Home গল্প অনুবাদ গল্প ঘুরু

ঘুরু

অজিত হরি সাহু..
অনুবাদ : হোসেন মাহমুদ…

গ্রীষ্মকাল। উঁচু পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত বিরাট উপত্যকায় প্রকৃতির মাঝে নতুন করে সাড়া জেগেছে। পাহাড়ে বরফ গলছে। একটি সোতধারা জন্ম নিতে থাকে সেই বরফগলা পানিতে। এবার তার নিচের দিকে প্রবাহিত হওয়ার পালা। সোতের প্রচণ্ড বেগ অচিরেই সামনের দিকে পথ করে নেয়।
সদ্য জন্ম নেয়া ছোট্ট নদীটির নাম ঘুংরু। ঘুঙুরের আরেক নাম। চারদিক ঘুঙুরের শব্দে মুখরিত করেই যেন বইতে শুরু করে সে। কী যে তার আনন্দ! চলচঞ্চল ঘুংরু কল্কল্ ছল্ছল্ শব্দে শুধু ছুটে চলে। উচ্ছল, অদম্য সে। পাহাড়ের কঠিন বুকে সে কিছুতেই আটকে থাকতে চায় না। বাইরের বিশাল পৃথিবী তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। সেই উন্মুক্ত পৃথিবীই তার লক্ষ্য। ঠিক এ সময়ই বিরাট বিরাট কিছু পাথর চাঁই পথ আগলে দাঁড়ায় তার। কিন্তু নৃত্যপরা ঘুংরু চটুল ছন্দে আলগোছে পাথর চাঁইগুলোকে পেরিয়ে যায়। সাফল্যের এ আনন্দে গুনগুন করে গান গেয়ে ওঠে সে-
সূর্য আমাকে দিয়েছে সাহস
আমার ঠোঁটে গুনগুন গান
আমি নেমে আসছি সমতলে
শুনছ কি ঢেউয়ের কলতান?
পাহাড়ের গায়ে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা চিনার গাছগুলোকে দ্রুত পেরিয়ে যায় সে। সবাইকে বিদায় অভিনন্দন জানায়।
: সামনে অনেক বড় পাথরের চাঁই আছে। সাবধানে যেও- ঘুংরুকে একান্ত বন্ধুর মত পরামর্শ দেয় বাতাস।
প্রচণ্ড ঢেউয়ের নাচন তুলে বিরাট পিচ্ছিল পাথরগুলো অতিক্রম করে ঘুংরু। এবার সে পরিণত হয় এক জলপ্রপাতে।
কিন্তু ঘুংরু চায় নদী হতে। তড়িঘড়ি করে নিজের পথ কেটে নেয় সে। কঠিন, পাথুরে পাহাড়ের বুকে খাত তৈরি করে এগিয়ে চলে।
চলার পথে অসংখ্য বড় ও ছোট পাথরের চাঁই পড়েছিল। তারা এবার চিৎকার করে বলে –
: ঘুংরু! একটু দাঁড়াও, আমরাও তোমার সাথে আসছি। আমাদেরও তোমার সাথে নিয়ে যাও।
: ঠিক আছে, আসতে চাও এস। কিন্তু আমি দেরি করতে পারব না। আমাকে অনেক পথ যেতে হবে। ফুরফুরে মেজাজে গানের সুর ভাঁজতে ভাঁজতে ঘুংরু দ্রুত বয়ে চলে। সে এখন আরো শক্তিশালী, আরো গতিশীল। অনেক পথ চলে এসেছে সে। চির বরফে ঢাকা পাহাড়ের চূড়াগুলো তার ভারি প্রিয়। সেগুলো চিরকালের জন্য দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে যায়। মন খুব খারাপ হয়ে যায় তার। তবে দ্রুতই সব বিষণœতা ঝেড়ে ফেলে। পেছন ফিরে তাকানো তার সাজে না। তার দৃষ্টি সামনের উন্মুক্ত পৃথিবীর দিকে। চূড়ান্ত লক্ষ্য সাগর।
