে থাকে। সফেদ সকালে দূরের ফ্ল্যাট বাড়িগুলোর মাথা মনে হয় মিহি রেশমের ওড়না ঢাকা। কুয়াশা কুয়াশা। এসব দৃশ্যপট রিনির মনটাকে আরো কোমল প্রাণবন্ত করে তোলে। টবগুলো যতœ করে সাজিয়েছে ও নিজের হাতে। ঝলমলে লাল-সবুজ রঙে রাঙানো বিভিন্ন ডিজাইনের টব তরতাজা গাছপালা ফুল-লতা যে কারো চোখ জুড়িয়ে দেবে। আর ঐ উদার অসীম আকাশ। পরতে পরতে যার মেঘের পানসি উড়ছে। যারা সাতজন্মে নিঃসীম ঐ আকাশ দেখতে শেখেনি তারা কেমন করে খুশি থাকে জানে না রিনি। ওর খুব কাছের বন্ধু নীলাইতো আকাশ দেখতে শেখেনি। ও বলে, দুর ছাই আকাশ আবার দেখতে হয় নাকি! কী আছে ওতে এমন ঘটা করে দেখবার! ঐতো খোলা আসমান! ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না। মেঘের রাজত্ব্ কখনও ঘোলাটে। রঙই বোঝা যায় না। ঐ আকাশ আবার ঘাড় কাত করে অবাক হয়ে দেখার কী আছে? রিনি তোর না কেমন বোকা বোকা পাগলামি। এমন ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট হয়ে এসব পানসে পানসে আবেগ দিয়ে কী হবে, বলত?
রিনি খুব কষ্ট পায় বন্ধুর কাঠ কাঠ কথায়। মনে হয় নীলাদের প্রকৃতির পাঠটা মগজে ঢুিকয়ে দিতে পারলে তার জয় হতো। প্রকৃতি যে আমাদের কত বড় বন্ধু। কত উপকারী তা অনেক শিক্ষিত লোকজনও বোঝে না। গুরুত্বই দেয় না। অথচ প্রকৃতিকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা আর নিজের পায়ে কুড়াল মারা একই কথা। ঢাকার বাতাসে বিষের পরিমাণ যাচাই করলেই ব্যাপারটা বোঝা যায়। নানা কারণের মধ্যে গাছগাছড়ার ঘাটতি প্রধান। পিওর অক্সিজেনের জননী যে বৃক্ষ! অথচ প্রাচীন ছায়াময় বৃক্ষ মাঠ জলাশয় শেষ করে প্রতিদিন গজিয়ে উঠছে নতুন সাইনবোর্ড বারো তলা, ষোল তলা ফ্ল্যাটবাড়ি, বাণিজ্যভবন। শুধু ইট। ইটের পরে ইট, মাঝে মানুষ কীট।
নীলাদের তিনশ’ স্কয়ারফিটের ঝকঝকে তকতকে ফ্ল্যাটবাড়িতে যতেœ ছাড়া কোন গাছগাছড়া নেই। আছে কিছু দুর্লভ বনসাই, অর্কিড শপিংমল থেকে কিনে আনা। ওগুলো মলিন হলে শুকিয়ে গেলে চটজলদি সব সরিয়ে ফেলা হয়। আসে সুদৃশ্য সিরামিকের টবে নতুন ক্যাকটাস, অর্কিড, বনসাই। এসব ক্ষণিক শোভা বর্ধনের জন্য। এর বেশি কিছু নয়Ñ ভালোবেসে তো নয়ই। নীলার বাবা একটু অন্যরকম। উনি ব্যস্ত শিল্পপতি। কিন্তু সকালের কফি ব্যালকনিতে বসে আয়েশ করে পান করেন। দুই-একটা বনসাই অর্কিড মন্দ লাগে না তাঁর।
নীলার মা তানজিলা চৌধুরী বছরে একবার তাদের বহুমূল্য সোফার কভার চেঞ্জ করেন। কভারের রঙের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পর্দা কেনেন। তাঁর বহুমূল্য শোপিস ক্রিস্টাল আসবাব ঝাড়বাতি সবই চোখ ধাঁধানো। কিন্তু গাছগাছড়া? অসম্ভব। টবের মাটিতে নাকি কেঁচো হয়। সর্বনাশ একটা কিলবিলে কেঁচো দেখলে মা মেয়ে তখনই সেন্সলেস হয়ে যাবেন। নীলার এসব মনভাঙা কথাবার্তা শুনে রিনির নরম মনটা অযথাই কঁকিয়ে ওঠে। সবুজপাতার ঘোমটা ডাকা রঙিন ফুল রিনি প্রতিদিনের আনন্দের আঁধার। মানসিক প্রশান্তির অব্যর্থ মলম। কেন এমন শিক্ষিত লোকেরা বোঝে না সবুজ পাহারা ছাড়া নির্মল অক্সিজেন কে দেবে এ সীসাময় বাতাসের ঢাকা শহরে? রিনির চোখের ডাক্তার বাবু ড. আলী আকবর বলেছেন চোখের জন্য সবুজ গাছপালার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকা খুব উপকারী। সবুজ রঙ আল্লাহপাকেরও পছন্দের রঙ।
জোছনা রাতে আকাশভরা বাঁধভাঙা চাঁদের হাসি দেখার জন্যও রিনি অন্তত আধঘণ্টার জন্য হলেও ছাদে যায়। সঙ্গে মাঝে মধ্যে বেদানা বুয়া থাকে। কখনও মামনি! কোজাগরী পূর্ণিমা, বুদ্ধ পূর্ণিমা প্রায় সব রূপোগলা চাঁদভাসা রাতে কিছুক্ষণের জন্য হলেও রিনি অমূল্য ভাললাগার সৌরভটুকু প্রাণে ভরে নেয়। কখনও সন্ধ্যামণির দল মিহি সুবাস দিয়ে আপ্যায়ন করেন দরদি এই মেয়েটিকে। আর কী হয় জানো তোমরা? ওরা অনেক কথা বলে রিনির সাথে। সুখ-দুঃখের কথা, হাজার কথা। যা আর কাউকে বলা যায় না। টগর গাছটি হয়তো বিনীত অনুরোধ জানায়, ‘আমাকে একটু সারমাটি দিওত ভাই রিনি। শরীরে অপুষ্টি হয়েছে। দোলনচাঁপারা বলছে আমি নাকি শুকিয়ে গেছি আগের সেই টলটলে ভাব নাকি নেই।’ রিনি টগর গাছের সারা শরীরে আদর করে হাত বুলিয়ে দেয়। আদর পেয়ে টগর বলে, ‘বেলী গাছটি বলেছে, ভাই টগর চিন্তা করো না। রিনি আপুকে বলো উনি ব্যবস্থা করবেন। এমন গাছদরদি মানুষ আর দেখি না। রঙ্গন গাছটির সঙ্গে বোন পাতিয়েছে টগর, সেও এই পরামর্শ দিয়েছে।’
আসলে পরীক্ষার চাপে ওদের সার দেয়ার কাজটি সময় মতো হয়নি। জমানো চা-পাতা আর ডিমের খোসার গুঁড়ো জমিয়ে রেখেছে বেদানা বুয়া লালবোতলটা ভরে। সন্ধ্যামণি গাছগুলো আরো তরতাজা ছিল ফুল ফুটত বেশুমার। আজ ওদেরও খানিক রোগা রোগা লাগছে বটে। রিনি নিজেকে অপরাধী ভাবে। মনটা একটু খারাপ হয়ে যায়। আসলে এতোগুলো ছানাপোনাদের সঠিক দেখভাল করার জন্য একলা মা নানীর তদারকি যথেষ্ট নয়। বেদানা বুয়া আর কতটুকু সময় দিতে পারে। রসুইঘরেই তো তার সারাটি দিন কাবার।
চারদিকে বর্ষবরণের বর্ণিল আয়োজন। বৈশাখ মাস। এসেছে নতুন বছর ১৪১৯ । এখন খানিক ঝিমিয়ে পড়া বাগানের টবে ড্রামে গাছগাছড়া আস্তে আস্তে সজীব হয়ে উঠছে। রিনির বড় ভালো লাগে। কেন যেন সন্ধ্যামণির লাজুক মৃদু আবেদন ওর মন ছুঁয়ে যায়। ওরা খুব বিনয়ী নম্র আদুরে। ফুলের রাজ্যে ওদের তেমন কোন কদর না থাকলেও রিনির কাছে ওরা খুব প্রিয়। পরদিন বিকেলে মুঠো মুঠো ঘরে তৈরি নির্ভেজাল সার গাছগাছড়ার গোড়ায় গোড়ায় নিড়ানি দিয়ে মিশিয়ে দেয় রিনি। ফিস ফিস করে বলে, ‘এবার খুশি হও সোনারা। তোমরা দোয়া করো যেন তোমাদের সেবা যতœ ঠিকমতো করতে পারি। তোমাদের সবুজ পাতার ফাঁকে নানা বর্ণের নানা নামের ফুলগুলো নম্র হাসির বেহেশতী আনন্দ আমাকে কোন রূপকথার রাজ্যে নিয়ে যায়, যার মূল্য আমি কোনদিন দিতে পারব না ভাই। তোমাদের কাছে আমি ঋণী থেকে যাবো চিরকাল। তোমরা ভালো থেকো কিন্তু। তোমাদের যা কিছু আর্জি আমাকে জানাবে কিন্তু। কষ্ট চেপে রেখে শরীর খারাপ করবে না।’ রিনির কণ্ঠস্বর মোলায়েম। এবার রঙ্গন গাছটি পাতাগুলো এদিক সেদিক দুলিয়ে বলে, ‘ভাই রিনি, দেখেছ বৈশাখী ঝড়ে আমার গোড়াটি আলগা হয়ে কেমন হেলে গেছে। আমি অনেকটা বিকলাঙ্গ গাছের মতো কাত হয়ে আছি। আমাকে একটা খুঁটি দিয়ে সোজা করে দাও। গোড়ায় মাটি দিয়ে শিকড়গুলো ঢেকে দাও সোনাভাই। বড় ব্যথা হচ্ছে, টনটন করছে সারা শরীর। আর আমার শরীর বেয়ে লতিয়ে উঠেছিল কুঞ্জলতাটি। সেটিও দিন দিন কেমন নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। রাতভর কত যে কান্নাকাটি করে মেয়েটি! ওরতো জাতিগোষ্ঠী কেউ নেই এ সংসারে। একটা পাতিকাকের ঠোঁট থেকে একটা কালো মিশমিশে বীজ পড়েছিল এই নরম মাটিতে। কয়দিন পর দেখি একটা ছোট্ট চারাগাছ ভীতু ভীতু চোখ মেলে তাকিয়ে দেখছে রোদ-হাওয়ার এ দুনিয়া। তরতরিয়ে ও বেড়ে উঠল। তুমিতো রোজ পানি দিতে। তারপর অবাক হয়ে দেখি সেদিনের ছোট্ট মেয়েটির ঝিরঝিরি সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে এত্তটুকুন জমাট রক্তের মতো রঙের ফুলের মেলা। ওতো লতানো গাছ। তাই সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। তাই অনুনয় করে বলল, ‘আন্টি তোমার ডালে একটু লতিয়ে উঠতে দেবে?’ আমি ওর কান্নাভেজা গলার আবদার ফেলতে পারি নাই। বেচারী এতিম লতাগাছটি। কুঞ্জলতা আমাকে জড়িয়ে জড়িয়ে বেড়ে উঠেছিল। এখন দেখ দু’জনারই কী হাল। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমার একটা ব্যবস্থা কর সোনা মেয়ে।’
রিনির দুই চোখ ভরে ওঠে অশ্রুফোঁটায়। হায় অসহায় বৃক্ষলতা! সারাদিন পাতা নেড়ে ফুলের হাসি দিয়ে কত কিছু যে বলতে চায় ওরা। কয়জনা বোঝে গাছগাছড়ার সুখ-দুঃখের কথা! সবাই শুধু বাইরের লোভটুকুই দেখে। মিহি কান্না হাসি শুনতে পায় না। রিনি যেন ওদের মনের কথা সত্যি সত্যি শুনতে পায়, বুঝতে পারে।
সিরাজী স্যার বলেছিলেন, ‘যাদের তৃতীয় নয়ন থাকে তারা পশুপাখি গাছগাছড়া দুর্বল অসহায় মানুষের না-বলা কথা বুঝতে পারে। হজরত সোলায়মান নবী পাখির ভাষা বুঝতেন। রিনির চোখ দুটোর মধ্যে ঠিকরে পড়ে অন্যরকম আলো। তুমি সবার চেয়ে আলাদা। তোমার মন খুঁজে বেড়ায় সত্যসুন্দর আলোর জগৎ। এটুকুন বয়সে এতখানি গভীর ভাবনা চিন্তার খেলা তোমার কচি মনে! এই ব্যাপারটি আমাকে বড় আনন্দ দেয় রিনি। তুমি শুধু মেধাবী ছাত্রীই নও, তোমার মধ্যে পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার সব লক্ষণ আমি দেখতে পাচ্ছি। দোয়া করি তুমি সবার মুখ উজ্জ্বল করবে।’ …
রিনির এই মুহূর্তে সিরাজী স্যারের স্নেহময় দোয়া খুব মনে পড়ছে। স্যার খুব বড় মাপের বিশাল মনের জ্ঞানতাপস। কালকেই একটা বাঁশের খুঁটি জোগাড় করে রঙ্গন গাছটিকে সোজা করে দিতে হবে। হামিদুল্লাহ চাচা রিনিদের পুরনো ড্রাইভার। চাচাকে বললেই যেভাবেই হোক জোগাড় করে দেবে বাঁশের খুঁটি। আইডিয়াটা মাথায় আসতেই রিনির মনটা ফুরফুরে প্রজাপতি হয়ে গেল। বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর প্রতি কৃতজ্ঞতায় শ্রদ্ধায় রিনির মন উদাস হয়ে যায়। গাছগাছড়া প্রাণ বোধ অনুভব আবিষ্কার করেন এই মহান বিজ্ঞানী দীর্ঘ গবেষণায়। রাঢ়িখালে তাঁর জন্ম। ছুটির দিনে এই কুমড়ো ফুল রঙের বিকেলে ছাদের এই প্রিয় বাগানে ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে রিনির মনটা তরতাজা হয়ে উঠেছে। রিনির মা সমঝদার মানুষ। তিনিও মেয়ের এ ছাদ-বাগানের জন্য সুযোগ পেলেই অনেক কিছু করে আনন্দ পান। তিনি সাইকোলজি নিয়ে মাস্টার্স করেছেন। তাঁর মনটাও সফেদ কাশফুলের মতো পেলব, দোলনচাঁপার মতো সুবাসিত। আত্মীয় বন্ধু সবার সঙ্গে কী মিষ্টি করেই না কথা বলেন। মায়াবী মমতা তাঁর দুই চোখে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। রিনির মা বলেন, ‘মানব জন্ম অমূল্য। মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত। সৃষ্টির সেরা। যদিও আমাদের আটপৌরে জীবনে দুঃখ আছে, কষ্ট যন্ত্রণা হতাশা আনন্দ কোনটিরই কমতি নেই। কিন্তু এই সবের মধ্যে থেকেও ভালো থাকার জন্য চেষ্টা করতেই হবে। দুঃখকে নাইলোটিকা পোনার মতো মনের গভীর দীঘিতে আদর করে লালন পালন না করে ঐ টলমল দীঘির পানিতে ফোটাতে হবে শাপলা পদ্মফুল। এই যে তোর বাগানে ফোটে বেলী, জুঁই, কামিনী। বাতাসে ঢেউ খেলে সুবাস। তোর মন খুশিতে ভরে ওঠে। তোর বন্ধুরা আসে খুশি হয়। এইতো পরম পাওয়া। ভুলে যা না কেন কোথায় ফুটছে বোমা, কোথায় পুড়ছে টায়ার। যে সমস্যাগুলো আমরা সহজে নিরাময় করতে পারছি না তা নিয়ে এখন ভেবে ভেবে মনকে কষ্ট দেয়া কেন? শরীরটাকেও সেইসাথে বিকল করা! সময় হলে ভাবতে হবে সমাজ সংসারের জন্য। কাজ করতে হবে বৈকি। আসলে আহ্লাদী মনটাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে তুষ্ট রাখা কার্যক্রম রাখাও জরুরি। কবি কী সুন্দর করে কথামালা সাজিয়েছেন,
…‘মনরে তুমি কৃষিকাজ জানো না
