Home ফিচার স্বপ্নপুরী আটলান্টিস

স্বপ্নপুরী আটলান্টিস

মঈনুল হক চৌধুরী..
আটলান্টিস, রহস্যঘেরা এক স্বপ্নপুরী। বিষ্ময়কর উন্নত এক মহাদেশ। এই মহাদেশটি সভ্যতার চরম শিখরে পৌঁছে গিয়েছিল দূর কোন অতীতে। সমসাময়িক বিশ্বে জ্ঞান, বিজ্ঞানে, শিক্ষাকৃষ্টিতে, ঐশ্বর্যে আর সামরিক শক্তিতে অতুলনীয় হয়ে উঠেছিল এর মানুষরা। তাই আটলান্টিস ছিল এক ঐশ্বর্যময় মহাদেশ। ফুলে-ফলে ভরা ছিল এর উর্বর শ্যামল ভূমি। দলবদ্ধ হাতিরা ঘুরে বেড়াতো এর সুগভীর অরণ্যে। খনিগুলো ভরা ছিল সোনা, রুপা, আর তামার আকরিকে। মহাদেশের দক্ষিণে আটলান্টিসের নৃপতিরা গড়ে তুলেছিলেন অনুপম এক নগরী। নগরীটির নামও ছিল আটলান্টিস। একের পর এক সাজানো জলপথ আর স্থলপথ আইটির মতো বেষ্টন করে রেখেছিল এই নগরীকে। নগরের প্রধান আকর্ষণ ছিল এর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত রাজপ্রাসাদটি। ছোট্ট একটি টিলার উপর গড়ে তোলা হয়েছিল এই সুরম্য প্রাসাদ। একে ঘিরে রেখেছিল তিনটি খাল। প্রাসাদ চত্বরের একেবারে কেন্দ্রস্থলে ছিল একটি মন্দির।
আটলান্টিসের মহাক্ষমতাধর রাজা এ্যাটলাস আর তাঁর নয় ভাই নিয়মিতভাবে মিলিত হতেন এই মন্দিরে। পাঁচ-ছয় বছর পর পর তাঁরা আসতেন এখানে। প্রথমে দেবতাদের উদ্দেশ্যে একটা বন্য ষাঁড় বলি দিতেন তাঁরা। দেবতাদের তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করতেন এর রক্ত। পবিত্র কৃষ্ণপোশাকে সজ্জিত হতেন শাসকরা। এর পর রত হতেন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় আলোচনায়। সবশেষে আলোচনার সারসংক্ষেপ লিখে নেয়া হতো সোনার তৈরি ফলকে। এটা সংরক্ষণ করা হতো পরবর্তী বৈঠকের জন্য। উল্লেখ্য, রাজাদের সুশাসনে বহুদিন পর্যন্ত সুখে-শান্তিতে বসবাস করে আসছিল আটলান্টিসবাসীরা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! আকস্মিক দুর্বিপাক নিমিষে গায়েব করে দিয়েছিল আটলান্টিসের পাঁচ কোটি মানুষকে। শক্তিশালী কোন ভূমিকম্প দু’টুকরো করে দিয়েছিল আটলান্টিস নামের ভূ-খণ্ডকে। পাহাড় সমান সাগরতরঙ্গ এসে ভাসিয়ে দিয়েছিল আটলান্টিসের নগরগুলোকে। ভেসে গিয়েছিল ক্ষেত-খামার আর বন-বনানী। সবশেষে এমন এক ভয়াবহ ভূমিকম্প ঘটে যায়, যার শক্তি অন্যান্য ভূমিকম্পের চেয়ে শতগুন ছিল।
এই ভূমিকম্প মহাদেশটিকে ডুবিয়ে দেয় সাগরতলে। মাত্র একদিন একরাতের ভেতরে গোটা মহাদেশটি বিলীন হয়ে যায় সাগরের গভীরে।  কিংবদন্তীর এই সুবিশাল দ্বীপ আটলান্টিক মহাসাগরে গড়িয়ে যাওয়ার পর আর দেখা যায়নি কোন দিন। উল্লেখ্য, প্রায় নয় হাজার বছর পর প্রথমবারের মতো বিস্মৃতির অতল থেকে আটলান্টিককে তুলে আনলেন গ্রীক দার্শনিক প্লেটো।
