Home সায়েন্স ফিকশন মহাকাশে বাংলা মার্কেট

মহাকাশে বাংলা মার্কেট

মুহাম্মাদ দারিন…

‘সময়টা ছিল ২০০৩। নাসা বিশ্বব্যাপী শিশু-কিশোরদের নিয়ে এক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। প্রতিযোগিতার বিষয় মেধাযাচাই।
দশটি মহাকাশবিষয়ক প্রশ্ন তারা বিশ্বব্যাপী প্রচার করে দেয়। ঘোষণা করা রড বিজয়ীকে মহাকাশ ভ্রমণ করানো হবে। নির্দিষ্ট সময়ে উত্তরপত্র জমা পড়লো নাসার দফতরে।’ এ পর্যন্ত বলে থামেন নাসার মহাকাশ বিজ্ঞানী ড. এডসার হামবার্ট।
‘সেই সৌভাগ্যবান শিশুটি কে, স্যার?’ জানতে চাইলো ডিক ব্লেয়ার। সে ড. এডসার হামবার্টের সহকারী।
‘সে ছিল দক্ষিণ এশিয়ার এক ছোট জনবহুল দেশের বার বছরের এক কিশোর। এই কিশোরই বাঁচিয়েছিল নাসার নামকরা সাত মহাকাশ বিজ্ঞানীকে।’
‘স্যার এই কাহিনী শুনতে অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু বেশি জানতে পারিনি। প্লিজ স্যার, বলবেন কি পুরো কাহিনীটা?’
ঠিক তখন ড. এডসার হামবার্ট মহাকাশ যানটা থামান।
ডিক বলে, ‘স্যার এখানে থামার তো আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই।’
‘ডিক চল, আজ আমরা একটু বাংলা খাবার খেয়ে আসি বাংলা মার্কেটের বাংলা রেস্টুরেন্ট  থেকে।’ বললেন ড. এডসার হামবার্ট।
‘স্যার, পৃথিবী থেকেতো আমরা খাদ্যের ক্যাপসুল খেয়ে এসেছি। বাহাত্তর ঘণ্টার আগে আমাদের ক্ষুধা লাগার কোনো কথা নয়। তাছাড়া আমাদের হাতে সময়ও কম।’
বিজ্ঞানের এক মহা আবিষ্কার খাদ্য ক্যাপসুল। এই ক্যাপসুল মানুষের সময় বাঁচিয়ে দিয়েছে। এখন মানুষ চুলার ধারে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে রান্না করে না। এই খাদ্য ক্যাপসুলই শিরায় শিরায় পৌঁছে দেয় প্রয়োজনীয় উপাদান। ফলে দূর হয় ক্ষুধা। এটাই এখন খাদ্যের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয় সারা বিশ্বে।
নাসার ব্রিলিয়ান্ট বিজ্ঞানীদের মধ্যে ড. এডসার হামবার্ট একজন। ডিক ব্লেয়ার তার সহকারী। গুরুত্বপূর্ণ কী এক গবেষণার কাজে তারা এসেছেন মহাশূন্যে।
ইতোমধ্যে ড. মহাকাশ যানের দরজা খুলে ফেলেছেন। তিনি বললেন, ‘ডিক, আজ বাংলা মার্কেটে বাংলা খাবার খেতে খেতে তোমাকে এক বাঙালি কিশোরের গল্প বলব।’
‘কিন্তু স্যার…।’
ডিকের কথা যেন ড. শুনতে পাননি এমন ভান করে বললেন, ‘তুমি বাইরে বের হওয়াব প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জলদি নিয়ে এসো।’
প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পরে এবং সাথে নিয়ে মহাকাশ যান থেকে নামেন ড. এডসার হামবার্ট।
গজ গজ করতে করতে ডিকও নামলো।
ডিকের দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিলেন ড.।
মহাকাশে হাজারো মার্কেটের মধ্যে এটা একটা ছোট্ট মার্কেট। এর নাম “বাংলা মার্কেট”। এই মার্কেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় সমস্ত কিছুই পাওয়া যায়।
মার্কেটের একমাত্র রেস্টুরেন্টের সামনে এসে থামলেন ড.। সাথে ডিকও।
মার্কেটের সব দোকানের সাইনবোর্ডের লেখা বাংলায়। বর্তমান শতাব্দীতে বাংলা বিশ্বের বহুল ব্যবহৃত ও প্রচলিত একটি ভাষা।
ড. ডিকের দিকে ফিরলেন। বললেন, ‘এই রেস্টুরেন্টের নাম বাংলা রেস্টুরেন্ট।’
ডিক তখনও গজ গজ করছে। যেন তার মগজে কেউ গরম পানি ঢালছে।
ড. প্রবেশ করলেন ভেতরে।
একবিংশ শতাব্দীতে ব্যবহৃত চেয়ার টেবিল পাতা ভেতরে।
ড. এক কর্নারের চেয়ারে যেয়ে বসলেন। পাশে ডিক ব্লেয়ারও।
এগিয়ে এলো দশ-বার বছরের এক হোটেল বয়। বাংলায় জানতে চাইলো, ‘স্যার কী খাবেন?’