নইলে এমন মানবজমিন রইল পতিত
আবাদ করলে ফলতো সোনা।’…
আল্লাহ তো আমাদের কম করে কিছু দেননি। সব দিয়েছেন উজাড় করে। আরেক কবি লিখেছেন, ‘আমি অকৃতী অধম বলও তো মোরে কম করে কিছু দাওনি।’ …
রিনি মায়ের সুন্দর কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনে। কথাগুলো যেন তার কর্ণের ভেতর দিয়ে মর্মে প্রবেশ করে। রিনি মায়ের কাঁধ স্পর্শ করে বলে, ‘মা, তুমি কত ভালো মা। তোমার মনটাও আকাশের মতো অনেক অনেক বড়।’
আজ আসবেন তালেব চাচা সিরাজগঞ্জ থেকে। রিনির আদর্শ মানুষগুলোর তালিকায় তিনি অন্যতম। বিকেলের সূর্য নরম হয়ে আসছে। রিনি ব্যস্ত হয়ে উঠেছে তার প্রিয় বাগানে যাবার জন্য। শোন ছোট্ট প্রিয় বন্ধুরা, রিনির ছাদে দক্ষিণ দিকে আছে বনৌষধির গাছগাছড়া। নিম, ঘৃতকুমারী, তুলসি, থানকুনি, গন্ধভাদাললতা, পুদিনা, মেহেদী, হলুদ, আদা আরও কিছু গাছ-লতা। দুইটা বড় বড় ড্রামে আছে পুঁইলতা, সূর্যমুখী মরিচ। এই ড্রামে মৌসুমের নানাজাতের শাক হয়। অল্পখাকিনটা জায়গাজুড়ে অবশ্য। লালশাক, ডাঁটাশাক ভালই গজায়। গোবর সারের উর্বর মাটিতো! বেদানা বুয়া সবজি আর বনৌষধি গাছগুলোতে রোজ লম্বা পাইপ লাগিয়ে পানি দেয়। সে জন্য বেগম নুসরাত ওকে মাসকাবারি কিছু টাকা দেন। ঈদে পার্বণে সাহায্য সহযোগিতা করেন। বুয়ার মেয়ে টুলটুলির পড়ার খরচাও দেন। বেদানা বুয়াও গাছগাছড়া ভালোবাসে। ওর হাতের বীজ থেকে আল্লাহর রহমে হৃষ্টপুষ্ট চারা গজায়। ঐটুকুন ড্রামে গত বছর ভুট্টা হয়েছিল। আখ হয়েছিল। রিনির যে কী আনন্দ হয়েছিল! বেদানা বুয়া, রিনি ভুট্টা গাছের সামনে দাঁড়িয়ে অনেক ছবি তুলেছিল।

তালেব চাচার সঙ্গে রাঙা ভোর
গত সন্ধ্যায় তালেব চাচা এসেছেন। ভোরবেলা রিনিকে নিয়ে শূন্যোদ্যানে উঠলেন। বাগানের তরতাজা পত্রপল্লব আর ফুলের অভ্যর্থনায় বিমুগ্ধ চাচা। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে মোড়ায় বসলেন আয়েশ করে।
রিনিকে পাশের মোড়ায় বসিয়ে বললেন, ‘জানিস রিনি আল্লাহপাক গাছগাছড়ার মধ্যে ছড়িয়ে রেখেছেন তাঁর অমূল্য নেয়ামত। রোগবালাইয়ের মহৌষধ। মানুষ এখন এত ব্যস্ত, এত অস্থির যে টপাটপ ট্যাবলেট গিলে খালাস। এই সব ওষুধের যে কতরকমের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে তা জানা নেই। মুড়ি মুড়কির মতো মাথাব্যথা, হাঁটুব্যথা, গ্যাস্ট্রিক ইত্যাদির জন্য ফার্মেসি থেকে ট্যাবলেট ক্যাম্পসুল কিনে খাচ্ছে। এটা খুব বাজে অভ্যেস। জানিসতো নিমপাতা, কাঁচাহলুদ বেটে সাধারণ ত্বকের চুলকানিতে অন্তত সাতদিন লাগালে জাদুর মতো কাজ হয়। আর সর্দি কাশিতে তুলসিপাতা, আদা, শেফালীপাতা, বাসকপাতা ছেঁচে রস করে তাতে লোহার খুন্তির সরু দিকটা আগুনে খুব গরম করে ছ্যাঁকা দিতে হয়। তারপর পরিমাণমতো মধু মিলিয়ে তিন দিন তিনবেলা করে খেলে ঠাণ্ডালাগা কাশি বাপ বাপ করে পালাবে। তার সঙ্গে যদি লবণ মেশানো গরমপানি দিয়ে কুলকুচা করা যায় তবে তো কথাই নেই। ডাক্তারের চেম্বারে ধর্নাও দিতে হবে না। পকেটের পয়সাও খসবে না। বুঝলি রিনিমা। আর পা হাত মচকে গেলে কাঁচাহলুদ চুন আর সরষের তেল মিশিয়ে প্রলেপ দিলে বোঝা যায় তার কেরামতি। দুই তিন দিনেই ব্যথা হাওয়া। অবশ্য হাড় ভেঙে গেলে ডাক্তারের চেম্বারের দ্বারস্থ হতেই হবে। কাঁচা বেল পুড়িয়ে বা বেলসুঁট বানিয়ে রোদে শুকিয়ে বোয়াম ভরে রাখলে এবং হজমের সমস্যায় ঐ বেলসুঁটে ভেজানো লালপানি খালিপেটে কয়েকদিন খেলে খুব স্বস্তি মেলে। কাঁচা বেলের মোরব্বাও উপকারী পেটের পীড়ায়। আর শোন রিনিমা, থানকুনি পাতাকে আমাদের দেশের কোন কোন অঞ্চলে টাকামানিক বলে। বুঝলি তো মানিকে মানিক চেনে। এই পাতার রসও পেটের পীড়ায় অব্যর্থ। এর রসে গায়ের ত্বকের রঙ উজ্জ্বল হয়। এবার তোকে বলি ঘৃতকুমারীর গুণকীর্তনÑ অল্পযতেœ এই শাঁসসমৃদ্ধ ছোট ছোট গাছগুলো বেড়ে ওঠে।’
রিনি উৎসাহী গলায় বলে, ‘চাচা ঘৃতকুমারীর সবুজ দুইধারে কিছুটা কাঁটা কাঁটা ডাল ফেরিওয়ালাদের ঠেলাগাড়িতে ঝুলানো দেখেছি। গরমের দিনে কিছু নিম্নবিত্ত লোকের জটলা থাকে ঠেলাগাড়ির সামনে। ঘাম মুছতে মুছতে ওরা এগলোভেরার শরবত খায়। এর কী উপকার চাচা?’
চাচা হেসে উত্তর দেন, ‘অনেক গুণ রে মা। যুগ যুগ ধরে গাঁও গেরামের মানুষ এই রকম অমূল্য লতাগুল্মের শেকড়বাকড়ের রস খেয়ে রোগ নিরাময় করে আসছে। যদিও এখন আর আগের মতো জাত কবিরাজ নেই। ঔষধি গাছগাছড়াও হারিয়ে যাচ্ছে। গড়ে উঠছে লোকালয়। আর এ যুগের গ্রাম্য কবিরাজরা বনে বাদাড়ে ঘুরে ঘুরে সঠিক লতাপাতা জোগাড় করার মতো শ্রম ও মানসিকতা দুটোই হারিয়েছে কিন্তু অতি সম্প্রতি মানুষের মধ্যে কিছুটা বোধোদয় হয়েছে। সারা বিশ্বজুড়ে হার্বাল বা আয়ুর্বেদিক ওষুধের দিকে ঝুঁকেছে। হার্বাল ওষুধে তেমন কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। সঠিক মাত্রা সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবহারে হার্বাল ওষুধে উপকার পাওয়া যায় শরীর মনে। জানিসতো এলোপ্যাথি ট্যাবলেট ক্যাপসুল ইনজেকশন অনেক রোগের জন্য অব্যর্থ। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই ওষুধগুলো নানারকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ঘটায়। পুরনো একটা বাক্য মনে পড়েÑ ম্যালেরিয়া সারাবে কুইনাইন কিন্তু কুইনাইন সারাবে কে? সেই জন্য বিশেষজ্ঞ দরদি ডাক্তারের দ্বারস্থ হওয়া দরকার। কিন্তু বলতো রিনি কয়জনের ভাগ্যে জোটে এমন ধম্বন্তরি চিকিৎসক! গরিব মানুষের পকেটে কাড়ি কাড়ি টাকাই বা কোথায়, সুচিকিৎসার সুযোগই বা কোথায়? অনেক বড় লেকচার দিলাম।
রিনি ব্যস্তকণ্ঠে বলে, ‘না, না চাচা আমার কাছে আপনার এই বহুমূল্য কথাগুলো খুব ভালো লেগেছে। বিষয়গুলো সবারই জানা দরকার। বোঝা দরকার।’
চাচা বলেন, ‘মগো, এখন আমাকে এক কাপ জিনজার গ্রিন-টি খাওয়া আর সেই সঙ্গে মুচমুচে মজার সেই টোস্ট।’
খানিক পরে বেদানা বুয়া মুড়ি ভুনা ছোলা আদা কুচি কাঁচামরিচ পেঁয়াজকুচি মাখানো বাটি, টোস্ট, চায়ে নকশি ট্রে সাজিয়ে নিয়ে আসে। চাচা হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপ টেনে নেন।
চম্পা খালামণি রিনিকে খুব ভালোবাসেন। তিনি বলেন, ‘রিনির মনটা জুঁই ফুলের মতো সাদা। যেমন লেখাপড়া আদবকায়দা তেমনি গাছলতার ভালোবাসায় মনের মধ্যে গড়েছে এক অপূর্ব মায়াবাড়ি। ডাগর চোখজোড়ায় যেন আলো ঠিকরায়। মুখখানাও দীপ্ত লাবণ্যমাখা। আজকালকার মেয়েদের মতো বিউটি পারলারে দৌড়াতে হয় না। মনের প্রসাধনের মায়া ছড়ায় সারা অবয়বে। সোনা মেয়ে আমাদের। আমাদের পরিবারে চেনাজানার মধ্যে আরও তো অনেক মেয়ে আছে। তারা এক একজন এক এক ধারার। সে এক লম্বা কেচ্ছা। সইতেও পারি না, কইতেও পারি না। মনামি, পারুল, রিমি, চৈতি ওরা রিনিকে দেখে দেখে কিছুটা শিখেছে। বৃক্ষমেলায় যেয়ে শখ করে দুই একটা চারা কিনে আনে। দিনরাত ঘরবন্দী কম্পিউটারের গলা ধরে মাতোয়ারা হয়ে থাকাটা খানিক কমেছে। কিন্তু রুম্মা, মীম, চন্দ্রা, শাকিল, মিঠু ওরাতো সেই কম্পিউটার ধ্যানজ্ঞান করে বসে আছে। এই বয়সে ঘাড়ব্যথা, মাথাব্যথা মানে সর্বাঙ্গে ব্যথা ওষুধ দিব কোথা অবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এসিডিটি, রাতের ঘুম ওদের জন্য হারাম। ওরা ঘুমায় দিনের বেলায় প্যাঁচার মতো। ঘরের রান্না করা খাবার যেন অখাদ্য। নজর ফাস্টফুডের দিকে। এই অভ্যেস আমাদের নতুন প্রজন্মের, ইয়ং জেনারেশনের। ফ্রায়েড রাইস, ফ্রায়েড চিকেন, পিৎজা, বার্গার না খেলে কি মন ভরে? যেন জন্মেই এসব খাবারে জিহ্বা তৈরি হয়েছিল। এর ফলে বুকজ্বালা, পেটজ্বালা আরো কত সে জ্বালা! আবার সেই চিকেনে আস্ত তেলে পোকা ভাজা থাকলেও ক্ষতি নেই। সাতরকমের ভেজাল মিশিয়ে বানানো রক্ত-লাল সস দিয়ে মহা আনন্দে ওরা লাঞ্চ, ডিনার করে। শুনেছি মরা মুরগি, পচা ডিম নিয়মিত জোগান দেয়া হয় কোন কোন ঝলমলে রেস্তোরাঁয়। ভবিষ্যৎ কী হবে এই সব তরুণ কিশোরের! আগামী দিনের নাগরিক ওদের হাতে যে বাংলাদেশের পতাকাটা উড়াতে হবে। আর জানিস রিনি, ওরা বেশির ভাগই দেশী ফুল চেনে না। দেশী ফল চেনে না। বাংলার ঐতিহ্য পিঠেপুলিতেও কোন আগ্রহ নেই। আগ্রহ কেক, পেস্ট্রিতে। ওরা তোর মতো আকাশ দেখতে শেখেনি। তারা, নক্ষত্র, চাঁদ দেখে না। শুক্লপক্ষ, কৃষ্ণপক্ষের হদিসই রাখে না। চাঁদের হাসি যেদিন বাঁধ ভেঙে আকাশময় ছড়িয়ে পড়ে তখন হয়তো ওরা কম্পিউটারে চ্যাট করছে। ফেসবুকে ফালতু বন্ধু পাতিয়ে মাতামাতি করছে। কোন কিছুরই বাড়াবাড়ি করা ভালো নয় রে। দুঃখ হয় ওরা জোয়ার ভাটা বোঝে না। গাছের নাম, ফুলের নাম, নদীর নাম, মাছের নাম, ধানের নাম, পাখির নাম মানে সকল দেশেল রানী এ বাংলাদেশের কোন বিষয়ে না আছে ধারণা না আছে মাথাব্যথা। কবি বলেছেন, ‘এমন চাঁদের আলো/ মরি যদি সেও ভালো। সে মরণ স্বর্গ সমান।’… হায় অবুঝ কবি চাঁদের পবিত্র হাসির কী মূল্য এদের কাছে! তবে আমি আনন্দ পাই যখন দেখি কিছু বরেণ্য ব্যক্তিত্ব প্রকৃতি, পাখি, আকাশ অর্থাৎ নিজেদের চারপাশের মূল্যবান সম্পদ সম্বন্ধে তরুণ প্রজন্মকে সচেতন আগ্রহী করবার জন্য নানা কর্মসূচি নিয়েছেন। এসবই নতুন করে ঘুম ভাঙানোর গান। বাতাসভরা তীব্র বিষ সীসা প্রতিদিন টেনে নিচ্ছি নিঃশ্বাসে। আর পুরনো বৃক্ষ কেটে রাতারাতি গড়ে তুলছি আকাশছোঁয়া দালান-কোঠা। এখন ইটের পরে ইট/ মাঝে মানুষ কীট। কিন্তু আমি আশাবাদী, শ্যামল বাংলাকে আবার তোদের মতো তরুণরাই সাজিয়ে তুলতে পারবে। দীর্ঘতম বক্তৃতা আজ দিলাম মনের দুঃখে। মনে রাখিস রে মা।’
খালামণি এবার খানিকক্ষণ চুপ করে থাকেন। রিনির সব কথা মনে পড়ে। এসব যেন জীবনের আদর্শ পাঠেরই এক একটি পাতা।

পূর্ণিমা রাতে
মায়ের সঙ্গে রিনি আজ ছাদে ভেসে যাচ্ছে অন্য ভুবনে। জোছনায় ঢাকা শহর ভেসে যাচ্ছে। ভেসে যাচ্ছে বাংলাদেশ। মা বললেন, ‘আজ ৭ মে দুই হাজার বারো। আজ রাতটা অনন্য সাধারণ। এ বছরের সবচেয়ে বড় তেঁতুলমাঝা কাঁসার থালার মতো অপূর্ব চাঁদটি উঠবে আকাশে ৯টা বেজে ৩৫ মিনিটে। তারপরও কথা আছে, আজ সূর্যোদয়ের কয়েক মিনিট আগে মায়াবী চাঁদটি পশ্চিম আকাশে অস্ত গেছে। আবার সূর্যাস্তের এক ঘণ্টা পরে আজকের ভরা পূর্ণিমার চাঁদটি উদার আকাশের পূর্বদিকে আপন আসনটি সযতেœ পেতে বসেছে। অলৌকিক আলো ছড়াবে বলে। এই অস্থির দিশেহারা শহরের হাইওয়ে অলি গলি তস্য গলির আনাচে কানাচে দশতলা বিশতলা ফ্ল্যাট বাড়ির ছাদে ছাদে কংক্রিটের গায়। কিন্তু ক’জন সুসভ্য ব্যস্ত নাগরিক পূতপবিত্র প্রাণজুড়ানো চাঁদের আলো প্রাণের গহিনে চোখের তারায় এঁকে নিতে পারছেন। পারছেন না কেননা তাঁদের ওরকম ‘এলেবেলে’ অভ্যেস নেই। মাথায় যাদের কিছু সমস্যা আছে তারাই নাকি চাঁদ, ফুল, পাখি, নদী, গান এসব নিয়ে কইমাছের মতো লাফালাফি করে। নতুন প্রজন্ম তো নয়া নয়া প্রযুক্তির খপ্পরে। কম্পিউটার, মোবাইল, ল্যাপটপ ইত্যাদি আছে না পরানের বন্ধু! আকাশ, বাতাস, চাঁদ ফাঁদ তো আছেই। ওগুলো নিয়ে এত সময় নষ্ট করার কী মানে!