তিনটি বইয়ের মধ্যে বর্ণনা করে গিয়েছিলেন হারিয়ে যাওয়া সেই মহাদেশের কাহিনী। সক্রেটিসের ছাত্র ছিলেন প্লেটো। দর্শনশাস্ত্রের ওপর নিজের মতবাদগুলোকে কতগুলো নাটিকার ভেতর দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছিলেন তিনি। এই নাটকগুলোকে বলা হতো ডায়ালগ। প্লেটোর প্রথম ডায়ালগ ছিল রিপাবলিক। পরবর্তীতে আরও দু’টি ডায়ালগ রচনা করেন তিনি। একটি হলো টিমিউস অপরটি হলো ক্রিটিয়াস। আর এ দু’টি ডায়ালগেই বিশদভাবে বর্ণনা দেন তিনি আটলান্টিসের। ক্রিটিয়াসের বর্ণনার ভেতর দিয়েই আটলান্টিসকে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন প্লেটো। ক্রিটিয়াসের বর্ণনায় আছে, সৃষ্টির শুরুতে দেবতারা যখন পৃথিবীকে ভাগাভাগি করে নিচ্ছিলেন নিজেদের মাঝে, তখন সাগরদেবতা পসাইডন বিশাল এক মহাদেশ তাঁর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা কতগুলো দ্বীপকে নিজের জন্য নিয়ে নেবেন বলে ঠিক করেন। পসাইডনের ছিল পাঁচ জোড়া যমজ সন্তান। প্রথম সন্তানের নাম রাখেন তিনি এ্যাটলাস। এ্যাটলাসের নামেই পরবর্তীতে বিশাল এই ভূ-খণ্ড আর তাকে ঘিরে থাকা মহাসাগরের নাম রাখা হয়। আটলান্টিসকে মোট দশটি ভাগে ভাগ করেন রাজা পসাইডন। সবচেয়ে বড় আর ভালো অংশটির প্রধান বানিয়ে দেন এ্যাটলাসকে। প্লেটোই যে কেবল হারিয়ে যাওয়া মহাদেশ আটলান্টিস সম্পর্কে বর্ণনা দিয়েছেন, তা কিন্তু নয়। পরে আরও অনেকেই এই আটলান্টিস সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। উল্লেখ্য, মাদাম বাভাৎস্কি নামে এক রাশিয়ান মহিলা, তিনি ছিলেন অতীন্দ্রিয় ক্ষমতার অধিকারী। আটলান্টিসকে নিয়ে তিনি লিখেছেন, একটি বই। তাঁর বইটির নাম ‘দ্য সিক্রেট ডকট্রিন’। বইটি ছিল দুই খণ্ডের। বইটিতে লেখক প্রাচীন আটলান্টিসকে হারিয়ে যাওয়া লেমুরীয় সভ্যতার উত্তরসুরি বলে উল্লেখ করেন। মাদাম বাভাৎস্কি ও তার অনুসারীরা বিশ্বাস করতেন, সৃষ্টির শুরুতে মানুষের যে সাতটি মূল জাতি ছিল, লেমুনিয়ারা ছিল তাদের মধ্যে তৃতীয়। দক্ষিণ গোলার্ধ জুড়ে ছিল তাদের মহাদেশ। লেমুরীয়রা ছিল উভলিঙ্গÑ অর্থাৎ পুরুষ কিংবা স্ত্রী বলে আলাদা করে চেনা যেত না তাদের। কথা বলতে পারত না তারা। তৃতীয় একটি চোখের সাহায্যে সাইকিক পাওয়ারের মাধ্যমে যোগাযোগ করত একে অপরের সঙ্গে। আটলান্টিসবাসীরা ছিল এই লেমুরীয়দেরই বংশধর। চতুর্থ মূল জাতি। লাখ লাখ বছর আগে ডুবে যায় লেমুরীয়দের মহাদেশ। উত্তর আটলান্টিকে কেবল জেগে ছিল সামান্য একটু অংশ। ধারণা করা হয়, পরবর্তীতে সেখানেই গড়ে ওঠে আটলান্টিস