‘ডাল-ভাত আর আলুভর্তা নিয়ে এসো।’ অর্ডার দিলেন ড.।
ডিক ব্লেয়ার কিছুটা ভড়কে গেল। সেটা প্রকাশ করে ফেলল স্যারের সামনে। বলল, ‘ডাল-ভাত আর আলুভর্তা আবার কী জিনিস? আর আপনি এই ভাষা জানেন স্যার?’
‘ডাল-ভাত আর আলুভর্তা হলো একবিংশ শতাব্দীতে ব্যবহৃত দক্ষিণ এশিয়ার কিছু মানুষের প্রধান খাদ্য। আর বাংলা ভাষা আমি কিছুটা জানি।’
‘স্যার এটা কি নাসার সেই পুরস্কার বিজয়ী কিশোরটির খাদ্য?’
‘হ্যাঁ। শুধু তার খাদ্য নয়, তার ভাষাও বাংলা।’
ডিক ব্লেয়ার এবার উৎসাহী হয়ে উঠলো। রাগ রাগ ভাবটা দূর হয়ে গেল তার মধ্য থেকে।
বয় তখন দুটো প্লেটে চারটি করে ক্যাপসুল দিয়ে গেল। চারটির তিনটি স্বাভাবিক আর একটি ছোট্ট।
ড. এডসার হামবার্ট বললেন, ‘ডিক ব্লেয়ার, শুরু কর বাংলা খাবার খাওয়া।’ বলে তিনি বড় তিনটা ক্যাপসুল একবারে গালে পুরে চুষতে লাগলেন। প্লাস্টিক গলে যেতেই ছোট্ট ক্যাপসুলটাও মুখে পুরে চোষা শুরু করলেন।
বড তিনটা ক্যাপসুল ছিল ভাত, ডাল ও আলুভর্তা। আর ছোট্টটি ছিল কাগজি লেবু।
ডিক ব্লেয়ারও স্যারের অনুসরণ করলো।
কয়েক সেকেন্ড চোষার পর চোখ দু’টি বন্ধ করে নীরবে চুষতে লাগলো।
পুরো দুই মিনিট পর চোখ বন্ধ রেখেই ডিক বলল, ‘স্যার, আমার পূর্বপুরুষের জীবনটাই বৃথা গেছে। তারা বাংলা খাদ্য চেখে দেখাতো দূরে থাক চোখেও দেখেনি। আমার জীবনটা আজ ধন্য। মনে হচ্ছে স্বর্গের কোনো খাদ্য খাচ্ছি আমি। স্যার, প্লিজ। এবার বলবেন কি ছেলেটির কাহিনী?’
‘হ্যাঁ বলব।’ একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে তারপর বলেন, ‘শোন তাহলে, ঐ ছেলেটির দেশ ছিল দক্ষিণ এশিয়ায়। ইন্ডিয়াতো অবশ্যই চেনো। তিন দিক থেকে ইন্ডিয়া বেষ্টিত সেই ছোট্ট দেশটি।’
‘স্যার দেশেটির নাম?’
