Home তোমাদের কবিতা ঈদের খুশি

ঈদের খুশি

জনি সিদ্দিক…

ঈদের আর মাত্র পাঁচ দিন বাকি। তাই রাফির ব্যস্ততাও বেশি। ঈদকে নিয়ে নানান পরিকল্পনায় ভাসছে ও। ঈদের দিন কী করবে, কী খাবে, কোথায কোথায় ঘুরবে- এরকম হাজারো চিন্তায় ওর মন অস্থির। এবারের ঈদের জন্য চার সেট নতুন জামা-কাপড় পেয়েছে ও। কিন্তু ও একলা মানুষ, এত জামা-কাপড় দিয়ে কী করবে? এর সাথে গতবারের দুটো এখনও আছে। ওর ভাবনা- ‘আমি এত জামা দিয়ে কী করবো? সাধারণ দুটো হলেই তো হয়। যারা রাস্তার টোকাই, ওরা তো খালি গায়েই ঈদ কাটায়।’ রাফির ইচ্ছে হয় ওর কিছু জামা কাপড় ঐ টোকাই ছেলেদের মাঝে বিলিয়ে দিতে। একটু হলেও ওদের মনে আনন্দ দিতে। কিন্তু আব্বু-আম্মুর ভয়েই তা করতে পারে না।
রাফি ওর আব্বু-আম্মুর একমাত্র আদরের সন্তান। স্বাভাবিকভাবেই কোনো কিছুর অভাব নেই। ওর আম্মু গৃহিণী হলেও আব্বু বড় ব্যবসায়ী ও বাংলাদেশ শিশু অধিকার আন্দোলন সংস্থার কার্যকরী বোর্ডের স্থায়ী সদস্য। আব্বুকে শিশু অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে টিভিতে, পত্রপত্রিকায় অনেক দেখেছে কিন্তু বাস্তবে অনাথ শিশুদের ভালোবাসতে দেখেনি। আসলে এদেশের অর্থবান লোকদের স্বভাবটাই এমন। মুখে মধু ছড়ালেও কাজের বেলায় শূন্য।
ছি! ছি! কী ব্যাপার! ও এসব ভাবছে কেন?
নিজ আব্বুর সমালোচনা করছে ও? অথচ আব্বুর জন্য পাগল ও। আসলে মাসখানেক হলো ওর আচার আচরণে কেমন জানি পরিবর্তন ঘটেছে। যে রাফি সকাল ৭টার সময় ছাড়া বিছানা ছাড়েনি সেই রাফি এখন রাত ৩টায় উঠে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করে। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, পথে-ঘাটে সবাইকে সালাম দেয়। আর সবকিছুই সম্ভব হয়েছে কেবল ওদের স্কুলে দশম শ্রেণীর মেধাবী ছাত্র সাকিব ভাইয়ার কল্যাণে।
সাকিব ভাইয়া স্কুলসেরা ছাত্র। আসলে তার কল্যাণেই রাফির এমন অভবনীয় পরিবর্তন। সাকিব ভাইয়া খুবই ভালো ছেলে। স্কুলজুড়ে নাম। শান্ত শিষ্ট, সৌম্য, ভদ্র ছেলে সাকিব ভাইয়া। সবসময় যেন মুচকি হাসি লেগেই থাকে। বিশেষ করে ছোট ভাই বোনদের সাথে দেখা হলেই। কী ছোট কী বড় সবার সাথেই তার খাতির। তাই সবাই তাকে খুব ভালোবাসে। তবে গুণ্ডা-পাণ্ডা টাইপের কিছু ছাত্র তাকে পছন্দ করে না।
তার কথাগুলো শুধু পরামর্শতো নয়ই বরং সেগুলো কুরআন হাদিসে গড়া এবং হৃদয় ছোঁয়ানো। ও বুঝতে পারে এর রহস্য। ভাইয়া নিয়মিত কুরআন-হাদিস পড়েন এবং বিভিন্ন ইসলামী সাহিত্য পড়ে এর আলোকে জীবন গড়ার চেষ্টা করেন। যার কারণে তিনি সবার কাছেই প্রশংসিত। সাকিব ভাইয়ার মতোই হতে চায় রাফি। সাকিব ভাইয়ার মতো স্কুলসেরা ছাত্র হওয়ার প্রত্যয় রাফির। এখনও সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। রোল নম্বর ২, বাড়িতে চার চারজন গৃহশিক্ষক, যার মধ্যে অন্যতম একজন সাকিব ভাইয়া। সাকিব ভাইয়া সব বিষয়েই দক্ষ। লেখালেখি, লেখাপড়া, কাজকর্মে সব দিকেই সেরা। আর এই সেরা মানুষটার ছোঁয়া পেয়েই ও অনেকটা উন্নতি করেছে। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যেন সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে তা বুঝতেই পারেনি। মাগরিবের আজানের সুর শুনে ভাবনায় ছেদ পড়ে ওর। ঘরে এসে নামাজ আদায় করে নেয়। নামাজ শেষে আবার ভাবে, কী মজা এই নামাজে! অথচ ওর আব্বু-আম্মু কখনও এই নামাজ পড়তে বলেননি। সাকিব ভাইয়াই এসব কিছু শিখিয়েছেন। আর এজন্য সাকিব ভাইয়া এখন ওর সবচেয়ে প্রিয় মানুষ হয়েছেন। এ কথাটা একদিন ও সাকিব ভাইয়াকে বলেই ফেললো। তৎক্ষণাৎ সাকিব ভাইয়া প্রতিবাদ করে বললেন, না না রাফি। তুমি ভুল করছো।