ওরা এভাবেই ভাবতে অভ্যস্ত। তা ছাড়া অনেকের বাড়িতে বড়রাও মহাব্যস্ত, তাঁরাইবা আকাশ দেখার কথা বলবেন কখন? আজকের আকাশের চাঁদটি সুপারমুন। বাংলায় বলা যায় মহাচাঁদ নাকি অতিচাঁদ।’
মায়ের কথাগুলো শুনতে শুনতে রিনি বিভোর হয়ে যায়। বড়দের মতো ভাবতে থাকে। নিজেকে আর ছোট ক্লাস টেনে পড়া মেয়ে বলে মনে হয় না। বছর দুই আগে ওরা সবাই মিলে সিলেট বেড়াতে গিয়েছিল। মা খুব সুন্দর, নকসা করা শীতল পাটি কিনেছিলেন। পাটির চারপাশটা লাল ভেলভেট কাপড় দিয়ে বর্ডারও করিয়ে নিয়েছিলেন। মা যখন যেখানে বেড়াতে যান সেখানকার ঐতিহ্যবাহী কিছু নিদর্শন সঙ্গে করে আনতে ভোলেন না। সেবার দুটো মনিপুরী শাড়িও কিনেছিলেন। সিলেটের বিরুই চাল, সাতকড়া সবই এনেছিলেন বেগম নুসরাত। সেই চালের আধালো স্বাদু খিচুড়ি হাঁসের গোশতের ভুনা দিয়ে একদিন মেঘলা দুপুরে মায়ের কয়েকজন বান্ধবীকে নিয়ে দারুণ ভোজসভা হয়েছিল। সাতকড়া দিয়ে গরুর  গোশতও রান্না হয়েছিল। আজ এই সুন্দর রাতে রিনির সেই স্মৃতিগুলো মনে পড়ছে। … মা তাঁদের বাড়ির বাগানে স্থলপদ্ম, উদয়পদ্ম, নিশিপদ্মের গল্প করলেন। নানুভাইও বাগান করতে ভালোবাসতেন। নানারঙের জবা, লতানো গোলাপ, মিনিপন্ডে শাপলা দিয়ে সুন্দর বাড়ি ছিল রিনির নানুবাড়ি। মা স্মৃতি হাতড়ে কেমন বিভোর হয়ে গেলেন। নিশিপদ্ম ফুটেছিল নানুবাড়িতে। এক টবে আটটি। রাত বারোটার পর নিশিপদ্ম ফুটতে থাকে। কলির চেহারা দেখে বলা যায় যে রাতে এ কলিগুলো পূর্ণ পাপড়ি মেলে ফুটবে। বেগম নুসরাত রিনির নানীমা সেদিন ওদের নিকটজন কয়েকজনকে দাওয়াত দিয়েছিল। কী যে আনন্দ হয়েছিল প্রথমবার! একসঙ্গে আটটি। সাংবাদিক এসেছিলেন। ছবি ছেপেছিলেন দৈনিক কাগজে। এত সুন্দর ফুল, অথচ ফোটে রাতের গভীরে আর সকাল হতে হতে বুজে যায়।
রিনির মামণিও অনেক ছবি তুলেছিলেন। সেগুলো নানুবাড়ির পুরনো অ্যালবামে এখনও শোভা পাচ্ছে।
রাতে রিনিদের ফ্ল্যাটে একটা অনুষ্ঠান হলো। গত বুধবার ওরা গিয়েছিল কুমিল্লা। বাবার বন্ধুর মেয়ের বিয়েতে। ফেরার পথে মাতৃভাণ্ডার থেকে প্যারা, ছানামুখী, রসমালাই কিনলেন মা। তারপর খাদিবিতান থেকে বেশ কিছু বেডকভার, লুঙ্গি, টেবিলক্লথ, ন্যাপকিন এমনকি শাড়িও কিনলেন তিনটা। মামা, চাচারা এলেন সস্ত্রীক। কাজিনরা এলো। পোলাও, চিতলমাছের কোপ্তাকারী ইত্যাদি ছিল। আর মায়ের হাতের পায়েস। তারপর মিষ্টি মেলা। রসমালাইয়ের বোল দ্রুত শেষ হতে লাগল।
ছোট মামা সবসময় মাকে খোঁচাতে ভালোবাসেন। খেতে খেতে বলেন, আচ্ছা আপু তুমি বেড়াতে যাও নাকি আতশকাচ দিয়ে খুঁজে বেড়াও কোন কোন বস্তু টোপলা বেঁধে নেয়া যায়।
বড় মামা কপট রাগ দেখিয়ে বলেন, ‘হ্যাঁরে ফাজিল কবজি ডুবিয়ে খাচ্ছিস আবার চন্দনকে খোঁচা দিতেও ছাড়ছিস না। বুজবক কাঁহাকো।’
রঞ্জু চাচা প্রাণ খোলা সদালাপী মানুষ। তিনি ভাইবোনের খুঁনসুটি উপভোগ করেন। নরম গলায় বলেন, ‘বুড়ো ভাইয়া আমাদের আসর জমিয়ে তোলেন। নইলে তো সেই বুলি ‘কেমন আছেন’? ভালো আছি তারপর বিরস বদনে খাবার খাওয়া এবং তারপর আলস্যভরা শরীর এলিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকা। যেন ত্রিভুবনের সব কথা তেপান্তরের তেমাথায় চুটিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। তারপর চাবিআঁটা পুতুলের মতো বাড়িমুখো প্রস্থান।’
বড়মামা রঞ্জুচাচার পিঠ আলতো হাতে চাপড়ে দিয়ে হা: হা: করে হেসে ওঠেন, ‘ঠিক বলেছেন ভাই। এ যে একেবারে আমারই মনের কথা। সার কথা। শুধুই কী রসনার সেবায় লোকে দাওয়াতে যায়। সেখানে চাই আদর আপ্যায়নের টইট¤ু^র আন্তরিকতা। মুরগি মোসাল্লাম, কাচ্চি বিরিয়ানি, হোল ফিশের বাহারি সাজ শুধু লোক দেখানো হয়ে যায় যদি না গৃহকর্তা-গৃহকর্ত্রীর গলায় আমন্ত্রণের উষ্ণতা না থাকে। তবে আমাদের বোনজামাই এ ব্যাপারে আদর্শ। চন্দনের হাতে গরম ভাত বেগুনভর্তা মাগুর মাছের ঝোল তো আমার রসনায় অমৃতের স্বাদ এনে দেয়। মনে হয় মায়ের হাতের রান্না খাচ্ছি।
বুড়ো এবার ঝাঁকড়া চুলগুলো দু’হাতে কব্জা করে বলে ওঠে, ‘হ্যাঁ ভাইয়া এবার বল চন্দন আপুর হাতের দুধভাত শবরী কলাও অসাধারণ! এ বাড়ির এক গ্লাস পানি খেলেও মনে হয় জমজমের পানি খেলাম, তাই না?’
বড়মামা চোখজোড়া রসগোল্লা বানিয়ে বলেন, ‘আবার …আবার টিপ্পনী। ওদের হতচ্ছাড়া এ বাড়ির এই নির্ভেজাল আনন্দটুকু কোথায় মেলে বলতো?
এবার রিনির ডাক্তার বাবা প্রস্তাব দিলেন, চল সবাই মিলে রিনির বাগানে। জোছনা দেখবে। আকাশ দেখবে আর পাবে হরেক জাতের ফুলের সুবাস। সবাই হৈ হৈ করে ছাদে উঠলেন। আকাশভরা চাঁদের হাসি সত্যি বাঁধ ভেঙে উছলে পড়ছে আলো। ছোট বড় সবাই মুগ্ধ। বড় মামা বললেন, ‘গুরুভোজনের পর এই ছাদ বাগানে এমন চাঁদের আলোয় খানিকক্ষণ পায়চারি করা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। কিছু ক্যালরি বার্ন হবে হজম হবে। ঘুম হবে যাকে বলে সুখনিদ্রা।’ বড়মামার সুন্দর বাচনভঙ্গি কথাও বলেন পরিশীলিত উচ্চারণে। তাঁর কথাগুলো বাতাসে ভেসে বেড়ায়। সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো পায়চারি শুরু করে।
ছাদ এখন ফাঁকা। সবাই নেমে গেছে। শুধু বসে আছে রিনি আর রিনির মা। রিনির মনে হয় মায়ের মনের মধ্যে এখনও একজন কিশোরী স্বপ্নসুখে দুই কাজলকালো চোখ ভরিয়ে চুপটি করে বসে আছে। মা একজন দায়িত্বশীল রুচিসম্পন্ন গৃহকর্ত্রী অন্য দিকে একজন আপনভোলা উৎফুল্ল কিশোরী। মায়ের হাতে ছোট্ট টিফিন বক্স। তাতে কয়টা এলেবেলে গজা। প্রিয় গজা চিবুতে চিবুতে রিনি বলে, ‘মা আমি কিন্তু ভবিষ্যতে বোটানি-উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করব। বাবা কেবল বলেন ডাক্তারি পড়তে। আমি দ্বিজেন শর্মা, ড. নওয়াজেস আহমেদের ভাবনার জগৎ ও কর্মকাণ্ডের দারুণ ভক্ত।’
মা বলেন, ‘শোন রিনি, তোর যে বিষয়ে স্বতঃস্ফূর্ত ঝোঁক সেই বিষয়টিই বেছে নিবি ভবিষ্যতের কর্মময় জীবনের জন্য। তুই তো এখন থেকেই গাছগাছড়ার সঙ্গে গল্পও করিস। ওদের সুখ-দুঃখ বুঝিস। সুতরাং এই গাছলতাই তোকে সমাজে সম্মানের আসনটি দেবে। হারিয়ে যাওয়া প্রকৃতিকে হাত ধরে ঘরের আঙিনায় নিয়ে আসবে যারা তাদের মধ্যে তুইও একজন। প্রকৃতিকে পরমাত্মীয় ভাবতে শিখাবি তোরাই।’ চোখ থাকতেও যারা অন্ধ তাদের অন্ধত্ব ঘোচাতে হবে তোদেরই। সন্তানের জন্য মায়ের খাস দোয়া আল্লাহর আরশে সহজে পৌঁছে যায়।
‘মা আজ চাঁদের গল্প বল। দেখ আকাশজুড়ে ঝলমল করছে অপরূপ জোছনা।’ আবদারে আকুল রিনি।
মা বললেন, ‘আর কত বলব চাঁদের গল্প। আমি যা জানি সবই তোকে বলেছি। আসলে এই চাঁদের তুলনাহীন হাসির মধ্যে আমি মায়ের হাসির অজস্রধারা ঝরতে দেখি। সেই ছোটবেলা থেকেই বুঝি। আমাদের পাবনার খোলামেলা দোতলা বাড়ির আমার শোবার ঘরের খাটে চাঁদের আলো লুটিয়ে পড়ত। সে যে কী আনন্দ, কী শান্তি বোঝাতে পারব না। তুইও হয়েছিস তেমনি চাঁদ-পাগল।
রাত হয়েছে বেশ। মা-মেয়ে নেমে আসে নিজেদের ফ্ল্যাটে। সকালে দীপা ফোন করেছিল। ওর ফোন পেলে দুই বন্ধু চুটিয়ে পণ্ডিতের মতো পরিবেশ রক্ষা নিয়ে অজস্র কথা বলে। মনোযোগী সহযোদ্ধা পেয়ে রিনির মনটাও ময়ূরের মতো পেখম মেলে দেয়। ওদের বাসা সেগুনবাগিচায়। ওখানে আগ্রহী কয়েকজন মিলে পরিবেশ পরিপাটি করবার জন্য একটা সংগঠন গড়ে তুলেছে। ‘সবুজ আরো সবুজ’ ওদের সংগঠনের নাম। ওরা একটা সুন্দর অনুষ্ঠানও করেছিল। একটা ব্যাপারে দীপা লিখেছিল, ‘বাতাসে বেশ সীসা/ হারিয়েছে দিশা।’ ওরা আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। মাসে একটা সভা হয়। সদস্যসংখ্যা ১০ জন। অধ্যাপক সোহরাব স্যার প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট। ওরা দুস্থ নিঃস্বদের মধ্যেও গাছের চারা বিতরণ করে। স্যার বলেছেন, রাস্তার ফাঁকা কোনো বাড়ির সামনে পেছনে যেখানেই গাছ লাগাবার মতো খানিক জমিন পাবে সেখানেই লাগাবে চারাগাছগুলো। অবশ্য দীপা, মৌরী এদের গাইড করে। ‘সবুজ আরো সবুজ’ সংগঠনটি পায়ে পায়ে এগিয়ে চলেছে। ওরা একবার সবাই এসেছিল রিনির ছাদ-বাগানে। সোহরাব স্যার সভাপতি ছিলেন। ঘরোয়া সেদিনের সভায় তিনি প্রকৃতির অকাতর দানের কথা সুন্দর ভাষায় বুঝিয়ে বলেছিলেন। আর রিনির এ বাগানের ভূয়সীয় প্রশংসা করেছিলেন। এমনি করে কেউ না কেউ বিড়ালের গলায় ঘণ্টাটি পোক্ত করে বেঁধে দেবে। তাহলেই এই দূষণ এই বিষ সীসা একটু একটু করে শুষে নেবে সবুজ বন্ধু পত্রপল্লব। নইলে এই নতুন নতুন আয়োজন সাজানো ছককাটা জীবনের সারসত্য মিথ্যে হয়ে যাবে। মানে ষোলআনাই মিছে!