‘বাংলাদেশ। দেশটির ভাষা বাংলা। ভাষার জন্য এই বিশ্বে একমাত্র বাংলাদেশীরাই আন্দোলন করেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে ভাষার জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম আর কোনো জাতি করেনি। জীবনের বিনিময়ে অর্জিত ওদের ভাষা। তাই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে জাতিসঙ্ঘ বাংলা ভাষাকে স্বীকৃতি দেয়।’
‘স্যার আপনি এতো কিছু জানেন?’
‘হ্যাঁ ডিক। বাংলা ভাষার ওপর আমি একটা কোর্স করেছিলাম। তা থেকেই কিছু কিছু জেনেছি। এবার শোন সেই ছেলেটির কাহিনী।’ বলে একটু দম নিলেন ড.।
বাম হাতের উল্টা পিঠে মুখ মুছে আবার শুরু করলেন, ‘নাসা আমন্ত্রণ জানালো ছেলেটিকে। মহাকাশ ভ্রমণের জন্য। যথাসময়ে ছেলেটি হাজির হলো নাসার সদর দফতরে। নির্দিষ্ট দিনে ছেলেটিকে মহাকাশ ভ্রমণে পাঠানো হলো। নাসা তার সর্বকালের সেরা সাত বিজ্ঞানীর সাথে তাকে পাঠায়। সাত বিজ্ঞানীকে এক সাথে পাঠানো হয়েছিল মহাকাশবিষয়ক এক জটিল সমস্যার সমাধানের জন্য।
‘দুইদিন ছেলেটিসহ বিজ্ঞানীদের ভালোই কাটে। তৃতীয় দিনে সমস্ত কিছু ওলট-পালট হয়ে যায়। পৃথিবী থেকে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় মহাকাশ যানের।’ এ পর্যন্ত বলে ড. আবার থামেন।
টেবিলে রাখা একবিংশ শতাব্দীতে ব্যবহৃত কাচের গ্লাসের সব পানি একবারে শেষ করে ছোট্ট একটা ঢেঁকুর তুলেন। বাম হাতের উল্টা পিঠ দিয়ে মুখ মুছে আবার বলতে আরম্ভ করলেন, ‘শত চেষ্টার পরও সাত বিজ্ঞানী হতাশ হয়ে গেলেন। কিছুতেই যোগাযোগ করতে পারলেন না তারা নাসার সাথে।
‘চতুর্থ দিনে সাত বিজ্ঞানীর একজন উধাও হয়ে গেলেন। পঞ্চম দিনে আরও একজন। এভাবে দিনে দিনে ছয় বিজ্ঞানী নিখোঁজ হয়ে গেলেন। অবশিষ্ট থাকলেন নাসার একমাত্র তরুণ বিজ্ঞানী আর সেই ছেলেটি।
‘সমস্ত মহাকাশ যান ঐ দু’জন তন্ন তন্ন করে খুঁজলেন। কিন্তু কোথাও পাওয়া গেল না। তবে মহাকাশ যানের কয়েকটা রুম বন্ধ অবস্থায় পেলেন ওরা। শত চেষ্টায়ও রুমগুলো খোলা গেল না। পাওয়া গেল না রুমের ভেতর কোনোরূপ সাড়াশব্দ। সপ্তম দিনে হঠাৎ উদয় হলো সাবেক নাসার খুনি মহাকাশ বিজ্ঞানী ড. কেইন। খুনের দায়ে নাসা তাকে পাঁচ বছর আগে বহিষ্কার করে।
‘ড. কেইন মহাকাশ যানটা দখল করে নিয়েছিল। সে নাসার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। ও জানতে চেয়েছিল সাত বিজ্ঞানী কোন কাজে মহাশূন্যে গেছেন?’ এ পর্যন্ত বলে থামলেন ড. এডসার হামবার্ট। লম্বা একটা নিঃশ্বাস ছাড়লেন।
ডিক ব্লেয়ারের যেন আর সহ্য হচ্ছে না। তাই বলল, ‘স্যার তারপর কী হলো?’