কেন ভাইয়া? বললো রাফি।
এ জন্য যে, বললেন ভাইয়া, বুখারী শরিফের হাদিসে আছে হজরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করিম (সা) বলেছেন, তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মু’মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে আমাকে তার পিতা, সন্তান-সন্ততি এবং অন্যান্য সকল মানুষের চেয়ে বেশি ভালোবাসবে। অতএব ভেবে দেখো রাফি, আমার চাইতে রাসূলকে (সা) সবচেয়ে বেশি প্রিয় আদর্শ হিসেবে মানতে হবে। তিনি এখন নেই, তাই তাকে ভালোবাসার অর্থ হলো তার আদর্শ মেনে চলা, তার সুন্নাতকে পরিপূর্ণভাবে মেনে চলা। অতএব দুনিয়ার যত ধরনের ভালোবাসায় থাকুক না কেন সব ভালোবাসার কেন্দ্র্র হলেন রাসূল (সা)।
তাই ভাইয়া, বললো রাফি। আমি ইসলাম সম্পর্কে আরো ভালোভাবে জানতে চাই। আর তাই আপনি আমাকে আরও বেশি বেশি বই দেন।
এভাবে আরো দুই দিন কেটে গেলো। এই দুই দিনে ও একটা এতিম টোকাই ছেলের সাথে বেশ ভাব জমিয়ে ফেলেছে। ছেলেটা বেশ সহজ সরল। মুখের দিকে তাকালেই কেমন একটা অসহায়ত্ব ভাব ফুটে ওঠে। হৃদয় থেকে সৃষ্টি হয় গভীর ভালোবাসা। ছেলেটার দুঃখময় কাহিনী শুনে রাফির মনের ভেতর হু হু করে ওঠে। ওর নাম আলী আকবার। ওদের গ্রামের বাড়ি ছিলো মেঘনা নদীর তীরে। নদীভাঙনের কবলে পড়ে পারি জমিয়েছিল শহরে। আজ প্রায় বছর পাঁচেক হলো এখানে আসা। ওর মা বাসায় বাসায় কাজ করে আর ও টোকাইয়ের কাজ করে কোনোরকমে সংসার চালায়। ওরা রাফিদের বাসার সামনেই থাকে।
রাফি জিজ্ঞাসা করে, ‘তোমার কি লেখাপড়া করতে ইচ্ছে হয় না?’ তখন আলী আকবার বলে, ‘পেডের খাওন জোগাইবার পারি না, আবার লেহাপড়া?’ গরিবের সখ থাকলেও সাধ্য নেই।
‘আচ্ছা আলী, আমি যদি তোমাকে পড়ালেখার ব্যবস্থা করে দিই তবে কি তুমি পড়বে?’
‘কী যে বলেন না ভাইজান! আপনারা শুধু বলেন কিন্তু কামের বেলা ফুটুস।’
‘না, না, আলী! সত্যি বলছি।’
‘যদি করবার পারেন তবে খুউব ভালো হইবো, তয় পেড আগে।’
সেদিন আলী আকবারের সাথে কথা বলে বাড়িতে এসে ওর নতুন প্ল্যান খোঁজে। ভাবতে ভাবতে এক সময় আলহামদুলিল্লাহ বলে লাফিয়ে ওঠে। তারপর সাকিব ভাইকে ফোন করে সব বলে দেয়। সাকিব ভাইয়া এক ঘণ্টা পর রাফিদের বাসায় আসেন। এদিকে রাফি ওর আব্বু-আম্মুকে অনেক কষ্টে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজি করায়। তারপর দু’জন দুই হাজার টাকা নিয়ে বাজারে যায়।
ঈদের দিন সকালবেলা। আলী আকবার আর ওর মা নতুন কাপড়ে সজ্জিত হয়ে রাফিদের বাসায় বসে আছে। এমন সময় রাফি আর সাকিব ভাইয়া হাজির হলো, হাতে কিছু জিনিস নিয়ে। তারপর জিনিসগুলো ওদের মা ও ছেলের হাতে তুলে দিয়ে বললো, ওকে কর্মজীবীদের স্কুলে ভর্তি করে দেবো। আর এখানে প্রায় দুই হাজার টাকার মালামাল রয়েছে। আলী আকবার এগুলো রাস্তার মোড়ে মোড়ে ফেরি করে বিক্রি করবে। তবে অবশ্যই স্কুল ছুটির পর। আল্লাহ চাহেতো এভাবে ফেরি করে বিক্রি করতে করতে ও একদিন বড়ো ব্যবসায়ী হবে। কারণ ছোট থেকেই বড়ো হতে হয়। আর এ বুদ্ধি হলো রাফির।
ছেলের এত সুন্দর পরিকল্পনা দেখে পিতা-মাতা দু’জনেই অবাক হয়ে গেলেন। আলী আকবার আর তার মা অশ্রুসিক্ত নয়নে রাফির জন্য দোয়া করলেন, যে দোয়া ঈদের খুশির দোয়া।

SHARE

Leave a Reply