নাশতার টেবিলে মা আবার শুরু করলেন ৭ মে সুপার মুনের গল্প।
‘রিনি জানিসতো ৭ মে চাঁদটি ছিল স্বাভাবিক পূর্ণিমার চাঁদের চেয়ে ১৬ শতাংশ বড়। বাংলায় কী যেন বলব বাঘাচাঁদ। দুর ছাই কেমন যেন কানে লাগছে। তারচেয়ে রানীচাঁদ বা খাসা চাঁদ বলা যায়। যাহোক আমাদের প্রিয় চাঁদ নিজের অক্ষরেখায় পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে বছরের একটি সময়ে পৃথিবীর খুব কাছাকাছি চলে আসে ঐ হাসিখুশি চাঁদমামা। আবার একদিনের জন্য খুব দূরেও চলে যায়। প্রতি বছরই এরকম ঘটনা ঘটে। ৭ মে ছিল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। পৃথিবীর খুব কাছাকাছি দেখা গেছে মায়াময় চাঁদকে।’…
রিনি মনে মনে হাসে। আজ ছুটির সকালটা মায়ের সঙ্গে নাশতা করতে করতে চাঁদ নিয়ে মায়ের চাঁদপনা মুখ থেকে কথা না শোনা হল!

রসনার সেরা বাসা রসনায়
জ্যৈষ্ঠ মাস বাঙালি মধুমাস। আম, জাম, লিচু, কাঁঠাল, ফুটি, বাঙ্গি, তরমুজের সুগন্দে ম ম করে বাংলার বাতাস। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘বাসনার সেরা বাসা রসনায়’। তিনি সুমিষ্ট পাকা আমের দারুণ ভক্ত ছিলেন। ‘নিমন্ত্রণ’ কবিতায় কবি কয়েকটি পঙ্ক্তিতে সেই কথাই বলেছেন অপূর্ব ছন্দ দোলায়,
‘বেতের ডালায় রেশমি রুমাল টানা
অরুণ-বরণ আম এনো গোটা কত।
গদ্যজাতীয় ভোজ্যও কিছু দিয়ো,
পদ্যে তাদের মিল খুঁজে পাওয়া দায়।’
কবির মনের কথাটিÑ
‘জেনো, বাসনার সেরা বাসা রসনায়।’
মা মাঝে মধ্যে বলেন, ‘রান্নাটা অতি উচ্চমানের শিল্পকর্ম। রন্ধনবিদ্যাকে ছোট করে দেখা খুবই বোকামি। অতিভোজন বা খাওয়ার জন্য বাঁচা যেমন সঠিক পথ নয়, তেমনি পরিমিত রুচিকর টাটকা খাবারের জন্য যতœশীল থাকা মনোযোগী হওয়াটাও জরুরি। তা ছাড়া অনেক বাঙালিই মনে করেন, রান্নাঘর একটু এলোমেলো, একটু ঘিঞ্জি হলেই বা এমন কী ক্ষতি। ব্যাপারটা সে রকম নয় কিন্তু রিনি। রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতা পরিপাট্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যত বড় জজ ব্যারিস্টার ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার সেলিব্রেটি হও না কেন পাকস্থলীতে দূষিত অরুচিকর খানা পড়লে সব বরবাদ। তখন কড়া ব্যক্তিত্ব দিয়ে কিসসু হবে না। রোগশয্যায় সটান শয়ান। দিনকয় ভোগান্তি- নো ওয়ে বুঝেছিস রিনি। অনেক মা-মেয়ে রান্নাঘরকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন বৈকি। এটা স্রেফ বোকামি। আদতে কিছুটা রন্ধনবিদ্যা আয়ত্তে রাখা এবং মাঝে মধ্যেই চর্চা করা খুবই দরকার। এতে আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। বাড়ির রাঁধুনি কোন কারণে হেঁসেল চালাতে অপারগ হলে হোটেল রেস্তোরাঁ থেকে বিষের পুঁটলি কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা দিয়ে কিনে এনে খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়তে হয় না। মাঝে মধ্যে নতুন রেসিপি-দরদি আয়োজনে তৈরি করলে বাড়িতে উৎসবের রঙ লাগে যেন।
রান্নাঘর-কিচেন মানে নাক সিটকানো নয়। সারাদিন খুন্তি নিয়ে লড়াই করাও যেমন ঠিক নয়। মাঝামাঝি পথটি ভালো।
বাঙালি পরিবারের পুরুষরা রান্নাঘরে ঢোকাটাকে ভারী অসম্মানের মনে করেন। কিন্তু আসলে ছোটবেলা থেকে ছেলেমেয়ে সবাইকে অল্পবিস্তর রান্নার প্রাথমিক ধারণাটি দেয়া দরকার। অনেক ছেলে বিদেশে পড়তে গিয়ে কী করুণ অবস্থায় না পড়ে। এক মুঠ ভাত ফুটিয়ে ডিমের মামলেট বা ডাল রান্না করতে ওদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। আর রোজ রোজ বার্গার, পিৎজা খেয়েই কাটাতে হয়। অথচ বিশ্বজুড়ে বড় বড় হোটেলে রেস্তোরাঁয় শেফ পুরুষ। গ্রামেগঞ্জেও কিন্তু বড় বড় মেহমানদারিতে মেজবানিতে পুরুষ পাচকরাই শাহি মেজাজে পান জর্দা চিবুতে চিবুতে মহান শিল্পীর মতো শত শত মানুষের রান্না করে থাকেন। বড় সড় লম্বা কাঠের হাতা বড় বড় ডেকচিতে গরুর  গোশত রান্না হয়। খুশবুতে বাতাসও লোভী হয়ে যায় বুঝি। সেখানে পিঁয়াজ সবজি কোটা বাটনা বাটার কাজটি প্রায় ক্ষেত্রেই মহিলারা করে থাকেন। বিজ্ঞজন বলে গেছেন মানুষের মন জয় করতে হলে জিহ্বাকে অর্থাৎ রসনাকে জয়যুক্ত করা দিয়ে শুরু করতে হয়। একদম মোদ্দা কথা। তাই বলে সারাক্ষণ ‘খাই খাই’ ব্যারামের কথা বলছি নারে। অতিভোজন গুরুপাক ভোজন যেমন জীবন চলার পথকে আঁকাবাঁকা করে দেয়, তেমনি অতি অল্প আহার সুন্দর জীবনযাত্রার পথে দেয়ালের মতো। আর এ জন্যই এ বাক্যটি ‘আপ রুচি খানা পররুচি পহেনা।’ কী ধরনের খাবার তোমার শরীরকে ভালো রাখবে রুচিকে তৃপ্ত করবে সে দায় তোমার ওপর। আবার কোন পোশাকে তোমাকে কেমন মানাবে সেটা জানতে খানিকটা অন্যের পরামর্শ দরকার পড়ে। বুঝেছ মামণি?’
রিনি মায়ের লম্বা নসিহত মন দিয়ে শুনছিল। এখন থেকেই তো অনেক বিষয় জানতে হবে বুঝতে হবে। বাবা প্রায়ই বলেন বড় হয়ে একজন পূর্ণ বিকশিত মানুষ হতে হলে এখন থেকেই মনের কপাট খুলে দিতে হবে। চেতনার দরজা জানালা পাট পাট করে খুলে রাখতে হবে, যাতে আলো বাতাস খেলতে পারে। মধুমাসে প্রায় প্রতিবেলা টেবিলে হলুদরবণ গোপালভোগ, ল্যাংড়া, ফজলি, রানিপছন্দ ইত্যাদি বাহারি নামের আম থাকে বেতের ডালায় সাজানো। আজকাল বাজারের ফলমূলে অসাধু ব্যবসায়ীরা বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশিয়ে অসময়ে পাকায় আর স্বাভাবিক পচন বন্ধ করে। এইসব ফলমূল খেলে যে বিষ আমাদের শরীরে ঢুকে যায় তা যে কত মারাত্মক ক্ষতি করে তা টের পাওয়া যায় কিছু সময়ের মধ্যেই। আগুন দামে ফলফলারি কিনে হতভাগ্য সাধারণ মানুষ কি দিন দিন মরণের পথে এগিয়ে যাবে! এর জরুরি প্রতিকার দরকার। রিনির সৌভাগ্য ওর দীপু মামা থাকেন রাজশাহীতে। ওখান থেকে আম পাঠান ঝুড়ি ভরে। দিনাজপুর থেকে চম্পা খালা  বাগানের টসটসে লিচু পাঠান আর কাঁঠাল আসে দাদাবাড়ি নরসিংদী থেকে। বেগম নুসরাত এসব বিষমুক্ত ফলফলারি শুধু নিজেরাই খান না, পড়শি আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতেও পাঠান। ওরাও খুশি হন। এ কি শুধু ফলফলারির বিনিময়, এ হচ্ছে প্রাণের ভালোবাসার বিনিময়।
রিনিদের ফ্ল্যাটে আম-দুধের দাওয়াত হয়। স্বজন প্রিয়জনরা আসেন। হৈ হৈ করে আম দুধ, ঘরে পাতা দই, চিঁড়া, শবরীকরা, কাঁঠাল, মুড়ি, খই ওরা আনন্দ করে খায়। কারণ এ ফলগুলো ফরমালিনমুক্ত। রিনির কাজিনরা রেহনুমা, আকাশ, তমাল, টিটু ভরপেট আম-দুধ-ভাত খেয়ে গলা ছেড়ে গান গায়, ‘আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে।’ রিনির ঘরটা ভরে ওঠে আনন্দে। মায়ের ঘরে ফুফু, খালাদের আলাদা আড্ডা। ব্যস্ত বাবাও কিছু সময় চাচা মামাদের নিয়ে নানা আলাপচারিতায় সময় কাটান। এ সময়ের অস্থিরতা সড়ক দুর্ঘটনা থেকে শুরু করে দেশের বাড়িতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত স্কুল, পুকুরের ঘাটলা মেরামত, মাছ চাষ ইত্যাদি বিষয়ে মেতে ওঠেন। বিকেলের মিষ্টি রোদ রিনির বাগানবিলাসের ফুলে পাতায় আঁকিবুঁকি এঁকে যায়।  বেগম নুসরাত বেদানা বুয়া দু’জন মিলে দিনাজপুরের কাসুন্দিমাখা রসগোল্লা সাইজের লিচু দাদীর হাতে আমসত্ত্ব কলাপিঠার বাটিগুলি সাজিয়ে ঘরে ঘরে বিলাতে থাকে। সবাই গালভরে খায়। রিনি এসবের ফাঁকে এক বাটি স্বাস্থ্যবান জাম কাঁচামরিচ লবণ দিয়ে ঝাঁকিয়ে ঘরে ঢোকে। পাশের ফ্ল্যাটের রিঙ্কুরা জাম পাঠিয়েছে। গাজীপুরে ওর দাদাবাড়িতে জামগাছ আছে। জামরুল, করমচাও আছে। রিনির মা কাঠের বারকোশ ভরে হলুদ আম, কাঁঠালের কোয়া, লিচু একথোকা পাঠালেন। রিঙ্কুর মায়ের হাতের করমচা আর বিলিম্বির আচারের জুড়ি নেই। তার ভাগও চলে আসে রিনিদের ঘরে। শুধু পড়শি নয়, যেন আপনজন! আজকাল তো ঢাকা শহরে পাশের ফ্ল্যাটে মানুষ মারা গেলে বা ডাকাত পড়লেও আরেক পড়শি টের পায় না। কারুকার্যকরা মেহগনি দরজা লক করে তারা সোফায় গা ডুবিয়ে টকশো শোনেÑ দেশের উন্নতির জন্য আর কী কী পদক্ষেপ নেয়া জরুরি সে বিষয়ে। এই শহরেই রিনিরা আপনভুবন তৈরি করে নিয়েছে। গত বছর রিঙ্কুর বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে রাত ২টায় বেল বেজে ওঠে। রিনির বাবা দশ মিনিটের মধ্যে ওদের ফ্ল্যাটে যেয়ে রিঙ্কুর বাবাকে হসপিটালে নিয়ে যান নিজে গাড়ি চালিয়ে। দুইদিন হসপিটালে থাকার পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন তিনি। রিঙ্কুর মা বেগম নুসরাতকে বুকে জড়িয়ে কী কান্না! কৃতজ্ঞতার অশ্রুজল।