ড. আবার শুরু করলেন, ‘মহাশূন্যের তরুণ বিজ্ঞানীর কাছ থেকে কেইন হয়তো বের করে ফেলতো গবেষণার গোপনীয় বিষয়টি। কিন্তু ছেলেটি তা হতে দেয়নি। ছেলেটি কিভাবে যেন জেনে যায় মহাকাশ যানের পৃষ্ঠে অবস্থান করছে ড. কেইনের ডিঙির মতো ছোট্ট মহাকাশ যানটা। ওটায় গিয়ে ছেলেটি নাসার সাথে যোগাযোগ করে। এবং ঘটনা খুলে বলে। নাসা ত্বরিতগতিতে উদ্ধার যান পাঠায় মহাকাশে। কিন্তু ছেলেটিকে বাঁচানো গেল না। ছেলেটির সমস্ত যোগাযোগের কাজ যখন শেষ তখন ড. কেইন তার যানে যেয়ে দেখে ছেলেটি সমস্ত যোগাযোগ সম্পন্ন করে ফেলেছে। তখন খুনির মাথায় খুন চাপতে সেকেন্ডও দেরি হয় না। সাথে সাথে খুনি বিজ্ঞানী লেসার দিয়ে খুন করে ছেলেটিকে। তারপর নিজে না পালিয়ে ওখানেই লেজার দিয়ে আত্মহত্যা করে।’
‘ও আত্মহত্যা করলো কেন স্যার?’ কথার মাঝে জানতে চায় ডিক ব্লেয়ার।
‘কারণ ড. কেইন জানতো পালিয়ে ও আর বাঁচতে পারবে না।’ বললেন ড. এডসার হামবার্ট।
‘স্যার ছয় বিজ্ঞানীকে কোথায় পাওয়া গেল?’ জিজ্ঞাসা ডিকের।
‘মহাকাশ যানের বন্ধ ঘরগুলোতে আটকে রেখেছিল খুনি কেইন। উদ্ধারকর্মীরা এসে তাদের বের করেন। ছেলেটির মৃত্যু হয় এই বাংলা মার্কেটের স্থানে। ওর মুত্যুতে নাসা গভীর শোক প্রকাশ করেছিল। ওর স্মরণেই মহাকাশের এই স্থানে তৈরি করা হয় বাংলা মার্কেট।’ বলে থেমে যান ড. এডসার হামবার্ট। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। ছেলেটিকে যেন তিনি স্মৃতির পাতায় দেখতে পাচ্ছেন ভাবটা এমন।
ডিক ব্লেয়ার এতক্ষণ স্যারের দিকে অপলক নেত্রে তাকিয়ে ছিল। এবার চোখের পলক ফেলে জানতে চাইলো, ‘স্যার মহাকাশ যানের সেই সর্বকনিষ্ঠ তরুণ বিজ্ঞানী কে ছিলেন?’
একটা মুচকি হাসি দিলেন ড.। বললেন, ‘সেটা হলো এই অধম এডসার হামবার্টের গ্রেট গ্রান্ড ফাদার।’
ডিক ব্লেয়ার চেয়ার থেকে উঠে সোজা স্যারের সামনে এসে বসে বাংলা কায়দায় স্যারের দু’পা ছুঁয়ে সালাম করল। স্যারও বাংলা কায়দায় সহকারীর মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করলেন।
ড. চেয়ার থেকে উঠে সহকারীর দু’কাঁধ ধরে দাঁড় করায়ে একটা ঝাঁকি দিয়ে বললেন, ‘তুমি যে কায়দায় সালাম করলে এটা হলো সালামের বাংলা রীতি।’ ঘাড় থেকে হাত নামিয়ে বললেন, ‘চল ডিক ব্লেয়ার, এবার যাওয়া যাক।’
ড. রেস্টুরেন্ট থেকে বের হতে যাবেন এমন সময় ডিক ব্লেয়ার বলল, ‘স্যার সাথে কিছু বাংলা খাবারের ক্যাপসুল নিলে হতো না?’
ড. এডসার হামবার্ট তাকালেন ডিক ব্লেয়ারের দিকে। একটা সুন্দর হাসি দিয়ে সম্মতি জানালেন।

SHARE

Leave a Reply