সূর্যকরোজ্জ্বল উপত্যকায় নেমে আসে ঘুংরু। পাথুরে পাহাড়, নীরব পাইন ও চিনার গাছের পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে এসে এই প্রথমবারের মতো নিঃসঙ্গ বোধ করে। চলার পথের দু’পাশের মাঠ ঢেকে রাখা সবুজের চাদর এবং ফুটে থাকা নানা রকম বনফুল তাকে সঙ্গ দিতে থাকে। ছোট ছোট পাথর ও বড় আকারের পাথরের চাঁইগুলোকে সে তার সাথে সাথেই বয়ে নিয়ে চলেছিল। তারা সবাই মিলে ঘুংরুর সাথে গেয়ে ওঠে-
কলকল ছলছল ছন্দে
আমরা বয়ে চলি
পাখি আর প্রাণীদের সাথে
কত না কথা বলি।
চলার আনন্দে আত্মহারা ঘুংরু উপত্যকার ঢাল বেয়ে ক্রমেই এগিয়ে চলে। কখনো সে তীরের সূর্যের আলো মাখা আপেল বাগানের দিকে প্রসন্ন দৃষ্টি মেলে চায়। কখনো নিজের পানিতে সূর্যকিরণের উজ্জ্বল প্রতিফলনের দিকে মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকে।
একটি ছোট্ট স্রোতধারা থেকে এটি গর্জনমুখর নদীতে পরিণত হওয়া এবং উন্মুক্ত পৃথিবীর স্বাদ গ্রহণের নেশায় বুঁদ হয়েছিল ঘুংরু। বলা যায়, অসম্ভব দ্রুতগতিতে বন্ধুর পাহাড়ি পথ পেরিয়ে উপত্যকার ছড়ানো বুকে নেমে এসেছে। এখন বোধ হয় একটু শান্ত হওয়া যায়Ñ ভাবে সে। স্রোতের বেগ কিছুটা মন্থর করে। অনেকটা অলস দৃষ্টিতে চেয়ে দেখে বিস্তৃত প্রান্তর যেখানে অলসভাবে চরে বেড়াচ্ছে গরু-ভেড়া-ছাগলের দল। তাদের উদ্বেগহীন ঘাস খাওয়া দেখে যেন কিছুটা লজ্জাই পায় ঘুংরু। তার জীবনের ভীষণ ঝড়োগতির সাথে এসব প্রাণীর আচরণ একেবারেই বেমানান। ঘুংরুর সারা দেহজুড়ে যেন আলস্যের ভার নেমে আসে। তার দুরন্ত, দুর্বার গতি স্তিমিত হয়ে আসার পাশাপাশি অঙ্গপ্রত্যঙ্গে যেন ব্যথা-বেদনা শুরু হয়। পাথরগুলোকে আর বয়ে নিয়ে যেতে অক্ষম হয়ে পড়ে সে। তাই বড় বড় পাথর চাঁইগুলোর উদ্দেশ্যে বলে, আমার দুঃখ হচ্ছে যে তোমাদেরকে এবার বোধ হয় ফেলে যেতে হবে। কারণ, এখন আমি আর আগের মত তরুণ ও শক্তিশালী নই।
ঘুংরু আসলেও বুড়িয়ে যাচ্ছিল। কিছুদিন আগেও সে ছিল তন্বী অর্থাৎ ক্ষীণদেহী। কিন্তু এখন তার দেহ অনেক প্রশস্ত অর্থাৎ সে মুটিয়ে গেছে। তার তীব্র স্রোতের গতিও এখন মন্থর।