রিনি মায়ের কথা এই ছোট্ট জীবনে কেবল নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করতে অ্যামবিশনের চূড়ায় উঠতে চোখ-কান বন্ধ করে দৌড়ালে চলবে না। বড় হতে যশস্বী হওয়ার সাধ হয়তো মানুষের সুপ্ত ইচ্ছে। সব ঠিক আছে। কিন্তু চারপাশের মানুষদের নিয়েও ভাবতে হবে। তাদের জন্য কিছু ভালো কাজ করে যাওয়ার নিয়ত করতে হবে। কবি বলেছেন, ‘আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী পরে’। এ সময়ে অনেকের কাছে এ জাতীয় বাক্যমালা হাস্যকর বৈকি।
মধুমাসের এইদিনে চম্পা খালা এসেছেন। ওর চোখের পাওয়ার দেখাতে। খালার দুই ছেলে কানাডায় প্রবাসী। বছরে একবার বাবামাকে দেখতে আসে। দুঃখগুলো বুকের মধ্যে লুকিয়ে রেখে খালার চাঁদপনা মুখটি জুড়ে সদাই খুশির আলো। খালু কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা ছিলেন। দিনাজপুরের বাড়িটা বিরল সব বৃক্ষলতায় ছায়াচ্ছন্ন। ভোরবেলা, বিকেলে বা চাঁদনী রাতে খালুকে অবধারিতভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে ফুলের বাগানে। সঙ্গে অবশ্য থাকে আজন্মের ‘কেষ্ট’ আবুল। আজ পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে খালুর ছায়াসঙ্গী। এসেছিল দশ বছর বয়সে গা-ভরা খোস পাঁচড়া পেটভরা কৃমি অপুষ্টির জ্বলন্ত স্বাক্ষর এক পথশিশু। চম্পা খালা আর খোদাবক্স খালুর সস্নেহ যতেœ সেই রোগাভোগা এতিম শিশুটি হয়ে ওঠে নওজোয়ান। আবুল কোনদিন এই ‘মেঘমালা’ বাড়িটি ছেড়ে অন্য কোথাও অন্য কোনো জীবিকায় যেতে চায়নি। এ বাড়ির মানুষ, এ বাড়ির বাড়া ভাতের চেয়ে বড় আর কোন সুখ ত্রিভুবনে আছে কি না জনতে চায় না পাগলা আবুল। তাই খালা-খালুর দেখভাল ঘর-গেরস্থালির নাড়িনক্ষত্রের খবর জানে আবুল। আবুলের বিয়ে দিয়েছিলেন চম্পা খালা পুব পাড়ার গায়েন সিধুমিয়ার মা-মরা মেয়ে ফুটফুটে লালমোতির সঙ্গে। বছর তিনেকের মাথায় লালমোতির একটা ছেলে হয়। কিন্তু পরদিন দুটো গোলাপফুল পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। ডাক্তার, কবিরাজ, স্বাস্থ্যকর্মী, দাই কোনটাই বাদ রাখেনি খালা। কিন্তু সবই বিফলে গেল।
আবুল এখন খালুর ছায়াসঙ্গী। সে শিখেছে কী করে গাছের কলম দিতে হয়। আম, পেয়ারা নানা ফল গোলাপগাছের অসংখ্য কলম দিয়েছে আবুল। খোদাবক্স মাসের প্রথম শুক্রবার বিকেলে বৈঠকঘরে একটা জমায়েত বসান। চা, সেমাই, ডালের বড়া খাওয়া হয়। নানা বিষয় নিয়ে মতবিনিময় হয়। তারপর গাছপ্রেমিক পড়শি স্বজন বন্ধুদের মধ্যে চারা উপহার দেয়া হয়। এতে আশপাশের অনেক অভাবী মানুষও উপকার পেয়েছে। কলমের আমের চারায় ফলন হয় তাড়াতাড়ি। পেয়ারা হয়েছে কারো বাড়ি বেশুমার। তাদের ছেলেপুলেরা আর চুরি করে অন্যের বাগানের ফল খায় না। এছাড়া লাউ, শিম, ঢেঁড়সের বীজও বিতরণ করেন খালু। এমনকি মাঝে মধ্যে সারও। গাছের রোগাবালাই বিষয়ে খালুর হাতে কলমে শিক্ষা আছে অভিজ্ঞতা আছে। কৃষিবিষয়ে সেই কোন কালে আমেরিকার টেক্সাসের অস্টিন থেকে এমএস করে এসেছেন।
বাগানে লিচুগাছ সারি সারি। তিন জাতের লিচু আছে এ বাগানে। শুধু বোম্বাই লিচুর নামটাই মনে আছে। সারা রাত টিন পেটাতে হয়। নইলে রসালো লিচুগুলো বাদুড়ের দল আধ-খাওয়া করে ফেলে রাখে গাছের তলায়। তাই গাছতলায় মাচা বেঁধে কাঁথা বালিশ নিয়ে শুয়ে থাকে আবুল। লম্বা দড়ির মাথায় কায়দা করে বাঁধা থাকে টিন। দড়ি ধরে টান দিলেই গগনবিদারি আওয়াজে লিচুখেকো বাদুড়গুলো জান বাঁচাতে ক্যাচ ক্যাচ শব্দ করে উড়ে যায়। লিচুর লোভ সামলানো বাদুড় বাহাদুরদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই বিকট শব্দ থেমে গেলেই আবার ঝাঁকে ঝাঁকে আসে লাল লাল লিচুগুলোর মিষ্টিরস খেতে শুরু করে। টের পেয়ে আবার আবুল তৎপর হয়ে ওঠে। আবার টিনপেটানোর পালা। এরকমই চলতে থাকে রাতভর। লিচুর মৌসুমটা আবুলের জান কয়লা।
গতকাল ছোট্কু চাচার বাড়িতে দাওয়াত ছিল দুধ কাঁঠালের। রিনির দাদাবাড়িতে তো কাঁঠালের রাজত্ব্। লালমাটি উঁচু নিচু ছোট ছোট মাটির ঢিবি আর কাঁঠাল গাছের ঘন বাগান। কত জাতের পাখপাখালি যে দিনরাত কলকাকলিতে ভরিয়ে রাখে সারা এলাকা। আর বাঁশঝাড়ে ডাকে ঘু ঘু। ঘু-উ-উ ঘু-উ-উ। কী মিষ্টি সে সুর উথাল পাথাল আনন্দে ভরে যায় রিনির মন। দাদাদের আদি গ্রাম হাড়িসাঙ্গান। মধুমাসে ওখানকার গরিব বা সম্পন্ন গৃহস্থ সবাই কাঁঠাল খায় তিনবেলা। নানাজাতের রোয়াভরা কাঁঠাল ফলে। আর সবাই কাঁঠাল খেয়ে দিব্যি মোটাতাজা হয়ে যায়।
বাংলাদেশটা বৈচিত্র্যে সম্পদে ভরপুর। অথচ দিনে দিনে নদীমাতৃক এ শ্যামলভূমি কেমন রুক্ষ হয়ে যাচ্ছে। মাটিতে কৃত্রিম সারের ছড়াছড়ি। ফসলে কীটনাশক বিষের ছোবল। নদীগুলো বিষাক্ত বর্জ্যে ভরে যাচ্ছে দিনকে দিন। ইটভাটার ধোঁয়ায় গাছ ফলশূন্য পত্রশূন্য হয়ে যাচ্ছে। কারখানার বিষাক্ত রঙ কেমিক্যালে নদীর মাছ মরে যাচ্ছে। পানি হচ্ছে ভয়াবহ মাত্রায় দূষিত। প্রমত্তা পদ্মা, মেঘনা, যমুনা আর শত শত সুন্দর সুন্দর নামের শাখা নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। যেখানে এক সময় ছিল ঝিরঝিরে নদী। সেখানে আজ শুকনো জমি ফুটি-ফাটা হয়ে পড়ে আছে। সিলেটের বৃহৎ হাকালুকি হাওর শত শত বাঁওড়, পাবনার দিগন্ত বিস্তৃত চলনবিলের চেহারায় ভাঙন ধরেছে। দূষিত পানিতে মাছের সংসার তছনছ। ওদের মন ও স্বাস্থ্য দুই-ই কাহিল।
এ বছর সময়মতো বৃষ্টি না হওয়ায় অনেক বাগানের আমের গুটি শুকিয়ে গেছে। রিনির মনে আছে একবার জ্যৈষ্ঠ মাসে মোমিন চাচার বাড়িতে গিয়েছিল ওরা সবাই। নিশি আপুর বিয়ে উপলক্ষে। সেবার রিনি দেখেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বাগানের শোভা। থোকা থোকা আম বাতাসে দোল খাচ্ছে। কিন্তু কী আশ্চর্য ওখানকার নিম্নবিত্ত ছেলেমেয়েরাও আম  ছেঁড়ে না। আম পরিপুষ্ট হলে বিশেষ যতেœ আঁকশি দিয়ে আম পাড়া হয়। কারণ আম মাটিতে পড়ে থেঁতলে গেলে নষ্ট হয়ে যায় স্বাদ। এই ঝোপা ঝোপা আম দেখে আনন্দে রিনির মাথা খারাপ হয়ে যাবার দশা। তখন ও ক্লাস ফাইভে পড়ে। সেই দৃশ্য আজো মনে ঝলমলিয়ে ওঠে। সেবার ঢাকায় ফেরার সময় শান্তি ফুফি আমের মোরব্বা আর কাশ্মিরি আচার বোয়াম ভরে দিয়েছিলেন।
কয়েক বছর আগে গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠত রিনি। মা বলতেন, ‘শোন মামণি গরম না পড়লে আম-কাঁঠাল পাকবে কী করে?’ এখন রিনির মনে প্রশ্নÑ পাজি ব্যবসায়ীরা গরমের তোয়াক্কা করে না শরমেরও না। কেমিক্যালস দিয়ে ফল পাকায়। ক্ষতিকর প্রিজারভেটিভ দিয়ে দীর্ঘদিন তাজা রাখে আর ইনঞ্জেকশন দিয়ে তরমুজ, কমলালেবু মিষ্টি করে। এইসব বদমাস মানুষের কেন কঠিন সাজা হয় না? কেনই বা এই সব মারাত্মক ক্ষতিকারক কেমিক্যাল যত্রতত্র কিনতে পাওয়া যায়?

রিমি রিম ঝিম রিম ঝিম নামিল দেয়া
বর্ষাকাল রিনির প্রিয় ঋতু। অবশ্য মাঝে মধ্যে একটু বিরক্ত যে লাগে না তা বললে ভুল হবে। তবু বর্ষাকাল জিন্দাবাদ! কেবল বৃষ্টির অগুনতি ফোঁটা ঝরে পড়ার ছায়াছবিই নয়। রিনির মন-মযূরী পেখম মেলে আরো এক বিশেষ কারণে। ছাদে তার শূন্যোদ্যানের গাছলতাগুল্মগুলোও বুঝি চাতক পাখির মতো অপেক্ষায় ছিল এই মণিমুক্তোর ঝর ঝর ফোঁটার জন্য। ছাদে উঠে যায় রিনি। সদ্য সিনান সেরে গাছগাছড়াগুলো রিনিকে যেন সমস্বরে ডেকে ডেকে বলে ওঠে, ‘এসো এসো সুন্দর মনের বালিকা। এসো মঙ্গলময়ী। দেখ আমরা কেমন সুখের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছি। উপরঅলা আল্লাহপাককে লাখ কোটি শুকরিয়া।’ রিনি গাছলতাফুলের ভাষা যে বোঝে। মনের দীঘল দীঘিতে রাজহাঁসগুলো কেলি কাটতে থাকে। দিনাজপুরের খালুজান রিনিকে যতœ করে গাছের কলম দেয়া শিখিয়েছেন। যেবার প্রথম ওর কলমের গাছে আম ধরল সেদিন রিনির মনে হয়েছিল বাইশ ক্যারেট সোনার আম্র পাতার ফাঁকে মনের সুখে দুলছে।
এবার বর্ষাকালে রিনি দাদাবাড়ি নরসিংদী গিয়েছিল। কী আনন্দ যে হয়েছিল! শানবাঁধানো ঘাটে ব্যাঙ ডাকে ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ…। এই বিটোফোনের সিম্ফনির চেয়ে মধুর নাকি সুরেলা সানাই! আর কার কেমন লাগে জানে না কিন্তু ওর প্রকৃতিপ্রিয় মনটা নিবিড় আনন্দে টইটম্বুর হয়ে ওঠে। ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকে লাগাতার। আহা যেন মোহনবাঁশি। আর ভাঁটফুলের ঝোপে জোনাকির থোপা থোপা আলোর জ্বলানেভা। রাতে তপতীদের পুকুরপাড়ের পিপুলগাছের ওপাড় থেকে ডাকে কুব পাখি কু-ব-কু-ব। মা বলেন ডাহুক। একদিন বিকেলে উঠোনে রিনি দেখেছে সাতটি লেজঝোলা পাখি। ওদের অনেক নামÑ সেভেন সিস্টারস, সাতভায়রা, সাতভায়লা। আর ঘুঘুর দীর্ঘ সুললিত ডাক রিনিকে কোন সুদূরের তেপান্তরের মাঠে নিয়ে যায়!