সভ্যতা। একদিন ডুবে গিয়েছিল সেটিও। অস্ট্রিয়ার দার্শনিক রুডলফ স্টাইনারও বলে গেছেন আটলান্টিসের কথা। তাঁর গবেষণায় ধরা পড়ে, আটলান্টিসবাসীরা উড়তে শিখেছিল। তবে ওদের আকাশযানগুলো এখনকার পৃথবীতে ওড়ার উপযোগী হতো না। কারণ, তখনকার দিনে বাতাস ছিল অনেক ঘন আর ভারি। এখনকার মতো এত হাল্কা নয়। উল্লেখ্য, আটলান্টিসকে নিয়ে লিখে গেছেনÑ ডব্লিও স্কট এলিয়ট। প্লেটোর চেয়েও নিখুঁত, আরও সুন্দর ছিল তার বর্ণনা। দিব্যজ্ঞান পেয়েছিলেন স্কট এলিয়ট। অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা ছিল তাঁরও। ১৮৯৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বই। ওই বইয়ের কথা অনুযায়ী আটলান্টিসকে শাসন করত অভিজাত একশ্রেণীর মানুষ। তাদের সমাজ ছিল এক সর্বগ্রাসী, সর্বনাশা সমাজ। সব কিছুকেই নিজের আয়ত্তে নিয়ে আসতে চাইত তারা। প্রযুক্তির দিক থেকেও প্রচুর উৎকর্ষতা লাভ করেছিল আটলান্টিয়ানরা। ঘণ্টায় এক’শ মাইল গতিতে চলতে পারে এমন উড়োজাহাজ আবিষ্কার করেছিল তাঁরা। এই উড়োজাহাজটি চালানো হতো ভ্রিল নামের এক ঘরনের জ্বালানি দিয়ে। যার সঙ্গে মিল আছে আজকের জেট ফুয়েলের। এর পর অনেক বছর গড়িয়ে যায়। ১৯৫৩ সালে ড. জার্মেন স্প্যানুথ নামে এক জার্মান প্রতœতত্ত্ববিদ বলেন, আটলান্টিস নামে এক মহাদেশ হয়তবা ছিল, কিন্তু সে মহাদেশের স্থান নির্ণয়ে ভুল করেছেন তিনি। ইউরোপের মূল ভূখণ্ড এবং ব্রিটেনের মাঝামাঝিতে উত্তর সাগরে অভিযান চালিয়ে আশানুরূপ সাফল্য পান তিনি। তাঁর অনুসন্ধানী দলের এক ডুবুরি সাগরতল থেকে ত্রিশ ফুট নিচে বিস্ময়কর এক দেয়াল খুঁজে পায়। দেয়ালটি এক হাজার বারো গজ বৃত্তাকার সীমানা ঘিরে রয়েছে। প্রায় দশটা ফুটবল মাঠের সমান লম্বা এই দৈর্ঘ্য। জায়গাটি আড়াআড়ি তিন’শ আটাশ গজ। দেয়ালের ভেতরে বিশাল এক বালির স্তুপ ছিল।
ড. স্প্যানুথের ধারণা, আটলান্টিসের ধ্বংসাবশেষ থেকে ডুবুরিরা কিছু জিনিস নিয়ে আসে, যা হারিয়ে যাওয়া আটলান্টিসের কোন রাজপথের ভগ্নাংশ বলে ধারণা করা হয়। পরে আরেক ডুবুরি একটা চকমকি পাথরও নিয়ে আসে সেখান থেকে। ধারণা করা হয়, সভ্যতার প্রথম যুগে কোন হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এই চকমকি পাথর। ওই সাগর সীমানায় অভিযান চালানোর কয়েক বছর আগে এক জেলে অনেককাল আগের ভারি এক জোড়া বালা উদ্ধার করে। এটা কি হারিয়ে যাওয়া আটলান্টিসের অস্তিত্ব প্রমাণ করে? হয়তবা! তবে বিজ্ঞানীরা আটলান্টিস নিয়ে নিরলস গবেষণা করে যাচ্ছেন। আগামীতে আমরা হয়ত আরও চমকপ্রদ তথ্য জানতে পারব স্বপ্নপুরী আটলান্টিস সম্পর্কে।

SHARE

Leave a Reply