ঘুংরু তাদের ফেলে যাবেÑ এ কথা শুনেও পাথরের চাঁইগুলো মনে কষ্ট পেল না। ঘুংরুর প্রবল স্রোতের টানে অতি দ্রুতগতিতে নিচের দিকে নেমে এসেছে তারা। নদীর মেঝেতে ঘষা খেতে খেতে তাদের আকার যেমন হ্রাস পেয়েছে তেমনি চেহারাও বদলে গেছে। দিনভর সূর্যের উত্তাপ তাদের গা গরম করে রাখে। এদিকে বাচ্চা ছেলেরা তাদের খেলার সামগ্রী বানিয়েছে। এটা একবারে মন্দ লাগে না।
বাদ সাধে খুদে নুড়ি ও বেলে পাথরগুলো। ঘুংরুর সাথেই তারা পাহাড় থেকে নেমে এসেছে। তারা মিনতি করে বলে, ও ঘুংরু! আমাদেরকে তোমার সাথে নিয়ে চল। কিছুতেই আমাদের ফেলে যেও না। তুমি সাগরকে দেখতে চাও, আমরাও তাই চাই।
দীর্ঘদিনের যাত্রাপথে ঘুংরু তাদেরকে সাগর সম্পর্কে তার শোনা গল্প শোনাত। সে বলত, সাগর যে কত বিশাল তা কল্পনাও করা যায় না। যাহোক, করুণ মিনতির কারণে ঘুংরু তাদের সাথে নেয়। তারপর সমতল ভূমির ওপর দিয়ে আঁকাবাঁকা পথ কেটে সে এগিয়ে চলে।
ঘুংরু এখন বৃদ্ধ। তার স্রোতের গর্জন এখন আর ভীতিকর শোনায় না। তার বুকে ঢেউয়ের উন্মাতাল নৃত্যের বদলে শান্ত ভাব। তার পানিও ঘোলা রঙের বদলে রুপালি রং ধারণ করেছে। ইতোমধ্যে তার শরীরের প্রশস্ততা আরো বেড়ে যাওয়ায় আগের চেয়েও ভারি হয়ে পড়েছে সে। শহর ও গ্রামের ঘাটগুলোতে লোকে যখন গোসল করতে নামে, কিছুটা নাড়াচাড়া করলেই তার পানি ঘোলা হয়ে যায়। তার বুকের শান্ত পানিতে এখন বড় বড় নৌকার বদলে ছোট ছোট নৌকা ও ভেলা চলাচল করে। প্রশস্ত তীরজুড়ে জেলেরা অলস বসে সময় কাটায়। কখনো কখনো কোনো দুঃসাহসী কিেেশার ডুব দিয়ে তার তলদেশ আবিষ্কারের চেষ্টায় মাতে।
ঘুংরুর এখন বয়ে যেতেও বুঝি কষ্ট হয়। একটু এগোলেই শরীরে যন্ত্রণা অনুভব করে। তখন কাতরে ওঠে সে। যে নুড়ি পাথরগুলোকে বয়ে এনেছিল সে, সেগুলো এখন পলির মধ্যে আটকে গেছে। পলির পরিমাণ এত বেশি যে তা সরিয়ে ফেলার মতো শক্তি তার নেই। অনেক জায়গাতেই তার শরীর ছোট ছোট জলাশয়ের রূপ ধারণ করেছে।
অনেক দূরে বিশাল সুনীল সাগরকে দেখতে পায় ঘুংরু। তার কল্পনার চাইতেও বিশাল সে সাগর। সাগর তাকে দেখতে পেয়ে হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকে। আর তখনি যেন ঘুংরুর শক্তি বেড়ে যায়। মৃদু হাসে সে, কিন্তু সে হাসির শব্দ ফিসফিসানির চেয়ে জোরে শোনা যায় না।
বহুদিন পর ঘুংরু আবার গান গেয়ে ওঠে-
সাগর আমার ঘর
আমি এখানেই ফিরে এলাম
খুশিতে ভরা হৃদয়
তাই শেষ গান শুনিয়ে গেলাম।
ঘুংরুর জলরাশি সাগরের অথৈ পানির সাথে মিশে একাকার হয়ে যায়। গভীর শান্তিতে চোখ মুদে আসে তার। শেষ পর্যন্ত নিজের গন্তব্যে পৌঁছতে পেরেছে সে।

SHARE

Leave a Reply