দাদাবাড়ির পুকুরের ঘাটলায় দাদী বর্ষাকালে যেতে দেন না। পানি থৈ থৈ করে। রিনি ভালো সাঁতার জানে না। দক্ষিণের উঠানে আকেটা ছোট বাঁধানো চৌবাচ্চা আছে। ওখানে ফুটে আছে অসংখ্য লাল শাপলা। জোছনারাতে চালভাজা চিবুতে চিবুতে দাদীর কোলে মিনি বিড়ালের মতো গুটিশুটি মেরে শুয়ে গল্প শোনে। সুয়োরানী দুয়োরানীর গল্প। সুখু দুখুর কথা মনে গেঁথে যায়। ক্ষীরের পুতুল, ডালিমকুমার কত না গল্প। ঠাকুরমার ঝুলিতে আর একটি গল্পও বুঝি জমা থাকে না। রিনির বন্ধুদের এই সৌভাগ্য অনেকেরই নেই। ওদের নানাবাড়ি দাদাবাড়ি পোড়োবাড়ির মতো। বটগাছ শিয়ালকাঁটা, ডাঁটাফুলের জঙ্গল। ঘন ঘাস ঢোল কলমির ঘন গাছপালা। দিনে রাতে বেজি আনন্দে ঘুরে বেড়ায়, আসে গুঁইসাপ কাঠবেড়ালি, হোৎকা হুলো বিড়াল এমনকি শিয়াল। কেন্নো বিছা তো আছেই। লক্ষ্মী পেঁচা, বাদুড়, চামচিকে ঘরের ভেতরের বাসিন্দা। রওনক একবার দুঃখ করে বলেছিল, ওর দাদাবাড়ি এখন শাকচুন্নী ব্রহ্মদৈত্য মামদো ভূত আর শ্যাওড়াগাছের পেতিœরা সুখের সংসার পেতেছে। কী দুঃখ রওনকের! রিনিকে ও বলেছিল, ‘তোদের দাদাবাড়ি নানাবাড়ির মতো যদি আমারও কিছু একটা শেকড়বাকড়ের টান থাকত। তোর দাদু-নানু বাড়িতে কত আদর কত যতœ, কত মায়াময় মানুষ। ইস, রিনি তোকে আমার রীতিমতো হিংসে হয় রে।’ বর্ষার মৌসুমে রিনি প্রাণভরে বর্ষার গান শোনে। ‘আজি ঝরঝর মুখর-বাদল দিনে/ জানিনে জানিনে কিছুতে কেন যে মন লাগে না।’ কাজী নজরুল ইসলামের ‘রুমু রুম ঝুম, রুম ঝুম ডাকিছে দেয়া।’ আরো অনেক বর্ষার গান রিনির প্রিয়। যেমন প্রিয় ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি, ধুম বৃষ্টি, শিলা বৃষ্টি সব কিছু। মা বলেন, ‘ওরে মেয়ে তুই দেখি রবীন্দ্রনাথের সার্থক শিষ্য হয়ে গেলি। বর্ষাঋতুটি ছিল এই নোবেলবিজয়ী কবির প্রিয় ঋতু। পদ্মার বোটে বজরায় দিনমান ভেসে ভেসে কত যে কবিতা, গান, গল্প রচনা করেছেন। জানিসতো জমিদারি দেখাশোনার তাগিদে কবি বাংলাদেশের শিলাইদহ, পতিসর, শাহজাদপুরে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন। আর রচনা করেছেন অমর সাহিত্য। ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পটি তোর পড়া আছে। রতন নামের হতদরিদ্র ছোট্টমেয়েটি কত যতেœ কলকাতার বাবুর সংসার সামলিয়েছে। বাবুটিরও মমতাময় মন ছিল বটে। কিন্তু একদিন অজপাড়াগাঁ ছেড়ে বদলি নিয়ে চলে গেলেন কলকাতায়। রতনের অবুঝ কচি মনটা ফেটে চৌচির হয়ে গেল। কিন্তু জগৎ সংসারে তাতে কিবা এসে যায়! সেই সূর্য ঠিকই ঝলমলিয়ে ওঠে।
চাঁদ হাসে আকাশে। প্রজাপতির পাখার রঙ একটুও মলিন হয় না। এই গল্পটি কবির শাহজাদপুরে কাছারি বাড়িতে বসে লেখা। এ গ্রামে আমার ফুফুর বাড়ি। উলিপুর গ্রামের উল্লেখ আছে, সেই গ্রাম আমার খালার শ্বশুরবাড়ি উল্লাপাড়া। আমার জয়নাল চাচা এই তথ্য দিয়েছিলেন আমাকে।’
রিনি অবাক হয়ে মায়ের কথা শোনে।
রিনির মা বলেন, জানিসতো রবীন্দ্রনাথের পূর্ব পুরুষ পিরালী ব্রাহ্মণ ছিলেন। যশোরে তাঁদের আদি পুরুষের বাস ছিল। তাঁর স্ত্রী ভবতারিনী ওরফে মৃণালিনীদেবীর আদিবাড়ি যশোরে। কবির পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ শাহজাদপুরের জমিদারি রানী ভবানীর কাছ থেকে কিনে নেন। এই জমিদারি দেখভালের দায়িত্ব বর্তায় কবির ওপর। তাইতো তিনি বাংলাদেশের উদার শ্যামল প্রকৃতিকে ভালোবেসে তুলে এনেছেন তাঁর সাহিত্যে। অমিত সাহস প্রতিভা আর একনিষ্ঠ শ্রম ছাড়া সাহিত্যজগতে দিকপাল হওয়া যায় না। আমাদের জাতীয় কবি নজরুল মাত্র ২৩ বছর সাহিত্য সাধনা করে যেতে পেরেছেন। তেতাল্লিশ বছর বয়সে এই অমর কবি দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। ব্যাধি তাঁর চেতনাকে গ্রাস করে বাকশক্তি কেড়ে নেয়। দারিদ্র্য আর দুর্ভাগ্য জাতীয় কবির পিছ ছাড়ে নাই। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘ আশি বছর পরমায়ু জুড়ে সৃজনশীল ছিলেন। যদিও বারবার প্রিয়জন বিচ্ছেদ ব্যথা তাঁকে সইতে হয়েছে। আর একদিন এঁদের নিয়ে তোকে আরো অনেক কথা বলব। তুই মা নিজেও কিন্তু মহান ব্যক্তিদের জীবনী পাঠ করবি। দেখবি এক একটা গ্রন্থের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে হীরের খনি। কত বিচিত্র সব বিস্ময়কর ঘটনা। বর্ষায় প্রকৃতি সজল হয়। মলিনতা মুছে যায়। সাদা রঙের ফুলগুলো বেশি করে ফোটে। টগর, জুঁই, লিলি, কদম, কেয়া, কামিনী। বেলী আছে তিন জাতের তুইতো জানিস। খয়ে বেলী, রাই বেলী, মোতিয়া বেলী। রঙিন ফুলও ফোটে।’
আনন্দে রিনির মন পদ্মবাগান হয়ে যায় যেন। মা যেন বিশাল জ্ঞানের ভাণ্ডার।
চম্পা খালার বাড়িতে রিনির বেড়ানোটা একটু বেশিই হয়। একবার বর্ষায়ও গিয়েছিল দিনাজপুর। টিনের চলে টাপুর টুপুর বৃষ্টির গান। নারকেল আমের ডালের হুটোপুটি। খালুজান কবিতা শুরু করেছিলেন,
‘জল ঝরে জল ঝরে সারাদিন সারারাত
অফুরান নামতার বাদলের ধারাপাত।’…
রিনি খুশিমাখা গলায় বলে, খালুজান, এটা সুকুমার রায়ের কবিতা। ’ফুপাও খুশি হয়ে রিনির পিঠ চাপড়ে দেন। তুমুল বৃষ্টি বাইরে। হয়তো এখনই ব্যাঙের কাওয়ালি শুরু হয়ে যাবে। খালু পান চিবুতে চিবুতে আওড়াতে থাকেন, ‘ব্যাঙেদের মহাসভা আহ্লাদে গদগদ। গান ধরে সারারাত অতিশয় বদখদ।’…
রিনি প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে এবার। ‘খালুজান ব্যাঙদের এ আনন্দগীতি মোটেও বদখত নয়।’ কবি মনে হয় গদগদ শব্দটির সঙ্গে ছন্দ মেলানোর জন্য বদখদ শব্দটি জুড়ে দিয়েছেন।’…
চম্পাখালা হাতের কাজ সেরে এলেন। স্নেহের সুরে বললেন, ‘রিনুমা এবার ঘুমিয়ে পড়। তোমার খালুজান কবিতা বলার মেনোযোগী শ্রোতা পান না। তোমাকে পেয়ে হয়তো রাত ভোর করে দিতে পারেন। রাত ১১টা বাজে। এখন না ঘুমালে শরীর খারাপ লাগবে মা মণি।’
খালুজান কিছু বলেন না, কেবল মিটি মিটি হাসেন। রিনি হাসতে হাসতে বলে, ‘খালামণি তুমি যে আমাকে তুলোর মধ্যে করে রাখতে চাও। কোলে রাখবে না মাথায় রাখবে ভেবে পাচ্ছ না।’…
এরপর আর গল্প-কবিতা চলে না। রিনি ধবধবে টান টান বিছানায় গিয়ে আরাম করে শুয়ে পড়ে। খালুজান কতক্ষণ লম্বা বারান্দা জুড়ে পায়চারি করতে করতে গুণগুণ করে জিকির করেন। রিনির ঘরের এককোনায় একটা ছোট তক্তপোশে আদুরি ঘুমিয়ে থাকে। যেন রিনি একা ঘরে ভয় না পায়। দেখতে দেখতে বিদায়ের ঘণ্টা বেজে ওঠে। খালা-খালুকে ছেড়ে আসতে রিনির কষ্ট হয়। বেশ কষ্ট। মনে হয় ছায়াচ্ছন্ন বাড়িটাও কাঁদছে ‘যেতে নাহি দিব’, ‘যেতে নাহি দিব’ বলে। …

এইতো ভালো লেগেছিল
শরত কালটাও রিনির প্রিয় ঋতু। কিন্তু এই ফাঁকিবাজ ঋতুটা না বলে এসে না বলেই চম্পট দেয়। মন গুন গুন করে গায়, ‘নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা।’ দেখতে না দেখতে সাদা ভেলাটা কোন বিজন ভ্রমণে চলে যায়। আর শরতের কাশফুল এ রোয়া ওঠা শহরে কোথায়?
কেবল ‘পথের পাঁচালী’তে কাশফুল দেখেছে রিনি। অবশ্য একবার ট্রেনে যেতে যেতে মাঠের পাশে কাশফুল দেখেছিল রিনি। কী সুন্দর! কী সুন্দর! মৃদুমন্দ বাতাসে মৃদু মৃদু মাথা দোলাচ্ছিল কাশফুলগুলো। মায়ের একটা ছোটবেলার সাদা-কালো ছবি আছে কাশবনের মাঝে দাঁড়িয়ে দুইবেণীতে রিবন বেঁধে দুধসাদা দাঁতগুলো মেলে হাসছেন। …শরতকালাটা যেন রবীন্দ্রনাথের গানের মতো, ‘মাধবী হঠাৎ এসে হেসে বলে যাই যাই যাই।’ …
শরত শেষে হেমন্ত গুটি গুটি পায়ে আসে। কিন্তু গ্রামেগঞ্জে একটা উৎসব উৎসব রঙ লাগে যেন। নতুন ধান গোলায় ওঠে। নতুন ধান সেদ্ধর গন্ধ ছড়ায় বাতাসে। নবান্ন আসে গ্রামীণ মানুষের ঘরে উৎসবের রঙ নিয়ে। নতুন চালের গুঁড়ি দিয়ে পিঠেপুলি হয়। পায়েস হয়। যার যেমন সাধ্য। সম্পন্ন গৃহস্থ বাড়িতে আয়োজন হয় খানিকটা জমজমাট আকারে।
রিনিদের বাড়িতেও চালের গুঁড়ি আসে। পাটিসাপটা, ভাপা পিঠা হয়। আবারও স্বজন বন্ধুদের নিয়ে কছুটা সময় কাটে আনন্দে। পিঠেপুলি যে কী স্বাদ তা বাঙালিই জানে। কেক, পেস্ট্্ির, পেটিস, পিৎজা, এর কাছে কিছুই না। এমনকি নানু যে হাতে কাটা সেমাই ঘনদুধে রেঁধে আদর করে পরিবেশন করেন তারইবা তুলনা কোথায়!
রিনিদের দাদাবাড়িতে এখন পাকন পিঠা হয়। লালফুপি বিধবা হয়ে নাবালক দুই ছেলের হাত ধরে উঠেছিলেন বাপের বাড়ি। লালফুপির এখনও ধবধবে গায়ের রঙ। সারা মুখজুড়ে যেন নূরানী আলো ছড়িয়ে থাকে। মনে হয় এক রাশ জুঁইফুলের শুভ্রতা ছুঁয়ে আছে তাঁকে। কী মিষ্টি সহী উচ্চারণে কুরআন শরীফ পাঠ করেন! তাঁর দুই ছেলে ফরহাদ, ফরাস উচ্চশিক্ষা নিতে স্বলারশিপ নিয়ে আমেরিকার বোস্টনে আছেন। ওনারা দুই ভাই মিলে গ্রামে একটা এতিমখানা করেছেন। ফুপুরও এটা অনেকদিনের স্বপ্ন, ফুপু সর্বদা হাসিমুখ। কোন অভিযোগ নেই কারো কাছে। এতিমখানার নাম ‘শান্তিধাম’। এখানে প্রায় ১০০ জন এতিম কিশোর পড়ালেখা করে। গ্রামের সম্পন্ন কিছু সহৃদয় ব্যক্তিও আর্থিক সহযোগিতা করেন। আর ফরহাদ ভাই ও ফরাস ভাই কিছু কিছু ডলার নিয়মিত পাঠান। এখানে শরীরচর্চা থেকে আরবি, বাংলা ও ইংরেজি পড়ানো হয়। এখানকার ছেলেরা কেরাত প্রতিযোগিতা, খেলাধূলা, পড়াশোনায় খুব ভালো করছে। লালফুপিও তাঁর ছেলেদের সবাই দোয়া করে। এইসব অসহায় ছেলেরা টোকাই হয়ে যায়নি। বখাটে বাউন্ডুলে হয়ে যায়নি!
লালফুপি রিনির জন্য প্রায়ই মুগপাকন পাঠান। রিনির বাবার খুব প্রিয় মুগপাকন। অথচ ওনার সুগারের খানিক দোষ আছে। তবুও মাঝেমধ্যে খেয়ে ফেলেন। মায়ের হাতে ধরা পড়লে বলেন, ‘দুর বুবুর হাতের পাকন খেয়ে যদি সুগার একটু একটু বাড়ে তাতে ক্ষতি কী এমন! একশ কদম লেফট রাইট করলেই সব ক্যালরি বার্ন হয়ে ছাইভস্ম হয়ে যাবে। প্রাণের খুশিটাও ত দরকার নাকি।’
রিনির মা রাগ করেন আবার হাসেন মুচকি মুচকি, ‘ঠিক আছে। দুই দিন খাবারে র‌্যাশন হবে। দুটো রুটি সবজি সবজি আর সবজি। ঠিক আছে? আর দুইবেলা হাঁটা।
কপট রাগে রিনির বাবা বলেন, ‘ঠিক আছে। ঠিক আছে। ডাক্তারের ওপর আর ডাক্তারি ফলাতে এসো নাতো।’
রিনি বাবা-মায়ের এই মধুর কলহের একমাত্র ন্যায়বিচারক।
রিনির ছাদে ওঠার সময় হয়ে গেছে। মায়াভরা চোখ মেলে তাকায় তার বাগানের দিকে। কী শোভা, কী মায়াগো! খবরের কাগজ খুললে পাতায় পাতায় কেবল মন খারাপ করা খবর। সহ্য হয় না রিনির! তাই এই বাগানে এসে মনকে ভুলিয়ে রাখে, আনন্দময় করে তোলে। প্রার্থনা ওর সৃষ্টিকর্তার দরবারে, ‘সকল দেশের সেরা সে যে আমার জন্মভূমি।’ যেন সকল দেশের সেরাই হয়ে ওঠে আবার নতুন দিনের ভোরে। রিনির মনের সমস্ত ভালো-না লাগার অনুভবগুলো কার্পাস তুলোর মতো উড়ে যায় ঐ প্রিয় নীলাকাশে। মনের মধ্যে গুণগুন করে ‘এইতো ভালো লেগেছিল। পাতায় পাতায় আলোর নাচন।’ মাঝে মধ্যে পানি ¯েপ্র করে গাছের পাতাগুলোকে গোসল করায় রিনি। পাতাগুলো খুশি হয়ে হাসতে থাকে যেন। হতাশায় ভেঙে পড়লে কি চলে? মানুষ যে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ সৃষ্টির সেরা জীব।
রিনির মনে পড়ে খোদাবক্স খালুর কথা। তিনি বলেছেন, হাদিস শরীফে আছে, ‘যে ব্যক্তি অকারণে একটি কুলগাছ কাটবে আল্লাহ তাকে অধোমুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।’
মা প্রায়ই বলেন, ‘জানিস রিনি গাছপালা ভূমি ক্ষয়রোধ, অনাবৃষ্টি, বানভাসি, ঝড়-তুফান সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে অনেকখানি রক্ষা করে। আর মনোযোগ দিয়ে শোন প্রিয় নবীজী রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বাণী, ‘যদি কিয়ামত হওয়ার মুহূর্তেও তোমাদের কারও হাতে একটি চারাগাছ থাকে তাহলে সে যেন সেই মহাবিপদের সময়ও তা রোপণ করে দেয়।’
রিনির মন খুশিতে ভরে যায়। কারণ গাছগাছড়ার বিষয় তাকে নির্মল আনন্দ দেয়।

এ শহের হঠাৎ ডেকে ওঠে কোকিল
ফাল্গুন-চৈত্র মাস ক্যালেন্ডারের বিচারে বসন্তকাল। ছয় ঋতুর সেরা মাস। এই সময় রিনির ভালো লাগে কোকিলের কুহু। যদিও খুব কমই শোনার সৌভাগ্য হয়। গতকাল নীরু, মিতু, এসেছিল। ব্যাবিলনের বাগানে তো উঠতেই হবে। মিতু আবার গাইতে জানে। ও সুরেলা গলায় গাইল, ‘আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে।’ তারপর নীরু গাইল। যদিও বারবার বলছিল ও নেহাতই বাথরুম সিঙ্গার। বন্ধুদের অনুরোধে সতরঞ্জির ওপর আরাম করে বসে নীরু গাইল, ‘এই সুন্দর ফুল, সুন্দর ফল মিঠা নদীর পানি/ খোদা তোমার মেহেরবানি।’ তারপর গাইল, ‘রোজ হাসরে আল্লাহ আমার কোরো না বিচার।’ নীরুর কণ্ঠে নিবেদিত আবেদন ও সুর ছড়িয়ে পড়ল বাতাসে। ফুলগুলো যেন মুগ্ধ হয়ে গান শুনছে এমনি মনে হল রিনির। এবার রিনি প্রতিটি ফুলের নাম বলতে বলতে হয়রান হয়ে গেল। টগর গাছটায় বেশুমার ফুল ফুটেছে এবার। মনে হচ্ছে ফুলগুলো মুক্তো আর পাতাগুলো পান্না। রাধাচূড়ার গাছটায় ঝিরিঝিরি পাতার ফাঁকে হলুদ লাল মেশানো ফুল। মিতু চেঁচিয়ে বলে, ‘আচ্ছা রিনি কৃষ্ণচূড়া ঝাঁকড়া অগড়া গাছ। ফুল যেন লাল আগুনের মেলা। আর রাধাচূড়া এত পিচ্চি।’ রিনি হাসে, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, তাই।’
সামনেই পলাশদের দোতলা বাড়িটা। অনেক পুরনো গাছগাছড়া আছে। পলাশের দাদুভাইয়ের দৃঢ়পণ, ‘আমি যতদিন বেঁচে আছি ততদিন এ বাড়ি এমনি থাকবে। ডেভেলপাররা যেন শতহস্ত দূর দিয়ে হাঁটে।’
হঠাৎ পলাশদের গোলাপি রঙের বাড়িটা থেকে ডেকে ওঠে কোকিল। কী মিষ্টি সেতারের সুর! কু-উ-কু-উ। রিনি হাসতে হাসতে বলে, ‘আমার দাদীমা বলতেন, ‘কাকের বসায় কুলার ছা/ রাত পোহালে করে রা।’… কোকিল এত সুরেলা কণ্ঠের বসন্তের পাখি অথচ সংসারী নয়। সে কখনও নিজের বাসা বানায় না। কাকের বাসায় যেয়ে ডিম পাড়ে। ডিম থেকে ছানা বের হওয়ার আগ পর্যন্ত কাক মাতৃস্নেহে ডিমে তা দিতে থাকে। বেশ কিছুদিন পর কাক বোঝে কোকিলের কীর্তি। কেমন বেমানান চরিত্র। তাই নারে?’
ওরা দু’জনে মাথা নাড়ায়, ‘তাইতো কোকিলে এই রকম দুষ্টুমি করাটা ঠিক নয়।’ বেলফুল ফুটেছে অজস্র। মোতিয়া বেলী, খয়ে বেলী। মিষ্টি সুগন্ধ বাতাসে। ধীর পায়ে নেমে আসছে ধূসর সন্ধ্যা। আজান পড়ে গেছে। ওরা তিন বন্ধু খোলা হাওয়ার সুন্দর বাগান ছেড়ে অনিচ্ছুক পায়ে নেমে আসে।
রিনির মা লুচি, মোহনভোগ, নিরামিষ নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। বেগম নুসরাত সবুজ বুটিদার সাদা শাড়ি পরেছিলেন। ওনাকে আদর্শ মাতৃমূর্তির মতো লাগছিল মিতুর। মিতুর মা পাঁচ বছর আগে মারা গেছেন। ওর বুকটা হু হু করতে করতে আবার স্নেহসুধায় ভরে গেল। ওরা তিন বন্ধু ক্লাসের গল্প পড়াশোনার বিষয় নিয়ে কথা বলতে বলতে গরম গরম লুচি খেতে লাগল।
মঙ্গলবার দিন রিনির ডাক্তার বাবা হাস্যমুখে ঘোষণা দিলেন, ‘সামনে শুক্রবার আমরা সবাই গাজীপুর যাবো। আমার স্কুলফ্রেন্ড রেজওয়ানের বাগানবাড়িতে।’ রিনিতো খুশিতে আটখানা। বাগানবাড়িতে পা দিয়ে রিনি অবাক। অপূর্ব সাজানো গোছানো ছিমছাম বাগানবাড়ি। সবুজ ঘাসের লনটি চমৎকার। যেন ইরানি সবুজ রঙের কার্পেট বিছানো। কেয়ারী করে লাগানো ফুলের সারি। মনে হয রূপকথার মায়াকুটির। স্থলপদ্মের গাছ দেখে রিনি আরো অভিভূত।
ফুল ফুটে রয়েছে। এই পদ্ম রং বদলায়। প্রথমে সাদা, তারপর গোলাপি পরে লাল। তাই এর আর এক নাম ঈযধহমবধনষব জড়ংব বোটানিক্যাল নেম ঐরনরংপঁং গঁঃধনরষরং। এ এই গাছটি চম্পাখালার দিনাজপুরে বাড়িতেও আছে। এখানেও জারুল গাছটার  ভেতর থেকে কোকিল ডেকে উঠল। প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে ফুলের বনে নেচে নেচে। গঙ্গাফড়িং, ঘোড়াপোকা দেখেছে রিনি এখানে। রিনির আজ একটা কথা মনে পড়ে হাসি পেল। আলতা নামে তার একটা বন্ধু ছিল। একবার ওকে ওর কাজিন নিয়ে গিয়েছিল একটা অপূর্ব ফুলভরা গাছ দেখানোর জন্য। আলতার কাজিন বলেছিল, তোকে এক জায়গায় নিয়ে যাবো। সেখানে একটা অপূর্ব গাছ দেখাবো। আমার চিনি ফুপুর বাড়ি। গাছটি হলুদ ফুলে ফুল ছেয়ে গেছে। গোল্ডেন শাওয়ার নাম। মনে হয় অসংখ্য ঝাড়বাতি দুলছে গাছে।
আলতা ওর কাজিন বেগমের হাতে ধরে প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে পৌঁছে গেল চিনিফুপুর বাড়ির আঙিনায়। আঙিনার দক্ষিণ দিকে একটা বাঁশের বেড়া দেয়া ছোট্ট সুন্দর বাগান। মধু-মঞ্জুরিলতা, কাঠগোলাপ আছে একধারে। আর হলুদ ফুলে ছাওয়া গাছটির দিকে চেয়ে বেগম অভিভূত ভঙ্গিতে বলে, এই যে গোল্ডেন শাওয়ার। দ্যাখ চোখ জুড়িয়ে যায়।
আলতা হি: হি: করে হাসতে থাকে। এইটা তোর বিখ্যাত অপূর্ব ফুল। আরে এতো বান্দরলাঠির গাছ। শিমুলদের বাড়িতেও আছে। এর ডালে দুলতে থাকে লম্বা লম্বা লাঠি। আমরা বলি বান্দরলাঠি।…
আলতা ফুটো বেলুনের মতো চুপসে যায়। এ গল্পটা আলতা করেছিল রিনির কাছে। আজ মনে পড়ে হাসি পাচ্ছে।
খাবারের ডাক পড়েছে। টেবিলটিও সুন্দর করে সাজিয়ে পরিবেশন করেছেন লিন্টুমিয়া। বাবার আগে থেকেই নির্দেশ বা অনুরোধ ছিল বন্ধুর কাছেÑ ‘নো পোলাও, নো বিরিয়ানি। ভর্তা, মাছ, ভাত।’ শফিক চাচা ও চাচী ফারজানা খুব আমুদে মানুষ। রিনির মায়ের গল্প আর ফুরায় না। ছোটবেলায় ওনারা নাকি সিরাজগঞ্জের সালেহা ইসহাক স্কুলে পড়াশোনা করেছেন।
টেবিলে বড় বড় পাবদা মাছের রসা রসা তরকারি। চিংড়ি মাছের ভর্তা, মুড়ি ঘণ্ট, দই, রসগোল্লা। রিনির খুব মজা লেগেছে পাবদা মাছের তরকারি। খাবার পর্ব শেষ করে পরিপাটি বিছানায় খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে একেবারে তারতাজা হয়ে উঠল। এই বাংলো বাড়িতে স্বচ্ছ পানির একটা পুকুর আছে। ঘাটলা বাঁধানো। লাল টুকটুকে রঙ করা।
শফিক সাহেব ও রিনির বাবা ঘাটলায় বসে চা খেতে খেতে বললেন,
‘জানিসতো শফিক আমাদের এই নদীমাতৃক দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪/৫ জন শিশু-কিশোর পানিতে ডুবে প্রাণ হারায়। কারণ ওরা বেশির ভাগই সাঁতার জানে না। কী দুঃখের কথা একবার ভাবত। পানিতে পড়লে হাত-পা ছোড়ার আগে হার্টফেল করে মারা যায়।’ রিনি বাবার পাশটিতে এসে বসে। বাবা বলেন, ‘বৃক্ষলতা ভালোবাস। পড়াশোনা করছ মনোযোগ দিয়ে। সব ভালো। কিন্তু জীবনের পূর্ণতার জন্য আরো কিছু ক্ষেত্র আছে রিনি। আস্তে আস্তে সেদিকেও খেয়াল করতে হবে। আজ থেকে মনে রেখ তোমার সাঁতার শেখা জরুরি। বিজ্ঞ কবি মাঝির কণ্ঠে বললেন, জীবনটা যে ষোল আনাই মিছে। বিদেশে দেখেছি ওরা সুইমিং পুলে ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে যায়। সাঁতার শেখায়। এটা একটা ভালো এক্সারসাইজও বটে। কিছুকাল আগেও আমাদের দেশের নদী, পুকুর, দীঘি থৈ থৈ করত। এখন পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে মানুষের চরম স্বার্থের কারণে নদী, পুকুর, খালবিল সবই শুকিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বন্যা এলে তো আবার সব ভেসে যায়। ঘরবাড়ি লোকালয়। নদীর পাড় ভাঙতে ভাঙতে গ্রাস করে গ্রামের পর গ্রাম। এই বাংলাদেশের সব কিশোর যেন ছোটবেলা থেকে সাঁতার শেখে সে বিষয়ে বাবা মাকে সচেতন হতে হবে। উদ্যোগী হতে হবে। কত কত মেধাবী ছাত্র কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতে, মাধবকুণ্ডের ঝর্ণায় প্রাণ হারাচ্ছে। বুড়িগঙ্গায় ডুবে যাচ্ছে। চোরাবালি, জোয়ার-ভাটা, নদীর চরিত্র সম্বন্ধে, সমুদ্রের রহস্য না জেনেই ভালো সাঁতারু না হয়েও নেমে পড়ে পানিতে। তারুণ্যের উচ্ছলতায় আর বেঘোরে হারায় প্রাণ। মোটকথা রিনি এবার আমরা দিন সাতেকের জন্য তোমার দাদাবাড়ি যাবো। ওখানে তুমি আমাদের পুকুরে সাঁতার শিখবে, কেমন? সাঁতার তোমাকে শিখতেই হবে। সাঁতার শিখতে পারলে তোমাকে একটা সারপ্রাইজ গিফট দেবো।
রিনির সাঁতার শিখতে উৎসাহ কম নেই। কিন্তু ভয় শুধু জোঁকের। ও বলে, ‘কিন্তু বাবা পুকুরে নাকি জোঁক আছে। রক্ত চুষে ঢোল হয়ে শরীরের সঙ্গে লেগে থাকে। আমার বড্ড ভয় করে।’
বাবা বলেন, ‘কোন ভয় নেই রিনি। কালা মিয়া, ধলা মিয়া, মাখনা ওরা সব আছে না। পুকুরের শ্যাওলা, কচুরিপানা সব সাফসুতরো করে দেবে। আমি মোবাইল করে দেবো আজই। দেখবে কী সুন্দর টলটলে পানি। সুরাতন খুব ভালো সাঁতার জানে। এ এক নতুন বিদ্যা, যা শুধু আনন্দই দেয় না, জীবন রক্ষাও করে। বুঝলে রিনিমণি?
রিনির মনটা এক নতুন চেতনায় ভরে ওঠে।

সকল দেশের রানী
‘সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।’ নরসিংদী জেলার মনোহরদীতে বছর দুই পর রিনি এসেছে দাদুবাড়ি। পাড়া প্রতিবেশী- আত্মীয়স্বজনে উঠোন ভর্তি হয়ে গেল। কেউ বলছে, ‘বৌমা তোমার মাইয়া যে মাথায় তোমারেও ছাড়াইয়া গেছে গা। এবার বিয়া দিবা নাকি আরো পড়াইবা?’ সুন্দরী নানী বলেন, ‘অহনই কিয়ের বিয়া। মাইয়ার বিয়ার বয়স হয় নাই। পড়ালেখা করুক।’ এমন সব অদ্ভুত কথা শুনে রিনির মনে হয়, ‘আহারে এঁরা এখনও মান্ধাতার আমলের ধ্যানধারণা নিয়ে বসে আছেন!’…
দাদীমার বয়স হয়েছে পঁচাত্তর। আর দাদাভাইয়ের আশি। এখনও দু’জনেই চলাফেরা করতে পারেন। কিছুটা তদারকিও করেন ঘরগেরস্থালির। বাবা-মা অনেক অনুরোধ করেছেন ঢাকায় তাদের সঙ্গে থাকার জন্য। কিন্তু ওরা এই ভিটেমাটি, ধানক্ষেত, সর্ষে ক্ষেত, আত্মীয়স্বজন, এই পরিবেশ ছেড়ে কোথাও যেতে চান না। অবশ্য বছরে দুইবার বাবা দাদাদাদীকে চেকআপের জন্য নিয়ে যান ঢাকায়। দিন কয় থাকেন। তারপরই শুরু করেন, ‘ওরে বাবা দম বন্ধ হয়ে আসে। গাছপালা নাই। উঠান নাই। ঝলমলা কবুতরের খোপ।’
তো দাদুবাড়িতে এসে রিনি যেন শেকড়ের সন্ধানে মেতেছে। মনে হয় অ্যালেক্স হ্যালীর ‘দি রুট’। দাদীমা বেদৌরা খানম কত সে স্মৃতির ঘুড়ি উড়িয়ে দিলেন আকাশময়! দাদীমা নাকি দুধের সব সর আর কাঁচাহলুদ দিয়ে রোজ গোসল করতেন। দাদীমার মায়ের হুকুম। দাদীমা অন্য ভাইবোনদের মতো দুধে আলতা বরণ ছিলেন না বলে। রোজ আয়া শেফালী বিবি ঘরে তৈরি নারকেল তেল চুলের গোড়ায় ঘষে ঘষে বিলি কেটে কেটে লাগিয়ে দিতেন। তারপর চারবেণী গেঁথে দিতেন। কোনদিন বেণীখোঁপা তার মধ্যে প্রজাপতিমার্কা রূপোর কাঁটা। আর চুল পরিষ্কার করতেন মসুরের ডালবাটা দিয়ে। জবা ফুল বেটেও মাথায় দিতেন।
তেরো বছর বয়সে দাদীর বিয়ে হয়। তখন তাঁর শাশুড়ি এতবড় ভারী সীতাহার, কোমরের বিছা, বাজুবন্দ দিয়েছিলেন যে সেগুলো পরে দাদীমা সোজা হয়ে হাঁটতে পারতেন না। এসব স্মৃতিকথা বলতে বলতে দাদীমা ফোকলা গালে মিষ্টি করে হাসেন। দাদা শিক্ষিত জোতদার। বড় বিবেচক মানুষ। দাদীর অনেক ছড়া, কবিতা, খনার বচন মুখস্থ। ফার্সি জানেন অল্পবিস্তর। কুরআন শরীফ সহীহভাবে পড়তে জানেন। এর পেছনে দাদার অবদান অনেক। দাদার ঘরে একটা ছোট লাইব্রেরি আছে। বিষাদসিন্ধু থেকে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল। দাদা-দাদীমাকে নিয়ে অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। সেই সময়ে এরকম ঘুরে বেড়ানো খুব সহজ ছিল না।
দাদীমার হাতের এঁচোড় তরকারি খুব মজার। দাদীমার একটা বিশেষ শখ এখনও আছে। তাঁর প্রায় হাফ ডজন পোষা বিড়াল আছে। তাদের কী বাহারি নাম! খেয়ালি, চপলা, লক্ষ্মী দুষ্টু, মিষ্টি, মেম ও সুন্দরী। ওদের জন্য ঘর আছে। নিত্য ওদের জন্য মাছের কাঁটা, কিছুটা দুধ কখনও কিছুটা মাছ, অল্প ভাত বরাদ্দ থাকে। বর্তমানে ওদের খাবার মান কিছুটা নেমে এসেছে। বাজার মূল্য বেড়ে যাওয়ায়। দাদীমার বিল্লিবাহিনী দাদীকে উঠোনে বেড়োতে দেখলেই ঘিরে ধরে। আদর খেতে ওস্তাদ ওরা। দাদুর প্রিয় একঝাঁক রাজহাঁস। সাদা পালকে যেন কখনও ময়লা লাগে না। লাগলেও ওরা ধুয়ে ফেলে। এখনও দাদুর গোলাঘর ভরা থাকে সোনালি ধানের স্তূপে। ঘরের একপাশে থাকে সোনালি পাট। সোঁদা সোঁদা গন্ধ বেরোয় সোনালি আঁশ থেকে।
দাদীমা ধলাচাচীকে দিয়ে এখনও মাসকলাই ডালের কুমড়ো বড়ি চাদরে বিছিয়ে দেন উঠোনে। কঞ্চি হাতে কাক পাহারা দেয় ফুলমতি। রান্নাঘরের পাশে লাউডগা লকলকিয়ে উঠেছে। কী সবুজ! কী তরতাজা! রিনি বলে দাদীমার গালা ধরে, ‘দাদীমণি এই লাউগাছকে তুমি কী ভিটামিন খাওয়াও? এত সুন্দর স্বাস্থ্য।’
বেদৌরা খানম খুশিভরা গলায় বলেন, ‘রিনিমণি ওদের প্রতিদিন মাছ, গোশত ধোয়া পানি দেই গোড়ায়। আর গোবর সার। রান্নাঘরের সবজির খোসা, পচা লতাপাতা একটা গর্ত করে রেখে দেয়া হয় পুবের এ খালপড়ে। ওগুলো পচে সার তৈরি হয়। জৈব সার। খুব ভালো লাউ, শিম, কুমড়ো, ঢেঁড়স ইত্যাদিতে গাছে কত দেইরে খুব ভালো ফলন হয়। পাড়াপড়শি, মিসকিন গরিব মানুষগুলোকে কিছু কিছু দেই। খুব আনন্দ হয় রে।’
দাদীমার কাছ থেকে রিনি অনেক দামি বিষয় জেনে খুশিভরা গলায় বলল, ‘দাদীমা তুমি আসলে একজন আদর্শ মহিলা।’…
প্রায় প্রতিদিন সুরাতন রিনিকে সাঁতার শেখায়। প্রথমে কোমর পানি, তারপর গলাপানি। রিনি অনেক আয়ত্ত করে নিয়েছে। হয়তো আর বার দুই সুযোগ মতো এসে কায়দাকানুনগুলো আরো ভালো করে রপ্ত করতে পারলে মোটামুটি সাঁতারু হয়ে যেতে পারবে।
এক সকালে ওরা সবাই মিলে নৌকা ভ্রমণে বেরোয়। পুরু কাঁথা বিছানো নৌকার ভেতর। দাদী দু’টি ছোট বালিশ দিয়ে দিয়েছেন। বাড়ি থেকে সসপ্যানভর্তি ভুনা খিচুড়ি আর ডিমের কারি আনা হয়েছে। মজা করে খাওয়া হল। মা গল্প করলেন নানু ভাইয়ের সঙ্গে চাঁদপুরে মেঘনা নদীতে নৌ-ভ্রমণে যেয়ে মাঝিরা তাজা ইলিশ কিনে দিয়েছিল নানুভাইকে। একেবারে তড়পানো ইলিশ। এ দৃশ্য বিরল। ইলিশ খুব লাজুক মাছ ,পানি থেকে উঠালেই স্থির হয়ে যায়।
বাবা নৌকায় বসে কত গল্প করতে লাগলেন, ‘শোন রিনি বারবার বলেছি আবারও বলি শুধু পুঁথিগত বিদ্যায় মানুষ পূর্ণ মানুষ হতে পারে না। চারপাশটাকে খানিক বুঝতে হবে। ভালোবাসতে হবে। স্বপ্ন দেখতে হবে, সুন্দর স্বপ্ন। আর লাগাতার নিষ্ঠা থাকলে পূরণ হবে স্বপ্ন। এই যে সমতল ভূমির শ্যামল বাংলার সন্তান মুসা ইব্রাহিম, মুহিত, নিশাত মজুমদার, তাসফিয়াহÑ এরা তাদের স্বপ্নগুলোকে শুধু শিথানে নিয়ে ঘুমিয়েই থাকেনি বরং স্বপ্নের হাত ধরে এগিয়ে গেছে অনেক দূর। দৃঢ় মনোবল, শ্রম, অনুশীলন ছাড়া কি অর্জন হয় বলতো? এভারেস্টের সর্বোচ্চ শিখরে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছে বাঙালি তরুণ-তরুণী। দেশের জন্য কত বড় গৌরবের বিষয়। আমার মন ভরে যাচ্ছে গর্বে আনন্দে।
গত বছর চিম্বুক পাহড়ে উঠে রিনির বড় ভালো লেগেছিল। আর ভালো লেগেছিল কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত। রাখাইনদের ঘর গেরস্থালি। মনে পড়ে মাধবকুণ্ডের প্রপাতের কথা। আশ্চর্য সৌন্দর্যে ভরপুর। তবে তখন রাস্তাটা বেশ দুর্গম ছিল। তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত প্রায় অনেকটাই দেখার সৌভাগ্য হয়েছে রিনির।
ঢাকায় ফিরে এসে মনটা বেশ ফুরফুরে লাগছে রিনির। এই ঢাকা এখন পোড়া শহর তারপরও প্রিয়। যেন অনেক কালের চেনা।

ফ্ল্যাট বাড়িটা রঙিন জাহাজ
এবার রিনির মগজে ঢুকেছে এক অপূর্ব ভাবনা। বুয়াদের বাচ্চাগুলোকে নিয়ে ছাদে বসে পাঠশালা খুলবে ও। প্রথমে পাঁচজন শিক্ষার্থী মিলল। প্রতি সপ্তাহে তিন দিন পাঁচটা থেকে ছয়টা পর্যন্ত অক্ষরজ্ঞান দান। কী যে তৃপ্তি এ কাজে আগে বুঝতে পারেনি রিনি। কয়েক দিনের মধ্যে ছাত্রছাত্রী আরো চারজন পাওয়া গেল। হাসু, নসু, আলতা, ঝান্টু, ডলার, বাদশা, পিয়ারা। ওরা বুকে বর্ণ-পরিচয় শ্লেট পেনসিল নিয়ে জড়ো হয় বাগানের স্কুলে। এ যেন শক্তিনিকেতনের এক অতি ক্ষুদ্র সংস্করণ। নসুমিয়ার বয়স এগারো। ভারী চঞ্চল। কিন্তু অপুষ্টি অযতেœ বেড়ে উঠলেও মগজ বেশ সতেজ। ও সবার আগে স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ, তিনের ঘরের নামতা মুখস্থ করে ফেলেছে। রিনি এ মাসে ওকে একটি রঙ পেন্সিল বক্স উপহার দেবে।
সবচেয়ে অমনোযোগী ছাত্রী আলতাবানু। বইয়ের মধ্যে মাথার ক্লিপ, তেঁতুলের বিচি, রঙিন কাচের টুকরা তার থাকে। পড়ার চেয়ে ওগুলো নিয়ে খেলতে তার আগ্রহ বেশি। সে ক খ গ ঘ পর্যন্ত এসে ব্রেক কষে বসে আছে। ‘ঙ’ বর্ণটি তার বড় অপ্রিয়। এ বর্ণটি উচ্চারণ করতে গেলে তার পেটের মধ্যে নাকি গুড়গুড়ায়। নসুর মা বলে, আপা গো আপা, পোলাটারে আপনের হাতে দিয়া আমার যে কী শান্তি হইছে। পোলাটা রাস্তায় রাস্তায় হাবিজাবি পোলাপানের সাথে মেশে। ডাংগুলি খেলে। ওর চৌদ্দগোষ্ঠীর ভাইগ্য যে আপনে ওরে পড়ালেখা শিখাইতেছেন। বাপ-মা মুরুক্ষ বইলা সন্তান মুরুক্ষ হইবো ক্যান?
রিনি ওদের বইখাতা কিনে দেয়। মাঝে মধ্যে টফি, বাদাম কিনে দেয়। মাস দুই কেটে গেছে। ছাত্রসংখ্যা বেড়েছে। রিনি প্রিন্সিপাল রিনিই দারোয়ান। পাঠশালার নাম ‘চাঁদের হাট’। রিনির মা সহযোগিতা করেন প্রথম থেকেই। এবার রসিকতা করতেও ভুলে যাননি। সবাই সুর করে নামতা পড়ছে। সেই সেদিনের পুচকে রিনি একটা হালকা বেত হাতে নিয়ে মোড়ায় বসে আছে। পুরোদস্তুর কানাই মাস্টার। মা হালকা গলায় স্মৃতি হাতড়ে বলতে থাকেন,
আমি আজ কানাই মাস্টার
পড় মোর বিড়াল ছানাটি।
আমি ওকে মারি না মা বেত
মিছে মিছে বসে নিয়ে লাঠি। …
কানাই মাস্টার একটু কপট রাগ দেখিয়ে ঘাড় ফেরায়।
‘এরা বিল্লী নয়।’
মা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘রিনি আমরা সবাই একসঙ্গে কোরাস গাই। দেশটা গেল। এ সময়ের মানুষগুলো সব বাটপার, ভণ্ড, ঠকবাজ, স্বার্থপরের চূড়ান্ত। একটা সাদা মনের মানুষ খুঁজতে পেলে আধমরা হতে হয়।’
রিনি বলে, ‘হ্যাঁ সবাই এরকমই বলে। মানুষজন সব খারাপ হয়ে গেছে। কথা রাখে না। একজন আর একজনকে ঠকাতে পারলেই সুখী হয়।’
মা এবার শান্ত গলায় বললেন, ‘কিন্তু রিনিমা বুকে হাত দিয়ে প্রতিটি মানুষ বলুক না আমি নিজে ভালো। আমি কাউকে ঠকাই না। অন্যের ভালো চাই। এসব কথা জোর দিয়ে বলতে পারে। কিন্তু এই আমি, তুমি, সে এই নিয়েই তো সমাজ সংসার।’
মায়ের কথাগুলো আজ খুব সহজ হয়ে গেল রিনির কাছে। রিনির ভাবনাগুলো ভরিয়ে তোলে তার মনকে। ‘আমরা প্রত্যেকেই যদি একটু একটু ভালো কাজ ভালো চিন্তা করি ভালো মানুষ হবার চেষ্টা করি, তাতে ঐসব কাজে লোকগুলো তেমন কিছু ক্ষতি করতে পারবে না।’
আজ যেন রিনির ভুবন ভরে উঠছে আলোয় আলোয়। ভরে উঠছে সাহস ও শক্তিতে।

 

SHARE

Leave a Reply